আমার প্রিয় নবী

দ্বীন ত্যাগের আন্দোলন

মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তেইশ বছরের নবুয়তকালে সমগ্র আরব উপদ্বীপ মুসলমান হয়ে যায়, আর অন্যান্য অঞ্চল থেকেও বহু মানুষ দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনেন এবং প্রতিটি কথা ও প্রতিটি কাজে তাঁর প্রেরিত নবীর অনুসরণ করেন। রাসূলুল্লাহ যখন ইন্তেকাল করেন, তখন পৃথিবীতে এক লাখ চব্বিশ হাজারেরও বেশি (এক বর্ণনায় প্রায় দেড় লাখ) সাহাবী ছিলেন। বিদায় হজের পর আরবদের মধ্যে কিছু লোক নবুয়তের দাবি নিয়ে মাথা তুলল। তাদের প্রথমজন ছিল বনু আনস গোত্রের আসওয়াদ আনসি। তার আসল নাম আবহালা ইবনে কাব। নানা রকম ছলচাতুরী করে সে ইয়েমেনবাসীদের অনেককে প্রতারিত করল। নাজরানের অধিবাসীরাও তার অনুসারী হলো। সে সানা দখল করে ফিতনার পরিধি আরও বিস্তৃত করল। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ আসওয়াদ আনসির মতো মিথ্যাবাদীদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিলেন। এই মিথ্যাবাদীর নিহত হওয়ার খবর ওহীর মাধ্যমে মহানবীকে জানানো হলো। রাসূলুল্লাহ পরদিন সাহাবীদের এই সুসংবাদ দিলেন, “গত রাতে মিথ্যাবাদী আসওয়াদ আনসি আমাদের এক ভাইয়ের হাতে নিহত হয়েছে।”

আমাদের নবীর ইন্তেকালের পর মুনাফিক, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের উসকানিতে দলে দলে ইরতিদাদের (দ্বীন ত্যাগের) আন্দোলন শুরু হলো। এই আন্দোলন বিশাল আকার ধারণ করল। রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম আলাইহিমুর রিদওয়ান সর্বসম্মতিক্রমে আবু বকর সিদ্দিককে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) খলিফা নির্বাচিত করেছিলেন। বাহ্যত মুসলমান হলেও যাদের অন্তর তখনো ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়নি, এমন বেদুইন আরবদের একটি অংশ মহানবীর ইন্তেকালকে সুযোগ মনে করে ফরজ ইবাদতসমূহ, বিশেষ করে যাকাত দিতে অস্বীকার করল। সাহাবায়ে কেরামের (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন) মধ্যে যাঁরা দায়িত্ব নিয়ে তাদের কাছে গিয়েছিলেন, তাঁদের তারা শহিদ করল। মুসলমান হওয়ার পরও তারা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করল। মুরতাদ হয়ে গেল। ইয়েমেনে ও অন্যান্য স্থানে নিযুক্ত কর্মকর্তারা ফিরে আসতে লাগলেন, দুঃসংবাদ বয়ে আনতে লাগলেন। ইরতিদাদের বিপদ হঠাৎ করে বহু গুণ বেড়ে গেল। চারদিক আতঙ্কে ছেয়ে গেল। মুরতাদদের সংখ্যার তুলনায় মুসলমানরা ছিলেন খুবই কম। আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। যে শত্রু মদিনায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তিনি রাতে তাদের ওপর প্রবল আক্রমণ চালালেন এবং ভোর পর্যন্ত যুদ্ধ করলেন। তাদের সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। দূরবর্তী মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তিনি নিজের উটে আরোহণ করলেন।

হযরত আয়েশা বলেন, “আরবরা যেদিনগুলোতে দ্বীন ত্যাগ করেছিল, সেই দিনগুলোতে আমার আব্বা তলোয়ার কোষমুক্ত করে উটে আরোহণ করলে হযরত আলি তাঁর কাছে এলেন, উটের লাগাম ধরে বললেন, ‘হে রাসূলের খলিফা! কোথায় যাচ্ছেন? উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ আপনাকে যা বলেছিলেন, আমিও আপনাকে তা-ই বলছি। সেদিন তিনি আপনাকে বলেছিলেন, “তলোয়ার কোষবদ্ধ করো! তোমার মৃত্যু দিয়ে আমাদের দগ্ধ কোরো না!” আল্লাহর কসম, যদি আপনার কিছু হয়ে যায়, তাহলে আপনার পরে মুসলমানদের মধ্যে আর শৃঙ্খলা ফিরবে না।’” সাহাবায়ে কেরামের (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন) সবাই হযরত আলির কথা সমর্থন করলেন। খলিফা হযরত আবু বকর মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে এলেন। মুরতাদদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বাহিনী পাঠালেন। খলিফা প্রথমে মদিনার নিকটবর্তী চারটি গোত্রের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে তাদের আনুগত্যে ফিরিয়ে আনলেন। এরপর এগারোটি গোত্রের বিরুদ্ধে বাহিনী পাঠালেন। এগুলোর মধ্যে ইকরিমার নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইয়ামামায় মুসাইলামার চল্লিশ হাজার সৈন্যের মোকাবিলা করতে পারল না।

“হে আমার প্রিয় নবী! তাদের বলো, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো এবং চাও যে, আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসুন, তাহলে আমার অনুসরণ করো! যারা আমার অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন’” আলে ইমরান: ৩১

খলিফা খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে সাহায্যের জন্য পাঠালেন। খালিদ তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ, সাজাহ বিনতে হারিস ও মালিক ইবনে নুওয়াইরাকে বিপর্যস্ত করে মদিনায় ফিরে এলেন। ইয়ামামাতেও তিনি বিরাট বিজয় লাভ করলেন। বিশ হাজার মুরতাদ নিহত হলো। প্রায় দুই হাজার মুসলমান শহিদ হলেন। আমর ইবনে আসও খুজাআ গোত্রকে ঈমানে ফিরিয়ে আনলেন। আলা ইবনে হাদরামি বাহরাইনে কঠিন যুদ্ধ করে মুরতাদদের ছত্রভঙ্গ করলেন। হুজাইফা, আরফাজা ও ইকরিমা ওমান ও বাহরাইনে একত্র হয়ে মুরতাদদের পরাজিত করলেন। তাঁরা দশ হাজার মুরতাদকে হত্যা করলেন। খলিফা খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে ইরাকের দিকে পাঠালেন। তিনি হিরা থেকে এক লাখ স্বর্ণমুদ্রা জিজিয়া আদায় করলেন। হুরমুজের নেতৃত্বাধীন পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করলেন। বসরায় ত্রিশ হাজার সৈন্যের বাহিনীকে বিধ্বস্ত করলেন। সাহায্যের জন্য আসা শত্রুবাহিনীর সত্তর হাজার কাফির নিহত হলো। এরপর বিভিন্ন যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি বড় বড় শহর জয় করলেন। খলিফা মদিনায় সৈন্য সংগ্রহ করে আবু উবাইদাকে শামের দিকে এবং আমর ইবনে আসকে ফিলিস্তিনে পাঠালেন। এরপর ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ানকে সাহায্যকারী হিসেবে শামে পাঠালেন। পরে আরও সৈন্য সংগ্রহ করে হযরত মুআবিয়াকে তাঁর ভাই ইয়াজিদের সাহায্যে পাঠালেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদকেও ইরাক থেকে শামে পাঠালেন। খালিদ সৈন্যদের একটি অংশ মুসান্নার কাছে রেখে বহু যুদ্ধ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় এসে পৌঁছালেন। ইসলামি বাহিনী একত্র হয়ে আজনাদাইনে বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনীকে পরাজিত করল। এরপর ইয়ারমুকে ছেচল্লিশ হাজার মুসলমান সৈন্য হিরাক্লিয়াসের দুই লাখ চল্লিশ হাজার সৈন্যের সঙ্গে দীর্ঘ ও অত্যন্ত কঠিন যুদ্ধ করে বিজয়ী হলো। এক লাখেরও বেশি বাইজান্টাইন সৈন্য নিহত হলো। তিন হাজার মুসলমান শহিদ হলেন। এই যুদ্ধে মুসলমান নারীরাও যুদ্ধ করেছিলেন। প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও বাহিনীর এক অংশের সেনাপতি ইকরিমার বিস্ময়কর বীরত্ব দেখা গেল। এই সব বিজয় খলিফার সাহস, প্রতিভা, সুন্দর শাসন ও বরকতের ফলেই অর্জিত হয়েছিল। মহানবীর ইন্তেকালের পর যে বিদ্রোহ ও ইরতিদাদের আন্দোলন আগুনের মতো সমগ্র আরব উপদ্বীপকে গ্রাস করেছিল, হযরত আবু বকরের দৃঢ় সংকল্প, অটল মনোবল এবং বাহিনীতে তাঁর যথোপযুক্ত পুনর্বিন্যাসের ফলে মাত্র এক বছরের মতো অল্প সময়ের মধ্যে তা দমন করা হলো। উসামার বাহিনী সিরিয়ায় পাঠানো এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিরাট অবদান রাখলেন। আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বহু মানুষকে ইরতিদাদ থেকে বিরত রাখলেন। আবু দুজানাও ঘটনাবলি দমনে অত্যন্ত বড় ভূমিকা রাখলেন। নুমান ইবনে মুকাররিন ও খালিদ ইবনে সাঈদ মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিরাট সাফল্য দেখালেন। এভাবে ইরতিদাদের ফিতনাকে বাড়তে না দিয়ে এক মহাবিপর্যয় ঠেকানো হলো এবং ইসলামি ঐক্যকে নড়বড়ে করার লক্ষ্যে প্রজ্বলিত এক বিশাল ফিতনার আগুন নিভিয়ে দেওয়া হলো।

তবে যারা দ্বীন ত্যাগে উদ্যত হয়েছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে প্রকাশ্যে তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না, এমন কিছু লোক পরবর্তী যুগের ফিতনার আন্দোলনেও শরিক হয়েছিল। তারা মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভেদের কারণ হয়েছিল।

ইসলামের ইতিহাসে এই ঘটনাবলির পর থেকেই দ্বীন প্রত্যাখ্যান ও দ্বীন ত্যাগের অর্থে “ইরতিদাদ” (দ্বীন ত্যাগ) ও “মুরতাদ” (দ্বীন ত্যাগকারী) পরিভাষা দুটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে। মুরতাদদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে হযরত আবু বকরের অবদান ছিল বিশাল। এমন বিচক্ষণ একজন মানুষ না থাকলে এই বিপদ সমগ্র আরব দেশে ছড়িয়ে পড়ত। এ কারণেই হযরত আয়েশা বলেছেন, “রাসূলুল্লাহর রুহ কবজ হওয়ার পর আরবরা দ্বীন ত্যাগ করল। নিফাক (কপটতা) মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমার আব্বার ওপর যে ভার চেপে বসেছিল, তা যদি পাহাড়ের ওপর পড়ত, তাহলে নিশ্চয়ই পাহাড়গুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত!”1

হযরত আবু হুরায়রাও বলেছেন, “যদি আবু বকর না থাকতেন, তাহলে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের ইন্তেকালের পর উম্মতে মুহাম্মদি ধ্বংস হয়ে যেত!”2 তিনি আরও বলেছেন, “যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, সেই আল্লাহর কসম, আবু বকর যদি খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে না নিতেন, তাহলে মহান আল্লাহর ইবাদত করার মতো কেউ থাকত না!” – এ কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন।

আবু রাজা উতারিদি বলেন, “মদিনায় প্রবেশ করে দেখলাম, লোকজন জড়ো হয়েছে, আর একজন লোক আরেকজনের মাথায় চুমু খেতে খেতে বলছেন, ‘আমি আপনার জন্য কুরবান হই! আল্লাহর কসম, আপনি না থাকলে আমরা নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যেতাম!’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘যিনি চুমু খাচ্ছেন আর যাঁকে চুমু খাওয়া হচ্ছে, তাঁরা কে?’ তাঁরা বললেন, ‘মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উমর আবু বকরের মাথায় চুমু খাচ্ছেন!’”3

হযরত আয়েশা সেই দিনগুলোর কথা এভাবে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর আরবের বহু গোত্র দ্বীন ত্যাগ করল। অন্ধকার রাতে বৃষ্টিতে আটকে পড়া মানুষের মতো মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। এমনকি তখন মক্কাবাসীদের অধিকাংশও ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হযরত সুহাইল ইবনে আমর কাবার দরজায় দাঁড়িয়ে মক্কাবাসীদের আহ্বান জানালেন। তাদের উদ্দেশে এক প্রভাবশালী ভাষণ দিয়ে তিনি তাদের সন্দেহ দূর করলেন এবং তাদের দ্বীন ত্যাগ ঠেকালেন। তিনি তাদের বললেন, “হে মক্কাবাসী! তোমরা ছিলে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সবার শেষে। সাবধান, দ্বীন ত্যাগকারীদের, ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়া লোকদের মধ্যে সবার আগে হয়ো না! আল্লাহর কসম, রাসূল আলাইহিস সালাম যেমন বলেছিলেন, মহান আল্লাহ এ কাজ নিশ্চয়ই পূর্ণ করবেন! আমি নিজে এই যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক এখানে একা দাঁড়িয়ে তাঁকে বলতে শুনেছি, ‘আমার সঙ্গে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলো, যাতে তোমাদের দেখে আরবরা দ্বীনে প্রবেশ করে, আর অনারবরা তোমাদের জিজিয়া দেয়! আল্লাহর কসম, কিসরা ও কায়সারের ধনভান্ডার আল্লাহর পথে ব্যয় করা হবে!’

যারা উপহাস করত, তোমরা দেখেছ, তারাই যাকাত ও সদকা আদায়কারী হয়েছে। আল্লাহর কসম, বাকিটাও ঘটবে! আল্লাহর কসম, আমি ভালো করেই জানি, যত দিন সূর্য উদিত হবে আর অস্ত যাবে, তত দিন এই দ্বীন টিকে থাকবে! তোমাদের মধ্যে থাকা ওই লোকগুলো যেন তোমাদের প্রতারিত না করে! আমি যা জানি, তারাও তা জানে। কিন্তু বনু হাশিমের প্রতি তাদের হিংসা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছে। হে লোকসকল! কুরাইশদের মধ্যে স্থলে ও সমুদ্রে সবচেয়ে বেশি বাহন আমারই আছে। তোমরা তোমাদের আমিরের আনুগত্য করো এবং তোমাদের যাকাত তাঁর কাছে আদায় করো। যদি ইসলামের এ কাজ শেষ পর্যন্ত টিকে না থাকে, তাহলে তোমাদের যাকাত তোমাদের ফিরিয়ে দেওয়ার জামিন আমি!” এ কথা বলে তিনি কাঁদলেন। এতে জনতা শান্ত হলো।4

সুহাইল ইবনে আমর তাঁর প্রভাবশালী ভাষণের মাধ্যমে মক্কাবাসীদের ইরতিদাদ থেকে বিরত রাখার পর মক্কার শাসনকর্তা আত্তাব ইবনে আসিদ জনসমক্ষে বের হতে পারলেন।

“যদি আবু বকর না থাকতেন, তাহলে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের ইন্তেকালের পর উম্মতে মুহাম্মদি ধ্বংস হয়ে যেত!” আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

হুজরায়ে সাআদাত / মসজিদে নববি

আমাদের প্রিয় নবী (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) এবং তাঁর সাহাবীদের মধ্যে মুসলমানদের দুই চোখের মণি
হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) পবিত্র কবরসমূহের
সামনের দিক, অর্থাৎ কিবলার দিক থেকে দৃশ্য।

সুহাইল ইবনে আমর বদরের যুদ্ধে বন্দিদের মধ্যে ছিল। হযরত উমর তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। তখন মহানবী হযরত উমরকে বলেছিলেন, “কেন তাকে হত্যা করতে চাও? ছেড়ে দাও, হয়তো আল্লাহ তাকে এমন এক মর্যাদায় পৌঁছে দেবেন, যা তুমিও পছন্দ করবে। মানুষের উদ্দেশে তার ভাষণ দেওয়ারও আশা আছে!” এবার বোঝা গেল, হাদীস শরীফে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল, তা হলো প্রশংসনীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে দেওয়া সুহাইল ইবনে আমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এই ভাষণ।5 হযরত উমরও সুহাইলের ভাষণ শুনে তাঁর সম্পর্কে মহানবীর বলা কথাটি স্মরণ করলেন; মহানবী তখন আর দুনিয়ায় না থাকলেও তিনি “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল!” বলে না উঠে পারলেন না।6

তোমার প্রেম সকল ব্যথার দাওয়াই, ইয়া রাসূলাল্লাহ,
তোমার দরবারে পূর্ণ হয় সব চাওয়া, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার নূর দেখেছে যে চোখ, দেখে না সে চাঁদ-তারা,
তোমার নূরে রাত-দিন আলোময়, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার ঘামে ফোটে গোলাপ, কথায় ঝরে মধু-মিছরি,
রোগা হৃদয়ের শিফা তুমি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
বাদশাহদের হাবিব তুমি, দুঃখ-আহাজারির চিকিৎসক,
তোমার শাফায়াত পাপীর জন্য আনন্দ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
চাঁদ-সূর্য, সাত তারা – সবাই তোমার প্রশংসা গায়,
তোমার কথা ছাড়া অন্য কথা ভুল, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
ইবলিস তোমায় হিংসা করে, কী নির্বোধ তার ছলনা,
তোমায় ভালোবেসে ইদরিস হলেন মহান, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
সদা বাজে তোমার নাকাড়া, পাঁচ ওয়াক্তে তোমার সুন্নত কায়েম,
তোমার ঘরে যে-ই আসে, সে-ই আমন্ত্রিত, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
কাঁটাঝোপ পরল রেশম, মরুভূমি হলো সুবাসিত,
তোমার জন্য সওয়া কষ্টের ব্যথাও বিশ্বস্ততা, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
কেনানের ইউসুফকে বিক্রি করা হলো গোপনে সামান্য দামে,
তোমায় দেখা আমার কাছে হাজার প্রাণের মূল্য, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার পবিত্র রওজা মাটিতে নূরে পরিপূর্ণ,
আর তোমার রুহ আসমানে উদ্ভাসিত, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
দাউদের গায়ে তোমার খিলাত, খলিলের দস্তরখানে তোমার নিয়ামত,
মূসার হাতে তোমার নিদর্শন – লাঠি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার মাকাম কাবা-জমজম, চিরকাল অটল ও সুদৃঢ়,
খিজির তোমার উম্মতকে সদা পানি পান করান, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
শাইয়াদ হামজা সেই বাদশাহর কাছে চায় দুঃখ থেকে মুক্তি,
তোমার প্রশংসা আল্লাহর পক্ষ থেকে দান, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
Şeyyâd Hamza

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল!” হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

জান্নাতুল বাকি

মদিনা মুনাওয়ারার জান্নাতুল বাকি ছিল এমন এক কবরস্থান, যেখানে হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সমাধিসৌধ ছিল।

এখানকার সেই সুন্দর সমাধিসৌধ ও কবরগুলোর সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং দুঃখজনকভাবে জায়গাটিকে একটি মাঠে পরিণত করা হয়েছে।

ধীরে ধীরে!

আজরাইল যখন আসবেন তোমার শিয়রে,
ভেঙে যাবে হাত আর পা – ধীরে ধীরে।
মাওলা নসিব করুন দ্বীন ও ঈমান,
চোখ থেকে ঝরবে অশ্রু – ধীরে ধীরে।
উঁচুতে ওড়া মন ক্লান্ত হবে একদিন,
হিসাবের দাঁড়িপাল্লা বসানো হবে একদিন।
সবার কাজের হিসাব নেওয়া হবে একদিন,
হে রব, জিভ কি ঘুরবে তখন – ধীরে ধীরে?
সারাজীবন নফসের পিছে ছুটলে, তওবা করলে না,
যা পেলে তা-ই খেলে, শোকর করলে না।
অবশেষে এসে পৌঁছালে এই কালো মাটিতে,
দুনিয়া থেকে গুটিয়ে আসবে হাত – ধীরে ধীরে।
তোমার কবরের ওপর পুঁতে দেবে পাথর,
এক মুঠো মাটিতে রাখবে তুমি মাথা।
পিতা দেখবে না পুত্রকে, ভাই দেখবে না ভাইকে,
চলে যাবে, আর ফিরবে না সে পথ – ধীরে ধীরে।
কর্পূর-মেশানো কুসুম গরম পানি আনবে,
সেই আদরের দেহ পুরোপুরি বস্ত্রহীন করবে।
তোমার মৃত্যুর খবর পাড়াপড়শি শুনবে,
ফিরে যাবে বন্ধুরা সব – ধীরে ধীরে।