মহানবীর ফজিলতসমূহ
মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের ফজিলত বর্ণনাকারী শত শত গ্রন্থ রয়েছে। ফজিলত অর্থ “শ্রেষ্ঠত্ব”। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বসমূহের কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো: ১. সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর ও রুহ সৃষ্টি করা হয়েছে। ২. আল্লাহ তাআলা তাঁর নাম আরশে, জান্নাতসমূহে এবং সাত আসমানে লিখে রেখেছেন। ৩. ভারতবর্ষে জন্মানো এক প্রকার গোলাপের পাপড়িতে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” লেখা রয়েছে। ৪. বসরা শহরের নিকটবর্তী এক নদীতে ধরা একটি মাছের ডান পাশে “আল্লাহ” এবং বাম পাশে “মুহাম্মদ” লেখা দেখা গেছে। এ ধরনের ঘটনা অনেক। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে প্রকাশিত A History of Fishes গ্রন্থের দুইশোতম পৃষ্ঠায় একটি মাছের ছবি রয়েছে, যার লেজে পবিত্র কুরআনের হরফে “শানুল্লাহ” লেখা। প্রদত্ত তথ্যে জানানো হয়েছে যে, লেজের অপর পাশে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” লেখা রয়েছে। এর দৃষ্টান্ত অসংখ্য। ৫. এমন ফেরেশতা আছেন, মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নাম উচ্চারণ করা ছাড়া যাঁদের আর কোনো দায়িত্ব নেই। ৬. ফেরেশতাদের হযরত আদমকে সিজদা করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল এই কারণে যে, তাঁর ললাটে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর ছিল। ৭. আল্লাহ তাআলা সকল নবীকে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের আগমনের কথা জানিয়েছেন; সেই সঙ্গে তাঁদের বলেছেন, তাঁরা যেন নিজ নিজ উম্মতকে আদেশ দেন, তাঁর যুগ পেলে তারা যেন তাঁর প্রতি ঈমান আনে। ৮. তাঁর দুনিয়ায় আগমনের সময় অত্যন্ত বড় বড় নিদর্শন দেখা গিয়েছিল। ইতিহাস ও মাওলিদ গ্রন্থসমূহে সেগুলো লেখা আছে। ৯. দুনিয়ায় আগমনের সময় তাঁকে নাড়ি কাটা ও খতনা করা অবস্থায় দেখা গেছে। ১০. তিনি দুনিয়ায় আগমনের পর শয়তানরা আর আসমানে উঠতে এবং ফেরেশতাদের কাছ থেকে খবর চুরি করতে পারত না। ১১. তাঁর আগমনের সময় পৃথিবীর সমস্ত মূর্তি ও পূজিত ভাস্কর্য উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছিল। ১২. ফেরেশতারা তাঁর দোলনা দোলাতেন। ১৩. দোলনায় থাকা অবস্থায় তিনি আকাশের চাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি মুবারক আঙুল দিয়ে যেদিকে ইশারা করতেন, চাঁদ সেদিকে হেলে পড়ত। ১৪. দোলনায় থাকতেই তিনি কথা বলতে শুরু করেন। ১৫. শৈশবে খোলা জায়গায় চলাফেরার সময় তাঁর মাথা বরাবর একখণ্ড মেঘ তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলে ছায়া দিত। এ অবস্থা তাঁর নবুয়ত শুরু হওয়া পর্যন্ত চলেছিল। ১৬. প্রত্যেক নবীর ডান হাতের ওপর নবুয়তের মোহর ছিল। কিন্তু মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মোহর ছিল তাঁর মুবারক পিঠের মাঝখানে, বাম কাঁধের হাড়ের কাছে, হৃদয় বরাবর। জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর হৃদয় ধুয়ে বুক বন্ধ করার সময় জান্নাত থেকে আনা মোহর দিয়ে তাঁর পিঠে ছাপ দিয়েছিলেন।
১৭. সামনে যেমন দেখতেন, পেছনেও তেমনি দেখতেন।
১৮. আলোতে যেমন দেখতেন, অন্ধকারেও তেমনি দেখতেন। ১৯. তাঁর থুতু তেতো পানিকে মিষ্টি করেছে, রোগীদের আরোগ্য দিয়েছে, শিশুদের জন্য দুধের মতো খাদ্য হয়েছে। ২০. তাঁর চোখ ঘুমালেও হৃদয় জাগ্রত থাকত। (সকল নবীও এমন ছিলেন।) ২১. জীবনে কখনো হাই তোলেননি। ২২. তাঁর মুবারক ঘাম গোলাপের মতো সুগন্ধময় ছিল। এক দরিদ্র ব্যক্তি নিজের মেয়ের বিয়ের সময় তাঁর কাছে সাহায্য চেয়েছিল। সে মুহূর্তে তাঁর দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। তিনি একটি ছোট শিশিতে নিজের ঘাম ভরে দিলেন। সেই মেয়ে যখনই তা মুখে ও মাথায় মাখত, তার ঘর মেশকের সুবাসে ভরে উঠত। তার ঘর “সুগন্ধি ঘর” নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল। ২৩. মাঝারি উচ্চতার হওয়া সত্ত্বেও লম্বা লোকদের পাশে থাকলে তাদের চেয়ে উঁচু দেখাত। ২৪. সূর্য ও চাঁদের আলোয় হাঁটলে তাঁর ছায়া মাটিতে পড়ত না। ২৫. তাঁর দেহে ও পোশাকে মাছি, মশা ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ বসত না। ২৬. তাঁর অন্তর্বাস যত দিনই পরতেন, কখনো ময়লা হতো না। ২৭. তিনি যখনই হাঁটতেন, তাঁর পেছনে ফেরেশতারা চলতেন। এজন্য তিনি সাহাবীগণকে সামনে হাঁটাতেন এবং বলতেন, “আমার পেছনটা ফেরেশতাদের জন্য ছেড়ে দাও।”1 ২৮. পাথরের ওপর পা রাখলে পাথরে তাঁর পায়ের ছাপ পড়ে যেত। আর বালুর ওপর দিয়ে চললে কোনো ছাপই পড়ত না। প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারলে মাটি ফাঁক হয়ে প্রস্রাব ইত্যাদি মাটির ভেতরে চলে যেত। (সকল নবীও এমন ছিলেন।) ২৯. মানুষ ও ফেরেশতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান তাঁকে দেওয়া হয়েছে। তিনি উম্মি হওয়া সত্ত্বেও, অর্থাৎ কারও কাছ থেকে কিছু না শিখলেও আল্লাহ তাআলা তাঁকে সবকিছু জানিয়েছেন। আদম আলাইহিস সালামকে যেমন প্রতিটি জিনিসের নাম জানানো হয়েছিল, তেমনি তাঁকে প্রতিটি জিনিসের নাম জানানো ও জ্ঞান দান করা হয়েছে। ৩০. তাঁর উম্মতের নাম, আকৃতি এবং তাদের মধ্যে যা কিছু ঘটবে, সবকিছু তাঁকে জানানো হয়েছে। ৩১. তাঁর বুদ্ধি সকল মানুষের বুদ্ধির চেয়ে বেশি। ৩২. মানুষের মধ্যে থাকতে পারে এমন সমস্ত উত্তম স্বভাব তাঁকে দান করা হয়েছে। মহাকবি উমর ইবনুল ফারিদকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি রাসূলুল্লাহর প্রশংসা করেননি কেন?” তিনি বললেন, “আমি বুঝতে পেরেছি, তাঁর প্রশংসা করার সামর্থ্য আমার হবে না। তাঁর প্রশংসা করার মতো শব্দ আমি খুঁজে পাইনি।”
“আমার উম্মতের একজনও জাহান্নামে থেকে যাবে – এতে আমি রাজি হব না” হাদীস শরীফ
৩৩. কালিমায়ে শাহাদাতে, আজানে, ইকামতে, নামাজের তাশাহহুদে, বহু দোয়ায়, কিছু ইবাদতে ও খুতবায়, উপদেশ দেওয়ার সময়, কষ্টের সময়ে, কবরে, হাশরে, জান্নাতে এবং প্রত্যেক সৃষ্টির মুখে আল্লাহ তাআলা তাঁর নাম নিজের নামের পাশে রেখেছেন। ৩৪. তাঁর শ্রেষ্ঠত্বসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো তাঁর হাবিবুল্লাহ হওয়া। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজের প্রিয়তম ও বন্ধু বানিয়েছেন। সবার চেয়ে, প্রত্যেক ফেরেশতার চেয়েও তাঁকে বেশি ভালোবেসেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, “ইবরাহিমকে যদি খলিল বানিয়ে থাকি, তবে তোমাকে বানিয়েছি আমার হাবিব।”
৩৫. “তুমি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত (‘যথেষ্ট হয়েছে!’ না বলা পর্যন্ত) আমি তোমাকে তোমার প্রতিটি কাম্য বস্তু দিতে থাকব”2 – এই মর্মের পবিত্র আয়াত প্রতিশ্রুতি দেয় যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে সমস্ত জ্ঞান, সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব, ইসলামের বিধিবিধান, শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য ও বিজয়, তাঁর উম্মতকে বহু বিজয় ও সাফল্য এবং কিয়ামতে সব ধরনের শাফায়াত ও তাজাল্লি দান করবেন। এই পবিত্র আয়াত নাজিল হলে তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার উম্মতের একজনও জাহান্নামে থেকে যাবে – এতে আমি রাজি হব না।” ৩৬. আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রত্যেক নবীকে তাঁর নাম ধরে সম্বোধন করেছেন, আর মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করেছেন “হে আমার রাসূল! হে আমার নবী!” বলে। ৩৭. তিনি আরবি ভাষার প্রতিটি আঞ্চলিক রূপে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সহজবোধ্যভাবে কথা বলতেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে যারা প্রশ্ন করত, তাদের নিজ নিজ উপভাষায় উত্তর দিতেন। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে যেত। তিনি বলতেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছেন।”3
৩৮. অল্প কথায় অনেক কিছু বোঝাতেন। তাঁর এক লক্ষেরও বেশি হাদীস শরীফ প্রমাণ করে যে, তিনি ছিলেন “জাওয়ামিউল কালিম”।
কিছু আলেম বলেছেন, “মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম ইসলাম ধর্মের চারটি ভিত্তি চারটি হাদীসের মাধ্যমে জানিয়েছেন:
- ‘আমলসমূহ নিয়ত অনুযায়ী মূল্যায়িত হয়।’4
- ‘হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট।’5
- ‘বাদীর দায়িত্ব সাক্ষী উপস্থিত করা, আর বিবাদীর দায়িত্ব কসম করা।’6 এবং
- ‘কোনো ব্যক্তি নিজের জন্য যা কামনা করে, তা তার দ্বীনি ভাইয়ের জন্যও কামনা না করা পর্যন্ত তার ঈমান পূর্ণ হয় না।’7 এই চারটি হাদীসের প্রথমটি ইবাদতের, দ্বিতীয়টি মুআমালাতের (পারস্পরিক লেনদেনের), তৃতীয়টি খুসুমাতের, অর্থাৎ বিচার ও শাসনসংক্রান্ত বিষয়ের এবং চতুর্থটি আদব ও চরিত্রবিষয়ক জ্ঞানের ভিত্তি।”8
৩৯. মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম ছিলেন মাসুন (সুরক্ষিত) ও মাসুম (নিষ্পাপ)। জেনে বা না জেনে, বড় বা ছোট – চল্লিশ বছর বয়সের আগে বা পরে – তিনি কোনো গুনাহ করেননি। তাঁর কোনো অশোভন কাজ দেখা যায়নি। ৪০. মুসলমানদের নামাজে বসা অবস্থায় “আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি” পাঠ করে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে সালাম দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। নামাজে অন্য কোনো নবী বা ফেরেশতাদের সালাম দেওয়া জায়েজ নয়। ৪১. হাদীসে কুদসিতে ইরশাদ হয়েছে, “তুমি না হলে আমি কিছুই সৃষ্টি করতাম না!”9
৪২. অন্য নবীগণ কাফিরদের অপবাদের জবাব নিজেরাই দিয়েছেন। আর মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে আরোপিত অপবাদের জবাব আল্লাহ তাআলা নিজে দিয়ে তাঁকে রক্ষা করেছেন। ৪৩. মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের উম্মতের সংখ্যা অন্য সকল নবীর উম্মতের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি। এই উম্মত অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও অধিক মর্যাদাবান। জান্নাতে প্রবেশকারীদের তিন ভাগের দুই ভাগ এই উম্মত থেকে হবে বলে হাদীস শরীফে জানানো হয়েছে। ৪৪. রাসূলুল্লাহকে যে সওয়াব দেওয়া হবে, তা অন্য নবীদের দেওয়া সওয়াবের চেয়ে বহু গুণ বেশি।
যে ব্যক্তি কবুল হওয়া কোনো ইবাদত বা কল্যাণকর কাজ করে, তাকে যে পরিমাণ সওয়াব দেওয়া হয়, তার উস্তাদকেও সেই পরিমাণ সওয়াব দেওয়া হবে। উস্তাদের উস্তাদকে চার গুণ, তাঁর উস্তাদকে আট গুণ, তাঁরও উস্তাদকে ষোলো গুণ – এভাবে রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত প্রত্যেক উস্তাদকে তাঁর ছাত্রের দ্বিগুণ সওয়াব দেওয়া হবে। যেমন, বিশতম উস্তাদকে ৫,২৪,২৮৮ সওয়াব দেওয়া হবে। মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে তাঁর উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতিটি কাজের সওয়াব দেওয়া হবে।
এই হিসাব অনুযায়ী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে প্রতিটি কাজের জন্য যে সওয়াব দেওয়া হবে, তার সংখ্যা ভেবে দেখলে বোঝা যায়, সবগুলোর পরিমাণ আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ জানে না। সালাফে সালেহিন (পূর্ববর্তী নেককারগণ) পরবর্তীদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ বলে জানানো হয়েছে। সওয়াবের সংখ্যার দিক থেকে এই শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট। ৪৫. তাঁকে নাম ধরে ডাকা, তাঁর কাছে উচ্চস্বরে কথা বলা, দূর থেকে তাঁকে চিৎকার করে ডাকা এবং পথে তাঁর আগে আগে চলা হারাম করা হয়েছে। অন্য নবীদের উম্মতেরা নিজেদের নবীকে নাম ধরে ডাকত। ৪৬. তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামকে ফেরেশতার আকৃতিতে দুবার দেখেছেন। অন্য কোনো নবী তাঁকে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখেননি। ৪৭. তাঁর কাছে জিবরাইল আলাইহিস সালাম চব্বিশ হাজারবার এসেছেন। অন্য নবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছেন মূসা আলাইহিস সালামের কাছে – চারশোবার।
“আমার আহলে বাইতের সঙ্গে যে শত্রুতা করে, সে মুনাফিক (কপট)” হাদীস শরীফ
৪৮. ইসরাফিল আলাইহিস সালামও মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের কাছে বহুবার এসেছেন। অন্য নবীদের (আলাইহিমুস সালাওয়াতু ওয়াত তাসলিমাত) কাছে কেবল জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসেছেন। ৪৯. মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের উসিলা দিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে কসম দিয়ে চাওয়া জায়েজ; অন্য নবী ও ফেরেশতাদের উসিলায় তা জায়েজ নয়। ৫০. মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের পর অন্য কারও জন্য তাঁর স্ত্রীদের বিয়ে করা হারাম করা হয়েছে এবং এদিক থেকে তাঁরা যে মুমিনদের মা, তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্য নবীদের (আলাইহিমুস সালাওয়াতু ওয়াত তাসলিমাত) স্ত্রীরা হয় তাঁদের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে, নয়তো কোনো উপকারে আসেনি। আর মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মুবারক স্ত্রীগণ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুন্না) দুনিয়া ও আখিরাতের কাজে তাঁর সহায়ক হয়েছেন, দারিদ্র্যে ধৈর্য ধরেছেন, শোকর করেছেন এবং ইসলাম প্রচারে বিরাট খেদমত করেছেন। ৫১. নসব ও সবব, অর্থাৎ রক্ত ও বিবাহসূত্রের আত্মীয়তা কিয়ামতে কোনো উপকারে আসবে না। রাসূলুল্লাহর আত্মীয়তা এর ব্যতিক্রম। ৫২. রাসূলুল্লাহর নাম রাখা দুনিয়া ও আখিরাতে উপকারী। তাঁর নাম ধারণকারী প্রকৃত মুমিনরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। ৫৩. তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ সঠিক। তাঁর প্রতিটি ইজতিহাদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সত্যায়িত হয়। ৫৪. তাঁকে ভালোবাসা সবার ওপর ফরজ। তিনি ইরশাদ করেছেন, “যে আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসে, সে আমাকেও ভালোবাসে।” তাঁকে ভালোবাসার নিদর্শন হলো তাঁর দ্বীন, পথ, সুন্নত ও চরিত্রের অনুসরণ করা। পবিত্র কুরআনে তাঁকে আদেশ করা হয়েছে, তিনি যেন বলেন, “তোমরা আমার অনুসরণ করলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের ভালোবাসবেন।”
৫৫. তাঁর আহলে বাইতকে ভালোবাসা ওয়াজিব। তিনি ইরশাদ করেছেন, “আমার আহলে বাইতের সঙ্গে যে শত্রুতা করে, সে মুনাফিক (কপট)।” আহলে বাইত হলেন তাঁর সেই আত্মীয়গণ, যাঁদের জন্য যাকাত গ্রহণ করা হারাম। তাঁরা হলেন তাঁর স্ত্রীগণ এবং তাঁর পরদাদা হাশিমের বংশধর মুমিনগণ, অর্থাৎ আলি, উকাইল, জাফর তাইয়ার ও আব্বাসের বংশধরগণ।
৫৬. তাঁর সকল সাহাবীকে ভালোবাসা ওয়াজিব। তিনি ইরশাদ করেছেন, “আমার পরে আমার সাহাবীদের সঙ্গে শত্রুতা কোরো না! তাঁদের ভালোবাসা আমাকেই ভালোবাসা। তাঁদের সঙ্গে শত্রুতা আমার সঙ্গেই শত্রুতা। যে তাঁদের কষ্ট দেয়, সে আমাকেই কষ্ট দেয়। আর যে আমাকে কষ্ট দেয়, সে আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেয়। যে আল্লাহ তাআলাকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে শাস্তি দেবেন।”
৫৭. আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জন্য আসমানে দুজন ও জমিনে দুজন সাহায্যকারী সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা হলেন জিবরাইল, মিকাইল, আবু বকর ও উমর (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন)।10 ৫৮. পুরুষ হোক বা নারী, বড় হয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেককে কবরে মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। “তোমার রব কে?” যেমন জিজ্ঞেস করা হবে, তেমনি “তোমার নবী কে?” – এ প্রশ্নও করা হবে। ৫৯. মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের হাদীস শরীফ পাঠ করা ইবাদত। পাঠকারীকে সওয়াব দেওয়া হয়।
হাদীস শরীফ পাঠের সময় অজু করা, পরিষ্কার পোশাক পরা, সুগন্ধি লাগানো, হাদীস শরীফের কিতাব উঁচু স্থানে রাখা, বাইরে থেকে আগতদের জন্য পাঠকারীর উঠে না দাঁড়ানো এবং শ্রোতাদের পরস্পর কথা না বলা মুস্তাহাব। যাঁরা নিয়মিত হাদীস শরীফ পাঠ করেন, তাঁদের চেহারা নূরানি, উজ্জ্বল ও সুন্দর হয়। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সময়ও এসব আদব রক্ষা করা আবশ্যক। ৬০. তাঁর মুবারক রুহ কবজ করার জন্য আজরাইল আলাইহিস সালাম মানুষের আকৃতিতে এসেছিলেন এবং ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চেয়েছিলেন। ৬১. তিনি কবরে এমন এক জীবনে জীবিত, যা আমরা জানি না। কবরে তিনি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন, নামাজ আদায় করেন। (সকল নবীও এমন।) ৬২. পৃথিবীর সর্বত্র রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি দরুদ পাঠকারী মুসলমানদের দরুদ যে ফেরেশতারা শোনেন, তাঁরা তাঁর কবরে এসে তাঁকে জানিয়ে দেন। প্রতিদিন হাজার হাজার ফেরেশতা তাঁর কবর জিয়ারত করেন। ৬৩. তাঁর কবরের ভেতরের মাটি সব স্থানের চেয়ে, কাবার চেয়ে এবং জান্নাতসমূহের চেয়েও উত্তম। ৬৪. তাঁর উম্মতের আমল ও ইবাদত প্রতি সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সামনে পেশ করা হয়। যারা সেগুলো করে, তাদেরও তিনি দেখেন এবং গুনাহগারদের ক্ষমার জন্য দোয়া করেন। ৬৫. তাঁর কবর জিয়ারত করা নারীদের জন্যও মুস্তাহাব। তবে অন্যান্য কবর তারা কেবল নির্জন সময়ে এবং মুসলমান নারীর উপযোগী পোশাকে জিয়ারত করতে পারে। ৬৬. জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি ইন্তেকালের পরও পৃথিবীর যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময় যারা তাঁর উসিলা গ্রহণ করে, অর্থাৎ তাঁর খাতিরে ও সম্মানে চায়, আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া কবুল করেন।
এক বেদুইন তাঁর রওজা শরীফের কাছে এসে বলল, “হে আমার রব! তুমি দাস মুক্ত করার আদেশ দিয়েছ। ইনি তোমার নবী, আর আমি তোমার দাসদের একজন। তোমার নবীর খাতিরে আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করো!” তখন একটি আওয়াজ শোনা গেল, “হে আমার বান্দা! কেন শুধু নিজের মুক্তি চাইলে? আমার সব বান্দার মুক্তি কেন চাইলে না? যাও! আমি তোমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিলাম।”
প্রসিদ্ধ আউলিয়ার অন্যতম হাতিম আসাম রাসূলুল্লাহর রওজা শরীফের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আমার রব! আমি তোমার নবীর কবর জিয়ারত করেছি। আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না!” তখন আওয়াজ শোনা গেল, “হে আমার বান্দা! তুমি যে আমার হাবিবের কবর জিয়ারত করেছ, তা আমি কবুল করেছি। তোমাকে এবং তোমার সঙ্গে যারা জিয়ারত করেছে, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।”
ইমাম আহমদ কাসতাল্লানি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, “কয়েক বছর আমি এক রোগে ভুগেছি। চিকিৎসকেরা তার প্রতিকার খুঁজে পাননি। মক্কায় এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহর কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করলাম। সে রাতে স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তাঁর হাতের কাগজে পড়লাম, ‘এখানে রাসূলুল্লাহর অনুমতিক্রমে আহমদ কাসতাল্লানির রোগের ওষুধ লেখা হয়েছে।’ জেগে উঠে দেখি, আমার রোগ আর নেই।” কাসতাল্লানি আরও বলেন, “এক বেচারি মেয়ে মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তার আরোগ্যের জন্য আমি রাসূলুল্লাহর কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করলাম। যে জিন মেয়েটিকে অসুস্থ করে তুলেছিল, স্বপ্নে এক ব্যক্তি সেই জিনকে আমার কাছে নিয়ে এসে বললেন, ‘একে রাসূলুল্লাহ তোমার কাছে পাঠিয়েছেন।’ আমি জিনটির ওপর রাগ করলাম, তাকে ধমক দিলাম। সে মেয়েটিকে আর কষ্ট দেবে না বলে আমার কাছে কসম করল, আর আমি জেগে উঠলাম। পরে খবর পেলাম, মেয়েটি মৃগী রোগ থেকে সেরে উঠেছে।”
৬৭. কিয়ামতের দিন সবার আগে রাসূলুল্লাহ কবর থেকে উঠবেন। তাঁর গায়ে থাকবে জান্নাতের পোশাক। তিনি বুরাকে চড়ে হাশরের ময়দানে যাবেন, তাঁর হাতে থাকবে “লিওয়াউল হামদ” নামক পতাকা। নবীগণ ও সকল মানুষ এই পতাকার নিচে দাঁড়াবেন। হাজার বছর অপেক্ষা করতে করতে সবাই অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়বে। মানুষেরা পালাক্রমে আদম, নূহ, ইবরাহিম, মূসা ও ঈসা নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) কাছে গিয়ে অনুরোধ করবে, তাঁরা যেন হিসাব শুরু হওয়ার জন্য শাফায়াত করেন। তাঁদের প্রত্যেকে নিজ নিজ ওজর পেশ করে জানাবেন যে, তাঁরা আল্লাহ তাআলার কাছে লজ্জিত ও ভীত; তাই তাঁরা শাফায়াত করা থেকে বিরত থাকবেন। শেষে মানুষ রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করলে তিনি সিজদায় গিয়ে দোয়া করবেন এবং তাঁর শাফায়াত কবুল হবে। সবার আগে তাঁর উম্মতের হিসাব নেওয়া হবে, সবার আগে তারা পুলসিরাত পার হবে, সবার আগে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা যেখানেই যাবে, সে স্থান আলোকিত করে তুলবে।
হযরত ফাতিমা পুলসিরাত পার হওয়ার সময় ঘোষণা করা হবে, “সবাই চোখ বন্ধ করো! মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের কন্যা আসছেন।”
৬৮. জান্নাতে রাসূলুল্লাহর মাকামের নাম ওয়াসিলা। এটি জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর। সিদরাতুল মুনতাহা বৃক্ষের মূল সেখানে, যার একটি করে শাখা জান্নাতের প্রত্যেক অধিবাসীর দিকে বিস্তৃত। জান্নাতবাসীদের কাছে নিয়ামত এই শাখাগুলো দিয়েই আসবে।
৬৯. আদম আলাইহিস সালামের যুগে নামাজের জন্য যে আজান দেওয়া হতো, তাতে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নামও উচ্চারিত হতো।
৭০. তাওরাত, ইঞ্জিল ও জাবুরে মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম, তাঁর চার খলিফা, সাহাবীগণ এবং তাঁর উম্মতের কিছু লোক সুন্দর গুণাবলিতে বর্ণিত ও প্রশংসিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা নিজের মাহমুদ নাম থেকে “মুহাম্মদ” শব্দটি বের করে তাঁর হাবিবের নাম রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা নিজের নামসমূহ থেকে রউফ ও রহিম নাম দুটি তাঁর হাবিবকেও দান করেছেন। ৭১. তিন বছর বয়সে, চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত জানানোর সময় এবং বায়ান্ন বছর বয়সে মিরাজে নিয়ে যাওয়ার সময় ফেরেশতারা তাঁর বুক বিদীর্ণ করেছিলেন। জান্নাত থেকে আনা একটি গামলায় জান্নাতের পানি দিয়ে তাঁরা তাঁর হৃদয় ধুয়ে দিয়েছিলেন। ৭২. সাওর (ষাঁড়, বৃষ) রাশির কাছে অবস্থিত “সুরাইয়া” নামক নক্ষত্রপুঞ্জের সাতটি তারা তিনি খালি চোখে দেখে সেগুলোর সংখ্যা জানিয়েছিলেন। এই নক্ষত্রপুঞ্জকে পারভিন ও উলকারও বলা হয়। ৭৩. কেউ কেউ তাঁর শিঙা লাগানোর (হিজামার) রক্ত পান করেছিলেন। একজন তা পান করলে তিনি ইরশাদ করলেন, “জাহান্নামের আগুন তাকে পোড়াবে না।” ৭৪. তাঁর একটি মহান মুজিযা হলো মিরাজে নিয়ে যাওয়া। বুরাক নামক জান্নাতি বাহনে করে তাঁকে মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে (জেরুজালেমে) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে আসমানসমূহে ও আরশে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে বিস্ময়কর সব জিনিস দেখানো হয়। তিনি আল্লাহ তাআলাকে মাথার চোখে দেখেছেন, এমনভাবে যার ধরন জানা যায় না। (তবে এই দেখা হয়েছিল জড়জগতের বাইরে, অর্থাৎ আখিরাতের জগতে।) মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে আবার ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়। মিরাজের মুজিযা আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।
৭৫. জীবনে একবার তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা তাঁর উম্মতের ওপর ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ও ফেরেশতাগণও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাচ্ছেন।
“আমি বান্দা হিসেবে নবুয়ত চাই” হাদীস শরীফ
৭৬. রাতে, জাগ্রত অবস্থায় ও ঘুমের মধ্যে, একাকী ও লোকসমাগমে, সফরে ও ঘরে, যুদ্ধে, হাসার সময় ও কাঁদার সময় – সর্বাবস্থায় তাঁর মুবারক হৃদয় আল্লাহ তাআলার সঙ্গে থাকত। আর কোনো কোনো সময় কেবল আল্লাহ তাআলার সঙ্গেই থাকত।
দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করতে এবং মুবারক হৃদয়কে মানবজগতের দিকে ফেরাতে তিনি স্ত্রী আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কাছে এসে বলতেন, “হে আয়েশা! আমার সঙ্গে একটু কথা বলো (যেন আমি নিজের মধ্যে ফিরে আসি)।” এরপর সাহাবীগণকে উপদেশ দিতে ও সঠিক পথ দেখাতে যেতেন। ফজরের নামাজের সুন্নত ঘরে আদায় করে আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর সাহাবীগণকে ফরজ নামাজ পড়ানোর জন্য মসজিদে যেতেন। এই অবস্থা নবীর বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহের (খাসায়িসের) অন্তর্ভুক্ত। আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সঙ্গে কথা না বলে বাইরে বের হলে ঐশী তাজাল্লি ও নূরের কারণে কেউ তাঁর চেহারার দিকে তাকাতে পারত না। ৭৭. তিনি পদমর্যাদা ও রাজত্ব চাননি; নবুয়ত ও দারিদ্র্য চেয়েছেন। এক সকালে জিবরাইল আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বললেন, “গত রাতে আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো এক লোকমা খাবারও ছিল না।” তখনই ইসরাফিল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “আপনি যা বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তা শুনেছেন এবং আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনি চাইলে আপনার হাত যে পাথরেই লাগবে, তা সোনা, রুপা বা পান্না হয়ে যাবে। আপনি চাইলে বাদশাহ হয়ে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করুন।” রাসূলুল্লাহ তিনবার বললেন, “আমি বান্দা হিসেবে নবুয়ত চাই।”
৭৮. অন্য নবীগণ (আলাইহিমুস সালাওয়াতু ওয়াত তাসলিমাত) নির্দিষ্ট এক যুগে, নির্দিষ্ট এক দেশে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর সকল মানুষ ও জিনের জন্য নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছে। তিনি ফেরেশতা, প্রাণী, উদ্ভিদ ও জড়বস্তুরও, সংক্ষেপে সমস্ত সৃষ্টির নবী – এ কথা জানিয়েছেন এমন আলেমও আছেন।
৭৯. তাঁর রহমত ও কল্যাণ সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মুমিনদের প্রতি তাঁর কল্যাণ সুস্পষ্ট। অন্য নবীদের (আলাইহিমুস সালাওয়াতু ওয়াত তাসলিমাত) যুগের কাফিরদের দুনিয়াতেই আজাব দেওয়া হতো, তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হতো। আর যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনেনি, তাদের দুনিয়ায় আজাব দেওয়া হয়নি। একদিন তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামকে বললেন, “আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন যে, আমি জগৎসমূহের জন্য রহমত। আমার রহমত থেকে তোমার ভাগেও কি কিছু জুটেছে?” জিবরাইল বললেন, “আল্লাহর মহত্ত্ব ও প্রতাপের সামনে আমার পরিণাম কী হবে – এই ভয়ে আমি সবসময় ভীত থাকতাম। আমি যে আমিন (বিশ্বস্ত), তা জানিয়ে দেওয়া আয়াতগুলো (সূরা তাকভিরের ২০ ও ২১তম আয়াত) যখন নিয়ে এলাম, এই প্রশংসার কারণে আমি সেই ভয়ংকর ভীতি থেকে মুক্তি পেলাম, নিশ্চিন্ত হলাম। এর চেয়ে বড় রহমত আর কী হতে পারে?” ৮০. আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন, মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম যেন সন্তুষ্ট হন। (৩৫তম ফজিলতে যেমন আমরা উল্লেখ করেছি, তিনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর কাম্য সবকিছু দান করবেন। এ বিষয়টি সূরা দুহায় জানানো হয়েছে।)
৮১. “মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া” গ্রন্থে বলা হয়েছে, “আমি আমার রবের কাছে চেয়েছি, আমার উম্মত যেন গোমরাহির (দালালাতের) ওপর ঐক্যবদ্ধ না হয়। তিনি তা কবুল করেছেন” – এই হাদীস শরীফটি প্রসিদ্ধ।
আরেক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের তিনটি বিষয় থেকে রক্ষা করেছেন। প্রথমত, তিনি তোমাদের গোমরাহির ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। দ্বিতীয়ত, সংক্রামক রোগে যে মারা যায়, সে শহিদের সওয়াব লাভ করে। তৃতীয়ত, দুজন নেককার মুসলমান কোনো মুসলমান সম্পর্কে ‘সে ভালো মানুষ’ বলে সাক্ষ্য দিলে সেই মুসলমান জান্নাতে যায়।”
এক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “আমার সাহাবীদের মতভেদ তোমাদের জন্য রহমত” এবং “আমার উম্মতের মতভেদ (আমলের ক্ষেত্রে মাজহাবে বিভক্ত হওয়া) রহমত।” তাঁর উম্মত হক ও সত্য খুঁজে বের করার চেষ্টায় মতভেদে পড়ে। আর তাদের এই প্রচেষ্টা রহমতের কারণ হয়। এই হাদীস শরীফকে দুই ব্যক্তি অস্বীকার করেছে: একজন মাজিন, অপরজন মুলহিদ। মাজিন হলো সেই প্রতারক, যে দ্বীনকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার বানায়। আর মুলহিদ হলো সেই পথভ্রষ্ট, যে দুনিয়ার স্বার্থ অনুযায়ী পবিত্র আয়াতসমূহের অর্থ করে কাফির হয়ে গেছে। ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ বলেন, ইসলামের আলেমগণ বিষয়কে সহজ করে দেন। একই বিষয়ে একজন বলেছেন “হালাল”, অন্যজন বলেছেন “হারাম”। নেককার মানুষের জন্য যেটিকে তাঁরা হালাল বলেছেন, ফাসাদের যুগে সেটিকেই হারাম বলেছেন। ওপরের হাদীস শরীফগুলো দেখায় যে, ইজমায়ে উম্মত, অর্থাৎ মুজতাহিদ নামে পরিচিত আলেমগণের ঐকমত্য, আদিল্লায়ে শারইয়্যার (শরিয়তের দলিলসমূহের) অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এটি দ্বীনি জ্ঞানের চারটি উৎসের একটি, এবং চার মাজহাবই হক। মাজহাবসমূহ মুসলমানদের প্রতি আল্লাহ তাআলার রহমত। ৮২. রাসূলুল্লাহর মুবারক কন্যাগণ ও স্ত্রীগণ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুন্না) দুনিয়ার নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর সকল সাহাবীও নবীগণের পর সকল মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর শহর মক্কা মুকাররমা এবং তারপর মদিনা মুনাওয়ারা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান স্থান। তাঁর মসজিদ শরীফে আদায় করা এক রাকাত নামাজের জন্য এক হাজার রাকাতের সওয়াব লেখা হয়। অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রেও এমনই।
তাঁর কবর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগান। তিনি ইরশাদ করেন:
“আমার ওফাতের পর যে আমাকে জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমাকে জিয়ারত করল। হারামাইনের কোনো একটিতে যে মুমিন মারা যায়, কিয়ামতের দিন তাকে নিরাপদ অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে।” মক্কা ও মদিনা শহরকে হারামাইন বলা হয়। ৮৩. প্রত্যেকের বংশধারা চলে তার পুত্রের মাধ্যমে। কিন্তু মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের বংশধারা চলেছে তাঁর কন্যা ফাতিমা থেকে। এ বিষয়টি হাদীস শরীফেও জানানো হয়েছে। ৮৪. প্রত্যেক মানুষের জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী আছে। এই শয়তান কাফির। সে কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) দিয়ে মানুষের ঈমান কেড়ে নিতে এবং তাকে দিয়ে গুনাহ করাতে চেষ্টা করে। রাসূল আলাইহিস সালাম তাঁর সঙ্গী জিনকে ঈমানের পথে নিয়ে এসেছেন।
৮৫. রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তেকালের সময় জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম পৌঁছালেন এবং জানালেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন। জিবরাইল তাঁকে তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ দিলেন এবং রাসূলুল্লাহর নিজের ও তাঁর উম্মতের জন্য বহু সুসংবাদ দিলেন।
তোমার পায়ের ধুলোর বদলে জগৎও নেব না, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তোমার একটি কেশের বদলে সাত আসমানও নেব না, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
সিদ্দিকের কামনা – তোমার একটিমাত্র সাহু (ভুলে যাওয়া) হওয়া, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
ইরফানের অভিলাষ তোমার পায়ের ধুলো হওয়া, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
