আমার প্রিয় নবী

মহানবীর মুজিযাসমূহ

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম যে আল্লাহ তাআলার নবী, তার সাক্ষ্য-প্রমাণ গুনে শেষ করা যায় না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “তুমি না হলে আমি জগৎ সৃষ্টি করতাম না!”1 সকল সৃষ্টি যেমন আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও একত্বের সাক্ষ্য দেয়, তেমনি মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নবী হওয়া এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বেরও সাক্ষ্য দেয়। তাঁর উম্মতের আউলিয়ার মধ্যে যত কারামত প্রকাশ পেয়েছে, সবই তাঁর মুজিযা। কেননা কারামত প্রকাশ পায় তাঁর অনুসারীদের মধ্যে, তাঁর পথে যাঁরা চলেন তাঁদের মধ্যে। এমনকি সকল নবী তাঁর উম্মত হতে চেয়েছিলেন বলে, আরও সঠিকভাবে বললে তাঁরা সকলে তাঁর নূর থেকে সৃষ্ট বলে, তাঁদের মুজিযাসমূহও মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মুজিযার অন্তর্ভুক্ত গণ্য হয়। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মুজিযাসমূহ সময়ের দিক থেকে তিন ভাগে বিভক্ত:

প্রথম ভাগ – তাঁর রুহ মুবারক সৃষ্টি হওয়া থেকে শুরু করে তাঁর নবুয়ত ঘোষিত হওয়ার সময়, অর্থাৎ বিসত পর্যন্ত যা ঘটেছে। দ্বিতীয় ভাগ – বিসত থেকে তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যা ঘটেছে।

তৃতীয় ভাগ – তাঁর ইন্তেকাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটেছে ও ঘটবে। এগুলোর প্রথম ভাগকে ইরহাস বলা হয়। প্রতিটি ভাগ আবার দুই প্রকার: চোখে দেখা মুজিযা এবং না দেখে বুদ্ধি দিয়ে উপলব্ধি করা মুজিযা। সকল মুজিযা এত বেশি যে, তার সীমা টানা বা গুনে শেষ করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় ভাগের মুজিযা প্রায় তিন হাজার বলে জানানো হয়েছে। নিচে এগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকটি উল্লেখ করা হলো। ১. মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মুজিযাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় মুজিযা হলো পবিত্র কুরআন। আজ পর্যন্ত যত কবি ও সাহিত্যিক এসেছেন, সকলেই পবিত্র কুরআনের বাক্যবিন্যাস ও অর্থের সামনে অক্ষম ও বিস্মিত হয়ে পড়েছেন। তাঁরা একটি পবিত্র আয়াতের মতো আয়াতও বলতে পারেননি। এর ইজাজ (অলৌকিক অনন্যতা) ও বালাগাত (অলংকারপূর্ণ বাকশৈলী) মানুষের কথার মতো নয়। অর্থাৎ এ থেকে একটি শব্দ বাদ দিলে কিংবা একটি শব্দ যোগ করলে এর শব্দের ও অর্থের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। এর একটি শব্দের জায়গায় বসানোর জন্য যাঁরা অন্য শব্দ খুঁজেছেন, তাঁরা তা খুঁজে পাননি। এর বাক্যবিন্যাস আরব কবিদের কবিতার মতো নয়। অতীতে ঘটে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে ঘটবে এমন বহু গোপন বিষয়ের সংবাদ এতে দেওয়া হয়েছে। যারা এটি শোনে ও পড়ে, এর স্বাদে তাদের তৃপ্তি কখনো মেটে না। ক্লান্ত হলেও বিরক্ত হয় না। এটি পড়া ও শোনা দুশ্চিন্তা দূর করে – অসংখ্য অভিজ্ঞতায় তা প্রমাণিত হয়েছে। এটি শুনে যাদের হৃদয়ে ভীতি ও আতঙ্ক নেমে এসেছে, এমনকি এ কারণে যারা মারা গেছে, এমন লোকও দেখা গেছে। ইসলামের বহু কট্টর শত্রুর হৃদয় পবিত্র কুরআন শুনে নরম হয়েছে এবং তারা ঈমান এনেছে। ইসলামের শত্রুদের মধ্যে এবং মুআত্তিলা, মালাহিদা ও কারামিতা নামে পরিচিত, মুসলমান নাম বহনকারী জিন্দিকদের মধ্যে এমন লোক ছিল, যারা পবিত্র কুরআনকে পরিবর্তন করতে, বিকৃত করতে কিংবা এর মতো কিছু রচনা করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের কেউই নিজ উদ্দেশ্যে সফল হতে পারেনি। অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল মানুষ সবসময় পরিবর্তন করেছে, আজও পরিবর্তন করে চলেছে। কোনো জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন সুন্দর বিষয়, উত্তম চরিত্র, মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দানকারী গুণাবলি, দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যে পৌঁছে দেয় এমন সৎকর্ম, সৃষ্টিজগতের সূচনা ও সমাপ্তি সম্পর্কিত জ্ঞান এবং মানুষের জন্য উপকারী ও ক্ষতিকর সব বিষয় পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অস্পষ্ট বিষয়গুলো এর বিশেষজ্ঞগণ বুঝতে পারেন। আসমানি কিতাবসমূহে – তাওরাত, জাবুর ও ইঞ্জিলে – যত জ্ঞান ও রহস্য রয়েছে, সবই পবিত্র কুরআনে জানানো হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান সকল জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। এর অধিকাংশ তিনি তাঁর প্রিয় নবীকে (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়েছেন। আলি ও হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা) জানিয়েছেন যে, তাঁরা এসব জ্ঞানের অনেকখানি জানেন। পবিত্র কুরআন পাঠ করা অনেক বড় নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামত তাঁর হাবিবের উম্মতকে দান করেছেন। ফেরেশতাগণ এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত। এজন্য যেখানে পবিত্র কুরআন পাঠ করা হয়, সেখানে তাঁরা সমবেত হয়ে শোনেন। সকল তাফসির পবিত্র কুরআনের জ্ঞানের খুব সামান্য অংশই প্রকাশ করে। কিয়ামতের দিন মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম মিম্বরে উঠে পবিত্র কুরআন পাঠ করলে শ্রোতারা এর সকল জ্ঞান বুঝতে পারবে। ২. মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের প্রসিদ্ধ মুজিযাসমূহের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিযা হলো চাঁদকে দুই খণ্ড করা। এই মুজিযা আর কোনো নবীর ভাগ্যে জোটেনি। মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের বয়স যখন বায়ান্ন বছর, তখন মক্কায় কুরাইশ কাফিরদের নেতারা তাঁর কাছে এসে বলল, “তুমি নবী হলে চাঁদকে দুই খণ্ড করো।” মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম চাইতেন, সবাই, বিশেষ করে তাঁর পরিচিতজন ও আত্মীয়স্বজন যেন ঈমান আনে। তিনি দুই হাত তুলে দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করে চাঁদকে দুই খণ্ড করে দিলেন। এর এক অর্ধেক একটি পাহাড়ের ওপর, অপর অর্ধেক আরেকটি পাহাড়ের ওপর দেখা গেল। কাফিররা বলল, “মুহাম্মদ আমাদের জাদু করেছে।” তারা ঈমান আনল না।

“মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের হাজার মুজিযা প্রকাশ পেয়েছে, শত্রু-মিত্র সবাই তা বলেছে। এত মুজিযার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল তাঁর আদব ও তাঁর উত্তম চরিত্র” রিয়াদুন নাসিহিন

কবিতা:
চাঁদের দিকে চেয়ে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে,
এতে চাঁদের কী দোষ আছে, বলো তবে?
কুকুরেরা তো সবসময়ই ঘেউ ঘেউ করে,
নির্বোধ এ থেকে কী-ইবা বুঝতে পারে?
বয়েত:
মুখের স্বাদ চলে যাওয়া রোগেরই লক্ষণ,
সবচেয়ে মিঠা শরবতও রোগীর মুখে তেতো তখন।

৩. কোনো কোনো গাজওয়ায় পানির অভাব দেখা দিলে মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম একটি পাত্রের পানিতে তাঁর হাত মুবারক ডুবিয়ে দিতেন; তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, আর পাত্রটি অবিরাম উপচে পড়তে থাকত। কখনো আশিজন, কখনো তিনশো, কখনো দেড় হাজার মানুষ, আর তাবুক অভিযানে সত্তর হাজার মানুষের সকলে তাদের পশুসহ এই পানি পান করেছে এবং ব্যবহার করেছে। তিনি হাত মুবারক পানি থেকে তুলে নিলে পানির প্রবাহ থেমে যেত। ৪. একদিন তিনি চাচা আব্বাসের ঘরে গিয়ে তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের নিজের কাছে বসালেন। নিজের ইহরামের চাদর দিয়ে তাঁদের ঢেকে দিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ! আমি যেমন আমার এই চাচাকে ও আমার আহলে বাইতকে ঢেকে দিয়েছি, তুমিও তেমনি তাঁদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো!” তখন দেয়াল থেকে তিনবার “আমিন” ধ্বনি শোনা গেল।2 ৫. একদিন যারা তাঁর কাছে মুজিযা দেখতে চেয়েছিল, তাদের জবাবে তিনি দূরের একটি গাছকে ডাকলেন। গাছটি শিকড় টেনে টেনে এসে সালাম দিল এবং বলল, “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।” তারপর ফিরে গিয়ে নিজের জায়গায় আবার দাঁড়িয়ে গেল। ৬. খায়বার অভিযানে তাঁর সামনে বিষ মেশানো ভুনা বকরির গোশত রাখা হলে একটি আওয়াজ শোনা গেল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে খাবেন না, আমি বিষাক্ত।”

৭. একদিন এক লোকের হাতে একটি মূর্তি দেখে তিনি তাকে বললেন, “মূর্তিটি যদি আমার সঙ্গে কথা বলে, তুমি কি ঈমান আনবে?” লোকটি বলল, “আমি পঞ্চাশ বছর ধরে এর পূজা করছি। এটি আমাকে কোনো দিন একটি কথাও বলেনি। আপনাকে কীভাবে বলবে?” মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম বললেন, “হে মূর্তি! আমি কে?” তখন আওয়াজ শোনা গেল, “আপনি আল্লাহর নবী।” মূর্তির মালিক সঙ্গে সঙ্গে ঈমান আনল।

৮. মদিনায় মসজিদে নববিতে খেজুরগাছের একটি গুঁড়ি পোঁতা ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুতবা দেওয়ার সময় এই খুঁটিতে হেলান দিতেন। একে হান্নানা বলা হতো। মিম্বর তৈরি হলে তিনি আর হান্নানার কাছে গেলেন না। তখন সমবেত সবাই তার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। আমাদের নবী মিম্বর থেকে নেমে হান্নানাকে জড়িয়ে ধরলেন। আওয়াজ থেমে গেল। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “আমি যদি একে জড়িয়ে না ধরতাম, তাহলে আমার বিচ্ছেদে এটি কিয়ামত পর্যন্ত কাঁদত।”

এ ধরনের মুজিযা বহুবার দেখা গেছে এবং বর্ণিত হয়েছে। ৯. তিনি হাতে যে নুড়িপাথর তুলে নিতেন এবং যে খাবারের টুকরা ধরতেন, সেগুলো মৌমাছির গুঞ্জনের মতো আওয়াজে আল্লাহ তাআলার তাসবিহ পাঠ করছে – এমনটি বহুবার দেখা গেছে।

১০. একদিন এক কাফির এসে বলল, “তুমি যে নবী, তা আমি কী করে বুঝব?” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “ওই খেজুরগাছের কাঁদিটিকে যদি আমি ডাকি আর সেটি চলে আসে, তুমি কি ঈমান আনবে?” কাফির বলল, “হ্যাঁ, ঈমান আনব।” রাসূলুল্লাহ খেজুরের কাঁদিটিকে ডাকলেন, আর সেটি লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এল। রাসূলুল্লাহ বললেন, “নিজের জায়গায় ফিরে যাও!” কাঁদিটি গাছে উঠে নিজের জায়গায় ঝুলে গেল। এ দৃশ্য দেখে কাফির ঈমান আনল। ১১. মক্কায় কয়েকটি নেকড়ে একটি পাল থেকে বকরি ছিনিয়ে নিয়ে গেল। রাখাল তেড়ে গিয়ে নেকড়েদের কবল থেকে বকরিগুলো উদ্ধার করলে একটি নেকড়ে বলল, “আল্লাহ তাআলা আমাদের যে রিজিক পাঠিয়েছেন, তা আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিতে গিয়ে তুমি কি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করলে না?” রাখাল বলল, “ভারি আশ্চর্য! নেকড়েও কথা বলে নাকি?” তখন নেকড়েটি বলল, “এর চেয়েও আশ্চর্য বিষয়ের খবর দেব কি? মদিনায় আল্লাহ তাআলার নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুজিযা দেখাচ্ছেন।” রাখাল এসে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ঘটনা জানাল এবং মুসলমান হয়ে গেল।

১২. মহানবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন একটি তৃণভূমি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনবার “ইয়া রাসূলাল্লাহ!” ডাক শুনতে পেলেন। সেদিকে তাকিয়ে তিনি বাঁধা অবস্থায় একটি হরিণ দেখতে পেলেন। তার পাশে এক লোক ঘুমিয়ে ছিল। হরিণটি কী চায়, তিনি তা জানতে চাইলে হরিণটি বলল, “এই শিকারি আমাকে শিকার করেছে। সামনের টিলায় আমার দুটি বাচ্চা আছে। আমাকে ছেড়ে দিন! গিয়ে ওদের পেট ভরিয়ে আবার ফিরে আসব।” রাসূল আলাইহিস সালাম বললেন, “তুমি কি কথা রেখে ফিরে আসবে?” হরিণটি বলল, “আল্লাহর নামে কথা দিচ্ছি, যদি না ফিরি, আল্লাহর আজাব আমার ওপর পড়ুক!” রাসূলুল্লাহ হরিণটিকে ছেড়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর সেটি ফিরে এল। লোকটি জেগে উঠে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য আপনার কোনো আদেশ আছে কি?” মহানবী বললেন, “এই হরিণটিকে মুক্ত করে দাও!” লোকটি হরিণের দড়ি খুলে তাকে ছেড়ে দিল। হরিণটি বলল, “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নাকা রাসূলুল্লাহ”, তারপর চলে গেল।

১৩. একদিন তিনি এক গ্রাম্য লোককে ঈমানের দাওয়াত দিলেন। লোকটি বলল, “আমার এক মুসলমান প্রতিবেশীর মেয়ে মারা গেছে, তাকে যদি জীবিত করতে পারেন, তাহলে ঈমান আনব।” তাঁরা মেয়েটির কবরের কাছে গেলেন, আর রাসূলুল্লাহ নাম ধরে মেয়েটিকে ডাকলেন। প্রথমে কবরের ভেতর থেকে আওয়াজ শোনা গেল, তারপর মেয়েটি বেরিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাও?” মেয়েটি বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি দুনিয়ায় ফিরতে চাই না। এখানে আমি আমার বাবার ঘরের চেয়েও বেশি আরামে আছি। মুসলমানের আখিরাত তার দুনিয়ার চেয়ে উত্তম।” এ দৃশ্য দেখে গ্রাম্য লোকটি তৎক্ষণাৎ ঈমান আনল। ১৪. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) একটি বকরি রান্না করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীগণকে নিয়ে তা খেলেন। তিনি বললেন, “হাড়গুলো ভেঙো না!” তারপর হাড়গুলো একত্র করে সেগুলোর ওপর হাত মুবারক রেখে দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা বকরিটিকে জীবিত করে দিলেন। ১৫. রাসূলুল্লাহর কাছে এমন একটি শিশুকে আনা হলো, যে বড় হয়েও কখনো কথা বলেনি। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কে?” শিশুটি উত্তর দিল, “আপনি আল্লাহর রাসূল।” এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সে কথা বলতে পারত।

“হে আল্লাহ! আমি যেমন আমার এই চাচাকে (আব্বাসকে) ও আমার আহলে বাইতকে ঢেকে দিয়েছি, তুমিও তেমনি তাঁদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো!” হাদীস শরীফ

১৬. এক ব্যক্তি সাপের ডিমে পা রাখায় তার দুই চোখেরই দৃষ্টি চলে গেল। তাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে আনা হলো। তিনি তাঁর থুতু মুবারক তার চোখে লাগিয়ে দিলে সে আবার দেখতে লাগল। এমনকি আশি বছর বয়সেও সে সুইয়ে সুতা পরাতে পারত।

১৭. মুহাম্মদ ইবনে হাতিব বলেন, “আমি তখন ছোট ছিলাম। আমার গায়ে গরম পানি পড়ে শরীর পুড়ে গেল। আমার বাবা আমাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি হাত মুবারক দিয়ে নিজের থুতু পোড়া জায়গাগুলোতে লাগিয়ে দিলেন এবং দোয়া করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পোড়া জায়গাগুলো সেরে গেল।”

১৮. এক মহিলা তার টাকমাথা ছেলেকে নিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ তার মাথায় হাত মুবারক বুলিয়ে দিলেন। ছেলেটি আরোগ্য লাভ করল, আর তার মাথায় চুল গজাতে লাগল।

১৯. তিরমিজি ও নাসায়ির “সুনান” গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে: দুই চোখে অন্ধ এক ব্যক্তি এসে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! দোয়া করুন, যেন আমার চোখ খুলে যায়।” মহানবী দয়াপরবশ হয়ে তাকে নিখুঁতভাবে অজু করতে এবং তারপর এই দোয়া পড়তে বললেন: “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে মিনতি করছি। তোমার প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে মাধ্যম বানিয়ে তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। হে আমার অতি প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ! আপনাকে উসিলা বানিয়ে আমি আমার রবের কাছে মিনতি করছি। আপনার খাতিরে তিনি যেন আমার দোয়া কবুল করেন, এই প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! এই মহান নবীকে আমার জন্য শাফায়াতকারী বানাও! তাঁর সম্মানে আমার দোয়া কবুল করো!” লোকটি অজু করে দোয়া করার পর তার চোখ খুলে গেল। মুসলমানরা সবসময় এই দোয়া পড়েছেন এবং নিজেদের মনোবাসনা পূর্ণ করেছেন। ২০. রাসূলুল্লাহ আবু তালিবের সঙ্গে এক মরুভূমি দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু তালিব জানালেন যে, তাঁর খুব পিপাসা পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাহন থেকে মাটিতে নেমে বললেন, “আপনার কি পিপাসা পেয়েছে?” তারপর তাঁর পা মুবারকের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। মাটি ফুঁড়ে পানি বেরিয়ে এল। তিনি বললেন, “চাচাজান, এই পানি পান করুন!” ২১. হুদাইবিয়ার সফরে তাঁরা অল্প পানির একটি কূপের কাছে যাত্রাবিরতি করলেন। সৈন্যরা পানির অভাবের কথা জানাল। রাসূলুল্লাহ এক বালতি পানি চাইলেন। তিনি সেই পানি থেকে অজু করলেন, তাতে থুতু দিলেন এবং তা কূপে ঢেলে দিতে বললেন। তারপর একটি তির নিয়ে কূপে ফেলে দিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁরা দেখলেন, কূপটি কানায় কানায় পানিতে ভরে গেছে।

২২. এক গাজওয়ায় সৈন্যরা পানির অভাবের কথা জানাল। রাসূল আলাইহিস সালাম দুজন সৈন্যকে পানির খোঁজে পাঠালেন। তারা দেখল, এক মহিলা উটের পিঠে দুই মশক ভরা পানি নিয়ে যাচ্ছে; তারা তাকে নিয়ে এল। রাসূল আলাইহিস সালাম মহিলার কাছে কিছু পানি চাইলেন। তা একটি পাত্রে ঢালালেন। গোটা বাহিনী পালাক্রমে এসে নিজেদের পাত্র ও মশক ভরে নিল। মহিলাকে কিছু খেজুর দেওয়া হলো এবং তার মশকগুলোও পানিতে ভরে দেওয়া হলো।

রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, “আমরা তোমার পানি একটুও কমাইনি। আমাদের পানি দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা।”

২৩. মদিনায় তিনি মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! খরায় আমাদের সন্তান, আমাদের পশু, আমাদের খেত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সাহায্য করুন!” তিনি দুই হাত তুলে দোয়া করলেন। আকাশে এক টুকরা মেঘও ছিল না; কিন্তু তিনি হাত মুবারক চেহারায় বুলিয়ে নেওয়ার আগেই মেঘ জমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হলো। কয়েক দিন ধরে তা চলল। তিনি আবার মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন সেই লোকটি বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! বৃষ্টিতে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব।” তখন রাসূল আলাইহিস সালাম মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহ! তোমার রহমত তোমার অন্য বান্দাদেরও দান করো!” মেঘ কেটে গেল, সূর্য দেখা দিল। ২৪. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন: আমার অনেক ঋণ ছিল। আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা জানালাম। তিনি আমার বাগানে এসে খেজুরের স্তূপের চারপাশে তিনবার ঘুরলেন। তারপর বললেন, “তোমার পাওনাদারদের ডাকো, তারা আসুক!” তাদের প্রত্যেককে তার প্রাপ্য দেওয়া হলো, অথচ স্তূপ থেকে কিছুই কমল না। ২৫. এক মহিলা উপহার হিসেবে মধু পাঠাল। রাসূল আলাইহিস সালাম মধু গ্রহণ করে খালি পাত্রটি ফেরত পাঠালেন। আল্লাহ তাআলার কুদরতে পাত্রটি মধুতে ভরা অবস্থায় ফিরে গেল। মহিলাটি এসে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার অপরাধ কী? আমার উপহার কেন গ্রহণ করলেন না?” তিনি বললেন, “আমরা তোমার উপহার গ্রহণ করেছি। তুমি যে মধু দেখছ, তা তোমার উপহারের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার দেওয়া বরকত।” মহিলাটি খুশি হয়ে মধু ঘরে নিয়ে গেল। সন্তান-পরিজন নিয়ে মাসের পর মাস তারা তা খেল, অথচ মধু একটুও কমল না। একদিন ভুল করে তারা মধু অন্য পাত্রে ঢেলে রাখল। সেখান থেকে খেতে খেতে তা শেষ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহকে এ কথা জানানো হলে তিনি বললেন, “আমার পাঠানো পাত্রে থাকলে দুনিয়া যত দিন টিকে থাকত, তারা তত দিন খেতে পারত, তা একটুও কমত না।”

২৬. আবু হুরায়রা বলেন: আমি রাসূলুল্লাহর কাছে কয়েকটি খেজুর আনলাম এবং সেগুলোতে বরকত দানের জন্য দোয়া করতে অনুরোধ করলাম। তিনি সেগুলো বরকতময় হওয়ার জন্য দোয়া করলেন এবং আমাকে বললেন, “এগুলো নাও, তোমার পাত্রে রাখো। যখন এ থেকে নিতে চাইবে, হাত দিয়ে ভেতর থেকে নিয়ো; উপুড় করে ঢেলে মাটি থেকে নিয়ো না!” খেজুরভর্তি থলেটি দিনরাত কাছছাড়া না করে আমি উসমানের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যুগ পর্যন্ত তা থেকে খেয়েছি। আমার সঙ্গীদেরও খাইয়েছি, মুঠো মুঠো সদকাও করেছি। উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যেদিন শহিদ হন, সেদিন আমার থলেটি হারিয়ে যায়। ২৭. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুলাইমান আলাইহিস সালামের মতো সকল প্রাণীর ভাষা বুঝতেন। প্রাণীরা তাঁর কাছে এসে নিজেদের মালিক বা অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে – এমনটি বহুবার দেখা গেছে। রাসূলুল্লাহ তা সাহাবায়ে কেরামকে জানাতেন। হুনাইনের যুদ্ধে তিনি তাঁর বাহন “দুলদুল” নামের সাদা খচ্চরটিকে বললেন, “বসে পড়ো!” দুলদুল সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়লে তিনি মাটি থেকে এক মুঠো বালু তুলে কাফিরদের দিকে ছুড়ে দিলেন।

২৮. একদিন তিনি তাঁর স্ত্রী হাফসাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, “আবু বকর ও তোমার পিতা আমার উম্মতের শাসনভার নিজেদের হাতে নেবেন।” এ কথার মাধ্যমে তিনি আবু বকর এবং হাফসার পিতা উমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) খলিফা হওয়ার সুসংবাদ দিলেন।

“হে হাফসা! আবু বকর ও তোমার পিতা আমার উম্মতের শাসনভার নিজেদের হাতে নেবেন” হাদীস শরীফ

২৯. তিনি আবু হুরায়রাকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) মদিনায় যাকাত হিসেবে আসা খেজুর পাহারার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবু হুরায়রা এক লোককে খেজুর চুরি করতে দেখে ধরে ফেললেন এবং বললেন, “তোমাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে যাব।” কিন্তু চোর “আমি গরিব, আমার অনেক সন্তান” বলে কাকুতি-মিনতি করলে আবু হুরায়রা তাকে ছেড়ে দিলেন। পরদিন রাসূলুল্লাহ আবু হুরায়রাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “গত রাতে যে লোকটিকে ছেড়ে দিয়েছ, সে কী করেছিল?” আবু হুরায়রা ঘটনা খুলে বললে তিনি বললেন, “সে তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে। সে আবার আসবে।” পরের রাতে সে সত্যিই আবার এল এবং ধরা পড়ল। আবারও “আল্লাহর দোহাই, আমাকে ছেড়ে দাও” বলে কাকুতি-মিনতি করে সে ছাড়া পেল। তৃতীয় রাতে এসে ধরা পড়লে তার মিনতি আর কাজে এল না। তখন সে বলল, “আমাকে ছেড়ে দিলে তোমাকে এমন কয়েকটি বিষয় শিখিয়ে দেব, যা তোমার খুব উপকারে আসবে।” আবু হুরায়রা রাজি হলেন। সে বলল, “রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পড়লে আল্লাহ তাআলা তোমাকে রক্ষা করবেন, শয়তান তোমার কাছে ঘেঁষবে না।” এ কথা বলে সে চলে গেল। পরদিন রাসূলুল্লাহ আবু হুরায়রাকে আবার জিজ্ঞেস করে উত্তর পেয়ে বললেন, “এবার সে সত্য বলেছে। অথচ সে নিজে মহা মিথ্যাবাদী। তিন রাত ধরে তুমি কার সঙ্গে কথা বলেছ, জানো?” আবু হুরায়রা বললেন, “না, জানি না।” তখন তিনি বললেন, “সে ছিল শয়তান।”

৩০. বাইজান্টাইন সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তিনি মুতা নামক স্থানে সৈন্য পাঠালেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনজন আমির (জায়েদ ইবনে হারিসা, জাফর ইবনে আবি তালিব ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা) একের পর এক শহিদ হলেন। তিনি তখন মদিনায় মিম্বরের ওপর ছিলেন; আল্লাহ তাআলা তাঁকে তা দেখিয়ে দিলে তিনি পাশের লোকদের জানিয়ে দিলেন। ৩১. মুআজ ইবনে জাবালকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) ইয়েমেনে শাসনকর্তা করে পাঠানোর সময় তিনি তাঁকে মদিনার বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন, তাঁকে অনেক উপদেশ দিলেন এবং বললেন, “কিয়ামতের আগে তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।” মুআজ ইয়েমেনে থাকাকালেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় ইন্তেকাল করলেন।

৩২. ইন্তেকালের আগে তিনি তাঁর কন্যা ফাতিমাকে বললেন, “আমার আত্মীয়দের মধ্যে সবার আগে তুমিই আমার সঙ্গে মিলিত হবে।” ছয় মাস পর ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ইন্তেকাল করলেন। তাঁর আগে রাসূলুল্লাহর আত্মীয়দের মধ্যে আর কেউ ইন্তেকাল করেননি।

৩৩. তিনি কাইস ইবনে শাম্মাসকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “তুমি সুন্দর জীবন যাপন করবে এবং শহিদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।” আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) খলিফা থাকাকালে ইয়ামামায় মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের সঙ্গে সংঘটিত যুদ্ধে কাইস শহিদ হলেন। হযরত উমর ফারুক, হযরত উসমান ও হযরত আলির (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন) শহিদ হওয়ার কথাও তিনি আগাম জানিয়ে দিয়েছিলেন। ৩৪. তিনি সুসংবাদ দিলেন যে, পারস্য-সম্রাট কিসরা ও বাইজান্টাইন সম্রাট কায়সারের দেশ মুসলমানদের হাতে আসবে এবং তাদের ধনভান্ডার আল্লাহর পথে বিতরণ করা হবে। ৩৫. তিনি জানালেন যে, তাঁর উম্মতের বহু লোক সমুদ্রপথে জিহাদে যাবে এবং নারী সাহাবী উম্মে হারামও সেই জিহাদে অংশ নেবেন। হযরত উসমানের খিলাফতকালে মুসলমানরা জাহাজে করে সাইপ্রাস দ্বীপে গিয়ে যুদ্ধ করলেন। উম্মে হারামও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। সেখানে তিনি শহিদ হলেন।3

৩৬. একদিন রাসূল আলাইহিস সালাম একটি উঁচু স্থানে বসে ছিলেন। তিনি পাশের লোকদের দিকে ফিরে বললেন, “আমি যা দেখছি, তোমরাও কি তা দেখছ? কসম করে বলছি, তোমাদের ঘরবাড়ির মাঝে, অলিগলিতে যেসব ফিতনা দেখা দেবে, আমি তা দেখতে পাচ্ছি।” উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন শহিদ হন, সেই দিনগুলোতে এবং পরে ইয়াজিদের যুগে মদিনায় বড় বড় ফিতনা দেখা দেয় এবং অলিগলিতে বহু মানুষের রক্ত ঝরে।

৩৭. একদিন তিনি জানালেন যে, তাঁর স্ত্রীদের একজন খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা) এ কথা শুনে হেসে উঠলে তিনি বললেন, “হে হুমাইরা4! আমার এ কথা ভুলো না! সেই নারী যেন তুমি না হও!” তারপর আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দিকে ফিরে বললেন, “তার বিষয়টি যদি তোমার হাতে আসে, তার সঙ্গে কোমল আচরণ করো!” ত্রিশ বছর পর আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সঙ্গে যুদ্ধ করলেন এবং তাঁর হাতে বন্দি হলেন। আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসরা থেকে মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন।

৩৮. তিনি হযরত মুআবিয়াকে বললেন, “কোনো দিন যদি তুমি আমার উম্মতের শাসক হও, তাহলে যারা ভালো কাজ করে তাদের পুরস্কৃত করো, আর যারা মন্দ কাজ করে তাদের ক্ষমা করে দিয়ো!” হযরত মুআবিয়া হযরত উমর ও হযরত উসমানের যুগে বিশ বছর দামেস্কে শাসনকর্তা ছিলেন, তারপর বিশ বছর খলিফা ছিলেন। ৩৯. একদিন তিনি বললেন, “মুআবিয়া কখনো পরাজিত হবেন না।” আলি (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) সিফফিনের যুদ্ধে এই হাদীস শুনে বললেন, “আগে যদি এ কথা শুনতাম, তাহলে মুআবিয়ার (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) সঙ্গে যুদ্ধ করতাম না।” ৪০. তিনি আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) বললেন, “তোমাকে বাগি, বিদ্রোহী লোকেরা হত্যা করবে।” আম্মার আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সঙ্গে থেকে মুআবিয়ার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় শহিদ হলেন। ৪১. তিনি তাঁর কন্যা ফাতিমার পুত্র হাসান (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা) সম্পর্কে বললেন, “আমার এই পুত্র অত্যন্ত কল্যাণময়। আল্লাহ তাআলা তাঁকে মুসলমানদের দুটি বিশাল বাহিনীর মধ্যে সন্ধির উপলক্ষ বানাবেন।” হাসান যখন বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মুআবিয়ার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছিলেন, তখন ফিতনা ঠেকাতে এবং মুসলমানদের রক্ত যেন না ঝরে সেজন্য নিজের প্রাপ্য খিলাফত মুআবিয়ার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাতে অর্পণ করলেন। ৪২. আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজামা (শিঙা লাগানো) করার সময় বের হওয়া রক্ত পান করে ফেললেন। তা দেখে মহানবী বললেন, “মানুষের হাতে তোমার মাথার ওপর দিয়ে কী কী বয়ে যাবে, জানো? তোমার কারণেও মানুষের ওপর অনেক কিছু ঘটবে। জাহান্নামের আগুন তোমাকে পোড়াবে না।” আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর মক্কায় নিজের খিলাফত ঘোষণা করলে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান দামেস্ক থেকে হাজ্জাজকে বিশাল এক বাহিনী দিয়ে মক্কায় পাঠাল। তারা আবদুল্লাহকে ধরে হত্যা করল। ৪৩. তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার এক পুত্রসন্তান হবে। সে জন্ম নিলে তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো!” শিশুটিকে আনা হলে তিনি তার কানে আজান ও ইকামত দিলেন এবং নিজের মুখ মুবারকের লালা তার মুখে লাগিয়ে দিলেন। তার নাম আবদুল্লাহ রেখে তাকে মায়ের কোলে তুলে দিলেন এবং বললেন, “খলিফাদের পিতাকে নিয়ে যাও!” শিশুর পিতা হযরত আব্বাস এ কথা শুনে এসে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি এমনটিই বলেছি। এই শিশু খলিফাদের পিতা। তাদের মধ্যে সাফফাহ, মাহদি এবং ঈসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে নামাজ আদায়কারী এক ব্যক্তি থাকবেন।” আব্বাসি রাষ্ট্রের শীর্ষে বহু খলিফা এসেছেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বংশধর।

“হে মুআবিয়া! কোনো দিন যদি তুমি আমার উম্মতের শাসক হও, তাহলে যারা ভালো কাজ করে তাদের পুরস্কৃত করো, আর যারা মন্দ কাজ করে তাদের ক্ষমা করে দিয়ো!” হাদীস শরীফ

৪৪. একদিন তিনি বললেন, “আমার উম্মতের মধ্যে রাফিজি নামে পরিচিত বহু লোকের আবির্ভাব হবে। তারা ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।”

৪৫. তিনি তাঁর বহু সাহাবীর জন্য কল্যাণের দোয়া করেছেন। সেসব দোয়ার সবই কবুল হয়েছে এবং তাঁরা এর সুফল পেয়েছেন। আলি (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ইয়েমেনে কাজি (বিচারক) করে পাঠাতে চাইলেন। আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি তো বিচারকাজ জানি না।” তিনি তাঁর হাত মুবারক আমার বুকে রেখে বললেন, “হে আল্লাহ! তাঁর অন্তরে সঠিক বিষয় জানিয়ে দাও। তাঁকে সবসময় সত্য বলার তাওফিক দাও!” এরপর আমার কাছে যারা নালিশ নিয়ে আসত, তাদের মধ্যে কে সঠিক, তা আমি তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলতাম এবং হক অনুযায়ী ফয়সালা করতাম।

৪৬. রাসূলুল্লাহ যে দশজনকে জান্নাতে যাওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন, তাঁদের আশারায়ে মুবাশশারা বলা হয়। উহুদের যুদ্ধে তিনি তাঁদের একজন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জন্য বললেন, “হে আল্লাহ! তাঁর তিরগুলো লক্ষ্যে পৌঁছে দাও এবং তাঁর দোয়াগুলো কবুল করো!” এরপর থেকে সাদের প্রতিটি দোয়া কবুল হতো এবং তাঁর ছোড়া প্রতিটি তির শত্রুর গায়ে লাগত।

৪৭. তিনি তাঁর চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ললাটে হাত মুবারক রেখে বললেন, “হে আল্লাহ! তাঁকে দ্বীনের গভীর জ্ঞানী আলেম বানাও, হিকমতের অধিকারী করো! তাঁকে পবিত্র কুরআনের জ্ঞান দান করো!” এরপর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস সকল বিদ্যায়, বিশেষ করে তাফসির, হাদীস ও ফিকহের জ্ঞানে তাঁর যুগের অদ্বিতীয় ব্যক্তি হয়ে উঠলেন। সাহাবীগণ ও তাবেয়িগণ সবকিছু তাঁর কাছ থেকে শিখতেন। তিনি “তরজুমানুল কুরআন”, “বাহরুল ইলম” ও “রইসুল মুফাসসিরিন” নামে প্রসিদ্ধ হলেন, আর ইসলামি দেশগুলো তাঁর ছাত্রে ভরে গেল।5

৪৮. তিনি তাঁর খাদেম আনাস ইবনে মালিকের জন্য দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তাঁর ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দাও, তাঁর আয়ু দীর্ঘ করো, তাঁর গুনাহ মাফ করে দাও!” সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ধনসম্পদ বেড়ে চলল। তাঁর গাছপালা ও আঙুরবাগান প্রতি বছর ফল দিত। তাঁর অনেক সন্তান হলো। তিনি একশো দশ বছর বেঁচে ছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! তোমার হাবিব আমার জন্য যে দোয়াগুলো করেছিলেন, তার তিনটি তুমি কবুল করেছ, দান করেছ! চতুর্থটি, অর্থাৎ আমার গুনাহ মাফের বিষয়টি না জানি কেমন হবে!” তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনলেন, “চতুর্থটিও কবুল করেছি। নিশ্চিন্ত থাকো!”

“হে আল্লাহ! তাঁকে (আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে) দ্বীনের গভীর জ্ঞানী আলেম বানাও, হিকমতের অধিকারী করো! তাঁকে পবিত্র কুরআনের জ্ঞান দান করো!” হাদীস শরীফ

৪৯. তিনি মালিক ইবনে রাবিআর (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) জন্য দোয়া করলেন, “তোমার সন্তানসন্ততিতে বরকত হোক!” মালিকের আশিজন পুত্র হয়েছিল।

৫০. নাবিগা নামের প্রসিদ্ধ কবি তাঁর কয়েকটি কবিতা পাঠ করলে মহানবী আরবদের মধ্যে প্রচলিত এই দোয়াটি করলেন: “আল্লাহ তাআলা তোমার দাঁত না ঝরান!” নাবিগা একশো বছর বয়সে পৌঁছেছিলেন, অথচ তাঁর দাঁত ছিল ধবধবে সাদা ও ঝকঝকে, মুক্তার মতো সারি বেঁধে সাজানো। ৫১. তিনি উরওয়া ইবনে জাদের (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) জন্য বললেন, “হে আল্লাহ! তার ব্যবসায় বরকত দাও!” উরওয়া বলেন, “এরপর আমি যত ব্যবসা করেছি, সবগুলোতেই লাভ হয়েছে। একবারও লোকসান হয়নি।” ৫২. একদিন তাঁর কন্যা ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা) তাঁর কাছে এলেন। ক্ষুধায় তাঁর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তিনি কন্যার বুকে হাত রেখে বললেন, “হে ক্ষুধার্তদের অন্নদাতা আমার রব! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাকে ক্ষুধার্ত রেখো না!” সঙ্গে সঙ্গে ফাতিমার চেহারায় রক্ত ফিরে এল, তিনি সজীব হয়ে উঠলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আর কখনো ক্ষুধা অনুভব করেননি।

৫৩. তিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম আবদুর রহমান ইবনে আওফের জন্য বরকতের দোয়া করলেন। তাঁর ধনসম্পদ এত বেড়ে গেল যে, তা লোকের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে উঠল।

৫৪. তিনি বললেন, “প্রত্যেক নবীর দোয়া কবুল হয়। প্রত্যেক নবী দুনিয়াতে নিজ উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন। আর আমি দোয়া করছি, কিয়ামতের দিন যেন আমাকে আমার উম্মতের জন্য শাফায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়। ইনশাআল্লাহ, আমার দোয়া কবুল হবে। যারা মুশরিক নয়, তাদের সকলের জন্য আমি শাফায়াত করব।”

৫৫. তিনি মক্কার আশপাশের কয়েকটি জনপদে গিয়ে সেখানকার লোকেরা যেন ঈমান আনে, সেজন্য অনেক চেষ্টা করলেন। তারা গ্রহণ করল না। তখন তিনি দোয়া করলেন, ইউসুফ নবীর (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) যুগে মিসরে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তারাও যেন তেমন কষ্টে পড়ে। সে বছর সেখানে এমন দুর্ভিক্ষ হলো যে, মানুষ মরা জন্তুর গোশত পর্যন্ত খেল। ৫৬. চাচা আবু লাহাবের পুত্র উতাইবা রাসূলুল্লাহর (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) জামাতা হয়েও রাসূলুল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি এবং সেই সরওয়ারকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব কষ্ট দিয়েছিল। সে তাঁর বরকতময় কন্যা উম্মে কুলসুমকে তালাক দিল এবং কুৎসিত কথা বলল। এতে মহানবী খুব ব্যথিত হয়ে বললেন, “হে আল্লাহ! তোমার কুকুরগুলোর একটিকে তার ওপর লেলিয়ে দাও!” উতাইবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামে যাওয়ার পথে এক রাতে সঙ্গীদের মাঝে শুয়ে ছিল। একটি সিংহ এসে তার সঙ্গীদের শুঁকে শুঁকে ছেড়ে দিল, তাদের কোনো ক্ষতি করল না। উতাইবার পালা এলে সিংহটি তাকে ধরে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলল। ৫৭. এক লোক বাঁ হাত দিয়ে খাচ্ছিল। মহানবী বললেন, “ডান হাত দিয়ে খাও!” লোকটি “আমার ডান হাত নড়ে না” বলে মিথ্যা কথা বলল। মহানবী বললেন, “তাহলে তোমার ডান হাত আর কখনো না নড়ুক!”6 মৃত্যু পর্যন্ত লোকটি তার ডান হাত মুখ পর্যন্ত তুলতে পারেনি।

৫৮. তিনি পারস্য-সম্রাট খসরু পারভেজকে ঈমান আনার আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠালেন। নীচ খসরু চিঠিটি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করল এবং চিঠি বহনকারী দূতকে শহিদ করল। রাসূল আলাইহিস সালাম এ কথা শুনে খুব ব্যথিত হলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহ! সে যেমন আমার চিঠি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করেছে, তুমিও তেমনি তার রাজত্ব টুকরা টুকরা করে দাও!” রাসূলুল্লাহর জীবদ্দশাতেই খসরুকে তার নিজের পুত্র শিরওয়াইহ খঞ্জর দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করল। আর উমর (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) খলিফা থাকাকালে মুসলমানরা গোটা পারস্য দেশ জয় করলেন; খসরুর বংশও রইল না, রাজত্বও রইল না।

৫৯. রাসূল আলাইহিস সালাম বাজারে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার করতেন, উপদেশ দিতেন। তখন মারওয়ানের পিতা হাকাম ইবনে আস নামের এক নীচ লোক রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পেছনে পেছনে এসে চোখ খোলা-বন্ধ করে আর মুখ বিকৃত করে তাঁকে উপহাস করত। রাসূল আলাইহিস সালাম পেছনে ফিরে তার এই কুৎসিত আচরণ দেখে বললেন, “নিজেকে যেভাবে দেখালে, সেভাবেই থেকে যাও!” মৃত্যু পর্যন্ত লোকটির মুখ ও চোখ খিঁচুনি দিয়ে কাঁপতে থাকল। ৬০. আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবিবকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করতেন। আবু জাহল ছিল রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবচেয়ে বড় শত্রু। সে একবার তাঁর মাথা মুবারকে আঘাত করার জন্য বড় একটি পাথর তুলল। তখন সে রাসূলুল্লাহর দুই কাঁধে একটি করে সাপ দেখতে পেল। পাথরটি তার হাত থেকে পড়ে গেল এবং সে পালিয়ে গেল।

৬১. মহানবী কাবা মুআজ্জমার পাশে নামাজ আদায় করছিলেন। তখন নীচ আবু জাহল আবার “এই তো উপযুক্ত সময়” বলে ছুরি হাতে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু হঠাৎ পেছনে ফিরে পালিয়ে গেল। পরে তার সঙ্গীরা “কেন ভয় পেলে?” বলে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, “মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আর আমার মাঝখানে আগুনে ভরা একটি খাদ দেখলাম। সেখানে অনেক লোক আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। এক পা এগোলেই তারা আমাকে ধরে আগুনে ছুড়ে ফেলত।” মুসলমানরা এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “আল্লাহ তাআলার ফেরেশতারা তাকে ধরে টুকরা টুকরা করে ফেলতেন।”

৬২. হিজরতের চতুর্থ বছরে বনু নাজির গোত্রের কাছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইহুদিদের দুর্গের দেয়ালের নিচে সাহাবীগণের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখন এক ইহুদি ওপর থেকে তাঁর ওপর বড় একটি জাঁতার পাথর ফেলতে চাইল। পাথরের দিকে হাত বাড়াতেই তার দুই হাত অবশ হয়ে গেল। ৬৩. হিজরতের নবম বছরে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ দলে দলে এসে ঈমান আনছিল। আমির ও আরবাদ নামের দুই কাফির আগন্তুকদের দলে ভিড়ে গেল। আমির যখন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছিল যে, তারা ঈমান আনতে এসেছে, তখন আরবাদ তাঁর পেছনে গিয়ে খাপ থেকে তলোয়ার বের করতে চাইল। কিন্তু তার হাত কাজ করল না। আমির সামনে থেকে “দাঁড়িয়ে আছ কেন?” বলে ইশারা করলে রাসূল আলাইহিস সালাম বললেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের দুজনের অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন।” সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর আমির আরবাদকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কথা রাখলে না কেন?” সে বলল, “কী করব বলো? কতবার তলোয়ার টেনে বের করতে চাইলাম, প্রতিবারই দেখলাম তুমি আমাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ।” কয়েক দিন পর আকাশ পরিষ্কার থাকা অবস্থায় হঠাৎ মেঘে ছেয়ে গেল। আরবাদের ওপর বজ্রপাত হলো এবং সে তার উটসহ মারা গেল।

৬৪. একদিন রাসূল আলাইহিস সালাম অজু করে তাঁর চামড়ার মোজার একটি পরলেন। দ্বিতীয়টির দিকে হাত বাড়াতেই একটি পাখি মোজাটি ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে শূন্যে ঝাঁকাল। তার ভেতর থেকে একটি সাপ পড়ে গেল। তারপর পাখিটি মোজাটি মাটিতে ফেলে দিল। সেদিন থেকে জুতা পরার আগে প্রথমে তা ঝেড়ে নেওয়া সুন্নত হয়ে গেল। ৬৫. রাসূল আলাইহিস সালাম গাজওয়াগুলোতে ও মরুভূমিতে নিজের নিরাপত্তার জন্য সাহাবীগণের মধ্য থেকে প্রহরী নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। সূরা মায়িদার “আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন” মর্মার্থের ৬৭তম আয়াত নাজিল হলে তিনি প্রহরার ব্যবস্থা তুলে দিলেন। তিনি শত্রুদের মাঝে একা চলাফেরা করতেন, একা ঘুমাতেন, একটুও ভয় পেতেন না।

“হে মর্যাদাবান নবী! আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন” মায়িদা: ৬৭

৬৬. হযরত আনাস বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহর একটি রুমাল ছিল, যা দিয়ে তিনি চেহারা মুবারক মুছতেন। রুমালটি ময়লা হলে তিনি তা আগুনে রেখে দিতেন। ময়লা পুড়ে যেত, কিন্তু রুমাল পুড়ত না, ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে আসত। ৬৭. একটি কূপের পানি বালতিতে তোলা হলো, তিনি বালতি থেকে পান করলেন, আর বাকি পানি কূপে ঢেলে দেওয়া হলো। এরপর থেকে সেই কূপ থেকে সবসময় মেশকের সুবাস আসত। ৬৮. উতবা ইবনে ফারকাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শরীরে আমবাত (আর্টিকেরিয়া) নামের রোগ দেখা দিল। রাসূল আলাইহিস সালাম তাঁর গায়ের জামা খোলালেন, নিজের হাত মুবারকে থুতু দিয়ে দুই হাতে তাঁর শরীরে বুলিয়ে দিলেন। রোগী আরোগ্য লাভ করলেন। তাঁর শরীর থেকে মেশকের মতো সুগন্ধ ছড়াত, আর এ অবস্থা দীর্ঘকাল স্থায়ী ছিল। ৬৯. রাসূল আলাইহিস সালাম নামাজ আদায় করছিলেন, তখন শয়তান এসে তাঁর নামাজ নষ্ট করতে চাইল। মহানবী হাত মুবারক দিয়ে তাকে ধরে ফেললেন। সে আর কখনো এসে নামাজ নষ্ট করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আদায় করার পরই তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন।

৭০. মদিনার মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল মৃত্যুর আগে রাসূলুল্লাহকে ডেকে পাঠাল। সে মিনতি করে বলল, “আপনার গায়ের জামাটি আমার কাফন বানিয়ে দিন।” কেউ কিছু চাইলে তা দিয়ে দেওয়াই ছিল মহানবীর অভ্যাস। তাই তিনি তাকে নিজের জামা দান করলেন। এমনকি তার জানাজার নামাজও পড়ালেন। মদিনায় যে এক হাজার মুনাফিক ছিল, তারা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই অনুগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়ে সকলেই ঈমান আনল। ৭১. কুরাইশ কাফিরদের মধ্যে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, আস ইবনে ওয়াইল, হারিস ইবনে কাইস, আসওয়াদ ইবনে ইয়াগুস ও আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কষ্ট ও যন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে সূরা হিজরের ৯৫তম আয়াত নিয়ে এলেন, যার মর্মার্থ: “তোমাকে নিয়ে যারা উপহাস করে, আমি তাদের শাস্তি দেব…” তারপর তিনি ওয়ালিদের পায়ের দিকে, দ্বিতীয়জনের গোড়ালির দিকে, তৃতীয়জনের নাকের দিকে, চতুর্থজনের মাথার দিকে এবং পঞ্চমজনের চোখের দিকে ইশারা করলেন। ওয়ালিদের পায়ে একটি তির বিঁধল। সে খুব অহংকারী ছিল বলে ঝুঁকে তিরটি টেনে বের করে ফেলতে তার মানে লাগল। তিরের লোহার ফলা গোড়ালির রগে ঢুকে গেল, আর সে সায়াটিকা রোগে আক্রান্ত হলো। আসের গোড়ালিতে কাঁটা বিঁধল, আর তার গোড়ালি মশকের মতো ফুলে উঠল। হারিসের নাক দিয়ে অবিরাম রক্ত ঝরতে লাগল। আসওয়াদ একটি গাছের নিচে ফুর্তিতে বসে থাকা অবস্থায় গাছের সঙ্গে নিজের মাথা ঠুকতে লাগল, আর অপর আসওয়াদ অন্ধ হয়ে গেল। এভাবে তারা সকলেই ধ্বংস হলো।

৭২. মদিনায় বনু নাজ্জার গোত্রের এক অপরূপ সুন্দরী নারী ছিল। এক জিন তার প্রেমে পড়ে সবসময় তার কাছে আসত। রাসূল আলাইহিস সালাম মদিনায় আসার পর একদিন সেই জিন নারীটির ঘরের সামনের দেয়ালে বসে ছিল। নারীটি তাকে চিনতে পেরে বলল, “তুমি আমার কাছে আসা বন্ধ করলে কেন?” জিন বলল, “আল্লাহ তাআলার নবী (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিনা এবং সকল হারাম নিষিদ্ধ করেছেন।”

৭৩. বিরে মাউনা নামে পরিচিত যুদ্ধে কাফিররা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সত্তরজন সাহাবীর মধ্যে এক-দুজন ছাড়া সকলকে শহিদ করল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমির ইবনে ফুহাইরা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু), যিনি ছিলেন আবু বকরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) গোলাম এবং আবু বকরই তাঁকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন; তিনি প্রথম দিকের ঈমান আনয়নকারীদের অন্যতম। আমির ইবনে ফুহাইরাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করা হলে কাফিরদের চোখের সামনেই ফেরেশতারা তাঁকে আকাশে তুলে নিলেন। রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ খবর জানানো হলে তিনি বললেন, “জান্নাতের ফেরেশতারা তাঁকে দাফন করেছেন, আর তাঁর রুহ জান্নাতে তুলে নেওয়া হয়েছে।”

৭৪. সাদ ইবনে মুআজ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) খন্দকের যুদ্ধে আহত হলেন এবং কিছুদিন পর ইন্তেকাল করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানালেন যে, তাঁর জানাজার নামাজে সত্তর হাজার ফেরেশতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁর কবর খোঁড়ার সময় চারদিকে মেশকের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। ৭৫. রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা) সাফিনা নামের যে সাহাবীকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন, তিনি কখনো রাসূলুল্লাহর খেদমত থেকে দূরে থাকতেন না। রোমানদের বিরুদ্ধে এক জিহাদে তিনি বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাফিরদের হাতে বন্দি হলেন। পালিয়ে ফেরার পথে তাঁর সামনে একটি ভয়ংকর সিংহ এসে দাঁড়াল। সাফিনা বললেন, “আমি রাসূলুল্লাহর খাদেম।” তারপর নিজের ওপর দিয়ে যা ঘটেছে, তা সিংহকে খুলে বললেন। সিংহটি তাঁর গায়ে মুখ ঘষে তাঁর পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। শত্রুর পক্ষ থেকে যেন কোনো ক্ষতি না আসে, সেজন্য তাঁর কাছ থেকে সরল না। ইসলামি বাহিনী দেখা দিলে সিংহটি ফিরে চলে গেল। ৭৬. জাহজাহ গিফারি নামের এক ব্যক্তি খলিফা উসমানের (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবসময় যে লাঠিটি হাতে রাখতেন, সে তা হাঁটুতে ঠেকিয়ে ভেঙে ফেলল। এক বছর পর তার হাঁটুতে শিরপাঞ্জা (অ্যানথ্রাক্স) নামের রোগ দেখা দিল এবং তা-ই তার মৃত্যুর কারণ হলো।

৭৭. মুআবিয়া (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) দামেস্ক থেকে হজে এসে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনার মিম্বর শরীফ বরকত লাভের জন্য দামেস্কে নিয়ে যেতে চাইলেন। মিম্বরটিকে জায়গা থেকে নাড়াতেই সূর্যগ্রহণ হলো। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল, আকাশে তারা দেখা দিল। মুআবিয়া তাঁর এই ইচ্ছা ত্যাগ করলেন। ৭৮. উহুদের যুদ্ধে আবু কাতাদার একটি চোখ বেরিয়ে এসে গালের ওপর ঝুলে পড়ল। তাঁকে রাসূলুল্লাহর কাছে আনা হলো। তিনি হাত মুবারক দিয়ে চোখটি যথাস্থানে বসিয়ে দিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ! তাঁর চোখটি সুন্দর করে দাও!” এই চোখটি অন্যটির চেয়ে সুন্দর হলো এবং সেটির চেয়ে ভালো দেখত। একদিন আবু কাতাদার এক নাতি খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে এলেন। খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?” তিনি একটি বয়েত আবৃত্তি করে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ যাঁর চোখ হাত মুবারক দিয়ে যথাস্থানে বসিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সেই ব্যক্তির নাতি। খলিফা বয়েতগুলো শুনে তাঁকে বিশেষ সম্মান দেখালেন এবং প্রচুর উপহার দিলেন। ৭৯. ইয়াস ইবনে সালামা বলেন: খায়বার অভিযানে রাসূলুল্লাহ আমাকে পাঠিয়ে আলিকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) ডেকে আনতে বললেন। আলির চোখে ব্যথা ছিল। আমি তাঁর হাত ধরে অতি কষ্টে তাঁকে নিয়ে এলাম। রাসূলুল্লাহ আঙুল মুবারকে থুতু দিয়ে আলির চোখে লাগিয়ে দিলেন। তারপর তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিয়ে খায়বারের দরজায় লড়াই করতে পাঠালেন। বহুদিন ধরে যে দরজা খোলা যাচ্ছিল না, আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তা জায়গা থেকে উপড়ে ফেললেন, আর সাহাবায়ে কেরাম দুর্গে প্রবেশ করলেন। ৮০. একদিন মহানবী তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমার ঘরে গিয়ে তাঁদের খোঁজখবর নিলেন। হযরত ফাতিমা উত্তর দিলেন, “আব্বাজান! তিন দিন ধরে আমি আমার সন্তানদের নিয়ে কিছুই খাইনি, পান করিনি। ক্ষুধায় ধৈর্য ধরে আছি। আমার কষ্ট বড় কথা নয়। কিন্তু হাসান ও হুসাইনের অবস্থা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।” তখন সরওয়ারে আলম মহানবী বললেন, “হে ফাতিমা! আমার কলিজার টুকরা মেয়ে! তুমি তিন দিন ধরে ক্ষুধার্ত। আর আমি চার দিন ধরে ক্ষুধার্ত।” নাতি হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন ক্ষুধার্ত থাকায় তিনি খুব ব্যথিত হলেন… ৮১. হযরত আলি পরিশ্রম করে কিছু উপার্জন করবেন এবং তা দিয়ে খাবার কিনে এনে তাঁর বরকতময় সন্তানদের পেট ভরাবেন – এই উদ্দেশ্যে বের হলেন। মদিনার বাইরে গিয়ে তিনি দেখলেন, এক গ্রাম্য লোক একটি কূপের পাশে তার উটগুলোকে পানি পান করানোর চেষ্টা করছে। হযরত আলি তার কাছে গিয়ে বললেন, “হে আরব! মজুরির বিনিময়ে তোমার উটগুলোকে পানি পান করানোর জন্য কোনো লোক লাগবে কি?” গ্রাম্য লোকটি বলল, “হ্যাঁ। আমিও ঠিক এমন একজনকে খুঁজছিলাম। চাইলে এসো, আমার উটগুলোকে পানি পান করাও! যত বালতি তুলবে, প্রতি বালতির জন্য তিনটি করে খেজুর দেব।” হযরত আলি রাজি হয়ে পানি তুলতে শুরু করলেন। তিনি নয় বালতি তুলেছেন, এমন সময় হঠাৎ বালতির দড়ি ছিঁড়ে গেল এবং বালতিটি কূপের ভেতরে রয়ে গেল। এ দেখে গ্রাম্য লোকটি রাগে লাফিয়ে উঠে হযরত আলির মুখে হাত দিয়ে আঘাত করার মতো দুর্ভাগ্যজনক কাজ করে বসল। তারপর আট বালতি পানির বিনিময়ে চব্বিশটি খেজুর দিল। এতে অত্যন্ত ব্যথিত হযরত আলি কূপের দিকে দুই হাত বাড়ালেন। ভেতরের বালতিটি তুলে এনে কূপের পাশে রাখলেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন। গ্রাম্য লোকটি বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল! এত গভীর কূপের তলায় তাঁর হাত পৌঁছাল কীভাবে?! তবে কি এই ব্যক্তি সেই দ্বীনের অনুসারী, যার আগমনের সংবাদ আগেই দেওয়া হয়েছিল? এসব ভাবনায় হতবাক গ্রাম্য লোকটি বলল, “তাঁর নবী সত্য নবী। আমি ঈমান আনলাম!” একটু আগে সে যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, যে বড় অপরাধ করেছে, তার জন্য সে অনুতপ্ত হলো। “এমন মানুষের দিকে যে হাত ওঠে, তা কেটে ফেলা উচিত, তার হাড় ভেঙে দেওয়া উচিত” – এই বলে সে এক হাতে তলোয়ার নিয়ে অন্য হাতের কবজিতে সজোরে আঘাত করল… তার ইচ্ছা পূর্ণ হলো। সে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করল, কিন্তু এখন তার মন শান্ত। কাটা হাতটি অন্য হাতে নিয়ে সে সোজা মসজিদে নববিতে এল। সাহাবায়ে কেরামের কাছে জানতে চাইল, তাঁদের নবী কোথায়। তাঁরা জানালেন, তিনি তাঁর কন্যার কাছে গেছেন। হযরত ফাতিমার ঘর কোথায় জেনে নিয়ে সে সেদিকে গেল। মহানবী তখন নাতি হযরত হাসান ও হযরত হুসাইনকে তাঁর বরকতময় হাঁটুর ওপর বসিয়ে আনা খেজুরগুলো খাওয়াচ্ছিলেন। নিজের ভুলের গুরুত্ব যতই ভাবছিল, গ্রাম্য লোকটি ততই পাগলপ্রায় হয়ে যাচ্ছিল, তার দুই চোখ দিয়ে ঝরনার মতো অশ্রু ঝরছিল। এ অবস্থায় সে হযরত ফাতিমার ঘরে এসে দরজায় কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে জগৎসমূহের সরদার সূর্যের মতো নূর ছড়িয়ে বেরিয়ে এলেন। গ্রাম্য লোকটি মহানবীকে দেখামাত্র মিনতি করে বলল, “আমি ঈমান আনলাম, আপনি আল্লাহর রাসূল! আমি যা করেছি, তার জন্য অনুতপ্ত, আমাকে ক্ষমা করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” আমাদের প্রিয় নবী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হাত কেটেছ কেন?” সে বলল, “আপনার প্রতি ঈমান আনা মানুষের বরকতময় মুখে যে হাত আঘাত করেছে, তা বয়ে বেড়াতে লজ্জা পেয়েছি বলে!… আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” দয়ার সাগর আমাদের প্রিয় নবী গ্রাম্য লোকটির হাত থেকে কাটা হাতটি নিলেন এবং “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে তা রক্ত ঝরতে থাকা কবজির সঙ্গে জুড়ে দিলেন। আল্লাহ তাআলার অনুমতিতে, মহানবীর এক মুজিযা হিসেবে হাতটি আগের অবস্থায় ফিরে এল। আল্লাহ তাআলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, সবকিছুই তাঁর সাধ্যের মধ্যে।

“হে আল্লাহ! ইনি আমার চাচা, আমার পিতার ভাই। আর এরা আমার আহলে বাইত। আমি যেমন আমার এই চাদর দিয়ে তাঁদের ঢেকে দিয়েছি, তুমিও তেমনি তাঁদের ঢেকে নাও, জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো!” হাদীস শরীফ