কবিরা গুনাহ
বাহাত্তরটি কবিরা গুনাহ এই:
১. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা।
২. জিনা করা।
৩. সমকাম করা।
৪. মদ ও সব ধরনের মাদক পানীয় পান করা। (বিয়ার পান করাও হারাম।)
৫. চুরি করা।
৬. নেশার জন্য মাদকদ্রব্য সেবন করা।
৭. অন্যের সম্পদ জোর করে নেওয়া, অর্থাৎ গসব করা।
৮. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।
৯. বিনা ওজরে মুসলমানদের সামনে খেয়ে রমজানের রোজা ভঙ্গ করা।
১০. সুদ নেওয়া ও দেওয়া।
১১. বেশি বেশি কসম খাওয়া।
১২. মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, তাঁদের বিরোধিতা করা।
১৩. মাহরাম ও নেককার আত্মীয়দের সঙ্গে সিলায়ে রাহম (খোঁজখবর নেওয়া, দেখা-সাক্ষাৎ) ত্যাগ করা।
১৪. যুদ্ধের সময় রণক্ষেত্র ছেড়ে শত্রুর সামনে থেকে পালিয়ে যাওয়া।
১৫. অন্যায়ভাবে ইয়াতিমের সম্পদ খাওয়া।
১৬. দাঁড়িপাল্লা ও মাপযন্ত্র ন্যায্যভাবে ব্যবহার না করা।
১৭. নামাজ ওয়াক্তের আগে বা পরে পড়া।
১৮. মুমিন ভাইয়ের মনে কষ্ট দেওয়া। (এটি কাবা ধ্বংস করার চেয়েও বড় গুনাহ। আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট করে যে কুফর, তার পরে মনে কষ্ট দেওয়ার মতো বড় গুনাহ আর নেই।)
১৯. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেননি এমন কথা বলা এবং তা তাঁর নামে চালিয়ে দেওয়া।
২০. ঘুষ নেওয়া।
২১. সত্য সাক্ষ্য দেওয়া থেকে পালিয়ে থাকা।
২২. সম্পদের যাকাত ও উশর না দেওয়া।
২৩. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মুনকার (মন্দ কাজ) ও গুনাহকারীকে দেখে বাধা না দেওয়া।
২৪. জীবন্ত প্রাণীকে আগুনে পোড়ানো।
২৫. মহামর্যাদাবান কুরআন শেখার পর তার তিলাওয়াত ভুলে যাওয়া।
২৬. মহামর্যাদাবান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া।
২৭. মুসলমান হোক বা কাফির, মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
২৮. শূকরের গোশত খাওয়া।
২৯. রাসূলুল্লাহর সাহাবীগণের (রিদওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাইন) কোনো একজনকে অপছন্দ করা ও গালি দেওয়া।
৩০. পেট ভরে যাওয়ার পরও খাওয়া চালিয়ে যাওয়া।
৩১. স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর বিছানা থেকে দূরে সরে থাকা।
৩২. স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর অনুমতি ছাড়া বেড়াতে যাওয়া।
৩৩. কোনো সতী নারীকে ব্যভিচারিণী বলা।
৩৪. নামিমা, অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে কথা লাগানো (চোগলখোরি করা)। ৩৫. সতরের অঙ্গ অন্যকে দেখানো। (পুরুষের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত; নারীর চুল, বাহু ও পা সতর।) অন্যের সতরের দিকে তাকানোও হারাম।
৩৬. মৃত প্রাণী খাওয়া এবং অন্যকে খাওয়ানো। ৩৭. আমানতের খিয়ানত করা। ৩৮. মুসলমানের গিবত করা। ৩৯. হিংসা করা।
৪০. মহামর্যাদাবান আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা। ৪১. মিথ্যা বলা। ৪২. অহংকার করা, নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা।
৪৩. মৃত্যুশয্যায় শায়িত রোগীর ওয়ারিশদের কাছ থেকে সম্পদ লুকিয়ে ফেলা। ৪৪. কৃপণ, অতি লোভী হওয়া।
৪৫. দুনিয়ার প্রতি আসক্তি রাখা।
৪৬. আল্লাহ তাআলার আজাবকে ভয় না করা। ৪৭. হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস না করা।
৪৮. হালালকে হালাল বলে বিশ্বাস না করা। ৪৯. গণকদের গণনায় ও গায়েবের খবর দেওয়ায় বিশ্বাস করা। ৫০. দ্বীন থেকে ফিরে যাওয়া, মুরতাদ হওয়া।
৫১. বিনা ওজরে পরনারী বা পরের মেয়ের দিকে তাকানো। ৫২. নারীদের পুরুষের পোশাক পরা। ৫৩. পুরুষদের নারীর পোশাক পরা। ৫৪. কাবার হারামে গুনাহ করা। ৫৫. ওয়াক্ত হওয়ার আগে আজান দেওয়া ও নামাজ পড়া।
৫৬. রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের আদেশ ও আইনকানুন অমান্য করা, সেগুলোর বিরোধিতা করা।
৫৭. নিজের স্ত্রীর গোপন অঙ্গকে নিজের মায়ের গোপন অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা। ৫৮. স্ত্রীর মাকে গালি দেওয়া।
৫৯. একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করা।
৬০. কুকুরের উচ্ছিষ্ট খাওয়া ও পান করা। ৬১. নিজের করা উপকারের খোঁটা দেওয়া। ৬২. রেশমি পোশাক পরা (পুরুষদের জন্য)। ৬৩. অজ্ঞতায় জেদ ধরে থাকা। (আহলে সুন্নতের আকিদা, ফরজ, হারাম এবং প্রয়োজনীয় সব জ্ঞান না শেখা।)
৬৪. আল্লাহ তাআলা এবং ইসলাম যেসব নাম জানিয়েছে, সেগুলো ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম খাওয়া।
৬৫. ইলম থেকে পালিয়ে থাকা।
৬৬. অজ্ঞতা যে একটি মুসিবত, তা না বোঝা।
৬৭. ছোট গুনাহ বারবার করায় জেদ ধরে থাকা। ৬৮. প্রয়োজন ছাড়া অট্টহাসি দিয়ে বেশি হাসা।
৬৯. এক ওয়াক্ত নামাজের সময় পার হয়ে যাওয়া পর্যন্ত জুনুবি (গোসল ফরজ হওয়া) অবস্থায় থাকা। ৭০. হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা।
৭১. তাগান্নি (গান গাওয়া) করা। অশ্লীল গান গাওয়া, বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা। ৭২. আত্মহত্যা করা, অর্থাৎ নিজেকে হত্যা করা।
উত্তম চরিত্র
ইসলাম উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হতে, নফসকে মন্দ স্বভাব থেকে পবিত্র করতে, সৎস্বভাবের অধিকারী হতে এবং সব দিক থেকে পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতা অবলম্বন করতে আদেশ করে। এসব জ্ঞান ও পথ যে বিদ্যা শেখায়, তাকে তাসাউফ বলা হয়।
চিকিৎসাবিদ্যা যেমন দেহের সুস্থতা সংক্রান্ত জ্ঞান শেখায়, তেমনি তাসাউফের ইলম অন্তর ও রুহকে মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত করার উপায় শেখায়। এটি মানুষকে যেসব মন্দ কাজ অন্তরের রোগের আলামত, সেগুলো থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালো কাজ ও ইবাদত করতে সাহায্য করে।
ইসলাম প্রথমে ইলম শিখতে, তারপর শেখা অনুযায়ী কাজ ও ইবাদত করতে এবং এসব কিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে – সংক্ষেপে ইলম, আমল ও ইখলাস – আদেশ করে। মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য লাভকে যদি একটি বিমানের ওড়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে ঈমান ও ইবাদত হলো তার দেহ ও ইঞ্জিনের মতো।
আর তাসাউফের পথে অগ্রসর হওয়া হলো তার জ্বালানি, অর্থাৎ পেট্রোল। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বিমান সংগ্রহ করা হয়, অর্থাৎ ঈমান ও ইবাদত অর্জন করা হয়। আর চলতে শুরু করার জন্য প্রয়োজন শক্তি, অর্থাৎ তাসাউফের পথে অগ্রসর হওয়া।
তাসাউফের দুটি লক্ষ্য রয়েছে:
প্রথমটি হলো ঈমান যেন অন্তরের গভীরে প্রোথিত হয়, অর্থাৎ অন্তরে স্থির হয়ে যায় এবং সন্দেহ সৃষ্টিকারী প্রভাবে টলে না যায়। বুদ্ধি, দলিল ও প্রমাণ দিয়ে শক্তিশালী করা ঈমান এতটা মজবুত হয় না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সূরা রাদের আটাশতম আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেন, “অন্তরসমূহে ঈমানের প্রশান্তি ও স্থিতি কেবল জিকিরের মাধ্যমেই হয়।” জিকির মানে প্রতিটি কাজে ও প্রতিটি নড়াচড়ায় আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা, তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী কাজ করা।
তাসাউফের দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো ফিকহের ইলম যেসব ইবাদত জানিয়েছে, সেগুলো যেন ভালোবেসে ও সহজে আদায় হয় এবং নফসে আম্মারা থেকে জন্ম নেওয়া অলসতা ও কষ্টবোধ দূর হয়ে যায়। ইবাদত সহজে ও ভালোবেসে আদায় করা এবং গুনাহের কাজ ঘৃণা করে তা থেকে দূরে থাকা কেবল তাসাউফের ইলম শিখে এই পথে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব।
তাসাউফ আঁকড়ে ধরা এই জন্য নয় যে, অন্যরা যা জানে না তা দেখা যাবে, গায়েবের খবর দেওয়া যাবে কিংবা নূর, রুহ ও মূল্যবান স্বপ্ন দেখা যাবে।
তাসাউফের মাধ্যমে যেসব মারিফাত, জ্ঞান ও অবস্থা অর্জিত হয়, সেগুলো লাভের জন্য প্রথমে ঈমান সংশোধন করতে হবে, ইসলামের আদেশ-নিষেধ শিখে সে অনুযায়ী কাজ ও ইবাদত করতে হবে। কারণ এই তিনটি কাজ না করা পর্যন্ত অন্তর পরিশুদ্ধ করা, মন্দ স্বভাব থেকে পবিত্র করা, নফসের তাজকিয়া ও তারবিয়াত (পরিশুদ্ধি ও প্রশিক্ষণ) সম্ভব নয়।
