আমার প্রিয় নবী

মহানবীর ইস্তিগফার1

মহানবী যেমন সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন, তেমনি আল্লাহ তাআলাকে যথাযথভাবে চিনে তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন। মহান আল্লাহ তাঁকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা সত্ত্বেও তিনি বিরামহীনভাবে ইবাদত করতেন, আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন। রাতের প্রথম ভাগে (এশার পর) ঘুমাতেন, শেষ ভাগে ইবাদত করতেন। ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, “এক রাতে আমি মুমিনদের মা হযরত মাইমুনার ঘরে মেহমান ছিলাম। রাসূলুল্লাহ মধ্যরাত পর্যন্ত, অথবা তার কিছু আগে বা পরে পর্যন্ত ঘুমালেন। তারপর জেগে উঠে বসলেন, হাত দিয়ে চেহারা থেকে ঘুমের চিহ্ন মুছলেন। উঠে ঝুলিয়ে রাখা পানির পাত্র নিয়ে অজু করলেন। সূরা আলে ইমরানের শেষ দিক থেকে দশটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন এবং নামাজে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে রাসূলুল্লাহ যেভাবে অজু করেছিলেন, সেভাবে অজু করলাম এবং নামাজে সেই সরওয়ারের পাশে দাঁড়ালাম। রাসূলুল্লাহ দুই রাকাত নামাজ পড়লেন। তারপর আরও দুই রাকাত পড়লেন। এরপর আবার দুই রাকাত পড়লেন। তারপর বিতরের নামাজে দাঁড়ালেন। এরপর ফজরের আজান হওয়া পর্যন্ত শুয়ে রইলেন। তারপর উঠে আবার দুই রাকাত নামাজ পড়লেন এবং মসজিদে গিয়ে ফজরের ফরজ নামাজ আদায় করলেন।”2 আমাদের মা হযরত আয়েশা বর্ণনা করেন, “এক রাতে রাসূলুল্লাহ ঘুমিয়ে ছিলেন। জেগে উঠে বললেন, ‘হে আয়েশা, তুমি অনুমতি দিলে আজ রাতটি আমি আমার রবের ইবাদতে কাটাই।’ তারপর উঠলেন। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে কাঁদলেন। এমনকি চোখের পানিতে তাঁর দুই হাঁটু ভিজে গেল। তিনি তিলাওয়াত চালিয়ে গেলেন; যতই পড়তেন, তাঁর মুবারক অশ্রু দেহের যেখানে লাগত, সেখানেই ভিজিয়ে দিত। এ অবস্থা ভোর পর্যন্ত চলল।

সকালে বিলাল হাবশি এসে এ অবস্থা দেখে বললেন, ‘আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা কি আপনার আগের ও পরের সমস্ত ত্রুটি ক্ষমা করে দেননি?’ রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘হে বিলাল! আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? আল্লাহ তাআলা তো আজ রাতে3 সূরা আলে ইমরানের ১৯০তম আয়াত নাজিল করেছেন, যার মর্মার্থ: “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পালাক্রমে আগমনে বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।”’” “মুসলিম” সংকলনে বর্ণিত হাদীস শরীফেও তিনি ইরশাদ করেন, “আমার হৃদয়ে এমন কিছু আসে যে, এ কারণে আমি প্রতিদিন ও প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলার কাছে সত্তরবার ইস্তিগফার করি”; “আমার হৃদয়ে (ঐশী নূর আসার পথে বাধা সৃষ্টিকারী) পর্দা পড়ে। এজন্য আমি প্রতিদিন ৭০ বার ইস্তিগফার করি”; এবং “আমি প্রতিদিন আল্লাহ তাআলার কাছে একশোবার ইস্তিগফার করি।”4

মহানবীর আল্লাহভীতি এত বেশি ছিল যে, তাঁকে কখনো অট্টহাসি হাসতে দেখা যায়নি। ইমাম তিরমিজি আবু জর থেকে মারফু5 হিসেবে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করেছেন, তাতে ইরশাদ হয়েছে, “নিঃসন্দেহে তোমরা যা দেখো না, আমি তা দেখি; তোমরা যা শোনো না, আমি তা-ও শুনি। আসমানে চার আঙুল পরিমাণ এমন কোনো খালি জায়গা নেই, যেখানে ফেরেশতারা সিজদা করছেন না। আল্লাহর কসম, আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে কম হাসতে, বেশি কাঁদতে। পথে পথে বেরিয়ে পড়ে গলা ফাটিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করতে।”6

আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, “কাউকেই তার আমল জান্নাতে নিয়ে যাবে না।” “আপনাকেও নয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ?” জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ইরশাদ করলেন, “হ্যাঁ, আমাকেও আমার আমল জান্নাতে নিয়ে যাবে না। তবে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও রহমত আমাকে ঢেকে নেবে।”

ইবনে উমর বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহর সঙ্গে কোনো মজলিসে থাকলে আমরা গুনতাম, তিনি একশোবার বলতেন, ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করো এবং আমার তওবা কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী, দয়াময়।’”7

আনাস ইবনে মালিক বর্ণনা করেছেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবসময় বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি আলা দিনিক।’”8 তিরমিজি আবু সাঈদ খুদরি থেকে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করেছেন, তাতে মহানবী ইরশাদ করেন, “বিছানায় যাওয়ার সময় যে ব্যক্তি তিনবার ‘আসতাগফিরুল্লাহাল আজিম, আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহ’ বলে, তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনা, অথবা তামিম অঞ্চলের বালু, অথবা গাছের পাতার সংখ্যা, অথবা দুনিয়ার দিনগুলোর মতো অসংখ্য হলেও আল্লাহ তাআলা তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”

বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ এভাবে ইস্তিগফার করতেন: “আল্লাহুম্মাগফিরলি খাতিআতি ওয়া জাহলি ওয়া ইসরাফি ফি আমরি ওয়া মা আনতা আলামু বিহি মিন্নি।” (হে আল্লাহ! তুমি যা জানো এবং আমি (জেনে অথবা) না জেনে সীমা লঙ্ঘন করে যেসব ত্রুটি করেছি, তা ক্ষমা করো!)

আবু মূসা আশআরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবেও ইস্তিগফার করতেন:

“আল্লাহুম্মাগফিরলি হাজলি ওয়া জিদ্দি ওয়া খাতায়ি ওয়া আমদি ওয়া কুল্লু জালিকা ইনদি। আল্লাহুম্মাগফিরলি মা কাদ্দামতু ওয়া মা আখখারতু ওয়া মা আসরারতু ওয়া মা আলানতু ওয়া মা আনতা আলামু বিহি মিন্নি, আনতাল মুকাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুআখখিরু ওয়া আনতা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।”9 (হে আল্লাহ! কৌতুকে, গুরুত্বের সঙ্গে, ভুলে এবং জেনেশুনে আমার দ্বারা যত ত্রুটি হওয়া সম্ভব, সব ক্ষমা করো। হে আল্লাহ! আগে ও পরে যা করেছি, গোপনে ও প্রকাশ্যে যা করেছি, তুমি যা জানো – আমার সব ধরনের ত্রুটি মাফ করো। তুমিই অগ্রবর্তীকারী, তুমিই পশ্চাদ্বর্তীকারী। তুমি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।)

রাসূলুল্লাহ দিনের বেলা রোজা রাখতেন,
রাতের বেলা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
তুমি যদি হও সেই মনোনীতের উম্মত,
সুন্নত ও মাকরুহের দিকে সদা খেয়াল রেখো।

“আমার হৃদয়ে (ঐশী নূর আসার পথে বাধা সৃষ্টিকারী) পর্দা পড়ে। এজন্য আমি প্রতিদিন ৭০ বার ইস্তিগফার করি” হাদীস শরীফ