আমার প্রিয় নবী

মহানবীর সন্তানগণ

মহানবীর সাতজন সন্তান ছিলেন: তিন পুত্র ও চার কন্যা। হযরত ফাতিমা ছাড়া তাঁদের সকলেই রাসূলুল্লাহর আগে ইন্তেকাল করেন। আমাদের প্রিয় নবীর বংশধারা আমাদের মা হযরত ফাতিমার মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। তাঁর নাতি হযরত হুসাইনের বংশধরদের সাইয়্যিদ এবং হযরত হাসানের বংশধরদের শরীফ বলা হয়। সাইয়্যিদ ও শরীফদের সম্মান করা মহানবীকেই সম্মান করা। সাইয়্যিদ ও শরীফদের ভালোবাসা শেষ নিঃশ্বাসে ঈমান নিয়ে বিদায় নেওয়ার উপলক্ষ হয়।

কাসিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু): তিনি রাসূলুল্লাহর তিন পুত্রের মধ্যে প্রথম। এ কারণে রাসূলুল্লাহকে “আবুল কাসিম” বলা হতো। তিনি নবুয়তের আগে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা খাদিজাতুল কুবরা। তিনি সতেরো মাস বয়সে ইন্তেকাল করেন।1

জয়নব (রাদিয়াল্লাহু আনহা): তিনি রাসূলুল্লাহর চার কন্যার মধ্যে প্রথম। আমাদের নবীর বয়স যখন ত্রিশ বছর, তখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। নবুয়তের আগে তাঁর বিবাহ হয় তাঁর মা খাদিজার বোনের ছেলে আবুল আস ইবনে রাবির সঙ্গে।2 আবুল আস প্রথমে ঈমান আনেননি। বদরের যুদ্ধে তিনি বন্দি হন এবং স্ত্রীকে মদিনায় পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি পান। তিনি নিজের ভাইয়ের সঙ্গে তাঁকে পাঠালেন, কিন্তু কাফিররা পথ থেকে জয়নবকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। রাসূল আলাইহিস সালাম জায়েদ ইবনে হারিসাকে মক্কায় পাঠালেন এবং জয়নবকে রাতের বেলা গোপনে মদিনায় নিয়ে আসা হলো। আবুল আস হুদাইবিয়ার সফরের পর ঈমান আনেন। জয়নবকে আবার তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। জয়নব হিজরতের অষ্টম বছরে একত্রিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর দুই সন্তান রয়ে যায়। একজন আলি, তিনি বালিগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সে ইন্তেকাল করেন। অপরজন উমামা। জয়নব ফাতিমাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ওসিয়ত করে সন্তানদের ইমাম আলির হাতে সঁপে দিয়েছিলেন। তাঁর পুত্র আলি মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহর উটের পিঠে তাঁর পেছনে বসে ছিলেন। উমামাকে হযরত আলি বিবাহ করেন।3

রুকাইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা): তিনি রাসূলুল্লাহর দ্বিতীয় কন্যা। আমাদের নবীর বয়স যখন তেত্রিশ বছর, তখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা খাদিজাতুল কুবরা। তিনি অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত উসমানের স্ত্রী। আগে আবু লাহাবের পুত্র উতবার সঙ্গে তাঁর বাগদান হয়েছিল। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছেলেকে এই বাগদান ভেঙে দিতে বাধ্য করল। “তাব্বাত ইয়াদা” সূরা নাজিল হলে উতবা বিয়ের অনুষ্ঠানের আগেই তাঁকে তালাক দিল। ওহী এলে হযরত উসমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হলো। তাঁরা একসঙ্গে দুবার হাবশায়, তারপর মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন। বদরের যুদ্ধের আগে, বাইশ বছর বয়সে হযরত রুকাইয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন। হযরত উসমানকে বদরে না গিয়ে স্ত্রীর সেবা করার আদেশ দেওয়া হলো। বদরের বিজয়ের সুসংবাদ যেদিন মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছাল, সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সেদিনই তাঁকে দাফন করা হয়।4

উম্মে কুলসুম (রাদিয়াল্লাহু আনহা): তিনি রাসূলুল্লাহর তৃতীয় কন্যা। আবু লাহাবের দ্বিতীয় পুত্র উতাইবার সঙ্গে তাঁর বাগদান হয়েছিল। “তাব্বাত ইয়াদা” সূরা নাজিল হলে উতাইবা বিয়ের অনুষ্ঠানের আগেই তাঁকে তালাক দিল এবং রাসূলুল্লাহকে কষ্টদায়ক কথা বলল। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার বিরুদ্ধে বদদোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তোমার হিংস্র প্রাণীগুলোর একটিকে তার ওপর লেলিয়ে দাও!” শামের পথে একটি সিংহ তাকে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলল। রুকাইয়ার ইন্তেকালের পর ওহী এলে উম্মে কুলসুমেরও হযরত উসমানের সঙ্গে বিবাহ হলো। তিনি হিজরতের নবম বছরে ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান, আর তাঁকে দাফন করার সময় তিনি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর চোখ মুবারক থেকে অশ্রু ঝরছিল।5

ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা): তিনি রাসূলুল্লাহর চতুর্থ কন্যা, হযরত আলির স্ত্রী এবং হযরত উমরের শাশুড়ি। বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিল পনেরো বছর।6 “মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া” গ্রন্থে সাবিক গাজওয়ার আলোচনায় লেখা আছে যে, তাঁর মোহর ছিল চারশো মিসকাল রুপা। এর পরিমাণ ৫৭.১৪ মিসকাল স্বর্ণের সমান। (আজকের হিসাবে তা ৩৮টি স্বর্ণ লিরা।) আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বয়স তখন ছিল পঁচিশ বছর। তিনি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। ফাতিমা ছিলেন ফরসা ও অপরূপ সুন্দরী। তিনি হিজরতের তেরো বছর আগে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরতের একাদশ বছরে চব্বিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর হাসান, হুসাইন ও মুহসিন নামে তিন পুত্র এবং উম্মে কুলসুম ও জয়নব নামে দুই কন্যা ছিলেন।7

রাসূলুল্লাহর বংশধারা ফাতিমার মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। জয়নবের বিবাহ হয় আবদুল্লাহ ইবনে জাফর তাইয়ারের সঙ্গে। তাঁদের আলি ও উম্মে কুলসুম নামে সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের বংশধরদের শরীফে জাফরি বলা হয়।

“আমার আহলে বাইত নূহ আলাইহিস সালামের নৌকার মতো। যে তাঁদের অনুসরণ করবে, সে নাজাত পাবে। বাকিরা ধ্বংস হবে” হাদীস শরীফ

১. জান্নাতুল বাকি – মদিনা মুনাওয়ারা
২. আহলে বাইত
৩. বানাতুন নবী (মহানবীর কন্যাগণ)
৪. শুহাদাউল বাকি (জান্নাতুল বাকির শহিদগণ)
৫. আজওয়াজুন নবী (মহানবীর স্ত্রীগণ)
৬. ইমাম মালিক

জান্নাতুল বাকির মাজারগুলো ভেঙে ফেলার আগের অবস্থা

আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু): তিনি খাদিজাতুল কুবরার গর্ভে জন্ম নেওয়া রাসূলুল্লাহর শেষ সন্তান। তিনি নবুয়তের পর জন্মগ্রহণ করেন এবং দুধের শিশু অবস্থাতেই ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাইয়িব ও তাহিরও বলা হয়। আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর আস ইবনে ওয়াইল বলল, “মুহাম্মদ আবতার হয়ে গেল”; এর দ্বারা সে বোঝাতে চাইল যে, তাঁর বংশধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা “ইন্না আতাইনা” সূরার মাধ্যমে কাফির আসকে জবাব দিলেন।8

ইবরাহিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু): তিনি রাসূলুল্লাহর পুত্রদের মধ্যে তৃতীয় এবং তাঁর সকল সন্তানের মধ্যে সর্বশেষ। তিনি হযরত মারিয়ার পুত্র। হযরত মারিয়াকে হিরাক্লিয়াসের মিসরীয় শাসনকর্তা মুকাওকিস উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিল। তিনি হিজরতের অষ্টম বছরে জন্মগ্রহণ করেন এবং দেড় বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি অসুস্থ থাকাকালে রাসূলুল্লাহ তাঁকে কোলে তুলে নিতেন, তখন তাঁর চোখ মুবারক থেকে অশ্রু ঝরত। ইবরাহিমের ইন্তেকালের পর তিনি বললেন, “হে ইবরাহিম! তোমার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। আমাদের চোখ কাঁদছে, আমাদের হৃদয় ব্যথিত। কিন্তু আমরা এমন কোনো কথা বলব না, যা আমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করে।”9 তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হলো। সেদিন সূর্যগ্রহণ হলো। লোকেরা বলল, “তাঁর ইন্তেকালের কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে।” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ কথা শুনে বললেন, “চাঁদ ও সূর্য আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও একত্বের সাক্ষ্য বহনকারী দুটি সৃষ্টি। কারও মৃত্যু বা বেঁচে থাকার কারণে এদের গ্রহণ হয় না। এদের গ্রহণ দেখলে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করো!”

হে আল্লাহ! ফাতিমার সন্তানদের খাতিরে,
আমার শেষ কথা যেন হয় তাওহিদের কালিমা!
এ দোয়া ফিরিয়ে দাও কিংবা কবুল করো,
আঁকড়ে ধরেছি আমি নবীর আহলে বাইতের আঁচল।

আহলে বাইতে রাসূল (আলে রাসূল – আলে আবা)

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আহলে বাইত সম্পর্কে মর্মার্থে ইরশাদ করেন: “আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে রিজস, অর্থাৎ সকল ত্রুটি ও অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদের পরিপূর্ণ পবিত্রতায় পবিত্র করতে চান।”10

সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আহলে বাইত কারা?” এমন সময় ইমাম আলি এলেন। মহানবী তাঁকে নিজের বরকতময় আবার (চাদরের) নিচে টেনে নিলেন। তারপর একে একে ফাতিমাতুজ জাহরা, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন এলেন। তাঁদের প্রত্যেককে এক পাশে টেনে নিয়ে তিনি বললেন, “এঁরাই আমার আহলে বাইত।” এই মহান ব্যক্তিদের “আলে আবা ও আলে রাসূল” নামেও ডাকা হয়।11

নবীর আহলে বাইতকে ভালোবাসা ঈমান নিয়ে আখিরাতে যাওয়ার এবং শেষ নিঃশ্বাসে নাজাত লাভের উপলক্ষ হয়। আহলে বাইতকে ভালোবাসা প্রত্যেক মুমিনের ওপর ফরজ। সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “আমার আহলে বাইত নূহ আলাইহিস সালামের নৌকার মতো। যে তাঁদের অনুসরণ করবে, সে নাজাত পাবে। বাকিরা ধ্বংস হবে।”12

নবীর আহলে বাইতের ফজিলত ও পূর্ণতা অগণিত। গুনে শেষ করা যায় না। তাঁদের বর্ণনা ও প্রশংসা করার সাধ্য মানুষের নেই। তাঁদের মূল্য ও মহত্ত্ব কেবল পবিত্র আয়াতের মাধ্যমেই বোঝা যায়।

সেখানে আছেন আলি, হাসান ও হুসাইন,
তাঁদের প্রেম হৃদয়ে, তাঁদের ভালোবাসা প্রাণে।
কাল হাশরের দিনে মহা আদালতে,
হে মুহাম্মদ, আমার প্রাণ তোমাকেই চায়।
আরাফাত পাহাড় – সে তো আমাদের পাহাড়,
সেখানেই কবুল হয় দোয়া আমাদের।
মদিনায় শুয়ে আছেন আমাদের নবী,
হে মুহাম্মদ, আমার প্রাণ তোমাকেই চায়।

ইমাম শাফেয়ি এ কথা সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন: “হে রাসূলের আহলে বাইত! আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আপনাদের ভালোবাসার আদেশ দিয়েছেন। যারা নামাজে আপনাদের জন্য দোয়া করে না, তাদের নামাজ কবুল না হওয়াই আপনাদের মূল্য ও উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করে। আপনাদের মর্যাদা কত মহান যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আপনাদের সালাম জানিয়েছেন!” হযরত আনাস বলেন, “রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আহলে বাইতের মধ্যে আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন?’ তিনি বললেন, ‘হাসান ও হুসাইনকে।’”13

হযরত আবু হুরায়রা বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহর কাছে ছিলাম। হাসান এলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তাঁকে ভালোবাসি। তুমিও তাঁকে ভালোবাসো এবং যারা তাঁকে ভালোবাসে, তাদেরও ভালোবাসো।’ আরেকবার তিনি বললেন, ‘হাসান ও হুসাইন দুনিয়াতে আমার দুটি সুগন্ধি ফুল।’” মহানবী আরও ইরশাদ করেন, “আমার পরে আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। এ দুটিকে আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। প্রথমটি দ্বিতীয়টির চেয়ে মহান। একটি হলো আল্লাহ তাআলার কিতাব পবিত্র কুরআন, যা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত এক মজবুত রশি। দ্বিতীয়টি আমার আহলে বাইত। এ দুটি কখনো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। যে এ দুটির অনুসরণ করে না, সে আমার পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।”14

হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মহানবী হযরত আলি ও হযরত ফাতিমাকে বললেন, “তোমাদের এই কলিজার টুকরাদের জন্য একটি মানত করো!” হযরত আলি, আমাদের মা ফাতিমা এবং তাঁদের ফিদ্দা নামের দাসী তিন দিন করে রোজা রাখার মানত করলেন। জান্নাতের সেই দুই সুবাস আরোগ্য লাভ করলেন। কিন্তু ঘরে খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। হযরত আলি এক ইহুদির কাছ থেকে তিন সা15 যব ধার নিলেন। তিনজনই মানতের রোজার নিয়ত করলেন। হযরত ফাতিমা যবের এক সা পিষে পাঁচটি রুটি বানালেন। তাঁরা ছিলেন পাঁচজন। ইফতারের সময় হলো। তিনি পাঁচটি রুটির একটি হযরত আলির সামনে, একটি হযরত হাসানের সামনে, একটি হযরত হুসাইনের সামনে, একটি দাসী ফিদ্দার সামনে এবং একটি নিজের সামনে রাখলেন। তাঁরা ইফতার করতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক মিসকিন এসে বলল, “হে রাসূলুল্লাহর আহলে বাইত! আমি মিসকিন মুসলমানদের একজন। আমাকে কিছু খেতে দিন! আল্লাহ তাআলা আপনাদের জান্নাতের নিয়ামত দিয়ে পুরস্কৃত করুন।” তাঁরা হাতের রুটিগুলো তাকে সদকা করে দিলেন, আর নিজেরা পানি দিয়ে ইফতার করলেন। পরদিন তাঁরা আবার রোজা রাখলেন। দাসী আরও এক সা যব পিষে আবার পাঁচটি রুটি বানালেন। ইফতারের সময় রুটিগুলো সামনে নিয়ে তাঁরা ইফতার করতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় এক ইয়াতিম এল। পাঁচজনই রুটিগুলো তাকে দিয়ে সেই ইয়াতিমকে খুশি করলেন, আর নিজেরা পানি দিয়ে ইফতার করে ঘুমিয়ে পড়লেন। তৃতীয় দিনও তাঁরা রোজা রাখলেন। অবশিষ্ট শেষ এক সা যব দিয়ে আবার পাঁচটি রুটি বানিয়ে সামনে রাখলেন। ইফতার করতে যাবেন, এমন সময় এক বন্দি এসে বলল, “তিন দিন ধরে আমি ক্ষুধার্ত। আমাকে বেঁধে রেখেছিল, খেতেও দেয়নি। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য আমার প্রতি দয়া করুন!” পাঁচজনই রুটিগুলো তাকে দিয়ে আবার পানি দিয়ে ইফতার করলেন। এ ঘটনার পর নাজিল হওয়া পবিত্র আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা মর্মার্থে ইরশাদ করেন, “তারা নিজেদের মানত পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ ও স্থায়ী কিয়ামত দিবসের ভয়ে তারা নিজেদের অতি প্রিয়, মনের আকাঙ্ক্ষিত খাবার মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিকে দিয়েছে এবং বলেছে, ‘আমরা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের খাইয়েছি। তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা আশা করি না, কিছুই চাই না।’”16 “এ কারণে মহান আল্লাহ তাদের শারাবান তাহুরা (পরিশুদ্ধ পানীয়) পান করালেন…”17 আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমাদের নবী ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা আমার পরে আমার আহলে বাইতের প্রতি সদাচরণ করে।”

“যারা আমার আহলে বাইত ও আমার সাহাবীগণকে গভীরভাবে ভালোবাসে, তারাই পা না পিছলে পুলসিরাত পার হবে” হাদীস শরীফ

হযরত আলি বলেন, আমাদের নবী ইরশাদ করেছেন, “যারা আমার আহলে বাইতের প্রতি সদাচরণ করে, কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য শাফায়াত করব।” “যারা আমার আহলে বাইত ও আমার সাহাবীগণকে গভীরভাবে ভালোবাসে, তারাই পা না পিছলে পুলসিরাত পার হবে।”

হযরত ইমাম রব্বানি যে হাদীস শরীফটি উল্লেখ করেছেন, তাতে ইরশাদ হয়েছে, “যে আলিকে ভালোবাসে, সে নিশ্চয়ই আমাকে ভালোবাসে। যে তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করে, সে নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে শত্রুতা করে। যে তাঁকে কষ্ট দেয়, সে নিশ্চয়ই আমাকে কষ্ট দেয়। আর যে আমাকে কষ্ট দেয়, সে আল্লাহ তাআলাকেই কষ্ট দেয়।”

রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে চারজনকে ভালোবাসার আদেশ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি নিজেও তাঁদের ভালোবাসেন।” তখন জিজ্ঞেস করা হলো, “তাঁরা কারা? তাঁদের নাম কি আমাদের বলবেন?”

তিনি বললেন, “আলি তাঁদের একজন, আলি তাঁদের একজন, আলি তাঁদের একজন; আর আবু জর, মিকদাদ ও সালমান।”

“আমার পরিবারের কারণে যারা আমাকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।”

এক হাদীস শরীফে তিনি আরও বলেছেন, “ফাতিমা আমার একটি অংশ (অর্থাৎ আমার দেহের একটি টুকরা)। যে তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়।” হযরত আবু হুরায়রা বলেন, “মহানবী হযরত আলিকে বলেছিলেন, ’ফাতিমা আমার কাছে তোমার চেয়ে বেশি প্রিয়। আর তুমি আমার কাছে তাঁর চেয়ে বেশি আজিজ (অর্থাৎ মূল্যবান)!’”18

তিনি আরও ইরশাদ করেন, “তোমাদের কাছে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আসার বিনিময়ে আমি কোনো প্রতিদান চাই না। আমি শুধু চাই, তোমরা আমার নিকটাত্মীয় আহলে বাইতকে ভালোবাসো।”

ইসলামের আলেমগণ আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসাকে শেষ নিঃশ্বাসে ঈমান নিয়ে বিদায় নেওয়ার শর্ত মনে করেছেন। আহলে বাইতের মধ্যে রয়েছে রাসূলুল্লাহর কণা। আহলে বাইতকে মূল্য দেওয়া, তাঁদের সম্মান করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। মহান ইসলামি আলেম ইমাম রব্বানি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন, “আমার পিতা জাহিরি ও বাতিনি, অর্থাৎ অন্তরের জ্ঞানে বড় আলেম ছিলেন। তিনি সবসময় আহলে বাইতকে ভালোবাসার উপদেশ দিতেন ও উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন, এই ভালোবাসা মানুষকে শেষ নিঃশ্বাসে ঈমান নিয়ে বিদায় নিতে অনেক সাহায্য করে। তাঁর ইন্তেকালের সময় আমি তাঁর শিয়রে ছিলাম। শেষ মুহূর্তগুলোতে যখন তাঁর চেতনা ক্ষীণ হয়ে আসছিল, তখন আমি তাঁকে এই উপদেশগুলো স্মরণ করিয়ে দিলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, সেই ভালোবাসা কেমন প্রভাব ফেলছে। সে অবস্থাতেও তিনি বললেন, ‘আমি আহলে বাইতের ভালোবাসার সাগরে সাঁতার কাটছি।’ আমি তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার হামদ ও প্রশংসা করলাম। আহলে বাইতের ভালোবাসা আহলে সুন্নতের পুঁজি। আখিরাতের সকল লাভ এই পুঁজিই এনে দেবে।”

হযরত ফাতিমা এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর যত সন্তান আসবেন, সকলেই আহলে বাইত। তাঁরা গুনাহগার হলেও তাঁদের ভালোবাসতে হবে। তাঁদের ভালোবাসা, অন্তর, শরীর ও সম্পদ দিয়ে তাঁদের সাহায্য করা, তাঁদের সম্মান করা ও খোঁজখবর রাখা ঈমান নিয়ে মৃত্যুর উপলক্ষ হয়। (সিরিয়ার হামা শহরে সাইয়্যিদদের জন্য একটি আদালত ছিল। এই বরকতময় বংশে জন্ম নেওয়া শিশুদের দুজন সাক্ষীর মাধ্যমে বিচারকের সামনে নিবন্ধন করা হতো। ইংরেজদের বিশ্বস্ত বন্ধু মুস্তফা রশিদ পাশা এই আদালত তুলে দেয়।) আহলে সুন্নতের ইমামগণ ঈমান ও ফিকহের জ্ঞান, তাসাউফের মারিফাত, এমনকি তাফসির ও হাদীসের জ্ঞানেরও অধিকাংশ আহলে বাইতের ইমামগণের কাছ থেকে শিখেছেন। তাঁরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছেন। তাঁদের সুদৃষ্টিতে উন্নীত হয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে সুসংবাদ লাভ করেছেন। মুসলমানরা রাসূলুল্লাহর আহলে বাইতকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন) সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আর যাঁরা আহলে বাইতকে ভালোবাসেন, তাঁদেরও ভালোবাসেন। আহলে বাইতকে যাঁরা ভালোবাসেন এবং আহলে বাইতের পথে চলেন, সেই সঠিক মুসলমানদের (আহলে সুন্নত) বলা হয়। আহলে সুন্নতের সকলেই প্রতিটি নামাজে আহলে বাইতের জন্য কল্যাণের দোয়া করেন।

রাসূলকে দেখেছেন যে মুমিন, “সাহাবী” তাঁর নাম,
সকলকে বোঝাতে বলা হলো “সাহাবায়ে কেরাম”।
নবীপ্রেমী প্রতিটি হৃদয় এক পলকে নূরে ভরে যেত,
যাঁরা তাঁর সাহাবী হলেন, কুরআন তাঁদের প্রশংসা গেয়েছে।
রাসূলুল্লাহর জন্য সবাই দিয়েছেন সম্পদ ও প্রাণ,
শান্তিতে ছড়াতেন জ্ঞান, যুদ্ধে সিংহের মতো গর্জন।
হাদীস শরীফে সাহাবীগণকে তুলনা করা হলো তারার সঙ্গে,
যাঁরই অনুসরণ করো, পৌঁছাবে আলোকিত পথে।
সাহাবীগণ একে অপরকে ভালোবাসতেন, করতেন প্রশংসা,
পরে আসা মুসলমানরাও সবাই বলেছেন এই কথা।
কুরআন আর হাদীস তাঁরাই পৌঁছে দিয়েছেন আমাদের কাছে,
তাঁদের হৃদয়ের পবিত্রতায় মনে আস্থা জেগেছে।
তাঁদের একজনকেও গালি দিলে আহত হয় ইসলাম,
সাহাবীর নিন্দুক অস্বীকার করে কুরআনের কালাম।
সত্যিকার মুসলমান হলে সম্মান করো প্রত্যেককে,
সবার আগে দরুদ-সালাম পাঠাও রাসূলের আহলে বাইতের প্রতি!