মহানবীর ইন্তেকাল
হিজরতের একাদশ বছর। আগের রমজান মাসে জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে আমাদের প্রিয় নবীকে পবিত্র কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুবার পড়ে শোনালেন। অথচ আগের বছরগুলোতে তিনি পবিত্র কুরআন একবারই পড়ে শোনাতেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম সর্বশেষ যে সূরা পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা হলো সূরা নাসর, যার মর্মার্থ: “যখন আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও বিজয়ের দিন আসবে এবং তুমি দেখবে, মানুষ দলে দলে আল্লাহ তাআলার দ্বীনে (ইসলামে) প্রবেশ করছে, তখন তোমার রবের প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করো! তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো! নিশ্চয়ই তিনি সর্বদা তওবা কবুলকারী।”1 এ সূরা শোনার পর সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “হে জিবরাইল! আমি অন্তরে অনুভব করছি, আমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে।” তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এই পবিত্র আয়াতগুলো পাঠ করলেন, যার মর্মার্থ: “আখিরাত তোমার জন্য দুনিয়ার চেয়ে উত্তম। তুমি ‘সন্তুষ্ট হলাম’ না বলা পর্যন্ত তোমার রব তুমি যা চাও, সবই তোমাকে দেবেন।”2
হিজরতের একাদশ বছরের সফর মাসের সাতাশ তারিখে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুবারক মাথায় ব্যথা শুরু হলো। তিনি সম্মানিত স্ত্রী হযরত আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কক্ষে তাশরিফ নিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আবি বকরকে ডেকে জানালেন যে, তাঁর পরে আবু বকর সিদ্দিককে খলিফা নির্বাচনের জন্য তিনি ওসিয়ত লেখাবেন; তারপর দোয়াত-কলম আনতে আদেশ দিলেন। হযরত আবু বকরের ছেলে আবদুর রহমান আদেশ পালন করতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তিনি বললেন, “পরে আনবে, এখন থাক!” এবং বরকতময় মসজিদে তাশরিফ নিলেন। সেদিন আমাদের প্রিয় নবী মদিনায় উপস্থিত সকল সাহাবায়ে কেরামকে জোহরের নামাজে মসজিদে সমবেত হওয়ার খবর পাঠালেন। নামাজ পড়ানোর পর সরওয়ারে আলম মিম্বরে উঠে খুতবা দিলেন। সাহাবীগণকে নসিহত করলেন এবং নিজের প্রতি তাঁদের কারও কোনো দাবি থাকলে তা মাফ করে দেওয়ার আবেদন জানালেন। তারপর সাহাবীগণের মধ্যে আবু বকর সিদ্দিকের শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা এবং তাঁর প্রতি নিজের গভীর সন্তুষ্টির কথা জানালেন। এই খুতবা যাঁরা শুনলেন, তাঁদের সবার হৃদয় কেঁপে উঠল, চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, “হে লোকসকল! তোমাদের নবী হিসেবে আমাকে কেমন পেয়েছ?” সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ তাআলা আপনাকে প্রচুর কল্যাণ দান করুন। আপনি আমাদের জন্য পরম স্নেহময় পিতার মতো, নসিহতকারী স্নেহশীল ভাইয়ের মতো ছিলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে নবুয়তের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তা আপনি পালন করেছেন। আপনার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে, তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আপনার রবের পথে, ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে মহান প্রতিদান দান করুন।”
তখন মহানবী বললেন, “হে মুমিনগণ! আল্লাহর ওয়াস্তে, আমার কাছে কারও কোনো পাওনা থাকলে সে যেন উঠে আসে এবং কিয়ামতের আগে এখানেই তা নিয়ে নেয়।”
কিন্তু পাওনা নিতে কেউ উঠে এল না। রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাআলার নাম স্মরণ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারও বললেন, “যার পাওনা আছে, সে আসুক, নিয়ে যাক।” তখন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অতি বৃদ্ধ হযরত উক্কাশা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি রাসূলুল্লাহর দরবারে গেলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! তাবুক অভিযানে আমি আপনার সঙ্গে ছিলাম। তাবুক থেকে ফেরার সময় আমার উট আর আপনার উট পাশাপাশি এসে পড়েছিল। আমি উট থেকে নামলাম। আপনার কাছে গেলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল আপনার মুবারক দেহে চুমু খাওয়া; তখন আপনি চাবুক দিয়ে আমার পিঠে আঘাত করলেন। কেন আঘাত করেছিলেন, তা জানি না।”
“আখিরাত তোমার জন্য দুনিয়ার চেয়ে উত্তম। তুমি ‘সন্তুষ্ট হলাম’ না বলা পর্যন্ত তোমার রব তুমি যা চাও, সবই তোমাকে দেবেন” দুহা: ৪–৫
মহানবী বললেন, “হে উক্কাশা! আল্লাহ তাআলা তোমাকে তাঁর রাসূলের ইচ্ছাকৃত আঘাত থেকে রক্ষা করুন।” তারপর আদেশ দিলেন, “হে বিলাল! আমার মেয়ে ফাতিমার ঘরে যাও। সেই চাবুকটি আমার কাছে নিয়ে এসো।” হযরত বিলাল মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি মাথায় হাত রেখে গভীর বিস্ময়ে বলছিলেন, “রাসূলুল্লাহ নিজের ওপর কিসাস নেওয়াবেন!” ঘরে পৌঁছে দরজায় কড়া নেড়ে বললেন, “হে রাসূলুল্লাহর কন্যা! আমাকে রাসূলুল্লাহর চাবুকটি দিন!” আমাদের মা হযরত ফাতিমা জিজ্ঞেস করলেন, “হে বিলাল! এখন তো হজের সময়ও নয়, যুদ্ধের সময়ও নয়! আব্বা চাবুক দিয়ে কী করবেন?” হযরত বিলাল বললেন, “হে ফাতিমা! আপনি কি খবর পাননি? এ দিয়ে রাসূলুল্লাহর ওপর কিসাস নেওয়া হবে!”
হযরত ফাতিমা হযরত বিলালকে কড়াভাবে বলে দিলেন, “হে বিলাল! রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে কিসাস নিয়ে নিজের পাওনা আদায় করতে কার মন সায় দেবে? তিনি যেহেতু চেয়েছেন, দিচ্ছি। কিন্তু হাসান ও হুসাইনকে বলো, যে-ই পাওনা নিতে চায়, সে যেন তাদের ওপর কিসাস নেয়। সেই ব্যক্তি তাদের কাছ থেকেই নিজের পাওনা নিক। কিছুতেই যেন রাসূলুল্লাহর ওপর কিসাস নেওয়া না হয়।” হযরত বিলাল মসজিদে এলেন এবং চাবুকটি রাসূলুল্লাহকে দিলেন, আর রাসূলুল্লাহ তা হযরত উক্কাশাকে দিলেন। এ দেখে হযরত আবু বকর ও হযরত উমর অনুনয় করে বললেন, “হে উক্কাশা! এই তো আমরা তোমার সামনে প্রস্তুত, আমাদের কাছ থেকে তোমার পাওনা নাও। দোহাই, রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে নিয়ো না!” তখন মহানবী হযরত আবু বকরকে বললেন, “হে আবু বকর! তুমি থামো, সরে দাঁড়াও। হে উমর! তুমিও সরে দাঁড়াও। আল্লাহ তাআলা তোমাদের উচ্চ মর্যাদা জানেন।” তারপর হযরত আলি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “হে উক্কাশা! রাসূলুল্লাহকে তুমি আঘাত করবে – এতে আমার মন সায় দেয় না। এই আমার পিঠ আর পেট, এসো, আমার কাছ থেকে তোমার পাওনা নাও; চাইলে একশোবার আঘাত করো। কিন্তু রাসূলুল্লাহকে স্পর্শ কোরো না!” তখন মহানবী বললেন, “হে আলি! তুমিও বসো। আল্লাহ তাআলা তোমারও উচ্চ মর্যাদা ও অবস্থা জানেন।” এবার হযরত হাসান ও হুসাইন উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “হে উক্কাশা! তুমিও জানো, আমরা রাসূলুল্লাহর নাতি। তাই আমাদের ওপর কিসাস মানে রাসূলুল্লাহর ওপর কিসাস। আমাদের কাছ থেকে তোমার পাওনা নাও, দোহাই, রাসূলুল্লাহকে আঘাত কোরো না!” তখন মহানবী তাঁদের বললেন, “তোমরাও বসো, হে আমার দুই চোখের প্রশান্তি।” তারপর বললেন, “হে উক্কাশা! এসো, আঘাত করো!”
উক্কাশা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যখন আমাকে আঘাত করেছিলেন, তখন আমার শরীর খোলা ছিল।” তখন আমাদের প্রিয় নবী মুবারক পিঠ খুলে দিলেন। এ সময় সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শোনা গেল; তাঁরা বললেন, “হে উক্কাশা! তুমি কি সত্যিই রাসূলুল্লাহর মুবারক পিঠে আঘাত করবে?” সবাই দুঃখভরা মনে অপেক্ষা করছিলেন। হযরত উক্কাশা রাসূলুল্লাহর মুবারক পিঠে মোহরে নবুয়ত দেখতে পেয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! পাওনা আদায়ের জন্য আপনার মুবারক পিঠে আঘাত করার, আপনার ওপর কিসাস নেওয়ার শক্তি কার আছে, কে এমন দুঃসাহস করবে?” এই বলে তিনি বিশ্বজগতের সুলতানের মুবারক মোহরে নবুয়তে চুমু খেলেন। তখন রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন, “না, হয় আঘাত করবে, নয়তো ক্ষমা করবে।” হযরত উক্কাশা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক! ক্ষমা করলাম। আল্লাহ তাআলাও কি কিয়ামতের দিন আমাকে ক্ষমা করবেন?” মহানবী বললেন, “যে জান্নাতে আমার সঙ্গীকে দেখতে চায়, সে যেন এই বৃদ্ধের দিকে তাকায়।” রাসূলুল্লাহর এই বরকতময় কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম উক্কাশার দুই চোখের মাঝখানে চুমু খেতে লাগলেন। সবাই বলছিলেন, “সৌভাগ্য তোমার, সৌভাগ্য তোমার! হে উক্কাশা! রাসূলুল্লাহর সঙ্গে থাকার বদৌলতে তুমি জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছ।”3
উসামা ইবনে জায়েদকে সেনাপতি নিযুক্ত করা
সফর মাসের শেষ দিনগুলো। জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাইছিলেন, উত্তরের বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মুসলমানদের জন্য বড় বিপদ হয়ে ওঠার আগেই তাদের আবার ইসলামের দাওয়াত দেবেন, গ্রহণ না করলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইসলামি রাষ্ট্রের অধীন করবেন। তাই তিনি বীর সাহাবীগণকে বাইজান্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম প্রস্তুতির জন্য ছড়িয়ে পড়লেন। রাসূলে আকরাম হযরত উসামা ইবনে জায়েদকে ডেকে বললেন, “হে উসামা! আল্লাহ তাআলার নাম ও বরকত নিয়ে শামে, বালকার সীমান্তে, ফিলিস্তিনের দারুমে – তোমার বাবা যেখানে শহিদ হয়েছিলেন, সেই জায়গা পর্যন্ত যাও। সেসব জায়গা ঘোড়ার খুরে মাড়িয়ে দাও। আমি তোমাকে এ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলাম। উবনাবাসীদের ওপর অতর্কিতে গিয়ে বিদ্যুতের মতো আক্রমণ করো। এত দ্রুত যাও, যেন তোমার গন্তব্যে তোমার আগে খবর না পৌঁছায়। সঙ্গে পথপ্রদর্শক নাও, গুপ্তচর ও পর্যবেক্ষকদের আগে আগে পাঠাও। আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করলে তাদের মধ্যে অল্প সময় অবস্থান করো।” তারপর জুরফে শিবির স্থাপনের আদেশ দিলেন এবং নিজের মুবারক হাতে পতাকা বেঁধে তাঁর হাতে তুলে দিলেন।4
তিনি মসজিদে মিম্বরে উঠলেন এবং বললেন, “হে আমার সাহাবীগণ! উসামার বাবা জায়েদ যেমন সেনাপতি হওয়ার যোগ্য ছিলেন এবং আমার কাছে যেমন সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন, তাঁর পরে তাঁর ছেলে উসামাও তেমনি সেনাপতি হওয়ার যোগ্য। উসামা আমার কাছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়দের একজন।”
হযরত উসামার নেতৃত্বে যুদ্ধে যাঁরা যাবেন, তাঁদের মধ্যে হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ, হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মতো বিশিষ্ট সাহাবীগণও ছিলেন।
কিন্তু পরদিন বিশ্বজগতের সুলতান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাহিনীর রওনা মহানবীর আখিরাতে যাত্রার পর পর্যন্ত পিছিয়ে গেল। আমাদের প্রিয় নবী তীব্র জ্বরে (হুম্মা) আক্রান্ত হয়েছিলেন। দিন দিন জ্বর বাড়ছিল, অসুস্থতা তীব্র হচ্ছিল।
এক রাতে ব্যথা কিছুটা কমলে তিনি মাঝরাতে বিছানা থেকে উঠলেন। পোশাক পরে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। এ দেখে আমাদের মা হযরত আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক! কোথায় যাচ্ছেন?” সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর দিলেন, “বাকি কবরস্থানে যাঁরা শায়িত আছেন, তাঁদের জন্য ইস্তিগফার করার আদেশ পেয়েছি। সেখানে যাচ্ছি।”
তিনি আবু মুওয়াইহিবা ও আবু রাফিকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গেলেন। কবরস্থানে দীর্ঘক্ষণ দোয়া করলেন, তাঁদের ক্ষমা ও মাগফিরাতের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করলেন। মহানবীর এমন আকুল মিনতি দেখে তাঁর সঙ্গী সাহাবীগণ বললেন, “আহা, আমরাও যদি এখন এখানে শায়িত থাকতাম, আর রাসূলুল্লাহর এই দোয়া লাভের মর্যাদা পেতাম!” আমাদের প্রিয় নবী আবু মুওয়াইহিবার দিকে ফিরে বললেন, “হে আবু মুওয়াইহিবা! আমাকে দুনিয়ার ধনভান্ডার ও আখিরাতের নিয়ামতের মধ্যে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আমাকে বলা হলো, ’চাইলে দুনিয়ায় থাকো, তারপর জান্নাতে যাও; চাইলে লিকাউল্লাহ (আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎ) লাভ করো, তারপর জান্নাতে প্রবেশ করো।’ আমি লিকাউল্লাহ এবং তারপর জান্নাতকে বেছে নিয়েছি।”
“হে মুমিনগণ! আল্লাহর ওয়াস্তে, আমার কাছে কারও কোনো পাওনা থাকলে সে যেন উঠে আসে এবং কিয়ামতের আগে এখানেই তা নিয়ে নেয়” হাদীস শরীফ
একদিন তিনি উহুদে শায়িত শহিদদের জন্য মাগফিরাত চাইতে রওনা হলেন। তাঁদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দীর্ঘক্ষণ কাকুতি-মিনতি করে দোয়া করলেন। তারপর মসজিদে এসে সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, “আমি হাউজে কাওসারে তোমাদের সবার আগে পৌঁছাব, তোমাদের অভ্যর্থনা জানাব। আমাদের মিলনের স্থান সেখানেই… আমার পরে তোমরা শিরকে ফিরে যাবে – তোমাদের ব্যাপারে আমি এ ভয় করি না। কিন্তু ভয় করি, তোমরা দুনিয়ার মোহে পড়বে, এর জন্য একে অপরকে হিংসা করবে, একে অপরকে হত্যা করবে এবং শেষ পর্যন্ত তোমাদের পূর্ববর্তীরা যেমন ধ্বংস হয়ে গেছে, তোমরাও তেমনি ধ্বংস হয়ে যাবে…” তারপর সাদাতখানায় চলে গেলেন। অসুস্থতা বেড়ে গেল। মুবারক স্ত্রীগণ আমাদের প্রিয় নবীকে জানালেন যে, তাঁরা চান তিনি আমাদের মা হযরত আয়েশার ঘরে থাকুন এবং তাঁরা নিজেদের পালা তাঁকে ছেড়ে দিচ্ছেন। পবিত্র স্ত্রীগণের এই আত্মত্যাগে তিনি খুশি হলেন, সবার জন্য দোয়া করলেন এবং বাকি দিনগুলো আমাদের মা হযরত আয়েশার ঘরে কাটাতে লাগলেন। রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জ্বর অনেক বেড়ে গেল। জ্বরের তীব্রতায় তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এ অবস্থায় সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে দেখতে আসছিলেন, মহানবীর তীব্র কষ্টে তাঁরা ভীষণ ব্যথিত হচ্ছিলেন। আবু সাঈদ খুদরি বর্ণনা করেন, “আমি রাসূলুল্লাহর মুবারক দরবারে গিয়েছিলাম। তাঁর গায়ে ছিল একটি মখমলের চাদর। জ্বরের উত্তাপ চাদর ভেদ করে বেরিয়ে আসছিল; গরমের কারণে আমরা চাদরে হাত রাখতে পারছিলাম না। আমাদের বিস্ময় ও দুঃখ দেখে রাসূলুল্লাহ বললেন:
‘সবচেয়ে কঠিন বিপদ আসে নবীগণের ওপর। তবুও নিয়ামত পেয়ে তোমাদের যে আনন্দ হয়, বিপদে নবীর আনন্দ তার চেয়েও বেশি।’”
উম্মে বিশর বিনতে বারা বর্ণনা করেন, “আমি রাসূলুল্লাহকে দেখতে গিয়েছিলাম। তাঁর মুবারক দেহ আগুনের মতো জ্বলছিল। আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক! এমন কঠিন অসুখ আমি কখনো দেখিনি!…’ তিনি বললেন, ‘হে উম্মে বিশর! জ্বরের তীব্রতা আমার সওয়াব বেশি হওয়ার জন্য। এ অসুখ খায়বারে চেখে দেখা বিষমাখা গোশতের প্রভাব। সেই গোশতের যন্ত্রণা আমি সবসময় অনুভব করতাম। সেদিন যে বিষ খেয়েছিলাম, তা এখন আমার আবহার, অর্থাৎ মহাধমনী ছিঁড়ে ফেলছে।’”5
আমাদের প্রিয় নবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকেও বললেন, “কোনো মুসলমান অসুস্থ হলে আল্লাহ তাআলা তার ভুলত্রুটি ও গুনাহ এমনভাবে ঝরিয়ে দেন, যেমন গাছের পাতা ঝরে পড়ে!”6 অসুস্থতা দিন দিন বাড়ছিল। সাহাবায়ে কেরাম এতে ভীষণ ব্যথিত ছিলেন, ঘরে স্থির থাকতে পারছিলেন না। তাঁরা মসজিদে সমবেত হলেন। মহানবীর অবস্থা জানার জন্য হযরত আলিকে তাঁর দরবারে পাঠালেন। জগৎসমূহের সরদার ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন, “আমার সাহাবীগণ কী বলছেন?” হযরত আলি বললেন, “‘রাসূলুল্লাহ যদি আমাদের মাঝ থেকে চলে যান!…’ – এই ভেবে তাঁরা ভীষণ দুঃখিত ও উৎকণ্ঠিত।” সাহাবীগণের প্রতি সীমাহীন দয়াশীল আমাদের প্রিয় নবী অসুস্থতার তীব্রতা সহ্য করে উঠলেন এবং হযরত আলি ও হযরত ফজল ইবনে আব্বাসের ওপর ভর দিয়ে মসজিদে এলেন। মিম্বরে উঠে আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা পাঠ করার পর সাহাবায়ে কেরামকে বললেন:
“হে আমার সাহাবীগণ! শুনলাম, তোমরা আমার মৃত্যুর কথা ভেবে অস্থির হয়ে পড়েছ। কোনো নবী কি নিজ উম্মতের মাঝে চিরকাল থেকে গেছেন যে, আমিও তোমাদের মাঝে চিরকাল থেকে যাব? জেনে রাখো, আমি আমার রবের সঙ্গে মিলিত হব। তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ এই যে, মুহাজিরদের প্রবীণদের সম্মান করবে! হে মুহাজিরগণ! তোমাদের প্রতিও আমার ওসিয়ত এই যে, আনসারদের সঙ্গে সদাচরণ করবে! তাঁরা তোমাদের উপকার করেছেন। তোমাদের নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। নিজেরা অভাবে থাকা সত্ত্বেও তোমাদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নিজেদের সম্পদে তোমাদের শরিক করেছেন। যে কেউ আনসারদের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করবে, সে যেন তাঁদের দেখাশোনা করে, আর তাঁদের কেউ ত্রুটি করলে তাঁকে ক্ষমা করে।” এরপর তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী উপদেশ দিয়ে বললেন, “আল্লাহ তাআলা তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়ায় থেকে যাওয়া ও তাঁর রবের সঙ্গে মিলিত হওয়ার মধ্যে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই বান্দা তাঁর রবের সঙ্গে মিলিত হওয়াকেই বেছে নিয়েছেন।” হযরত আবু বকর বুঝতে পারলেন, রাসূলুল্লাহ এ কথার মাধ্যমে নিজের ইন্তেকালের দিকেই ইঙ্গিত করছেন। তিনি “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক!” বলে কাঁদতে শুরু করলেন। দয়ার সাগর আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) “হে আবু বকর! কেঁদো না!” বলে তাঁকে সবর করার ও ধৈর্য ধরার আদেশ দিলেন। তাঁর মুবারক চোখ থেকে তখন অশ্রু ঝরছিল। তিনি বললেন, “হে আমার সাহাবীগণ! ইসলাম ধর্মের পথে সততা ও ইখলাসের সঙ্গে যিনি নিজের সম্পদ উৎসর্গ করেছেন, সেই আবু বকরের প্রতি আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট। আখিরাতের পথে কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যদি সম্ভব হতো, তাহলে আমি তাঁকেই বেছে নিতাম।” তারপর আদেশ দিলেন, “মসজিদের দিকে খোলা দরজাগুলোর মধ্যে আবু বকরের দরজা ছাড়া বাকি সবগুলো বন্ধ করে দাও!”
এরপর তিনি মিম্বর থেকে নেমে আমাদের মা হযরত আয়েশার কক্ষে ফিরে গেলেন। সাহাবায়ে কেরাম কাঁদতে শুরু করলেন। তখন মহানবী হযরত আলি ও ফজল ইবনে আব্বাসের বাহুতে ভর দিয়ে আবার মসজিদে তাশরিফ আনলেন। মিম্বরের নিচের ধাপে দাঁড়িয়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, “হে মুহাজিরগণ, হে আনসারগণ! যে জিনিসের সময় নির্ধারিত, তার কাছে পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়া করে কোনো লাভ নেই। আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার জন্যই তাড়াহুড়া করেন না। কেউ যদি আল্লাহ তাআলার কাজা ও কদর বদলে দিতে, তাঁর ইচ্ছার ওপর প্রবল হতে চেষ্টা করে, তিনি তাকে পরাভূত ও বিপর্যস্ত করবেন।
যে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কৌশল করতে চায়, তাঁকে ধোঁকা দিতে চায়, তার কাজ পণ্ড হয় এবং সে নিজেই প্রতারিত হয়। জেনে রাখো, আমি তোমাদের প্রতি পরম স্নেহশীল ও দয়ালু। তোমরাও আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তোমরা আমার সঙ্গে যেখানে মিলিত হবে, তা হলো হাউজে কাওসারের কিনারা। যে জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, আমার সঙ্গে মিলিত হতে চায়, সে যেন অনর্থক কথা না বলে। হে মুসলমানগণ! কাফির হওয়া ও গুনাহ করা নিয়ামত বদলে যাওয়ার এবং রিজিক কমে যাওয়ার কারণ হয়। মানুষ যদি আল্লাহ তাআলার আদেশ মেনে চলে, তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান, কর্তাব্যক্তি ও শাসকেরা তাদের প্রতি দয়া ও স্নেহ দেখায়। আর যদি তারা পাপাচার, অনাচার ও সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয় এবং গুনাহ করে, তাহলে তারা দয়ালু শাসক লাভ করতে পারে না। আমার জীবন যেমন তোমাদের জন্য কল্যাণকর, তেমনি আমার মৃত্যুও কল্যাণ ও রহমত। যদি আমি কাউকে অন্যায়ভাবে মেরে থাকি কিংবা কাউকে কোনো মন্দ কথা বলে থাকি, তাহলে সে আমার সঙ্গে একই আচরণ করে তার হক আদায় করে নিক – এতে আমি রাজি। আর যদি তোমাদের কারও কাছ থেকে অন্যায়ভাবে কিছু নিয়ে থাকি, সে তা ফেরত চাইলে আমি রাজি, পরস্পর দায়মুক্ত হতে আমি প্রস্তুত। কেননা দুনিয়ার শাস্তি আখিরাতের শাস্তির তুলনায় অনেক হালকা। তা সহ্য করা অনেক সহজ।” আগে যেমন তিনি হযরত আবু বকরের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন, তেমনি এই খুতবায় হযরত উমরের প্রতিও সন্তুষ্টি জানিয়ে বললেন, “উমর আমার সঙ্গে, আমিও তাঁর সঙ্গে। আমার পরে হক উমরের সঙ্গে থাকবে।”
“সবচেয়ে কঠিন বিপদ আসে নবীগণের ওপর। তবুও নিয়ামত পেয়ে তোমাদের যে আনন্দ হয়, বিপদে নবীর আনন্দ তার চেয়েও বেশি” হাদীস শরীফ
এই খুতবার পর রাসূলুল্লাহ মিম্বর থেকে নামলেন। নামাজের পর আবার মিম্বরে উঠে ওসিয়ত ও উপদেশ দিলেন, তারপর বললেন, “তোমাদের আল্লাহ তাআলার হাতে সোপর্দ করলাম।” এরপর তিনি সাহাবীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজ কক্ষে চলে গেলেন। একদিন জগৎসমূহের সরদারের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যথা অত্যন্ত তীব্র হলো। সেদিন সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরস্পর দায়মুক্ত হওয়ার জন্য এবং বান্দার হক কাঁধে নিয়ে আখিরাতে না যাওয়ার জন্য তিনি হযরত বিলাল হাবশিকে ডেকে পাঠালেন। তাঁকে বললেন, “লোকদের ডাক দাও! তারা মসজিদে একত্র হোক। আমি তাদের আমার শেষ ওসিয়ত করতে চাই!…”
হযরত বিলাল সাহাবীদের মসজিদে একত্র করলেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত আলি ও ফজলের ওপর ভর দিয়ে মসজিদে তাশরিফ আনলেন। মিম্বরে বসে আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা পাঠের পর তিনি বললেন, “হে আমার সাহাবীগণ! জেনে রাখো, তোমাদের মাঝ থেকে আমার বিদায় নেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমার কাছে যার কোনো হক পাওনা আছে, সে যেন আমার কাছ থেকে তা চেয়ে নেয়। আমার কাছে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে আমার কাছে তার হক চেয়ে নেয় অথবা তা মাফ করে দেয়, যাতে আমি এসব পরিশোধ করে আমার রব ও তাঁর রহমতের সঙ্গে মিলিত হতে পারি।” তারপর মিম্বর থেকে নেমে জোহরের নামাজ পড়ালেন। নামাজের পর আবার মিম্বরে উঠে নামাজের আগে যা বলেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি করলেন। অসুস্থতার সময়ও মহানবী আজান হলেই সবসময় মসজিদে নববিতে যেতেন এবং সাহাবায়ে কেরামের ইমাম হয়ে জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন।7 ইন্তেকালের তিন দিন আগে আমাদের প্রিয় নবীর অসুস্থতা আরও বেড়ে গেল। তিনি মসজিদে গিয়ে জামাআতে নামাজ পড়াতে পারলেন না। জামাআতের সঙ্গে যে নামাজটি তিনি প্রথম আদায় করতে পারেননি, সেটি ছিল এশার নামাজ।
হযরত বিলাল প্রতিদিনের মতো সেই সময় দরজায় এসে বললেন, “আসসালাত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” দুর্বলতার কারণে আমাদের প্রিয় নবীর মসজিদে যাওয়ার শক্তি ছিল না। তিনি বললেন, “আবু বকরকে বলো! তিনি যেন আমার সাহাবীদের নামাজ পড়ান।” আমাদের মা হযরত আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আমার আব্বা কোমল হৃদয়ের মানুষ, খুব সহজেই দুঃখে ভেঙে পড়েন। আপনার স্থানে দাঁড়িয়ে সেখানে আপনাকে দেখতে না পেলে কান্নার কারণে তিনি কিরাআত পড়তে পারবেন না। ইমামতির জন্য উমরকে এগিয়ে যেতে আদেশ দেবেন কি?” মহানবী আবার বললেন, “আবু বকরকে বলো! তিনি যেন আমার সাহাবীদের ইমাম হয়ে নামাজ পড়ান।” হযরত বিলাল আবু বকর সিদ্দিককে বিষয়টি জানালেন। মিহরাবে রাসূলুল্লাহকে দেখতে না পেয়ে হযরত আবু বকরের মনে হলো যেন তাঁর হৃদয়ে তির বিঁধেছে, তিনি প্রায় জ্ঞান হারাতে বসলেন। তিনি কাঁদলেন!… কাঁদলেন!… সাহাবায়ে কেরামও একসঙ্গে কাঁদতে শুরু করলেন। মসজিদ থেকে ভেসে আসা এই আর্তনাদ কিসের, হাবিবুল্লাহ তা জিজ্ঞেস করলে আমাদের মা হযরত ফাতিমা অবস্থা জানিয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আপনার সাহাবীগণ আপনার বিচ্ছেদ সইতে না পেরে কাঁদছেন!…”8 দয়ার সাগর আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। সাহাবীদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অসুস্থতা এত তীব্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন। হযরত আলি ও হযরত আব্বাসের ওপর ভর দিয়ে মসজিদে এলেন। নামাজের পর বললেন, “হে আমার সাহাবীগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হেফাজতে আছ, আর আমি তোমাদের আল্লাহ তাআলার কাছে আমানত রেখে গেলাম! তাকওয়ার ওপর থাকো। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। আল্লাহ তাআলার আদেশ আঁকড়ে ধরো এবং তাঁর আনুগত্য করো। আমি এখন এই দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছি।”
আমাদের প্রিয় নবীর ইন্তেকালের তখন তিন দিন বাকি। জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহকে দেখতে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। আপনার অবস্থা জানা সত্ত্বেও তিনি জিজ্ঞেস করছেন, আপনি কেমন আছেন, নিজেকে কেমন অনুভব করছেন।” জগৎসমূহের সরদার উত্তর দিলেন, “আমি বিষণ্ন!” রবিবারেও জিবরাইল আলাইহিস সালাম এলেন এবং একই কথা বললেন। মহানবী আবারও আগের উত্তরই দিলেন। এ ছাড়া জিবরাইল আলাইহিস সালাম খবর দিলেন যে, ইয়েমেনে নিজেকে নবী বলে দাবি করা আসওয়াদ আনসি নিহত হয়েছে। রাসূলে আকরামও তা সাহাবীদের জানালেন। অসুস্থ হওয়ার আগে তাঁর কাছে কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রা এসেছিল; তার কয়েকটি তিনি দরিদ্রদের এবং কয়েকটি হযরত আয়েশাকে দিয়েছিলেন। রবিবার রাসূলুল্লাহর অসুস্থতা আরও বেড়ে গেল। সেনাপতি হযরত উসামা তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁকে কিছুই বললেন না। তবে মুবারক হাত দুটি তুলে তাঁর গায়ে বুলিয়ে দিলেন। বোঝা গেল, তিনি তাঁর জন্য দোয়া করছেন। অসুস্থতার তেরোতম ও শেষ দিন… আমাদের প্রিয় নবী যেদিন দুনিয়াকে ধন্য করেছিলেন, সেদিনের মতোই এ দিনটিও ছিল রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ, সোমবার। বিশ্বজগতের সুলতান তাঁর দেহ মুবারকে কিছুটা হালকা বোধ করলেন… সাহাবায়ে কেরাম যখন হযরত আবু বকর সিদ্দিকের পেছনে ফজরের নামাজ আদায় করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখন জগৎসমূহের সরদার মসজিদে নববিতে তাশরিফ আনলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর উম্মত সারিবদ্ধ হয়ে ইবাদত করছে। আনন্দে তিনি মুচকি হাসলেন। সাহাবায়ে কেরামও রাসূলুল্লাহকে মসজিদে দেখে, অসুখ সেরে গেছে ভেবে আনন্দিত হলেন। আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের প্রিয় নবীর আগমন টের পেয়ে পেছনে সরে আসতে চাইলেন। মহানবী তাঁকে “নিজের জায়গায় থাকো!” – এই অর্থে ইশারা করলেন। তিনি নিজে হযরত আবু বকরের ইকতিদা করে তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করলেন।9 এভাবে রাসূলুল্লাহর আদেশে হযরত আবু বকর সাহাবায়ে কেরামকে সতেরো ওয়াক্ত নামাজ পড়ালেন। নামাজের পর রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশার কক্ষে তাশরিফ নিয়ে শুয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, “আমি দুনিয়ার কোনো সম্পদ রেখে না গিয়ে আল্লাহ তাআলার দরবারে যেতে চাই। তোমার কাছে যে স্বর্ণমুদ্রাগুলো রয়ে গেছে, সেগুলোও দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দাও!” এরপর তাঁর জ্বর বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলে তিনি হযরত আয়েশার কাছে জানতে চাইলেন, স্বর্ণমুদ্রাগুলো বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না। হযরত আয়েশা জানালেন, বিলিয়ে দেবেন। মহানবী বারবার আদেশ দিলেন, এখনই যেন সেগুলো বিলিয়ে দেওয়া হয়। তৎক্ষণাৎ বিলিয়ে দিয়ে তাঁকে জানানো হলে তিনি বললেন, “এখন আমি স্বস্তি পেলাম।” বিছানায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর তিনি হযরত আলিকে নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন। নিজের মুবারক মাথা তাঁর কোলে রাখলেন। তাঁর মুবারক ললাট ঘেমে গিয়েছিল, মুবারক চেহারার রং বদলে গিয়েছিল। আমাদের মা হযরত ফাতিমা তাঁর মহান পিতার এ অবস্থা দেখে আর তাকিয়ে থাকতে পারলেন না; তিনি তাঁর পুত্র হযরত হাসান ও হযরত হুসাইনের কাছে গেলেন। তাঁদের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, “হায় আমার আব্বাজান! আপনার মেয়েকে কে দেখবে? হাসান ও হুসাইনকে কার কাছে আমানত রেখে যাচ্ছেন? হায় আমার আব্বা! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আপনার পরে আমার কী দশা হবে? আপনার মুবারক চেহারার পর আমার চোখ আর কার দিকে তাকাবে?” মেয়ের হৃদয়বিদারক এ কথাগুলো শুনে রাসূলুল্লাহ মুবারক চোখ খুললেন, তাঁকে কাছে ডাকলেন এবং দোয়া করলেন, “হে আমার রব! তাঁকে সবর দান করো।” তারপর যখন বললেন, “হে ফাতিমা! হে আমার চোখের মণি! তোমার আব্বা এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় আছেন!” তখন তাঁর বুকফাটা কান্না আরও বেড়ে গেল। হযরত আলি বললেন, “হে ফাতিমা! দোহাই তোমার, চুপ করো, রাসূলুল্লাহকে আর কষ্ট দিয়ো না!” তখন আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “তাঁকে কষ্ট দিয়ো না, হে আলি! আব্বার জন্য তাঁর চোখ অশ্রু ঝরাক!…” এরপর তিনি মুবারক চোখ বন্ধ করলেন, যেন সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। তারপর হযরত হাসান তাঁর মহান নানার কাছে এসে কেঁদে কেঁদে বললেন, “হে আমার পবিত্র নানাজান! আপনার বিচ্ছেদ কে সইতে পারবে? আমাদের মনের দুঃখ আমরা কাকে জানাব? আপনার পরে আমার আম্মা, আব্বা ও ভাইকে কে স্নেহ করবে? আপনার স্ত্রীগণ ও সাহাবীগণ আপনার সেই সুন্দর চরিত্র আর কোথায় খুঁজে পাবেন?…” এ কথা শুনে মহানবীর সম্মানিত স্ত্রীগণের আর সহ্য করার অবস্থা রইল না। তাঁরা সবাই একসঙ্গে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করলেন। বাইরে গভীর বেদনা নিয়ে অপেক্ষারত সাহাবায়ে কেরাম যখন শুনলেন যে, মহানবীর অসুস্থতা অনেক বেড়ে গেছে, তখন তাঁদের হৃদয় দগ্ধ হলো। তাঁরা কাঁদতে শুরু করলেন। শেষবারের মতো হলেও প্রিয় নবীর মুবারক চেহারা দেখার জন্য তাঁরা দরজায় দাঁড়িয়ে মিনতি করছিলেন, “দোহাই, দরজাটা খুলে দিন! রাসূল আলাইহিস সালামের মুবারক চেহারা আরেকবার দেখি!…” জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত আল্লাহ তাআলার হাবিব, তাঁর প্রিয়তম, সাহাবীদের এই মিনতি শুনে দয়াপরবশ হয়ে বললেন, “দরজা খুলে দাও!” সাহাবীদের নেতৃস্থানীয়রা ভেতরে প্রবেশ করলেন। আমাদের প্রিয় নবী তাঁদের সবর করার উপদেশ দিয়ে বললেন, “হে আমার সাহাবীগণ! তোমরা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে মর্যাদাবান। তোমাদের পরে যে-ই আসুক না কেন, তোমরা তাদের সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখার ব্যাপারে অটল থাকো এবং মহান কুরআনকে ইমাম (পথপ্রদর্শক) হিসেবে গ্রহণ করো।
“হে আমার সাহাবীগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হেফাজতে আছ, আর আমি তোমাদের আল্লাহ তাআলার কাছে আমানত রেখে গেলাম! তাকওয়ার ওপর থাকো” হাদীস শরীফ
দ্বীনের বিধানাবলি সম্পর্কে গাফেল হয়ো না।” তারপর “হে আমার রব! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” বলে তিনি মুবারক চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুবারক চেহারা ঘেমে উঠল। হযরত আলি ইশারায় সাহাবীদের বেরিয়ে যেতে বললেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পর আমাদের মা হযরত আয়েশা তাঁর কাছে এসে উপদেশ চাইলেন। মহানবী বললেন, “হে আয়েশা! নিজের ঘরের কোণে বসে থেকে নিজেকে হেফাজত করো!” এরপর তাঁর মুবারক চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। বিশ্বজগতের সুলতান কাঁদছিলেন… সেখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হলো, কলিজা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। আমাদের মা হযরত উম্মে সালামা জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আপনি কেন কাঁদছেন?” তিনি বললেন, “আমার উম্মতের প্রতি যেন দয়া করা হয়, সে জন্য কাঁদছি।”
সূর্য মাথার ওপরের দিকে উঠছিল। সময় ঘনিয়ে এসেছিল… আমাদের প্রিয় নবীর মুবারক মাথা আমাদের মা হযরত আয়েশার বুকে হেলান দেওয়া ছিল। জগৎসমূহের সরদার তখন শেষ মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করছিলেন। তাঁর মুবারক ঠোঁট থেকে এই কথাগুলো ঝরে পড়ছিল: “সাবধান! সাবধান! তোমাদের অধীন দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে! তাদের পোশাক পরাবে, তাদের পেট ভরে খাওয়াবে। তাদের সঙ্গে নরম ভাষায় কথা বলবে। নামাজ, নামাজ – নামাজে অবিচল থাকবে। তোমাদের স্ত্রী ও দাস-দাসীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করবে!… হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করো! আমাকে তোমার রহমত দান করো!… আমাকে রফিকে আলার দলের সঙ্গে মিলিত করো!…” আমাদের মা হযরত ফাতিমার চোখের পানি বানের মতো বয়ে যাচ্ছিল, তাঁর আর্তনাদ কলিজা দগ্ধ করছিল। আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে নিজের কাছে বসিয়ে বললেন, “মা আমার, একটু সবর করো, কেঁদো না। কেননা হামালায়ে আরশ (ফেরেশতাগণ) তোমার কান্নার সঙ্গে কাঁদছেন।” তিনি আমাদের মা হযরত ফাতিমার চোখের পানি মুছে দিলেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন, আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর জন্য সবর চাইলেন এবং বললেন, “হে আমার মেয়ে, আমার রুহ কবজ করা হবে। তুমি বলবে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ হে ফাতিমা! আগত প্রতিটি বিপদের প্রতিদান দেওয়া হয়।” কিছুক্ষণ মুবারক চোখ বন্ধ রাখার পর বললেন, “এরপর তোমার আব্বার আর কোনো দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থাকবে না। কেননা তিনি নশ্বর জগৎ ও কষ্টের স্থান থেকে মুক্তি পাচ্ছেন।” তারপর হযরত আলিকে বললেন, “হে আলি! আমার কাছে অমুক ইহুদির এই পরিমাণ সম্পদ পাওনা আছে। সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করার জন্য আমি তা নিয়েছিলাম। সাবধান, তা পরিশোধ করতে ভুলো না। নিশ্চয়ই তুমি আমাকে এই দায় থেকে মুক্ত করবে, আর হাউজে কাওসারের কিনারায় আমার সঙ্গে যারা সাক্ষাৎ করবে, তাদের মধ্যে প্রথম হবে তুমি। আমার পরে তোমার অনেক ক্ষতি হবে, তুমি সবর করবে। মানুষ যখন দুনিয়া চাইবে, তুমি তখন আখিরাতকে বেছে নেবে।”
হযরত উসামা আবার এলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, “আল্লাহ তাআলা তোমার সহায় হোন! যাও, জিহাদে যাও!” তিনিও বের হয়ে তাঁর বাহিনীর কাছে গেলেন এবং তৎক্ষণাৎ যাত্রার আদেশ দিলেন।10
জগৎসমূহের সরদার তখন শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন… সময় একেবারে ঘনিয়ে এসেছিল… আল্লাহ তাআলা আজরাইল আলাইহিস সালামের প্রতি ওহী পাঠালেন, “আমার হাবিবের কাছে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে যাও! যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে তাঁর রুহ অত্যন্ত কোমলভাবে ও সহজভাবে কবজ করো। অনুমতি না দিলে ফিরে এসো!” আজরাইল আলাইহিস সালাম সবচেয়ে সুন্দর আকৃতিতে, মানুষের বেশে আমাদের প্রিয় নবীর বরকতময় গৃহের দরজায় এলেন এবং বললেন, “আসসালামু আলাইকুম, হে নবুয়তের ঘরের অধিকারী! ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেবেন কি? আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহমত করুন!”
আমাদের মা হযরত আয়েশা আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিয়রে বসে থাকা হযরত ফাতিমাকে বললেন, “এই আগন্তুককে তুমি উত্তর দাও।” হযরত ফাতিমা দরজার কাছে গিয়ে অত্যন্ত বেদনাভরা কণ্ঠে বললেন, “হে আল্লাহ তাআলার বান্দা! রাসূলুল্লাহ এখন নিজের অবস্থা নিয়ে ব্যস্ত আছেন।” আজরাইল আলাইহিস সালাম আবার অনুমতি চাইলেন। একই উত্তর দেওয়া হলো। তৃতীয়বার তিনি সালাম দিয়ে উচ্চস্বরে জানালেন যে, তাঁকে অবশ্যই প্রবেশ করতে হবে। তখন মহানবী তা শুনতে পেলেন এবং বললেন, “হে ফাতিমা! দরজায় কে?”
হযরত ফাতিমা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! দরজায় একজন প্রবেশের অনুমতি চাইছেন। আমি কয়েকবার তাঁকে উত্তর দিয়েছি। কিন্তু তৃতীয়বার যখন তিনি ডাকলেন, আমার সারা শরীর শিউরে উঠল।” তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, “হে ফাতিমা! দরজায় কে, তুমি কি জানো? তিনি স্বাদ-আনন্দ ধ্বংসকারী, সমাবেশ ছত্রভঙ্গকারী, নারীদের বিধবা আর শিশুদের ইয়াতিমকারী, ঘরবাড়ি বিরান আর কবরস্থান আবাদকারী মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাইল। হে আজরাইল, প্রবেশ করো!” তখন আমাদের মা হযরত ফাতিমা অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় ভেঙে পড়লেন, তাঁর মুবারক মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “হায় মদিনা, তুমি বিরান হয়ে গেলে!” মহানবী হযরত ফাতিমার হাত ধরে নিজের মুবারক বুকে রাখলেন এবং মুবারক চোখ বন্ধ করলেন। উপস্থিত সবাই ভাবলেন, তাঁর মুবারক রুহ কবজ হয়ে গেছে। আমাদের মা হযরত ফাতিমা আর সইতে না পেরে আব্বার মুবারক কানের দিকে ঝুঁকে হৃদয়বিদারক কণ্ঠে ডাকলেন, “হে আমার আব্বাজান!…” কোনো উত্তর না পেয়ে এবার বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! দোহাই, আপনার মুবারক চোখ একবার খুলুন, আমাকে কিছু বলুন…” জগৎসমূহের সরদার মুবারক চোখ খুলে মেয়ের চোখের পানি মুছে দিলেন এবং তাঁর কানে কানে জানালেন যে, তিনি ইন্তেকাল করবেন। এতে হযরত ফাতিমা কাঁদতে শুরু করলেন। এবার মহানবী তাঁর কানে কানে বললেন, “আমার আহলে বাইতের মধ্যে সবার আগে আমার কাছে আসবে তুমি।” এই সুসংবাদে তিনি আনন্দিত হলেন এবং সান্ত্বনা পেলেন।
“হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করো! আমাকে তোমার রহমত দান করো!… আমাকে রফিকে আলার দলের সঙ্গে মিলিত করো!…” হাদীস শরীফ
আমাদের মা হযরত ফাতিমা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার আব্বাজান! আজ বিচ্ছেদের দিন! আবার কবে আমি আপনার সঙ্গে মিলিত হব?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হে আমার মেয়ে! কিয়ামতের দিন আমাকে হাউজের কিনারায় পাবে। আমার উম্মতের মধ্যে যারা হাউজে আসবে, আমি তাদের পানি পান করাব।” হযরত ফাতিমা যখন জিজ্ঞেস করলেন, “যদি সেখানে আপনাকে না পাই, তাহলে কী করব?” তখন মহানবী বললেন, “মিজানের কাছে পাবে। সেখানে আমি আমার উম্মতের জন্য শাফায়াত করব।”
আমাদের মা হযরত ফাতিমা যখন বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেখানেও যদি না পাই?” তখন মহানবী বললেন, “পুলসিরাতের কাছে পাবে। সেখানে আমি আমার রবের কাছে মিনতি করে বলব, ‘হে আমার রব! আমার উম্মতকে আগুন থেকে রক্ষা করো!’”
এরপর হযরত আলি বেদনাভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি রুহ সোপর্দ করার পর আপনাকে কে গোসল দেবে, কী দিয়ে কাফন পরাব? আপনার জানাজার নামাজ কে পড়াবে, কবরে কে রাখবে?” মহানবী বললেন,
“হে আলি, তুমি আমাকে গোসল দেবে, ফজল ইবনে আব্বাস তোমাকে পানি ঢেলে দেবে। জিবরাইল হবেন তোমাদের তৃতীয়জন। গোসলের (ধোয়ার) কাজ শেষ হলে তোমরা আমাকে কাফন পরাবে। জিবরাইল জান্নাত থেকে সুগন্ধি নিয়ে আসবেন। তারপর আমাকে মসজিদে নিয়ে গিয়ে তোমরা বেরিয়ে যাবে। কেননা সবার আগে জিবরাইল, তারপর মিকাইল, তারপর ইসরাফিল, তারপর ফেরেশতাগণ দলে দলে আমার জানাজার নামাজ আদায় করবেন। এরপর তোমরা প্রবেশ করবে এবং সারিবদ্ধ হবে। কেউ যেন আমার সামনে না দাঁড়ায়।”11 এরপর অপেক্ষমাণ আজরাইল আলাইহিস সালামকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আজরাইল! তুমি কি দেখা করতে এসেছ, নাকি আমার রুহ কবজ করতে?…” আজরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “আমি মেহমান হিসেবেও এসেছি, দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবেও এসেছি। আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ দিয়েছেন, আমি যেন কেবল অনুমতি নিয়েই আপনার কাছে প্রবেশ করি। আপনার মুবারক রুহ আমি কেবল আপনার অনুমতিক্রমেই কবজ করব। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিলে আপনার আদেশ মেনে আপনার রুহ কবজ করব। নইলে ফিরে গিয়ে আমার রবের কাছে চলে যাব।” মহানবী বললেন, “হে আজরাইল! জিবরাইলকে কোথায় রেখে এলে?…” আজরাইল বললেন, “জিবরাইলকে দুনিয়ার আসমানে রেখে এসেছি। আপনার ইন্তেকালের কারণে ফেরেশতারা তাঁকে সমবেদনা জানাচ্ছেন।” তাঁরা এভাবে কথা বলছিলেন, এমন সময় জিবরাইল আলাইহিস সালাম এলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, “হে আমার ভাই জিবরাইল! দুনিয়া থেকে বিদায়ের সময় এসে গেছে। আল্লাহ তাআলার কাছে আমার জন্য কী আছে? সেই সুসংবাদ আমাকে দাও, যাতে প্রশান্ত মনে আমানত তার মালিকের কাছে সোপর্দ করতে পারি।” জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “হে আল্লাহ তাআলার প্রিয়তম! আমি আসমানের দরজা খোলা রেখে এসেছি। ফেরেশতারা সারিবদ্ধ হয়ে ভালোবাসার সঙ্গে আপনার রুহের জন্য অপেক্ষা করছেন।” মহানবী বললেন, “সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহ তাআলার। তুমি আমাকে সুসংবাদ দাও! আমার রবের কাছে আমার জন্য কী আছে?…” জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার শুভাগমনের জন্য জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, জান্নাতের নহরগুলো বইতে শুরু করেছে, জান্নাতের গাছগুলো নুয়ে পড়েছে, হুরেরা সেজেগুজে আছে।”
মহানবী আবার বললেন, “সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহ তাআলার। হে জিবরাইল! আমাকে অন্য সুসংবাদ দাও!…” জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামতের দিন আপনিই প্রথম শাফায়াতকারী এবং আপনার শাফায়াতই সর্বপ্রথম কবুল করা হবে।” আমাদের প্রিয় নবী আবার যখন বললেন, “সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহ তাআলার। হে জিবরাইল! আমাকে অন্য সুসংবাদ দাও,” তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কোন বিষয়ে জানতে চাইছেন?…” তখন মহানবী বললেন, “আমার সমস্ত দুশ্চিন্তা, দুঃখ ও বেদনা আমার উম্মতকে নিয়ে, যাদের আমি পেছনে রেখে যাচ্ছি।” হযরত জিবরাইল বললেন, “হে আল্লাহ তাআলার হাবিব! কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আপনার উম্মতকে ক্ষমা করতে থাকবেন। সকল নবীর আগে আপনাকে এবং সকল উম্মতের আগে আপনার উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” আমাদের প্রিয় নবী জিবরাইল আলাইহিস সালামকে বললেন, “আল্লাহ তাআলার কাছে আমার তিনটি আকাঙ্ক্ষা আছে: প্রথমটি, তিনি যেন আমাকে আমার উম্মতের গুনাহগারদের জন্য শাফায়াতকারী বানান। দ্বিতীয়টি, দুনিয়ায় করা গুনাহের কারণে তিনি যেন তাদের আজাব না দেন। তৃতীয়টি, বৃহস্পতিবার ও সোমবার যেন আমার উম্মতের আমলসমূহ আমার সামনে পেশ করা হয়। (যদি তাদের আমল ভালো হয়, আমি দোয়া করব, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন। আর মন্দ হলে আমি শাফায়াত করে আমলনামা থেকে তা মুছে দেওয়ার আবেদন করব।)” জিবরাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর এই তিনটি আকাঙ্ক্ষাই কবুল হওয়ার সংবাদ পৌঁছে দিলেন। এতে আমাদের প্রিয় নবী প্রশান্ত হলেন।
আল্লাহ তাআলা ওহী পাঠালেন, “হে আমার হাবিব! তোমার উম্মতের প্রতি এত ভালোবাসা ও স্নেহ দেখানোর প্রেরণা তোমার মুবারক অন্তরে কে দিয়েছে?…” মহানবী উত্তর দিলেন, “যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন ও লালন করেছেন, সেই আমার মহান রব।” তখন মহান আল্লাহ বললেন, “তোমার উম্মতের প্রতি আমার রহমত ও দয়া তোমার দয়ার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। তাদের আমার হাতে ছেড়ে দাও।” এরপর আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “এখন আমি প্রশান্ত হলাম। হে আজরাইল! তোমাকে যে দায়িত্বের আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা পালন করো!” আজরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য সেই বিশ্বজগতের সুলতানের নিকটবর্তী হলেন, যাঁর সম্মানে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী পাশে রাখা পানির পাত্রে তাঁর দুই মুবারক হাত ডুবিয়ে ভেজা হাত দুটি মুবারক চেহারায় বুলিয়ে নিলেন এবং বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! হে আল্লাহ! রফিকে আলা!…” আজরাইল আলাইহিস সালাম জগৎসমূহের সরদারের মুবারক রুহ কবজ করতে শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহর মুবারক চেহারা কখনো লাল হয়ে উঠছিল, কখনো ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিল। তিনি আজরাইল আলাইহিস সালামকে বললেন, “আমার উম্মতের প্রাণও কি এমন কঠোরভাবে ও জোর করে কবজ করবে?…” আজরাইল উত্তর দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আর কারও প্রাণ এত সহজে কবজ করিনি।” শেষ মুহূর্তেও আমাদের প্রিয় নবী উম্মতকে ভোলেননি; তিনি বললেন, “হে আজরাইল! আমার উম্মতের প্রতি যে কঠোরতা করবে, তা আমার ওপর করো! কেননা তারা দুর্বল, সইতে পারবে না…” এরপর বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! রফিকে আলা!…” – আর তাঁর মুবারক রুহ কবজ করা হলো এবং আলায়ে ইল্লিয়্যিনে পৌঁছে দেওয়া হলো…
শাফায়াত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
দাখিলাক, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া সাইয়্যিদাল আউয়ালিনা ওয়াল আখিরিন!
জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবীকে “আসসালামু আলাইকুম, হে আল্লাহ তাআলার রাসূল! আমার লক্ষ্য, আমার কাঙ্ক্ষিত ছিলেন আপনিই। এখন থেকে আমি আর কখনো পৃথিবীতে আসব না!…” বলে বিদায় নিলেন।
রাসূলে আকরামের মুবারক রুহ ঊর্ধ্বজগতে চলে গেলে আমাদের মা হযরত ফাতিমা ও মহানবীর পবিত্র স্ত্রীগণ (আজওয়াজে তাহিরাত) (রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না) নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করলেন।12 এমন সময় এক অদৃশ্য কণ্ঠ
“হে ফাতিমা! দরজায় কে, তুমি কি জানো? তিনি স্বাদ-আনন্দ ধ্বংসকারী, সমাবেশ ছত্রভঙ্গকারী, নারীদের বিধবা আর শিশুদের ইয়াতিমকারী, ঘরবাড়ি বিরান আর কবরস্থান আবাদকারী মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাইল” হাদীস শরীফ
“আসসালামু আলাইকুম, হে আহলে বাইত! ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু” বলে সালাম দিলেন এবং সূরা আলে ইমরানের ১৮৫তম পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করলেন, যার মর্মার্থ: “জেনে রাখো, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে।” তারপর তাঁদের সান্ত্বনা দিয়ে সমবেদনা জানিয়ে বললেন, “আল্লাহ তাআলার দান ও অনুগ্রহের ওপর ভরসা রাখো। তাঁকে আঁকড়ে ধরো, তাঁর কাছেই আশা করো। বিলাপ কোরো না! প্রকৃত বিপদগ্রস্ত তো সে-ই, যে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়!”
সেখানে উপস্থিত সবাই এ কথাগুলো শুনলেন এবং তাঁর সালামের জবাব দিলেন। এ কথাগুলো যিনি বলেছিলেন, তিনি ছিলেন খিজির আলাইহিস সালাম।13 রাসূলে আকরামের মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখা দিলে উম্মে আইমান তাঁর পুত্র উসামার কাছে খবর পাঠালেন। উসামা, হযরত উমর ও আবু উবাইদা এই মর্মান্তিক সংবাদ পেয়ে বাহিনী ছেড়ে মসজিদে নববিতে চলে এলেন। আয়েশা সিদ্দিকা ও অন্যান্য নারী কাঁদতে শুরু করলে মসজিদে নববিতে থাকা সাহাবায়ে কেরাম হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। কী হয়েছে, তাঁরা বুঝে উঠতে পারলেন না। তাঁদের মনে হলো যেন মাথায় বজ্রাঘাত হয়েছে। হযরত আলি মৃত মানুষের মতো নিশ্চল হয়ে রইলেন। হযরত উসমানের মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। হযরত আবু বকর তখন নিজের বাড়িতে ছিলেন। তিনি দৌড়ে এলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে হুজরায়ে সাআদাতে প্রবেশ করলেন। বিশ্বজগতের গৌরবের চেহারা থেকে কাপড় সরালেন এবং দেখলেন, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মুবারক চেহারা ও সারা দেহ কোমল, পরিচ্ছন্ন হয়ে নূরের মতো ঝলমল করছিল। “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জীবনের মতো আপনার মৃত্যুও কত সুন্দর!” – এ কথা বলে তিনি তাঁকে চুম্বন করলেন। অনেকক্ষণ কাঁদলেন। মুবারক চেহারা ঢেকে দিলেন। ঘরের সবাইকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর মসজিদে নববিতে এলেন। মিম্বরে উঠে সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে একটি খুতবা দিলেন। আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা পাঠ করলেন এবং রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি দরুদ পাঠের পর বললেন, “যে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের প্রতি ঈমান এনেছিল, সে জেনে রাখুক, মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করেছেন। আর যে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক, তিনি হাই (চিরঞ্জীব) ও বাকি (যিনি মরেন না, চিরস্থায়ী)।” তারপর তিনি সূরা আলে ইমরানের ১৪৪তম পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করলেন, যার মর্মার্থ: “মুহাম্মদ (আলাইহিস সালাম) একজন রাসূল। তাঁর আগেও বহু রাসূল এসেছেন। তিনিও মৃত্যুবরণ করবেন। তিনি যদি ইন্তেকাল করেন কিংবা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা তোমাদের দ্বীন থেকে ফিরে যাবে? যে তার দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে, সে আল্লাহ তাআলার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। সে কেবল নিজেরই ক্ষতি করবে। যারা দ্বীন থেকে ফিরে যায় না, আল্লাহ তাআলা তাদের সওয়াব দান করবেন।” তিনি সাহাবায়ে কেরামকে উপদেশ দিয়ে চারদিকের অবস্থা শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনলেন।14 এভাবে সবাই বিশ্বাস করলেন যে, রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেছেন। দুঃখ ও বেদনা সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ে বিষমাখা খঞ্জরের মতো বিঁধে গেল। চোখ কাঁদছিল, অশ্রু বানের মতো বয়ে যাচ্ছিল, বিরহের আগুন সবার কলিজা দগ্ধ করছিল। সাহাবায়ে কেরাম আলাইহিমুর রিদওয়ান সবার আগে যে কাজটি করলেন, তা হলো সব কাজ পরিচালনার জন্য হযরত আবু বকরকে খলিফা নির্বাচন করা। তাঁর হাতে বাইআত করে তাঁর আনুগত্য মেনে নিলেন এবং তাঁর আদেশ অনুযায়ী কাজকর্ম চালাতে শুরু করলেন।15 রাসূলে আকরাম হিজরতের একাদশ বছরে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দে), রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে, সোমবার দুপুরের আগে আখিরাতে পাড়ি জমালেন। তখন চান্দ্রবর্ষের হিসাবে তাঁর বয়স ছিল ৬৩ (সৌরবর্ষের হিসাবে ৬১) বছর।16
হযরত আলি, হযরত আব্বাস, হযরত ফজল ইবনে আব্বাস ও হযরত উসামা ইবনে জায়েদ মহানবীকে গোসল দিলেন।17
“আল্লাহ তাআলার দান ও অনুগ্রহের ওপর ভরসা রাখো। তাঁকে আঁকড়ে ধরো, তাঁর কাছেই আশা করো। বিলাপ কোরো না! প্রকৃত বিপদগ্রস্ত তো সে-ই, যে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়!” খিজির আলাইহিস সালাম
মিহরাব শরীফ – রওজায়ে মুতাহহারা / মসজিদে নববি
মহানবীর (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) মসজিদে নববিতে
“রওজায়ে মুতাহহারা / জান্নাতের বাগান” নামে পরিচিত অংশ।
আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমাম হয়ে যেখানে নামাজ পড়াতেন,
সেই মিহরাব দেখা যাচ্ছে।
এই ছবিতে দেখা না গেলেও বাম দিকে তাঁর মুবারক কবর শরীফ
(হুজরায়ে সাআদাত) অবস্থিত।
মিম্বর শরীফ – রওজায়ে মুতাহহারা / মসজিদে নববি
আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেখানে দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা দিতেন, সেই মিম্বর দেখা যাচ্ছে। সে যুগে মিম্বর শরীফ ছিল তিন ধাপের এবং এক মিটার উঁচু। হিজরি ৬৫৪ সালের (১২৫৬ খ্রিস্টাব্দের) অগ্নিকাণ্ডে তা সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মিম্বর তৈরি করা হয়। বর্তমানের বারো ধাপবিশিষ্ট, সাত মিটার উঁচু মার্বেলের মিম্বরটি সুলতান তৃতীয় মুরাদ খান হিজরি ৯৯৮ সালে (১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে) ইস্তাম্বুল থেকে পাঠিয়েছিলেন।
গোসলের সময় তাঁর দেহ মুবারক থেকে এমন মেশকের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল, যা এর আগে কেউ কখনো পায়নি। তারপর মুবারক জামা গায়ে রেখেই তাঁকে তিনবার গোসল দেওয়া হলো এবং তিন প্রস্থ নতুন সাদা কাফনে জড়িয়ে কাফন পরানো হলো। একটি খাটিয়ায় বহন করে তাঁকে মসজিদে আনা হলো। আমাদের প্রিয় নবী আগে যেভাবে জানিয়ে গিয়েছিলেন, সেভাবে সবাই মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেলেন। ফেরেশতাগণ দলে দলে এসে তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করলেন। ফেরেশতাদের নামাজ শেষ হলে এক অদৃশ্য কণ্ঠ বলে উঠল, “প্রবেশ করো! তোমাদের নবীর জানাজার নামাজ আদায় করো!” তখন সাহাবায়ে কেরাম ভেতরে প্রবেশ করলেন। তাঁরাও দলে দলে এসে ইমাম ছাড়াই আমাদের প্রিয় নবীর জানাজার নামাজ আদায় করলেন। বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ তবেই তাঁরা তা শেষ করতে পারলেন। আমাদের প্রিয় নবীর মুবারক কবর খননের ব্যাপারে হযরত আবু বকর একটি হাদীস শরীফ স্মরণ করিয়ে দিলেন, আর সাহাবায়ে কেরাম তা-ই অনুসরণ করলেন: “নবীগণ যে স্থানে রুহ সোপর্দ করেন, সেখানেই তাঁদের দাফন করা হয়।” হযরত আবু তালহা আনসারি লাহদ আকারে যে কবর শরীফ খনন করেছিলেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে (বুধবারের রাতে) মধ্যরাতের দিকে মহানবীকে সেখানে দাফন করা হলো। হযরত আব্বাসের পুত্র কুসাম কবরের কাজ শেষ করে সবার শেষে সেখান থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি বললেন, “রাসূলুল্লাহর মুবারক চেহারা সবার শেষে আমিই দেখেছি। তাঁর মুবারক ঠোঁট নড়ছিল। আমি তাঁর দিকে ঝুঁকে কান পাতলাম। তিনি মিনতি করে বলছিলেন, ‘হে আমার রব! আমার উম্মত!… হে আমার রব! আমার উম্মত!…’”18 আমাদের প্রিয় নবী যেদিন আখিরাতে পাড়ি জমালেন, সেদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ দোয়া করলেন, “হে আমার রব! আমি এই চোখ চেয়েছিলাম তোমার হাবিবের নূরানি মুবারক চেহারা দেখার জন্য। তিনিই যখন আর দৃষ্টির সামনে নেই, তখন এই চোখ দিয়ে আমি কী করব! হে আমার রব, আমার দৃষ্টি তুলে নাও!” – আর তিনি দৃষ্টিশক্তি হারালেন…
রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালে তাঁর সম্মানিত ফুফু সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এই শোকগাথা রচনা করলেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! তুমি ছিলে আমাদের আশা,
তুমিই দিতে আমাদের কল্যাণ ভালোবাসা।
অন্যায় যারা করে, তুমি ছিলে না তাদের দলে,
তুমি ছিলে স্নেহময়, পথ দেখাতে সকলে।
ছিলে তুমি জ্ঞানের সাগর, যার বর্ণনা নেই,
আজ যত কান্না-বিলাপ, সব তোমারই জন্যেই।
তোমার পথে উৎসর্গ হোক আমার পূর্বপুরুষ সব!
উৎসর্গ হোক ধন, প্রাণ, আমার যা কিছু বৈভব।
হায়! এখনো যদি তুমি থাকতে আমাদের মাঝে,
কত যে খুশি হতাম, যদি থাকতে সকাল-সাঁঝে।
এ যে হক তাআলার হুকুম, বলি – “সবর” সবাই,
কী যে করি, জানি না, শুধু বিলাপ করে যাই।
আল্লাহর সালাম তোমার প্রতি, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আদন জান্নাতে প্রবেশ করে থাকো, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
