আমার প্রিয় নবী

বিদায় হজ

হিজরতের দশম বছরে মহানবী হজের প্রস্তুতি নিলেন এবং মদিনার মুসলমানদেরও হজের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিলেন। মদিনার বাইরে থাকা লোকদের কাছেও খবর পাঠালেন। এরপর হাজার হাজার মুসলমান মদিনায় সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ কুরবানির জন্য একশো উট কিনলেন। রওনার আগে তিনি গোসল করলেন। মুবারক চুল আঁচড়ে, সুগন্ধি মেখে ইজার ও চাদর (রিদা) পরলেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আমাদের প্রিয় নবী জিলকদ মাসের ২৫ তারিখে জোহরের নামাজের পর ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষের কাফেলা নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হলেন। শাজারার পথ ধরে তাঁরা জুলহুলাইফায় এলেন। এখানে সাহাবীগণের সংখ্যা চল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে গেল। রাতটি তাঁরা সেখানে কাটালেন। আমাদের প্রিয় নবী সঙ্গে আনা একশো উটের একটিকে কাছে আনালেন। কুরবানির পশুর চিহ্ন হিসেবে সেটির কুঁজের ডান পাশে দাগ টেনে রক্ত বের করলেন, গলায় দুটি কাঠের জুতা ঝুলিয়ে দিলেন এবং সাহাবীগণকেও এমন করতে বললেন। দুই রাকাত ইহরামের নামাজ আদায় করলেন। আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানার পর সরওয়ারে কায়েনাত দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! একে আমার জন্য এমন মাবরুর ও মাকবুল হজ বানিয়ে দাও, যাতে নেই কোনো রিয়া, লোকদেখানো ভাব ও খ্যাতির মোহ!” তিনি ইহরাম বাঁধলেন এবং জিবরাইল আলাইহিস সালাম খবর দেওয়ার পর উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে লাগলেন। সাহাবায়ে কেরামও তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলালে আকাশ-পৃথিবী তালবিয়ার ধ্বনিতে গমগম করে উঠল: “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক! ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক!…”

বাইদার পথ ধরে তাঁরা মালালের দিকে এগোলেন। সাহাবীগণ বন্যার স্রোতের মতো তাঁর পেছনে পেছনে চলছিলেন। পথে যোগদানকারীর সংখ্যা বেড়েই চলছিল। মূসা আলাইহিস সালামসহ প্রায় সত্তরজন নবী যেখানে নামাজ আদায় করেছিলেন, সেই রাওহা উপত্যকায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ বললেন, “এ উপত্যকা জান্নাতের উপত্যকাগুলোর একটি।” এখানে তাঁরা নামাজ আদায় করলেন। তারপর মুনসারাফের দিকে রওনা হয়ে আসাসায় ফজরের নামাজ আদায় করলেন। লাহয়ে জামালে পৌঁছে মহানবী অসুস্থ বোধ করলেন, হিজামা (শিঙা) লাগালেন এবং সুকইয়ায় যাত্রাবিরতি করলেন। তাঁর সম্মানিত মা হযরত আমিনা যেখানে ইন্তেকাল করেছিলেন, সেই আবওয়ায় পৌঁছে তিনি মায়ের কবর জিয়ারত করে কাঁদলেন। সঙ্গীদেরও কাঁদালেন। এরপর তাঁরা তালাআতুল ইয়ামান, জুহফা, গাদিরে খুম, কুদাইদ ও উসফান উপত্যকায় পৌঁছালেন। এখানে মহানবী হযরত আবু বকরকে বললেন, “হুদ ও সালিহ আলাইহিমাস সালাম কোমরে আবা জড়িয়ে, গায়ে ডোরাকাটা কাপড় পরে, খেজুরের আঁশে বোনা লাগামওয়ালা কমবয়সী লাল উটে চড়ে হজের তালবিয়া পাঠ করতে করতে এখান দিয়ে গিয়েছিলেন।”1 গানিম, মাররুজ জাহরান ও সারিফ হয়ে তাঁরা জি-তুওয়ায় এলেন। রাতটি এখানে কাটিয়ে ফজরের নামাজ আদায়ের পর হাজুন পার হয়ে কাদা নামক টিলার দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করলেন। ১০ দিনের সফরের পর তাঁরা জিলহজ মাসের ৪ তারিখে মক্কায় পৌঁছালেন। ইয়েমেন ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে হজ করতে আসা লোকেরা যোগ দেওয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়ে গেল। (এক বর্ণনায় এ সংখ্যা ছিল এক লাখ চৌদ্দ হাজার, আরেক বর্ণনায় প্রায় এক লাখ বিশ হাজার।)

“হে আল্লাহ! একে আমার জন্য এমন মাবরুর ও মাকবুল হজ বানিয়ে দাও, যাতে নেই কোনো রিয়া, লোকদেখানো ভাব ও খ্যাতির মোহ!” হাদীস শরীফ

বাইতুল্লাহ দেখে রাসূলুল্লাহ এই দোয়া করলেন:

“হে আল্লাহ! এই ঘরের মর্যাদা, মহিমা, প্রতাপ ও সম্মান বাড়িয়ে দাও। যারা হজ ও উমরার মাধ্যমে একে সম্মান করে, তাদের মর্যাদা, প্রতাপ, সম্মান ও কল্যাণও বাড়িয়ে দাও।”

এরপর তিনি হজের বিধিবিধান (মানাসিক) পালন শুরু করলেন। হজের পুরো সময় তিনি মক্কা ও মিনার মাঝে আবতাহে খাটানো তাঁবুতে অবস্থান করলেন। আমাদের প্রিয় নবী জিলহজ মাসের ৮ তারিখে (তারবিয়ার দিন) মিনায় এবং ৯ তারিখে (আরাফার দিন) আরাফাতে গেলেন। আরাফাত উপত্যকার মাঝখানে উরানা উপত্যকায় এসে থামলেন। দুপুরের পর কাসওয়া নামের উটনীর পিঠে বসে বিদায় হজের খুতবা দিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কাছ থেকে বিদায় নিলেন।2

তোমার কাছে এলাম!
হে পাপীদের আশ্রয়স্থল, তোমার কাছে আশ্রয় নিতে এলাম!
অনেক অপরাধ করেছি, তোমার কাছে মিনতি করতে এলাম!
অন্ধকার পথে ভুল করে ঢুকেছি, ডুবেছি জলাভূমিতে,
সরল পথ আলোকিত করা নূরের ঝরনার কাছে এলাম।
বাকি আছে বের হওয়ার মতো একটিই প্রাণ, হে সব প্রাণের প্রাণ!
শোভা পায় কি বলা: “প্রাণ কুরবান করতে এলাম”?
ব্যথিতদের চিকিৎসক তুমি, আর আমি মনের রোগী,
হৃদয়ের ক্ষতের ওষুধ খুঁজে তোমার দুয়ারে কড়া নাড়তে এলাম।
দানশীলদের দুয়ারে কিছু নিয়ে যাওয়া ভুল,
পা রেখে তুমি যে মাটিকে সম্মান দিয়েছ, তাতে চুমু দিতে এলাম।
আমার পাপ পাহাড়ের মতো অনেক, মুখ আমার আলকাতরার মতো কালো!
এ বোঝা আর কালিমা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে এলাম।
তোমার দানের সাগরের এক ফোঁটাই নিশ্চয় সব ধুয়ে দেবে,
যদিও মুখের মতোই কালো আমলনামা নিয়ে এলাম।
তোমার দুয়ারে যদি মুখ রাখতে পারতাম, হে প্রাণের চেয়ে প্রিয় প্রিয়তম!
পানিতে যা হয় না, সে কাজ সিদ্ধ হয় সেই মাটিতে!