আমার প্রিয় নবী

মহানবীর সাহাবীগণ

আমাদের নবীর সঙ্গীগণ: নারী হোক বা পুরুষ, শিশু হোক বা বয়স্ক, কোনো মুসলমান যদি রাসূলুল্লাহকে খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও একবার দেখেন – আর অন্ধ হলে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলেন – এবং ঈমানের সঙ্গে ইন্তেকাল করেন, তাঁকে সাহিব বা সাহাবী বলা হয়। একাধিকজনকে আসহাবে কেরাম, সাহাবায়ে কেরাম অথবা সাহব বলা হয় (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)। যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় আমাদের নবীকে দেখে রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর ঈমান এনেছে, কিংবা মুসলমান অবস্থায় দেখে পরে মুরতাদ হয়ে গেছে (ইসলাম ত্যাগ করেছে), সে সাহাবী নয়। সাহাবী হওয়ার পর মুরতাদ হয়ে রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর আবার ঈমান আনলে তিনি সাহাবীই থাকেন। মহানবী জিন জাতিরও নবী বলে জিনও সাহাবী হতে পারে।

নবীগণ ও শ্রেষ্ঠ ফেরেশতাগণের পর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেন সাহাবায়ে কেরাম। তাঁদের প্রত্যেকের নাম “হযরত” অথবা “রাদিয়াল্লাহু আনহু” বলে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করা উচিত। মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম যে নবী, তা যারা বিশ্বাস করে, তাদের – অর্থাৎ যে বংশেরই হোক, যে দেশেরই হোক, প্রত্যেক মুসলমানকে – মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের উম্মত বলা হয়। সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকে এই উম্মতের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সাহাবায়ে কেরামের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কিত পবিত্র আয়াতসমূহে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে: “তোমরা উম্মতসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম।”1 “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সবার আগে ঈমান এনেছে এবং যারা সৎকর্মে তাদের অনুসরণ করেছে (তাদের পথে চলেছে), আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তারাও আল্লাহ তাআলার প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।”2 “মুহাম্মদ (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলার রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে (অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম), তারা সকলেই কাফিরদের প্রতি কঠোর, কিন্তু পরস্পরের প্রতি দয়ার্দ্র। তোমরা তাদের প্রায়ই রুকু ও সিজদায় দেখবে। তারা এসব ইবাদত দিয়ে এবং মানুষের প্রতি তাদের স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ কামনা করে। বেশি বেশি সিজদা করার কারণে তাদের চেহারায় তার চিহ্ন স্পষ্ট (তাদের চেহারায় সিজদার নিদর্শন ও চিহ্ন রয়েছে)। তাওরাতে তাদের অবস্থা এমনই। আর ইঞ্জিলে তাদের বৈশিষ্ট্য এই: তারা সেই শস্যক্ষেতের মতো, যা অঙ্কুর বের করেছে, তারপর তা শক্ত হয়েছে, পুষ্ট হয়েছে এবং নিজের কাণ্ডের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কৃষকদের আনন্দ দেয়। (সাহাবায়ে কেরামও এমনই ছিলেন। প্রথমে তাঁরা ছিলেন অল্প ও দুর্বল, পরে সংখ্যায় বেড়ে শক্তিশালী হয়েছেন।) এই উপমা কাফির ও অস্বীকারকারীদের ক্ষোভ ও ক্রোধে জ্বালিয়ে দিয়েছে। যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”3

সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস শরীফ:

“আমার সাহাবীগণকে গালি দিয়ো না! আমার সাহাবীগণের পরে আসা কোনো ব্যক্তি পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ সদকা করলেও আমার কোনো সাহাবীর এক মুঠো যব দান করে অর্জিত সওয়াব, এমনকি তার অর্ধেকও লাভ করতে পারবে না!”4

“মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তাআলার রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে (সাহাবায়ে কেরাম), তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর, আর পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র (অত্যন্ত স্নেহশীল)” ফাতহ: ২৯

“আমার সাহাবীগণ আকাশের তারকার মতো। তাঁদের যে কারও অনুসরণ করো, হিদায়াত লাভ করবে।”5

“আমার সাহাবীগণের সঙ্গে শত্রুতা করা থেকে বেঁচে থাকো! আল্লাহকে ভয় করো! যে তাঁদের ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে বলেই তাঁদের ভালোবাসে। যে তাঁদের সঙ্গে শত্রুতা করে, সে আমার সঙ্গেই শত্রুতা করে। যে তাঁদের কষ্ট দেয়, সে আমাকেই কষ্ট দেয়। আর যে আমাকে কষ্ট দেয়, সে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেয়।”

“আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা আমার যুগে আছে। তাদের পরে সর্বোত্তম তারা, যারা তাদের পরে আসবে। তাদের পরে সর্বোত্তম তারা, যারা আরও পরে আসবে।”

“যে মুসলমান আমাকে দেখেছে এবং যে আমাকে দেখেছে তাকে দেখেছে, জাহান্নামের আগুন তাকে পোড়াবে না।”6

ওপরের পবিত্র আয়াত ও হাদীস শরীফগুলো সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।

দ্বীনি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য সূত্র। কেননা তাঁরা আমাদের নবীর কাছ থেকে পবিত্র কুরআন শিখে তাঁদের পরবর্তীদের শিখিয়েছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের নবীর কাজ ও কথা সম্পর্কিত জ্ঞান তাঁদের নিজের চোখে দেখা ও নিজের কানে শোনা বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

তাঁদের সম্মিলিতভাবে বর্ণিত বিধানসমূহই হাদীস শরীফের ভিত্তি রচনা করেছে। ইসলামে ইজমায়ে উম্মত, অর্থাৎ আলেমগণের ঐকমত্য, কেবল সাহাবীগণের যুগেই পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এ ছাড়া সাহাবীগণের প্রত্যেকে এমন মুজতাহিদ আলেম, দ্বীনের ব্যাপারে যাঁর কথা দলিল ও প্রমাণ। তাঁরা পরবর্তী মুজতাহিদগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আহলে সুন্নতের আলেমগণ সাহাবায়ে কেরামকে শ্রেষ্ঠত্বের ক্রম অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করেছেন: ১. মুহাজিরগণ: মক্কা নগরী বিজয়ের আগে যাঁরা মক্কা বা অন্যান্য স্থান থেকে নিজেদের জন্মভূমি ও আপনজন ছেড়ে মদিনা নগরীতে হিজরত করেছেন। তাঁরা ঈমান নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে এসেছেন কিংবা এসে ঈমান এনেছেন। হযরত আমর ইবনে আস তাঁদের অন্যতম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)।

২. আনসারগণ: মদিনা নগরীতে বা এর কাছাকাছি স্থানে বসবাসকারী এবং আওস ও খাজরাজ নামের দুই গোত্রভুক্ত মুসলমানদের আনসার বলা হয়। কেননা তাঁরা মহানবী ও মক্কাবাসী মুসলমানদের সব ধরনের সাহায্য ও আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং নিজেদের কথা রেখেছিলেন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)।

৩. অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম: যাঁরা মুহাজিরও নন, আনসারও নন, কিন্তু অন্যান্য স্থান থেকে এসে মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্নিধ্যের মর্যাদা লাভ করেছেন, সেই মুসলমানগণ। মক্কা নগরী বিজয়ের সময় বা অন্যান্য স্থানে যাঁরা ঈমান এনেছেন, তাঁরা এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের কেবল সাহাবী বলা হয় (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন রাসূলুল্লাহর চার খলিফা। খিলাফতের ক্রম অনুযায়ী তাঁরা হলেন: হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান ও হযরত আলি। তাঁদের পরে শ্রেষ্ঠ হলেন আশারায়ে মুবাশশারা, অর্থাৎ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের অবশিষ্ট ছয়জন (তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, জুবাইর ইবনে আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সাঈদ ইবনে জায়েদ, আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ), এবং হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)।

তাঁদের পরে শ্রেষ্ঠ হলেন সবার আগে মুসলমান হওয়া চল্লিশজন। তারপর বদরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া তিনশো তেরোজন সাহাবী। তারপর উহুদের যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাতশো বীর। তাঁদের পরে শ্রেষ্ঠ হলেন সেই চৌদ্দশোজন, যাঁরা হিজরতের ষষ্ঠ বছরে গাছের নিচে রাসূলুল্লাহর কাছে “মৃত্যু আছে, ফিরে যাওয়া নেই!” বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। এই অঙ্গীকারকে “বাইআতে রিদওয়ান” বলা হয়।7

সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা: মক্কা বিজয়ের সময় বারো হাজার, তাবুক অভিযানে ত্রিশ হাজার, বিদায় হজে নব্বই হাজার সাহাবী ছিলেন, আর রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের সময় পৃথিবীতে প্রায় এক লাখ চব্বিশ হাজার সাহাবী ছিলেন। এ বিষয়ে আরও বর্ণনা রয়েছে।8

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সবার শেষে যাঁরা ইন্তেকাল করেছেন: আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৮৬ সনে) কুফায় ইন্তেকাল করেন। আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াসর ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৮৮ সনে) দামেস্কে, সাহল ইবনে সাদ ৭০৯ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৯১ সনে) ১০০ বছর বয়সে মদিনায়, আনাস ইবনে মালিক ৭১১ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৯৩ সনে) বসরায় এবং আবুত তুফাইল আমির ইবনে ওয়াসিলা ৭১৮ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ১০০ সনে) মক্কায় ইন্তেকাল করেন (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)। আমাদের নবীর ইন্তেকালের পর চার খলিফার যুগেও সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম ধর্ম প্রচার ও জিহাদের ব্যাপারে নিজেদের অঙ্গীকারে অবিচল ছিলেন। তাঁরা কখনো নিজেদের অঙ্গীকার থেকে ফিরে আসেননি। সকলে একমত হয়ে ঘরবাড়ি ও জন্মভূমি ছেড়ে আরব থেকে বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেন। যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশ আর ফিরে আসেননি; যেখানে গিয়েছেন, সেখানে মৃত্যু পর্যন্ত জিহাদ করেছেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন। এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে বহু দেশ বিজিত হলো। বিজিত অঞ্চলগুলোতে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। সাহাবায়ে কেরামের সকলেই ন্যায়পরায়ণ। ইসলাম প্রচারে তাঁরা সকলে সমান অংশীদার। পবিত্র কুরআন তাঁরাই সংকলন করেছেন। হাদীস শরীফসমূহ আমাদের নবীর কাছ থেকে তাঁরাই বর্ণনা করেছেন। তাঁদের সকলকে ভালোবাসা আহলে সুন্নতের আকিদায় থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য শর্ত। (সাহাবায়ে কেরামের ইসলাম ধর্মের জন্য করা খেদমত, তাঁদের আদর্শ জীবন, ফজিলত, সকলের নাম ও জীবনী নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে। Hakikat Kitabevi প্রকাশিত “Eshâb-ı kirâm” ও “Menâkıb-ı Çihâr Yâr-i Güzîn” গ্রন্থ দুটি অত্যন্ত মূল্যবান।)

“আমার সাহাবীগণ আকাশের তারকার মতো। তাঁদের যে কারও অনুসরণ করো, হিদায়াত লাভ করবে” হাদীস শরীফ

জগৎসমূহের রবের প্রিয়তম – তিনি মুহাম্মদ,
পবিত্র দেহ, নাম আহমদ, জগতের জন্য রহমত।
খুলুকে আজিমের অধিকারী, “লাওলাকা…” সম্বোধন যাঁর প্রতি,
জ্ঞান, আদব, ফয়েজ, নূর ও প্রেমের তিনি উৎস-জ্যোতি।
হক ও বান্দার মাঝে তিনিই প্রকৃত মাধ্যম,
তাঁর বাণী আত্মার আরোগ্য, তাঁর নাম হৃদয়ের মরিচা দূর করে।
হতাশ হৃদয়ের রোগীর তিনিই প্রকৃত চিকিৎসক,
শুধু তিনি নন, তাঁর উম্মতও ফেরেশতাদের চেয়ে উচ্চ।
এই সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দাকে হক দিলেন সাহায্যকারী,
নিজের প্রিয়তম বান্দাদের করলেন তাঁর সাহাবী।
রাসূলুল্লাহ বললেন, “তাঁদের পথই আমার পথ,”
যুগের সেরা যুগ বলে দেখালেন এই যুগকেই।
মুহাম্মদ মুস্তফাকে ভালোবাসলেন প্রাণের চেয়েও বেশি,
ধন, সম্পদ, পদমর্যাদা তাঁর পথে ছেড়ে দিলেন সবই।
ইসলাম প্রচারের জন্য সানন্দে দিলেন প্রাণ,
হে রব, কী সুন্দর অবস্থা! হে রব, কী মহান সম্মান!
তাঁর এক সান্নিধ্যেই তাঁদের নফস হলো পবিত্র,
হৃদয় ভরে গেল মারিফাত, ফয়েজ, নূর আর তাজাল্লিতে।
আউলিয়ার অবস্থা তাঁরা পেলেন এক মুহূর্তে,
আর সর্বদা তাঁর অনুসরণ করলেন – কী বিরাট মর্যাদা এ যে!
তাঁরা সকলেই ন্যায়পরায়ণ, কারও প্রতি জুলুম করেন না,
নিজের নফসের জন্য তাঁরা কখনো খিলাফত চান না।
তাই তাঁরা যুদ্ধ করেন না, একে অপরকে দুঃখ দেন না,
সর্বোচ্চ মর্যাদায় তাঁরা, আর সকলেই মুজতাহিদ।