আমার প্রিয় নবী

মৃত ব্যক্তির প্রতি দ্বীনি দায়িত্বসমূহ

মৃত্যুর লক্ষণ দেখা দিলে করণীয়

মৃত্যু ঘনিয়ে আসার লক্ষণ হলো পা শিথিল হয়ে লম্বা হয়ে যাওয়া, নাক বেঁকে যাওয়া এবং কানপট্টি বসে যাওয়া। এমন রোগীকে ডান কাতে শুইয়ে মুখ কিবলার দিকে ফেরানো হয়। এভাবে শোয়ানো সুন্নত। পা কিবলার দিকে রেখে চিত করে শোয়ানোও জায়েজ। বর্তমানে এভাবেই করা হচ্ছে। তবে মাথার নিচে কিছু দেওয়া উচিত। এতে মুখ কিবলার দিকে থাকে। এগুলো কষ্টকর হলে যেভাবে সহজ হয় সেভাবে শোয়ানোও জায়েজ। কালিমায়ে তাওহিদের তালকিন দেওয়ার সময় “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” বলাও ভালো। মৃত্যুর লক্ষণ হলো শক্ত হয়ে যাওয়া, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ও গন্ধ বের হওয়া। এসব লক্ষণের আগেই মৃত্যু বোঝা গেলে [মুখের সামনে ধরা আয়না ঝাপসা না হওয়া থেকে শ্বাস বন্ধ হওয়া এবং নাড়ি থেকে হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়া বোঝা যায়] মৃতের চোখ বন্ধ করে দেওয়া এবং চোয়াল বেঁধে দেওয়া সুন্নত।

মৃত্যুর পর করণীয়

চোখ বন্ধ করে দেওয়া ও চোয়াল বেঁধে দেওয়া সুন্নত। চোয়াল চওড়া কাপড় দিয়ে মাথার ওপর দিয়ে বাঁধা হয়। চোখ বন্ধ করার সময় “বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ” বলা এবং এর দোয়া পড়া সুন্নত। দেহ ঠান্ডা হওয়ার আগে হাতের আঙুল, কনুই ও হাঁটু ভাঁজ করে আবার খুলে হাত-পা সোজা করে রাখা সুন্নত। এতে গোসল দেওয়া ও কাফনে মোড়ানো সহজ হয়। দেহ ঠান্ডা হওয়ার আগে তার পোশাক খুলে চওড়া, হালকা একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। চাদরের এক প্রান্ত মাথার নিচে এবং অন্য প্রান্ত পায়ের নিচে গুঁজে দেওয়া হয়। পেট যাতে ফুলে না যায়, সেজন্য পেটের ওপর, চাদরের ওপরে বা নিচে কিছু [ছুরি বা অন্য কোনো লোহা] রাখা হয়। এর ওজন একশো গ্রামের বেশি হওয়া ভালো। গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, জানাজার নামাজ আদায় করা ও দাফন করা ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ প্রয়োজন পরিমাণ লোক তা আদায় করলে অন্যদের ওপর আর ফরজ থাকে না। শিশুও গোসল দিতে পারে। নারী না থাকলে পুরুষ নারীকে গোসল দিতে পারে না। তবে মৃতদেহ মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা অবস্থায় তার আত্মীয়, আত্মীয় না থাকলে অন্য কেউ হাতে কাপড় পেঁচিয়ে আবরণের নিচে হাত ঢুকিয়ে তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দেয়। কারণ মৃতের সতর জীবিতের সতরের মতোই। যেখানে তাকানো হারাম, সেখানে স্পর্শ করাও হারাম। উত্তম হলো কোনো শিশুকে শিখিয়ে দিয়ে তাকে দিয়ে গোসল করানো। হানাফি মাজহাবে স্বামী স্ত্রীকে গোসল দিতে পারে না এবং তাকে স্পর্শও করতে পারে না। কারণ স্ত্রী মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার দিকে তাকানো জায়েজ। অন্য তিন মাজহাবে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে গোসল দেওয়া জায়েজ। স্ত্রীর জন্য স্বামীকে গোসল দেওয়া হানাফি মাজহাবেও জায়েজ। কারণ স্বামীর মৃত্যুর পর বিবাহ ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত [চার মাস দশ দিন] বহাল থাকে। নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারী গোসল দিতে পারে না। হাতে কাপড় পেঁচিয়ে তায়াম্মুম করিয়ে দেয়। তায়াম্মুমকারী পুরুষ বেগানা নারীর বাহুর দিকে তাকাতে পারে না। সে তার আত্মীয় হলে হাতে কাপড় না পেঁচালেও চলে। কারণ মাহরাম আত্মীয়ের বাহু ও মুখের দিকে তাকানো এবং স্পর্শ করা জায়েজ। কোনো মানুষের কেবল মাথা বা শরীরের অর্ধেক পাওয়া গেলে তাকে গোসল দেওয়া হয় না এবং তার জানাজার নামাজও আদায় করা হয় না। এমনিই দাফন করা হয়। শরীরের অর্ধেকের বেশি – মাথা না থাকলেও – কিংবা শরীরের অর্ধেক মাথাসহ পাওয়া গেলে তাকে গোসল দেওয়া হয় এবং জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। যে মৃতকে গোসল দেবে, তার আগে নিজে গোসল করে নেওয়া মুস্তাহাব। জুনুবি ব্যক্তি ও হায়েজগ্রস্ত নারীর গোসল দেওয়া মাকরুহ। মৃতকে গোসল দেওয়া পানি মায়ে মুস্তামাল (ব্যবহৃত পানি) হয়ে যায়। তা নাপাক, অপবিত্র হয়। এ কারণে গোসলদাতাদের গায়ে যেন তা ছিটকে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা এবং তাদের কোমরে গামছা জড়িয়ে নেওয়া আবশ্যক। গোসলের পর মৃতদেহ পবিত্র হয়ে যায়। গোসলের স্থানে গোসলদাতা ও তার সহকারী ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করে না। গোসলদাতাদের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হওয়া উচিত। তারা মৃতের মধ্যে যে সৌভাগ্যের লক্ষণ দেখে তা বলে, দুর্ভাগ্যের লক্ষণ বলে না। মৃতের দোষ প্রকাশ করে না। মৃতের অভিভাবক (ওলি) ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আব্বাসের পুত্র ফজল ও আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) গোসল দিয়েছিলেন। উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পানি ঢালছিলেন। আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসা-যাওয়া করছিলেন। জীবিত মানুষকে যা কষ্ট দেয়, মৃতকেও তা কষ্ট দেয়। এ কারণে খুব ঠান্ডা ও খুব গরম পানি দিয়ে গোসল দেওয়া হয় না। [দুর্গন্ধ রোধের জন্য তাকে হিমঘরেও রাখা হয় না। দুর্গন্ধ যেন না হয়, সেজন্য দ্রুত দাফন করা উচিত; দূর থেকে লোক আসবে বলে অপেক্ষায় রেখে দেওয়া উচিত নয়।] জমজমের পানি দিয়ে গোসল দেওয়া জায়েজ নয়।

“মৃত্যুর আগেই মরো। হিসাবের সম্মুখীন হওয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব নাও!” হাদীস শরীফ

মৃতকে গোসল দেওয়া

গোসলের খাটিয়ার (সারির) চারপাশে প্রথমে বাখুর জ্বালিয়ে তিনবার ঘুরিয়ে ধোঁয়া দেওয়া হয়। পাঁচবারও দেওয়া যায়। বাখুর এক প্রকার উদ্ভিদ। এর সঙ্গে আগর কাঠের (উদ কাঠ, Aquilaria) গুঁড়া এবং লোবানজাতীয় স্টোরাক্স গাছের আঠা মিশিয়ে একটি পাত্রের আগুনে দেওয়া হয় এবং গোসলের খাটিয়াকে নির্গত ধোঁয়ার ওপর ধরা হয়। খাটিয়া নাভি পর্যন্ত উঁচু এবং সামান্য ঢালু হওয়া উচিত। বরই (সিদর) গাছের পাতা বা সাবান-ঘাস দিয়ে ফুটিয়ে কুসুম গরম করা পানি, অথবা কর্পূর (কাফুর) নামক সাদা, সুগন্ধি বস্তু মেশানো পানি প্রস্তুত করা হয়। পানি খুব গরম হওয়া উচিত নয় এবং লবণাক্ত হওয়া উচিত। ঠান্ডা ও লবণাক্ত পানি পচন বিলম্বিত করে। মৃতকে গোসল দেওয়ার সময় নিয়ত করা সুন্নত। নিয়ত ছাড়া গোসল দিলে মৃতদেহ পবিত্র হলেও ফরজ আদায় হয় না। ঢাকা অবস্থায় মৃতকে ধোঁয়া দেওয়া খাটিয়ার ওপর চিত করে অথবা যেভাবে সহজ সেভাবে শোয়ানো হয়। নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা রেখে গোসল দেওয়া হয়। কারণ নারীদের জন্য নারীর সতর পুরুষদের জন্য পুরুষের সতরের মতোই। খাটিয়ার ওপর মৃতকে কিবলামুখী করে শোয়ানো সুন্নত। মৃত ব্যক্তি শিশু হলেও প্রথমে তাকে অজু করানো হয়। তবে মুখে ও নাকে পানি না দিয়ে কাপড় দিয়ে সেগুলো পরিষ্কার করা হয়। মুখে পানি ঢুকলে তা দ্রুত পচনের কারণ হয়। প্রথমে মুখমণ্ডল ধোয়া হয়। এরপর হাত ধুয়ে মাথা, কান ও ঘাড় মাসেহ করা হয় এবং পা ধোয়া হয়। মাথা ও দাড়ি খিতমি বা সাবান দিয়ে ধোয়া হয়। এরপর বাম কাতে শুইয়ে ডান পাশে পানি ঢেলে ধোয়া হয়। খাটিয়ার তক্তা স্পর্শ করছে এমন অংশ পর্যন্ত পানি প্রবাহিত করতে হবে। এভাবে তিনবার পানি ঢেলে ধোয়া হয়। এরপর একইভাবে ডান কাতে শুইয়ে বাম পাশ কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত তিনবার পানি ঢেলে ধোয়া হয়। এরপর বসিয়ে পেটে হালকাভাবে চাপ দেওয়া হয়। কিছু বের হলে তা ধুয়ে ফেলা হয় [অর্থাৎ পানি ঢেলে দূর করা হয়]। এরপর বাম কাতে শুইয়ে ডান পাশ আবার ধোয়া হয় [অর্থাৎ কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত পানি ঢালা হয়]। এভাবে মৃতকে সুন্নত অনুযায়ী তিনবার গোসল দেওয়া হয়। গোসলের পর অজু ভঙ্গকারী কিছু বের হলে আবার গোসল দেওয়া হয় না এবং অজুও করানো হয় না। চুল ঝরে পড়লে তা কাফনের ভেতরে রেখে দেওয়া হয়। জীবিত মানুষের নখ, চুল ও দাঁতও দাফন করা সুন্নত। গোসলের পর খাটিয়ার ওপর কাপড় দিয়ে শরীর মুছে শুকানো হয়। চুল ও দাড়ির ফাঁকে হানুত নামক সুগন্ধি দ্রব্যের মিশ্রণ বা কর্পূর দেওয়া হয়। জাফরান দেওয়া মাকরুহ। সিজদার অঙ্গগুলোতে [ললাট, নাক, হাঁটু, হাত ও পায়ের আঙুলে] কর্পূর ছিটানো তুলা রাখা হয়। মুখ, নাক, কানের ছিদ্র ও চোখে তুলা রাখা জায়েজ। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তিকেও তিনবার গোসল দেওয়া হয়, অথবা গোসলের নিয়তে পানিতে তিনবার নাড়ানো হয়। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া মৃতকেও গোসল দেওয়া হয়।

“কবরের মৃত ব্যক্তি সমুদ্রে ডুবন্ত মানুষের মতো: পিতা, মাতা, ভাই ও বন্ধুদের কাছ থেকে আসা একটি দোয়ার জন্য সে সর্বদা অপেক্ষা করে থাকে” হাদীস শরীফ

পুরুষের কাফন

পুরুষের কাফন তিন টুকরা হওয়া সুন্নত। ইস্তাম্বুলে কাফনের জন্য পুরুষদের সাত মিটার এবং নারীদের আট মিটার লংক্লথ (মিহি সুতি কাপড়) কেনার প্রচলন আছে। এর প্রস্থ ১৩০–১৪০ সেন্টিমিটার। ১. ইজার: মাথা থেকে পা পর্যন্ত। এর প্রস্থ এক মিটারের বেশি। ২. কামিস [জামার মতো লম্বা পিরান]: এর দৈর্ঘ্য কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের দ্বিগুণ। এই কাপড় মাঝখান থেকে দুই ভাঁজ করে ভাঁজের স্থান থেকে মাথা ঢোকার মতো করে সোজা কাটা হয়। আস্তিন ও নিচের অংশের জায়গা কাটা হয় না। ৩. লিফাফা: এটি মাথা ও পা ছাড়িয়ে আরও লম্বা এবং আরও চওড়া। মাথার ওপর দিকে ও পায়ের নিচের দিকে এর প্রান্তগুলো জড়ো করে কাপড় দিয়ে বাঁধা হয়। হযরত ইমাম রব্বানি বলেন, কাফন তিন টুকরার বেশি হওয়া বিদআত। কাফনগুলো তাবুতে (খাটিয়ায়) রাখার আগে প্রত্যেকটিকে আলাদাভাবে ধোঁয়া দেওয়া ভালো। নেককার ও ওলিগণের অন্তর্বাস বা পোশাক দিয়ে কাফন বানানো, কিংবা সেগুলো কাফনের ভেতরে, মৃতের মুখের ওপর বা বুকের ওপর রাখা উপকারী। তাবুতের ভেতরে প্রথমে লিফাফা বিছানো হয়। এরপর এর ওপর ইজার বিছানো হয়। কামিসও তাবুতের ভেতরে রাখা হয়। এরপর তাবুতের চারপাশে তিন বা পাঁচবার বাখুর ঘোরানো হয়। কাফনের তিনটি টুকরার ওপরই হানুত ছিটানো হয়। মৃতদেহ মুছে শুকানোর পর কামিস তাবুত থেকে তুলে মাথা দিয়ে গলিয়ে অর্ধেক সামনে ও অর্ধেক পেছনে পা পর্যন্ত টেনে দেওয়া হয়। এরপর বিসমিল্লাহ বলে মৃতকে তাবুতের ভেতরে ইজারের ওপর শোয়ানো হয়। প্রথমে ইজারের বাম পাশ, তারপর ডান পাশ মৃতের ওপর জড়িয়ে দেওয়া হয়। লিফাফাও এভাবে জড়ানো হয়। অর্থাৎ ডান প্রান্ত বাম প্রান্তের ওপর থাকে।

নারীর কাফন

নারীর কাফন পাঁচ টুকরা হওয়া সুন্নত: কামিস, ইজার, লিফাফা, খিমার ও সিনাবন্দ (বুকের কাপড়)। খিমার হলো প্রায় পঁচাত্তর সেন্টিমিটার লম্বা মাথার কাপড়। এর প্রান্তগুলো মুখের ওপর ঝুলে থাকে, মাথায় পেঁচানো হয় না। সিনাবন্দ কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত। তাবুতের ভেতরে প্রথমে লিফাফা বিছানো হয়। এরপর এর ওপর ইজার বিছানো হয়। কামিসও তাবুতের ভেতরে রাখা হয়। ইজারের আগে বা পরে সিনাবন্দ বিছানো হয়। নারীর কামিস পরানোর পর চুল দুই ভাগ করে দুই পাশ দিয়ে বুকের ওপর, কামিসের ওপর রাখা হয়। চুলের ওপর খিমার রেখে তার ওপর দিয়ে ইজার জড়িয়ে দেওয়া হয়। ইজারের আগে বা পরে সিনাবন্দ জড়ানো হয়। এরপর লিফাফা জড়ানো হয়। লিফাফার মাথার দিক, পায়ের দিক এবং মাঝখান [অর্থাৎ পাকস্থলী বরাবর] কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধা হয়। বড় ছেলেকে পুরুষের মতো কাফন পরানো হয়। বড় মেয়েকে নারীর মতো কাফন পরানো হয়। ছোট ছেলেকে এক টুকরা এবং ছোট মেয়েকে দুই টুকরা কাফনে মোড়ানো হয়। মৃত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশু, গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণ এবং মানুষের কোনো অঙ্গ [যেমন হাত] কাফন পরানো হয় না, একটি কাপড়ে মুড়ে দাফন করা হয়। তাবুত পেরেক ছাড়া, তক্তাগুলো একটি আরেকটির খাঁজে বসিয়ে বানানো হওয়া আবশ্যক। একটি সংক্ষিপ্ত দোয়া এবং মৃতের সঙ্গে হক-হালাল মিটিয়ে নেওয়ার পর তাকে মুসাল্লায় নিয়ে গিয়ে জানাজার নামাজ আদায় করা হয়।

কবর জিয়ারত ও পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত

“শিরআতুল ইসলাম” গ্রন্থের শেষে বলা হয়েছে, কবর জিয়ারত সুন্নত। [সপ্তাহে একবার, অন্তত ঈদের দিনগুলোতে জিয়ারত করা উচিত। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার বা শনিবার জিয়ারত করা অধিক সওয়াবের।] জিয়ারতকারী মৃতদেহ পচে যাওয়ার কথা ভেবে শিক্ষা গ্রহণ করে। উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এত কাঁদতেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। মৃত ব্যক্তিও তার জন্য করা দোয়া থেকে উপকৃত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর আত্মীয়স্বজন ও সাহাবীগণের (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম) কবর জিয়ারত করতেন। সালাম ও দোয়ার পর কিবলার দিকে পিঠ দিয়ে কবরের দিকে মুখ করে বসা হয়। কবরে হাত ও মুখ ঘষা এবং মাটিতে চুমু খাওয়া খ্রিস্টানদের রীতি। কেবল মা-বাবার কবরের মাটিতে চুমু খাওয়া জায়েজ।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে:

“কেউ তার পরিচিত কারও কবরের কাছে গিয়ে সালাম দিলে মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারে এবং তার সালামের জবাব দেয়।” “কেউ কোনো মুমিনের কবর জিয়ারত করে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বি হাক্কি মুহাম্মাদিন ওয়া আলি মুহাম্মাদিন আন লা তুআজ্জিবা হাজাল মাইয়্যিত’ বললে মৃত ব্যক্তির আজাব তুলে নেওয়া হয়।” “যে ব্যক্তি প্রতি জুমায় তার মা-বাবার বা তাদের একজনের কবর জিয়ারত করে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”

বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দূর দেশে না যাওয়া এবং অন্য কোনো কাজে গেলে জিয়ারত করা ভালো। কেবল মহানবীর (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জিয়ারতে যাওয়া সওয়াবের কাজ। নবীগণ (আলাইহিমুস সালাম) ও আউলিয়ার (আলাইহিমুর রহমা) জিয়ারতকারী তাঁদের বরকতময় রুহ থেকে উপকৃত হয়। তাঁদের প্রতি তার ভালোবাসা ও অনুরাগ যত গভীর, তার অন্তর তত পবিত্র হয়। মাজারে গুনাহে লিপ্ত লোক থাকলেও, যেমন বেপর্দা নারীরা এলেও, জিয়ারত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়; তাদের বাধা দিতে না পারলে অন্তরে ঘৃণা করা উচিত। তেমনি কোনো মুমিনের জানাজায় নারীরা উপস্থিত থাকলেও, গান ও ইলাহি (ধর্মীয় সংগীত) গাওয়া হলেও এবং বক্তৃতা দেওয়া হলেও সেখানে যাওয়া আবশ্যক। কবরের পাশে বা অন্য কোথাও পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে এর সওয়াব মৃতদের উদ্দেশে হাদিয়া দেওয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা উচিত। কারণ যেখানে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, সেখানে রহমত ও বরকত নাজিল হয়। সেখানে করা দোয়া কবুল হয়।

“যে ব্যক্তি প্রতি জুমায় তার মা-বাবার বা তাদের একজনের কবর জিয়ারত করে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়” হাদীস শরীফ

“জিলাউল কুলুব” গ্রন্থে বলা হয়েছে, কবরস্থানে আগত ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলবে, “আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলা দারিল কাওমিল মুমিনিন! ইন্না ইনশাআল্লাহু আন কারিবিন বিকুম লাহিকুন।” এরপর বিসমিল্লাহসহ এগারোবার সূরা ইখলাস এবং একবার ফাতিহা পড়বে। তারপর “আল্লাহুম্মা রাব্বাল আজসাদিল বালিয়াহ, ওয়াল ইজামিন নাখিরাতিল্লাতি খারাজাত মিনাদ দুনিয়া ওয়া হিয়া বিকা মুমিনাতুন, আদখিল আলাইহা রাওহান মিন ইনদিকা ওয়া সালামান মিন্নি” – এই দোয়া পড়া উচিত। সে কবরের কাছে মৃতের ডান দিক [কবরের কিবলার দিক] এবং পায়ের দিক থেকে এগিয়ে আসবে। সালাম দেবে। দাঁড়িয়ে, উবু হয়ে বা বসে সূরা বাকারার শুরু ও শেষ, বরকতময় সূরা ইয়াসিন, মুলক (তাবারাকা), তাকাসুর, বরকতময় ইখলাস ও ফাতিহা সূরা পড়ে এর সওয়াব মৃতকে হাদিয়া দেবে। “কিতাবুল ফিকহ আলাল মাজাহিবিল আরবাআ” গ্রন্থে বলা হয়েছে, “মৃত থেকে শিক্ষা নেওয়া ও আখিরাতের কথা ভাবার জন্য কবর জিয়ারত করা পুরুষদের জন্য সুন্নত। কাছের ও দূরের সব কবর জিয়ারত করা হয়। বিশেষ করে নেককার ও ওলিগণের (রাহিমাহুমুল্লাহু তাআলা) জিয়ারতের জন্য দূরে যাওয়া সুন্নত। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বরকতময় কবর জিয়ারত করা সবচেয়ে মূল্যবান ইবাদতগুলোর অন্যতম। বয়স্ক নারীদের জন্যও পর্দাসহ জিয়ারত করা জায়েজ। জিয়ারতের সময় কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা, পাথর বা মাটিতে চুমু খাওয়া এবং মৃতের কাছে এমন কিছু চাওয়া, যা সে করতে পারবে না, জায়েজ নয়।” আউলিয়ার (রাহিমাহুমুল্লাহু তাআলা) কাছে চাওয়া হয়, যেন তাঁরা শাফায়াত করেন, প্রার্থনাকারীর জন্য দোয়া করেন এবং আল্লাহ তাআলার দানের উসিলা হন।

সেই সরওয়ার আমাদের রবের এমন এক বান্দা,
প্রতিটি বিপদের মুহূর্তে তাঁর শাফায়াতের আশা করা হয়।
তিনি এমন এক রাসূল, যিনি মানুষকে
আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকেন – তাঁর অনুসরণ করো!
যে এমন করে, সে কখনো না ছেঁড়া মজবুত রশি
আঁকড়ে ধরার মতো নিজেকে নিরাপদ ও প্রশান্ত পায়।
হে আল্লাহ, অনুমতি দাও: তাঁর পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর,
তাঁদের অনুসারী তাকওয়াবানদের ওপরও
রহমতের মেঘ যেন সর্বদা বর্ষিত হয়,
সহনশীল ও দানশীল বান্দারা তোমার রহমত লাভ করুক।
হে রব, যতক্ষণ ভোরের বাতাস বইতে থাকে,
বান গাছের শাখা সেই বাতাসে দোলে,
কাফেলার সরদার তার মধুর সুরে
উটগুলোকে প্রেমে উদ্বেল করে তোলে,
ততক্ষণ বিশ্বজগতের গৌরব, তাঁর পরিবার, সাহাবীগণ
ও তাঁদের অনুসারীদের ওপর রহমতের মেঘ পাঠাও।
কাসিদায়ে বুরদা

মাকামে ইবরাহিম ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বরকতময় পদচিহ্ন রয়েছে যে পাথরে – কাবাঘর নির্মাণের সময় তিনি একে ভারা ও আরোহণের পাথর হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন এবং এর ওপর দাঁড়িয়ে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের এক মুজিযা হিসেবে এই পাথর লিফটের মতো তাঁর প্রয়োজনীয় উচ্চতায় ওঠানামা করে নির্মাণকাজে সাহায্য করেছিল। এই বরকতময় পাথর যে কক্ষে (মাকসুরায়) ছিল, সৌদি বাদশাহ ফয়সালের আমলে তা ভেঙে সরিয়ে ফেলা হয়, তার জায়গায় বর্তমানে বিদ্যমান ষড়ভুজ আকৃতির কাচের আবরণ স্থাপন করা হয়েছে এবং এর ওপরের অংশ সম্পূর্ণ খোলা।