আমার প্রিয় নবী

নামাজ আদায় করা

ইসলামের পাঁচ শর্তের দ্বিতীয়টি নামাজ আদায় করা। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রতিদিন ওয়াক্ত হলে পাঁচবার নামাজ আদায় করা এবং প্রতিটি নামাজ যে নিজ ওয়াক্তে আদায় করেছে, তা জানা ফরজ। নামাজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহের প্রতি খেয়াল রেখে এবং অন্তরকে আল্লাহ তাআলার দিকে নিবিষ্ট করে ওয়াক্ত পার হওয়ার আগেই নামাজ আদায় করতে হবে। পবিত্র কুরআনে নামাজকে “সালাত” বলা হয়েছে। সালাতের আভিধানিক অর্থ মানুষের দোয়া করা, ফেরেশতাদের ইস্তিগফার করা, আল্লাহ তাআলার রহমত করা ও দয়া করা। আর ইসলামে “সালাত” মানে ইলমেহালের কিতাবসমূহে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, সেভাবে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করা এবং নির্দিষ্ট কিছু জিনিস পাঠ করা।

নামাজের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবীর খাতিরে মুমিনদের যত আদেশ দান করেছেন, নামাজ তার মধ্যে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে সুন্দর। নামাজ দ্বীনের খুঁটি। যে নিয়মিত, সঠিকভাবে ও পরিপূর্ণভাবে নামাজ আদায় করে, সে তার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, ইসলামের ইমারতকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আর যে নামাজ আদায় করে না, সে নিজের দ্বীন ও ইসলামের ইমারতকে ধ্বংস করেছে। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “আমাদের দ্বীনের মাথা হলো নামাজ।” মাথা ছাড়া যেমন মানুষ হয় না, তেমনি নামাজ ছাড়াও দ্বীন হয় না।

ইসলাম ধর্মে ঈমানের পর সর্বপ্রথম যে আদেশ ফরজ করা হয়েছে, তা নামাজ। আল্লাহ তাআলা নামাজ ফরজ করেছেন, যেন তাঁর বান্দারা কেবল তাঁরই ইবাদত করে। পবিত্র কুরআনের একশোরও বেশি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “নামাজ কায়েম করো!” হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ করেছেন। যে গুরুত্ব দিয়ে এবং শর্তসমূহ মেনে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর ওয়াদা দিয়েছেন।”

আমাদের দ্বীনে যত ইবাদতের আদেশ দেওয়া হয়েছে, নামাজ তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান। এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে নামাজ আদায় করে না, ইসলামে তার কোনো অংশ নেই!” আরেক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “মুমিন ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যকারী হলো নামাজ।” অর্থাৎ মুমিন নামাজ আদায় করে, কাফির করে না।

নামাজ আদায় করা মানে আল্লাহ তাআলার মহত্ত্বের কথা ভেবে তাঁর সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করা। যে এটা উপলব্ধি করে, সে সর্বদা ভালো কাজ করে। সে কখনো মন্দ কাজ করতে পারে না। যে প্রতিদিন পাঁচবার নিজের রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার নিয়ত করে, তার অন্তর ইখলাসে ভরে যায়। নামাজে যেসব কাজ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিটি অন্তর ও দেহের উপকার করে। মসজিদে জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা মুসলমানদের অন্তরকে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে দেয়। তাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। তারা বুঝতে পারে যে তারা পরস্পর ভাই ভাই। বড়রা ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হয়, ছোটরা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। ধনীরা গরিবদের এবং সবলরা দুর্বলদের সাহায্য করে। সুস্থরা অসুস্থদের মসজিদে দেখতে না পেলে তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেয়। “যে তার দ্বীনি ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা তার সাহায্যকারী” – এই হাদীস শরীফের সুসংবাদ লাভের জন্য তারা প্রতিযোগিতা করে।

নামাজ মানুষকে কুৎসিত, মন্দ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখে। তা গুনাহের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হয়। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তোমাদের কারও দরজার সামনে দিয়ে বয়ে চলা নদীর মতো। কেউ যদি প্রতিদিন পাঁচবার সেই নদীতে নেমে গোসল করে, তবে যেমন তার শরীরে কোনো ময়লা থাকে না, তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়কারীদের ছোট গুনাহগুলোও এভাবে মাফ হয়ে যায়।” আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানের পর নামাজ সমস্ত আমল ও ইবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এ জন্য নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাবসমূহ রক্ষা করে নামাজ আদায় করতে হবে। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “হে আমার উম্মত ও আমার সাহাবীগণ! যে নামাজ আদায়ে পরিপূর্ণ যত্ন নেওয়া হয়, তা আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় সমস্ত আমলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তা নবীগণের সুন্নত। তা ফেরেশতাদের প্রিয় জিনিস। তা মারিফাতের, পৃথিবীর ও আকাশসমূহের নূর। তা দেহের শক্তি। তা রিজিকের বরকত। তা দোয়া কবুলের উসিলা। তা মালাকুল মাওতের [অর্থাৎ মৃত্যুর ফেরেশতার] কাছে শাফায়াতকারী। তা কবরে আলো, মুনকার ও নাকিরের প্রশ্নের জবাব। তা কিয়ামতের দিন মাথার ওপর ছায়া। তা জাহান্নামের আগুন ও মানুষের মাঝে ঢাল। তা সিরাতের পুল বিদ্যুতের মতো পার করিয়ে দেয়। তা জান্নাতের চাবি। তা জান্নাতে মাথার মুকুট। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নামাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেননি। নামাজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো ইবাদত থাকলে তিনি সবার আগে মুমিনদের সেটিই দিতেন। কেননা ফেরেশতাদের কেউ সর্বদা কিয়ামে (দাঁড়িয়ে), কেউ রুকুতে, কেউ সিজদায়, আবার কেউ তাশাহহুদে থাকেন। এ সবকিছুকে তিনি এক রাকাত নামাজে একত্র করে মুমিনদের উপহার দিয়েছেন। কেননা নামাজ ঈমানের মাথা, দ্বীনের খুঁটি, ইসলামের বাণী এবং মুমিনদের মিরাজ। তা আকাশের নূর এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিদাতা।”

একদিন হযরত আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু ওয়া কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) আসরের নামাজ ছুটে গিয়েছিল। দুঃখে তিনি একটি টিলা থেকে নিজেকে নিচে ফেলে দিলেন। গুমরে গুমরে কেঁদে আর্তনাদ করতে লাগলেন। আমাদের নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর এই অবস্থার খবর পেয়ে সাহাবীগণকে নিয়ে হযরত আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাছে এলেন। তাঁর অবস্থা দেখে বিশ্বজগতের সরদার আমাদের নবীও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাঁদতে লাগলেন। তিনি দোয়া করলেন। সূর্য আবার ওপরে উঠে এল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “হে আলি! মাথা তোলো, সূর্য এখনো দেখা যাচ্ছে।” হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এতে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং নামাজ আদায় করলেন। এক রাতে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অনেক ইবাদত করার কারণে রাতের শেষ ভাগে ঘুমে কাতর হয়ে পড়লেন। তাঁর বিতরের নামাজ ছুটে গেল। ফজরের নামাজের সময় তিনি মহানবীর পেছনে পেছনে গিয়ে মসজিদের দরজায় তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন এবং কেঁদে কেঁদে মিনতি করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে সাহায্য করুন, আমার বিতরের নামাজ ছুটে গেছে।” রাসূলুল্লাহও কাঁদতে লাগলেন। তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সিদ্দিককে বলে দিন, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” আউলিয়ায়ে কেরামের অন্যতম বড় ওলি বায়েজিদ বোস্তামি (কুদ্দিসা সিররুহু) এক রাতে ঘুমে কাতর হয়ে ফজরের নামাজের জন্য জাগতে পারলেন না। তিনি এত কাঁদলেন ও আর্তনাদ করলেন যে, একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন: “হে বায়েজিদ! তোমার এই ত্রুটি ক্ষমা করে দিলাম। এই কান্নার বরকতে তোমাকে অতিরিক্ত সত্তর হাজার নামাজের সওয়াব দান করলাম।” কয়েক মাস পর আবার তিনি ঘুমে কাতর হয়ে পড়লেন। তখন শয়তান এসে তাঁর মুবারক পা ধরে তাঁকে জাগিয়ে দিল। সে বলল, “উঠুন, আপনার নামাজের ওয়াক্ত পেরিয়ে যাচ্ছে!” হযরত বায়েজিদ বোস্তামি বললেন, “হে অভিশপ্ত! তুমি এমন কাজ কীভাবে করছ? তুমি তো চাও প্রত্যেকের নামাজ ছুটে যাক, ওয়াক্ত পেরিয়ে যাক। আমাকে কেন জাগালে?” শয়তান বলল, “যেদিন আপনার ফজরের নামাজ ছুটে গিয়েছিল, সেদিন আপনি কেঁদে সত্তর হাজার নামাজের সওয়াব অর্জন করেছিলেন। আজ সে কথা ভেবেই আপনাকে জাগিয়েছি, যেন আপনি কেবল এক ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব পান, সত্তর হাজার নামাজের সওয়াব না পান!”

“যে নামাজ আদায় করে না, ইসলামে তার কোনো অংশ নেই!” হাদীস শরীফ

মহান ওলি হযরত জুনাইদ বাগদাদি বলেছেন, “দুনিয়ার এক ঘণ্টা কিয়ামতের হাজার বছরের চেয়ে উত্তম। কারণ এই এক ঘণ্টায় একটি নেক ও মকবুল আমল করা যায়, অথচ সেই হাজার বছরে কিছুই করা যায় না।” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “কেউ যদি জেনেশুনে এক নামাজকে অন্য নামাজের সঙ্গে মিলিয়ে আদায় করে, তবে সে আশি হুকবা জাহান্নামে জ্বলবে।” এক হুকবা আখিরাতের আশি বছর। আর আখিরাতের এক দিন দুনিয়ার এক হাজার বছর। অতএব, হে আমার দ্বীনি ভাই! তোমার সময়কে অনর্থক, নিষ্ফল কাজে কাটিয়ো না। তোমার সময়ের মূল্য বোঝো। সময়কে সবচেয়ে ভালো কাজে ব্যয় করো। আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করেন, “বিপদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো সময়কে অনর্থক কাজে কাটানো।” কিয়ামতের দিন যেন অনুতপ্ত হতে না হয় এবং যেন বিরাট সওয়াব লাভ করতে পারো, সে জন্য তোমার নামাজগুলো ওয়াক্তমতো আদায় করো! হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে ব্যক্তি এক ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় না করে কাজা করার জন্য রেখে দেয় এবং তা আদায় করার আগেই মারা যায়, তার কবরে জাহান্নামের দিকে সত্তরটি জানালা খুলে দেওয়া হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে আজাব ভোগ করতে থাকে।”

যে জেনেশুনে এক ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করে না, অর্থাৎ নামাজের ওয়াক্ত পেরিয়ে যাওয়ার সময় নামাজ আদায় না করার জন্য দুঃখিত হয় না, সে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায় অথবা মৃত্যুর সময় ঈমানহারা হয়ে যায়। তাহলে যারা নামাজের কথা মনেও আনে না, নামাজকে কর্তব্য বলেই মানে না, তাদের কী অবস্থা হবে? যারা নামাজকে গুরুত্ব দেয় না এবং একে কর্তব্য বলে মানে না, তারা মুরতাদ, অর্থাৎ কাফির হয়ে যায় – এ কথা চার মাজহাবের সব আলেম একমত হয়ে জানিয়েছেন। যে জেনেশুনে নামাজ আদায় করে না, তা কাজা করার কথাও ভাবে না এবং এর জন্য আজাব ভোগ করতে হবে বলে ভয়ও পায় না, সে-ও মুরতাদ, অর্থাৎ কাফির হয়ে যায় – এ কথা হযরত আবদুল গনি নাবলুসির “হাদিকাতুন নাদিয়্যা” কিতাবের “জিহ্বার বিপদসমূহ” অধ্যায়ে লেখা আছে।

নামাজ কাদের ওপর ফরজ

বুদ্ধিসম্পন্ন ও বালিগ প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ ও নারীর ওপর নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ ফরজ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত আছে:

১. মুসলমান হওয়া। ২. বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া। ৩. বালিগ হওয়া।

আমাদের দ্বীনে বুদ্ধিসম্পন্ন নয় এবং বালিগ হয়নি এমন ছোট শিশুরা নামাজ আদায়ের জন্য দায়ী নয়। কিন্তু মা-বাবার উচিত সন্তানদের দ্বীনের ইলম শেখানো এবং তাদের ইবাদতে অভ্যস্ত করে তোলা। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “তোমরা প্রত্যেকে একটি পালের রাখালের মতো! রাখাল যেমন তার পালকে রক্ষা করে, তেমনি তোমাদেরও উচিত নিজ নিজ ঘরে এবং তোমাদের অধীনে যারা আছে, তাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা! তাদের ইসলাম শেখাতে হবে! না শেখালে তোমরা দায়ী হবে।” অন্য এক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “প্রত্যেক শিশু ইসলামের উপযোগী ও তা গ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে দুনিয়ায় আসে। পরে তার মা-বাবা তাকে খ্রিস্টান, ইহুদি ও দ্বীনহীন বানায়।” অতএব প্রত্যেক মুসলমানের প্রথম কর্তব্য হলো সন্তানদের ইসলাম, পবিত্র কুরআন পড়া, নামাজ আদায় করা এবং ঈমান ও ইসলামের শর্তসমূহ শেখানো। যে মা-বাবা চান তাঁদের সন্তান মুসলমান হোক এবং দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও স্বস্তি লাভ করুক, তাঁদের সবার আগে এই কর্তব্য পালন করতে হবে। যে শিশুকে ইসলামের জ্ঞান ও উত্তম চরিত্র দেওয়া হয়নি, সে অসৎ পথের লোকদের দ্বারা দ্রুত প্রতারিত হয়। সে তার মা-বাবা, তার রাষ্ট্র ও জাতির জন্য ক্ষতিকর হয়।

আমরা এখানে নামাজ-সংক্রান্ত মাসআলাগুলো হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, সেই মাজহাবের মহান আলেমগণের কিতাব থেকে নিয়ে সহজ করে বর্ণনা করেছি।

মুসলমানদের যেসব নামাজ আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো তিন ভাগে বিভক্ত: ফরজ, ওয়াজিব ও নফল (অতিরিক্ত)। ১. ফরজ নামাজ: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ, জুমার নামাজের দুই রাকাত ফরজ এবং জানাজার নামাজ – এগুলো ফরজ নামাজ। (জানাজার নামাজ ফরজে কিফায়া।) ২. ওয়াজিব নামাজ: বিতরের নামাজ, ঈদের নামাজ, মানতের নামাজ এবং শুরু করে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া নফল নামাজ। কাজা হয়ে যাওয়া বিতরের নামাজের কাজা আদায় করাও ওয়াজিব।

৩. নফল নামাজ: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুন্নতসমূহ, তারাবির নামাজ এবং সওয়াব অর্জনের নিয়তে আদায় করা তাহাজ্জুদ, তাহিয়্যাতুল মসজিদ, ইশরাক, চাশত (দুহা), আওয়াবিন, ইস্তিখারা, সালাতুত তাসবিহ ইত্যাদি নামাজ – এগুলো নফল নামাজ। অর্থাৎ এগুলো আদায় করার আদেশ দেওয়া হয়নি। যার কোনো ফরজ ও ওয়াজিব নামাজ বাকি নেই, তাকে নফল ইবাদতের জন্যও সওয়াব দেওয়া হয়।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

আমাদের নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ওপর প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আদায় করা ফরজ করেছেন। যারা উত্তমরূপে অজু করে এই পাঁচ নামাজ নিজ নিজ ওয়াক্তে আদায় করে এবং রুকু ও সিজদা সুন্দরভাবে আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করেন ও মাগফিরাত দান করেন।”

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মোট চল্লিশ রাকাত। এর মধ্যে সতেরো রাকাত ফরজ, তিন রাকাত ওয়াজিব এবং বিশ রাকাত সুন্নত। অর্থাৎ: ১. ফজরের নামাজ চার রাকাত। প্রথমে দুই রাকাত সুন্নত, তারপর দুই রাকাত ফরজ আদায় করা হয়। এই সুন্নত অত্যন্ত জোরালো। একে ওয়াজিব বলেন এমন আলেমও আছেন। ২. জোহরের নামাজ দশ রাকাত। প্রথমে চার রাকাত প্রথম সুন্নত, তারপর চার রাকাত ফরজ, ফরজের পর দুই রাকাত শেষ সুন্নত আদায় করা হয়।

৩. আসরের নামাজ আট রাকাত। প্রথমে চার রাকাত সুন্নত, তারপর চার রাকাত ফরজ আদায় করা হয়।

৪. মাগরিবের নামাজ পাঁচ রাকাত। প্রথমে তিন রাকাত ফরজ, তারপর দুই রাকাত সুন্নত আদায় করা হয়। ৫. এশার নামাজ তেরো রাকাত। প্রথমে চার রাকাত সুন্নত, তারপর চার রাকাত ফরজ, তারপর দুই রাকাত শেষ সুন্নত এবং এরপর তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করা হয়।

নামাজের ফরজসমূহ

ফরজ হলো কোনো কাজ করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার অকাট্য আদেশ। কোনো ইবাদতের ফরজগুলো পালন না করা পর্যন্ত সেই ইবাদত সহিহ (শুদ্ধ) হয় না। নামাজ আদায়ের সময় বারোটি শর্ত পালন করা ফরজ। এই ফরজগুলোর সাতটি নামাজের বাইরে, পাঁচটি ভেতরে। বাইরের ফরজগুলোকে শর্ত এবং ভেতরের ফরজগুলোকে রুকন (স্তম্ভ) বলা হয়। [কিছু আলেম বলেছেন, তাকবিরে তাহরিমা (প্রারম্ভিক তাকবির) নামাজের ভেতরের অংশ। তাঁদের মতে নামাজের শর্তও ছয়টি, রুকনও ছয়টি।] নামাজের শর্ত এত বেশি হওয়া থেকেই বোঝা যায় যে, নামাজ এক বিরাট কাজ এবং ইবাদতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে যদি এর ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, মাকরুহ ও মুফসিদগুলোও যোগ করা হয়, তবে বোঝা যায়, বান্দা তার রবের সামনে কীভাবে দাঁড়াবে এবং কীভাবে দাঁড়ানো উচিত। বান্দারা অক্ষম, দুর্বল ও অসহায় সৃষ্টি। প্রতিটি নিঃশ্বাসে তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার মুখাপেক্ষী। নামাজ এমন এক ইবাদত, যা বান্দাকে তার অক্ষমতার কথা জানিয়ে দেয়।

“যে ব্যক্তি এক ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় না করে কাজা করার জন্য রেখে দেয় এবং তা আদায় করার আগেই মারা যায়, তার কবরে জাহান্নামের দিকে সত্তরটি জানালা খুলে দেওয়া হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে আজাব ভোগ করতে থাকে” হাদীস শরীফ

ক) নামাজের শর্তসমূহ

নামাজের বাইরের ফরজ, অর্থাৎ শর্ত সাতটি। সেগুলো হলো:

১. হাদাস থেকে তাহারাত (পবিত্রতা)

অর্থাৎ অজুহীন ব্যক্তির অজু করা এবং জুনুবি (জানাবাতগ্রস্ত) ব্যক্তির গোসল করা।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী অজু কীভাবে করতে হয়

সুন্নত অনুযায়ী অজু করার জন্য: ১. অজু শুরু করার সময় দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া হয়। ২. ডান হাত দিয়ে মুখে তিনবার পানি দেওয়া (কুলি করা) হয়। ৩. ডান হাত দিয়ে নাকে তিনবার পানি দিয়ে বাম হাত দিয়ে নাক ঝাড়া হয়। ৪. দুই হাতের তালুতে পানি নিয়ে ললাট থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত এবং দুই কানপট্টি পর্যন্ত মুখমণ্ডল (তিনবার) ধোয়া হয়। মুখমণ্ডল একবার ধোয়া ফরজ। মুখমণ্ডল ধোয়ার সময় অন্তরে নিয়ত করা হয়। ৫. বাম হাত দিয়ে ডান হাত কনুই পর্যন্ত (তিনবার) ধোয়া হয়। ৬. ডান হাত দিয়ে বাম হাত কনুইসহ (তিনবার) ধোয়া হয়। দুই হাত কনুইসহ একবার ধোয়া ফরজ। ৭. দুই হাত ধোয়ার পর হাত আবার ভিজিয়ে সেই আর্দ্রতা দিয়ে মাথা মাসেহ করা হয়, এটি ফরজ। এরপর দুই কান ও ঘাড় মাসেহ করা হয়। শেষের এই তিনটি একসঙ্গে করার জন্য দুই হাত ভেজানো হয়। দুই হাতেরই সরু তিনটি আঙুল পরস্পর মিলিয়ে এমনভাবে দুই হাত মাথায় রাখা হয়, যেন আঙুলের ভেতরের দিক মাথার সামনে চুলের শুরুর জায়গায় বসে। দুই হাতের এই তিন আঙুলের মাথা পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকবে। বুড়ো আঙুল, তর্জনী ও হাতের তালু শূন্যে থাকবে, মাথা স্পর্শ করবে না। দুই হাত পেছনের দিকে টেনে তিন তিন আঙুল দিয়ে মাথা মাসেহ করা হয়। হাত পেছনের চুলের কিনারায় পৌঁছালে তিন তিন আঙুল মাথা থেকে তুলে নেওয়া হয়। তারপর দুই হাতের তালু মাথার পাশের চুলের ওপর লাগিয়ে পেছন থেকে সামনের দিকে টেনে মাথার দুই পাশ মাসেহ করা হয়। তারপর তর্জনী কানের ভেতরের দিকে এবং বুড়ো আঙুলের ভেতরের দিক কানের পেছনে রেখে কান ওপর থেকে নিচের দিকে মাসেহ করা হয়। তারপর বাকি তিন আঙুলের পিঠ ঘাড়ে রেখে ঘাড়ের মাঝখান থেকে দুই পাশের দিকে টেনে মাসেহ করা হয়। [মাথা এভাবে মাসেহ করা মালেকি মাজহাবে ফরজ।] ৮. ঘাড় মাসেহ করার পর পা ধোয়া হয়: প্রথমে ডান পা – বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে কনিষ্ঠা থেকে শুরু করে বুড়ো আঙুল পর্যন্ত পায়ের আঙুলগুলোর ফাঁক খিলাল করে টাখনুসহ (তিনবার) ধোয়া হয়। তারপর বাম পা – এবার বুড়ো আঙুল থেকে শুরু করে কনিষ্ঠা আঙুলের দিকে, আবারও বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে পায়ের আঙুলগুলোর ফাঁক খিলাল করে টাখনুসহ (তিনবার) ধোয়া হয়। এভাবে দুই পা দুই পাশের টাখনুর হাড়সহ একবার ধোয়া ফরজ।

এক হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি অজু করার পর একবার ‘ইন্না আনজালনাহু’, অর্থাৎ সূরা কদর পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে সিদ্দিকদের (সত্যনিষ্ঠদের) অন্তর্ভুক্ত করে লেখেন। দুবার পাঠ করলে শহিদদের অন্তর্ভুক্ত করে লেখেন। তিনবার পাঠ করলে নবীগণের সঙ্গে তার হাশর হবে।”

আরেক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি অজু করার পর আমার প্রতি দশবার দরুদ ও সালাম পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার দুঃখ দূর করে তাকে আনন্দিত করেন এবং তার দোয়া কবুল করেন।”

অজু ভঙ্গের কারণসমূহ

সাতটি জিনিস অজু ভেঙে দেয়, সেগুলো হলো:

১. সামনের ও পেছনের রাস্তা দিয়ে যা কিছু বের হয়। ২. মুখ দিয়ে বের হওয়া নাপাক জিনিস: ক) বমি, যদি মুখভরে হয়; খ) থুতু ফেলার সময় রক্ত থুতুর চেয়ে বেশি হলে। ৩. চামড়া থেকে বের হওয়া জিনিস: ক) রক্ত, পুঁজ ও হলুদ পানি নিজে নিজে বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে; খ) ফোড়া ও ক্ষতের রক্ত বা হলুদ পানি তুলা শুষে নিলে। ৪. ঘুমানো: কাত হয়ে শুয়ে, অথবা কনুইয়ে বা কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে ঘুমালে অজু ভেঙে যায়। ৫. বেহুঁশ হওয়া, পাগল হয়ে যাওয়া, মৃগী রোগে আক্রান্ত হওয়া অথবা হাঁটার সময় টলে পড়ার মতো নেশাগ্রস্ত হওয়া অজু ভেঙে দেয়। ৬. রুকু ও সিজদা আছে এমন নামাজে অট্টহাসি (কাহকাহা) দিয়ে হাসলে নামাজ ও অজু দুটোই ভেঙে যায়। তবে শিশুর অজু ভাঙে না।

নামাজে মুচকি হাসি (তাবাসসুম) নামাজও ভাঙে না, অজুও ভাঙে না। হাসির আওয়াজ পাশের লোকেরা শুনতে পেলে তাকে কাহকাহা বলা হয়। নিজেও শুনতে না পেলে তাকে তাবাসসুম বলা হয়। ৭. মুবাশারাতে ফাহিশা, অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর বিবস্ত্র অবস্থায় লজ্জাস্থান পরস্পর ঘর্ষণ করা পুরুষ ও নারী উভয়ের অজু ভেঙে দেয়। কেউ অজু করেছে বলে নিশ্চিত জানার পর অজু ভেঙেছে কি না সন্দেহ করলে তার অজু আছে বলে গণ্য হয়। আর অজু ভেঙেছে বলে নিশ্চিত জানার পর অজু করেছে কি না সন্দেহ করলে তাকে অজু করতে হবে।

গোসল (পূর্ণ পবিত্রতা)

নামাজ সহিহ, অর্থাৎ শুদ্ধ হওয়ার জন্য অজু ও গোসল শুদ্ধ হওয়া জরুরি। জুনুবি প্রত্যেক নারী ও পুরুষের এবং হায়েজ ও নিফাস থেকে মুক্ত হওয়া নারীদের জন্য, নামাজের ওয়াক্তের শেষে সেই নামাজ আদায় করার মতো সময় বাকি থাকতেই গোসল করা ফরজ। সহবাস (জিমা) ও ইহতিলামের (স্বপ্নদোষের) কারণে মানুষ জুনুবি হয়। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “যে গোসল করতে ওঠে, তাকে তার শরীরের লোমের সংখ্যা পরিমাণ [অর্থাৎ অনেক অনেক] সওয়াব দেওয়া হয়, ততগুলো গুনাহ মাফ করা হয়। জান্নাতে তার মর্তবা উঁচু হয়। গোসলের জন্য তাকে যে সওয়াব দেওয়া হবে, তা দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলেন, ‘আমার এই বান্দার দিকে তাকাও! সে রাতে আলস্য না করে উঠে আমার আদেশের কথা ভেবে জানাবাত থেকে গোসল করছে। তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি আমার এই বান্দার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিলাম এবং তাকে মাগফিরাত দান করলাম।’”

“প্রত্যেক শিশু ইসলামের উপযোগী ও তা গ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে দুনিয়ায় আসে। পরে তার মা-বাবা তাকে খ্রিস্টান, ইহুদি ও দ্বীনহীন বানায়” হাদীস শরীফ

গোসলের ফরজসমূহ

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী গোসলের ফরজ তিনটি: ১. মুখের ভেতর ধোয়া। মুখের ভেতরে সুইয়ের মাথা পরিমাণ জায়গাও যদি শুকনো থেকে যায়, অথবা দাঁতের ওপরের অংশ ও দাঁতের গর্ত ভেজানো না হয়, তবে গোসল হয় না।

২. নাক ধোয়া। নাকের ভেতরের শুকনো ময়লার নিচে এবং মুখে চিবানো রুটির নিচে পানি না পৌঁছালে গোসল হয় না।

হাম্বলি মাজহাবে মুখ ও নাক ধোয়া অজুতেও ফরজ, গোসলেও ফরজ। শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে গোসলের সময় নিয়ত করাও ফরজ।

৩. শরীরের প্রতিটি জায়গা ধোয়া। নাভির ভেতর, গোঁফ, ভ্রু, দাড়ি, এগুলোর নিচের চামড়া এবং মাথার চুল ধোয়া ফরজ। নখ, ঠোঁট, চোখের পাতা বা শরীরের যেকোনো জায়গায় পানি পৌঁছাতে দেয় না এমন কোনো পদার্থ থাকলে [নখে নেইলপলিশ থাকলে] গোসল আদায় হয়েছে বলে গণ্য হয় না।

গোসল কীভাবে করতে হয়

হানাফি মাজহাবে সুন্নত অনুযায়ী গোসল এভাবে করতে হয়:

১. প্রথমে পরিষ্কার থাকলেও দুই হাত, লজ্জাস্থান এবং শরীরের যেসব জায়গায় নাজাসাত (নাপাকি) আছে, সেগুলো ধুয়ে নিতে হবে।

২. তারপর নামাজের পূর্ণ অজু করতে হবে এবং মুখমণ্ডল ধোয়ার সময় গোসলের নিয়ত করতে হবে। পায়ের নিচে পানি না জমলে পা-ও ধুয়ে নিতে হবে।

৩. তারপর সমস্ত শরীরে তিনবার পানি ঢালতে হবে: প্রথমে তিনবার মাথায়, তারপর ডান কাঁধে, তারপর বাম কাঁধে। প্রতিবার পানি ঢালার সময় সেই দিক পুরোপুরি ভিজতে হবে। প্রথমবার পানি ঢালার সময় শরীর ঘষে নিতে হবে। গোসলে এক অঙ্গে ঢালা পানি অন্য অঙ্গে গড়িয়ে গেলে সেই জায়গাও পবিত্র হয়ে যায়, কারণ গোসলে পুরো শরীর এক অঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়। আর অজুর সময় এক অঙ্গে ঢালা পানি দিয়ে অন্য অঙ্গ ভিজলে তা ধোয়া হয়েছে বলে গণ্য হয় না। গোসল শেষ হওয়ার পর আবার অজু করা মাকরুহ। তবে গোসলের সময় নামাজের অজু ভেঙে গেলে আবার অজু করতে হবে।

যাদের দাঁতে ক্যাপ (মুকুট) বা ফিলিং আছে, তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা

হানাফি মাজহাবে দাঁতের ফাঁক ও দাঁতের গর্ত না ভিজলে গোসল পূর্ণ হয় না। এ জন্য দাঁতে ক্যাপ লাগালে বা ফিলিং করালে গোসল সহিহ হয় না। মানুষ জানাবাত থেকে মুক্ত হতে পারে না। সোনা, রুপা ও নাপাক নয় এমন অন্য পদার্থ দিয়ে তৈরি ক্যাপ ও ফিলিংয়ের নিচে পানি না ঢুকলে হানাফি মাজহাবের সব আলেমের মতেই গোসল জায়েজ হয় না। যে নিজের মাজহাবের কোনো ফরজ পালন করতে পারে না, কেবল সেই ফরজটি পালনের জন্য তাকে অন্য মাজহাবের তাকলিদ (অনুসরণ) করতে হবে। তবে এ কাজ করার সময় যে মাজহাবের তাকলিদ করছে, সেই মাজহাবের অজু-সংক্রান্ত শর্তগুলোও তাকে পালন করতে হবে। মালেকি ও শাফেয়ি মাজহাবে গোসলে মুখের ভেতর ধোয়া ফরজ নয়।

ক্যাপ বা ফিলিং করানো হানাফি মাজহাবের কোনো ব্যক্তির মালেকি মাজহাবের [অথবা শাফেয়ি মাজহাবের] তাকলিদ করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট: গোসলে, অজুতে এবং নামাজের নিয়ত করার সময় সে মনে রাখবে যে, সে ইমাম মালিকের [অথবা ইমাম শাফেয়ির] অনুসরণ করছে। অর্থাৎ গোসল শুরু করার সময় যে অন্তরে এ কথা উপস্থিত করে যে, “আমি গোসল করার এবং মালেকি মাজহাবের [অথবা শাফেয়ি মাজহাবের] অনুসরণ করার নিয়ত করলাম”, তার গোসল সহিহ হয়।

মুখে ক্যাপ বা ফিলিং আছে এমন হানাফি মাজহাবের কোনো ব্যক্তি এভাবে নিয়ত করলে তার গোসল, অর্থাৎ পূর্ণ পবিত্রতা সহিহ হয়। সে জানাবাত থেকে মুক্ত হয়, পবিত্র হয়ে যায়। মালেকি [অথবা শাফেয়ি] মাজহাবের তাকলিদ করলে তার অজু ও নামাজও সহিহ হয়। যাদের ক্যাপ ও ফিলিং নেই, তাদেরও সে ইমাম হতে পারে।

অন্য তিন মাজহাবে গোসলের ফরজসমূহ

মালেকি মাজহাবে:

১. নিয়ত,

২. দালক (ঘষা),

৩. মুওয়ালাত,

৪. চুল ও দাড়ি খিলাল করা (আঙুল দিয়ে ফাঁক করা),

৫. শরীরের প্রতিটি জায়গা ধোয়া।

শাফেয়ি মাজহাবে:

১. নিয়ত,

২. শরীরের প্রতিটি জায়গা ধোয়া। [শাফেয়ি মাজহাবে গোসলের ফরজ তিনটি বলা হলে শরীরের নাজাসাত (নাপাকি) পরিষ্কার করার কথা বোঝানো হয়। শরীর ধোয়া হলে নাজাসাতও পরিষ্কার হয়ে যায়, তাই গোসলের ফরজ দুটি বললে কোনো অসুবিধা নেই।]

হাম্বলি মাজহাবে: গোসলের ফরজ একটি – সমস্ত শরীর ধোয়া। এটি গোসলের রুকন, অর্থাৎ গোসলের ভেতরের ফরজ। গোসল শুরু করার সময় নিয়ত করা এবং বিসমিল্লাহ বলাও ফরজ। মুখ ও নাকের ভেতর শরীরের বাইরের অংশ হিসেবে গণ্য হয় বলে সেগুলো ধোয়াও ফরজ।

১. নিয়ত করা,

২. বিসমিল্লাহ বলা,

৩. মুখের ভেতর ধোয়া,

৪. নাকের ভেতর ধোয়া,

৫. শরীরের প্রতিটি জায়গা ধোয়া।

অন্য তিন মাজহাবে অজুর ফরজসমূহ

মালেকি মাজহাবে:

১. নিয়ত,

২. মুখমণ্ডল ধোয়া,

৩. দুই হাত ধোয়া,

“যে গোসল করতে ওঠে, তাকে তার শরীরের লোমের সংখ্যা পরিমাণ [অর্থাৎ অনেক অনেক] সওয়াব দেওয়া হয়, ততগুলো গুনাহ মাফ করা হয়। জান্নাতে তার মর্তবা উঁচু হয়” হাদীস শরীফ

৪. পুরো মাথা মাসেহ করা [কানের লতি বরাবর চামড়া ও চুল মাথার অন্তর্ভুক্ত]। ৫. দুই পা ধোয়া। ৬. মুওয়ালাত [বিরতি না দিয়ে অঙ্গগুলো পরপর ধোয়া],

৭. দালক [ধোয়া জায়গা ঘষা]।

শাফেয়ি মাজহাবে:

১. নিয়ত,

২. মুখমণ্ডল ধোয়া,

৩. দুই হাত ধোয়া,

৪. মাথার সামান্য অংশ মাসেহ করা,

৫. দুই পা ধোয়া,

৬. তারতিব [ক্রমানুসারে ধোয়া]।

হাম্বলি মাজহাবে:

১. নিয়ত,

২. বিসমিল্লাহ বলা,

৩. মুখমণ্ডল ধোয়া,

৪. মুখ ধোয়া,

৫. নাক ধোয়া,

৬. দুই হাত ধোয়া,

৭. পুরো মাথা মাসেহ করা [কান মাথার অন্তর্ভুক্ত],

৮. দুই পা ধোয়া,

৯. তারতিব। ১০. মুওয়ালাত।

তায়াম্মুম

তায়াম্মুম মানে মাটি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা। অজু বা গোসল করার জন্য পানি পাওয়া না গেলে, অথবা পানি থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার করা সম্ভব না হলে, পবিত্র মাটি, বালু, চুন ও পাথরের মতো মাটিজাতীয় কোনো পবিত্র জিনিস দিয়ে তায়াম্মুম করা হয়। হানাফি মাজহাবে নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেও তায়াম্মুম করা যায়। অন্য তিন মাজহাবে ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে তা জায়েজ নয়।

তায়াম্মুমের ফরজসমূহ

তায়াম্মুমের ফরজ তিনটি: ১. নিয়ত করা। ২. দুই হাতের তালু পবিত্র মাটিতে লাগিয়ে পুরো মুখমণ্ডল মাসেহ করা। ৩. দুই হাত পবিত্র মাটিতে মেরে প্রথমে ডান হাত, তারপর বাম হাত মাসেহ করা। কেউ কেউ বলেন, তায়াম্মুমের ফরজ দুটি: তাঁরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় ফরজকে একটি ফরজ হিসেবে উল্লেখ করেন। দুই রকম বলাই সঠিক।

অজুর জন্য এবং গোসলের জন্য তায়াম্মুম একই রকম।

তায়াম্মুম কীভাবে করতে হয়

১. প্রথমে জানাবাত থেকে অথবা অজুহীন অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়ার নিয়ত করা হয়। তায়াম্মুম দিয়ে নামাজ আদায় করতে চাইলে কেবল তায়াম্মুমের নিয়ত করা যথেষ্ট নয়। ইবাদত বলে গণ্য কোনো কাজের জন্য – যেমন জানাজার নামাজ আদায় বা তিলাওয়াতের সিজদা করার জন্য – অথবা অজুর জন্য, অথবা গোসলের জন্য তায়াম্মুম করার নিয়ত জরুরি। তায়াম্মুমের নিয়ত করার সময় অজু ও গোসলকে আলাদা করার প্রয়োজন নেই। অজুর নিয়ত করলেই মানুষ জানাবাত থেকেও পবিত্র হয়ে যায়। জানাবাত থেকে পবিত্র হওয়ার নিয়তে করা তায়াম্মুম দিয়ে নামাজ আদায় করা যায়। অজুর জন্য দ্বিতীয়বার তায়াম্মুমের প্রয়োজন নেই।

২. দুই হাতের আস্তিন কনুইয়ের ওপর পর্যন্ত গুটিয়ে দুই হাতের তালু পবিত্র মাটি, পাথর অথবা মাটি বা চুনের প্রলেপ দেওয়া দেয়ালে লাগাতে হবে। অন্তত তিন আঙুল যেন স্পর্শ করে। তারপর দুই তালু দিয়ে মুখমণ্ডল একবার মাসেহ করতে হবে, অর্থাৎ বুলিয়ে নিতে হবে। মুখমণ্ডলের সুইয়ের মাথা পরিমাণ জায়গাও হাতের স্পর্শ না পেলে তায়াম্মুম হয় না। পুরো মুখমণ্ডল ভালোভাবে মাসেহ করার জন্য তালু খোলা রাখা হয়, চার আঙুল পরস্পর মিলিয়ে রাখা হয় এবং দুই হাতের দুটি করে লম্বা আঙুলের মাথা পরস্পরকে ছুঁইয়ে রাখা হয়। এভাবে হাতের তালু চুলের গোড়ায় রেখে আস্তে আস্তে থুতনির দিকে নামানো হয়। আড়াআড়ি রাখা আঙুলগুলো ললাট, চোখের পাতা, নাকের দুই পাশ, ঠোঁটের ওপরের অংশ ও থুতনি ভালোভাবে বুলিয়ে নেবে। এ সময় হাতের তালুও দুই গাল বুলিয়ে নেবে।

৩. দুই তালু আবার মাটিতে লাগিয়ে পরস্পর ঠুকে ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলতে হবে। তারপর প্রথমে বাম হাতের চার আঙুলের ভেতরের দিক দিয়ে ডান হাতের নিচের দিক আঙুলের মাথা থেকে কনুইয়ের দিকে বুলিয়ে নিতে হবে। এরপর হাতের ভেতরের দিক বাম তালু দিয়ে কনুই থেকে তালু পর্যন্ত বুলিয়ে নিতে হবে। শেষে বাম বুড়ো আঙুলের ভেতরের দিক দিয়ে ডান বুড়ো আঙুলের বাইরের দিক বুলিয়ে নিতে হবে। আংটি খুলে ফেলতে হবে। তারপর একইভাবে ডান হাত দিয়ে বাম হাত মাসেহ করা হয়। হাতের তালু মাটিতে লাগাতে হবে। মাটি বা ধুলো হাতে লেগে থাকা জরুরি নয়।

তায়াম্মুম ভঙ্গের কারণসমূহ

যে ওজরের কারণে তায়াম্মুম করতে হয়েছিল, তা দূর হয়ে গেলে, পানি পাওয়া গেলে এবং যেসব অবস্থায় অজু ও গোসল ভেঙে যায়, সেসব অবস্থায় তায়াম্মুমও ভেঙে যায়।

নারীদের হায়েজ (মাসিক) ও নিফাসের অবস্থা1

হায়েজ হলো সেই রক্ত, যা আট বছর পূর্ণ করে নয় বছরে পা দিয়েছে এমন সুস্থ মেয়ের, অথবা আগের আদতের (মাসিকের নির্দিষ্ট মেয়াদের) শেষ মিনিট থেকে পনেরো দিন পেরিয়েছে এমন নারীর শরীর থেকে বের হয় এবং অন্তত তিন দিন স্থায়ী হয়। সাদা ছাড়া অন্য যেকোনো রঙের এবং ঘোলাটে রক্তকে হায়েজের রক্ত বলা হয়। কোনো মেয়ের হায়েজ শুরু হলে সে বালিগ হয়ে যায়, নারীর হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দ্বীনের আদেশ-নিষেধের জন্য দায়ী হয়। রক্ত দেখা যাওয়ার মুহূর্ত থেকে বন্ধ হওয়ার দিন পর্যন্ত দিনগুলোর সংখ্যাকে আদতের সময় বলা হয়। এই সময়ের সর্বনিম্ন ৩ দিন, সর্বোচ্চ ১০ দিন। প্রত্যেক নারীর নিজের আদতের দিনের সংখ্যা ও সময় (ঘণ্টা) জানা জরুরি। আট বছর পূর্ণ করা মেয়েকে হায়েজ ও নিফাসের ইলম শেখানো তার মায়ের, মা না থাকলে তার নানি-দাদিদের, বড় বোনদের, ফুফু ও খালাদের ওপর ফরজ।

“দোয়া ও ইস্তিগফার কবুল হওয়ার জন্য নামাজ আদায় করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং অজু অবস্থায় পাঠ করা জরুরি। ইস্তিগফার ও দোয়া অজু অবস্থায় পাঠ করা মুস্তাহাব” Se’âdet-i Ebediyye

নিফাস হলো সন্তান প্রসবের পরের রক্তস্রাব, অর্থাৎ নারীর সন্তান প্রসবের পর যে রক্ত আসে। এই রক্তের কোনো সর্বনিম্ন মেয়াদ নেই। রক্ত বন্ধ হলে নারীকে তখনই গোসল করতে হবে। এর সর্বোচ্চ মেয়াদ ৪০ দিন। ৪০ দিন পূর্ণ হলে রক্ত বন্ধ না হলেও সে গোসল করে নামাজ শুরু করবে। ৪০ দিনের পরে আসা রক্ত ইস্তিহাজা (অর্থাৎ ওজর)।

নারীদের নিফাসের দিনগুলোও মুখস্থ রাখা জরুরি। নিচের রক্তগুলোকে ইস্তিহাজা (ওজরের রক্ত) বলা হয়: ৩ দিন, অর্থাৎ বাহাত্তর ঘণ্টার চেয়ে পাঁচ মিনিট কম হলেও সেই রক্ত; যার হায়েজ সবে শুরু হয়েছে, তার ১০ দিনের বেশি স্থায়ী রক্ত; যার প্রথমবার নয়, তার আদতের চেয়ে বেশি এবং ১০ দিনও পেরিয়ে যাওয়া রক্ত; এবং গর্ভবতী নারী, ৫৫ বছর পেরিয়ে যাওয়া নারী (আয়িসা) ও নয় বছরের কম বয়সী মেয়েদের রক্ত।

একে ইস্তিহাজা (ওজরের রক্ত) বলা হয়। এই রক্ত রোগের লক্ষণ। দীর্ঘ সময় ধরে এর প্রবাহ বিপজ্জনক, ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। ইস্তিহাজার দিনগুলোতে নারী ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়া ব্যক্তির মতো: এ অবস্থায় সে নামাজ আদায় করতে পারে এবং রোজা রাখতে পারে। হায়েজ ও নিফাসের অবস্থায় নারী নামাজ আদায় করতে পারে না এবং রোজা রাখতে পারে না। সে তিলাওয়াতের সিজদা ও শোকরের সিজদা করতে পারে না। পবিত্র কুরআন [মুসহাফ শরীফ] স্পর্শ করতে পারে না। জামে মসজিদে বা সাধারণ মসজিদে প্রবেশ করতে পারে না, কাবার তাওয়াফ করতে পারে না, স্বামী-সহবাস করতে পারে না। পবিত্র হওয়ার পর সে রোজার কাজা আদায় করবে, নামাজের কাজা আদায় করবে না। সিজদার আয়াত শুনেছে এমন জুনুবি বা অজুহীন ব্যক্তি পবিত্র হওয়ার পর তিলাওয়াতের সিজদা করবে। কিন্তু হায়েজ ও নিফাসগ্রস্ত নারীর জন্য পবিত্র হওয়ার পরও তিলাওয়াতের সিজদা জরুরি নয়।

হায়েজ শুরু হলে নারীর তা স্বামীকে জানানো জরুরি। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “যে নারী হায়েজ শুরু হওয়া ও শেষ হওয়ার কথা স্বামীর কাছে গোপন রাখে, সে অভিশপ্ত।” হায়েজ বা নিফাস বন্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে গোসল করে পবিত্র হওয়া আল্লাহ তাআলার আদেশ, অর্থাৎ ফরজ।

মালেকি মাজহাবে হায়েজ ও নিফাস

মালেকি মাজহাবে নয় বছর বয়সে পৌঁছেছে এমন মেয়ের সামনের পথ দিয়ে কোনো কারণ ছাড়া প্রবাহিত লাল, হলুদ বা ঘোলাটে রক্তকে হায়েজের রক্ত বলা হয়। প্রবাহিত হতে শুরু করলেই তা হায়েজ। রক্ত চলতে থাকলে ১৫ দিনের কম অংশ আদত, আর বেশি অংশ ইস্তিহাজা। পরের মাসে আদত বদলে গেলে আগের আদতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশিটির সঙ্গে ৩ দিন যোগ করলে যা হয়, তা হায়েজ। এর বেশি এবং ১৫ দিনের বেশি রক্ত ইস্তিহাজা। কুরসুফ (তুলার প্যাড) শুকনো থাকলে, অথবা ভেজা কিন্তু সাদা থাকলে বোঝা যায় যে হায়েজ বন্ধ হয়েছে। ৭০ বছর বয়সের পর আসা রক্ত হায়েজ নয়, ইস্তিহাজা। রক্ত বিরতি দিয়ে দিয়ে চলতে থাকলে বন্ধ থাকার দিনগুলো পবিত্র বলে গণ্য হয়। পবিত্রতার সর্বনিম্ন মেয়াদ ১৫ দিন। ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে আসা রক্ত ইস্তিহাজা। এমন পবিত্রতার মেয়াদের কোনো সীমা নেই। রক্ত বন্ধ হয়ে ১৫ দিন পর আবার শুরু হলে তা হায়েজ। সন্তান প্রসবের আগে আসা রক্ত হায়েজ। পেট কেটে সন্তান বের করার পর যে রক্ত আসে, তা নিফাস নয়। নিফাসের সর্বোচ্চ মেয়াদ ৬০ দিন। ১৫ দিন রক্ত বন্ধ থাকলে নারী তাহির (পবিত্র) হয়ে যায়। এর পরে আসা রক্ত হায়েজ।

শাফেয়ি মাজহাবে হায়েজ ও নিফাস

হায়েজের সর্বনিম্ন মেয়াদ ১ দিন, সর্বোচ্চ ১৫ দিন। ১৫ দিনের বেশি এলে তা ইস্তিহাজা [ওজর]। পবিত্রতার মেয়াদ ১৫ দিন।

১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে রক্ত এলে তা হায়েজ নয়, ইস্তিহাজা। নয় বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং আয়িসা নারীর [৬০ বছর বয়সের পর] রক্ত হায়েজ নয়, ওজর।

নিফাসের সর্বোচ্চ মেয়াদ ৬০ দিন। সর্বনিম্ন মেয়াদের কোনো সীমা নেই। গর্ভবতী নারীর রক্ত হায়েজ। নিফাসের রক্তস্রাবের মাঝের পবিত্র দিনগুলো ১৫ দিনের কম হলে তা নিফাস বলে গণ্য হয়। নিফাসের রক্তের মাঝে ১৫ বা তার বেশি দিন পবিত্রতা থাকলে বুঝতে হবে, নিফাস শেষ হয়ে গেছে। ৬০ দিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। পবিত্রতার ১৫ বা তার বেশি দিন পরে রক্ত এলে তা নিফাসের রক্ত নয়, হায়েজের রক্ত।

হাম্বলি মাজহাবে হায়েজ ও নিফাস

হায়েজের সর্বনিম্ন মেয়াদ ১ দিন, সর্বোচ্চ ১৫ দিন। ১৫ দিনের বেশি এলে তা ইস্তিহাজা [ওজর]। দ্বিতীয় হায়েজ হওয়ার জন্য মাঝখানে অন্তত ১৩ দিন পার হতে হবে। ১৩ দিন পার হওয়ার আগে রক্ত এলে তা হায়েজ নয়, ইস্তিহাজা। নয় বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং আয়িসা নারীর [৫০ বছর বয়সের পর] রক্ত হায়েজ নয়, ওজর।

গর্ভবতী নারীর রক্ত হায়েজ নয়, ইস্তিহাজা। নিফাসের সর্বোচ্চ মেয়াদ হানাফি মাজহাবের মতো ৪০ দিন। সর্বনিম্ন মেয়াদের কোনো সীমা নেই। নিফাস চলাকালে যেদিন রক্ত আসে না, সেদিন সে পবিত্র: গোসল করে সব ইবাদত আদায় করবে। যেদিন রক্ত আসে, সেদিন নামাজ ও রোজা ছেড়ে দেবে। ৪০ দিন পর্যন্ত এভাবেই চলবে।

২. নাজাসাত থেকে তাহারাত (পবিত্রতা)

অর্থাৎ শরীরে, পোশাকে এবং নামাজ আদায়ের জায়গায় নাজাসাত বা নাপাকি না থাকা। ওড়না, টুপি, পাগড়ি, চামড়ার মোজা ও খড়মও পোশাকের অন্তর্ভুক্ত। গলায় জড়ানো শালের ঝুলন্ত অংশ নামাজির সঙ্গে নড়াচড়া করে বলে তা পোশাক হিসেবে গণ্য হয়, এবং সেই অংশ পবিত্র না হলে নামাজ কবুল হয় না। বিছানো কাপড়ের যে জায়গায় নামাজি দাঁড়ায় ও মাথা রাখে, তা পবিত্র হলে অন্য কোনো জায়গায় নাজাসাত থাকলেও নামাজ কবুল হয়, কারণ বিছানো কাপড় শালের মতো শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে না। কিন্তু বন্ধ বোতলে প্রস্রাব বহনকারী ব্যক্তির নামাজ জায়েজ হয় না, কারণ বোতল প্রস্রাব সৃষ্টির স্থান নয়। [এ থেকে বোঝা যায় যে, পকেটে বন্ধ কোলোন, স্পিরিট বা টিংচার আয়োডিনের শিশি, অথবা বন্ধ বাক্সে রক্তমাখা রুমাল বা নাপাক কাপড় থাকা অবস্থায় নামাজ আদায় করা জায়েজ নয়।] দুই পা যেখানে রাখা হয় এবং যেখানে সিজদা করা হয়, সেই জায়গা পবিত্র হওয়া জরুরি। নাজাসাতের ওপর বিছানো কাপড়, কাচ বা নাইলনের ওপর আদায় করা নামাজ কবুল হয়। সিজদার সময় পোশাকের প্রান্ত শুকনো নাজাসাতে লাগলে কোনো ক্ষতি নেই।

“যে নারী হায়েজ শুরু হওয়া ও শেষ হওয়ার কথা স্বামীর কাছে গোপন রাখে, সে অভিশপ্ত” হাদীস শরীফ

ইস্তিঞ্জা, ইস্তিবরা ও ইস্তিনকা

নির্দিষ্ট স্থান (সামনের ও পেছনের রাস্তা) দিয়ে নাজাসাত বের হওয়ার পর এই জায়গাগুলো পরিষ্কার করাকে ইস্তিঞ্জা বলা হয়।

ইস্তিবরা হলো প্রস্রাব করার পর মূত্রথলির আর্দ্রতা দূর না হওয়া পর্যন্ত হাঁটাহাঁটি করে বা অন্য কোনোভাবে সময় কাটানো। ইস্তিনকা হলো মূত্রনালিতে প্রস্রাব বাকি নেই অথবা শরীরে নাজাসাত বাকি নেই – এ বিষয়ে অন্তর নিশ্চিন্ত হওয়া।

নারীরা ইস্তিবরা করে না। পুরুষদের জন্য হেঁটে, কেশে বা বাম কাতে শুয়ে ইস্তিবরা করা, অর্থাৎ মূত্রনালিতে কোনো ফোঁটা বাকি না রাখা ওয়াজিব। প্রস্রাবের কোনো ফোঁটা বাকি নেই – এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে অজু করা উচিত নয়। একটি ফোঁটাও চুইয়ে বের হলে অজুও ভেঙে যায়, পোশাকও নাপাক হয়। অন্তর্বাসে হাতের তালুর চেয়ে কম পরিমাণ প্রস্রাব লেগে থাকলে, নতুন করে অজু করার পর আদায় করা নামাজ মাকরুহ হয়। বেশি চুইয়ে পড়লে নামাজ কবুল হয় না। যাদের ইস্তিবরা করতে কষ্ট হয়, তাদের উচিত যবের দানা পরিমাণ উদ্ভিজ্জ তুলার সলতে মূত্রছিদ্রে রাখা। চুইয়ে আসা প্রস্রাব তুলা শুষে নেয়। তবে তুলার মাথা যেন বাইরে না থাকে।

৩. সাতরে আওরাত (সতর ঢাকা)

মানুষের শরীরের যেসব জায়গা খোলা রাখা, অন্যকে দেখানো এবং অন্যের দেখা হারাম, সেগুলোকে সতর (আওরাতের স্থান) বলা হয়। পুরুষদের সতর নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত। হাঁটুও সতরের অন্তর্ভুক্ত। এই জায়গাগুলো খোলা রেখে আদায় করা নামাজ কবুল হয় না। নামাজ আদায়ের সময় শরীরের অন্যান্য অংশ (বাহু, মাথা) ঢাকা এবং মোজা পরা পুরুষদের জন্য সুন্নত। এসব জায়গা খোলা রেখে নামাজ আদায় করা তাদের জন্য মাকরুহ। নারীদের হাতের তালু ও মুখমণ্ডল ছাড়া শরীরের সব জায়গা, হাতের পিঠ, চুল ও পা চার মাজহাবেই সতর। এ জন্যই নারীদের “আওরাত” বলা হয়েছে। এই জায়গাগুলো ঢেকে রাখা তাদের জন্য ফরজ। সতরের কোনো অঙ্গের এক-চতুর্থাংশ এক রুকন পরিমাণ সময় খোলা থাকলে নামাজ ভেঙে যায়। এর চেয়ে কম খুললে নামাজ ভাঙে না, তবে নামাজ মাকরুহ হয়। এমন পাতলা কাপড়, যার নিচের অঙ্গের আকৃতি বা রং দেখা যায়, তা না থাকারই শামিল।

নামাজের বাইরে একা থাকলে নারীদের জন্য হাঁটু ও নাভির মাঝের অংশ ঢেকে রাখা ফরজ, পিঠ ও পেট ঢেকে রাখা ওয়াজিব, আর অন্যান্য জায়গা ঢেকে রাখা আদব।

৪. ইস্তিকবালে কিবলা (কিবলামুখী হওয়া)

অর্থাৎ কাবার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা। মক্কা মুকাররমা শহরে অবস্থিত কাবা ঘরের দিককে কিবলা বলা হয়। আগে কিবলা ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম)। হিজরতের সতেরো মাস পর শাবান মাসের মাঝামাঝি এক মঙ্গলবার কাবার দিকে মুখ ফেরানোর আদেশ দেওয়া হয়।

কিবলা কাবার ভবন নয়, বরং কাবা যে ভূমির ওপর অবস্থিত, সেই ভূমি। অর্থাৎ মাটি থেকে আরশ পর্যন্ত সেই পুরো শূন্যস্থানই কিবলা। এ জন্য সমুদ্রের ও কুয়ার তলদেশে, উঁচু পাহাড়ে এবং উড়োজাহাজে এই দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হয়। চোখের স্নায়ুর আড়াআড়ি দিক দুটির মাঝের প্রায় ৪৫ ডিগ্রির পরিসর কাবার দিকে পড়লে নামাজ সহিহ হয়।

৫. ওয়াক্ত

রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) কাবার দরজার পাশে দুদিন আমার ইমামতি করেছেন। আমরা দুজন সুবহে সাদিক (ফজর) উদিত হওয়ার সময় ফজরের নামাজ, সূর্য মাথার ওপর থেকে হেলে পড়ার সময় জোহর, প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার নিজের সমান হলে আসর, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় [তার ওপরের কিনারা অদৃশ্য হলে] মাগরিব এবং শাফাক অন্ধকার হলে এশা আদায় করেছি। দ্বিতীয় দিন ফজরের নামাজ চারদিক ফরসা হলে, জোহর প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার নিজের দ্বিগুণ হলে, আসর তার পরপরই, মাগরিব রোজাদার যখন ইফতার করে সেই সময়ে এবং এশা রাতের এক-তৃতীয়াংশ পার হলে আদায় করেছি। এরপর তিনি বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! আপনার এবং পূর্ববর্তী নবীগণের নামাজের ওয়াক্ত এটাই। আপনার উম্মত যেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতিটি আমাদের আদায় করা এই দুই সময়ের মাঝে আদায় করে।’”

প্রতিদিন যে নামাজ আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে, তার সংখ্যা যে পাঁচ, তা এ থেকেও বোঝা যায়। ফজরের নামাজের ওয়াক্ত: সুবহে সাদিক (ফজর) উদিত হওয়া, অর্থাৎ পূর্ব দিগন্তে শুভ্রতা দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে সূর্য ওঠা পর্যন্ত।

জোহরের নামাজের ওয়াক্ত: বস্তুর ছায়া ছোট হতে হতে আবার বড় হতে শুরু করার সময় থেকে শুরু হয় এবং ছায়া বস্তুর নিজের সমান লম্বা না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।

আসরের নামাজের ওয়াক্ত: জোহরের ওয়াক্ত শেষ হলে শুরু হয় এবং সূর্য অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।

কিন্তু সূর্য হলুদ হয়ে যাওয়ার পর, অর্থাৎ দিগন্তরেখার এক বর্শা পরিমাণ কাছে এলে, তথা মাগরিবের ৪০ মিনিট আগে থেকে যেকোনো নামাজ আদায় করা হারাম। অর্থাৎ আসরের নামাজ এত দেরিতে আদায় করা হারাম। তবে কেউ আসরের নামাজ আদায় না করে থাকলে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগ পর্যন্ত হলেও তা আদায় করতে হবে।

মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত: সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পর শুরু হয় এবং শাফাক অন্ধকার হওয়া, অর্থাৎ পশ্চিম আকাশের লালিমা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। এশার নামাজের ওয়াক্ত: মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত শেষ হওয়া থেকে শুরু করে সুবহে সাদিকের শুভ্রতা দেখা দেওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। বিনা ওজরে এশার নামাজ শরয়ি মধ্যরাতের পরে পিছিয়ে দেওয়া মাকরুহ।

নামাজকে তার ওয়াক্তের আগে বা পরে আদায় করা হারাম। এটি কবিরা গুনাহ। “Türkiye” পত্রিকার প্রস্তুত করা দেয়ালপঞ্জিকায় নামাজের ও ইমসাকের (সাহরির শেষ) সময় সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

“ইবাদতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো আউয়াল ওয়াক্তে (প্রথম সময়ে) আদায় করা নামাজ” হাদীস শরীফ

কারাহাতের ওয়াক্তসমূহ

যেসব ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি, অর্থাৎ হারাম, সেগুলো তিনটি। এই তিন ওয়াক্তে শুরু করা ফরজ নামাজ সহিহ হয় না। সেগুলো হলো সূর্য ওঠার সময়, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় এবং ঠিক দুপুরে। এই তিন ওয়াক্তে আগে থেকে প্রস্তুত করা মৃতের জানাজার নামাজ, তিলাওয়াতের সিজদা ও সাহু সিজদাও জায়েজ নয়। সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় কেবল সেই দিনের আসরের নামাজ আদায় করা যায়।

আজান ও ইকামত

আজান মানে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও কাজা নামাজের জন্য এবং জুমার নামাজে খতিবের সামনে পুরুষদের আজান দেওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। নারীদের আজান ও ইকামত দেওয়া মাকরুহ। আজান অন্যদের ওয়াক্তের কথা জানানোর জন্য উঁচু জায়গায় দেওয়া হয়। আজান দেওয়ার সময় দুই হাত তুলে দুই কানের ছিদ্রে একটি করে আঙুল রাখা মুস্তাহাব। ইকামত দেওয়া আজানের চেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ। আজান ও ইকামত দুটোই কিবলামুখী হয়ে দেওয়া হয়। এগুলো দেওয়ার সময় কথা বলা হয় না, সালামের জবাব দেওয়া হয় না। আজান এভাবে দেওয়া হয়: আল্লাহু আকবার (৪ বার), আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (২ বার),

আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ (২ বার),

হাইয়া আলাস সালাহ (২ বার),

হাইয়া আলাল ফালাহ (২ বার),

আল্লাহু আকবার (২ বার),

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (১ বার)।

কেবল ফজরের আজানে “হাইয়া আলাল ফালাহ” বলার পর দুবার (আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম) বলা হয়। আর ইকামতে আজানের সব বাক্যের সঙ্গে “হাইয়া আলাল ফালাহ” বলার পর দুবার (কাদ কামাতিস সালাহ) বলা হয়।

৬. নিয়ত

তাকবিরে ইফতিতাহ (প্রারম্ভিক তাকবির) বলার সময় নিয়ত করা হয়। নামাজের নিয়ত করা মানে নামাজের নাম, ওয়াক্ত, কিবলা এবং ইমামের অনুসরণের কথা অন্তরে উপস্থিত করা।

তাকবিরে ইফতিতাহর পরে করা নিয়ত সহিহ হয় না এবং সেই নামাজ কবুল হয় না। ফরজ ও ওয়াজিবের নিয়ত করার সময় কোন ফরজ ও কোন ওয়াজিব, তা জানা জরুরি। রাকাতের সংখ্যার নিয়ত জরুরি নয়। সুন্নত আদায়ের সময় “নামাজের” নিয়ত করাই যথেষ্ট। জানাজার নামাজের জন্য এভাবে নিয়ত করা হয়: “আল্লাহর জন্য নামাজের, মহানবীর জন্য দরুদের, মৃতের জন্য দোয়ার নিয়তে উপস্থিত ইমামের অনুসরণ করলাম।”

“যারা গাফিলতির সঙ্গে, গুরুত্ব না দিয়ে নামাজ আদায় করে এবং মানুষের সামনে নিফাক (কপটতা) ও রিয়া (লোক দেখানো মনোভাব) নিয়ে নামাজ আদায় করে নির্জনে তা ছেড়ে দেয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আজাব” মাউন: ৪–৬

পুরুষদের ইমামতি করার জন্য ইমামের নিয়ত করা শর্ত নয়। কিন্তু ইমাম যদি “আমি উপস্থিত জামাআতের ইমাম হলাম” বলে নিয়ত না করেন, তবে তিনি জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের সওয়াব পান না। ইমাম হওয়ার নিয়ত করলে এই সওয়াবও পান। “নারীদের ইমাম হওয়ার” নিয়ত করা ইমামের জন্য জরুরি। ইবাদত করার সময় কেবল মুখে বলাকে নিয়ত বলা হয় না। অন্তরে নিয়ত না করলে ইবাদত কবুল হয় না।

৭. তাকবিরে তাহরিমা

অর্থাৎ “আল্লাহু আকবার” বলে নামাজ শুরু করা। দুই হাত এমনভাবে কান পর্যন্ত তোলা হয়, যেন হাতের তালু কিবলামুখী থাকে। বুড়ো আঙুলের মাথা কানের লতি স্পর্শ করে। “আল্লাহু আকবার” বলার সময় হাত নামানো হয় এবং বলা শেষ হতেই হাত নাভির নিচে বাঁধা অবস্থায় থাকে। নারীরা দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত তুলে তাকবির বলে এবং বুকের ওপর বাম হাত নিচে ও ডান হাত ওপরে রেখে হাত বাঁধে; পুরুষদের মতো কবজি আঁকড়ে ধরে না।

খ) নামাজের রুকনসমূহ

নামাজের ভেতরের ফরজ, অর্থাৎ রুকন পাঁচটি। সেগুলো হলো:

১. কিয়াম

নামাজের পাঁচ রুকনের প্রথমটি কিয়াম। কিয়াম মানে দাঁড়িয়ে থাকা। যে অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়াতে পারে না, সে বসে নামাজ আদায় করবে। যে বসতেও পারে না, সে চিত হয়ে শুয়ে মাথা দিয়ে (ইশারায়) নামাজ আদায় করবে। মুখ আকাশের দিকে না থেকে যেন কিবলার দিকে থাকে, সে জন্য মাথার নিচে বালিশ দেওয়া হয়। সে পা হাঁটু থেকে ভাঁজ করে খাড়া রাখবে, কিবলার দিকে ছড়িয়ে দেবে না। দাঁড়ানো অবস্থায় দুই পায়ের মাঝে চার আঙুল পরিমাণ ফাঁক থাকা উচিত।

২. কিরাআত

সুন্নত ও বিতরের প্রতি রাকাতে এবং একা নামাজ আদায়ের সময় ফরজের দুই রাকাতে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআন থেকে একটি আয়াত পাঠ করা ফরজ। ছোট সূরা পাঠ করা বেশি সওয়াবের।

কিরাআত হিসেবে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজের প্রথম দুই রাকাতে ফাতিহা এবং একটি জম্মে সূরা (অতিরিক্ত সূরা) বা অন্তত ছোট তিনটি আয়াত পাঠ করা ওয়াজিব, আর শেষ দুই রাকাতে ফাতিহা পাঠ করা সুন্নত। ওয়াজিব বিতরের নামাজ ও সুন্নত নামাজের প্রতি রাকাতে ফাতিহার সঙ্গে একটি জম্মে সূরা পাঠ করা ওয়াজিব। ফাতিহাকে সূরার আগে এবং একবার পাঠ করাও ওয়াজিব। ফাতিহা-সংক্রান্ত এই পাঁচ ওয়াজিবের কোনো একটি ভুলে গেলে সাহু সিজদা করতে হয়। কিরাআতে পবিত্র কুরআনের অনুবাদ পাঠ করা জায়েজ নয়। তা মূল রূপে, আরবিতে পাঠ করতে হয়।

৩. রুকু

কিয়ামে কিরাআতের পর তাকবির বলে রুকুতে ঝুঁকতে হয়। রুকুতে পুরুষরা আঙুল ফাঁক করে হাঁটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, পিঠ ও মাথা সোজা রাখে। রুকুতে অন্তত তিনবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” বলা হয় (৩, ৫, ৭, ৯ বা ১১ বার বলা মুস্তাহাব)। রুকুতে হাত ও পা সোজা রাখা হয়। নারীরা আঙুল ফাঁক করে না। তারা পিঠ, পা ও হাত সোজা রাখে না।

রুকু থেকে কাওমার জন্য ওঠার সময় “সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলা ইমাম ও একা নামাজ আদায়কারীর জন্য সুন্নত। মুক্তাদিরা এটি বলে না। এর পরপরই “রাব্বানা লাকাল হামদ” বলা হয় এবং কাওমায় সোজা হয়ে দাঁড়ানো হয়; তারপর “আল্লাহু আকবার” বলে সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে ডান হাঁটু, তারপর বাম হাঁটু, তারপর ডান হাত, তারপর বাম হাত, তারপর নাক ও ললাট মাটিতে রাখা হয়।

৪. সিজদা

সিজদায় অন্তত তিনবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” বলা হয় (৩, ৫, ৭, ৯ বা ১১ বার বলা মুস্তাহাব)। হাতের আঙুলগুলো পরস্পর মিলিত, কিবলামুখী ও কান বরাবর থাকবে, আর মাথা থাকবে দুই হাতের মাঝে। ললাট পবিত্র জায়গায়, অর্থাৎ পাথর, মাটি, কাঠ বা বিছানো কাপড়ের ওপর রাখা ফরজ, আর এর সঙ্গে নাকও রাখা ওয়াজিব বলা হয়েছে। বিনা ওজরে কেবল নাক রাখা জায়েজ নয়। কেবল ললাট রাখা মাকরুহ।

দুই পা, অথবা অন্তত প্রতিটি পায়ের একটি করে আঙুল মাটিতে রাখা ফরজ অথবা ওয়াজিব। অর্থাৎ দুই পা মাটিতে রাখা না হলে নামাজ কবুল হয় না অথবা মাকরুহ হয়। সিজদায় পায়ের আঙুলগুলো ভাঁজ করে সেগুলোর মাথা কিবলার দিকে ফেরানো সুন্নত।

পুরুষরা বাহু ও ঊরু পেট থেকে আলাদা রাখে। দুই হাত ও দুই হাঁটু মাটিতে রাখা সুন্নত। কিয়ামে দুই গোড়ালি পরস্পর থেকে চার আঙুল পরিমাণ দূরে রাখা এবং রুকু, কাওমা ও সিজদায় মিলিয়ে রাখা সুন্নত। সিজদায় যাওয়ার সময় প্যান্টের পায়ের অংশ ওপরে টেনে তোলা মাকরুহ, আর তা ওপরে তুলে গুটিয়ে নামাজে দাঁড়ানোও মাকরুহ। আস্তিন, পায়জামার পা বা পোশাকের প্রান্ত গোটানো, ভাঁজ করা বা খাটো অবস্থায় নামাজ আদায় করা মাকরুহ। অলসতাবশত অথবা মাথা ঢেকে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব না ভেবে খালি মাথায় নামাজ আদায় করা মাকরুহ। আর নামাজকে গুরুত্ব না দেওয়া কুফর। ময়লা পোশাক ও কাজের পোশাক পরে নামাজ আদায় করাও মাকরুহ।

৫. কাদায়ে আখিরা (শেষ বৈঠক)

শেষ রাকাতে “আত্তাহিয়্যাতু” পাঠ করা যায় এমন পরিমাণ সময় বসা ফরজ। বসার সময় হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করা হয় না। পুরুষরা বাম পা আঙুলের মাথা ডান দিকে ফিরিয়ে মাটিতে বিছিয়ে দেয়। সেই পায়ের ওপর বসে। ডান পা খাড়া রাখে; এর আঙুলগুলো মাটি স্পর্শ করে থাকে, আঙুলের মাথা কিবলার দিকে কিছুটা ভাঁজ হয়ে থাকে। এভাবে বসা সুন্নত। নারীরা তাওয়াররুক করে, অর্থাৎ নিতম্ব মাটিতে রেখে বসে। তাদের ঊরু দুটি পরস্পরের কাছাকাছি থাকে। তারা ডান পা ডান দিক দিয়ে বাইরে বের করে দেয়। বাম পা আঙুলের মাথা ডান দিকে ফেরানো অবস্থায় তাদের নিচে থাকে।

সালাম বৃক্ষের দেশে ছিলেন যাঁরা, সেই
নবীর বন্ধুদের স্মৃতিই কি তোমায় কাঁদায়?
বলো, মদিনার বাতাসই কি তোমায় কাঁদিয়েছে,
নাকি রাতে ইদাম পাহাড়ে চমকে ওঠা বিদ্যুৎ?
কাসিদায়ে বুরদা