আমার প্রিয় নবী

দ্বিতীয় পর্ব কবরের জীবন

মহানবীর কবরে জীবিত থাকা

নবীগণ তাঁদের কবরে আমাদের অজানা এক জীবনে জীবিত আছেন। আউলিয়া ও শহিদগণও জীবিত। তাঁদের জীবিত থাকা কেবল কথার কথা নয়। তাঁরা প্রকৃত অর্থেই, পরিপূর্ণভাবে জীবিত। সূরা আলে ইমরানের ১৬৯তম পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলার পথে যারা নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে কোরো না! তারা তাদের রবের কাছে জীবিত। তাদের রিজিক দেওয়া হচ্ছে।”

এই পবিত্র আয়াত জানাচ্ছে যে, শহিদগণ জীবিত। আর নবীগণ তো নিঃসন্দেহে শহিদদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী ও শ্রেষ্ঠ। ইসলামের আলেমগণের মতে, প্রত্যেক নবী শহিদ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর শেষ অসুখের সময় ইরশাদ করেন, “খায়বারে যে খাবার খেয়েছিলাম, তার যন্ত্রণা আমি সবসময় অনুভব করতাম।”1 এই হাদীস শরীফ জানাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ শহিদ হিসেবে ইন্তেকাল করেছেন। এ কারণে মহানবী যে সকল শহিদের মতো তাঁর কবরে জীবিত, তা এখান থেকেও বোঝা যায়।

“বুখারি শরীফ” ও “মুসলিম শরীফ” গ্রন্থে বর্ণিত হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “মিরাজের রাতে আমাকে মূসার (আলাইহিস সালাম) কবরের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি তাঁর কবরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন।”2

আরেকটি হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা নবীগণের দেহ পচিয়ে ফেলা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।”3 এ কথা যে সত্য, আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে তা জানিয়েছেন। “বুখারি শরীফ” ও “মুসলিম শরীফ” গ্রন্থে লেখা আছে, “আল্লাহ তাআলা মিরাজের রাতে সকল নবীকে আমাদের নবীর কাছে পাঠালেন। তিনি তাঁদের ইমাম হলেন, আর তাঁরা দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন।”

নামাজ আদায় হয় রুকু ও সিজদার মাধ্যমে। এই বর্ণনা প্রমাণ করে যে, তাঁরা জীবিত অবস্থায়, দেহসহ নামাজ আদায় করেছেন। মূসা আলাইহিস সালামের কবরে নামাজ পড়াও এ কথাই প্রমাণ করে। “মিশকাত” গ্রন্থের শেষ খণ্ডে মিরাজ অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদের শেষে মুসলিম থেকে নেওয়া, আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা আমাকে দেখালেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন, তিনি ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের। তাঁর চুল এলোমেলোও ছিল না, ঝুলেও পড়েনি। তিনি ছিলেন শানুআ গোত্রের এক বীর যুবকের মতো। আর ঈসা (আলাইহিস সালাম) দেখতে ছিলেন উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফির মতো।”4 শানুআ ইয়েমেনের দুটি গোত্রের নাম। এই হাদীস শরীফগুলো প্রমাণ করে যে, নবীগণ তাঁদের রবের কাছে জীবিত। তাঁদের দেহ তাঁদের রুহের মতোই সূক্ষ্ম হয়ে গেছে। তা স্থূল ও কঠিন নয়। তাঁরা বস্তুজগতে ও রুহের জগতে – উভয় জগতেই দৃশ্যমান হতে পারেন। এ কারণে নবীগণ তাঁদের রুহ ও দেহ – উভয়সহ দেখা দিতে পারেন। হাদীস শরীফে জানানো হয়েছে যে, মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ পড়া মানে নানা রকম নড়াচড়া করা। এই নড়াচড়া হয় দেহ দিয়ে, রুহ দিয়ে নয়। মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে মহানবী বলেছেন, “আমি তাঁকে মাঝারি গড়নের, হালকা-পাতলা, পরিপাটি চুলের অবস্থায় দেখেছি।” তাঁর এই উক্তি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর রুহ নয়, দেহই দেখেছিলেন।

“আল্লাহ তাআলার পথে যারা নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে কোরো না! তারা তাদের রবের কাছে জীবিত। তাদের রিজিক দেওয়া হচ্ছে” আলে ইমরান: ১৬৯

ইমাম বায়হাকি বলেছেন, “নবীগণকে কবরে রাখার পর তাঁদের রুহ তাঁদের দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা তাঁদের দেখতে পাই না। ফেরেশতাদের মতো তাঁরা অদৃশ্য থাকেন। কেবল আল্লাহ তাআলা যাঁদের কারামত হিসেবে এ ক্ষমতা দান করেছেন, সেই নির্বাচিত ব্যক্তিরাই তাঁদের দেখতে পান।” ইমাম সুয়ুতিও এমনটিই বলেছেন। বহু মানুষ বহুবার শুনেছেন যে, রওজা মুবারক থেকে সালামের জবাব দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য কবর থেকেও সালামের জবাব দেওয়ার কথা বহুবার শোনা গেছে।

হাদীস শরীফেও ইরশাদ হয়েছে, “আমাকে সালাম দেওয়া হলে আল্লাহ তাআলা আমার রুহ ফিরিয়ে দেন, আর আমি তার জবাব দিই।”5

হযরত ইমাম সুয়ুতি বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ ঐশী সৌন্দর্যের (জামালে ইলাহির) দর্শনে নিমগ্ন। দেহের অনুভূতিগুলো তিনি ভুলে গেছেন। কোনো মুসলমান সালাম দিলে তাঁর মুবারক রুহ সেই অবস্থা থেকে সরে এসে দেহের অনুভূতি গ্রহণ করে। দুনিয়াতেও এমন মানুষ কম নয়। দুনিয়ার বা আখিরাতের কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সময় মানুষ তার পাশে কী বলা হচ্ছে, তা শুনতে পায় না। তাহলে ঐশী সৌন্দর্যে নিমগ্ন ব্যক্তি কি কোনো আওয়াজ শুনতে পারেন?”

হযরত কাজি ইয়াজ “শিফা শরীফ” গ্রন্থে সুলাইমান ইবনে সুহাইমের এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন: “এক রাতে স্বপ্নে ফখরে কায়েনাত মহানবীকে দেখে বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! যারা এসে আপনাকে সালাম দেয়, আপনি কি তাদের সালাম জানতে পারেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, জানতে পারি, তাদের সালাম গ্রহণ করি এবং জবাব দিই।’” নবীগণ যে তাঁদের কবরে জীবিত, তা জানায় এমন হাদীস শরীফ এত বেশি যে, সেগুলো পরস্পরকে শক্তিশালী করে। যেমন ইরশাদ হয়েছে, “আমার কবরের কাছে আমার জন্য যে দরুদ পড়া হয়, আমি তা শুনতে পাই। আর দূরের স্থানে যা পড়া হয়, তা আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।” এই হাদীস শরীফ আবু বকর ইবনে আবি শাইবা বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস শরীফ এবং এ ধরনের আরও হাদীস শরীফ ছয়জন মহান হাদীস-ইমামের গ্রন্থে রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণিত হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “কোনো ব্যক্তি তার কোনো পরিচিত লোকের কবরের কাছে গিয়ে সালাম দিলে মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারে এবং জবাব দেয়। আর অপরিচিত কোনো মৃতকে সালাম দিলে মৃত ব্যক্তি আনন্দিত হয় এবং জবাব দেয়।”

যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সর্বত্র একই সময়ে যারা দরুদ ও সালাম পাঠ করে, রাসূলুল্লাহ তাদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে কীভাবে জবাব দেন, তাহলে উত্তরে বলা হয়: যেমন দুপুরের সূর্য এক মুহূর্তে হাজার হাজার শহরে আলো ছড়িয়ে দেয়, তেমনি। হযরত ইবরাহিম ইবনে বিশার বলেছেন, “হজ আদায়ের পর আমি রওজা মুবারক জিয়ারতের জন্য মদিনায় গেলাম। হুজরায়ে সাআদাতের সামনে সালাম দিলাম এবং ‘ওয়া আলাইকাস সালাম’ – এই জবাব শুনতে পেলাম।”

এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “মৃত্যুর পরও আমি জীবিত অবস্থার মতোই বুঝতে পারি।” আরেক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “নবীগণ তাঁদের কবরে জীবিত এবং নামাজ আদায় করেন।”6

আউলিয়ায়ে কেরামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হযরত সাইয়্যিদ আহমদ রিফায়ি এবং আরও বহু ওলি রাসূলুল্লাহকে দেওয়া সালামের জবাব শুনেছেন, আর আহমদ রিফায়ি রাসূলুল্লাহর মুবারক হাত চুম্বনের সৌভাগ্য লাভ করেছেন – এ কথা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে লেখা আছে। ইমাম সুয়ুতি তাঁর গ্রন্থে বলেন, “উচ্চ মর্যাদার ওলিগণ নবীগণকে এমনভাবে দেখেন, যেন তাঁরা ইন্তেকাল করেননি। মহানবীর মূসা আলাইহিস সালামকে তাঁর কবরে জীবিত দেখা ছিল একটি মুজিযা। আউলিয়ার এভাবে দেখা হলো কারামত। কারামতে বিশ্বাস না করা অজ্ঞতা থেকে আসে।”

ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ ও আবু দাউদ বর্ণিত হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “জুমার দিনে আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো! তা আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।” যখন জিজ্ঞেস করা হলো, “মৃত্যুর পরও কি পৌঁছে দেওয়া হবে?” তখন তিনি বললেন, “মাটি নবীগণের দেহ পচায় না। কোনো মুমিন আমার প্রতি দরুদ পাঠ করলে একজন ফেরেশতা আমাকে খবর দিয়ে বলেন, ‘আপনার উম্মতের অমুকের পুত্র অমুক আপনাকে সালাম জানিয়েছে এবং দোয়া করেছে।’”

রাসূলুল্লাহ জীবিত অবস্থায় যেমন তাঁর সাহাবীদের জন্য আল্লাহ তাআলার এক রহমত ও মহা নিয়ামত ছিলেন, তেমনি ইন্তেকালের পরও তিনি তাঁর সমগ্র উম্মতের জন্য এক মহা নিয়ামত। তিনি সকল কল্যাণের উপলক্ষ। বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুজানি বর্ণিত হাদীস শরীফে রাসূলে আকরাম ইরশাদ করেন, “আমার জীবন তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তোমরা আমাকে বলো, আমিও তোমাদের বলি। মৃত্যুর পর আমার ইন্তেকালও তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। তোমাদের আমলসমূহ আমার সামনে পেশ করা হবে। তোমাদের ভালো কাজ দেখলে আমি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করব। আর মন্দ কাজ দেখলে তোমাদের জন্য ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করব।”7

হযরত কুসাম ইবনে আব্বাস রাসূলুল্লাহর দাফনের কাজে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। কবরের কাজ শেষ হলে তিনিই সবার শেষে সেখান থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহর মুবারক চেহারা সবার শেষে আমিই দেখেছি। কবরে তাঁর মুবারক ঠোঁট নড়ছিল। আমি তাঁর দিকে ঝুঁকে কান পাতলাম। তিনি বলছিলেন, ‘হে আমার রব! আমার উম্মত!… হে আমার রব! আমার উম্মত!…’”8

মহানবীকে দেখা

রাসূলুল্লাহকে কি ঘুমে ও জাগ্রত অবস্থায় দেখা যায়? দেখা গেলে যাঁকে দেখা যায়, তিনি কি স্বয়ং তিনি, নাকি তাঁর সদৃশ কেউ? আমাদের আলেমগণ এর বিভিন্ন উত্তর দিয়েছেন। তিনি যে কবরে জীবিত – এ কথা সর্বসম্মতভাবে জানানোর পর তাঁদের অধিকাংশ বলেছেন যে, স্বয়ং তাঁকেই দেখা যায়। এমনটি যে হয়, তা হাদীস শরীফ থেকেও বোঝা যায়। এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখল।”9 এ কারণে হযরত ইমাম নববি বলেছেন, “তাঁকে স্বপ্নে দেখা মানে পুরোপুরি স্বয়ং তাঁকেই দেখা।” হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে সত্যিই দেখল। কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না।”10

“যে আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে যেন আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখল” হাদীস শরীফ

হযরত ইবরাহিম লাকানি বলেন, “হাদীসের আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহকে স্বপ্নের মতো জাগ্রত অবস্থায়ও দেখা যেতে পারে।” উভয় অবস্থারই বহু দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। তার কয়েকটি উল্লেখ করা যাক:

হযরত মুইনুদ্দিন চিশতি যে শহরেই যেতেন, সেখানকার কবরস্থান জিয়ারত করতেন এবং কিছুকাল সেখানে অবস্থান করতেন। যেখানে যেতেন, সেখানে লোকে তাঁকে চিনে ফেললে তিনি আর থাকতেন না, কাউকে না জানিয়ে গোপনে চলে যেতেন। তাঁর এসব সফরের একটি ছিল মক্কায়। তিনি মক্কা মুকাররমায় গিয়ে কাবা মুআজ্জমা জিয়ারত করলেন। কিছুদিন মক্কায় থেকে সেখান থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় গেলেন। একদিন তিনি যখন মহানবীর কবর শরীফ জিয়ারত করছিলেন, তখন রওজা মুবারক থেকে একটি আওয়াজ শোনা গেল, “মুইনুদ্দিনকে ডাকো!” এই আদেশ শুনে রওজার খাদেম ডাক দিলেন, “মুইনুদ্দিন!” কয়েক জায়গা থেকে আওয়াজ এল, “জি, আমি!” তারপর তাঁরা বললেন, “কোন মুইনুদ্দিনকে খুঁজছেন? এখানে মুইনুদ্দিন নামের অনেক লোক আছে।” তখন রওজার খাদেম ফিরে গিয়ে রওজায়ে মুতাহহারার দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি দুবার শুনলেন, এক কণ্ঠ ডেকে বলছে, “মুইনুদ্দিন চিশতিকে ডাকো!” এই আদেশ শুনে রওজার খাদেম জনতার উদ্দেশে চিৎকার করে বললেন, “মুইনুদ্দিন চিশতিকে ডাকা হচ্ছে!”

হযরত মুইনুদ্দিন চিশতি এ কথা শুনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবস্থায় উপনীত হলেন। কাঁদতে কাঁদতে, অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে এবং দরুদ পড়তে পড়তে তিনি আমাদের প্রিয় নবীর রওজার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং আদবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ সময় তিনি একটি আওয়াজ শুনলেন, “হে কুতবুল মাশায়িখ! ভেতরে এসো!”

আমাদের নবী বললেন, “তুমি আমার দ্বীনের খাদেম। তোমাকে ভারতবর্ষে যেতে হবে। ভারতবর্ষে যাও। সেখানে আজমির নামে একটি শহর আছে। সেখানে আমার বংশধরদের (নাতিদের) মধ্যে সাইয়্যিদ হুসাইন নামে একজন আছেন। তিনি জিহাদ ও গাজওয়ার নিয়তে সেখানে গিয়েছিলেন। এইমাত্র তিনি শহিদ হয়েছেন। আজমির কাফিরদের হাতে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তোমার সেখানে যাওয়ার উসিলায় ও বরকতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়বে, আর কাফিররা লাঞ্ছিত হবে, শক্তিহীন ও প্রভাবহীন হয়ে পড়বে।” তারপর তিনি তাঁকে একটি ডালিম দিয়ে বললেন, “এই ডালিমের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকাও, কোথায় যাবে তা দেখে বুঝতে পারবে।” হযরত মুইনুদ্দিন চিশতি মহানবীর দেওয়া ডালিমটি নিয়ে আদেশমতো সেদিকে তাকালেন এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সবকিছু পুরোপুরি দেখতে পেলেন। হযরত আহমদ রিফায়ি হজে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে মদিনা মুনাওয়ারায় রাসূলে আকরামের মুবারক রওজা জিয়ারতের সময় তিনি এই মর্মে একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন:

দূরে ছিলাম তোমার মাটিতে চুমু দিতে, হে আমার সরদার,
নিজে আসতে না পেরে রুহকে পাঠাতাম প্রতিনিধি আমার।
আজ তোমার জিয়ারতের নিয়ামত হলো নসিব আমার,
বাড়িয়ে দাও মুবারক হাত, ঠোঁট চুমু দিক, হে হাবিব আমার!

কবিতা শেষ হতেই আমাদের প্রিয় নবীর কবর থেকে তাঁর মুবারক হাত দেখা দিল। সাইয়্যিদ আহমদ রিফায়ি পরম ভক্তি ও সম্মানের সঙ্গে মহানবীর মুবারক হাত চুম্বন করলেন। সেখানে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে এ ঘটনা দেখলেন। মহানবীর মুবারক হাত চুম্বনের পর তিনি রওজায়ে মুতাহহারার দরজার চৌকাঠে শুয়ে পড়লেন। কেঁদে কেঁদে সেখানকার সব মানুষের কাছে মিনতি করলেন, “আমার ওপর দিয়ে পা মাড়িয়ে চলে যান!” আলেমগণ অন্য দরজা দিয়ে বের হতে বাধ্য হলেন। এই কারামত অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হয়ে মুখে মুখে আমাদের যুগ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দ্বীনের অনুসরণে হযরত ইবনে আবেদিনের অবস্থা প্রসিদ্ধ; তাঁর কারামত ও মানাকিব অনেক।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পড়ার সময় তিনি রাসূলুল্লাহকে নিজের চোখে দেখতেন। দেখতে না পেলে সেই নামাজ আবার পড়তেন। ইসলামের আলেমগণের মধ্যে সবচেয়ে মহান ব্যক্তিদের অন্যতম, দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মুজাদ্দিদ ইমাম রব্বানি আহমদ ফারুকি সিরহিন্দি বলেছেন, “রমজান শরীফের শেষ দিনগুলোতে অত্যন্ত সুন্দর একটি অবস্থা প্রকাশিত হলো। আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম। চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। অনুভব করলাম, অন্য কেউ এসে আমার বিছানায় বসেছেন। তাকিয়ে দেখি, তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের সরদার, নেতা! আমি সঙ্গে সঙ্গে আদবের সঙ্গে উঠে বসলাম। আমাদের প্রিয় নবী বললেন, ‘তোমার জন্য ইজাজতনামা লিখতে এসেছি। আর কাউকে আমি এমন ইজাজতনামা লিখে দিইনি।’ দেখলাম, সেই ইজাজতনামার মূল লেখায় এই দুনিয়া সংক্রান্ত বিরাট অনুগ্রহরাজি, আর তার পেছনের পৃষ্ঠায় পরকাল সংক্রান্ত বহু দয়া ও করুণার কথা লেখা আছে।”

হযরত আবদুল কাদির জিলানি “গুনিয়া” গ্রন্থে হযরত ইবরাহিম তামিমি থেকে বর্ণনা করেন: খিজির আলাইহিস সালাম আমাকে বললেন, “যদি তুমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহকে দেখতে চাও, তাহলে মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর এশা পর্যন্ত কারও সঙ্গে কথা না বলে উঠে দাঁড়াবে এবং মাগরিবের পরের আওয়াবিনের নামাজ আদায় করবে। প্রতি দুই রাকাতে একবার সালাম ফেরাবে।

প্রতি রাকাতে একবার ‘আলহামদু’, অর্থাৎ সূরা ফাতিহা এবং সাতবার সূরা ইখলাস পড়বে। এশার নামাজও জামাআতের সঙ্গে আদায়ের পর ঘরে ফিরে বিতিরের নামাজ পড়বে। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও দুই রাকাত নামাজ আদায় করে প্রতি রাকাতে ‘আলহামদু’ ও সূরা ইখলাস সাতবার পড়বে। নামাজের পর সিজদায় গিয়ে সাতবার আল্লাহ তাআলার কাছে ইস্তিগফার করবে এবং সাতবার বলবে, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।’ তারপর সিজদা থেকে মাথা তুলে বসে দুই হাত তুলে বলবে, ‘ইয়া হাইয়ু, ইয়া কাইয়ুম, ইয়া জাল জালালি ওয়াল ইকরাম, ইয়া ইলাহাল আউয়ালিনা ওয়াল আখিরিন, ওয়া ইয়া রাহমানাদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাতি ওয়া রাহিমাহুমা, ইয়া রাব্বি, ইয়া রাব্বি, ইয়া রাব্বি, ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ।’

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একই দোয়া পড়বে। তারপর সিজদায় গিয়ে একই দোয়া পড়বে। তারপর সিজদা থেকে মাথা তুলে কিবলামুখী হয়ে যেভাবে ইচ্ছা শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুম না আসা পর্যন্ত মহানবীর প্রতি দরুদ শরীফ পাঠ করতে থাকবে।”

আমি বললাম, “এই দোয়া আপনি যাঁর কাছ থেকে শিখেছেন, তা আমাকে জানালে আমি খুশি হব।” হযরত খিজির বললেন, “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?” আমি বললাম, “যে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।”

খিজির আলাইহিস সালাম বললেন, “রাসূলুল্লাহ যে মজলিসে এই দোয়া শিখিয়েছিলেন ও ওসিয়ত করেছিলেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি যাঁকে এই দোয়া শিখিয়েছিলেন, আমি তাঁর কাছ থেকে তা শিখেছি।” আমিও খিজির আলাইহিস সালামের কথামতো আমল করলাম। বিছানায় শুয়ে মহানবীর প্রতি দরুদ শরীফ পড়তে শুরু করলাম। মহানবীকে দেখতে পাব – এই আনন্দে আমার ঘুম উড়ে গেল, আর ভোর পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারলাম না।

“হাদীসের আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহকে স্বপ্নের মতো জাগ্রত অবস্থায়ও দেখা যেতে পারে” ইবরাহিম লাকানি (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্য ওপরে ওঠা পর্যন্ত বসে রইলাম। দুহা, অর্থাৎ চাশতের নামাজ আদায় করলাম। মনে মনে বললাম, “সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকলে গত রাতে যা করেছি, আবারও তা-ই করব।” ঠিক তখনই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, ফেরেশতারা এসে আমাকে জান্নাতে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি ইয়াকুত, জমরুদ ও মুক্তা দিয়ে তৈরি প্রাসাদ ও অট্টালিকা এবং মধু, দুধ ও জান্নাতের পানীয়ের নহর দেখলাম। যে ফেরেশতারা আমাকে জান্নাতে এনেছিলেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, “এই প্রাসাদ কার জন্য?” ফেরেশতারা বললেন, “তুমি যে আমল করেছ, যারা সেই আমল করে, তাদের জন্য।” জান্নাতের খাবার না খাইয়ে এবং জান্নাতের পানি পান না করিয়ে তাঁরা আমাকে জান্নাত থেকে বের করলেন না। তারপর আমাকে জান্নাত থেকে বের করে আমি যেখানে ছিলাম, সেখানে ফিরিয়ে আনলেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ সত্তরজন নবী এবং সত্তর সারি ফেরেশতা – যাঁদের প্রতি দুই সারির মাঝের দূরত্ব পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝের দূরত্বের সমান – সঙ্গে নিয়ে আমার কাছে এলেন, আমাকে সালাম দিলেন এবং আমার হাত ধরলেন। তখন আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! খিজির আলাইহিস সালাম জানিয়েছেন যে, তিনি এই হাদীস আপনার কাছ থেকে শুনেছেন।” মহানবী বললেন, “খিজির সত্য বলেছেন, তিনি যা বলেছেন তা সঠিক। খিজির পৃথিবীবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলেম। তিনি আবদালদের নেতা। তিনি পৃথিবীতে আল্লাহর সৈন্যদের একজন।”

আমি আবার বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে এই আমল করবে, আমি যা দেখলাম, তা ছাড়া তার জন্য আর কোনো প্রতিদান আছে কি?” তিনি বললেন, “তুমি যা দেখেছ, তোমাকে যা দান করা হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম আর কী প্রতিদান হতে পারে? তুমি জান্নাতে তোমার স্থান ও মর্যাদা দেখেছ। জান্নাতের ফল খেয়েছ, পানীয় পান করেছ। আমার সঙ্গে ফেরেশতাদের ও নবীদের দেখেছ। হুরদের দেখেছ।”

আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেউ যদি আমার মতো আমল করে, কিন্তু আমি যা দেখেছি তা স্বপ্নে না দেখে, তবে আমাকে যা দান করা হয়েছে, তাকেও কি তা দেওয়া হবে?” তিনি বললেন, “যিনি আমাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, সেই ব্যক্তির কৃত কবিরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে। সেই ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ তাআলার ক্রোধ দূর হয়ে যাবে। যিনি আমাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, যে এই আমল করবে, সে তোমার মতো স্বপ্ন না দেখলেও তোমাকে যা দেওয়া হয়েছে, তা তাকেও দেওয়া হবে। আসমান থেকে এক আওয়াজ ঘোষণা করে, ‘আল্লাহ তাআলা এই আমলকারীকে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমস্ত উম্মতে মুহাম্মদিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’”

আমি বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যেমন আপনার জামাল মুবারক ও জান্নাত দেখলাম, সেই ব্যক্তিরও কি এগুলোতে ভাগ আছে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, সবই তাকে দেওয়া হবে।”

আমি যখন বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! নারী-পুরুষ সকল মুমিনকে এই দোয়া শেখানো এবং এর সওয়াবের কথা জানানো কি উচিত হবে?” তখন তিনি বললেন, “যিনি আমাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আল্লাহ তাআলা যাদের সৌভাগ্যবান করে সৃষ্টি করেছেন, তারা ছাড়া আর কেউ এই আমল করে না।” যে ব্যক্তি আমাদের নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে স্বপ্নে তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দেখে, সে নিশ্চয়ই তাঁকেই দেখেছে। কেননা শয়তান তাঁর আকৃতি ধারণ করতে পারে না। তবে শয়তান অন্য আকৃতি ধারণ করে দেখা দিতে পারে। যে রাসূলুল্লাহকে চেনে না, তার পক্ষে এ পার্থক্য করা সহজ নয়। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, “মহানবীকে অন্য আকৃতিতে দেখাও তাঁকেই দেখা। তবে তা সেই ব্যক্তির দ্বীনের ত্রুটির নিদর্শন। যে ব্যক্তি মহানবীকে স্বপ্নে তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দেখে এবং মুমিন অবস্থায় মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

আবু হুরায়রা মহানবীর এই হাদীস শরীফ বর্ণনা করেছেন: “কেউ যদি জুমার রাতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসি একবার করে এবং সূরা ইখলাস পনেরোবার পড়ে, আর নামাজের পর এক হাজারবার বলে, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি’, তাহলে পরবর্তী জুমা আসার আগেই সে আমাকে স্বপ্নে দেখবে। সেই ব্যক্তির অতীত ও ভবিষ্যতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে। জান্নাত তাদেরই জন্য, যারা আমাকে দেখে।”

মহানবীর কবর শরীফ জিয়ারত

ফখরে কায়েনাত মহানবী ইরশাদ করেন, “যে আমার ইন্তেকালের পর আমাকে জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমাকে জিয়ারত করল।” “Mir’ât-i Medîne” গ্রন্থে বর্ণিত এক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “যে আমার কবর জিয়ারত করে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যায়।” এই হাদীস শরীফ ইবনে খুজাইমা, বাজ্জার, দারাকুতনি ও তাবারানি বর্ণনা করেছেন। হযরত বাজ্জার বর্ণিত আরেকটি হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে আমার কবর জিয়ারত করে, তার জন্য আমার শাফায়াত হালাল হয়ে যায়।” “মুসলিম শরীফ” সংকলনে এবং আবু বকর ইবনে মাক্কারির “মুজাম” গ্রন্থে বর্ণিত হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “কেউ যদি কেবল আমাকে জিয়ারত করার জন্য আসে, আর অন্য কোনো কিছুর নিয়ত তার না থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন সে আমার শাফায়াতের হকদার হয়ে যায়।” এই হাদীস শরীফ জানাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে জিয়ারত করার জন্য যারা মদিনা মুনাওয়ারায় আসে, তাদের জন্য শাফায়াত করবেন।

সাবধান, আদব ছেড়ো না – এ যে আল্লাহর প্রিয়তমের গলি,
এ ঐশী দৃষ্টির স্থান, এ যে মুস্তফার মাকাম!
আকাশের নতুন চাঁদ – বাবুস সালামের বুক-চেরা প্রেমিক,
এর প্রদীপ জাওজা তারা – এ যে নূর ও আলোর উদয়স্থল।
এ যে মহান আল্লাহর হাবিবের শয়নস্থল, মর্যাদায়
মহান আল্লাহর আরশকেও ছাড়িয়ে যাওয়া স্থান এ।
এই মাটির দ্যুতিতে দূর হলো অনস্তিত্বের আঁধার,
সৃষ্টিকুল দুই চোখে এর সুরমা মেখে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পেল।
আদব রক্ষার শর্তে প্রবেশ করো, নাবি, এই দরগায়,
এ যে ফেরেশতাদের তাওয়াফের স্থান, নবীদের চুম্বনের স্থান!
Nâbî

দারাকুতনি বর্ণিত আরেকটি হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে হজ করল অথচ আমাকে জিয়ারত করল না, সে আমাকে কষ্ট দিল।” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে জিয়ারত কামনা করেছেন, তা এ জন্য যে, তাঁর উম্মত যেন এ পথেও সওয়াব অর্জন করে। এ কারণে আমাদের ফিকহের আলেমগণ হজের দায়িত্ব পালনের পর মদিনা মুনাওয়ারায় এসে মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করতেন। তারপর রওজায়ে মুতাহহারা, মিম্বরে মুনির এবং আরশে আলার চেয়েও শ্রেষ্ঠ কবর শরীফ জিয়ারত করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ যেখানে বসতেন, হাঁটতেন, হেলান দিতেন সেসব স্থান, ওহী নাজিলের সময় তিনি যে খুঁটিতে হেলান দিতেন সেই খুঁটি এবং মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কারের সময় যাঁরা কাজ করেছিলেন, নিজেদের সম্পদ ও অর্থ দানের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, সেই সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িনের পদচারণার স্থানসমূহ জিয়ারত করতেন এবং সেগুলো দেখে বরকত লাভ করতেন। তাঁদের পরে আসা আলেম ও সালেহগণও হজের পর মদিনায় আসতেন এবং আমাদের ফিকহের আলেমগণের মতোই আমল করতেন। গতকালের মতো আজও হাজিরা এই রীতির ওপর অটল থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় জিয়ারত করে থাকেন।

“কেউ যদি কেবল আমাকে জিয়ারত করার জন্য আসে, আর অন্য কোনো কিছুর নিয়ত তার না থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন সে আমার শাফায়াতের হকদার হয়ে যায়” হাদীস শরীফ

ইসলামের আলেমগণের সূর্য হযরত আবু হানিফা বলেছেন, “মুস্তাহাবসমূহের মধ্যে সর্বোত্তমগুলোর অন্যতম রওজা মুবারকের জিয়ারত ওয়াজিবের কাছাকাছি স্তরের একটি ইবাদত।” রাসূলুল্লাহর কবর শরীফ জিয়ারতে যে ব্যক্তি যাবেন, তাঁর উচিত বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করা। পঠিত এসব দরুদ ও সালাম যে মহানবীর কাছে পৌঁছে, তা হাদীস শরীফে জানানো হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবীকে জিয়ারত করার আদব এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:

দূর থেকে মদিনা মুনাওয়ারা শহর দেখা গেলে দরুদ ও সালাম পাঠ করা হয়। তারপর বলা হয়, “আল্লাহুম্মা হাজা হারামু নাবিয়্যিকা, ফাজআলহু বিকায়াতান লি মিনান নারি ওয়া আমানান মিনাল আজাবি ওয়া সুইল হিসাব।” সম্ভব হলে শহরে বা মসজিদে প্রবেশের আগে গোসল করে নেওয়া হয়। সুগন্ধি লাগানো হয়। নতুন, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা হয়। কেননা এগুলো সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। বিনয়, গাম্ভীর্য ও প্রশান্ত অবস্থায় মদিনা মুনাওয়ারায় প্রবেশ করা হয়। “বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ” বলার পর সূরা বনি ইসরাইলের (ইসরার) ৮০তম পবিত্র আয়াত পাঠ করা উচিত। এর পরপরই “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ। ওয়াগফির লি জুনুবি ওয়াফতাহ লি আবওয়াবা রাহমাতিকা ওয়া ফাদলিক” বলে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করা হয়। তারপর রাসূলুল্লাহর মিম্বরের পাশে এমনভাবে দাঁড়িয়ে, যাতে মিম্বরের খুঁটি ডান কাঁধ বরাবর থাকে, দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ আদায় করা উচিত। আমাদের প্রিয় নবী এখানে নামাজ পড়তেন। এই স্থানটি মহানবীর কবর ও মিম্বরের মাঝখানে। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আমার কবর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান। আমার মিম্বর আমার হাউজের ওপর অবস্থিত।”11 তারপর রাসূলুল্লাহর মুবারক কবর জিয়ারতের সৌভাগ্য দান করেছেন বলে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে সিজদা করা উচিত।

দোয়ার পর উঠে মহানবীর কবর শরীফে, হুজরায়ে সাআদাতের কাছে আসা উচিত এবং কিবলার দিকে পিঠ রেখে রাসূলুল্লাহর মুবারক চেহারার সামনে প্রায় দুই মিটার দূরত্বে আদবের সঙ্গে দাঁড়ানো উচিত। এর চেয়ে কাছে যাওয়া হয় না। বিনয় ও নম্রতার (খুশু ও খুদুর) সঙ্গে থাকা উচিত; আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে যেভাবে আদেশ করেছেন, সেভাবে রাসূলুল্লাহর প্রতি এমন আদব রক্ষা করা উচিত, যেন তিনি জীবিত আছেন আর জিয়ারতকারী তাঁর মহান সান্নিধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য ত্যাগ করা উচিত নয়। কবর শরীফের দেয়ালে হাত না রেখে দূরে আদবের সঙ্গে দাঁড়ানোই সম্মানের সঙ্গে বেশি সংগতিপূর্ণ। নামাজের মতো করে দাঁড়ানো উচিত। রাসূলুল্লাহর বরকতময়, কোমল আকৃতি কল্পনায় আনা উচিত এবং ভাবা উচিত যে, তিনি জিয়ারতকারীকে চেনেন, তার কথা, সালাম ও দোয়া শুনছেন, জবাব দিচ্ছেন, “আমিন” বলছেন। কেননা রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “যে আমার কবরের কাছে আমার প্রতি দরুদ পাঠ করে, আমি তা শুনি।” তেমনি হাদীস শরীফে জানানো হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহর কবর শরীফে একজন ফেরেশতাকে প্রতিনিধি নিযুক্ত রাখা হয়েছে, সেই ফেরেশতা তাঁর উম্মতের সালামদাতাদের সালাম তাঁর কাছে পৌঁছে দেন। তারপর বলা উচিত, “আসসালামু আলাইকা ইয়া সাইয়্যিদি ইয়া রাসূলাল্লাহ! আসসালামু আলাইকা ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! আসসালামু আলাইকা ইয়া সাফিয়্যাল্লাহ! আসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ! আসসালামু আলাইকা ইয়া নাবিয়্যার রাহমাতি! আসসালামু আলাইকা ইয়া শাফিআল উম্মাতি! আসসালামু আলাইকা ইয়া সাইয়্যিদাল মুরসালিন! আসসালামু আলাইকা ইয়া খাতামান নাবিয়্যিন!”

“আল্লাহ তাআলা আপনাকে সর্বোচ্চ প্রতিদান ও পুরস্কার দান করুন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নবুয়তের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমানত পৌঁছে দিয়েছেন। আপনার উম্মতকে নসিহত করেছেন। ইয়াকিন (মৃত্যু) আসা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদ করেছেন। আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আপনার প্রতি দরুদ ও সালাম পৌঁছাতে থাকুন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা বহু দূরদেশ থেকে আপনার কাছে এসেছি। আপনার কবর শরীফ জিয়ারত করতে, আপনার হক আদায় করতে, আপনার কীর্তির স্থানগুলো স্বচক্ষে দেখতে, আপনাকে জিয়ারত করে বরকত লাভ করতে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে আপনি যেন আমাদের জন্য শাফায়াতকারী হন, সেই প্রার্থনা জানাতে এসেছি। কেননা আমাদের ভুলত্রুটি আমাদের কোমর বাঁকা করে দিয়েছে। আমাদের গুনাহ আমাদের কাঁধে ভারী হয়ে চেপে বসেছে। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি শাফায়াতকারী, আবার আপনারই শাফায়াত কবুল করা হয়। মাকামে মাহমুদ আপনার জন্যই প্রতিশ্রুত। আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কুরআনে (সূরা নিসার ৬৪তম পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে) ইরশাদ করেন, ’আমি প্রত্যেক রাসূলকে কেবল এ জন্যই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহ তাআলার আদেশে (যে জাতির কাছে তাঁকে পাঠানো হয়েছে, তাদের দ্বারা) তাঁর আনুগত্য করা হবে। তারা নিজেদের ওপর জুলুম করার (নিজেদের ক্ষতি করার) পর যদি তোমার কাছে এসে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত, আর আমার রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আল্লাহ তাআলাকে তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু হিসেবে পেত।’ আমরা আপনার দরবারে এসেছি। কিন্তু আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আমাদের গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার কাছে আমাদের জন্য শাফায়াত করুন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আপনার সুন্নতের ওপর থাকা অবস্থায় আমাদের রুহ কবজ করেন, আগামীকাল কিয়ামতের দিন আপনার সঙ্গে হাশরের ময়দানে আগমনকারীদের মধ্যে আমাদের শামিল করেন এবং আপনার হাউজে এসে তা থেকে পান করার সৌভাগ্য দান করেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার শাফায়াত প্রার্থনা করছি।” – এভাবে দোয়া করা উচিত। তারপর সূরা হাশরের ১০ম পবিত্র আয়াত পাঠ করা উচিত, যার মর্মার্থ: “… হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের আগে যেসব ভাই ঈমানের সঙ্গে চলে গেছেন, তাঁদের ক্ষমা করো! যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না! হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই তুমি পরম স্নেহশীল ও দয়াময়!”

তারপর যাঁরা সালাম পাঠিয়েছেন, তাঁদের সালাম পৌঁছে দিয়ে বলা উচিত, “আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক ব্যক্তি প্রার্থনা করছেন, আপনি যেন আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর জন্য শাফায়াতকারী হন। তাঁর জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য শাফায়াত করুন।” এরপর যত ইচ্ছা দরুদ পাঠ করা উচিত।

তারপর আধা মিটার ডানে সরে হযরত আবু বকর সিদ্দিকের মুবারক মাথা বরাবর এসে এভাবে দোয়া করা উচিত, “আসসালামু আলাইকা ইয়া খালিফাতা রাসূলিল্লাহ! আসসালামু আলাইকা ইয়া রাফিকাহু ফিল গার! আসসালামু আলাইকা ইয়া আমিনাহু আলাল আসরার! আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের ইমাম হিসেবে আপনাকে সর্বোচ্চ প্রতিদান ও পুরস্কার দান করুন। আপনি সবচেয়ে সুন্দরভাবে রাসূলুল্লাহর খলিফা হয়েছেন। সবচেয়ে উত্তমভাবে তাঁর মহান সুন্নতের অনুসরণ করেছেন। মুরতাদদের (দ্বীন ত্যাগকারীদের) এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সর্বদা হক কথা বলেছেন। ইন্তেকাল পর্যন্ত হকের পথে থাকা লোকদের সাহায্যকারী ছিলেন। আপনার প্রতি আল্লাহ তাআলার সালাম, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক! হে আল্লাহ! তোমার রহমতে তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে আমাদের রুহ কবজ করো। তাঁর প্রতি আমাদের জিয়ারত বৃথা কোরো না!”

“আমার কবর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান। আমার মিম্বর আমার হাউজের ওপর অবস্থিত” হাদীস শরীফ

তারপর আবার আধা মিটার ডানে সরে হযরত উমরের কবর বরাবর এসে বলা উচিত, “আসসালামু আলাইকা ইয়া আমিরাল মুমিনিন! আসসালামু আলাইকা ইয়া মুজহিরাল ইসলাম! আসসালামু আলাইকা ইয়া মুকাসসিরাল আসনাম! আল্লাহ তাআলা আপনাকে সর্বোচ্চ প্রতিদান ও পুরস্কার দান করুন। জীবদ্দশায়ও, মৃত্যুতেও আপনি ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্য করেছেন। ইয়াতিমদের অভিভাবক হয়েছেন। আত্মীয়স্বজনের প্রতি সদাচরণ করেছেন। মুসলমানদের জন্য এমন একজন পথপ্রদর্শক হয়েছেন, যাঁর প্রতি তাঁরা সন্তুষ্ট ছিলেন, যিনি নিজেও হিদায়াতের ওপর ছিলেন এবং মানুষকে সরল পথে পরিচালিত করতেন। তাঁদের কাজকর্ম গুছিয়ে শৃঙ্খলায় এনেছেন। তাঁদের দরিদ্রদের ধনী করেছেন, তাঁদের ক্ষতে পট্টি বেঁধেছেন। আপনার প্রতি আল্লাহ তাআলার সালাম, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক!”

তারপর হযরত আবু বকর ও হযরত উমরকে সম্বোধন করে বলা উচিত, “আসসালামু আলাইকুমা ইয়া দাজিআই রাসূলিল্লাহি ওয়া রাফিকাইহি ওয়া ওয়াজিরাইহি ওয়া মুশিরাইহি ওয়াল মুআউইনাইনি লাহু আলাল কিয়ামি ফিদ দিনি ওয়াল কাইমাইনি বাদাহু বি-মাসালিহিল মুসলিমিন! আল্লাহ তাআলা আপনাদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। রাসূলুল্লাহ যেন আমাদের জন্য শাফায়াত করেন, আর আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের প্রচেষ্টা কবুল করেন, আমাদের ইসলাম ধর্মের ওপর মৃত্যু দেন এবং আবার ইসলাম ধর্মের ওপর জীবিত করেন, কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহর নিকটবর্তীদের মধ্যে আমাদের হাশর করেন – আপনারা যেন আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করেন, সে জন্য রাসূলুল্লাহর সান্নিধ্যে আমরা আপনাদের উসিলা বানাচ্ছি।”

তারপর নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, যাঁরা দোয়া চেয়েছেন তাঁদের জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য দোয়া করা উচিত। এরপর রাসূলুল্লাহর মুবারক চেহারার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে দোয়া করবে: “হে আল্লাহ! তুমি (মর্মার্থে) ইরশাদ করছ, ’আমি প্রত্যেক রাসূলকে কেবল এ জন্যই পাঠিয়েছি যে, আল্লাহ তাআলার আদেশে (যে জাতির কাছে তাঁকে পাঠানো হয়েছে, তাদের দ্বারা) তাঁর আনুগত্য করা হবে। তারা নিজেদের ওপর জুলুম করার (নিজেদের ক্ষতি করার) পর যদি তোমার কাছে এসে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত, আর আমার রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আল্লাহ তাআলাকে তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু হিসেবে পেত।’12 হে আমার রব! তোমার মহান বাণীর অনুসরণ করে, তোমার আদেশের আনুগত্য করে আমরা প্রার্থনা করছি, তোমার প্রিয় নবী যেন তোমার দরবারে আমাদের জন্য শাফায়াত করেন।” এরপর আগে পাঠ করা দোয়া, অর্থাৎ সূরা হাশরের ১০ম পবিত্র আয়াত (মর্মার্থে) পাঠ করবে:

“… হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের আগে যেসব ভাই ঈমানের সঙ্গে চলে গেছেন, তাঁদের ক্ষমা করো! যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না! হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই তুমি পরম স্নেহশীল ও দয়াময়!” তারপর “রাব্বানাগফির লানা ওয়া লি-আবাইনা ওয়া লি-উম্মাহাতিনা ওয়া লি-ইখওয়ানিনাল্লাজিনা সাবাকুনা বিল ঈমান”, “রাব্বানা আতিনা…” ও “সুবহানা রাব্বিকা…” পবিত্র আয়াতগুলো পাঠ করে হুজরায়ে সাআদাতের জিয়ারত সমাপ্ত করবে। তারপর রাসূলুল্লাহর কবর ও মিম্বরের মাঝখানে অবস্থিত রওজায়ে মুতাহহারায় আসবে। এটি একটি বর্গাকার স্থান। এখানে যত ইচ্ছা নামাজ পড়বে। দোয়া করবে। তাসবিহ পাঠ করবে। আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা করবে। তারপর মিম্বরের কাছে আসবে। রাসূলুল্লাহর বরকত যেন নিজের কাছে পৌঁছে – এই নিয়তে মহানবী খুতবা দেওয়ার সময় যেখানে তাঁর মুবারক হাত রাখতেন, সেখানে নিজের হাত রাখবে। এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে। আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের যা চাওয়ার, তা চাইবে। আল্লাহ তাআলার ক্রোধ থেকে তাঁর রহমতের আশ্রয় প্রার্থনা করবে। তারপর আগে যেখানে হান্নানা খুঁটি ছিল, সেখানে স্থাপিত খুঁটির কাছে আসবে। হান্নানা হলো সেই খুঁটি, যেটিকে ছেড়ে রাসূলুল্লাহ খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরে চলে গেলে সেটি কাঁদতে শুরু করেছিল; পরে রাসূলুল্লাহ নেমে এসে সেটিকে জড়িয়ে ধরলে তা শান্ত হয়েছিল। তারপর হযরত আবু লুবাবা নিজেকে যে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তওবা করেছিলেন, সেই খুঁটির কাছে আসবে। এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করবে। যত ইচ্ছা দোয়া করবে।

এখানে অবস্থানকালে রাতগুলো পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহ তাআলার জিকির, মিম্বর ও কবরের পাশে গোপনে ও প্রকাশ্যে দোয়া এবং রাবিতায় কাটানো উচিত। রাসূলুল্লাহকে জিয়ারতের পর বাকি কবরস্থানে গিয়ে সেটিও জিয়ারত করা মুস্তাহাব। তারপর অন্যান্য কবর, বিশেষ করে সাইয়্যিদুশ শুহাদা (শহিদদের সরদার) হযরত হামজার কবর জিয়ারত করা উচিত। তেমনি বাকিতে হযরত আব্বাস এবং সেখানে সমাহিত হাসান ইবনে আলি, জাইনুল আবেদিন, তাঁর পুত্র মুহাম্মদ বাকির ও তাঁর পুত্র জাফর সাদিক, আমিরুল মুমিনিন হযরত উসমান, রাসূলুল্লাহর পুত্র ইবরাহিম, সেখানে সমাহিত রাসূলুল্লাহর পবিত্র স্ত্রীগণ, তাঁর ফুফু সাফিয়া এবং সাহাবা ও তাবেয়িনদের মধ্য থেকে আরও বহু মহান ব্যক্তিকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন) জিয়ারত করা উচিত। বাকিতে অবস্থিত ফাতিমা মসজিদে নামাজ আদায় করা উচিত। বৃহস্পতিবার উহুদের শহিদদের জিয়ারত করা মুস্তাহাব। সেখানে বলা উচিত, “সালামুন আলাইকুম বিমা সাবারতুম। ফানিমা উকবাদ দার। সালামুন আলাইকুম ইয়া আহলা দারিল কাওমিল মুমিনিন, ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু আন কারিবিন বিকুম লাহিকুন।” তারপর আয়াতুল কুরসি ও সূরা ইখলাস পাঠ করা উচিত। হুজরায়ে সাআদাত জিয়ারতকারীদের অত্যন্ত সজাগ থাকা প্রয়োজন। তাঁদের অন্তরে দুনিয়ার চিন্তা থাকা উচিত নয়। মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর মুবারক ও তাঁর মর্যাদার উচ্চতা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। যারা দুনিয়ার কাজকর্ম, বড় লোকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সুবিধা আদায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের চিন্তা নিয়ে দোয়া করে, আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া কবুল করেন না, আর তারা তাদের আকাঙ্ক্ষায় পৌঁছাতে পারে না। হুজরায়ে সাআদাত জিয়ারত করা একটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। যারা এতে বিশ্বাস করে না, তাদের ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কেননা তারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও সকল মুসলমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মালেকি আলেমগণের কয়েকজন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিয়ারত করা ওয়াজিব বললেও তা যে মুস্তাহাব, সে কথা সর্বসম্মতভাবে জানানো হয়েছে।

“হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের আগে যেসব ভাই ঈমানের সঙ্গে চলে গেছেন, তাঁদের ক্ষমা করো! যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না! হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই তুমি পরম স্নেহশীল ও দয়াময়!” হাশর: ১০

আসসুবহু বাদা
আসসুবহু বাদা মিন তালআতিহি।
ওয়াল লাইলু দাজা মিন ওয়াফরাতিহি।
ফাকার রুসুলা ফাদলান ওয়া উলা।
আহদাস সুবুলা লি দালালাতিহি।
প্রভাত তার আলো নিল তাঁর চেহারা থেকে।
আর রাত তার আঁধার নিল তাঁর কালো কেশ থেকে।
মর্যাদা ও মহিমায় তিনি সকল রাসূলকে ছাড়িয়ে গেলেন।
হিদায়াতপ্রাপ্তরা তাঁর পথনির্দেশেই পথের সন্ধান পেল।
কানজুল কারামি মাওলান নিআমি।
হাদিল উমামি লি শারিআতিহি।
আজকান নাসাবি আলাল হাসাবি।
কুল্লুল আরাবি ফি খিদমাতিহি।
তিনি দানশীলতার ভান্ডার, সেই ভান্ডার থেকে দানকারী।
জাতিসমূহকে তিনি পৌঁছে দিলেন তাঁর দ্বীন ও হিদায়াতে।
তাঁর বংশ অতি পবিত্র, তাঁর মর্যাদা অতি উচ্চ।
সমস্ত আরব তাঁর খেদমতে নিয়োজিত।
সাআতিশ শাজারু নাতাকাল হাজারু।
শুক্কাল কামারু বি ইশারাতিহি।
জিবরিলু আতা লাইলাতা আসরা।
ওয়ার রাব্বু দাআ লি হাদরাতিহি।
গাছেরা ছুটে এল তাঁর সান্নিধ্যে, পাথর মুখ খুলে কথা বলল।
তাঁর (মুজিযাপূর্ণ) ইশারায় চাঁদ দুই টুকরা হলো।
ইসরার রাতে জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) তাঁর কাছে এলেন।
আর তাঁর রব তাঁকে নিজ সান্নিধ্যে আহ্বান করলেন।
নালাশ শারাফা ওয়াল্লাহু আফা।
আম্মা সালাফা মিন উম্মাতিহি।
ফা মুহাম্মাদুনা হুয়া সাইয়্যিদুনা।
ফাল ইজ্জু লানা বি ইজাবাতিহি।
তিনি মহান মর্যাদাসমূহ লাভ করলেন।
আল্লাহ (জাল্লা জালালুহু)ও তাঁর উম্মতকে ক্ষমা করলেন।
আমাদের মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – তিনিই আমাদের সরদার।
তাঁকে কবুল করেছি বলেই মর্যাদা আমাদের।
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)