মহানবীর শাফায়াত
রাসূলে আকরাম মহানবী কিয়ামতের দিন তাঁর উম্মতের জন্য শাফায়াত করবেন, তাদের কষ্ট ও দুঃখ থেকে উদ্ধার করবেন। এক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “আমার উম্মতের অর্ধেকের জান্নাতে প্রবেশ এবং শাফায়াত – এ দুটির মধ্যে আমাকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হলো। আমি শাফায়াতকে বেছে নিলাম, কেননা তা অধিক ব্যাপক। একে কেবল তাকওয়া অর্জনকারীদের জন্য মনে কোরো না; তা ভুলে লিপ্ত গুনাহগারদের জন্যও…”1
হযরত আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদীস শরীফে মহানবী ইরশাদ করেন, “আমার শাফায়াত সেই ব্যক্তির জন্য, যে হৃদয় দিয়ে মুখের কথার সত্যায়ন করে ইখলাসের সঙ্গে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে।”2
কোনো কোনো হাদীস শরীফেও ইরশাদ হয়েছে:
“আমার উম্মতের মধ্যে যারা আমার আহলে বাইতকে ভালোবাসে, তাদের জন্য আমি শাফায়াত করব।” “আমার উম্মতের মধ্যে যারা কবিরা গুনাহ করে, তাদের জন্য আমি শাফায়াত করব।” “যারা আমার সাহাবীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে, তারা ছাড়া সবার জন্য আমি শাফায়াত করতে পারব।” “আমার উম্মতের মধ্যে যারা নিজেদের নফসের ওপর জুলুম করে, নিজেদের নফসের ধোঁকায় পড়ে, তাদের জন্য আমি শাফায়াত করব।” “কিয়ামতের দিন সবার আগে আমিই শাফায়াত করব।”3
“যে আমার শাফায়াতে বিশ্বাস করে না, সে তা লাভ করবে না।”4
কিয়ামতের দিন সিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার ভয়াবহতায় গা শিউরে ওঠে, চোখ কোথায় তাকাবে দিশা পায় না, মুমিন ও কাফির সবাইকে হাশরের ময়দানে হাঁকিয়ে নেওয়া হয়। এ এমন এক শাস্তি, যা কিয়ামত দিবসের কঠোরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ সময় আটজন ফেরেশতা আরশ বহন করে নিয়ে যান। তাঁদের একজন এক কদমে দুনিয়ার বিশ হাজার বছরের পথ অতিক্রম করেন। আরশে আলা স্থির হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতাগণ ও মেঘমালা এমন সব তাসবিহ পাঠ করতে থাকেন, যা বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় না। এভাবে আরশে আলা সেই সাদা ভূমির ওপর স্থির হয়, যা আল্লাহ তাআলা এর জন্য সৃষ্টি করেছেন। এ সময় আল্লাহ তাআলার এমন আজাবের ভয়ে, যা কোনো কিছুই সহ্য করতে পারে না, সবার মাথা নিচু হয়ে যায়। সমস্ত সৃষ্টি নিজ নিজ দুর্দশায় বন্দি ও হতবিহ্বল হয়ে দয়া খুঁজতে থাকে। হাশরে মানুষের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায়। তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণা বেড়ে যায়। দুনিয়ায় যে সম্পদ তারা আঁকড়ে ধরে রেখেছিল, প্রত্যেকের গলায় তা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। যারা উটের যাকাত দেয়নি, তাদের ঘাড়ে উট চাপিয়ে দেওয়া হয়। তা এমন চিৎকার করে এবং এত ভারী হয়ে যায় যে, বিশাল পাহাড়ের মতো হয়ে ওঠে। যারা গরু ও ভেড়ার যাকাত দেয়নি, তাদেরও একই অবস্থা হয়। তাদের আর্তনাদ যেন মেঘের গর্জন।5 যারা শস্যের যাকাত, অর্থাৎ উশর দেয়নি, তাদের ঘাড়ে শস্যের বস্তা চাপিয়ে দেওয়া হয়। দুনিয়ায় যে জাতের শস্যের যাকাত দেয়নি, সেই জাতের বস্তা চাপানো হয়: গম হলে গম, যব হলে যব। এর ভারে তারা “ওয়া ওয়াইলা, ওয়া সাবুরা!” বলে চিৎকার করে। (“ওয়াইল” আজাব বোঝানোর শব্দ। মানুষ যখন আজাব সহ্য করতে পারে না, তখন এভাবে চিৎকার করে। আর “সাবুর” শব্দটি ধ্বংসের সময় ব্যবহৃত হয়।) সোনা, রুপা, (কাগজের) টাকা ও অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত যারা দেয়নি, তাদের ওপর এক ভয়ংকর সাপ লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা চিৎকার করে “এটা কী?” বললে ফেরেশতারা উত্তর দেন, “এগুলো তোমাদের সেই সম্পদ, দুনিয়ায় যার যাকাত তোমরা দাওনি।” এই ভয়ংকর অবস্থার কথাই সূরা আলে ইমরানের একশো আশিতম আয়াতে মর্মার্থে জানানো হয়েছে: “দুনিয়ায় তারা যা নিয়ে কৃপণতা করেছে, কিয়ামতের দিন তা তাদের গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে।”
“যে আমার শাফায়াতে বিশ্বাস করে না, সে তা লাভ করবে না” হাদীস শরীফ
আরেক দলের লজ্জাস্থান থেকে পুঁজ ও দূষিত রস ঝরে। তাদের দুর্গন্ধে আশপাশের লোকেরা খুবই কষ্ট পায়। এরা হলো জিনাকারী ও হারাম কাজে লিপ্ত লোকেরা। আরেক দল গাছের ডালে ঝুলতে থাকে। এরা হলো সেই লোকেরা, যারা দুনিয়ায় সমকাম করেছে।
আরেক দলের জিহ্বা মুখ থেকে বেরিয়ে বুকের ওপর ঝুলে থাকে; তারা অত্যন্ত কুৎসিত অবস্থায় থাকে। মানুষ তাদের দিকে তাকাতে চায় না। এরা হলো মিথ্যাবাদী ও অপবাদ রটনাকারী।
আরেক দলের পেট উঁচু পাহাড়ের মতো ফুলে ওঠে। এরা হলো সেই লোকেরা, যারা দুনিয়ায় অপরিহার্য প্রয়োজন ছাড়া এবং শরিয়তসম্মত লেনদেনের (মুআমালার) পথ অবলম্বন না করে সুদি মাল ও টাকা লেনদেন করেছে। এ ধরনের হারাম কাজে লিপ্তদের গুনাহ সবচেয়ে লজ্জাজনকভাবে প্রকাশ করে দেওয়া হয়। নবীগণ ও আলেমগণের মধ্যেও ভীতি দেখা দেয়। আউলিয়া ও শহিদগণ আল্লাহ তাআলার সহ্য করা কঠিন আজাবের ভয়ে আর্তনাদ করেন। মানুষ এ অবস্থায় থাকতেই সূর্যের আলোর চেয়েও অনেক তীব্র এক আলো তাদের ঘিরে ফেলে। সূর্যের তাপই যারা সহ্য করতে পারছিল না, এ দেখে তারা একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। হাজার বছর তারা এ অবস্থায় থাকে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের কিছুই বলা হয় না। তখন মানুষেরা প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করে বলে, “হে আদম আলাইহিস সালাম! আপনি সম্মানিত ও মর্যাদাবান নবী। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, ফেরেশতাদের দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছেন এবং আপনার মধ্যে তাঁর পক্ষ থেকে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। হিসাব শুরু হওয়ার জন্য আমাদের পক্ষে শাফায়াত করুন, যেন আল্লাহ তাআলা যা চান, সে অনুযায়ী আমাদের ফয়সালা হয় এবং তিনি যেখানে আদেশ করেন, প্রত্যেকে সেখানে চলে যায়। সবকিছুর হাকিম ও মালিক আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে যা ইচ্ছা করুন।”
আদম আলাইহিস সালাম বলেন, “আল্লাহ তাআলা যে গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, আমি তা খেয়েছি। তাই এখন আল্লাহ তাআলার কাছে লজ্জা পাই। তবে তোমরা নূহের কাছে যাও।” এরপর হাজার বছর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে থাকে। তারপর নূহ আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করে, “আমরা এমন অবস্থায় আছি, যা একেবারেই সহ্য করা যায় না। আমাদের বিচার যেন দ্রুত হয়, সেজন্য শাফায়াত করুন, যাতে এই হাশরের শাস্তি থেকে আমরা রক্ষা পাই।” নূহ আলাইহিস সালাম তাদের উত্তরে বলেন, “আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করেছিলাম, আর সেই দোয়ার কারণে পৃথিবীতে যত মানুষ ছিল, সবাই ডুবে গিয়েছিল। এজন্য আল্লাহ তাআলার কাছে লজ্জা পাই। তবে তোমরা খলিলুল্লাহ ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে যাও। আল্লাহ তাআলা সূরা হজের শেষ আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দ্বীনের অনুসরণ করো। নবী যেন তোমাদের জন্য সাক্ষী হন এবং তোমরা যেন মানুষের জন্য সাক্ষী হও, সেজন্য আল্লাহ তাআলা আগের কিতাবসমূহে এবং পবিত্র কুরআনেও তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান।’ হয়তো তিনি তোমাদের জন্য শাফায়াত করবেন।”
তারা আবার আগের মতো হাজার বছর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। তারপর ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলে, “হে মুসলমানদের পিতা! আপনি সেই সত্তা, যাঁকে আল্লাহ তাআলা নিজের খলিল বানিয়েছেন। আমাদের জন্য শাফায়াত করুন! আল্লাহ তাআলা যেন সৃষ্টির মধ্যে তাঁর ফয়সালা দেন।” ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাদের বলেন, “দুনিয়ায় আমি তিনবার দ্ব্যর্থবোধক কথা বলেছিলাম। সেগুলো বলে আমি দ্বীনের পথে সংগ্রাম করেছি। এখন এই স্থানে আল্লাহ তাআলার কাছে শাফায়াতের অনুমতি চাইতে লজ্জা পাই। তোমরা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে যাও, কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁকে আধ্যাত্মিক নৈকট্য দান করেছেন। তিনি তোমাদের জন্য শাফায়াত করবেন।” এরপর তারা আবার হাজার বছর দাঁড়িয়ে পরস্পর পরামর্শ করে। কিন্তু এ সময় তাদের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। হাশরের ময়দান খুবই সংকীর্ণ হয়ে যায়। তারপর তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলে, “হে ইমরানের পুত্র! আপনি সেই নবী, যাঁর সঙ্গে আল্লাহ তাআলা কথা বলেছেন এবং যাঁর প্রতি তাওরাত নাজিল করেছেন। হিসাব শুরু হওয়ার জন্য আমাদের পক্ষে শাফায়াত করুন! কেননা এখানে আমাদের অবস্থান অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। ভিড়ের চাপে একজনের পা আরেকজনের পায়ের ওপর উঠে গেছে।” মূসা আলাইহিস সালাম তাদের বলেন, “আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করেছিলাম, যেন ফিরআউনের লোকজনকে বছরের পর বছর তাদের অপছন্দনীয় বিষয় দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়। তারপর প্রার্থনা করেছিলাম, তারা যেন পরবর্তীদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে। এখন শাফায়াত করতে লজ্জা পাই। তবে মহান আল্লাহ রহমত ও মাগফিরাতের অধিকারী। তোমরা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে যাও, কেননা ইয়াকিনের দিক থেকে তিনি রাসূলদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ, মারিফাত ও জুহদের দিক থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং হিকমতের দিক থেকে সবচেয়ে উঁচু। তিনি তোমাদের জন্য শাফায়াত করবেন।” হাশরের কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে তারা এরপর ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলে, “আপনি আল্লাহ তাআলার রুহ ও কালিমা। আল্লাহ তাআলা আপনার সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের পঁয়তাল্লিশতম আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেছেন, ’তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে ওয়াজিহ, অর্থাৎ অত্যন্ত মূল্যবান (মর্যাদাবান ও সম্মানিত)।’ আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য শাফায়াত করুন!”
ঈসা আলাইহিস সালাম বলেন, “আমার কওম আমাকে ও আমার মাকে আল্লাহ ছাড়া ইলাহ বানিয়ে নিয়েছিল। এ অবস্থায় আমি কীভাবে শাফায়াত করব? তারা আমার ইবাদতও করেছে; আমাকে পুত্র এবং আল্লাহ তাআলাকে পিতা বলেছে। তবে তোমরা কি দেখোনি, তোমাদের কারও একটি থলে আছে, তার ভেতরে তার রসদ রয়েছে আর তার মুখ সিলমোহর করা? সেই সিলমোহর না ভেঙে কি সেই রসদে পৌঁছানো যায়? নবীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে যাও। কেননা তিনি তাঁর দোয়া ও শাফায়াত নিজের উম্মতের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। তাঁর কওম তাঁকে বহুবার কষ্ট দিয়েছে। তাঁর মুবারক ললাট ক্ষতবিক্ষত করেছে। তাঁর মুবারক দাঁত ভেঙেছে। তাঁকে পাগল বলে অপবাদ দিয়েছে। অথচ সেই মহান নবী গৌরবের দিক থেকে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং মর্যাদার দিক থেকে সর্বোচ্চ ছিলেন। তাদের অসহনীয় কষ্ট ও জুলুমের জবাবে তিনি সেই পবিত্র আয়াত পাঠ করতেন, যাতে ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাঁর ভাইদের যা বলেছিলেন তা বর্ণিত হয়েছে, যার মর্মার্থ: ‘আজ আমি আর তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের কাছে হিসাব চাইব না (তোমাদের ভুল তোমাদের মুখের ওপর বলব না)। আরহামুর রাহিমিন মহান আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন।’”6 ঈসা আলাইহিস সালাম মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজিলতের কথা বললে তারা সবাই যত দ্রুত সম্ভব তাঁর কাছে পৌঁছাতে চায়। তারা সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মিম্বরের কাছে এসে বলে, “আপনি হাবিবুল্লাহ! আর হাবিবই মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে সবচেয়ে ফলপ্রসূ। আমাদের জন্য শাফায়াত করুন! কেননা আমরা নবীদের মধ্যে প্রথম আদম আলাইহিস সালামের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের নূহ আলাইহিস সালামের কাছে পাঠালেন। আমরা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে গেলাম। তিনি আমাদের ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে পাঠালেন। আমরা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে গেলাম; তিনি আমাদের মূসা আলাইহিস সালামের কাছে পাঠালেন। আমরা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে গেলাম; তিনি আমাদের ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে পাঠালেন। আমরা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে গেলাম; তিনি আমাদের আপনার কাছে পাঠালেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনার পরে যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই।”
“দুনিয়ায় তারা যা (যে সম্পদ) আটকে রেখেছিল, কিয়ামতের দিন তা তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হবে” আলে ইমরান: ১৮০
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আল্লাহ তাআলা অনুমতি দিলে এবং সন্তুষ্ট হলে আমি শাফায়াত করব।”
তিনি সুরাদিকাতুল জালাল, অর্থাৎ জালালের (মহিমার) পর্দা নামক স্থানে পৌঁছান। আল্লাহ তাআলার কাছে শাফায়াতের অনুমতি চান। তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়। পর্দাগুলো উঠে যায়। তিনি আরশে আলায় প্রবেশ করেন। সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। হাজার বছর সিজদায় থাকেন। এরপর তিনি মহান আল্লাহর এমন হামদ করেন যে, জগৎ সৃষ্টির পর থেকে কেউ কখনো আল্লাহ তাআলার এমন প্রশংসা করেনি। কোনো কোনো আরিফ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জগৎসমূহ সৃষ্টি করার পর নিজেই নিজের এমন হামদ ও প্রশংসা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা মর্মার্থে ইরশাদ করেন, “হে মুহাম্মদ, সিজদা থেকে মাথা তোলো! বলো, শোনা হবে। (যা বলবে, শোনা হবে। যা চাইবে, দেওয়া হবে।) শাফায়াত করো, কবুল করা হবে।” তখন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “হে আমার রব! তোমার বান্দাদের মধ্য থেকে ভালোদের মন্দদের থেকে আলাদা করে দাও, কেননা তাদের অপেক্ষার সময় অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ গুনাহের কারণে আরাসাতের ময়দানে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়েছে।”
মহান আল্লাহ জান্নাত আনার আদেশ দেন। জান্নাতকে সব রকমের সাজসজ্জায় সজ্জিত করে আরাসাতের ময়দানে আনা হয়। তার সুগন্ধ পাঁচশো বছরের পথের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়। এতে হৃদয় প্রফুল্ল হয়, রুহ সজীব হয়ে ওঠে। (কিন্তু কাফির, মুরতাদ, মুসলমানদের নিয়ে উপহাসকারী, তরুণদের ধোঁকা দিয়ে তাদের ঈমান হরণকারী এবং) যাদের আমল নোংরা ও মন্দ, তারা জান্নাতের সুগন্ধ পায় না।
ফেরেশতারা জাহান্নামকে শিকল দিয়ে বেঁধে হাশরের ময়দানে নিয়ে আসেন। জাহান্নাম গর্জন করে, হুংকার ছাড়ে, আগুন ছিটায় এবং সমস্ত আকাশকে কালো করে দেওয়া ঘন ধোঁয়া ছাড়ে। তার গর্জন, হুংকার ও উত্তাপ অসহনীয় মাত্রার। সবার হাঁটু দুর্বল হয়ে পড়ে, যে যেখানে আছে সেখানেই বসে পড়ে। এমনকি নবী ও রাসূলগণও নিজেদের সামলাতে পারেন না। হযরত ইবরাহিম, হযরত মূসা, হযরত ঈসা আরশে আলা আঁকড়ে ধরেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যাঁকে কুরবানি করতে চেয়েছিলেন, সেই ইসমাইল আলাইহিস সালামকে ভুলে যান। মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে এবং ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর মা হযরত মারইয়ামকে ভুলে যান। তাঁদের প্রত্যেকে বলেন, “হে আমার রব! আজ আমি নিজের ছাড়া আর কিছু চাই না।”
আর মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম বলেন, “হে আমার রব! আমার উম্মতকে নিরাপত্তা ও মুক্তি দাও!” সেখানে এ অবস্থা সহ্য করতে পারে এমন কেউ থাকে না। কেননা আল্লাহ তাআলা এ সংবাদ দিয়ে সূরা জাসিয়ার আটাশতম আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেছেন, “তুমি প্রত্যেক উম্মতকে মহান আল্লাহর ভয়ে নতজানু হয়ে বসে থাকতে দেখবে। প্রত্যেককে দুনিয়ায় সে যে আমল করেছে, তার আমলনামার দিকে ডাকা হবে।”
আল্লাহ তাআলা সূরা মুলকের অষ্টম আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেন, “ক্রোধ ও প্রচণ্ডতার আতিশয্যে আগুন যেন ফেটে পড়বে।”
এরপর মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে এগিয়ে গিয়ে জাহান্নামকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, “লাঞ্ছিত ও অপদস্থ অবস্থায় ফিরে যাও! তোমার অধিবাসীরা দলে দলে তোমার কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।” জাহান্নামও বলে, “হে মুহাম্মদ! আমাকে যেতে দিন! কেননা আপনি আমার জন্য হারাম।” আরশ থেকে আওয়াজ আসে, “হে জাহান্নাম! মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের কথা শোনো এবং তাঁর আনুগত্য করো!” তারপর রাসূলুল্লাহ জাহান্নামকে টেনে নিয়ে আরশে আলার বাম পাশে এক জায়গায় স্থাপন করেন। হাশরের লোকেরা মহানবীর এই দয়ার্দ্র আচরণ ও শাফায়াতের সুসংবাদ একে অপরকে দেয়। তাদের ভয় কিছুটা কমে আসে। সূরা আম্বিয়ার একশো সাততম আয়াতের মর্মার্থ “আমি তোমাকে জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি” তখন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।7
সংক্ষেপে, রাসূলুল্লাহ পাঁচটি স্থানে শাফায়াত করবেন।8
প্রথমটি – মাকামে মাহমুদ নামে পরিচিত শাফায়াতের মাধ্যমে তিনি সকল মানুষকে হাশরে অপেক্ষার কষ্ট থেকে মুক্ত করবেন।9
দ্বিতীয়টি – তাঁর শাফায়াতে বহু মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তৃতীয়টি – বেশি গুনাহগার মুমিনদের তিনি জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। চতুর্থটি – সওয়াব ও গুনাহ সমান হওয়ায় যারা “আরাফ” নামক স্থানে অপেক্ষা করবে, তাদের জান্নাতে যাওয়ার জন্য তিনি শাফায়াত করবেন। পঞ্চমটি – জান্নাতবাসীদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি শাফায়াত করবেন।
শাফায়াতের মাধ্যমে তিনি যে সত্তর হাজার মানুষকে হিসাব থেকে মুক্ত করবেন, তাদের প্রত্যেকের শাফায়াতে আরও সত্তর হাজার করে মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
বড় অভাবী, এসেছি তোমার দ্বারে,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
জেনেছি আমার দোষ কী যে,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
গুনাহগার আমি, মুখ কালো,
হয়তো নিক্ষিপ্ত হব আগুনে,
তোমার কাছেই আছে উপায়,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তোমার ভালোবাসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে,
তোমার জ্ঞান সবার চেয়ে উঁচু,
তোমার প্রশংসাকারী স্বয়ং মাওলা,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
কেমন করে মানুষ করবে তোমার প্রশংসা?
তোমার কাছেই আছে অনুগ্রহ,
আমাদের সাহায্য করো, দোহাই!
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তুমি ছাড়া দুনিয়া আমার কারাগার,
কাজ আমার এলোমেলো, হাল বড় মন্দ,
তোমার কাছেই আছে প্রতিকার,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
এ জগতে তুমি ছড়ালে আলো,
দরুদ ও সালাম তোমার প্রতি,
মৃত-জীবিত সব মুসলমানের জন্য
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
অবশ্যই অনেক আমার অবাধ্যতা,
আমি অক্ষম, আমি ত্রুটিপূর্ণ,
কিন্তু আমার ঈমান সঠিক,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
জাহান্নাম যখন ফুটে উপচে পড়বে,
জানা নেই কী আসবে মাথার ওপর,
জিহাদকারী সঙ্গীর জন্য
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
চোখ থেকে আমার সরে যাক পর্দা,
তুমিই সব ব্যথার ওষুধ,
মুমিন প্রত্যেক মানুষের জন্য
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তোমার শানে বলা হয়েছে “লাওলাকা”,
আবার বলা হয়েছে “আতাইনাকা”,
তুমিই “আরসালনাকা” আয়াতের বাদশাহ,
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
যারা আমাদের দ্বীন ছড়ায়,
যারা তোমার সুন্নত মানে,
যারা তোমার পথে জীবন দেয়, তাদের জন্য
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তোমার উম্মতের নগণ্যজনের জন্য,
শোকরকারী, জিকিরকারীর জন্য,
ধনী ও গরিবের জন্য
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
Muhammed Hâdimî (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)
“তুমি প্রত্যেক উম্মতকে মহান আল্লাহর ভয়ে নতজানু হয়ে বসে থাকতে দেখবে। প্রত্যেককে দুনিয়ায় সে যে আমল করেছে, তার আমলনামার দিকে ডাকা হবে” জাসিয়া: ২৮
