আমার প্রিয় নবী

আহলে সুন্নতের আকিদা

মুসলমান হওয়ার প্রথম শর্ত ঈমান আনা। আর সঠিক ঈমান নির্ভর করে আহলে সুন্নতের আকিদা অনুযায়ী বিশ্বাস করার ওপর। বুদ্ধিমান ও বালিগ হওয়ার বয়সে পৌঁছানো প্রত্যেক পুরুষ ও নারীর প্রথম কর্তব্য হলো মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেভাবে বিশ্বাস করেছেন ও জানিয়েছেন, সেভাবে ঈমান আনা। আমাদের নবী একটিমাত্র ঈমানের কথাই জানিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের সবাই তাঁর জানানো অনুযায়ীই বিশ্বাস করেছেন, আকিদায় (বিশ্বাসে) তাঁদের মধ্যে কোনো মতভেদ ছিল না। মহানবীর ইন্তেকালের পর মানুষ সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে শুনে ও জিজ্ঞেস করে ইসলাম শিখেছে। তাঁরা সবাই একই ঈমানের কথা জানিয়েছেন। আহলে সুন্নতের আলেমগণ তাঁদের কিতাবে ঈমানের যে জ্ঞান লিখেছেন, তা শেখা এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস করা জরুরি। কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি নির্ভর করে তাঁদের জানানো বিষয়ে বিশ্বাস করার ওপর। জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে কেবল তারাই, যারা তাঁদের পথে চলে। তাঁদের পথে যারা চলে, তাদের (সুন্নি) অথবা (আহলে সুন্নত) বলা হয়।

এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আমার উম্মত তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে কেবল একটি ফিরকা জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি পাবে, আর বাকিরা ধ্বংস হবে, জাহান্নামে যাবে।” এই তিয়াত্তর ফিরকার প্রত্যেকটিই দাবি করে যে, তারা ইসলামের অনুসরণ করছে, এবং বলে যে, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে বলে যে ফিরকার কথা জানানো হয়েছে, সেটি তাদেরই ফিরকা। সূরা মুমিনুনের ৫৩তম ও সূরা রুমের ৩২তম পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “প্রত্যেক দল নিজেকে সঠিক পথে মনে করে আনন্দিত হচ্ছে।” অথচ এই নানা ফিরকার মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত ফিরকাটির আলামত ও নিদর্শন আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবে জানিয়েছেন: “এই ফিরকায় তারাই আছে, যারা আমার ও আমার সাহাবীগণের চলা পথে রয়েছে।” সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে একজনকেও যে ভালোবাসে না, সে আহলে সুন্নত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর যে আহলে সুন্নতের আকিদায় নেই, সে কাফির অথবা আহলে বিদআত, অর্থাৎ পথভ্রষ্ট হয়।

ঈমানে ও আকিদায় মাজহাব একটিই।

ঈমানে ও আকিদায় হক ফিরকা একটিই, অর্থাৎ মাজহাব একটিই। এই মাজহাব হলো আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মাজহাব। কেননা ইসলাম সকল মানুষকে কেবল একটি ঈমান ও একটি আকিদার আদেশ দেয়।

ঈমান আনার বিষয়গুলোতে কোনো মতভেদ হয় না।

এই ঈমানের মূলনীতি এবং কীভাবে বিশ্বাস করতে হবে, তা স্বয়ং মহানবী আলাইহিস সালাম তাবলিগ করেছেন (পৌঁছে দিয়েছেন)। মানুষকে তাদের এবং সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার খবর যিনি দিয়েছেন, সেই আমাদের নবী আল্লাহ তাআলার প্রতি, তাঁর সৃষ্টির প্রতি এবং তাঁর আদেশ ও নিষেধের প্রতি ঈমান কেমন হবে, তাও জানিয়ে দিয়েছেন। ঈমান আনার বিষয়গুলোতে সাহাবায়ে কেরামের সবার অনুসরণ করা জরুরি। কেননা বিশ্বাস করার বিষয়গুলোতে তাঁদের মধ্যে একটুও মতভেদ নেই। ঈমানের মূল শর্ত হলো আল্লাহ তাআলাকে এবং তিনি যাঁদের ভালোবাসেন তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা এবং তাঁর শত্রুদের শত্রু হওয়া। এ বিষয়ে হযরত মুহাম্মদ মাসুম বলেন, “আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মূসা! আমার জন্য তুমি কী আমল করেছ?’ তিনি বললেন,

‘হে আমার রব! তোমার জন্য নামাজ পড়েছি, রোজা রেখেছি, যাকাত দিয়েছি এবং তোমার জিকির করেছি।’ তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘নামাজ তোমার জন্য বুরহান (দলিল)। রোজা তোমাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল। হাশরের দিন যখন সবাই গরমে পুড়তে থাকবে, যাকাত তখন তোমাকে ছায়া দেবে। আর জিকির সেদিন অন্ধকারে তোমার জন্য নূর হবে। কিন্তু আমার জন্য তুমি কী করেছ?’ হযরত মূসা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমার রব! তোমার জন্য যে আমল, তা কী?’ আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘আমি যাকে ভালোবাসি, তাকে কি তুমি আমার জন্য ভালোবেসেছ, আর আমার শত্রুকে কি শত্রু বলে জেনেছ?’

“আমার উম্মত তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে কেবল একটি ফিরকা জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি পাবে, আর বাকিরা ধ্বংস হবে, জাহান্নামে যাবে” হাদীস শরীফ

হযরত মূসা বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় আমল হলো তাঁর বন্ধুদের ভালোবাসা এবং তাঁর শত্রুদের ভালো না বাসা। অতএব প্রিয়জনের প্রিয়দের ভালোবাসা এবং তার শত্রুদের শত্রু হওয়া ভালোবাসার আলামত। সূরা মুমতাহিনার ৪র্থ আয়াত, যার মর্মার্থ ‘ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীরা কাফিরদের বলেছিলেন: আমরা তোমাদের থেকে এবং তোমাদের মূর্তিগুলো থেকে দূরে; যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো, ততক্ষণ আমাদের মধ্যে শত্রুতা চলতে থাকবে। তাঁদের এই সুন্দর অবস্থা তোমাদের জন্য আদর্শ হওয়া উচিত’, দেখিয়ে দেয় যে, ঈমানদার হওয়ার জন্য এই শত্রুতা শর্ত, আর আল্লাহর শত্রুদের ভালোবাসা ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহর সাহচর্য লাভের মর্যাদায় ভূষিত সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁরা পরস্পরের নয়, কাফিরদের শত্রু ছিলেন। সূরা ফাতহের ২৯তম আয়াত, যার মর্মার্থ ‘তাঁরা কাফিরদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন, পরস্পরের প্রতি দয়ালু ছিলেন’, আমাদের কথাকে প্রমাণ করে।” (হযরত মুহাম্মদ মাসুম, ২৯তম চিঠি)

“কিমিয়ায়ে সাআদাত” গ্রন্থের পঞ্চম মূলনীতিতে লেখা আছে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “ঈমানের ভিত্তি ও সবচেয়ে শক্তিশালী আলামত হলো মুসলমানদের ভালোবাসা এবং যারা মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতা করে, তাদের ভালো না বাসা।” মহান আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালামকে যে ঐশী আদেশ দিয়েছিলেন, তার মর্মার্থ এই: “পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলের সকল সৃষ্টির ইবাদতও যদি তুমি করো, কিন্তু আমার বন্ধুদের ভালো না বাসো এবং আমার শত্রুদের সঙ্গে শত্রুতা না করো, তবে তাতে কোনো লাভ হবে না।” প্রত্যেক মুমিনের উচিত, যারা আল্লাহ তাআলার শত্রু, তাদের ভালো না বাসা, আর যারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরে আছে, তাদের ভালোবাসা। এটা তার কথায় এবং সম্ভব হলে কাজেও প্রকাশ করা উচিত। অবাধ্য গুনাহগার ও প্রকাশ্যে গুনাহকারীদের (ফাসিকদের) সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত নয়; যাদের ফিসক বেশি, তাদের থেকে খুব দূরে থাকা উচিত। জালিমদের থেকে এবং মুসলমানদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে আরও বেশি দূরে থাকা উচিত। তবে যারা কেবল তার নিজের ওপর জুলুম করেছে, তাদের ক্ষমা করা এবং তাদের জুলুমে সবর করা জরুরি, আর তা খুবই উত্তম।1 সঠিক পথ হলো আহলে সুন্নতের আলেমগণের জানানো ঈমান – এ খবর মহানবী দিয়েছেন। সুতরাং আহলে সুন্নতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাই ভাই হওয়া, একে অপরকে ভালোবাসা জরুরি। বিদআতি ফিরকাগুলোকে আহলে সুন্নতের আমলের ক্ষেত্রের চারটি হক মাজহাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। চার মাজহাব একে অপরকে সঠিক পথের অনুসারী বলে জানে এবং একে অপরকে ভালোবাসে। আর বিদআতি ফিরকাগুলো মুসলমানদের টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। এই চারটি হক মাজহাবকে একত্র করা যাবে না – এ কথা ইসলামের আলেমগণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে জানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমলের ক্ষেত্রে মাজহাবগুলোর একত্রীকরণ নয়, বরং আলাদা থাকাই চান। এভাবে তিনি ইসলাম ধর্মকে সহজ করে দেন। “আমার উম্মতের আলেমগণের মধ্যকার মতপার্থক্য রহমত।” এই হাদীস শরীফ জানিয়ে দেয় যে, এমন মতপার্থক্য উপকারী।

আকিদার ক্ষেত্রে অবশ্য আল্লাহ তাআলা ঐক্যের আদেশ দেন। সূরা আলে ইমরানের একশো তিনতম পবিত্র আয়াতের মর্মার্থ: “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না!” হযরত আবুস সাউদ এফেন্দি এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, “আহলে কিতাব যেমন খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছে, তেমনি খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে সঠিক ঈমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না! জাহিলিয়াতের যুগে তোমরা যেমন পরস্পর মারামারি করতে, তেমনি বিভক্ত হয়ো না!” হযরত ইবনে হাজার মাক্কি বলেন, “বিদআতি মানে সেই ব্যক্তি, যার বিশ্বাস আহলে সুন্নতের বিশ্বাস থেকে ভিন্ন। ইসলাম যা পছন্দ করে না, এমন কিছু যে-ই উদ্ভাবন করে, সে-ই বিদআতি হয়ে যায়।” (আল-ফাতাওয়াল হাদিসিয়্যা)। আহলে সুন্নতের আকিদায় যারা বিশ্বাস করে, তারা আহলে সুন্নত; আর যারা বিশ্বাস করে না, তারা বিদআতপন্থী (আহলে বিদআত) অথবা কাফির হয়।

যে মুসলমানরা আহলে সুন্নতের আকিদা অনুযায়ী ঈমান আনে, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এভাবে বিশ্বাসী হওয়ার অনেক শর্ত রয়েছে।

আহলে সুন্নতের আকিদার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

১. ঈমানের ছয়টি শর্তে বিশ্বাস করতে হবে, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও একত্বে, তাঁর কোনো শরিক ও সদৃশ না থাকায়, তাঁর ফেরেশতাগণে, কিতাবসমূহে, নবীগণে, আখিরাতের জীবনে এবং কল্যাণ ও অকল্যাণ, ভালো ও মন্দ আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেন – এতে বিশ্বাস করতে হবে। (এগুলো “আমানতু”-তে বর্ণিত হয়েছে।) ২. আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ কিতাব পবিত্র কুরআন যে আল্লাহ তাআলার কালাম, তা বিশ্বাস করতে হবে। ৩. মুমিন নিজের ঈমানের ব্যাপারে কখনো সন্দেহ করবে না। ৪. আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি ঈমান এনে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে দেখার মর্যাদা লাভকারী সাহাবায়ে কেরামের সবাইকে খুব ভালোবাসতে হবে। তাঁর চার খলিফা, তাঁর নিকটাত্মীয় আহলে বাইত এবং তাঁর সম্মানিত স্ত্রীগণের কারও বিরুদ্ধে কটু কথা বলা যাবে না। ৫. সাহাবায়ে কেরামের সবাই জান্নাতি। (রাফিজিরা বলে, “পাঁচজন ছাড়া বাকি সব সাহাবী কাফির।” অথচ পবিত্র কুরআনে তাঁদের সবাইকে জান্নাতি বলা হয়েছে।)2 ৬. আবু বকর সিদ্দিক সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।

৭. ইবাদতকে ঈমানের অংশ মনে করা যাবে না। আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধে বিশ্বাস করেও অলসতার কারণে যারা তা পালন করে না, সেই মুমিনদের কাফির মনে করা যাবে না। (ওয়াহাবিরা বলে, “আমল ঈমানের অংশ, যে নামাজ পড়ে না এবং হারাম কাজ করে, সে কাফির।”) যারা হারামকে গুরুত্ব দেয় না, হালকাভাবে নেয় এবং ইসলাম নিয়ে উপহাস করে, তাদের ঈমান চলে যায়। ৮. যারা নিজেদের আহলে কিবলা বলে, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের প্রতি বিশ্বাস করেছি বলে দাবি করে, অথচ ভুল আকিদায় রয়েছে, তাদের তাকফির করা, অর্থাৎ তাদের কাফির বলা যাবে না। এ কারণে আহলে কিবলাকে তাকফির করা হয় না, তাদের কাফির বলা হয় না। (কিন্তু ওয়াহাবিরা নিজেদের ছাড়া সবাইকে কাফির বলে।) ৯. প্রকাশ্যে গুনাহ করে বলে জানা যায় না, এমন প্রত্যেক ইমামের পেছনে নামাজ পড়তে হবে। এই বিধান জুমা ও ঈদের নামাজ পড়ানো আমির ও শাসকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১০. মুসলমানরা তাদের ওপরের আমির ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না। খুরুজ, অর্থাৎ বিদ্রোহ করা মানে ফিতনা সৃষ্টি করা, আর তা নানা বিপর্যয় ডেকে আনে। তারা যেন কল্যাণকর কাজ করে, সেজন্য দোয়া করতে হবে, আর ফিসক ও গুনাহের কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য নরম ভাষায় নসিহত করতে হবে। ১১. অজুর সময় পা ধোয়ার পরিবর্তে কোনো ওজর বা জরুরত না থাকলেও ভেজা হাতে একবার চামড়ার মোজার ওপর মাসেহ করা পুরুষ ও নারী – উভয়ের জন্য জায়েজ। খালি পা ও সাধারণ মোজার ওপর মাসেহ করা যায় না। ১২. আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিরাজ রুহ ও দেহ – উভয়সহ হয়েছিল, এ কথা বিশ্বাস করতে হবে। কেননা তিনি তাঁর রুহ মুবারক ও দেহ মুবারক একসঙ্গে নিয়েই মিরাজে গিয়েছিলেন। যারা বলে, “মিরাজ একটি অবস্থা, অর্থাৎ স্বপ্নে ঘটেছিল”, তারা আহলে সুন্নত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৩. ঈমান বাড়েও না, কমেও না। (তার ঔজ্জ্বল্য বাড়ে ও কমে।) ১৪. পবিত্র কুরআন মাখলুক (সৃষ্ট) নয়।

“ঈমানের ভিত্তি ও সবচেয়ে শক্তিশালী আলামত হলো মুসলমানদের ভালোবাসা এবং যারা মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতা করে, তাদের ভালো না বাসা” ইমাম গাজালি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

১৫. আল্লাহ তাআলা স্থান থেকে পবিত্র (মুনাজ্জাহ)। অর্থাৎ কোনো জায়গাকে আল্লাহ তাআলার স্থান বলা ও বিশ্বাস করা সঠিক নয়। (ওয়াহাবিরা বলে, “আল্লাহ আকাশে অথবা আরশে আছেন।” এটা কুফর।) ১৬. কবরের প্রশ্ন ও কবরের আজাব সত্য। কবরে আজাব রুহ ও দেহ – উভয়ের ওপর হবে। কবর জিয়ারত জায়েজ। ইস্তিগাসা, অর্থাৎ নবীগণ ও আউলিয়ার কবরে গিয়ে তাঁদের উসিলায় দোয়া করা এবং তাঁদের কাছে সাহায্য চাওয়া জায়েজ। (ওয়াহাবিরা অবশ্য একে শিরক বলে। এ কারণে তারা সুন্নি ও শিয়াদের মুশরিক, অর্থাৎ কাফির বলে।) ১৭. গায়েব কেবল আল্লাহই জানেন; তিনি চাইলে তাঁর নবীগণ ও আউলিয়াকেও জানিয়ে দেন। ১৮. আউলিয়ার কারামত সত্য। কারামত হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে প্রকাশ পাওয়া অলৌকিক অবস্থা, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নিয়মের বাইরে, অর্থাৎ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে তিনি যা দান ও অনুগ্রহ করেন; আর তা এত অধিক যে, অস্বীকার করা যায় না। ১৯. যাকে হত্যা করা হয়েছে, আর যে আত্মহত্যা করেছে – উভয়েই নিজ নির্ধারিত আয়ুষ্কাল (আজাল) অনুযায়ী মারা গেছে। ২০. নবীগণ গুনাহ করেন না। ২১. বর্তমানকালে চারটি হক মাজহাবের কোনো একটির অনুসারী হওয়া। ২২. নবীগণের মধ্যে প্রথম আদম আলাইহিস সালাম, আর সর্বশেষ মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম। (ওয়াহাবিরা হযরত আদম, হযরত ইদরিস ও হযরত শিসের নবী হওয়াকে অস্বীকার করে। তারা বলে, প্রথম নবী হযরত নূহ। নিজেদের নেতাকে রাসূল (নবী) বলে এমন কিছু দলও বলে, “নবী আসবেন না, কিন্তু রাসূল আসবেন।” এ কারণে “আমি রাসূল” দাবিকারী জিন্দিকদেরও উদ্ভব হয়েছে।) ২৩. শাফায়াত, পুলসিরাত, হিসাব ও মিজানে বিশ্বাস করা। ২৪. রুহ মরে না। কাফির ও মুসলমান মৃতদের রুহ শুনতে পায়। ২৫. কিয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে দাজ্জাল, দাব্বাতুল আরদ, হযরত মাহদির আগমন, হযরত ঈসার আকাশ থেকে অবতরণ, পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় এবং জানানো অন্যান্য কিয়ামতের আলামতে বিশ্বাস করা।

হযরত ইমামে আজম বলেন, “কিয়ামতের আলামতগুলোতে তাবিল (ব্যাখ্যা) ছাড়াই বিশ্বাস করতে হবে।” এক হাদীস শরীফের মর্মার্থ: “পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। তখন সবাই ঈমান আনবে, কিন্তু ঈমান আর কোনো উপকারে আসবে না।” (বুখারি, মুসলিম)

২৬. আখিরাতে আল্লাহ তাআলাকে দেখা যাবে।

২৭. কাফিররা জাহান্নামে চিরকাল থাকবে, আর তাদের আজাব হালকা হবে না, বরং দিন দিন বাড়তেই থাকবে।

২৮. কিয়ামতের দিন নবীগণ এবং সালিহ ও নেককার ব্যক্তিগণ শাফায়াত করবেন। কবরে রুহগুলো জীবিত মানুষের কাজকর্ম ও কথাবার্তা শুনতে পায়।

২৯. পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, সদকা দান, এমনকি আমাদের সকল ইবাদতের সওয়াব মৃতদের রুহের প্রতি পাঠালে তা তাদের উপকারে আসে, তাদের আজাব হালকা হওয়ার বা দূর হওয়ার কারণ হয়। এসবের প্রতি বিশ্বাস করা আহলে সুন্নতের আকিদায় থাকার আলামতগুলোর অন্যতম। (এই তথ্যগুলো “ফিকহে আকবর”, “নুখবাতুল লাআলি”, ইমাম রব্বানির “মাকতুবাত”, “রিয়াজুন নাসিহিন” ও “ফারাইদুল ফাওয়াইদ” গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।)

আমলে, অর্থাৎ পালনীয় ইবাদতে হক মাজহাব চারটি। হযরত সাইয়্যিদ আহমদ তাহতাবি “দুররুল মুখতার” গ্রন্থের ওপর লেখা তাঁর হাশিয়ার (টীকার) জাবাইহ (পশু জবাই) অধ্যায়ে বলেন, “আজ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য চার মাজহাবের কোনো একটির অনুসারী হওয়া ওয়াজিব। চার মাজহাবের কোনোটির অনুসারী যে নয়, সে আহলে সুন্নত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর আহলে সুন্নত থেকে যে বিচ্ছিন্ন হয়, সে পথভ্রষ্ট অথবা কাফির হয়।”

ইবনে হাজম, শাওকানি, আবদুহু, রশিদ রিজা, সিদ্দিক হাসানের মতো মাজহাবের শত্রুদের একাংশ তাকলিদকে (মাজহাবের অনুসরণকে) হারাম মনে করে, আর একাংশ তালফিক (মাজহাবের বিধান মিশ্রণ) করে অনেক মুসলমানকে গোমরাহির দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

আকিদা ও আমলে আমাদের মাজহাবের ইমামগণ

যে তাবেয়িন সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে ইসলাম শিখেছেন এবং যে তাবে-তাবেয়িন তাঁদের কাছ থেকে শিখেছেন, তাঁদের মধ্য থেকে দ্বীনি জ্ঞানে উন্নীত হয়ে মুজতাহিদে মুতলাকের স্তরে পৌঁছানো বড় বড় ইমাম গড়ে উঠেছেন।3 তাঁরা আমলের ক্ষেত্রে মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, আর তাঁদের প্রত্যেকের ইজতিহাদ থেকে উৎপন্ন বিধানগুলোকে সেই আলেমের মাজহাব বলা হয়। এই আলেমদের অধিকাংশের মাজহাব কিতাবে লিপিবদ্ধ না হওয়ায় বিস্মৃত হয়ে গেছে। কেবল চারজন মহান ইমামের ইজতিহাদ তাঁদের শিষ্যরা কিতাবে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করেছেন, আর তা মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সকল মুসলমানকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের পথ অপরিবর্তিত ও অবিকৃতভাবে শেখার উপলক্ষ হয়েছেন চারজন মহান ব্যক্তি। তাঁরাই আমলের ক্ষেত্রে আমাদের মাজহাবের ইমাম। প্রথমজন ইমামে আজম আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি ইসলামের আলেমগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠদের অন্যতম। তিনি আহলে সুন্নতের নেতা। দ্বিতীয়জন ইমাম মালিক ইবনে আনাস, তৃতীয়জন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস শাফেয়ি, চতুর্থজন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহমাতুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন)। আজ এই চার ইমামের কোনো একজনেরও অনুসরণ যে করে না, সে বড় বিপদের মধ্যে আছে। সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে।

এই চার ইমামের শিষ্যদের মধ্যে দুজন ঈমানের জ্ঞানে অনেক উঁচু স্তরে পৌঁছান। এভাবে আকিদায় মাজহাব দুটি হলো। পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঈমান হলো এই দুজনের জানানো ঈমান। ফিরকায়ে নাজিয়া (মুক্তিপ্রাপ্ত দল) আহলে সুন্নতের ঈমানের জ্ঞান সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন এই দুজনই। একজন আবু মানসুর মাতুরিদি, অন্যজন আবুল হাসান আলি আশআরি (রহমাতুল্লাহি আলাইহিমা)। এই দুই ইমাম একই ঈমানের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যকার কয়েকটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা এক। ইসলামের আলেমগণের প্রশংসা পবিত্র কুরআনে ও হাদীস শরীফে করা হয়েছে। এক পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি কখনো সমান হতে পারে?”4 আরেক পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “হে মুসলমানগণ! তোমরা যা জানো না, তা যারা জানে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো!”5

“আজ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য চার মাজহাবের কোনো একটির অনুসারী হওয়া ওয়াজিব। চার মাজহাবের কোনোটির অনুসারী যে নয়, সে আহলে সুন্নত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর আহলে সুন্নত থেকে যে বিচ্ছিন্ন হয়, সে পথভ্রষ্ট অথবা কাফির হয়” সাইয়্যিদ আহমদ তাহতাবি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে:

“মানুষকে যে মুসলমানরা কল্যাণ শিক্ষা দেয়, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি রহমত করেন, আর ফেরেশতাগণ ও প্রতিটি প্রাণী তাদের জন্য দোয়া করেন।”

“কিয়ামতের দিন প্রথমে নবীগণ, তারপর আলেমগণ, তারপর শহিদগণ শাফায়াত করবেন।”

“হে মানুষ, জেনে রাখো, ইলম আলেমের কাছ থেকে শুনে শেখা হয়।” “ইলম শেখো। ইলম শেখা ইবাদত। যে ইলম শেখায় এবং যে শেখে, উভয়ের জন্য জিহাদের সওয়াব রয়েছে।”

“ইলম শেখানো সদকা দেওয়ার মতো। আলেমের কাছ থেকে ইলম শেখা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার মতো।”

“ইলম শেখার সওয়াব সকল নফল ইবাদতের চেয়ে বেশি। কেননা তাতে তার নিজেরও উপকার হয়, যাদের সে শেখাবে তাদেরও উপকার হয়।”

“অন্যদের শেখানোর জন্য যে শেখে, তাকে সিদ্দিকদের সওয়াব দেওয়া হয়।”

“ইলম হলো ভান্ডার। তার চাবি হলো জিজ্ঞেস করে শেখা।”

“ইলম শেখো এবং শেখাও।”

“প্রতিটি জিনিসের একটি উৎস আছে। তাকওয়ার উৎস হলো আরিফদের অন্তর।”

“ইলম শেখানো গুনাহের কাফফারা।”

আপাদমস্তক আদব ও লজ্জা,
তাঁর নূর অন্ধকারে আলো,
তিনি খাতামুন নাবিয়্যিন,
আমার প্রিয় নবী।
নবুয়তের উৎস,
রহমতের ঝরনাধারা,
অসহায়দের আশ্রয়,
আমার প্রিয় নবী।
পিঠে তাঁর নবুয়তের মোহর,
তিনি সবচেয়ে স্নেহশীল নবী,
শাফায়াতের উসিলা,
আমার প্রিয় নবী।
হাশরের বিশৃঙ্খলা
মেটাবেন যিনি – একমাত্র আশ্রয়স্থল,
পরজগতের সংবাদদাতা,
আমার প্রিয় নবী।