আমার প্রিয় নবী

মহানবীর কিছু জাওয়াইদ সুন্নত

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেসব কাজ করেছেন, সেগুলো তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ – যেসব কাজ মুসলমানদেরও করা আবশ্যক। এগুলোকে “সুন্নত” বলা হয়। দ্বিতীয় ভাগ – যেসব বিষয় শুধু আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য নির্দিষ্ট। এগুলোকে “খাসাইস” বলা হয়। অন্যদের জন্য এগুলো করা জায়েজ নয়। তৃতীয় ভাগ – প্রথা ও অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এগুলো নিজের বসবাসের এলাকার প্রথা অনুযায়ী পালন করা। প্রথার বিপরীতে করলে ফিতনা সৃষ্টি হয়। আর ফিতনা সৃষ্টি করা হারাম।1

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ইবাদত হিসেবে যেসব কাজ করেছেন, সেগুলো যে ছেড়ে দেয় তাকে যদি তিনি তিরস্কার না করে থাকেন, অর্থাৎ তার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, তাহলে এসব ইবাদতকে “সুন্নতে হুদা” বলা হয়। আর যদি তিনি এগুলো নিয়মিত করে থাকেন, তাহলে এগুলোকে “সুন্নতে মুয়াক্কাদা” বলা হয়। রাসূলুল্লাহ অভ্যাস হিসেবে যেসব কাজ করেছেন, সেগুলোকে “সুন্নতে জায়িদা” বা “মুস্তাহাব” বলা হয়।2 যেমন, ভালো কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা, ডান হাতে করা এবং ঘর নির্মাণে, খাওয়ায়, পানে, বসায়, ওঠায় (শোয়ায়), পোশাকে ও সরঞ্জামে তিনি যা করেছেন ও ব্যবহার করেছেন – এসবই এ ধরনের। পরে উদ্ভাবিত বিষয়কে “বিদআত” বলা হয়। আটার চালনি, চামচ ব্যবহারের মতো “অভ্যাসগত বিদআত”, অর্থাৎ পরে প্রচলিত হওয়া অভ্যাসগুলো পালন করা গোমরাহি (দালালাত) নয়, গুনাহও নয়। এ থেকে বোঝা যায়, টেবিলে খাওয়া, কাঁটাচামচ ও চামচ ব্যবহার করা, খাটে ঘুমানো, সম্মেলনে ও বিদ্যালয়ে নৈতিকতা ও বিজ্ঞানের পাঠে রেডিও, টেলিভিশন ও টেপরেকর্ডার ব্যবহার করা, সব ধরনের যানবাহনে চড়া, চশমা ও হিসাবযন্ত্রের মতো বৈজ্ঞানিক উপকরণ থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ। কেননা এগুলো অভ্যাসগত বিদআত। অভ্যাসগত বিদআত ও নতুন উদ্ভাবনগুলোকে হারাম কাজে ব্যবহার করা হারাম। নামাজে, আজানে এবং মসজিদের ওয়াজ ও খুতবায় রেডিও, মাইক ও টেপরেকর্ডার ব্যবহার সম্পর্কে “Se’âdet-i Ebediyye” ও “İslâm Ahlâkı” গ্রন্থে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। ইবাদতে বিদআত করা, এমনকি সামান্য পরিবর্তন আনাও অত্যন্ত বড় গুনাহ।3 জিহাদ, অর্থাৎ সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইবাদত। কিন্তু যুদ্ধে সব ধরনের বৈজ্ঞানিক উপকরণ ব্যবহার করা বিদআত নয়। বরং তা অনেক বড় সওয়াবের কাজ। কেননা যুদ্ধে সব ধরনের বৈজ্ঞানিক উপকরণ ব্যবহারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ইবাদতের ক্ষেত্রে আদিষ্ট বিষয়গুলো পালনে সহায়ক নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। নিষিদ্ধ বিষয় পালনে সহায়ক নতুনত্ব ও পরিবর্তন আনা বিদআত। যেমন আজান দেওয়ার জন্য মিনারে ওঠা আবশ্যক, কেননা উঁচু স্থানে আজান দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাইকে আজান দেওয়া বিদআত, কেননা যন্ত্র দিয়ে আজান দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়নি। মানুষকে নিজে আজান দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নামাজের সময় জানানো বা অন্য ইবাদত পালনের জন্য ঘণ্টা বাজানো, শিঙা ফোঁকার মতো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষিদ্ধ করেছেন।4

“অভ্যাসগত বিষয়েও রাসূলুল্লাহর অনুসরণ মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক কিছু অর্জন করিয়ে দেয় এবং নানা সৌভাগ্যের পথ খুলে দেয়” মাকতুবাতে রব্বানি, II, ৫ম মাকতুব

“সুন্নতে হুদা” ছেড়ে দেওয়া মাকরুহ। কিন্তু “সুন্নতে জায়িদা” ছেড়ে দেওয়া মাকরুহ নয়।5

পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতায় মহানবীর গুরুত্বারোপ

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি প্রতিটি কাজ ডান দিক থেকে শুরু করতে এবং ডান হাতে করতে ভালোবাসতেন।6 শুধু ইস্তিনজা বাঁ হাতে করতেন।

যথাসম্ভব তিনি প্রতিটি কাজ বেজোড় সংখ্যায় করতেন। তিনি বলতেন, “যার চুল আছে, সে যেন তার যত্ন নেয়!”

আমাদের নবী মসজিদে ছিলেন, এমন সময় এলোমেলো চুল-দাড়ির এক ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করল। আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “এ লোকটির চুল পরিপাটি করার মতো একটু গোলাপ-তেলও কি পাওয়া যায় না?” তারপর তিনি হাতের ইশারায় তাকে তখনই বাইরে গিয়ে চুল-দাড়ি ঠিক করে নিতে বললেন। লোকটি তা-ই করে ফিরে এলে আমাদের নবী বললেন, “তোমাদের কারও এভাবে আসা ভালো, নাকি শয়তানের মতো এলোমেলো চুল-দাড়ি নিয়ে আসা ভালো?”

সফরেও তিনি শিশিতে করে তেল সঙ্গে নিতেন। তেল লাগানোর সময় মাথায় প্রথমে একটি পাতলা কাপড় রাখতেন, তার ওপর টুপি পরতেন। ফলে বাইরে থেকে বোঝা যেত না যে, তিনি তেল লাগিয়েছেন। আমাদের নবী প্রতিদিন দুবার দাড়ি আঁচড়াতেন।

আনাস ইবনে মালিক বলেন, “রাসূল আলাইহিস সালাম প্রায়ই তাঁর চুল মুবারকে গোলাপ-তেল লাগাতেন এবং দাড়ি মুবারক পানি দিয়ে ভিজিয়ে আঁচড়াতেন।”7 মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর দাড়ি মুবারকের দৈর্ঘ্য ও দুই পাশ থেকে সামান্য ছেঁটে নিতেন। জুমার নামাজে যাওয়ার আগে তিনি গোঁফ মুবারক ছোট করতেন এবং নখ মুবারকের বাড়তি অংশ কেটে ফেলতেন। মুসলমানদেরও গোঁফ ছোট করার আদেশ দিতেন।

আমাদের নবী যখনই আয়নার দিকে তাকাতেন, আল্লাহ তাআলার হামদ করতেন এবং দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ! তুমি যেমন আমার আকৃতি সুন্দর করে সৃষ্টি করেছ, তেমনি আমার চরিত্রও সুন্দর করে দাও!”

আমাদের নবী প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে চোখ মুবারকে তিনবার সুরমা লাগাতেন। ডান চোখ মুবারকে তিনবার এবং বাঁ চোখ মুবারকে দুবার সুরমা লাগাতেন। তিনি বলতেন, “সুরমা লাগাও! কেননা তা চোখকে উজ্জ্বল করে এবং চুল (চোখের পাপড়ি) গজাতে সাহায্য করে।”8

ইসলামের আলেমগণ জানিয়েছেন, পুরুষের জন্য চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সুরমা লাগানো জায়েজ, কিন্তু সাজসজ্জার উদ্দেশ্যে লাগানো জায়েজ নয়। জামাল ও জিনাত শব্দ দুটিকে পরস্পরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

জামাল মানে কুশ্রীতা দূর করা, গাম্ভীর্যপূর্ণ হওয়া এবং শোকর আদায়ের উদ্দেশ্যে নিয়ামত প্রকাশ করা। লোক দেখানো ও গর্ব করার জন্য নিয়ামত প্রকাশ করা জামাল নয়, বরং অহংকার। রাসূলুল্লাহ মিসওয়াক ব্যবহারকে খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি তা কখনো কাছছাড়া করতেন না। মহানবী বলতেন, “আরাক গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করো!” মিসওয়াক মুখে সুগন্ধ আনে। মহানবী বলেছেন, “এটি আমার এবং আমার আগের নবীগণেরও সুন্নত!”

মহানবী ইরশাদ করেন, “আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে আমি তাদের প্রত্যেক নামাজের জন্য মিসওয়াক ব্যবহারের আদেশ দিতাম!”9 “আমি তোমাদের মিসওয়াক ব্যবহারের জোর উপদেশ দিচ্ছি!”

“মিসওয়াক মুখের পরিচ্ছন্নতা এবং আমার রবের সন্তুষ্টি!” আমাদের প্রিয় নবী ঘরে প্রবেশ করে প্রথম কাজ হিসেবে দাঁত মুবারক মিসওয়াক করতেন। কাছে মিসওয়াক না রেখে তিনি ঘুমাতেন না, আর ঘুম থেকে জেগেও দাঁত মুবারক মিসওয়াক করে দিন শুরু করতেন। রাতে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য উঠেও দাঁত মুবারক মিসওয়াক করতেন।10 আমাদের মা হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন, “নবী আলাইহিস সালাম এমন কোনো রাত বা দিন ঘুমাননি, যার পর জেগে উঠে অজুর আগে মিসওয়াক করেননি!” আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুত্র ইবরাহিম ইন্তেকাল করেছিলেন। দাফনের সময় কবরে রাখা কাঁচা ইটগুলোর একটি বাঁকা হয়ে ছিল। মহানবী নিজে হাত লাগিয়ে তা সোজা করে দিলেন। তিনি জানালেন যে, বাঁকা ইটটি মৃত ব্যক্তির কোনো উপকার বা ক্ষতি করে না, কিন্তু বিশৃঙ্খলা দেখে তাঁর মনে অস্বস্তি লাগে।

মহানবীর সৌভাগ্যের ঘর

আমাদের প্রিয় নবী মদিনায় তাঁর মসজিদ নির্মাণ করানোর সময় মসজিদের পাশে কাঁচা ইটের দুটি কক্ষ নির্মাণ করিয়ে সেগুলোর ছাদ খেজুরগাছের গুঁড়ি ও ডাল দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। মসজিদ শরীফ নির্মাণের সময় আয়েশা ও সাওদার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) জন্য একটি করে কক্ষ তৈরি করা হয়। আমাদের মা হযরত আয়েশার কক্ষের দরজা ছিল মসজিদে যাওয়ার পথের দিকে। আমাদের মা হযরত সাওদার জন্য নির্মিত কক্ষের দরজা ছিল মসজিদের তৃতীয় দরজা – আলে উসমান দরজার দিকে। আমাদের নবী অন্য স্ত্রীদের গ্রহণ করার পর কক্ষের সংখ্যা বেড়ে নয়টি হয়। এগুলো আমাদের মা হযরত আয়েশার কক্ষ ও কিবলার মাঝখানে নির্মিত হয়েছিল। কক্ষগুলোর কোনোটি কাঁচা ইটের, কোনোটি পাথরের তৈরি ছিল। কোনো কোনোটি খেজুরের ডাল দিয়ে (বাগদাদি রীতিতে) তৈরি করে ওপরে কাদামাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল, আর ছাদও খেজুরের ডাল দিয়ে বানানো হয়েছিল। হাসান ইবনে আবিল হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আমি কিশোর বয়সে রাসূলুল্লাহর ঘরগুলোতে প্রবেশ করেছিলাম এবং হাত বাড়িয়ে ছাদ ছুঁতে পেরেছিলাম। রাসূলুল্লাহর কক্ষের ছাউনি ছিল সাইপ্রেস বা জুনিপার কাঠের গুঁড়ির ওপর টানানো পশমের একটি বোনা কাপড় মাত্র।”

ইমাম বুখারি জানিয়েছেন, “রাসূলুল্লাহর ঘরের দরজায় কোনো কড়া ছিল না; ধনুকের মাথা দিয়ে তাতে টোকা দেওয়া হতো।” মুহাম্মদ ইবনে হিলাল ও আতা খুরাসানি আমাদের নবীর স্ত্রীদের কক্ষগুলো দেখেছেন এবং জানিয়েছেন যে, সেগুলো খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি ছিল, আর দরজার জায়গায় কালো পশমের মোটা পর্দা ঝোলানো ছিল। দাউদ ইবনে কাইস কক্ষগুলো নিজ চোখে দেখেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিটি কক্ষের দরজা থেকে পাশের দেয়াল পর্যন্ত প্রস্থ ছিল প্রায় ৬–৭ জিরা11 (৩–৩.৫ মিটার), আর ভেতরের গভীরতা আনুমানিক দশ জিরা (৪.৮ মিটার)। (এক জিরা ৪৮ সেন্টিমিটার।)

“মিসওয়াক মুখের পরিচ্ছন্নতা এবং আমার রবের সন্তুষ্টি!” হাদীস শরীফ

মহানবীর স্ত্রীদের কক্ষগুলো অধিগ্রহণ করে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে খলিফা আবদুল মালিকের লিখিত নির্দেশ যেদিন এসে মদিনায় পড়ে শোনানো হলো, সেদিন বহু মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি; আমাদের নবীর ইন্তেকালের দিনের মতো মদিনাবাসী কান্নায় ভেঙে পড়ল।12

সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিবও এ বিষয়ে নিজের দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি কতই না চাইতাম, সেগুলো যেমন ছিল তেমনই রেখে দেওয়া হোক! তাহলে মদিনাবাসীদের নতুন প্রজন্ম এবং বাইরে থেকে মদিনায় আগতরা দেখতে পেত, রাসূল আলাইহিস সালাম তাঁর জীবনে কী নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন; আর মানুষ প্রচুর ধনসম্পদের প্রতি এবং তা নিয়ে গর্ব করার প্রতি আকৃষ্ট হতো না।”

ঘরের ভেতরে মহানবীর অবস্থা

হযরত হুসাইন বর্ণনা করেন: “আমি আমার পিতার কাছে মহানবীর ঘরের ভেতরের ব্যস্ততা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আমার পিতা এভাবে বর্ণনা করলেন: মহানবী ঘরে প্রবেশের পর থেকে তাঁর সময়কে তিন ভাগে ভাগ করতেন – আল্লাহর ইবাদত, পরিবারের লোকদের কাজ এবং নিজের ব্যক্তিগত কাজ। নিজের জন্য রাখা সময়টুকুও তিনি নিজের ও মানুষের মধ্যে ভাগ করে নিতেন। সে সময় মানুষের মধ্য থেকে কেবল বিশিষ্ট সাহাবীগণ তাঁর কাছে প্রবেশ করতেন। তাঁদের মাধ্যমে তিনি জনগণের কাছে দ্বীনি বিষয়াদি পৌঁছে দিতেন; জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কিছুই নিজের কাছে আটকে রাখতেন না, জমিয়ে রাখতেন না। মহানবীর অভ্যাস ছিল, উম্মতের জন্য রাখা সময় তিনি মর্যাদাবানদের মধ্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের স্তর অনুযায়ী ভাগ করে নিতেন এবং সেই অনুযায়ী তাঁদের নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নিতেন। তাঁদের কারও একটি প্রয়োজন থাকত, কারও দুটি, কারও আরও বেশি। মহানবী তাঁদের দ্বীনি প্রয়োজনগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তাঁদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতেন, তারপর বলতেন, ‘এখানে যারা উপস্থিত, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এসব পৌঁছে দেয়! যে নিজে এসে আমার কাছে তার প্রয়োজন জানাতে পারে না, তোমরা তার প্রয়োজন আমার কাছে পৌঁছে দাও। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি প্রয়োজন জানাতে অক্ষম কারও প্রয়োজন পৌঁছে দেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ পুলসিরাতের ওপর তার পা অবিচল রাখবেন!’

মহানবীর কাছে এসব ছাড়া অন্য কিছুর আলোচনা হতো না, মুখে আনা হতো না। তিনি নিজেও কারও কাছ থেকে এর বাইরে কিছু গ্রহণ করতেন না। মহানবীর সান্নিধ্যে যাঁরা প্রবেশ করতেন, তাঁরা জ্ঞানপিপাসু হয়ে প্রবেশ করতেন, আর বড় আলেম হয়ে, জ্ঞানের স্বাদ আস্বাদন করে এবং অন্যদেরও সেদিকে পথ দেখানোর যোগ্য হয়ে বের হতেন!”

ঘরের বাইরে মহানবীর অবস্থা

হযরত হুসাইন তাঁর পিতা হযরত আলির কাছে মহানবীর ঘরের বাইরের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তা এভাবে বর্ণনা করলেন:

বিশ্বজগতের সরদার বাইরে কথা বলতেন না। কেবল তাঁর কথা যদি মুসলমানদের উপকারে আসত, তাদের পরস্পরের কাছাকাছি আনত, তাদের মধ্যকার বিভেদ ও শীতলতা দূর করত, তবেই কথা বলতেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উত্তম গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে তিনি সম্মান করতেন এবং তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের ওপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন।13 তিনি জনগণকে মন্দ লোক ও মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করতেন, আর নিজেও এমন অবস্থায় পড়া থেকে সতর্ক থাকতেন। কারও প্রতিই তিনি হাসিমুখ ও উত্তম আচরণে কার্পণ্য করতেন না।

সাহাবীগণকে দেখতে না পেলে তিনি তাঁদের খোঁজ করতেন, সাহাবীগণের কাছে তাঁদের মধ্যকার ঘটনাবলি জিজ্ঞেস করতেন। ভালো কাজের প্রশংসা করতেন ও তা মজবুত করতেন, আর মন্দ কাজের নিন্দা করতেন ও তা দুর্বল করে দিতেন। তাঁর প্রতিটি কাজ ছিল মধ্যপন্থী, স্ববিরোধমুক্ত। মুসলমানরা গাফিল হয়ে পড়বে – এই আশঙ্কায় তিনি তাদের সতর্ক করা থেকে বিরত থাকতেন না। তাঁর প্রতিটি অবস্থা ছিল ভারসাম্যপূর্ণ, অপরিবর্তিত। রাসূলুল্লাহর মধ্যে ইবাদত ও আনুগত্যের পূর্ণ যোগ্যতা ছিল। তিনি হকের সীমা লঙ্ঘন করতেন না, আবার তা আদায়ে ত্রুটিও করতেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম।

তাঁর কাছে সাহাবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন তিনি, যাঁর উপদেশ সবচেয়ে ব্যাপক; আর মর্যাদায় সবচেয়ে বড় ছিলেন তিনি, যাঁর অভাবীদের প্রতি সাহায্য ও সদাচরণ সবচেয়ে সুন্দর। বিশ্বজগতের সরদার আল্লাহকে স্মরণ না করে বসতেন না, উঠতেনও না।

মজলিসে তিনি নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করতেন না, এমন করতে নিষেধও করতেন। যেখানেই হোক, বসে থাকা কোনো জামাআতের কাছে গেলে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন না, মজলিসের শেষ প্রান্তে বসতেন এবং মুসলমানদেরও এমন করার আদেশ দিতেন।

তাঁর সঙ্গে যাঁরা বসতেন, তাঁদের প্রত্যেককে তিনি তাঁর প্রাপ্য অংশ দিতেন, এমনভাবে সম্মান করতেন যে, প্রত্যেকেই মনে করতেন, রাসূলুল্লাহর কাছে তাঁর চেয়ে মূল্যবান আর কেউ নেই। তাঁর সঙ্গে যে বসত কিংবা এসে প্রয়োজন জানাত, সে নিজে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি তার সবকিছু সহ্য করতেন।14

কেউ তাঁর কাছে কোনো প্রয়োজন বা অনুরোধ নিয়ে এলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতেন না: হয় দিতেন, নয়তো মিষ্টি ও কোমল কথায় বিদায় দিতেন। তাঁর উত্তম চরিত্র ছিল এত প্রশস্ত যে, তা সকল মানুষকে বেষ্টন করে নিত। তিনি তাদের জন্য স্নেহশীল পিতার মতো ছিলেন। হকের ব্যাপারে তাঁর কাছে সবাই ছিল সমান। মহানবীর মজলিস ছিল জ্ঞান, লজ্জাশীলতা, ধৈর্য ও আমানতের মজলিস।

তাঁর মজলিসে আওয়াজ উঁচু হতো না, কাউকে দোষারোপ করা হতো না, কারও কৃত ত্রুটি ও ভুল প্রকাশ করা হতো না। বিশ্বজগতের সরদারের মজলিসে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা পরস্পর সমকক্ষ ছিলেন; একে অপরের ওপর তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল কেবল তাকওয়ার দিক থেকে। তাঁরা সকলেই ছিলেন বিনয়ী। তাঁরা বড়দের সম্মান করতেন, ছোটদের প্রতি স্নেহ ও দয়া দেখাতেন, অভাবীদের অন্যদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করতেন, অপরিচিত ও বাইরে থেকে আসা লোকদের রক্ষা করতেন ও দেখাশোনা করতেন। মহানবী সবসময় হাসিমুখ ও কোমল স্বভাবের ছিলেন। তাঁর মমতা ও ক্ষমা ছিল অপরিসীম। তিনি কঠোরহৃদয় ছিলেন না। কারও সঙ্গে ঝগড়া করতেন না। কখনো চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন না, মন্দ কথা বলতেন না। কারও দোষ ধরতেন না। কৃপণ ছিলেন না। অপছন্দনীয় বিষয় দেখেও না দেখার ভান করতেন। আশাবাদীকে হতাশ করতেন না, কোনো বিষয়ে নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ্যে জানাতেন না।

রাসূলুল্লাহ তিনটি বিষয় থেকে দূরে থাকতেন:

- মানুষের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ থেকে,

- বেশি কথা বলা থেকে,

“আমি কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে খাবার খাই না” হাদীস শরীফ

- অনর্থক ও বাজে কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে।

তিনটি বিষয়ে তিনি মানুষকেও তাদের নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিতেন:

- কাউকে মুখের ওপরও না, পেছনেও না – কখনো তিরস্কার বা দোষারোপ করতেন না,

- কারও দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াতেন না,

- কারও উদ্দেশে এমন কথা বলতেন না, যা তার জন্য সওয়াব ও কল্যাণের নয়।

মহানবী কথা বলার সময় তাঁর সান্নিধ্যে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা এমনভাবে নিঃশব্দ ও নিশ্চল হয়ে বসে থাকতেন, যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে আছে; তিনি কথা শেষ করে চুপ হলে তাঁরা নিজেদের বক্তব্য বলতেন, কিন্তু তাঁর কাছে কখনো তর্ক বা ঝগড়া করতেন না। মহানবীর কাছে কেউ কথা বললে, তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্যরা চুপ থাকতেন। মহানবীর কাছে সবার শেষে কথা বলা ব্যক্তির কথা আর সবার আগে কথা বলা ব্যক্তির কথার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। তাঁর মজলিসে উপস্থিতরা কোনো কিছুতে হাসলে তিনিও তাঁদের সঙ্গে হাসতেন, কোনো কিছুতে বিস্মিত হলে তিনিও তাঁদের সঙ্গে বিস্মিত হতেন। তাঁর সাহাবীগণও যেন তাঁর মতো আচরণ করেন, সেজন্য তাঁর কাছে আসা অপরিচিত ও বহিরাগতদের কথাবার্তা ও প্রশ্নের রূঢ়তা ও কটুতা তিনি সহ্য করতেন। মহানবী বলতেন, “কোনো অভাবী ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন চাইতে দেখলে প্রয়োজন পূরণে তাকে সাহায্য করো!”

মহানবী বাস্তবের সঙ্গে সংগতিহীন প্রশংসা গ্রহণ করতেন না। হকের সীমা লঙ্ঘন না করা পর্যন্ত তিনি কারও কথায় বাধা দিতেন না। আর যখন কেউ হকের সীমা লঙ্ঘন করত, তখন হয় নিষেধ করে তার কথা থামিয়ে দিতেন, নয়তো মজলিস ছেড়ে উঠে যেতেন। বিশ্বজগতের সরদারের নীরবতা ছিল চারটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত – হিলম (সহনশীলতা), হাজার (সতর্কতা), তাকদির (যথাযথ মূল্যায়ন) ও তাফাক্কুর (চিন্তাভাবনা)। তাঁর তাকদির প্রকাশ পেত মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টি দেওয়া ও সবার কথা সমানভাবে শোনার মধ্যে। তাঁর তাফাক্কুর চোখে পড়ত দুনিয়া ও আখিরাতের বিষয় নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনায়।

হিলম ও ধৈর্য তিনি নিজের মধ্যে একত্র করেছিলেন। দুনিয়ার কোনো কিছুই তাঁকে রাগান্বিত করত না। হাজারের কথা বলতে গেলে, এই স্বভাবের কারণে তাঁর মধ্যে চারটি গুণ একত্র হয়েছিল:

- উত্তমটি গ্রহণ করতেন, যেন তার অনুসরণ করা হয়,

- মন্দ বিষয়গুলো বর্জন করতেন, যেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা হয়,

- নিজের চিন্তা উম্মতের কল্যাণকর বিষয়ে ব্যয় করতেন,

- নিজের সকল প্রচেষ্টা উম্মতের দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে নিয়োজিত করতেন।

বিশ্বজগতের সরদার কোনো কিছুর জবাবে “না!” বলেছেন – এমন কখনো হয়নি। তিনি করতে চান এমন কিছু তাঁর কাছে চাওয়া হলে বলতেন, “ঠিক আছে!” আর করতে চান না এমন কিছু চাওয়া হলে চুপ থাকতেন; তাঁর এই নীরবতা থেকেই বোঝা যেত যে, তিনি তা করতে চান না। তিনি প্রত্যেকের দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের জন্য চেষ্টা করতেন। এক গাজওয়ায় তাঁর কাছে কাফিরদের ধ্বংসের জন্য দোয়া করার অনুরোধ করা হলে তিনি বললেন:

“আমাকে লানত করার জন্য, মানুষ যেন শাস্তি ভোগ করে সেজন্য পাঠানো হয়নি। আমাকে পাঠানো হয়েছে প্রত্যেকের কল্যাণ করার জন্য, মানুষ যেন শান্তি লাভ করে সেজন্য।”

সূরা আম্বিয়ার একশো সাততম আয়াতের মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “আমি তোমাকে জগৎসমূহের জন্য রহমত ও কল্যাণস্বরূপ পাঠিয়েছি।” এজন্য তিনি সবসময় প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য চেষ্টা করতেন। আনাস ইবনে মালিকের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তার সঙ্গে মুসাফাহা করতেন15; সেই ব্যক্তি হাত টেনে না নেওয়া পর্যন্ত মহানবীও হাত টেনে নিতেন না, আর সে মুখ ফিরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত মহানবীও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন না।

হযরত আনাস ইবনে মালিক আরও বর্ণনা করেন: “আমরা মহানবীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি একে অপরের সামনে ঝুঁকে পড়ব?’ তিনি বললেন, ‘না!’ আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমরা কি একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করব?’ তিনি বললেন, ‘না! বরং মুসাফাহা করো!’”16

হযরত বারা ইবনে আজিব বর্ণনা করেছেন, মহানবী ইরশাদ করেন, “দুজন মুসলমান সাক্ষাৎ করে মুসাফাহা করলে পরস্পর থেকে আলাদা হওয়ার আগেই তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়!”

বিশ্বজগতের সরদার সবসময় চিন্তামগ্ন থাকতেন। তাঁর নীরবতা তাঁর কথার চেয়ে দীর্ঘ হতো। রাসূলুল্লাহ অপ্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথা শুরু করার সময় এবং শেষ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করতেন।

তিনি সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ শব্দে কথা বলতেন। রাসূলুল্লাহর কথা সবসময় সত্য ও যথাযথ হতো। রাসূলুল্লাহ কথা বলার সময় বাড়তি শব্দও ব্যবহার করতেন না, কমতিও রাখতেন না। তিনি কারও মনে আঘাত দিতেন না, কাউকে তুচ্ছ করতেন না।

রাসূলুল্লাহ দুনিয়ার জন্য, দুনিয়ার বিষয়ের জন্য রাগ করতেন না। কিন্তু কোনো হক পদদলিত হতে চললে সেই হক আদায় না করা পর্যন্ত কোনো কিছুই তাঁর রাগ থামাতে পারত না।

নিজের ব্যক্তিগত কারণে তিনি কখনো রাগ করতেন না, প্রতিশোধও নিতেন না। কোনো কিছুর দিকে ইশারা করতে হলে আঙুল দিয়ে নয়, পুরো হাত দিয়ে ইশারা করতেন। বিস্মিত হলে হাতের অবস্থান উল্টে দিতেন, অর্থাৎ তালু আকাশের দিকে থাকলে মাটির দিকে, আর মাটির দিকে থাকলে আকাশের দিকে ঘুরিয়ে দিতেন। কথা বলার সময় হাত নাড়তেন, ডান হাত মুবারকের তালু দিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের ভেতরের দিকে আঘাত করতেন। রাগ হলে তৎক্ষণাৎ রাগ ছেড়ে দিতেন এবং তা প্রকাশ করতেন না। আনন্দিত ও প্রফুল্ল হলে চোখ মুবারক বন্ধ করতেন। তাঁর হাসি বড়জোর মুচকি হাসি পর্যন্তই হতো। মুচকি হাসার সময় তাঁর মুবারক দাঁতগুলো মুক্তার দানার মতো দেখা যেত।17

ভালো কাজে ডান দিককে আগে রাখতে ভালোবাসতেন,
অজু হোক বা পোশাক – ত্বরা করতেন সেই দানশীলতার খনি।
ডান কাতে শুতেন তিনি, কিবলার দিকে মুখ রেখে,
প্রতি নিঃশ্বাসে গায়েব দেখতেন সেই দানশীলতার খনি।

“দুজন মুসলমান সাক্ষাৎ করে সালাম বিনিময় ও মুসাফাহা করলে পরস্পর থেকে আলাদা হওয়ার আগেই তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়!” হাদীস শরীফ

তাঁর বিছানা ছিল চামড়ার, বালিশ খেজুরের আঁশে ভরা,
রাতে শুলেও ঘুমাতেন অল্প – সদা জাগ্রত সেই দানশীলতার খনি।
চোখ ঘুমালেও হৃদয় ঘুমাত না, বন্ধুর সঙ্গে থাকত জেগে,
অনাদিকাল থেকে তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন সেই দানশীলতার খনি।

মহানবীর শয়ন ও নিদ্রা

মহানবী বিছানায় ঘুমাতে চাইলে ডান কাত মুবারকের ওপর শুতেন, ডান হাত মুবারক ডান গাল মুবারকের নিচে রাখতেন, তারপর এই দোয়া পড়তেন: “হে আল্লাহ! আমি নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করলাম। আমার মুখ তোমার দিকে ফেরালাম। আমার কাজ তোমার কাছে সঁপে দিলাম। আমার পিঠ তোমার ওপর ভর দিলাম। আমি তোমার আজাবকে ভয় করি, তোমার রহমতের আশা করি। তোমার রহমত ছাড়া আশ্রয়ের আর কোনো স্থান নেই, তোমার আজাব থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।

কেবল তোমার রহমতেই আশ্রয় নেওয়া যায়, আর কেবল তোমার রহমতেই মুক্তি পাওয়া যায়। তুমি যে কিতাব নাজিল করেছ এবং যে নবীকে পাঠিয়েছ, আমি তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি।

হে আমার রব! তোমার নামেই আমি আমার পার্শ্বদেশ মাটিতে রাখলাম। তুমি যদি আমার রুহ নিয়ে আটকে রাখো, তাহলে তার প্রতি তোমার রহমতের আচরণ করো! আর যদি তা ফিরিয়ে দাও, তাহলে যেমন তোমার নেক বান্দাদের হেফাজত করো, তেমনি একেও হেফাজত করো!

হে আল্লাহ! তোমার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি, তোমার নামেই জীবিত হই। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের খাওয়াও, পান করাও, আমাদের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণ করো, আমাদের আশ্রয় দাও, ঠাঁই দাও! তোমার অসীম প্রশংসা করি। কত মানুষ আছে, যাদের প্রয়োজন পূরণ করার কেউ নেই, আশ্রয় দেওয়ারও কেউ নেই! হে আল্লাহ! যেদিন তুমি তোমার বান্দাদের তোমার সামনে একত্র করবে, সেদিন আমাকে তোমার আজাব থেকে রক্ষা করো! হে আল্লাহ! তুমিই আউয়াল (প্রথম)! তোমার আগে কিছুই নেই! তুমিই আখির (শেষ)! তোমার পরে কিছুই নেই! তুমিই জাহির (প্রকাশ্য)! তোমার ঊর্ধ্বে কিছুই নেই!”

ঘুম থেকে জেগে তিনি এই দোয়া পড়তেন: “তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, কেবল তুমিই আছ! আমি তোমার তাসবিহ ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমার গুনাহের ক্ষমা ও তোমার রহমত প্রার্থনা করি।

সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি মৃত্যুর পর আমাদের জীবিত করেছেন। কিয়ামতের দিন আমাদের প্রত্যাবর্তনও তাঁরই কাছে।”18 তারপর তিনি দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও! আমাকে সঠিক পথ দেখানোর পর আমার অন্তরকে বাঁকা করে দিয়ো না! তোমার মহান দরবার থেকে আমাকে রহমতও দান করো! কেননা তুমিই সবচেয়ে বেশি ক্ষমাশীল!” হযরত বারা ইবনে আজিব বর্ণনা করেন: বিশ্বজগতের সরদার আমাকে বললেন,

“যখন তুমি শোয়ার জায়গায় যাবে, নামাজের জন্য যেভাবে অজু করো, সেভাবে অজু করবে! তারপর ডান কাতে শুয়ে বলবে, ‘হে আল্লাহ! আমি নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করলাম। আমার মুখ তোমার দিকে ফেরালাম। আমার পিঠ তোমার ওপর ভর দিলাম। আমি তোমার আজাবকে ভয় করি, তোমার রহমতের আশা করি। তোমার রহমত ছাড়া আশ্রয়ের আর কোনো স্থান নেই, তোমার আজাব থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই! কেবল তোমার রহমতেই আশ্রয় নেওয়া যায়, আর কেবল তোমার রহমতেই মুক্তি পাওয়া যায়। তুমি যে কিতাব নাজিল করেছ এবং যে নবীকে পাঠিয়েছ, আমি তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি!’ সে রাতে মারা গেলে তুমি ইসলামের ফিতরাতের ওপর মারা যাবে। যে এ দোয়া পড়ে এবং সে রাতেই মারা যায়, সে ইসলামের ফিতরাতের ওপর মারা যায়!”

মহানবী ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ রাতে বিছানা ছেড়ে উঠে আবার ফিরে এসে শুতে চাইলে সে যেন বিছানাটি তিনবার ঝেড়ে নেয়। কেননা সে জানে না, তার উঠে যাওয়ার পর কী ঘটেছে, কী এসে বিছানার ওপর জায়গা করে নিয়েছে।” আসহাবে সুফফার অন্যতম আবদুল্লাহ ইবনে তিখফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, “আমি সাহরির সময় মসজিদে পেটের ওপর, অর্থাৎ উপুড় হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছিলাম, এমন সময় কেউ একজন পা দিয়ে আমাকে স্পর্শ করলেন।

– ‘এ কে?’ – তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

– ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে তিখফা’, – আমি উত্তর দিলাম।

তাকিয়ে দেখি, তিনি বিশ্বজগতের সরদার! আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলাম।

– ‘এটি এমন শোয়া, যা মহান আল্লাহ সবচেয়ে অপছন্দ করেন!’ – তিনি বললেন।”19 মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অজু ছাড়া মাটিতে পা রাখতেন না।

রাসূলুল্লাহ শৌচাগার থেকে ফিরে অজু করেননি – এমন কখনো দেখা যায়নি।

মহানবীর চলাফেরা

হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা বর্ণনা করেন: “বিশ্বজগতের সরদার হাঁটার সময় মাটি থেকে প্রাণবন্তভাবে পা তুলতেন, দুই দিকে দোল খেতেন না, লম্বা কদমে চলতেন, উঁচু স্থান থেকে নামার মতো সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে গাম্ভীর্য ও প্রশান্তির সঙ্গে স্বচ্ছন্দে হাঁটতেন।

যেদিকে তাকাতে চাইতেন, পুরোপুরি সেদিকে ফিরে তাকাতেন। এদিক-ওদিক যত্রতত্র তাকাতেন না।

আকাশের দিকে তাকানোর চেয়ে তাঁর মাটির দিকে তাকানো দীর্ঘ হতো।

মাটির দিকেও তাকাতেন চোখের কোণ দিয়ে। পথে তিনি সাহাবীগণের পেছনে পেছনে হাঁটতেন।

কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে প্রথমে তিনিই সালাম দিতেন।”

হযরত আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন: “হাঁটায় বিশ্বজগতের সরদারের চেয়ে দ্রুতগামী কাউকে আমি দেখিনি। তিনি যখন হাঁটতেন, মনে হতো যেন জমিন তাঁর পায়ের নিচে গুটিয়ে আসছে! তাঁর সঙ্গে তাল মেলাতে আমরা প্রাণপণ কষ্ট করতাম। অথচ বিশ্বজগতের সরদার হাঁটার সময় একটুও কষ্ট করতেন না।”20

মহানবীর বসার ধরন

তিনি অধিকাংশ সময় হাঁটু গেড়ে বসতেন। তাঁকে কুরফুসা অবস্থায়, অর্থাৎ হাঁটু খাড়া করে দুই হাতে তা জড়িয়ে ধরে বসতেও দেখা গেছে।21 তিনি কখনো মজলিসে উপস্থিতদের দিকে পা মেলে দিতেন না। সাধারণত কিবলার দিকে মুখ করে বসতেন। তাঁর কাছে মেহমান এলে প্রায়ই নিজের গায়ের আবা বিছিয়ে দিয়ে তাতে তাঁদের বসাতেন। কখনো কখনো মেহমানদের নিজের গদিও দিয়ে দিতেন। হানজালা ইবনে হিজইয়াম বলেছেন, “মহানবীর কাছে গিয়ে দেখলাম, তিনি আসন করে বসে আছেন।” জাবির ইবনে সামুরাও জানিয়েছেন যে, মহানবী ফজরের নামাজ আদায় করার পর সূর্য ওঠা পর্যন্ত নামাজের জায়গায় আসন করে বসে থাকতেন।

“আল্লাহ তাআলার গুণাবলিতে নিজেদের চরিত্র গড়ে তোলো!” হাদীস শরীফ

শারিদ ইবনে সুওয়াইদ বলেন, “মহানবী আমার কাছে এলেন। তখন আমি বাঁ হাত পেছনে রেখে হাতের তালুর অর্ধেকের ওপর ভর দিয়ে বসে ছিলাম। বিশ্বজগতের সরদার বললেন, ’তুমি কি আল্লাহর গজবপ্রাপ্তদের (ইহুদিদের) মতো করে বসছ?’” আবু জুহাইফা বর্ণনা করেন, “মহানবী বলেছেন, ‘আমি কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে খাবার খাই না।’”22

আসন করে, কখনো হাঁটু গেড়ে, কখনো হাঁটু তুলে বসতেন,
প্রকাশ্যে-গোপনে আদবে পূর্ণ ছিলেন সেই দানশীলতার খনি।
তিন আঙুলে খেয়ে তৃপ্তির সঙ্গে আঙুল চেটে নিতেন,
তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন সেই দানশীলতার খনি।
মধু, হালুয়া, লাউ, সিরকা ও সারিদ ভালোবাসতেন, তবু
যবের রুটিও পেট ভরে খাননি সেই দানশীলতার খনি।
ক্ষুধায় কখনো পেট মুবারকে পাথর বাঁধতেন,
“আমার হৃদয় যেন না কাঁপে” – বলতেন সেই দানশীলতার খনি।
সৌভাগ্যের ঘরে মাসের পর মাস চুলা জ্বলত না,
অল্পে তুষ্ট হয়ে খেজুর ও ডালিম খেতেন সেই দানশীলতার খনি।

মহানবীর পানাহার

মহানবী ইরশাদ করেন:

“খাবারের বরকত খাওয়ার আগে অজু করায় এবং খাওয়ার পরে হাত ধোয়ায়!”23

“কেউ যদি হাতে লেগে থাকা গোশত ও চর্বির গন্ধ ও ময়লা না ধুয়ে ঘুমায় এবং তার কোনো বিপদ ঘটে, তাহলে সে যেন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দোষ না দেয়!” “খাবারের বরকত তার মাঝখানে! তোমাদের কেউ খাওয়ার সময় যেন পাত্রের মাঝখান থেকে নয়, কিনারা থেকে খায়, কেননা বরকত তার মাঝখানে নাজিল হয়!” আমাদের মা হযরত আয়েশা বর্ণনা করেন: “বিশ্বজগতের সরদার বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ খেতে বসলে যেন বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে, মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করে। খাওয়া শুরুর আগে এ কথা বলতে ভুলে গেলে যেন বলে, খাবারের শুরু ও শেষের জন্য বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম!’”24

উমাইয়া ইবনে মাখশির বর্ণনা অনুযায়ী, এক লোক বিসমিল্লাহ না বলে খাচ্ছিল।

মহানবী বুঝতে পারলেন যে, সে বিসমিল্লাহ বলেনি। তিনি বললেন, “খাবারের শুরু ও শেষের জন্য বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলো!” লোকটি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বললে মহানবী মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “শয়তান তোমার সঙ্গে খেয়েই যাচ্ছিল। তুমি মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করতেই শয়তান তার পেটে যা ছিল, কিছুই না রেখে বমি করে ফেলে দিল!”

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী ইরশাদ করেন, “তোমাদের কেউ খাওয়ার সময় যেন ডান হাতে খায়। কিছু পান করার সময়ও যেন ডান হাতে পান করে। কেননা শয়তান বাঁ হাতে খায় এবং বাঁ হাতে পান করে!”25

সালামা ইবনে আকওয়া তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন: আশজা গোত্রের বুসর ইবনে রাইয়ুল ইর নামে পরিচিত এক লোককে মহানবী নিজের কাছে বাঁ হাতে খেতে দেখে তাকে বললেন, “ডান হাতে খাও!” লোকটি মিথ্যা বলল, “এর সামর্থ্য আমার নেই, আমি ডান হাতে খেতে পারি না!” তখন মহানবী বললেন, “তোমার যেন সামর্থ্য না হয়! অহংকার ও দম্ভ ছাড়া অন্য কিছুই তাকে ডান হাতে খেতে বাধা দিচ্ছে না!” সেদিনের পর থেকে লোকটি আর কখনো নিজের হাত মুখ পর্যন্ত তুলতে পারল না!26 মহানবী ইরশাদ করতেন, “মহাপরাক্রমশালী ও মহিমাময় আল্লাহ তাআলা সেই বান্দার প্রতি অবশ্যই সন্তুষ্ট হন, যে কোনো খাবার খেয়ে কিংবা কোনো পানীয় পান করে এর জন্য তাঁর প্রশংসা করে!”

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির ওপর বসতেন, খাবারও মাটিতে বসে খেতেন। তিনি ইরশাদ করতেন, “বান্দা যেভাবে বসে, আমি সেভাবে বসি; বান্দা যেভাবে খায়, আমি সেভাবে খাই। আমি তো একজন বান্দা মাত্র! যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়!”27

উমর ইবনে আবি সালামা বলেন, “আমি বিশ্বজগতের সরদারের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা এক শিশু ছিলাম। খাওয়ার সময় আমার হাত খাবারের পাত্রের ভেতরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত। বিশ্বজগতের সরদার আমাকে বললেন, ‘বৎস! বিসমিল্লাহ বলো। ডান হাতে খাও! নিজের সামনে থেকে খাও!’28 এরপর থেকে আমি সবসময় এভাবেই খেয়ে এসেছি।” মহানবী কোনো খাবারকে কখনো তুচ্ছ মনে করেননি, কোনো খাবারের নিন্দা করেননি। কোনো নিয়ামত পছন্দ হলে তার প্রশংসা করতেন না, অপছন্দ হলে তার নিন্দাও করতেন না। কোনো খাবার মনে চাইলে খেতেন, না চাইলে রেখে দিতেন এবং চুপ থাকতেন। সবচেয়ে ছোট নিয়ামতকেও তিনি সম্মান করতেন, কোনো নিয়ামতেরই নিন্দা করতেন না। রাসূলুল্লাহ কখনো “এটা বানাও, ওটা বানাও” বলতেন না। যা থাকত, তা-ই খেতেন। আমাদের মা হযরত আয়েশা বর্ণনা করেন: মহানবী আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করতেন, “তোমার কাছে খাওয়ার মতো কিছু আছে কি?” আমি বলতাম, “না!” তখন তিনি বলতেন, “তাহলে আমি রোজা রাখলাম!”29 হযরত আয়েশা আরও বর্ণনা করেন: “মহানবী মদিনায় আসার পর থেকে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকেরা একটানা তিন রাত গমের রুটি দিয়ে পেট ভরে খাননি।30 বেশির ভাগ সময় তাঁদের খাবার ছিল যবের রুটি আর খেজুর, তাও পরিমাণে বেশি ছিল না। মহানবীর পেটে একই দিনে দুই রকমের খাবার একত্র হয়নি। যেদিন তিনি খেজুর দিয়ে পেট মুবারক ভরিয়েছেন, সেদিন রুটি দিয়ে ভরাননি; আর যেদিন রুটি দিয়ে ভরিয়েছেন, সেদিন খেজুর দিয়ে ভরাননি। এ কথাই আমাকে কাঁদায়!”31

মহানবী হালুয়া ও মধু, রুটির সারিদ, খেজুরের সারিদ এবং শাকসবজির তরকারি পছন্দ করতেন। তাঁর কাছে দুধ এনে পেশ করা হলে তিনি ইরশাদ করতেন, “দুধে দুটি বরকত রয়েছে।”32

“তোমাদের কেউ যখন খায়, সে যেন ডান হাতে খায়। আর যখন কিছু পান করে, তখনও যেন ডান হাতে পান করে। কেননা শয়তান বাঁ হাতে খায় এবং বাঁ হাতে পান করে!” হাদীস শরীফ

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন: বিশ্বজগতের সরদার, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও আমি একসঙ্গে আমার খালা মাইমুনা বিনতে হারিসের ঘরে গেলাম। খালা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের দুধ দিয়ে আপ্যায়ন করব কি?”

বিশ্বজগতের সরদার বললেন, “হ্যাঁ, করো!” খালা গিয়ে একটি পাত্রে দুধ নিয়ে এলেন। বিশ্বজগতের সরদার তা নিয়ে পান করলেন। আমি ছিলাম বিশ্বজগতের সরদারের ডান পাশে, আর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ছিলেন তাঁর বাঁ পাশে। রাসূলুল্লাহ দুধের অবশিষ্টাংশ আমাকে দিয়ে বললেন, “তুমি পান করো। চাইলে খালিদকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁকে দিতেও পারো।”

আমি আরজ করলাম, “আপনার রেখে দেওয়া অবশিষ্টাংশ পান করার ব্যাপারে আমি কখনো কাউকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেব না!” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন:

“আল্লাহ তাআলা যাকে কোনো খাবার খাওয়ান, সে যেন বলে, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিহি ওয়া আতইমনা খাইরান মিনহু’ (হে আল্লাহ! এই খাবারে আমাদের জন্য বরকত দান করো! আমাদের এর চেয়েও উত্তম খাবার খাওয়াও!)।

আর আল্লাহ তাআলা যাকে দুধ পান করান, সেও যেন বলে, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিহি ওয়া জিদনা মিনহু’ (হে আল্লাহ! এই দুধে আমাদের জন্য বরকত দান করো এবং এ থেকে আমাদের প্রতি তোমার দান আরও বাড়িয়ে দাও!)। কেননা দুধ ছাড়া অন্য কোনো কিছুই খাদ্য ও পানীয় – উভয়ের স্থান পূরণ করতে পারে না।”33

মদিনার মুসলমানরা যখন তাঁদের খেজুরগাছে মৌসুমের প্রথম খেজুর দেখতেন, তা মহানবীর কাছে নিয়ে আসতেন। রাসূলুল্লাহ তা হাতে নিয়ে বরকতের দোয়া করার পর সামনে যে শিশুদের দেখতেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটিকে ডেকে তাকে দিয়ে দিতেন। তিনি ইরশাদ করতেন, “যে ঘরে খেজুর নেই, সে ঘরের লোকেরা ক্ষুধার্ত।” মহানবী পাত্রের তলায় লেগে থাকা খাবার খেতে পছন্দ করতেন। তিনি ইরশাদ করতেন, “যে ব্যক্তি কোনো থালায় বা পাত্রে খাবার খাওয়ার পর তা চেটে-মুছে পরিষ্কার করে খায়, সেই পাত্র তার জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করে!” মহানবী এ কথাও ইরশাদ করেছেন বলে বর্ণিত আছে: “হে আবু জর! যখন গোশত রান্না করবে, তার ঝোল বাড়িয়ে দিও এবং প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিও, তা থেকে তাদেরও ভাগ দিও।”34

“প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় যে নিজে পেট ভরে খায়, সে পূর্ণ মুমিন নয়!”

“আল্লাহর ইবাদত করো! মানুষকে খাবার খাওয়াও! সালামের প্রচলন করো, যাতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারো!”35

“একজনের খাবার দুজনের জন্য যথেষ্ট। তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট। চারজনের খাবার আটজনের জন্য যথেষ্ট!”36

হযরত আসমা বিনতে আবি বকর বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রান্না করা খাবারের ফুটন্ত ভাব ও ভাপ চলে না যাওয়া পর্যন্ত তা ঢেকে রাখার পরামর্শ দিতেন এবং ইরশাদ করতেন, “এতেই রয়েছে সবচেয়ে বড় বরকত!” মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচা আবু তালিবের কন্যা হযরত উম্মে হানির ঘরে গেলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কাছে খাওয়ার মতো কিছু আছে কি?” হযরত উম্মে হানি বললেন, “না! শুধু শুকনো রুটির টুকরো আর সিরকা আছে! কিন্তু এগুলো আপনার সামনে পেশ করতে আমার লজ্জা হচ্ছে!” মহানবী বললেন, “ওগুলোই নিয়ে এসো। পানির মধ্যে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দাও। লবণও নিয়ে এসো!” এর ওপর সিরকা ঢেলে খাওয়ার পর তিনি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করলেন এবং ইরশাদ করলেন, “হে উম্মে হানি! সিরকা কতই না উত্তম তরকারি! যে ঘরে সিরকা আছে, সে ঘর তরকারি থেকে বঞ্চিত বলে গণ্য হয় না!”37 তিনি রুটি কখনো তরকারি ছাড়াই খেতেন, কখনো খেজুর, সিরকা, ফল বা ঝোলের সঙ্গে খেতেন, কখনো জয়তুনের তেলে ভিজিয়ে খেতেন। তিনি মুরগি, খরগোশ, উট, হরিণ ও মাছের গোশত, শুকানো গোশত এবং পনিরও খেতেন। গোশতের মধ্যে সামনের পায়ের অংশ পছন্দ করতেন। তা হাত দিয়ে ধরে দাঁতে কামড়ে খেতেন। (ছুরি দিয়ে কেটে খাওয়াও জায়েজ।) বেশির ভাগ সময় দুধ পান করতেন অথবা খেজুর খেতেন। খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে তিনি ভেড়ার গোশত, গোশতের ঝোল, লাউ, মিষ্টান্ন, মধু, খেজুর, দুধ, মালাই, তরমুজ, খরবুজা, আঙুর ও শসা পছন্দ করতেন।38 পানি তিনি ধীরে ধীরে, বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে তিন চুমুকে পান করতেন, শেষে “আলহামদুলিল্লাহ” বলতেন এবং দোয়া করতেন। মহানবী বুয়ুতুস সুকইয়া থেকে আনা মিঠা পানি পান করতেন। বুয়ুতুস সুকইয়া ছিল মদিনা থেকে দুই দিনের পথের দূরত্বে।39 “পানীয়ের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে সুস্বাদু?” – এই প্রশ্নের উত্তরে মহানবী ইরশাদ করেন, “মিঠা ও শীতল পানি!”40

মহানবী ইরশাদ করতেন, “তোমাদের কেউ যখন কিছু পান করে, সে যেন পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস না ফেলে।” খাদ্য ও পানীয়ের ভেতরে নিঃশ্বাস ফেলতে যেমন নিষেধ করতেন, তেমনি সোনা ও রুপার পাত্রে খাওয়া ও পান করতেও নিষেধ করতেন। মহানবী পানি পান করার সময় দুই-তিনবার নিঃশ্বাস নিতেন এবং ইরশাদ করতেন, “এভাবে পান করা বেশি উপকারী এবং পিপাসা বেশি ভালোভাবে মেটায়।” তিনি আরও ইরশাদ করতেন, “তোমাদের কেউ যখন কিছু পান করে, সে যেন এক নিঃশ্বাসে পান না করে।” আরও ইরশাদ করতেন, “উটের মতো এক নিঃশ্বাসে পান কোরো না! দুই বা তিন নিঃশ্বাসে পান করো! পান করার সময় ‘বিসমিল্লাহ!’ বলো, আর পাত্র থেকে মুখ সরানোর পর ‘আলহামদুলিল্লাহ!’ বলো!”41

হযরত নওফল ইবনে মুআবিয়া বর্ণনা করেন: “বিশ্বজগতের সরদার কোনো কিছু পান করার সময় তিনবার নিঃশ্বাস নিতেন। শুরুতে মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলতেন, আর শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর প্রশংসা করতেন।”42

আবু উমামা বাহিলি বর্ণনা করেন, মহানবী ইরশাদ করেন, “মহাপরাক্রমশালী ও মহিমাময় আমার রব যখন মক্কার উপত্যকাকে আমার জন্য সোনায় পরিণত করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন, আমি বললাম, ‘না, হে আমার রব! আমি একদিন পেট ভরে খাব, একদিন ক্ষুধার্ত থাকব। যখন ক্ষুধার্ত থাকব, তোমার কাছে কাকুতি-মিনতি করব এবং তোমার জিকির করব। আর যখন পেট ভরে খাব, তোমার প্রশংসা করব, তোমার শোকর আদায় করব!’”43

খাওয়া-দাওয়ার নিয়মকানুন শেখা ইবাদতের জ্ঞান শেখার আগে আসে। খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়া, ডান হাতে খাওয়া ও ডান হাতে পান করা ছিল রাসূলুল্লাহর অভ্যাস। খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার সময় প্রথমে তরুণেরা ধোবে, খাওয়ার পরে প্রথমে বয়োজ্যেষ্ঠরা ধোবেন।44 থালার কিনারা থেকে খাওয়া, নিজের সামনে থেকে খাওয়া এবং ডান পা খাড়া রেখে বাঁ পায়ের ওপর বসা রাসূলুল্লাহর সুন্নত। খুব গরম জিনিস খাওয়া ও তার ঘ্রাণ নেওয়া উচিত নয়।

“প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় যে নিজে পেট ভরে খায়, সে পূর্ণ মুমিন নয়!” হাদীস শরীফ

খাওয়ার সময় একেবারেই কথা না বলাকে মহানবী সমীচীন মনে করতেন না। এটা অগ্নিপূজকদের রীতি। আনন্দের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

লবণ দিয়ে খাওয়া শুরু করা এবং লবণ দিয়ে শেষ করা রাসূলুল্লাহর সুন্নত, এতে রয়েছে শিফা (আরোগ্য)। ইসলামে সবার আগে যেসব বিদআত দেখা দিয়েছে, তার একটি হলো পেট পুরে খাওয়া। প্রতিদিন গোশত খাওয়া অন্তরে অস্বস্তি সৃষ্টি করে। ফেরেশতারা তা পছন্দ করেন না। আবার গোশত খুব কম খাওয়া চরিত্র নষ্ট করে। দস্তরখান, অর্থাৎ বিছানো কাপড়ের ওপর খাওয়া এবং তা মাটিতে বিছানো উত্তম। দস্তরখান আগে চামড়ার তৈরি হতো। উদ্ভিজ্জ খাবার খুবই ভালো। যে দস্তরখানে উদ্ভিজ্জ খাবার নেই, তাকে বুদ্ধিহীন বৃদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

ইমাম জাফর সাদিক বলেছেন, “যে ব্যক্তি সম্পদ ও সন্তান বেশি হোক বলে কামনা করে, সে যেন উদ্ভিজ্জ খাবার বেশি করে খায়!” প্রথমে দস্তরখানে বসা উচিত, খাবার পরে আনা উচিত।

আমাদের নবী ইরশাদ করেন, “আমি বান্দা। বান্দাদের মতো মাটিতে বসে খাই।”45

ক্ষুধা না লাগলে খাওয়া উচিত নয়, পেট ভরার আগেই উঠে পড়া উচিত, অবাক হওয়ার মতো কিছু না ঘটলে হাসা উচিত নয়। মহানবী ইরশাদ করতেন, “সকল কল্যাণের মূল ক্ষুধা। সকল অনিষ্টের মূল উদরপূর্তি।” ক্ষুধা যত বেশি হয়, খাবারের স্বাদও তত বাড়ে। উদরপূর্তি মানুষকে ভুলোমনা করে। তা অন্তরকে অন্ধ করে দেয় এবং মদ জাতীয় পানীয়ের মতো রক্ত নষ্ট করে। ক্ষুধা বুদ্ধিকে নির্মল করে, অন্তরকে উজ্জ্বল করে। প্রকাশ্যে গুনাহকারী (ফাসিক) ও মন্দ লোকদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা উচিত নয়। ফুটন্ত খাবার ঢেকে রেখে ঠান্ডা করা উচিত।

রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করতেন, “ডান হাতে খাও। ডান হাতে পান করো।” তিন আঙুলে খাওয়া সুন্নত। মহানবী ইরশাদ করেন, “হে আলি! খাবার তিন আঙুলে খাও, কেননা শয়তান দুই আঙুলে খায়।” আমাদের নবী রুটি ডান হাতে নিতেন, তারপর তরমুজ বাঁ হাতে খেতেন। রুটি এক হাতে নয়, দুই হাতে ছেঁড়া উচিত।46 লোকমা ছোট হওয়া উচিত এবং ভালোভাবে চিবানো উচিত। ডানে, বাঁয়ে, ওপরের দিকে না তাকিয়ে নিজের লোকমা ও নিজের সামনের দিকে তাকানো উচিত। মুখ খুব বড় করে খোলা উচিত নয়। দস্তরখানে বসে হাত কাপড়ে বা মাথায় মোছা উচিত নয়। কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় মাথা পেছনের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। দাওয়াত ছাড়া কারও দস্তরখানে বসা উচিত নয়। দস্তরখানে অন্য সবার চেয়ে বেশি খাওয়া উচিত নয়। পেট ভরে গেলে দোয়া করা উচিত, যেন এই তৃপ্তি গুনাহের কাজে ব্যয় না হয়। কিয়ামতের দিন এর কী হিসাব দিতে হবে, তা ভাবা উচিত। ইবাদতের জন্য শক্তি অর্জনের নিয়তে খাওয়া উচিত। ক্ষুধার্ত থাকলেও ধীরে ধীরে খাওয়া উচিত। প্রথমে বয়োজ্যেষ্ঠদের শুরু করা উচিত। তিনবারের বেশি “খাও, খাও” বলে কাউকে বিব্রত করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ অল্প খেতেন এবং বেশি না খাওয়ার ব্যাপারে খুব জোর দিতেন। তিনি ইরশাদ করতেন, “মানুষের অন্তর খেতের ফসলের মতো। খাবার বৃষ্টির মতো। অতিরিক্ত পানি যেমন ফসলকে শুকিয়ে মেরে ফেলে, তেমনি অতিরিক্ত খাবার অন্তরকে মেরে ফেলে। যে বেশি খায়, বেশি পান করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসেন না।”

রাসূলুল্লাহ পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য রাখার পরামর্শ দিতেন। বাকি এক-তৃতীয়াংশ বাতাসের জন্য, অর্থাৎ খালি রাখা – এটি সর্বনিম্ন স্তর। সর্বোত্তম স্তর হলো কম খাওয়া ও কম ঘুমানো। বেশি খাওয়া সকল রোগের মূল, আর কম খাওয়া সকল ওষুধের মূল। মেহমান গৃহকর্তার কাছ থেকে লবণ ও রুটি ছাড়া আর কিছু আশা করবে না। গৃহকর্তা মেহমানের দিকে লোকমা এগিয়ে দেবে। তার হাতে পানি ঢেলে দেবে। মেহমানের পছন্দের জিনিস তার মুখে তুলে দেবে। মেহমান পরিষ্কার জায়গায় যা ফেলে দেয়, তা তুলে তাকে দেবে। ময়লা লেগে গেলে বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য রেখে দেবে। এমন ঘরের বরকত বেড়ে যায়। সেই বরকত নাতি-নাতনিদের পর্যন্ত পৌঁছায়। মাটিতে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে নেওয়া না হলে শয়তান তা খায়।

পাত্রে লেগে থাকা খাবার চেটে-মুছে খাওয়া সুন্নত। শরবত, ঘোল জাতীয় জিনিসের অবশিষ্টাংশে পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে পান করা অনেক সওয়াবের কাজ। থালায় বা গ্লাসে কিছু অবশিষ্ট রেখে দেওয়া জায়েজ। রাসূলুল্লাহ মুমিনের রেখে দেওয়া অবশিষ্ট খাবার খেতে পছন্দ করতেন।

খাওয়ার পর মিসওয়াক ও খিলাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা রাসূলুল্লাহর সুন্নত। এটা পরিচ্ছন্নতা। পরিচ্ছন্নতা ঈমানকে মজবুত করে। খাওয়ার পর গৃহকর্তার জন্য বরকত, রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করা হয়। তারপর বিদায়ের অনুমতি চাওয়া হয়। গৃহকর্তাকেও নিজের ঘরে খাওয়ার দাওয়াত দেওয়া হয়।

খাওয়ার সময় ভয়ংকর ও ঘৃণ্য বিষয়ের কথা বলা উচিত নয়। মৃত্যু বা রোগের প্রসঙ্গ তোলা উচিত নয়। দস্তরখানে আসা খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত নয়। এক লোকমা গেলার আগে দ্বিতীয় লোকমা হাতে নেওয়া উচিত নয়। খাওয়ার মাঝখানে কোনো কিছুর জন্য, এমনকি নামাজের জন্যও দস্তরখান থেকে উঠে যাওয়া উচিত নয়। নামাজ আগেই আদায় করে নেওয়া উচিত। যদি প্রস্তুত খাবার ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং খাওয়ার পরও নামাজ আদায় করার মতো সময় থাকে, তাহলে নামাজের আগে খেয়ে নেওয়া উচিত। খাবার তুলে নেওয়ার পরই দস্তরখান থেকে ওঠা উচিত। রাস্তায়, দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া উচিত নয়। মুখে বা হাতে গোশত ও খাবারের গন্ধ থাকা অবস্থায় শুয়ে পড়া উচিত নয়। শিশুদের হাতও ধুয়ে দেওয়া উচিত। ভরা পেটে শোয়া উচিত নয়। খাদ্যসামগ্রী প্রয়োজন অনুযায়ী মেপে কেনা উচিত, মাপ ছাড়া বেশি কেনা উচিত নয়। নইলে তা অপচয় (ইসরাফ) হয়। খাবার ও পানীয়ের পাত্র ঢাকনাযুক্ত হওয়া উচিত। নদী বা হাউজের ওপর ঝুঁকে সরাসরি মুখ লাগিয়ে পান করা উচিত নয়। বদনা বা কলসির মুখে মুখ লাগিয়েও পান করা উচিত নয়। পেয়ালা বা গ্লাসের ভাঙা জায়গা দিয়ে পান করা উচিত নয়। গ্রীষ্মকালে শীতল পানীয় পান করা উচিত। রাসূলুল্লাহ শীতল শরবত পান করতে পছন্দ করতেন। জমজমের পানি দাঁড়িয়ে পান করা যায়। মুসাফির যেকোনো পানি দাঁড়িয়ে পান করতে পারে বলে বলা হয়েছে। খালি পেটে পানি পান করা উচিত নয়। পানি ধীরে ধীরে চুষে চুষে পান করা উচিত। রাসূলুল্লাহ কেশকেক নামের খাবার পছন্দ করতেন। হারিসা, অর্থাৎ কেশকেক (গম ও গোশত দিয়ে রান্না করা খাবার) রান্নার পদ্ধতি মহানবীকে জিবরাইল আলাইহিস সালাম শিখিয়েছিলেন। হারিসা মানুষকে খুব শক্তিশালী করে। সকল নবী যবের রুটি খেয়েছেন। রাসূলুল্লাহ লাউয়ের হালুয়া, মসুর ডালের ঝোল, শিকারের গোশত ও ভেড়ার গোশত পছন্দ করতেন। ভেড়ার সামনের পা, বুক ও কাঁধের অংশ পছন্দ করতেন। ছাগলছানার কাঁধের গোশত খুব পছন্দ করতেন। ছাগলছানার গোশত সহজে হজম হয়। তা সবার জন্য উপযোগী।47

“সকল কল্যাণের মূল ক্ষুধা। সকল অনিষ্টের মূল উদরপূর্তি” হাদীস শরীফ

নর (মদ্দা) পশুর গোশত মাদি পশুর গোশতের চেয়ে, আর লালচে গোশত সাদা গোশতের চেয়ে সহজে হজম হয়। সহজে হজম হওয়া ও স্বাদের দিক থেকে ভেড়ার গোশত এবং গাভির দুধ সবচেয়ে ভালো।

শিকারের গোশতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হরিণের গোশত। খরগোশের গোশত হালাল। আমাদের নবী তা খেয়েছেন। তা প্রস্রাব বাড়ায়, বেশি খেলে অনিদ্রা ঘটায়। তা সবার জন্য উপযোগী। পাখি ও মুরগির বাচ্চার গোশত সবার জন্য ভালো। গৃহপালিত পাখির মধ্যে গোশতের দিক থেকে সবচেয়ে উত্তম মুরগি।

আমাদের নবী ইরশাদ করেন, “সিরকা কতই না উত্তম খাদ্য!” সিরকা সবচেয়ে উপকারী খাবার। খেজুরও তরকারির মতো খাবার, অর্থাৎ তা রুটির সঙ্গে খাওয়া হয়। আঙুর তরকারিও, আবার ফলও। আঙুর রুটির সঙ্গে খাওয়া সুন্নত। খেজুর বেজোড় সংখ্যায় খাওয়া সুন্নত। কিশমিশ, আখরোট ও বাদাম খাওয়া সুন্নত। মধুতে শিফা রয়েছে। সত্তরজন নবী মধুর জন্য বরকতের দোয়া করেছেন। রাসূলুল্লাহ খেজুর খুব পছন্দ করতেন। তিনি খেজুর খরবুজা ও তরমুজের সঙ্গে মিলিয়ে খেতেন। খরবুজা ও তরমুজ কিডনি পরিষ্কার করে, মাথাব্যথা দূর করে। পেটের কৃমি বের করে দেয়। চোখের শক্তি বাড়ায়। পোলাও খাওয়ার সময় দরুদ শরীফ পড়া উচিত। মহানবী খোসাসহ শিমের বিচি খাওয়ার প্রশংসা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, “হাব্বাতুস সাওদা, অর্থাৎ কালোজিরা সকল রোগের ওষুধ।” আখরোট পনিরের সঙ্গে খাওয়া শিফা। এগুলো আলাদা আলাদা খাওয়া ক্ষতিকর। অন্য কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়া উচিত। মহানবী আঙুরের থোকা বাঁ হাতে নিতেন, আঙুর ডান হাতে খেতেন।48 সফরজল অন্তরের অস্বস্তি দূর করে। প্রতিটি খরবুজা, তরমুজ ও ডালিমে জান্নাতের পানির এক ফোঁটা রয়েছে। ডালিম একা একা খাওয়া উচিত, তার এক ফোঁটাও যেন নষ্ট না হয়। ডালিম বুক ধড়ফড়ানির জন্য উপকারী। তা পাকস্থলীকে শক্তিশালী করে। শাঁসসহ চিপে রস পান করলে পিত্ত বের করে দেয়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ডুমুর অন্তরে প্রশান্তি দেয়। তা ঘাড় ও পিঠের ব্যথা এবং পরিপাকতন্ত্রের ব্যথা দূর করে।

কাঁচা শসা লবণ দিয়ে খাওয়া এবং আখরোট খেজুর ও মধুর সঙ্গে খাওয়া রাসূলুল্লাহর সুন্নত।49 আমাদের নবী বেগুনের প্রশংসা করেছেন এবং ইরশাদ করেছেন, “তা জয়তুনের তেল দিয়ে রান্না করো।”

তিনি নুনিয়া শাকেরও প্রশংসা করেছেন। সেলারি ভুলোমনা ভাব দূর করে। প্রস্রাব বাড়ায়। রক্ত ও দুধ তৈরি করে। যকৃৎ পরিষ্কার করে। হারশাফ, অর্থাৎ আর্টিচোক পিত্তথলির পাথর গলিয়ে দেয়, রক্ত পরিষ্কার করে, ধমনির কাঠিন্যে উপকার করে। ঘামের দুর্গন্ধও দূর করে। কেউ নতুন কোনো দেশে এলে প্রথমে অল্প কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। পেঁয়াজ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। পেঁয়াজের পর সেলারি খেলে তার দুর্গন্ধ দূর হয়। সিতাব পাতা খেলেও গন্ধ দূর হয় বলে বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ জীবনের শেষ যে খাবার খেয়েছিলেন, তাতে পেঁয়াজ ছিল। তিনি ইরশাদ করতেন, “পেঁয়াজ ও রসুন রান্না করে খাও।” এগুলোর গন্ধে ফেরেশতারা কষ্ট পান। মুলা প্রস্রাব বাড়ায়। হজম সহজ করে।

মহানবীর দাড়ি মুবারক ও চুল মুবারক

মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুল মুবারক ও দাড়ির কেশ খুব কোঁকড়ানোও ছিল না, একেবারে সোজাও ছিল না; জন্মগতভাবেই ছিল ঢেউখেলানো। তাঁর চুল মুবারক লম্বা ছিল। প্রথম দিকে তিনি ললাটের ওপর চুল ঝুলিয়ে রাখতেন, পরে চুল দুই ভাগ করে সিঁথি কাটতে লাগলেন। চুল মুবারক কখনো লম্বা রাখতেন, কখনো কেটে ছোট করতেন।

রাসূলুল্লাহর চুল মুবারকের বর্ণনা সম্পর্কে হযরত আনাস ইবনে মালিককে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, “খুব কোঁকড়ানো ছিল না, একেবারে সোজাও ছিল না। এ দুয়ের মাঝামাঝি, মধ্যম ধরনের ছিল। দৈর্ঘ্যে তা কান ও কাঁধের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছাত।”50 হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, “বিশ্বজগতের গৌরব মহানবী তাঁর চুল মুবারক ললাটের ওপর ঝুলিয়ে রাখতেন। পরে চুল মুবারক দুই ভাগ করে সিঁথি কাটতে লাগলেন।”51 আলেমগণ বলেছেন, “চুল দুই দিকে ভাগ করা ফখরে কায়েনাত (বিশ্বজগতের গৌরব) মহানবীর সুন্নত, কেননা পরে তিনি এমনটাই করতেন। ললাটের ওপর ঝুলিয়ে রাখাও জায়েজ, দুই দিকে ভাগ করাও জায়েজ। তবে ভাগ করাই উত্তম।”

আমাদের মা হযরত আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, “মহানবীর চুল মুবারক ’জুম্মা’র চেয়ে ওপরে এবং ’ওয়াফরা’র চেয়ে নিচে ছিল।”52 কাঁধের প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছানো চুলকে “জুম্মা” বলা হয়। আর কানের লতি পর্যন্ত পৌঁছানো চুলকে “ওয়াফরা” বলা হয়। মোটকথা, আমাদের মা হযরত আয়েশার বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর চুল মুবারক এতটা লম্বা ছিল যে, তা কানের লতি মুবারকের নিচে নেমে আসত, কিন্তু কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাত না; অর্থাৎ এ দুয়ের মাঝামাঝি ছিল।

হযরত কাজি ইয়াজ বলেছেন, “এসব বর্ণনার সমন্বয় এভাবে হয়: কানের দিকের চুল মুবারক কানের লতি মুবারক পর্যন্ত পৌঁছাত। আর পেছনের চুল মুবারক কাঁধ মুবারক পর্যন্ত পৌঁছাত।” আলেমগণ আরও বলেছেন, “কোনো বর্ণনায় ‘কান পর্যন্ত নেমে আসত’, আবার কোনো বর্ণনায় ‘কাঁধ মুবারক পর্যন্ত নেমে আসত’ বলার কারণ এই যে, এক সময়ে এক রকম ছিল, অন্য সময়ে অন্য রকম ছিল। সব বর্ণনাই সঠিক। মহানবী কখনো চুল মুবারক লম্বা রাখতেন, তখন তা কাঁধের প্রান্ত পর্যন্ত নেমে আসত। আবার কখনো কেটে ফেলতেন, তখন তা কানের লতি মুবারক পর্যন্ত কিংবা কানের মাঝামাঝি পর্যন্ত থাকত।” পুরুষদের জন্য মাথা মুণ্ডন করা অথবা চুল লম্বা রেখে আঁচড়িয়ে দুই ভাগ করা সুন্নত। অবস্থা, প্রথা ও যুগ অনুযায়ী আমল করা উচিত। চুল পাকানো বা বেণি করা মাকরুহ। নারীদের মতো মুখমণ্ডল মসৃণ করা, নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বনের জন্য দাড়ি কামানো এবং থুতনি কামিয়ে গালের ওপর দাড়ি লম্বা রাখা হারাম।

রাসূলুল্লাহর দাড়ি মুবারকের বর্ণনা সম্পর্কে হযরত আনাস জানান, “মহানবীর দাড়ি মুবারকে সাদা চুল খুবই কম ছিল। তাঁর মাথা মুবারকে ও দাড়ি মুবারকে সাদা চুল সতেরো বা আঠারোটির বেশি ছিল না।”

একদিন হযরত আবু বকর সিদ্দিক আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার চুল পেকে গেছে।” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “আমাকে বুড়ো করে দিয়েছে সূরা হুদ, ওয়াকিয়া, মুরসালাত, নাবা (আম্মা ইয়াতাসাআলুন) ও তাকভির (ইজাশ শামসু কুওয়িরাত)।”53

অর্থাৎ এসব সূরায় জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থার কথা অনেক বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বললেন, “আমার উম্মতের অবস্থা কী হবে – এই দুশ্চিন্তা ও দুঃখে আমার চুল ও দাড়ি পেকে গেছে।” আমর ইবনে শুআইব বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ তাঁর দাড়ি মুবারকের প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য থেকে ছেঁটে নিতেন।” হযরত তিরমিজি বর্ণিত এক হাদীস শরীফে মহানবী ইরশাদ করেছেন, “যে গোঁফ ছোট করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”54 আরেক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা দাড়ি বাড়াও এবং গোঁফ ভালোভাবে ছেঁটে ফেলো।”55 ইবনে আবদুল হাকিম বলেছেন, “গোঁফ ভালোভাবে ছাঁটা উচিত, আর দাড়ি কাটা উচিত নয়। গোঁফ ভালোভাবে ছাঁটার উদ্দেশ্য তা মুণ্ডন করা নয়।” হযরত ইমাম নববি বলেছেন, “গোঁফ ছাঁটার ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো ঠোঁটের কিনারা দেখা না যাওয়া পর্যন্ত ছাঁটা, একেবারে গোড়া থেকে না কেটে ছোট করা।”

“পেঁয়াজ ও রসুন রান্না করে খাও” হাদীস শরীফ

আলেমগণ গোঁফের ওপরের অংশ ছেঁটে দুই পাশের প্রান্ত ঝুলিয়ে রাখাকে মাকরুহ মনে করেছেন। ইবনে উমর বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে মাজুসি (অগ্নিপূজক) সম্প্রদায়ের কথা বলা হলো। তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, ‘তারা গোঁফের প্রান্ত লম্বা রাখে এবং দাড়ি কামিয়ে ফেলে। সুতরাং তোমরা তাদের বিপরীত করো।’”56

আবু উমামা আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আহলে কিতাবরা দাড়ি ছাঁটে আর গোঁফ লম্বা রাখে।” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “তোমরা গোঁফের প্রান্ত ছেঁটে ফেলো এবং দাড়ি বাড়াও।”

আলেমগণ জানিয়েছেন, গোঁফ ছেঁটে ভ্রুর সমান ছোট করা সুন্নত। দাড়ি এক মুষ্টি পরিমাণ লম্বা রাখা এবং এক মুষ্টির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলা সুন্নত। দাড়ি এক মুষ্টির চেয়ে ছোট রাখাও সুন্নত অনুযায়ী নয়। সুন্নতের অনুসরণের নিয়তে ছোট দাড়ি রাখা বিদআত, আর বিদআত হারাম। দাড়ি রাখা সুন্নতে জাওয়াইদ। আমর বিল মারুফের জন্য, জীবিকা অর্জনের জন্য এবং ফিতনা সৃষ্টি হওয়া থেকে বাঁচার জন্য দাড়ি সম্পূর্ণ কামিয়ে ফেলা জায়েজ, এমনকি জরুরিও হয়ে যায়। এগুলো সুন্নত ছেড়ে দেওয়ার জন্য ওজর। কিন্তু ছোট দাড়ি রেখে বিদআত করার জন্য এগুলো ওজর হয় না।

মহানবীর পরিধেয় পোশাক

পরিধান করা জায়েজ এমন পোশাকের মধ্যে তিনি যা পেতেন, তা-ই পরতেন। মোটা কাপড় দিয়ে ইহরামের মতো সেলাইবিহীন কাপড় গায়ে জড়াতেন, তহবন্দ পরতেন, জামা ও জুব্বাও পরতেন। এগুলো সুতি, পশমি বা লোমের তৈরি কাপড়ে বোনা ছিল। বেশির ভাগ সময় সাদা, কখনো সবুজ পোশাক পরতেন। সেলাই করা পোশাকও তিনি পরতেন। জুমা ও ঈদের দিনে, বিদেশি দূতেরা এলে এবং যুদ্ধের সময় তিনি মূল্যবান জামা ও জুব্বা পরতেন। তাঁর পোশাকের রং বেশির ভাগ সময় সাদা হতো। সবুজ, লাল ও কালো রঙের পোশাকও থাকত। তাঁর পোশাক হাত কবজি পর্যন্ত এবং পা মুবারক নলার মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢেকে রাখত। ইমাম তিরমিজি (রাহিমাহুল্লাহু তাআলা) “শামায়েলে শরীফ” গ্রন্থে বলেন, “রাসূলুল্লাহ কামিস, অর্থাৎ জামা পরতে পছন্দ করতেন। তাঁর জামার হাতা কবজি পর্যন্ত লম্বা ছিল। জামার হাতায় ও কলারে কোনো বোতাম ছিল না। তাঁর জুতা ছিল চামড়ার; তাতে একটি ফিতা ও দুটি কিবাল ছিল। কিবাল হলো এমন চামড়ার ফালি, যার এক প্রান্ত ফিতার সঙ্গে আর অন্য প্রান্ত জুতার সামনের মাথায় সেলাই করা থাকে। তা দুই আঙুলের মাঝখান দিয়ে যায়। পোশাক ও জুতা পরার ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতি অনুসরণ করা হয়। প্রচলিত রীতি থেকে সরে যাওয়া খ্যাতির কারণ হয়। খ্যাতি থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। মক্কায় প্রবেশের সময় তাঁর মাথা মুবারকে কালো পাগড়ি বাঁধা ছিল।” বেশির ভাগ সময় সাদা, কখনো কালো মসলিনের কাপড় মাথায় পাগড়ি হিসেবে বাঁধতেন এবং তার প্রান্ত দুই কাঁধের মাঝখানে এক বিঘত পরিমাণ ঝুলিয়ে দিতেন। তাঁর পাগড়ি খুব বড়ও ছিল না, খুব ছোটও ছিল না; প্রায় সাড়ে তিন মিটার লম্বা ছিল। তিনি টুপি ছাড়াই পাগড়ি বাঁধতেন, আবার কখনো পাগড়ি ছাড়া সেলাই করা টুপি পরতেন। মহানবীর সুতি ও লিনেনের সুতায় বোনা, ডোরাকাটা ইয়েমেনি কাপড়ের তৈরি হিবারা নামের একটি পোশাক ছিল। এই পোশাক পরতে তিনি খুব পছন্দ করতেন। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি সাদা পোশাকও ছিল। তিনি ইরশাদ করতেন, “তোমরা তোমাদের পোশাকের মধ্যে সাদা পোশাক পরো! তোমাদের জীবিতরা সাদা পোশাক পরুক। তোমাদের মৃতদেরও সাদা কাফনে মুড়িয়ে দাও! কেননা তা তোমাদের পোশাকের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে সুন্দর!”57

“যে ব্যক্তি খ্যাতি ও লোক দেখানোর জন্য পোশাক পরে, সে তা খুলে না ফেলা পর্যন্ত আল্লাহ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন! কিয়ামতের দিন তিনি তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন!” হাদীস শরীফ

আমাদের নবীকে সবুজ পোশাক পরতেও দেখা গেছে। হযরত আবু রিমসা বর্ণনা করেন, তিনি আমাদের নবীকে ওপরে-নিচে দুই খণ্ডের একটি সবুজ পোশাক পরা অবস্থায় দেখেছেন।58 আমাদের নবী ডোরাকাটা রঙিন হুল্লাও পরতেন। হযরত বারা ইবনে আজিব বলেছেন, “‘লাল (ডোরাকাটা) হুল্লা’ নামের পোশাক পরিহিত, কানের লতি পর্যন্ত চুলওয়ালা মানুষদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের চেয়ে সুন্দর আর কাউকে আমি দেখিনি!”59 আমাদের নবীর একটি লাল জুব্বা ছিল, যা তিনি জুমা ও ঈদের দিনে পরতেন। আমাদের নবীর ইয়েমেনে তৈরি একটি জুব্বাও ছিল। সফরে আমাদের নবী দামেস্কে তৈরি, আস্তিনের মুখ সরু একটি জুব্বা পরতেন। ইরানের শাহরা যে তাইলাসান কাপড় পরত, সেই কাপড়ের তৈরি, কলারে আতলাসের (সাটিনের) একটি টুকরো লাগানো এবং আঁচলের সামনে-পেছনের দুই ফাড়া অংশে ও আস্তিনের ওপর আতলাসের পাড় বসানো একটি জুব্বা আমাদের নবী যুদ্ধে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সময় পরতেন।

হযরত আয়েশার ইন্তেকাল পর্যন্ত এই জুব্বা তাঁর কাছে ছিল, এরপর আসমা বিনতে আবি বকর তা নিয়ে নেন। আমাদের নবীর পরিহিত এই জুব্বা ধোয়া পানি দিয়ে রোগীদের গোসল করানো হতো, আর তারা আরোগ্য লাভ করত।60 দুমাতুল জান্দাল অভিযানে পাওয়া গনিমতের মালের মধ্যে একটি জুব্বা আমাদের প্রিয় নবীর ভাগে পড়েছিল। তার টানা ও পোড়েন – দুটোই রেশমি সুতায় বোনা, কাপড়টি ছিল আতলাসের, আর নকশার জায়গাগুলোতে সোনালি জরি দিয়ে খেজুরপাতা আঁকা ছিল। মহানবী এই জুব্বা পরে মিম্বরে উঠে বসলেন এবং কোনো কথা না বলেই মিম্বর থেকে নেমে এলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাতে হাত বুলাচ্ছিলেন, তাকিয়ে দেখছিলেন, এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছিলেন। মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি এর সৌন্দর্য দেখে অবাক হচ্ছ? এটা কি তোমাদের খুব পছন্দ হয়েছে?” তাঁরা বললেন, “এর চেয়ে সুন্দর পোশাক আমরা কখনো দেখিনি!” আমাদের নবী ইরশাদ করলেন, “যাঁর কুদরতের হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম, জান্নাতে সাদ ইবনে মুআজের রুমালগুলো তোমরা যা দেখছ তার চেয়েও সুন্দর ও মনোরম!”

মহানবী ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি খ্যাতি ও লোক দেখানোর জন্য পোশাক পরে, সে তা খুলে না ফেলা পর্যন্ত আল্লাহ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন! কিয়ামতের দিন তিনি তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন!”

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি খ্যাতি ও লোক দেখানোর জন্য পোশাক পরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে অনুরূপ পোশাক পরাবেন। তারপর তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেবেন!”

হযরত সাহল ইবনে সাদ বলেন, “এক নারী নিজের বোনা পাড়যুক্ত একটি বুরদা61 রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের কাছে নিয়ে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা আমি নিজ হাতে বুনেছি। আপনার মহান সত্তার জন্য হাদিয়া হিসেবে নিয়ে এসেছি।’ রাসূলুল্লাহ তাঁর হাদিয়া কবুল করলেন। তিনি এই বুরদা গায়ে জড়িয়ে আমাদের কাছে বেরিয়ে এলেন। উপস্থিত লোকদের একজন তাতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই বুরদার চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না! এটা কি আমাকে দেবেন?’ রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘আচ্ছা, দেব!’ মসজিদে আমাদের সঙ্গে আলাপ করে নসিহত করার পর তিনি ঘরে ফিরে গেলেন এবং বুরদাটি ভাঁজ করে মুড়িয়ে সেই লোকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। লোকেরা তাঁকে তিরস্কার করে বললেন, ‘তুমি মোটেই ভালো কাজ করোনি! রাসূলুল্লাহ যা পরেছিলেন এবং যা তাঁর প্রয়োজন ছিল, তা-ই তুমি তাঁর কাছে চেয়ে বসলে! তুমিও তো জানো, রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম কোনো প্রার্থীকে কখনো ফিরিয়ে দেন না, খালি হাতে বিদায় করেন না!’ লোকটি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি এটা পরার জন্য চাইনি। আমি চেয়েছি, যেন আমার মৃত্যুর দিন এটা আমার কাফন হয়!’ সত্যিই সেই বুরদা তাঁর মৃত্যুর দিন তাঁর কাফন হয়েছিল।”62 আমাদের নবী কালো পশমি পোশাকও পরেছেন। আমাদের মা হযরত আয়েশা বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের জন্য কালো পশমের একটি পোশাক তৈরি করা হয়েছিল। তা পরে ঘেমে গেলে তিনি পশমের গন্ধ টের পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা গা থেকে খুলে রেখে দিলেন, কেননা তিনি কেবল সুগন্ধই পছন্দ করতেন।” মহানবী ওপরে পরিধেয় কাফতানের আঁচল কেবল নলার মাঝামাঝি পর্যন্ত কিংবা তার চেয়ে একটু নিচে, গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা করার অনুমতি দিতেন; গোড়ালির চেয়েও নিচে, অর্থাৎ মাটিতে ছেঁচড়ে যাওয়ার মতো লম্বা করতে নিষেধ করতেন। তিনি ইরশাদ করতেন, যে পুরুষেরা অহংকার দেখানোর জন্য নিজেদের কাফতান মাটিতে ছেঁচড়ে চলে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।

একদিন মহানবী হযরত জাবির ইবনে সুলাইমকে বললেন, “তোমার কাফতানের আঁচল নলার মাঝামাঝি পর্যন্ত লম্বা করো! তা না পারলে গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা করো! মাটিতে ছেঁচড়ে যাওয়ার মতো লম্বা করা থেকে বেঁচে থেকো! কেননা এটা অহংকারের লক্ষণ। আর আল্লাহ তাআলা অহংকার পছন্দ করেন না!” এ কারণেই আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর কাফতান নলার মাঝামাঝি পর্যন্ত লম্বা করে পরতেন।63

“ইয়েমেনের দিক থেকে রহমতের বাতাস বইছে বলে আমি অনুভব করছি” হাদীস শরীফ

মহানবীর এক পরতের সুতি কাপড়ের একটি জামা ছিল। আমাদের মা হযরত আয়েশা বর্ণনা করেন: হযরত আবু জাহম মহানবীকে ওপরে নকশাকাটা একটি জায়নামাজ হাদিয়া দিয়েছিলেন। একদিন মহানবী এই জায়নামাজে নামাজ পড়ার সময় তাঁর দৃষ্টি মুবারক নকশার ওপর আটকে গেল। সালাম ফিরিয়ে তিনি বললেন, “এটা আবু জাহমের কাছে নিয়ে যাও। একটু আগে এটা নামাজে আমাকে অন্যমনস্ক করে দিয়েছে। সে যেন আমার জন্য নকশাবিহীন সাদামাটা একটি নিয়ে আসে।”

মদিনার মাটি স্যাঁতসেঁতে ও লোনা হওয়ায় মহানবীর ইন্তেকালের পর এই জায়নামাজ তাঁর রওজা মুবারকের তলায় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

হযরত ওয়াইস কারানিকে পাঠানো খিরকা শরীফ

ওয়াইস ইবনে আমির কারনি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাবেয়িনদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি ইয়েমেনের কারন গ্রামের অধিবাসী। মুসলমান হওয়ার পর সারা জীবন তিনি আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রেমে জ্বলে-পুড়ে কাটিয়েছেন, এক মুহূর্তের জন্যও নিজের রবকে ভোলেননি। বন্দেগিতে তিনি এমন স্তরে পৌঁছেছিলেন যে, তাঁর প্রতিটি অবস্থা, প্রতিটি কাজ ও প্রতিটি কথা মানুষের জন্য শিক্ষা ও নসিহত হয়ে উঠেছিল। তিনি কারও কাছ থেকে কষ্ট পাননি, কাউকে কষ্টও দেননি। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ ছিল মহানবীর প্রতি প্রেম, প্রাণপণে নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত এবং মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি মায়ের অনেক খেদমত করে তাঁর নেক দোয়া লাভ করেছিলেন। আমাদের প্রিয় নবীর প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা ও ইসলামের প্রতি তাঁর অনুরাগ মহানবীর মুখে তাঁর প্রশংসার কারণ হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাঝে মাঝে তাঁর চেহারা মুবারক ইয়েমেনের দিকে ফিরিয়ে ইরশাদ করতেন, “ইয়েমেনের দিক থেকে রহমতের বাতাস বইছে বলে আমি অনুভব করছি।” তিনি আরও ইরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ওয়াইসের আকৃতিতে সত্তর হাজার ফেরেশতা সৃষ্টি করবেন, আর তাঁরা ওয়াইসকে নিজেদের মাঝে নিয়ে আরাসাতের ময়দানে যাবেন। তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আর আল্লাহ তাআলা যাকে চান (যাকে জানিয়ে দেন) সে ছাড়া কোনো সৃষ্টিই জানবে না, তাঁদের মধ্যে কোনজন ওয়াইস।” “আমার উম্মতের মধ্যে এমন একজন আছেন, যিনি কিয়ামতের দিন রাবিআ ও মুদার গোত্রের ভেড়াগুলোর লোমের সংখ্যার সমান মানুষের জন্য শাফায়াত করবেন।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি কে?” তিনি বললেন, “আল্লাহর বান্দাদের একজন।” তাঁরা বললেন, “আমরা সবাই তো বান্দা; তাঁর নাম কী?” তিনি বললেন, “ওয়াইস।” তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “তিনি কোথাকার লোক?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “কারনের।” “তিনি কি আপনাকে দেখেছেন?” – এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “চর্মচক্ষে দেখেনি।”

তাঁরা বললেন, “আশ্চর্য! আপনার প্রতি এত প্রেম থাকা সত্ত্বেও তিনি আপনার খেদমতে, আপনার দরবারে ছুটে আসেন না!” রাসূলুল্লাহ বললেন, “দুটি কারণে। প্রথমত, সে নিজের অবস্থার কাছে পরাভূত। দ্বিতীয়ত, আমার দ্বীনের প্রতি তার অনুরাগের কারণে। তার বৃদ্ধা মা আছেন, যিনি ঈমান এনেছেন। তাঁর চোখ দেখতে পায় না, হাত-পা নড়াচড়া করতে পারে না। ওয়াইস দিনের বেলায় উট চরানোর কাজ করে, যে মজুরি পায় তা নিজের ও মায়ের ভরণপোষণে খরচ করে।” তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা কি তাঁকে দেখতে পাব?” হযরত আবু বকরকে তিনি বললেন, “তুমি নিজের সময়ে তাকে দেখতে পাবে না।” আর হযরত উমর ও হযরত আলিকে বললেন, “তোমরা তাকে দেখতে পাবে। তার শরীর লোমশ। তার বাঁ পাঁজরে ও হাতের তালুতে একটি রুপার মুদ্রার সমান সাদা দাগ আছে। এটা শ্বেতী (বারাস) রোগের সাদা দাগ নয়। তার কাছে গেলে আমার সালাম পৌঁছে দিয়ো এবং আমার উম্মতের জন্য দোয়া করতে বোলো।”

হযরত ওয়াইস কারানি (ওয়াইস কারানি) মায়ের ইন্তেকালের পর কারন গ্রাম ছেড়ে কুফা শহরে চলে গেলেন। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তেকাল ঘনিয়ে এলে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার খিরকা আমরা কাকে দেব?” তিনি বললেন, “ওয়াইস কারানিকে দিয়ো।” রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর হযরত উমর ও হযরত আলি কুফায় এলে হযরত উমর বললেন, “হে নজদবাসী! তোমাদের মধ্যে কারন থেকে আসা কেউ আছে কি?” তারা বলল, “জি, আছে।” তিনি তাদের কাছে হযরত ওয়াইস সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তারা বলল, “আমরা তাকে চিনি। আপনারা যেমন মানুষ খুঁজছেন, সে তার চেয়ে অনেক নিচু স্তরের লোক। সে পাগলাটে, নির্বোধ, মানুষ থেকে পালিয়ে বেড়ায়।”

“হে আমার রব! এই খিরকা শরীফের উসিলায়, আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উসিলায় উম্মতে মুহাম্মদির সবাইকে ক্ষমা করে দাও” হযরত ওয়াইস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

খিরকা শরীফ

আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত ওয়াইস কারানিকে (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) যে খিরকা মুবারক হাদিয়া দিয়েছিলেন, পবিত্র রমজান মাসে ইস্তাম্বুলের ফাতিহ এলাকার খিরকা শরীফ মসজিদে তা জিয়ারত করা যায়।

হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “আমি তাঁকেই খুঁজছি; তিনি কোথায়?” তারা বলল, “সে আরনা উপত্যকায় আমাদের উট চরায়, বিনিময়ে আমরা তাকে রাতের খাবার দিই। তার চুল-দাড়ি এলোমেলো, সে শহরে আসে না, কারও সঙ্গে কথা বলে না, মানুষ যা খায় তা খায় না। দুঃখ-আনন্দ কিছুই বোঝে না: মানুষ যখন হাসে, সে তখন কাঁদে; মানুষ যখন কাঁদে, সে তখন হাসে।” হযরত উমর বললেন, “আমি ঠিক তাঁকেই খুঁজছি।” তারা তাঁর থাকার জায়গার বর্ণনা দিল। হযরত উমর ও হযরত আলি তাঁর কাছে গেলেন। তাঁরা তাঁকে নামাজরত অবস্থায় দেখতে পেলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর উটগুলো চরানোর জন্য একজন ফেরেশতাকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। ওয়াইস নামাজ শেষ করে সালাম ফেরালে হযরত উমর উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিলেন। হযরত উমর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার নাম কী?” তিনি বললেন, “আবদুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর বান্দা।” হযরত উমর জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা; আপনার আসল নাম কী?” তিনি বললেন, “ওয়াইস।” হযরত উমর বললেন, “আপনার ডান হাতটি দেখান।” তিনি দেখালে হযরত উমর বললেন:

“মহানবী আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। তিনি তাঁর খিরকা মুবারক আপনার কাছে পাঠিয়ে ওসিয়ত করেছেন, ‘সে যেন এটা নিয়ে পরে এবং আমার উম্মতের জন্য দোয়া করে।’”

ওয়াইস বললেন, “হে উমর! আমি একজন দুর্বল, অক্ষম ও গুনাহগার বান্দা।

ভালো করে দেখুন, এই ওসিয়ত অন্য কারও জন্য নয় তো?” হযরত উমর জবাব দিলেন, “না, হে ওয়াইস! আমরা যাঁকে খুঁজছি, তিনি আপনিই। মহানবী আপনার চেহারা ও গুণাবলি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন।”

এরপর হযরত ওয়াইস খিরকা শরীফটি সসম্মানে গ্রহণ করলেন, চুমু খেলেন, ঘ্রাণ নিলেন, চোখে-মুখে বুলালেন। তিনি অনেকক্ষণ কাঁদলেন এবং “আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন” বলে তাঁদের কাছ থেকে সরে গেলেন। একটু দূরে গিয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অশ্রুসিক্ত চোখে আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করতে এবং উম্মতে মুহাম্মদির ক্ষমার জন্য দোয়া করতে লাগলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে, অনুনয়-বিনয় করে তিনি এভাবে দোয়া করলেন: “হে আমার রব! আমাদের প্রিয় নবী আমার যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তোমার এই দরিদ্র, অক্ষম বান্দার কাছে হযরত উমর ও হযরত আলির মাধ্যমে তাঁর খিরকা শরীফ পাঠিয়েছেন। বলেছেন, সে যেন আমার গুনাহগার উম্মতের জন্য দোয়া করে। হে আমার রব! এই খিরকা শরীফের উসিলায়, আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উসিলায় উম্মতে মুহাম্মদির সবাইকে ক্ষমা করে দাও… ক্ষমা করে দাও, হে আল্লাহ, ক্ষমা করে দাও… হে আল্লাহ…” বহু গুনাহগার মুসলমানকে ক্ষমা করা হয়েছে বলে জানিয়ে দেওয়া হলে তিনি খিরকা শরীফটি সসম্মানে পরিধান করলেন।

ওয়াইস কারানিকে হাদিয়া দেওয়া এই খিরকা শরীফ হাতবদল হয়ে ভান অঞ্চলের ইরিসান বেগদের কাছে পৌঁছায় এবং ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে উসমানি সুলতানদের অন্যতম সুলতান দ্বিতীয় ওসমান খানের কাছে এনে হাদিয়া দেওয়া হয়। সুলতান আবদুল মাজিদ খান এই খিরকা শরীফের জন্য ফাতিহ এলাকায় “খিরকা শরীফ মসজিদ” নির্মাণ করেন। আমাদের প্রিয় ও মর্যাদাবান নবীর দেহ মুবারকের গোলাপের সুবাস আজও একই সজীবতায় ধারণ করে আছে মধুর ফেনার মতো মালাই রঙের এই খিরকা শরীফ। প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে কাচের আবরণের ভেতরে রেখে তা জনসাধারণকে জিয়ারত করানো হয়।

হযরত কাব ইবনে জুহাইরকে দেওয়া খিরকায়ে সাআদাত

এক কবি পরিবারের সন্তান হযরত কাব ইবনে জুহাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেও কবি ছিলেন। আগে সে মহানবী ও ইসলামের বিরুদ্ধে কবিতা রচনা করত। মহানবীকে এ খবর জানানো হলে তিনি নির্দেশ দিলেন, তাকে যেখানেই দেখা যাবে, সেখানেই যেন হত্যা করা হয়।

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোনো ইলাহ নেই। মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম তাঁর বান্দা ও রাসূল” কাব ইবনে জুহাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

তাঁর ভাই হযরত বুজাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আগেই মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি চিঠি লিখে তাঁকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানালেন এবং লিখলেন, কাব মুসলমান হলে রহমতের সাগর আমাদের প্রিয় নবী তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন। চিঠি পড়ে হযরত কাব গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। মূর্তিপূজার অসারতা, ইসলামের মহত্ত্ব এবং মহানবীর মর্যাদা তিনি উপলব্ধি করতে লাগলেন, তাঁর অন্তর আলোকিত হতে লাগল। অবশেষে মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নূরানি মদিনার পথ ধরলেন। তিনি মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশংসায় এবং নিজের তওবা করে মুসলমান হওয়ার ঘোষণায় একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করলেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি জুহাইনা গোত্রের এক বন্ধুর সঙ্গে মহানবীর দরবারে হাজির হলেন। মহানবী তখন সাহাবীগণের সঙ্গে আলাপ করছিলেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার আগে হযরত কাব আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাব ইবনে জুহাইর নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মুসলমান হিসেবে নিরাপত্তা চাইতে এসেছে। আমি যদি তাকে আপনার কাছে নিয়ে আসি, আপনি কি তাকে নিরাপত্তা দিয়ে তার ইসলাম গ্রহণ কবুল করবেন?” মহানবী বললেন, “হ্যাঁ।” তখন হযরত কাব বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোনো ইলাহ নেই। মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।” মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?” তিনি আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কাব ইবনে জুহাইর।” আনসারদের একজন বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিন, আপনার বিরোধিতাকারী এই লোকটির গর্দান উড়িয়ে দিই।” তখন মহানবী বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও। সে নিজের আগের অবস্থার জন্য অনুতপ্ত হয়ে হকের দিকে ফিরে এসেছে।” এরপর কাব ইবনে জুহাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর বিখ্যাত কাসিদা আবৃত্তি করলেন, যাতে তিনি নিজের মুসলমান হওয়ার কথা এবং আমাদের প্রিয় নবী ও সাহাবায়ে কেরামের মহত্ত্ব ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করেছেন। “বানাত সুআদ / প্রিয়তমা দূরে চলে গেছে” কথাটি দিয়ে শুরু হয়ে এভাবে এগিয়ে চলা এই কাসিদা মহানবীর খুবই পছন্দ হলো:

প্রতিটি মানুষকে একদিন অবশ্যই খাটিয়ায় তুলে বয়ে নেওয়া হবে…
ওজর নিয়ে এসেছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার মহান দরবারে…
তাঁর ক্ষমাই সবচেয়ে বেশি আশা করার মতো জিনিস…
তাঁর দরবারে ওজর কবুল হয়…
আমার প্রতি দয়া করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ…
আমাকে ক্ষমা করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ…
নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ হক তাআলার
অনিষ্ট বিনাশকারী ধারালো তরবারিগুলোর এক কোষমুক্ত তরবারি…
তিনি হিদায়াত ছড়ানো, সঠিক পথ দেখানো এক নূর…

মহানবী তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন। আর কাব যখন এই বয়েতে পৌঁছালেন:

ইন্নার রাসূলা লানূরুন ইউসতাদাউ বিহি,
মুহাম্মাদুন মিন সুয়ুফিল্লাহি মাসলুলু।
রাসূলুল্লাহ এক নূর, যাঁর দ্বারা সৃষ্টি আলোকিত হয়,
তিনি হক তাআলার কোষমুক্ত তরবারিগুলোর এক তরবারি,

তখন দুই জাহানের সরদার, বিশ্বজগতের গৌরব মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কাঁধ মুবারক থেকে “খিরকায়ে সাআদাত” নামে পরিচিত খিরকাটি খুলে হযরত কাব ইবনে জুহাইরের কাঁধে পরিয়ে দিলেন।64

হযরত মুআবিয়া তাঁর খিলাফতকালে কাব ইবনে জুহাইরের কাছে বার্তা পাঠালেন, “রাসূলুল্লাহর খিরকাটি আমাদের কাছে বিক্রি করুন!” তিনি তাঁর কাছে দশ হাজার দিরহাম পাঠালেন। কাব ইবনে জুহাইর এই বলে হযরত মুআবিয়ার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন, “রাসূলুল্লাহর খিরকা পরার ব্যাপারে আমি কাউকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দিতে পারি না!” হযরত কাব ইবনে জুহাইরের ইন্তেকালের পর হযরত মুআবিয়া তা কাবের পুত্রদের কাছ থেকে বিশ হাজার দিরহামে কিনে নেন। আমাদের নবী হযরত কাব ইবনে জুহাইরকে যে খিরকা মুবারক দিয়েছিলেন, তা উত্তরাধিকারসূত্রে এক খলিফা থেকে আরেক খলিফার হাতে যেতে থাকে।

উমাইয়া শাসনের পতনের পর আব্বাসিদের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস সাফফাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ তা তিনশো দিনারে কিনে নেন। ঈদের দিনগুলোতে খলিফারা তা পরিধান করতেন। আব্বাসিরা মিসরে আসার সময় তা সঙ্গে নিয়ে আসে। হযরত ইয়াভুজ সুলতান সেলিম খান মিসর জয় করে খলিফা হলে মিসরে রক্ষিত অন্যান্য “বরকতময় আমানত” সহ এই খিরকা মুবারকও ইস্তাম্বুলে আনা হয়। ইস্তাম্বুলে তোপকাপি প্রাসাদের “খিরকায়ে সাআদাত কক্ষে” সবাই তা জিয়ারত করতে পারে।

এই খিরকা মুবারক ১২৪ সেন্টিমিটার লম্বা, চওড়া হাতাওয়ালা, কালো পশমি কাপড়ের তৈরি। খিরকার ভেতরের দিকে মালাই রঙের পশমি কাপড়ের আস্তর। কয়েকটি বোঁচকায় মুড়িয়ে তা সুলতান তৃতীয় মুরাদের তৈরি করানো, ওপর দিক থেকে খোলা যায় এমন ঢাকনাওয়ালা একটি সোনার সিন্দুকে রাখা আছে। খিরকায়ে সাআদাতের এই সিন্দুক শিল্পকর্ম হিসেবে অসাধারণ, তার ওপর পান্না দিয়েও সজ্জিত। সিন্দুকের ওপর লেখা আছে:

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল লিল আলামিন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল মালিকুল হাক্কুল মুবিন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, আস-সাদিকুল ওয়াদিল আমিন।”

মহানবীর বিছানা

মহানবী যে বিছানায় (শয্যায়) শুয়ে ঘুমাতেন, তার ওপরের আবরণ ছিল চামড়ার। ভেতরে খেজুরগাছের ছালের আঁশ ভরা ছিল। তিনি নিজে এবং তাঁর স্ত্রী এর ওপর শুতেন। আমাদের নবী মাথা মুবারকের নিচে যে বালিশ রাখতেন, তারও ওপরের আবরণ ছিল চামড়ার এবং ভেতরে খেজুরগাছের আঁশ ভরা ছিল। মহানবী দুনিয়া ও দুনিয়ার কোনো কিছুকে গুরুত্ব দিতেন না।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন: বিশ্বজগতের সরদার একটি চাটাইয়ের (হাসিরের) ওপর শুয়ে ঘুমিয়েছিলেন, আর চাটাই তাঁর পাঁজর মুবারকে দাগ ফেলে দিয়েছিল। তিনি জেগে উঠলে আমি তাঁর পাঁজর মুবারকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, “আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমাদের জানাতেন, তাহলে আমরা চাটাইয়ের ওপর আপনার জন্য এমন কিছু বিছিয়ে দিতাম, যা আপনাকে এ থেকে রক্ষা করত!” তারপর আরজ করলাম, “আপনার জন্য একটি নরম বিছানার ব্যবস্থা করে দেব?”

বিশ্বজগতের সরদার বললেন, “দুনিয়ার জিনিস দিয়ে আমার কী প্রয়োজন? দুনিয়ার সঙ্গে আমার দৃষ্টান্ত, আমার অবস্থা তো সেই আরোহীর দৃষ্টান্ত ও অবস্থার মতো, যে একটি গাছের নিচে কিছুক্ষণ ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে তা ছেড়ে আবার নিজের পথে চলে যায়!”65 আমাদের মা হযরত আয়েশা বর্ণনা করেন: আনসারদের এক নারী আমার কাছে এলেন। রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের বিছানা দেখে তিনি চলে গিয়ে ভেতরে পশম ভরা একটি তোশক পাঠিয়ে দিলেন।

রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী?” আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আনসারদের অমুক নারী আমার কাছে এসেছিলেন। আপনার বিছানা দেখে তিনি চলে গিয়ে এটা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।” তিনি বললেন, “এটা এক্ষুনি তাঁকে ফেরত পাঠাও!” কিন্তু আমি ফেরত পাঠালাম না। জিনিসটা আমার ঘরে থাকুক, এটাই আমার ভালো লেগেছিল। রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম এ কথা তিনবার বললেন। শেষে বললেন, “আল্লাহর কসম, হে আয়েশা! আমি চাইলে আল্লাহ সোনা ও রুপার পাহাড় আমার সঙ্গে সঙ্গে চলমান করে দিতেন!”66 নবী আলাইহিস সালামের গদিও ছিল দুটি আবা মাত্র।

“রাসূলুল্লাহ সোনা ও লোহার আংটি খুলিয়ে ফেলতেন, রুপার আংটির ব্যাপারে আপত্তি করতেন না” আমর ইবনে শুআইব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

এক রাতে তিনি যখন আমার কাছে এলেন, আমি এই আবাটি দুই ভাঁজ করে সরু করে রেখেছিলাম। তিনি এর ওপর ঘুমালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “হে আয়েশা! আজ রাতে আমার বিছানা অন্য সময়ের মতো ছিল না কেন?” আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার জন্য এটা ভাঁজ করে সরু করে দিয়েছিলাম।” তিনি বললেন, “তুমি এটা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দাও!”67

আমাদের মা হযরত আয়েশা আরও বর্ণনা করেন: “মক্কায় কুরাইশদের কাছে খাটের (সারিরের) ওপর ঘুমানোর চেয়ে আরামের আর কিছু ছিল না। রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম মদিনায় এসে আবু আইয়ুবের ঘরে উঠলে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু আইয়ুব! তোমাদের কি কোনো খাট নেই?’ আবু আইয়ুব বললেন, ‘আল্লাহর কসম, নেই।’ আনসারদের মধ্যে সাদ ইবনে জুরারা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহর জন্য একটি খাট পাঠালেন, যার পায়াগুলো সেগুন কাঠের তৈরি এবং ওপরটা লিনেনের আঁশে বোনা চাটাই দিয়ে ঢাকা। রাসূলুল্লাহ নিজের ঘরে স্থানান্তরিত হওয়া পর্যন্ত এর ওপরেই ঘুমিয়েছেন, ইন্তেকাল পর্যন্তও এর ওপরেই ঘুমিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামকে গোসল দিয়ে কাফন পরানোর পর তাঁকে এই খাটের ওপর রাখা হয়, আর এই খাটের ওপর রেখেই তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। লোকেরা তাদের মৃতদের বহন করার জন্য আমাদের কাছে এটি চেয়ে নিত এবং এর দ্বারা বরকত লাভ করত। হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের জানাজাও এর ওপরে বহন করা হয়েছিল।”

হযরত আয়েশা বলেন, “রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের একটি চাটাই ছিল, রাতে তিনি তার ওপর নামাজ পড়তেন, আর দিনে তা বিছিয়ে তার ওপর লোকজনের সঙ্গে বসতেন।”68

মহানবীর আংটি

পুরুষদের জন্য কেবল রুপার আংটি হালাল এবং সোনা, লোহা ও পিতলের আংটি পরা হারাম – এ কথা আমাদের নবী জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজেও ইন্তেকাল পর্যন্ত কেবল রুপার আংটিই ব্যবহার করেছেন।

রাসূলুল্লাহ আংটি তাঁর ডান হাত মুবারকে পরতেন। বাঁ হাতে পরতেও তাঁকে দেখা গেছে। ডান হাতে পরাও জায়েজ, বাঁ হাতে পরাও জায়েজ। তা কনিষ্ঠ আঙুলে অথবা তার পাশের আঙুলে পরা হয়। ঈদের দিনে সবার জন্য আংটি পরা মুস্তাহাব। লোক দেখানো ও গর্ব করার জন্য পরা হারাম।

হাবশার নাজাশি আসহামা আমাদের নবীর কাছে যেসব হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন, তার মধ্যে হাবশি পাথরের নগিনাযুক্ত একটি সোনার আংটিও ছিল। আমাদের প্রিয় নবী আবুল আসের কন্যা, নিজের নাতনি হযরত উমামাকে ডেকে বললেন, “মা আমার! এটা তুমি পরো!”69

একদিন হযরত নুমান ইবনে বাশির রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে এলেন। তাঁর আঙুলে ছিল সোনার আংটি। মহানবী বললেন, “জান্নাতে প্রবেশের আগেই জান্নাতের অলংকার কেন ব্যবহার করছ?” এরপর তিনি লোহার আংটি পরলেন। তা দেখে মহানবী বললেন, “জাহান্নামের জিনিস কেন বহন করছ?” তিনি সেটাও খুলে ফেললেন এবং ব্রোঞ্জের আংটি পরলেন। তা দেখে মহানবী বললেন, “তোমার কাছ থেকে মূর্তির গন্ধ পাচ্ছি কেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে কেমন আংটি পরব?” মহানবী বললেন, “রুপার আংটি পরতে পারো। তবে তার ওজন যেন এক মিসকাল (৪.৮ গ্রাম) ছাড়িয়ে না যায়, আর তা ডান হাতে পরো!”

হযরত আমর ইবনে শুআইব বলেন, “রাসূলুল্লাহ সোনা ও লোহার আংটি খুলিয়ে ফেলতেন, রুপার আংটির ব্যাপারে আপত্তি করতেন না।”

আমাদের প্রিয় নবী যখন পারস্যের শাহ, রোমের কায়সার ও হাবশার নাজাশির কাছে চিঠি লেখাতে চাইলেন, তখন তাঁকে বলা হলো, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা সিলমোহর ছাড়া কোনো চিঠি পড়ে না!” তখন আমাদের নবী রুপার একটি আংটি তৈরি করালেন, যার নগিনায় তিন লাইনে “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” খোদাই করা ছিল।

মোহরাঙ্কিত আংটির লেখা ওপর থেকে নিচের দিকে তিন লাইনে সাজানো ছিল: “আল্লাহ” এক লাইন, “রাসূল” এক লাইন এবং “মুহাম্মদ” এক লাইন। মহানবীর রুপার আংটির পাথরটি ছিল হাবশি পাথর।70 এই রুপার আংটির নগিনাও রুপার ছিল বলে বর্ণিত আছে।

একদিন হযরত আমর ইবনে সাঈদ আমাদের নবীর কাছে এলেন। আমাদের প্রিয় নবী তাঁর আঙুলের আংটিটি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হাতের এই আংটিটি কী?” হযরত আমর ইবনে সাঈদ বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা একটা আংটা। আমি নিজে তৈরি করেছি।” আমাদের নবী জিজ্ঞেস করলেন, “এতে কী খোদাই করা আছে?” আমর ইবনে সাঈদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” মহানবী বললেন, “দাও তো, দেখি।” তিনি তা নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মোহর হিসেবে ব্যবহার করলেন এবং অন্যদের নিজেদের আংটিতে “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” কথাগুলো খোদাই করতে নিষেধ করে দিলেন।71 আমাদের প্রিয় নবীর আঙুল মুবারকে এই মোহরাঙ্কিত আংটি থাকা অবস্থাতেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

আমাদের নবী আংটির নগিনার দিকটা হাতের তালু মুবারকের দিকে ঘুরিয়ে পরতেন। শৌচাগারে প্রবেশের সময় তিনি আঙুল মুবারক থেকে আংটি খুলে রাখতেন। আমাদের প্রিয় নবীর ইন্তেকালের পর তাঁর মোহরাঙ্কিত আংটি হযরত আবু বকর, তারপর হযরত উমর এবং হযরত উমরের পর হযরত উসমান আঙুলে পরেছিলেন। হযরত উসমান খলিফা থাকাকালে একদিন আরিস কূপের ধারে বসে থাকার সময় তা কূপে পড়ে যায়। কূপের সব পানি সেঁচে ফেলা হলেও এবং তিন দিন ধরে আসা-যাওয়া করে খোঁজাখুঁজি করা হলেও এই বরকতময় আংটি আর পাওয়া যায়নি।72 আংটির পাথরে লেখা খোদাই করার রীতি আমাদের নবীর পরেও চালু ছিল।

হযরত আবু বকরের আংটিতে “নিমাল কাদিরু আল্লাহ” (সব কিছুর ওপর আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা কতই না উত্তমরূপে যথেষ্ট), হযরত উমরের আংটিতে “কাফা বিল মাওতি ওয়াইজান ইয়া উমর” (নসিহত হিসেবে মৃত্যুই যথেষ্ট) লেখা ছিল।

হযরত উসমানের আংটিতে “লানাসবিরান্না” (আমরা অবশ্যই সবর করব), হযরত আলির আংটিতে “আল-মুলকু লিল্লাহ” (রাজত্ব কেবল আল্লাহ তাআলারই) লেখা ছিল।

“ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়ানোর জন্য নালাইন পরে নামাজ পড়ো” হাদীস শরীফ

হযরত হাসানের আংটিতে “আল-ইজ্জাতু লিল্লাহ” (মহিমা ও মহত্ত্ব আল্লাহ তাআলারই) লেখা ছিল।

হযরত মুআবিয়ার আংটিতে “রাব্বিগফির লি” (হে আমার রব, ক্ষমা করো), হযরত ইবনে আবি লাইলার আংটিতে “আদ-দুনইয়া গারুরুন” (দুনিয়া প্রতারক, মিথ্যুক) লেখা ছিল।

হযরত ইমামে আজম আবু হানিফার আংটিতে “কুলিল খাইরা ওয়া ইল্লা ফাসকুত” (হয় ভালো কথা বলো, নয়তো চুপ থাকো!) লেখা ছিল।

হযরত ইমাম আবু ইউসুফের আংটিতে “মান আমিলা বিরাইহি নাদিমা” (যে নিজের মত অনুযায়ী কাজ করে, সে অনুতপ্ত হয়), হযরত ইমাম মুহাম্মদ শাইবানির আংটিতে “মান সাবারা জাফিরা” (যে সবর করে, সে বিজয়ী হয়) লেখা ছিল।

হযরত ইমাম শাফেয়ির আংটিতে “আল-বারাকাতু ফিল কানাআ” (বরকত অল্পে তুষ্টিতে) লেখা ছিল। তাঁরা নিজেদের আংটি মোহর হিসেবে ব্যবহার করতেন।

মহানবীর নকশে কদম শরীফ

নকশে কদম শরীফ হলো আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের পবিত্র পদচিহ্ন। মহানবীর মুজিযাগুলোর একটি ছিল এই যে, তিনি নরম জিনিসের ওপর, যেমন বালুর ওপর পা রাখলে পায়ের ছাপ পড়ত না, অথচ পাথর বা শক্ত জিনিসের ওপর পা রাখলে ছাপ ফুটে উঠত। তাঁর কদম মুবারক যেসব পাথর ও মার্বেলের ওপর পড়েছিল এবং ছাপ রেখে গিয়েছিল, তার কয়েকটি স্মারক হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী সংরক্ষিত হয়েছে, আমানত হিসেবে হাতে হাতে হস্তান্তরিত হয়েছে এবং মানুষ এগুলোর দ্বারা বরকত লাভ করেছে।

বিশেষ করে মুসলমান রাষ্ট্রনায়ক ও বাদশাহরা এই মূল্যবান স্মারকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ হেফাজতে সংরক্ষণ করেছেন, নিজেরা জিয়ারত করেছেন এবং অন্যদেরও জিয়ারত করিয়েছেন। সংরক্ষিত নকশে কদম শরীফগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো: ১. ভারতবর্ষে ফিরোজ শাহ তুঘলকের পুত্র ফাতহ খানের মাজারে রক্ষিত নকশে কদম শরীফ। ২. কায়রোতে কায়েতবায়ের মাজারে রক্ষিত দুটি পবিত্র পদচিহ্ন। ৩. কায়রোতে আসারুন নবী মসজিদে রক্ষিত দুটি পবিত্র পদচিহ্ন। ৪. ইস্তাম্বুলে খালিদ ইবনে জায়েদ আবু আইয়ুব আল-আনসারির (আইয়ুব সুলতান) মাজারে রক্ষিত ডান পায়ের পবিত্র ছাপ। মহানবীর এই নকশে কদম প্রথম মাহমুদ খানের নির্দেশে ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রাসাদ থেকে মাজারে আনা হয়।

৫. প্রথম আবদুল হামিদ খানের মাজারে ইয়েনি মসজিদের দিকের দেয়ালে আলমারির ভেতরে রক্ষিত দুটি পদচিহ্ন।

৬. লালেলিতে সুলতান তৃতীয় মুস্তফা খানের মাজারে দেয়ালে বিশেষভাবে তৈরি আলমারির ভেতরে রক্ষিত পাথরের ওপরের দুটি পবিত্র পদচিহ্ন। ৭. ইস্তাম্বুলে তোপকাপি প্রাসাদের পবিত্র আমানত বিভাগে রক্ষিত পদচিহ্নসমূহ। তোপকাপি প্রাসাদের খিরকায়ে সাআদাত বিভাগে ছয়টি নকশে কদম শরীফ রয়েছে, তার চারটি পাথরের এবং দুটি ইটের। এগুলোর একটি হলো মিরাজে যাওয়ার সময় মহানবী যে পাথরখণ্ডের ওপর পা রেখেছিলেন, তার ওপর ফুটে ওঠা পবিত্র পদচিহ্ন, যা খিরকায়ে সাআদাত কক্ষে একটি আলমারির ভেতরে সংরক্ষিত আছে। মিরাজে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ যে বরকতময় পাথরখণ্ডের ওপর পা রেখেছিলেন, তার ওপর কুব্বাতুস সাখরা নামে পরিচিত ইমারত নির্মিত হয়েছে। নকশে কদম শরীফগুলো বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত ছিল। সবশেষে এগুলো আজকের স্থানে রাখা হয়েছে। আর প্রকৃত নকশে কদম শরীফগুলো বরকত লাভের জন্য জিয়ারত করা হয়।

কদম শরীফ ও সুলতান প্রথম আহমদ খান

উসমানি বাদশাহ সুলতান প্রথম আহমদ তেরো বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং আটাশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি ইসলাম ও রাসূলুল্লাহর প্রতি অন্তর থেকে অনুরক্ত ছিলেন। “বাখতি” ও “আহমদি” ছদ্মনামে তিনি কবিতাও লিখতেন। তিনি নকশে কদম শরীফের আকৃতিতে রত্নখচিত একটি পাগড়ির অলংকার তৈরি করিয়েছিলেন এবং তার মাঝখানে নীল মিনার ওপর সোনা দিয়ে নিজের লেখা এই চরণগুলো লিখিয়েছিলেন:

কেন আমি তা মুকুটের মতো সর্বদা মাথায় বয়ে না বেড়াই –
রাসূলগণের শাহ সেই মহান সত্তার পবিত্র কদমের ছাপ?
নবুয়তের গোলাপবাগানের গোলাপ – সেই কদমের অধিকারী;
হে আহমদ, থেমো না, মুখ রাখো সেই গোলাপের কদমে।
Sultan I. Ahmed (Bahtî)

সুলতান প্রথম আহমদ জুমা ও ঈদের দিনে এবং অন্যান্য বরকতময় দিনে এই অলংকার মাথায় পরতেন। আইনতাবের মেহমেদ মুনিব এফেন্দি সুলতান প্রথম আবদুল হামিদের মাজারে রক্ষিত নকশে কদম শরীফ খুঁজে পাওয়া এবং মাজারে স্থাপনের ঘটনা বর্ণনা করে Âsâr-ul-Hikem fî Nakş-il Kadem নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সুলতান আহমদ খান এই কবিতাটি নিজ হাতে লিখে তাঁর শাইখ আজিজ মাহমুদ হুদায়ি এফেন্দির কাছে পাঠান। এ ছাড়া সুলতান আহমদ একটি কাঠের ফলকে এই কবিতা লিখিয়ে রাজসিংহাসনের সামনে ঝুলিয়ে রাখেন। কবিতা লেখা সেই ফলক আজও সুলতান আহমদ মসজিদে ঝোলানো আছে।

মহানবীর নালাইন শরীফ

মহানবীর যুগে ব্যবহৃত নালাইন আজকের জুতা থেকে ভিন্ন ছিল। সেগুলো ছিল চামড়ার তলিওয়ালা, ওপরের দিক খোলা, ফিতাযুক্ত পাদুকা। রাসূলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কেরাম রাস্তায় যে নালাইন পরতেন, তা পরেই নামাজ পড়তেন। তাঁদের নালাইন ছিল পরিষ্কার, আর মসজিদে নববির মেঝেতে বালু বিছানো ছিল। নোংরা নালাইন নিয়ে সেখানে প্রবেশ করা হতো না।

এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়ানোর জন্য নালাইন পরে নামাজ পড়ো।”

নালাইনে সাআদাতের ছবিও বরকতের কারণ হবে – এই বিশ্বাসে মানুষ তা ঘরে ও কর্মস্থলে ঝুলিয়ে রাখত। খিরকায়ে সাআদাত বিভাগে নালাইনে সাআদাতের সঙ্গে সেগুলোর ধাতু ও কাঠের তৈরি প্রতিরূপও রক্ষিত আছে।

মহানবী সঙ্গে রাখতেন এমন সাতটি জিনিস

আমাদের প্রিয় নবী চিরুনি, আয়না, মিসওয়াক, গোলাপের আতর, সুরমা ও কাঁচি সঙ্গে নিয়ে সফরে বের হতেন; সফরে ও বাড়িতে এগুলো কখনো কাছছাড়া করতেন না। হযরত আয়েশা বলেছেন, “যুদ্ধের জন্য আমি রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের গোলাপের আতর, চিরুনি, আয়না, দুটি কাঁচি, সুরমাদানি ও মিসওয়াক প্রস্তুত করে দিতাম।” আমাদের মা হযরত আয়েশা আরও বলেছেন, “সফরে ও বাড়িতে রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম সাতটি জিনিস সঙ্গে রাখতেন:

১. গোলাপের আতরের শিশি, ২. চিরুনি, ৩. আয়না, ৪. সুরমাদানি, ৫. মিসওয়াক, ৬. দুটি কাঁচি, ৭. চুলে সিঁথি কাটার হাড়ের কাঠি।”73

মহানবীর লাঠি ও ছড়িসমূহ

মহানবী জুমার দিনে খুতবা দেওয়ার সময় লাঠি বা ধনুকে, আর সফরে ধনুকে ভর দিতেন। আমাদের প্রিয় নবী বলতেন, লাঠিতে ভর দেওয়া নবীগণের চরিত্রের অংশ; তিনি নিজেও লাঠিতে ভর দিতেন এবং লাঠিতে ভর দেওয়ার পরামর্শ দিতেন। মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) খিলাফতকালে মহানবীর লাঠিটি সাদুল কারাজের কাছে ছিল। হযরত মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান হিজরতের পঞ্চাশতম বছরে হজ করতে এলেন। তিনি আমাদের প্রিয় নবীর মসজিদের মিম্বরটি খুলে দামেস্কে নিয়ে যেতে চাইলেন। সাদুল কারাজের কাছে থাকা লাঠিটিও চেয়ে আনাতে চাইলেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ ও হযরত আবু হুরায়রা তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, “হে আমিরুল মুমিনিন! রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের মিম্বর যেখানে স্থাপিত আছে, সেখান থেকে খুলে নিয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না, তাঁর লাঠি দামেস্কে নিয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না!” এ কথা শুনে হযরত মুআবিয়া এই সংকল্প ত্যাগ করলেন এবং ক্ষমা চাইলেন।

আমাদের নবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসকে মসজিদ থেকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে একটি লাঠি দিয়ে বললেন, “হে আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস! এই লাঠিটি তোমার কাছে যত্ন করে রেখো!” আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এই লাঠি নিয়ে লোকজনের কাছে গেলে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কিসের লাঠি?” তিনি বললেন, “এটা রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম আমাকে দিয়েছেন এবং আমার কাছে যত্ন করে রাখতে বলেছেন।” তাঁরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসকে বললেন, “আপনি যদি রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, এটা আপনাকে কেন দিয়েছেন!”

মহানবীর নালাইন শরীফের আকৃতি

নালাইন শরীফ

রাসূলুল্লাহর নালাইন আকাশপানে উঠে যায়,
সমগ্র সৃষ্টি তাঁরই ছায়াতলে ঠাঁই পায়।
তূরে মূসাকে যখন বলা হয়, “খুলে ফেলো নালাইন”,
আরশের ওপর তাঁকে বলা হয়, “তুমি খুলো না নালাইন।”
এ যে সবচেয়ে মর্যাদাবান রাসূলের নালাইনের আকৃতি,
তারকারাও চায় হতে তাঁর পা রাখা মাটি।
সাত আসমানের অধিবাসীরা তাঁরই আকাঙ্ক্ষায় রয়,
সুলতানদের মুকুটও তাকে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়।
মুস্তফার নালাইনের কোনো তুলনা মেলে না,
চোখের নূর, অন্তরের প্রশান্তি – সবই আসে তা থেকে।
নালাইনের প্রতিকৃতিকে রাখো পরম সম্মানে,
সব মাথাই চায় হতে তার পায়ের তলা – মনে-প্রাণে।
চারদিক যখন ঘিরে ফেলে বালা-মুসিবত,
নালাইন শরীফ হয় আমার নিরাপদ দুর্গ, হিফাজত।
এই সুদৃঢ় দুর্গে আমি থাকি নিরাপদে,
তার সুন্দর আকৃতির আশ্রয় নিলে সে রক্ষা করে বিপদে।
হৃদয় নালাইন শরীফের প্রতিকৃতির খেদমত করে
দুই জাহানে তার ছায়াতলে বাঁচতে চায় অন্তরে।
ইবনে মাসউদ নালাইনের খেদমত করে হলেন ধন্য,
আর আমি সৌভাগ্যে ধন্য হই তার প্রতিকৃতির জন্য।
ইউসুফ নাবহানি

এরপর আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস আমাদের নবীর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই লাঠিটি আমাকে কেন দিলেন?” আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “এটা কিয়ামতের দিন আমাদের মধ্যে একটি নিদর্শন হবে! সেদিন জান্নাতে লাঠিতে ভর দেওয়া মানুষ খুবই কম থাকবে! তুমি জান্নাতে এতে ভর দেবে!” আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস তা নিজের তরবারির সঙ্গে রাখতেন, কখনো কাছছাড়া করেননি। মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে তিনি পরিবারের লোকদের ওসিয়ত করলেন, তারা যেন তা তাঁর কাফনের ভেতরে রেখে তাঁর সঙ্গে দাফন করে। লাঠিটি তাঁর দেহ ও কাফনের মাঝখানে রাখা হলো এবং তাঁর ওসিয়ত পূর্ণ করা হলো। আমাদের নবীর এক আরশিন (৬৮ সেন্টিমিটার) বা তার চেয়ে একটু লম্বা একটি মিহজান ছিল। মিহজান হলো মাথা বাঁকা লাঠি। আমাদের নবী দূর থেকে তা দিয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে ইস্তিলাম করতেন। আমাদের নবী উটে আরোহণ করলে তা সামনে ঝুলিয়ে রাখতেন। মহানবীর উরজুন নামে পরিচিত (শুকনো খেজুরের ডালের তৈরি) একটি মিখসারাও ছিল। গাছের ডাল দিয়ে তৈরি লাঠিকে মিখসারা বলা হয়। আমাদের নবী বাকিউল গারকাদে যাওয়ার সময় তা সঙ্গে রাখতেন, তাতে ভর দিতেন, আর বসে থাকার সময় তা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। কখনো কখনো আমাদের নবী এই মিখসারা হাতে নিয়েই খুতবা দিতেন। আমাদের নবীর পাহাড়ি গাছ কেটে তৈরি মামশুক নামে পরিচিত একটি কাদিবও (সরু ছড়ি) ছিল। হযরত উসমান যখন মহানবীর কাদিব হাতে নিয়ে মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন জাহজাহ ইবনে সাঈদ অথবা জাহজাহ ইবনে কাইস এসে হযরত উসমানের হাত থেকে কাদিবটি কেড়ে নিল এবং হাঁটুতে ঠেকিয়ে বাঁকিয়ে ভেঙে ফেলল। লোকেরা জাহজাহের দিকে চিৎকার করে উঠল। এ কাজ আল্লাহ তাআলার গাইরতে আঘাত হানল, আর আল্লাহ তাআলা জাহজাহের হাতে কিংবা হাঁটুতে আকিলা (চুলকানি) রোগ দিলেন। হযরত উসমানের শাহাদাতের পর এক বছর পার হওয়ার আগেই জাহজাহ চুলকাতে চুলকাতে মারা গেল।

“মুস্তফার নালাইনের কোনো তুলনা মেলে না, চোখের নূর, অন্তরের প্রশান্তি – সবই আসে তা থেকে” ইউসুফ নাবহানি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

মহানবীর তরবারিসমূহ

মহানবীর নয়টি তরবারি ছিল।

পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মাসুর নামের তরবারিটি মদিনায় হিজরতের সময় আমাদের নবীর সঙ্গে ছিল।74 আবদ: এই তরবারি হযরত সাদ ইবনে উবাদা মহানবীকে হাদিয়া দিয়েছিলেন, আর বদরের যুদ্ধে যাওয়ার সময় মহানবী এটি সঙ্গে নিয়েছিলেন।

জুলফিকার: এটি ছিল কুরাইশ মুশরিকদের অন্যতম মুনাব্বিহ ইবনে হাজ্জাজের অথবা আস ইবনে মুনাব্বিহের তরবারি; বদরের যুদ্ধে তা গনিমত হিসেবে পাওয়া যায়। মহানবী জুলফিকার হযরত আলিকে হাদিয়া দিলেন। এর হাতলের মাথা, বাঁধনের আংটা ও শিকলগুলো ছিল রুপার।75

আমাদের নবীর ইন্তেকালের পর হযরত আব্বাস হযরত আবু বকরের কাছে গিয়ে জুলফিকার হযরত আলির কাছ থেকে চেয়ে নিতে চাইলে হযরত আবু বকর বললেন, “আমি এই তরবারি সবসময় তাঁর হাতেই দেখেছি। তাঁর কাছ থেকে এটা কেড়ে নেওয়া আমি ভালো মনে করি না!” তখন হযরত আব্বাসও তা হযরত আলির কাছেই রেখে দিলেন।

মহানবীর বর্শাসমূহ

বনু কাইনুকা ইহুদিদের কাছ থেকে তিনটি বর্শা মহানবীর হাতে গনিমত হিসেবে এসেছিল। আমাদের নবীর বর্শাগুলোর একটির নাম ছিল মুসভি, আরেকটির নাম মুসনা। আমাদের নবীর বাইজা নামে একটি বড় হারবা (ছোট বর্শা) এবং আনাজা নামে বর্শার চেয়ে ছোট আরেকটি হারবাও ছিল। হাবশার নাজাশি হযরত আসহামা আমাদের প্রিয় নবীর কাছে নাবআ নামে পরিচিত তিনটি আনাজা (বর্শা) ও একটি হারবা পাঠিয়েছিলেন। আমাদের নবী সেগুলোর একটি নিজের জন্য রাখলেন, দ্বিতীয়টি হযরত আলিকে এবং তৃতীয়টি হযরত উমরকে দিলেন।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বিলাল হাবশি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের নবীর বর্শাটি ঈদগাহ পর্যন্ত তাঁর সামনে সামনে বহন করে নিয়ে যেতেন এবং সেখানে মহানবীর সামনে গেড়ে দিতেন। আমাদের প্রিয় নবী সেটির দিকে মুখ করে ঈদের নামাজ পড়াতেন। মহানবীর ইন্তেকালের পর হযরত বিলাল হাবশি ঈদের দিনে এই বর্শা হযরত আবু বকরের সামনে বহন করে নিয়ে যেতেন এবং ঈদগাহে তাঁর সামনে গেড়ে দিতেন। হযরত আবু বকরের পর হযরত উমর এবং তারপর হযরত উসমানের যুগে এই দায়িত্ব একইভাবে পালন করেন মুয়াজ্জিন হযরত সাদুল কারাজ। মদিনার গভর্নরদের যুগেও এভাবেই করা হতে থাকে।

মহানবীর ধনুকসমূহ

আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছয়টি ধনুক ছিল। সেগুলোর মধ্যে রাওহা, বাইজা ও সাফরা নামের তিনটি ধনুক বনু কাইনুকা ইহুদিদের কাছ থেকে গনিমত হিসেবে এসেছিল। সাফরা ধনুকটি নাবা গাছের কাঠে তৈরি ছিল।76 কাতুম নামের ধনুকটিও নাবা গাছের কাঠে তৈরি ছিল, উহুদের যুদ্ধে এটি ভেঙে যায়। ভাঙা ধনুকটি হযরত কাতাদা ইবনে নুমান স্মারক হিসেবে নিয়ে নেন। এ ছাড়া মহানবীর সাদাদ ও জাওরা নামেও ধনুক ছিল।77

“আলির মতো যুবক নেই, জুলফিকারের মতো তরবারি নেই!” হাদীস শরীফ

মহানবীর ঢালসমূহ

আমাদের নবীর তিনটি ঢাল ছিল। জালুক নামের ঢালটির ওপর একটি দুম্বার মাথার ছবি ছিল। এই ঢাল আমাদের নবীকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ছবিযুক্ত হওয়ার কারণে তা আমাদের নবীর পছন্দ হয়নি। সকাল হলে দেখা গেল, আল্লাহ সেই ছবিটি ঢাল থেকে মুছে দিয়েছেন, বিলীন করে দিয়েছেন।78

মহানবীর বর্মসমূহ

রাসূলুল্লাহর সাতটি বর্ম ছিল। এই বর্মগুলো হলো:

জাতুল ফুদুল: হযরত সাদ ইবনে উবাদা বদরের যুদ্ধে রওনা হওয়ার সময় আমাদের নবীকে এটি হাদিয়া দিয়েছিলেন।79

সাদিয়া ও ফিদ্দা: এই দুটি বর্মও বনু কাইনুকা ইহুদিদের কাছ থেকে আমাদের নবীর হাতে গনিমত হিসেবে এসেছিল। সাদিয়া নামের বর্মটি ছিল সেই ঐতিহাসিক বর্ম, যা দাউদ আলাইহিস সালাম জালুতের সঙ্গে লড়াই করার জন্য পরেছিলেন। উহুদের যুদ্ধে আমাদের নবী ফুদুল ও ফিদ্দা একটির ওপর আরেকটি পরেছিলেন।80 আমাদের নবীর ইন্তেকালের সময় জাতুল ফুদুল নামের বর্মটি পরিবারের প্রয়োজনে নেওয়া ত্রিশ সা যবের বিনিময়ে বনু জাফরের আবুশ শাহম নামের এক ইহুদির কাছে বন্ধক রাখা ছিল।81

তাঁর অন্যান্য বর্ম ছিল জাতুল উইশাহ, জাতুল হাওয়াশি, বাতরা ও খিরনিক।82

হুনাইনের যুদ্ধে আমাদের নবী জাতুল ফুদুল ও সাদিয়া পরেছিলেন।83

মহানবীর শিরস্ত্রাণসমূহ

রাসূলুল্লাহর শিরস্ত্রাণগুলোর প্রথমটি মুওয়াশশাহ। এই শিরস্ত্রাণ বনু কাইনুকা ইহুদিদের কাছ থেকে গনিমত হিসেবে এসেছিল। জুস সুবুগ বা জুস সুসুব অথবা মাশবুগ নামের শিরস্ত্রাণটি আমাদের নবী উহুদের যুদ্ধে মাথায় পরেছিলেন। মুশরিকদের তরবারির আঘাতে ও ছুড়ে মারা পাথরে তা ভেঙে যায়, আর এর দুটি কড়া আমাদের প্রিয় নবীর গাল মুবারকে বিঁধে যায়।

মক্কা বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশের সময়ও আমাদের নবীর মাথায় শিরস্ত্রাণ ছিল।

ঘোড়ায় চড়ল সেনাদল, তুলে নিশান আর পতাকা,
বাজাল মেহতার84, নাকাড়া আর দফ – একসাথে সবকটা।

মহানবীর পতাকা ও নিশানসমূহ

মহানবী যুদ্ধাভিযানে দুই ধরনের পতাকা (নিশান) ব্যবহার করতেন। তাঁর রায়া ছিল কালো, আর লিওয়া ছিল তার চেয়ে ছোট এবং সাদা। মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের আজাদকৃত গোলাম ইউনুস ইবনে উবাইদ বর্ণনা করেন, “মুহাম্মদ ইবনে কাসিম রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের পতাকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য আমাকে বারা ইবনে আজিবের কাছে পাঠালেন। বারা ইবনে আজিব বললেন, ‘তা ছিল কালো, চারকোনা, নামিরার (সাদা-কালো ডোরাকাটা পশমি কাপড়ের) তৈরি।’” এই পতাকা ছিল হযরত আয়েশার পশমে বোনা একটি তহবন্দ, যার ওপর উটের হাওদার নকশা কাটা ছিল; তার রং ছিল কালো। একে উকাব বলা হতো। আমাদের প্রিয় নবীর পতাকা হযরত আলির কাছে থাকত। খায়বার অভিযানে আমাদের নবী ইরশাদ করেছিলেন, “আমি পতাকা এমন এক বীরকে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন!” এরপর তিনি হযরত আলিকে ডেকে নিজের পতাকা তাঁকে দিলেন।85 আল্লাহ তাআলা খায়বার বিজয় হযরত আলির ভাগ্যে রেখেছিলেন।

রাসূলুল্লাহর লিওয়াউল হামদ নামের নিশানের ওপর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” লেখা ছিল। খাররার সারিয়্যায় আমাদের নবী হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের জন্য একটি সাদা নিশান বেঁধে দিয়েছিলেন। হযরত আলিকে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তিনি একটি বর্শার মাথায় একটি পাগড়ি বেঁধে দিয়ে ইরশাদ করেছিলেন, “লিওয়া এমনই হয়!” লিওয়া কেবল সেনাপতিই ধরতেন এবং বহন করতেন। আবওয়া (ওয়াদ্দান) অভিযানে আমাদের নবীর সাদা নিশান বহন করেন হযরত হামজা, বুওয়াত অভিযানে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, কুরজ ইবনে জাবির আল-ফিহরির পশ্চাদ্ধাবনের সময় হযরত আলি এবং জুল উশাইরা অভিযানে হযরত হামজা।

বদরের যুদ্ধে রওনা হওয়ার সময় আমাদের নবী তাঁর সাদা নিশান (লিওয়া) মুসআব ইবনে উমাইরকে দিয়েছিলেন, আর হযরত আলি আমাদের নবীর সামনে তাঁর কালো নিশান (রায়া), অর্থাৎ উকাব বহন করেছিলেন।86 আমাদের নবীর সাদা নিশান (লিওয়া) বনু কাইনুকা অভিযানে হযরত হামজা; কারকারাতুল কুদর অভিযানে, উহুদের যুদ্ধে ও বদরুল মাওয়িদ অভিযানে হযরত আলি; আর খন্দকের যুদ্ধে জায়েদ ইবনে হারিসা বহন করেছিলেন। আমাদের নবী মক্কাও বিজয় করেছিলেন তাঁর সাদা নিশান নিয়ে। তাবুক অভিযানে মহানবী তাঁর বড় নিশানটি হযরত আবু বকরকে এবং ছোট নিশানটি জুবাইর ইবনে আওয়ামকে দিয়ে বহন করিয়েছিলেন।

মহানবীর ঘোড়াসমূহ

আমাদের প্রিয় নবীর প্রথম ঘোড়াটি তিনি মদিনায় বনু ফাজারার এক বেদুইনের কাছ থেকে দশ উকিয়া87 রুপার বিনিময়ে কিনেছিলেন; মরুবাসীরা তাকে দারিস বলত, আর আমাদের নবী তার নাম রাখেন সাকব। উহুদের যুদ্ধে তিনি এতে আরোহণ করেছিলেন।88 সাকবের ঠোঁটে সাদা দাগ ছিল। তার তিন পায়ে সাদা দাগ ছিল, কেবল ডান দিকের একটি পায়ে দাগ ছিল না। সাকব ছিল খুব দ্রুতগামী, অর্থাৎ চলার সময় পানির মতো বয়ে যেত। মুরতাজিজ নামের ঘোড়াটি আমাদের নবী বনু মুররার এক বেদুইনের কাছ থেকে কিনেছিলেন। মুরতাজিজ ছিল সুন্দর, সুঠাম, আর এমনভাবে হ্রেষাধ্বনি করত, যেন কবিতা আবৃত্তি করছে।89 লিজাজ নামের ঘোড়াটি আমাদের নবীকে হাদিয়া দিয়েছিল আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ মুকাওকিস। লিজাজ খুব দ্রুত ছুটত।90

জারিব নামের ঘোড়াটি আমাদের নবীকে হাদিয়া দিয়েছিলেন ফারওয়া ইবনে উমাইর আল-জুজামি। জারিব ছিল খুব শক্তিশালী ও সহনশীল ঘোড়া।

লাহিফ (অথবা লুহাইফ) নামের ঘোড়াটি আমাদের নবীকে হাদিয়া দিয়েছিলেন রাবিআ ইবনে আবি বারা আল-কালবি। লাহিফের লেজ ছিল লম্বা। তার লেজ মাটি ঝাড়ু দিত। ইয়াসুব ছিল আমাদের নবীর ঘোড়াগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম।

“আমি পতাকা এমন এক বীরকে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন!” হাদীস শরীফ

মুরাবিহ ছিল দৌড়ের ঘোড়া; উবাইদ ইবনে ইয়াসির তাবুকে তা আমাদের নবীকে হাদিয়া দিয়েছিলেন। মুরাবিহ বাতাসের মতো দ্রুত ছুটত।

মিরওয়াহ নামের ঘোড়াটি আমাদের নবীকে হাদিয়া দিয়েছিলেন হিজরতের দশম বছরে মদিনায় আসা বনু রাহার প্রতিনিধিদল। আমাদের নবীর সামনে মিরওয়াহের পিঠে চড়ে তাকে হাঁটিয়ে দেখানো হলে তা আমাদের নবীর খুব পছন্দ হয়েছিল। ওয়ার্দ – এই ঘোড়াটি আমাদের নবীকে হাদিয়া দিয়েছিলেন তামিম দারি। ওয়ার্দের রং ছিল লালচে-বাদামি। আমাদের নবী তা হযরত উমরকে হাদিয়া দিলেন। হযরত উমর ওয়ার্দের পিঠে চড়ে আল্লাহ তাআলার পথে লড়াই করেছেন, এক যুদ্ধ থেকে আরেক যুদ্ধে তাকে ছুটিয়েছেন। আমাদের নবী তাঁর ঘোড়াগুলোর মধ্যে তিনটিকে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামাতেন। জারিবের আরোহী ছিলেন হযরত সাহল ইবনে সাদ, আর লিজাজের আরোহী হযরত আবু উসাইদ আস-সাইদি। লিজাজ থাকত সবার আগে, জারিব তার পেছনে, আর সাকব জারিবের পেছনে।

মহানবীর গাধা ও খচ্চর

রাসূলুল্লাহর গাধাও ছিল, খচ্চরও ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ মুকাওকিস আমাদের নবীকে একটি ধূসর খচ্চর ও একটি ধূসর গাধা হাদিয়া দিয়েছিল। খচ্চরটির নাম ছিল দুলদুল, আর গাধাটির নাম ইয়াফুর অথবা উফাইর।91 ইসলামে সর্বপ্রথম দেখা সাদা খচ্চর ছিল দুলদুল। খায়বার অভিযানে আমাদের নবী এই ধূসর খচ্চরে, আর হুনাইনের যুদ্ধে অন্য ধূসর খচ্চরটিতে আরোহণ করেছিলেন। আমাদের নবী খচ্চরকে গোড়ালি দিয়ে খোঁচা দিয়ে হাওয়াজিন গোত্রের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলেন; হযরত আব্বাস খচ্চরের লাগাম এবং হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস তার রেকাব ধরে তার গতি কমাতে এবং আমাদের নবীর শত্রুদের মাঝে ঢুকে পড়া ঠেকাতে চেষ্টা করছিলেন। বর্ণিত আছে, খায়বার অভিযানে ইয়াফুরের পিঠে গদি চাপিয়ে এবং মাথায় খেজুরের আঁশের দড়ির লাগাম পরিয়ে আমাদের নবী তাতেও আরোহণ করেছিলেন। আমাদের নবী বিদায় হজ থেকে ফেরার সময় ইয়াফুর মারা যায়, আর দুলদুল আমাদের নবীর ইন্তেকালের পর হযরত আলির কাছে থেকে যায়। শাহাদাত পর্যন্ত হযরত আলি নিজে, তারপর হযরত হাসান, তারপর হযরত হুসাইন এবং এরপর হযরত মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া তাতে আরোহণ করেন। দুলদুল হযরত মুআবিয়ার যুগ পর্যন্ত বেঁচে ছিল।

মহানবীর উটসমূহ

কাসওয়া: জাদআ ও আদবা নামেও পরিচিত মহানবীর এই উটনীটি ছিল বনু কুশাইর ইবনে কাব ইবনে রাবিআ ইবনে আমিরের অথবা হুরাইশ ইবনে কাবের পশুগুলোর একটি; হযরত আবু বকর তা চারশো দিরহামে কিনে একই মূল্যে আমাদের প্রিয় নবীর কাছে হস্তান্তর করেন। আমাদের নবী কাসওয়ার পিঠে চড়েই মদিনায় হিজরত করেন। হুদাইবিয়ার উমরায় এতে চড়েই যান। মক্কাও বিজয় করেন এতে চড়েই। মহানবী কাসওয়াকে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামাতেন, আর কোনো উট তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারত না। কিন্তু একবার এক বেদুইন দুই বছর বয়সী একটি উট নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে তাকে ছাড়িয়ে যায়। বিদায় হজে আরাফাতের খুতবা তিনি কাসওয়ার পিঠে বসেই দিয়েছিলেন। হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে কাসওয়াকে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে সে নিজের মতো চরে বেড়িয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বেঁচে ছিল।92

“হে আল্লাহ! তুমি যেমন আমার আকৃতি সুন্দর করে সৃষ্টি করেছ, তেমনি আমার চরিত্রকেও সুন্দর করে দাও” হাদীস শরীফ

আবু জাহলের কাছ থেকে গনিমত হিসেবে পাওয়া উট: বদরের যুদ্ধে আবু জাহলের বিখ্যাত উটটি গনিমত হিসেবে আমাদের প্রিয় নবীর ভাগে পড়েছিল। হুদাইবিয়ার উমরা পর্যন্ত আমাদের নবী এই উটে চড়ে যুদ্ধাভিযানেও বের হতেন। উমরার জন্য তিনি এর গায়ে কুরবানির পশুর চিহ্ন লাগিয়ে দেন। মুশরিকরা একশো উট দিয়ে এটি নিয়ে নিতে চেয়েছিল। আমাদের নবী বললেন, “আমরা যদি এটাকে কুরবানির পশু হিসেবে আলাদা করে চিহ্নিত না করতাম, তাহলে তোমাদের ইচ্ছা পূরণ করতাম।” দুধেল উটনী: আমাদের নবীর জুলজাদর ও জাম্মা চারণভূমিতে চরে বেড়ানো হান্না, সামরা, উরাইস, সাদিয়া, বাগুম, ইয়াসিরা ও দাব্বা নামের সাতটি দুধেল উটনী ছিল; প্রতি রাতে এগুলোর যে দুই মশক ভরা দুধ আনা হতো, তা দিয়েই আমাদের নবীর পরিবারের লোকেরা জীবন চালাতেন।93 কিন্তু আমাদের নবীর ইন্তেকালের সময় এগুলোর একটিও অবশিষ্ট ছিল না।

মহানবীর ওয়াকফকৃত সম্পত্তি

ইসলামে প্রথম ওয়াকফ ছিল সাতটি বাগান ও ফলের খেত, যেগুলো উহুদে শহিদ মুখাইরিক আমাদের নবীর কাছে হস্তান্তরের ওসিয়ত করেছিলেন, আর আমাদের নবী সেগুলো গ্রহণ করে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। এগুলোর নাম: ১. মিসাব, ২. সাফিয়া, ৩. দালাল, ৪. হুসনা, ৫. বুরকা, ৬. আওয়াফ, ৭. মাশরাবা।94 মুসলমান হওয়ার আগে ইহুদি আলেম ও ধনীদের অন্যতম মুখাইরিক উহুদের যুদ্ধের দিন নিজের স্বজাতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান এভাবে স্পষ্ট করলেন: “তোমরাও খুব ভালো করে জানো যে, মুহাম্মদ আখেরি জামানার নবী। তাওরাতে তাঁর গুণাবলি স্পষ্টভাবে লেখা আছে। এখন আমাদের উচিত তাঁর অনুসরণ করা, তাঁর কঠিন দিনে তাঁর পাশে থাকা।” ইহুদিরা বলল, “তুমি ঠিকই বলছ, কিন্তু আজ শনিবার। আজ কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া যায় না!” পীড়াপীড়ি করে লাভ নেই দেখে তিনি তরবারি কোমরে বেঁধে নিলেন এবং নিজের মুসলমান হওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। আপনজনদের তিনি ওসিয়ত করলেন, “আমি যদি নিহত হই, আমার সমস্ত সম্পদ মুহাম্মদের। তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে স্বাধীন।” তিনি গিয়ে ইসলামের সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন এবং শাহাদাতের শরবত পান করলেন, রাদিয়াল্লাহু আনহু।

অবশেষে যুদ্ধ শেষ হলো, ক্ষতগুলোতে পট্টি বাঁধা হলো। মুখাইরিকের আপনজনেরা ওসিয়তের প্রতি বিশ্বস্ত রইলেন, তাঁর সম্পত্তি হাবিবুল্লাহর হাতে তুলে দিলেন। মহানবী শীতল পানি ও প্রচুর ফলে ভরা এই জমিগুলো ওয়াকফ করে দিলেন এবং গরিব-দুঃখীদের উপকারের জন্য খুলে দিলেন। এভাবেই ইসলামি সভ্যতায় প্রথম ওয়াকফের রীতি শুরু হলো। মহানবী তাঁর প্রশংসা করে বললেন, “মুখাইরিক ইহুদি বংশের এক উত্তম মানুষ।”

মদিনায় আমাদের নবীর ওয়াকফগুলো সাধারণত মুখাইরিকের সম্পদ থেকেই ছিল।

ইবনে হুমাইদ বলেন, “খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ মুখাইরিকের ওয়াকফকৃত খেজুরবাগান থেকে খেজুর আনাতে চাইলেন। একটি থালায় করে তা আনা হলো। উমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, ‘আবু বকর ইবনে হাজম আমাকে লিখে জানিয়েছেন যে, এই খেজুর রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের যুগ থেকে টিকে থাকা খেজুরগাছের, আর রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তা থেকে খেতেন।’ তখন আমি বললাম, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! এগুলো আমাদের মধ্যে ভাগ করে দিন!’ তিনি ভাগ করে দিলেন। আমাদের প্রত্যেকের ভাগে নয়টি করে খেজুর পড়ল।”

উমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, “মদিনার গভর্নর থাকাকালে আমি যখন সেই খেজুরবাগানে প্রবেশ করেছিলাম, সেই খেজুরগাছের খেজুর খেয়েছিলাম; তার মতো সুস্বাদু ও মিষ্টি খেজুর আমি আর কখনো দেখিনি!”

আমর ইবনে মুহাজির বলেন, “রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের জিনিসপত্র উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে একটি কক্ষে রক্ষিত ছিল, আর তিনি প্রতিদিন সেগুলো দেখতেন। তাঁর কাছে এসে জমায়েত হওয়া কুরাইশদেরও তিনি এই কক্ষে নিয়ে যেতেন, তারপর এই জিনিসগুলোর দিকে ফিরে বলতেন, ‘এই হলো সেই মহান সত্তার মিরাস, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের সম্মানিত করেছেন!’” সেগুলো হলো: ১. খেজুরপাতায় বোনা একটি খাট,

২. চামড়ার আবরণের ভেতরে খেজুরগাছের আঁশ ভরা একটি বালিশ, ৩. বেশ বড় একটি থালা, ৪. একটি পানির পাত্র,

৫. একটি পোশাক, ৬. একটি হাতে-ঘোরানো জাঁতা,

৭. একটি তূণ (তিরের থলে), ৮. একটি মখমলের লেপ।

(রাসূলুল্লাহর দেহ মুবারক থেকে লেগে থাকা সুগন্ধির কারণে এই লেপ থেকে মেশকের চেয়েও সুন্দর সুবাস ছড়াত। উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অসুস্থ হলে সেই লেপ ধোয়া পানি দিয়ে গোসল করতেন এবং সুস্থ হয়ে উঠতেন।)

প্রেমের সাগর যখন তরঙ্গে উঠল দুলে,
সেই অনুপম মুক্তা (দুররে ইয়াতিম) প্রকাশ পেল তখন,
তাঁর শানে পবিত্র সৃষ্টিকর্তা ইরশাদ করলেন:
“লাওলাকা লামা খালাকতুল আফলাক।”
যখন উদিত হলো সেই সূর্যের নূর,
সমগ্র বিশ্বজগৎ হলো তাতে ভরপুর।
যে-ই চলে তাঁর পথের চিহ্ন ধরে,
প্রতিটি কাজে সে কল্যাণ লাভ করে।
দেশের পর দেশ তাঁর অধীনে এলেও,
তিনটি জামারও তিনি মালিক ছিলেন না তবুও।
তাঁর ঘরে থাকত না অনেক ধনসম্পদ,
ইন্তেকালে দেখা গেল – তাঁর বর্ম ছিল বন্ধক।
অধিকাংশ সময় যা তিনি দেখতেন, তার কাছে
এই দুনিয়ার, বলো, কী মূল্য আছে?
সবার প্রতি তাঁর দান ছিল অগণন,
“কিছু নেই” বলা – তাঁর মাঝে ছিল না কখনো এমন।
কখনো তিনি দান করতেন এত অপার,
শত্রুরাও সবাই মাথা নোয়াত তাঁর।
প্রতিটি ইয়াতিমের তিনি ছিলেন স্নেহময় পিতা,
নীচজনের প্রতিও ছিল তাঁর অঢেল মমতা।
তাঁর প্রতিটি কাজে ছিল বহু হিকমত,
কারও প্রতি কখনো করেননি অনুগ্রহের খোঁটা-মিন্নত।
রোগীকে তিনি দেখতে যেতেন সবসময়,
দুঃখীর দুঃখ সারিয়ে দিতেন নিশ্চয়।

“ইয়া রাসূলাল্লাহ! তোমার প্রশংসা করার সাধ্য আমার নেই; আমরা সবাই সৃষ্ট হয়েছি তোমারই সম্মানে। মোটকথা, হে বিশ্বস্ততার রাজ্যের শাহ, তোমার জন্য আমার প্রাণও কুরবান, সব কিছুই কুরবান!” Hüseyin Hilmi bin Sa’îd (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

তাহাজ্জুদ তিনি কখনো ছাড়তেন না,
আল্লাহর ভয়ে রাতে শুয়ে থাকতেন না।
নবী সবাইকে সবসময় দেখতেন,
নিজের সমান বলেই তিনি গণ্য করতেন।
আল্লাহর বান্দা হওয়াতেই করতেন গৌরব,
ঐশী চরিত্রে ভূষিত ছিল তাঁর স্বভাব।
যে কেউ এই পথে চলতে আকুল হয়,
সুন্দর গুণাবলিতে সে সুশোভিত হয়।
এক বিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন নিয়মিত,
সেখানে আল্লাহই ছিলেন তাঁর শিক্ষক, নিশ্চিত।
তাঁকে বর্ণনা করার জন্য রহমান
কুরআনে সুন্দর করে দিলেন তাঁর বয়ান।
নবীগণের শাহের প্রতি হাশর পর্যন্ত
বর্ষিত হোক দরুদ – অসীম, অফুরন্ত!
তাঁর বংশধর আর সাহাবীগণের ওপরে
দরুদ ও সালাম হোক – বিনয়ভরে অন্তরে!

সোনার নালা (মিজাবে রহমত) / কাবা

মসজিদে নববির বাইরের দৃশ্য / মদিনা মুনাওয়ারা

হিলইয়ায়ে সাআদাত সাহাবীগণকে নসিহত করার পর বিশ্বজগতের গৌরব বললেন: আমার পর আমার পবিত্র হিলইয়া দেখে যদি কেউ, সে যেন দেখল আমারই চেহারা মুবারক। দেখে যদি তার অন্তরে প্রেম জেগে ওঠে, অর্থাৎ আমার সৌন্দর্যে সে প্রেমিক হয়ে ওঠে, আমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা যদি সে করে, তার অন্তর যদি আমার ভালোবাসায় ভরে, জাহান্নাম তার জন্য হয়ে যাবে হারাম, আমার রব তাকে দেবেন জান্নাতের ইনাম। হক তাআলা তাকে হাশরে ওঠাবেন না বিবস্ত্র অবস্থাতে, সে গিয়ে মিলিত হবে হকের ক্ষমার সাথে। বলা হয়েছে: রাসূলের হিলইয়া যদি কারও হাত লেখে ভালোবেসে, হক তাকে ভয় থেকে রাখবেন নিরাপদে, পৃথিবী যদি ভরেও যায় বালা-বিপদে। দুনিয়ায় তার শরীর রোগ দেখবে না, তার সারা দেহ কোনো ব্যথা পাবে না। এই মানুষ যদি গুনাহও করে থাকে, জাহান্নাম তার দেহের জন্য হয়ে যাবে হারাম। আখিরাতে আজাব থেকে সে মুক্তি পাবে, দুনিয়ায় তার প্রতিটি কাজ সহজ হবে। মহিমাময় রব তাকে হাশরে ওঠাবেন তাঁদের সাথে, দুনিয়ায় রাসূলকে দেখেছেন যাঁরা নিজ চোখে। নবীর হিলইয়া বর্ণনা কঠিন হলেও, সাধ্যমতো আমরা শুরু করছি তবুও। মহিমাময় আল্লাহর আশ্রয় নিয়ে, অক্ষমের মতো বর্ণনা করি বিনয় দিয়ে। এ কথায় সকল উম্মত হয়েছে একমত: বিশ্বজগতের গৌরব ছিলেন লালচে-সাদা, শোভিত। তাঁর চেহারা মুবারক ছিল খাঁটি সাদা, গোলাপের মতো লালচে আভায় মাখা। মুখের ঘাম ছিল যেন মুক্তার দানা, সুন্দর সেই রত্নকে তা আরও শোভিত করত।

যখন ঘামতেন সেই আনন্দের উৎস,
মনে হতো যেন নূরের সাগর ঢেউ খেলছে।
তাঁর চোখ দেখাত সবসময় সুরমা-মাখা,
সুন্দর চোখ দুটি টেনে নিত সকল হৃদয়।
চোখের সাদা অংশ ছিল অত্যন্ত সাদা,
তাঁর রব আয়াতে করেছেন তার প্রশংসা।
চোখের কালো মণি ছোট ছিল না,
কাছে আর দূরে – তাঁর কাছে ছিল একই সমান।
তাঁর চোখ ছিল প্রশস্ত, সুন্দর ও কোমল,
চেহারা মুবারক থেকে নূর ঝরত সর্বক্ষণ।
মুস্তফার সেই দৃষ্টিশক্তি অতি
রাতেও দিনের মতো ছিল প্রখর জ্যোতি।
কোনো দিকে তাকাতে চাইলে তিনি,
পবিত্র দেহও সেদিকে ঘুরে যেত তখনি।
দেহকে তিনি মাথার অনুগামী রাখতেন,
সারা জীবনে এ রীতি কখনো ছাড়েননি।
রাসূলে আকরাম দেহধারী হলেও,
তাঁকে দেহরূপী রুহ বললে মানায় তা-ও।
সুন্দর ও প্রিয়দর্শন ছিলেন রাসূল,
হকের কাছে অতি প্রিয় ছিলেন রাসূল।
মালিক আর আবু হালা বলেছেন:
নতুন চাঁদের মতো ছিল তাঁর ভ্রু, মাঝে ফাঁক রেখে।
দুই ভ্রুর মাঝখান সবসময়
রুপার মতো দেখাত স্পষ্ট, দীপ্তিময়।
চেহারা মুবারক ছিল কিছুটা গোলাকার,
ত্বক ছিল স্বচ্ছ আর ঝলমলে চমৎকার।
তাঁর কালো ভ্রু-যুগলের মেহরাব
ছিল সমগ্র জগতের কিবলা।
পাশ থেকে তাকালে নাক মুবারক
মাঝখানে কিছুটা উঁচু দেখাত।
অতি সুন্দর, টানা ও কোমল ছিল তা,
যে দেখত, সে-ও পুরো বর্ণনা দিতে পারত না।
দাঁতগুলোর মাঝে ছিল সামান্য ফাঁক,
ঝলমল করত যেন মুক্তার সারি এক ঝাঁক।
সামনের দাঁতগুলো যতবার প্রকাশ পেত,
চারদিক এক নূরে ছেয়ে যেত।

দুই জাহানের সরদার যখন হাসতেন –
প্রাণী-অপ্রাণী সব কিছুর নবী যিনি –
দেখা যেত সামনের দাঁতগুলো, অতি পবিত্র,
শিলার দানার মতো অতি সুকোমল, শুভ্র।
ইবনে আব্বাস বলেন: আল্লাহর হাবিব
হাসতে লজ্জা ও সংকোচ বোধ করতেন।
লজ্জাশীলতার কারণে তিনি, দ্বীনের সেই ভরসা,
কখনো অট্টহাসি হাসেননি – এ কথা বলা হয়।
কোমল ও লাজুক ছিলেন মহান রাসূল,
তাকাতে সবসময় সংকোচ বোধ করতেন।
তাঁর চেহারা ছিল গোল চাঁদের মতো,
তাঁর সত্তা ছিল মহান মাওলার আয়না।
সেই সুন্দর মুখ ছিল সর্বদা নূরানি,
তার দীপ্তির কারণে তাকানো যেত না।
সেই সুন্দর নবী জয় করলেন হৃদয়,
এক লাখ সাহাবী হলেন তাঁর প্রেমিক নিশ্চয়।
স্বপ্নে যাঁরা একটিবার দেখেছেন তাঁকে,
বলেছেন: দুনিয়ায় এমন স্বাদ নেই কোনোখানে।
জেনে রাখুক সবাই, তাঁর সুন্দর গাল দুটিও
বেশি মাংসল ছিল না – এমনটাই বলা হয়।
মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে ভালোবেসে
গড়েছেন সাদা মুখ আর প্রশস্ত ললাট দিয়ে।
তাঁর গ্রীবার নূর প্রতিটি মুহূর্তে
চুলের ফাঁকে ঝলমল করত।
দাড়ি মুবারকের, ভালো করে জেনো,
কেবল সতেরোটি চুল পেকেছিল।
তা না ছিল কোঁকড়া, না ছিল লম্বা,
প্রতিটি অঙ্গের মতোই ছিল সুসমঞ্জস।
জগৎসমূহের রাসূলের পবিত্র গ্রীবা
ছিল অত্যন্ত সাদা, অত্যন্ত স্বচ্ছ।
সাহাবীগণের মধ্যে বহু আদবওয়ালা জন
বলেছেন: তাঁর পেট ও বুক ছিল সমান।

যদি খুলে যেত তাঁর বক্ষ মুবারক,
জ্ঞানের ভান্ডার ছড়াত ফয়েজ95 অবিরাম।
প্রেম যখন সেখানে নিল আসন,
সেই মহিমান্বিত বক্ষ কি আর অন্য রকম হয়?
তাঁর বক্ষ মুবারক ছিল প্রশস্ত,
তাতে নাজিল হয়েছিল ইলমে লাদুন্নি।
সাদা ও স্বচ্ছ ছিল সেই মহান বক্ষ,
যারা দেখত, ভাবত – এ যেন পূর্ণিমার চাঁদ।
অনাদি সত্তার প্রেমের আগুন
সেই সুন্দরকে দগ্ধ করেছিল অনলে।
এ কথা অবশ্যই জানে বৃদ্ধ ও যুবা:
বিশ্বজগতের গৌরবের কাঁধের হাড় ছিল চ্যাপ্টা।
তাঁর পিঠের মাঝখানও ছিল মাংসল,
তিনি ছিলেন দানশীল, সৌভাগ্যে উজ্জ্বল।
রুপালি দেহে তাঁর ছিল কোমলতা,
তাতে ছিল বেশ বড় নবুয়তের মোহর।
নবুয়তের মোহর ছিল তাঁর পিঠে,
অবশ্যই তা ছিল ডান দিকের কাছে।
বর্ণনাকারীরা আমাদের জানিয়েছেন:
মহিমান্বিত মোহর ছিল একটি বড় তিল।
তার রং ছিল হলদেটে কালো,
আকারে কবুতরের ডিমের সমান।
তার চারপাশ যেন রেখায় ঘেরা ছিল –
একে অপরের সঙ্গে লাগানো ছোট ছোট লোম।
সেই অভিজাত বংশের মহান সত্তার বর্ণনাকারীরা
বলেছেন: নবী ছিলেন বড় হাড়ের অধিকারী।
প্রতিটি হাড় ছিল বড়, পৌরুষদীপ্ত,
তাঁর আকৃতি ও চরিত্র ছিল রাজকীয়।

তাঁর পবিত্র অঙ্গগুলোর প্রতিটি
সৃষ্টি করা হয়েছিল সুসমঞ্জস ও শক্তিশালী করে।
নবীর প্রতিটি অঙ্গ ছিল এমন সুন্দর,
যেমন সুন্দর কুরআনের আয়াতসমূহ।
সেই সুলতানের হাতের তালু
এবং তাঁর পায়ের তলাও
ছিল প্রশস্ত, পবিত্র, কোমল ও মনোহর,
তাজা গোলাপের মতো নরম ও প্রিয়তর।
অতি সুগঠিত ছিল – বলেন দৃষ্টিমানেরা –
কারামতময় সেই পবিত্র হাত দুটি।
নবী কাউকে সালাম দিলে
সবসময় মৃদু হাসতেন।
মাঝে এক-দুই দিন কেটে গেলেও,
এমনকি এক মাসের বেশি গড়ালেও,
সেই ব্যক্তিকে মানুষের ভিড়ে
তাঁর সুগন্ধ থেকেই চেনা যেত।
লোমহীন দেহ ছিল স্ফটিকের মতো,
সেই সৌন্দর্যের প্রশংসা করি কেমন করে!
প্রিয়জনকে দেখার জন্য সেই মহিমান্বিত
সমগ্র কোমল দেহ দিয়েই হয়েছিলেন চোখ।
তাঁর কোমল দেহ ছিল পরিপূর্ণ,
সৃষ্টিকর্তা তাতে দেখিয়েছেন তাঁর হিকমত।
বুকে ও পেটে কোথাও ছিল না
একটিও লোম – যেন রুপার ফলক।
কেবল বুকের মাঝখান থেকে নিচের দিকে
এক সারি লোম সমানভাবে সাজানো ছিল।
এই পবিত্র দেহের সেই কালো রেখা
চাঁদের চারপাশের জ্যোতির্বলয়ের মতো সুন্দর ছিল।
সারা জীবন তাঁর পবিত্র অঙ্গগুলো
যৌবনকালের মতোই রয়ে গিয়েছিল।
নবীর বয়স যত বাড়ত,
কুঁড়ির মতো তিনি নতুন হয়ে উঠতেন।
আর বিশ্বজগতের সুলতান সম্পর্কে
ভেবো না যে, তিনি খুব মোটা ছিলেন।
তিনি না ছিলেন কৃশ, না অতি মাংসল,
ছিলেন মাঝারি গড়নের, আর অত্যন্ত শক্তিশালী।

অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নরা তাঁর সম্পর্কে বলেছেন:
তাঁর অঙ্গগুলো একটি অন্যটির চেয়ে বেশিও ছিল না, কমও না।
সেই মহান স্রষ্টা তাঁর দেহপ্রাসাদের
ভিত গড়েছিলেন ন্যায় ও সমতার ওপর।
তাঁর পবিত্র দেহ ছিল সুষম,
সমগ্র দেহ নূরে ছিল নিমজ্জিত।
মাঝারি উচ্চতার ছিলেন সেই সিদরা-নিবাসী,
তাঁর মাধ্যমে জগৎ পেল শৃঙ্খলা।
তাঁর দেহসৌষ্ঠবের মুজিযা যাঁরা দেখেছেন,
সবাই তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন:
এমন গোলাপমুখ সুন্দর আমরা দেখিনি,
তাঁর উচ্চতা, চরিত্র ও মুখ – সবই সুন্দর।
নবী মাঝারি উচ্চতার হলেও,
যদি কোনো দীর্ঘদেহী লোকের সঙ্গে হাঁটতেন,
সেই লোক যত লম্বাই হোক না কেন,
নবীকে তবুও বেশি উঁচু দেখাত।
দীর্ঘদেহী ব্যক্তির চেয়ে সেই রত্ন
এক হাতের তালু পরিমাণ উঁচু ছিলেন।
মর্যাদার সঙ্গে কোনো পথে চললে,
অত্যন্ত দ্রুত হাঁটতেন।
তাঁর মহিমান্বিত গুণাবলির আরও কিছু বলি:
হাঁটার সময় তিনি সামনের দিকে ঝুঁকতেন।
অর্থাৎ ঢালু পথ বেয়ে নামার মতো
সবসময় সামনের দিকে একটু ঝুঁকে চলতেন।
গৌরবময়, মর্যাদাবান ছিলেন সেই মহান সত্তা,
তাঁকে নিয়ে গর্ব করত খলিলের রুহ।
আল্লাহ যাঁকে ভালোবেসে বেছে নেন,
তাঁর প্রতিটি অঙ্গই হয় সর্বোত্তম।
পথ চলতে গিয়ে যদি কেউ
হঠাৎ রাসূলুল্লাহকে দেখত,
তার অন্তরে ভয় ঢুকে যেত
রাসূলুল্লাহর মহত্ত্ব দেখে।
আর কেউ যদি নবীর সঙ্গে সর্বদা
আলাপ করে তাঁর কথা শুনত,
তাঁর কথার মাধুর্যে সে
গোলাম হয়ে যেত – যদি রাসূল কবুল করতেন।

অনাদি সৃষ্টিকর্তা তাঁকে সাজিয়েছিলেন
সুন্দর, অতুলনীয় চরিত্রে।
ইয়া রাসূলাল্লাহ! তোমার প্রশংসা করার সাধ্য আমার নেই,
আমরা সবাই সৃষ্ট হয়েছি তোমারই সম্মানে।
মোটকথা, হে বিশ্বস্ততার রাজ্যের শাহ,
তোমার জন্য আমার প্রাণও কুরবান, সব কিছুই কুরবান!
Hüseyin Hilmi Işık
(কাদ্দাসাল্লাহু তাআলা সিররাহুল আজিজ)

মক্কা মুকাররমার একটি পুরোনো দৃশ্য

আহলে সুন্নত কাসিদা
আহলে সুন্নতের আকিদা – সবার আগে তোমার যা প্রয়োজন,
তিয়াত্তর ফিরকা আছে, কিন্তু বাকি সবাই জাহান্নামের।
মুসলমানরা সবাই সুন্নি; সবার নেতা নুমান।
জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছে ঈমানে তাঁদের যে অনুসরণ করে।
আকিদা মজবুত করো; তারপর ইসলামকে আঁকড়ে ধরো!
ইসলামের পাঁচ রুকন পালন করো; হারাম থেকে বাঁচো এখনই!
কোনো গুনাহ করে ফেললে তওবা করো, সময় হারিয়ো না!
যে ইসলামের অনুসরণ করে না, একদিন সে অবশ্যই অনুতপ্ত হবে।
সাবধান, ধর্মহীনের ধোঁকায় পড়ো না, তুমিও ধ্বংস হবে, হুঁশিয়ার!
মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করলে পরে তোমার অবস্থা হবে শোচনীয়!
দুমুখোরা বেড়ে গেছে: বাইরে ফেরেশতা, ভেতরে সাপ,
ফাঁদে ফেলার জন্য বন্ধু সাজে, তাও আবার প্রাণের বন্ধু।
সবাই নিজেকে সঠিক ভাবে: বলে, মন্দ সে-ই, যে আমার মতো চলে না।
ইসলাম হলো দাঁড়িপাল্লা, সত্যপন্থীকে আলাদা করে দেয় তা-ই!
জেনে রাখো, ইসলামের অনুসরণ যে করে না, সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত মানুষ;
এ কথা অবশ্যই বিশ্বাস করবে, ইতিহাস যে ভালো বোঝে।
শরীরের কোথাও ব্যথা হলে মানুষ কেন ডাক্তারের কাছে ছোটে?
কারণ মরতে কেউ চায় না; সব কিছুর চেয়ে প্রাণ বেশি মধুর।
অনন্তকাল বাঁচার আকাঙ্ক্ষা আমার নেই – এমন কথা কেউ বলে কি?
মৃত্যু মানে বিলীন হয়ে যাওয়া নয়; কবরের জীবনে বিশ্বাস করো!
জান্নাত চিরস্থায়ী, জাহান্নামও; এ খবর দিয়েছে কুরআন,
অনন্ত যন্ত্রণা থেকে বাঁচা উচিত, এমনকি তা যদি একটি সন্দেহও হয়।
এতে বিশ্বাস করে না, এমন লোকও আছে; বাদুড় আলো থেকে পালায়।
কাক আবর্জনার স্তূপে স্বাদ পায়; গোলাপ খোঁজে বুলবুলি।
নফস ও ভোগবিলাসে আসক্ত যে, সে ইসলামকে ভালোবাসতে পারে না।
এ দুটি কি এক হয়? ভালো তো মন্দ থেকে আলাদা!
মুসলমানরা হককে চেনে, প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ করে,
ঈমানহীনরা সাপের মতো; প্রাণে জ্বালা দিয়ে মজা পায়।
আমান, হে আমার রব, আল-আমান! আখেরি জামানা কত কঠিন,
দ্বীনের জ্ঞান ভুলে গেছে মানুষ; নামাজি খুব কমে গেছে।