আমার প্রিয় নবী

বিদায় খুতবা

হামদ (প্রশংসা) কেবল আল্লাহ তাআলারই প্রাপ্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তওবা করি। নিজেদের নফসের অনিষ্ট ও আমলের গুনাহ থেকে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় চাই। আল্লাহ তাআলা যাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, তাকে বিপথগামী করার কেউ নেই; আর তিনি যাকে বিপথগামী করেন, তাকে সঠিক পথে আনার কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক। তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর বান্দা ও রাসূল।

হে আল্লাহর বান্দারা! আমি তোমাদের আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার এবং তাঁর আনুগত্য করার ওসিয়ত করছি।

হে লোকসকল! আমার কথা ভালো করে শোনো! জানি না, হয়তো এ বছরের পর এখানে তোমাদের সঙ্গে আর কখনো মিলিত হতে পারব না। হে লোকসকল! তোমাদের এই দিনগুলো যেমন পবিত্র দিন, এই মাস যেমন পবিত্র মাস, এই শহর (মক্কা) যেমন বরকতময় শহর, তেমনি তোমাদের জান, মাল ও সম্ভ্রমও পবিত্র। সব ধরনের আক্রমণ থেকে তা সুরক্ষিত।

আমার সাহাবীগণ! কাল তোমরা তোমাদের রবের সাক্ষাৎ লাভ করবে এবং আজকের প্রতিটি অবস্থা ও প্রতিটি কাজ সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান, আমার পরে পুরোনো গোমরাহিতে ফিরে গিয়ে একে অপরের গর্দান কেটো না!

এখানে যারা উপস্থিত, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে আমার এই ওসিয়ত পৌঁছে দেয়!

হতে পারে, যার কাছে পৌঁছানো হবে, সে এখানে উপস্থিত থেকে যে শুনেছে, তার চেয়েও ভালো বুঝে তা সংরক্ষণ করবে। আমার সাহাবীগণ! কারও কাছে কোনো আমানত থাকলে সে যেন তা মালিককে ফিরিয়ে দেয়!

সব ধরনের সুদ রহিত করা হলো। তা আমার পায়ের নিচে। তবে তোমাদের ঋণের মূল অংশ ফেরত দিতে হবে। তোমরা জুলুমও কোরো না, জুলুমের শিকারও হয়ো না। আল্লাহ তাআলার আদেশে সুদের কারবার এখন নিষিদ্ধ। জাহিলিয়াত যুগ থেকে চলে আসা এই কুৎসিত প্রথার সব রূপ আমার পায়ের নিচে। আমি সর্বপ্রথম যে সুদ রহিত করছি, তা হলো আবদুল মুত্তালিবের পুত্র (আমার চাচা) আব্বাসের সুদ। আমার সাহাবীগণ! জাহিলিয়াত যুগ থেকে চলে আসা রক্তের দাবিগুলোও সম্পূর্ণ রহিত করা হলো। আমি সর্বপ্রথম যে রক্তের দাবি রহিত করছি, তা হলো আবদুল মুত্তালিবের নাতি (আমার চাচাতো ভাই) রাবিআর রক্তের দাবি।

হে লোকসকল! যুদ্ধ করার জন্য হারাম মাসগুলোর স্থান বদল করা নিঃসন্দেহে কুফরে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া। এর দ্বারা কাফিরদের গোমরাহ করা হয়। তারা (কোনো একটি মাসকে) এক বছর হালাল বলে গণ্য করে, আরেক বছর তা হারাম ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ যে মাসগুলো হালাল ও হারাম করেছেন, সেগুলোর সংখ্যার সঙ্গে মেলানোর জন্য তারা এমন করে। তারা আল্লাহ তাআলার হারাম করা মাসকে হালাল এবং হালাল করা মাসকে হারাম করে।

হে আমার সাহাবীগণ! আমরা হজ ঠিক তার নির্ধারিত সময়েই আদায় করছি। মাসগুলোর ক্রম এখন ঠিক তেমনই, যেমন ছিল আল্লাহ তাআলা যখন সেগুলো সৃষ্টি করেছিলেন। নিঃসন্দেহে সময় ঘুরে আবার সেই রূপ ও বিন্যাসে ফিরে এসেছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা তা সৃষ্টি করেছিলেন।

“হে আল্লাহ! এই ঘরের মর্যাদা, মহিমা, প্রতাপ ও সম্মান বাড়িয়ে দাও। যারা হজ ও উমরার মাধ্যমে একে সম্মান করে, তাদের মর্যাদা, প্রতাপ, সম্মান ও কল্যাণও বাড়িয়ে দাও” হাদীস শরীফ

হে লোকসকল! আজ শয়তান তোমাদের এই ভূমিতে নতুন করে তার প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার শক্তি চিরতরে হারিয়েছে। কিন্তু আমি যা রহিত করলাম তার বাইরে, যেসব কাজকে তোমরা তুচ্ছ মনে করো, সেগুলোতে যদি তার অনুসরণ করো, তাতে সে খুশি হবে। দ্বীন রক্ষার জন্য এগুলো থেকেও বেঁচে থাকো!

হে লোকসকল! আমি তোমাদের নারীদের অধিকার রক্ষা করার এবং এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা নারীদের আল্লাহ তাআলার আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ; আল্লাহ তাআলার নামে অঙ্গীকার করে তাদের সম্ভ্রম ও সতীত্ব নিজেদের জন্য হালাল করেছ। নারীদের ওপর তোমাদের অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার আছে। নারীদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো, তারা যেন তোমাদের অপছন্দের কাউকে তোমাদের পরিবারের অন্দরমহলের মর্যাদা লঙ্ঘন করতে না দেয়। যদি তারা তোমাদের অসম্মতিতে কাউকে তোমাদের ঘরে ঢুকতে দেয়, তবে তোমরা তাদের হালকাভাবে মেরে বিরত রাখতে পারো। আর তোমাদের ওপর নারীদের অধিকার হলো, শরিয়তসম্মতভাবে তাদের সব ধরনের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা। হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের কাছে একটি আমানত রেখে যাচ্ছি; যতক্ষণ তা আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। সেই আমানত হলো আল্লাহ তাআলার কিতাব পবিত্র কুরআন। (অন্যান্য বর্ণনায় “আমার সুন্নত” ও “আমার আহলে বাইত”ও বলা হয়েছে।)

হে মুমিনগণ! আমার কথা ভালো করে শোনো এবং ভালো করে মনে রাখো! মুসলমান মুসলমানের ভাই; এভাবে সকল মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। দ্বীনি ভাইয়ের কোনো হকে হস্তক্ষেপ করা অন্যের জন্য হালাল নয়, যদি না সে নিজে খুশি মনে তা দেয়। আমার সাহাবীগণ! নিজেদের নফসের প্রতি, অর্থাৎ নিজেদের প্রতি জুলুম কোরো না। তোমাদের ওপর তোমাদের নিজেদেরও হক আছে। হে লোকসকল! আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার হক (পবিত্র কুরআনে) দিয়ে দিয়েছেন। ওয়ারিসের জন্য ওসিয়তের প্রয়োজন নেই। সন্তান যার বিছানায় জন্ম নেয়, সে তারই। ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে বঞ্চনা। যে নিজের বাবা ছাড়া অন্য কাউকে বাবা বলে বংশ দাবি করে, সেই বংশহীন ব্যক্তি, কিংবা যে নিজের মনিব ছাড়া অন্য কাউকে মনিব বলে দাবি করে, সেই অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার গজবে এবং ফেরেশতা ও সকল মুসলমানের লানতে পতিত হোক! মহান আল্লাহ এমন লোকদের তওবাও কবুল করেন না, ন্যায়সংগত সাক্ষ্যও কবুল করেন না। হে লোকসকল! তোমাদের রব এক। তোমাদের পিতাও এক; তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদম মাটি থেকে সৃষ্ট। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে, যার তাকওয়া সবচেয়ে বেশি। অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার মাধ্যমে। কোনো খুঁতওয়ালা কালো দাসকেও যদি তোমাদের আমির নিযুক্ত করা হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব দিয়ে তোমাদের পরিচালনা করে, তবে তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো। অপরাধী নিজের অপরাধ ছাড়া অন্য কিছুর জন্য অভিযুক্ত হবে না। পিতা পুত্রের অপরাধের জন্য, পুত্রও পিতার অপরাধের জন্য অভিযুক্ত হবে না।

হে লোকসকল! সতর্ক থাকো! এই চারটি কাজ কখনো করবে না:

১. আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।

২. আল্লাহ যে প্রাণ হারাম করেছেন, তা অন্যায়ভাবে হত্যা করবে না।

৩. ব্যভিচার করবে না।

৪. চুরি করবে না।

মানুষ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” না বলা পর্যন্ত (অর্থাৎ মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত) তাদের সঙ্গে জিহাদ করার জন্য আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। তারা এ কথা বললে নিজেদের জান ও মাল রক্ষা করে নেয়। আর তাদের হিসাব আল্লাহ তাআলার কাছে। হে লোকসকল! কাল তোমাদের কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে?… সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহ তাআলার দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন, আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, আমাদের ওসিয়ত ও নসিহত করেছেন।” তখন রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুবারক শাহাদাত আঙুল তুলে জনতার দিকে নামিয়ে বললেন, “হে আমার রব! সাক্ষী থাকো! হে আমার রব! সাক্ষী থাকো! হে আমার রব! সাক্ষী থাকো!”

আমাদের প্রিয় নবী যেদিন বিদায় হজের খুতবা দিলেন, সেদিন সূরা মায়িদার তৃতীয় পবিত্র আয়াত নাজিল হলো, যার মর্মার্থ: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে দিয়ে সন্তুষ্ট হলাম…” মহানবী এ পবিত্র আয়াত সাহাবায়ে কেরামকে পড়ে শোনালে হযরত আবু বকর কাঁদতে লাগলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “এই পবিত্র আয়াত রাসূলুল্লাহর ইন্তেকাল নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই কাঁদছি।”1

খুতবার পর তিনি জাবালে রহমতে উকুফ করলেন। মাগরিবের নামাজ আরাফাতে না পড়ে এশার নামাজের সঙ্গে মুজদালিফায় পড়ালেন। সেই রাত তাঁরা মুজদালিফায় কাটালেন। পরদিন সকালে মাশআরুল হারামে উকুফ করলেন। ঈদের প্রথম দিন মুজদালিফা থেকে মিনার দিকে রওনা হলেন। পথে মুহাসসার নামক যে উপত্যকায় আসহাবে ফিল2 থেমেছিল, সেখানে না থেমে অতিক্রম করলেন। মিনায় এলেন; এখানে কুরবানির উটগুলোর ৬৩টি মহানবী নিজ হাতে জবাই করলেন, তারপর ছুরিটি হযরত আলিকে দিলেন। বাকিগুলো হযরত আলি জবাই করলেন। ঈদের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দিন জামরাগুলোতে পাথর নিক্ষেপ করলেন, জিলহজ মাসের চৌদ্দ তারিখ ফজরের নামাজের আগে বাইতুল্লাহয় এসে বিদায়ী তাওয়াফ করলেন। রাসূলুল্লাহ মক্কায় ১০ দিন অবস্থান করলেন; বিদায় হজ ও বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করে মদিনায় ফিরে এলেন। মসজিদে নববিতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে সাদাতখানায় প্রবেশ করলেন। বিদায় হজের পর সাহাবায়ে কেরাম নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ যা জানিয়েছিলেন ও আদেশ করেছিলেন, সেখানকার লোকদের কাছে তা বর্ণনা করলেন।

হিজরতের দশম বছরে সংঘটিত অন্যান্য ঘটনা

হিজরতের দশম বছরের আরেকটি ঘটনা হলো নবুয়তের দাবিদার মিথ্যুকদের আবির্ভাব। তাদের একজন ইয়েমেনে আবির্ভূত আসওয়াদ আনসি। আমাদের প্রিয় নবীর আদেশে ইয়েমেনের মুসলমানরা আসওয়াদ আনসিকে তার নিজের ঘরে হত্যা করলেন। (অন্যজন মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। মহানবীর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর মুসাইলামার বিরুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন। মুসাইলামাকে ওয়াহশি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হত্যা করলেন।)3

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে দিয়ে সন্তুষ্ট হলাম” মায়িদা: ৩

হে জগতের বাদশাহ, হে জল ও স্থলের সুলতান!
হে ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, শেষ ও অতুলনীয় নবী!
“লি মাআল্লাহি ওয়াকতুন” জানিয়ে দেয় তোমার অবস্থার খবর,
দেহের জীবন, জিভের স্বাদ, হৃদয়ের সুলতান – তুমিই।
আহমদ, মুহাম্মদ, মাহমুদ – সর্বদা আল্লাহ তোমার প্রশংসা করেন;
তোমার নামেই পূর্ণ হয় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”।
এই সূক্ষ্ম রহস্য পথভ্রষ্ট বোঝে না, জানেও না!
নিজের নামের সঙ্গে তোমার নাম লিখেছেন রহমান।
তোমাকে যারা ভালোবাসে, সেই গোলামরা হয় সুলতান, হে আমার শাহ!
বসো আমার হৃদয়ের সিংহাসনে, হে অতুলনীয় বাদশাহ!
তোমাকে অনেক ভালোবাসি, যদিও আমার পাপ অনেক!
বিশ্বাস করেছি: প্রেমিকেরা ভাগ পায় তোমার দান থেকে।
কেমন করে না ভালোবাসি – আমার দেহের প্রাণ তুমি,
তোমার সম্মানে আমার সৃষ্টি, আমার জীবনের কারণ তুমি।
আমার শিরার রক্ত তুমি, আমার চেয়েও আমার নিকটে তুমি,
প্রেমিকদের প্রেমাস্পদ তুমি, সকল প্রাণের প্রাণপ্রিয়।
সব দুঃখের ওষুধ তুমি, প্রতিটি রুহের শিফা তুমি,
চোখের সুরমা, মাথার মুকুট, হৃদয়ের ঔজ্জ্বল্য তুমি।
হাবিবুল্লাহ তুমি, ঊর্ধ্বজগতের ফেরেশতাদের চেয়েও ঊর্ধ্বে তুমি,
তোমাকে সামান্য চিনেছে যে, সে আর কোনো দুয়ারে কড়া নাড়ে না।
আউলিয়ার মুরশিদ, আলেমদের পথপ্রদর্শক;
তোমার আগমন আনন্দিত করেছে সাত আসমান ও জমিন।
মানুষ ও জিনের জন্য হকের শেষ নবী!
মাটির নিচে চাপা পড়ুক, যে তোমার দুয়ারের গোলাম নয়!