আমার প্রিয় নবী

হজ ফরজ হওয়া

ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির একটি হজও হিজরতের নবম বছরে ফরজ করা হলো। নাজিল হওয়া পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে: “সেখানে (কাবায়) রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, মাকামে ইবরাহিম। যে সেখানে প্রবেশ করে, সে আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকে। মানুষের মধ্যে সেখানে যাওয়ার পথের সামর্থ্য যার আছে (যে সক্ষম), সেই ঘরের হজ (ও জিয়ারত) করা তার ওপর আল্লাহ তাআলার একটি হক, একটি ফরজ। যে এই ফরজ অস্বীকার করে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সমগ্র জগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী (কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন)।”1 বিশ্বজগতের গৌরব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তাআলার এই আদেশ সাহাবীগণকে জানালেন। তিনি নিজে জিলকদ মাসের শেষে হজ করতে চাইলেন। কিন্তু মুশরিকরা বিবস্ত্র হয়ে তাওয়াফ করে – এই খবর পেয়ে তিনি এমন অবস্থায় তাদের সঙ্গে একত্রে থাকা সমীচীন মনে করলেন না। হজের বিধিবিধান (মানাসিক) শেখানোর জন্য হযরত আবু বকরকে হজের আমির নিযুক্ত করলেন।

হযরত আবু বকর ও হযরত আলিকে হজে পাঠানো

সে বছর সাহাবায়ে কেরাম হযরত আবু বকরের নেতৃত্বে তিনশোজনের একটি কাফেলা হয়ে মক্কায় গেলেন। এ সময় সূরা বারাআতের প্রথম দিকের পবিত্র আয়াতগুলো নাজিল হলো। এতে চুক্তি সম্পর্কে কিছু বিধান জানানো হলো। আমাদের প্রিয় নবী এ বিধানগুলো ঘোষণা করার জন্য হযরত আলিকেও মক্কায় পাঠালেন।2

সে সময় আরবদের মধ্যে প্রচলিত একটি রীতি ছিল: কোনো চুক্তি সম্পাদিত হলে বা সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ হলে, যে চুক্তি করেছে, সে নিজে কিংবা তার নির্ধারিত কোনো আত্মীয় তা ঘোষণা করত। মহানবী এ কাজের জন্য হযরত আলিকে হজ কাফেলার পেছনে পেছনে মক্কায় পাঠালেন। হযরত আলি কাফেলার সঙ্গে মিলিত হলেন এবং তাঁরা একসঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করলেন।3 হযরত আবু বকর একটি খুতবা দিলেন এবং হজের ইবাদত বুঝিয়ে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম (আলাইহিমুর রিদওয়ান) শেখানো নিয়ম অনুযায়ী হজ আদায় করলেন। হজের ইবাদত চলার সময় হযরত আলিও মিনায় “জামরাতুল আকাবা” নামক স্থানে একটি খুতবা দিলেন। তিনি খুতবা এভাবে শুরু করলেন:

“হে লোকসকল! আমাকে রাসূলুল্লাহ তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।” তারপর তিনি সূরা বারাআতের প্রথম পবিত্র আয়াত পাঠ করলেন। এরপর বললেন, “আমাকে তোমাদের চারটি বিষয় জানানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে।” বিষয় চারটি ছিল এই:

১. মুমিনরা ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

২. এ বছরের পর কোনো মুশরিক কাবার কাছে আসতে পারবে না।

৩. কেউ বিবস্ত্র হয়ে কাবা তাওয়াফ করবে না। (সে সময় মুশরিকরা বিবস্ত্র অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করত।)

৪. রাসূলুল্লাহর সঙ্গে যার চুক্তি আছে, মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। অন্যদের চার মাসের অবকাশ দেওয়া হলো। এরপর কোনো মুশরিকের জন্য কোনো চুক্তিও নেই, নিরাপত্তাও নেই।

“সেখানে (কাবায়) রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, মাকামে ইবরাহিম। যে সেখানে প্রবেশ করে, সে আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকে। মানুষের মধ্যে সেখানে যাওয়ার পথের সামর্থ্য যার আছে (যে সক্ষম), সেই ঘরের হজ (ও জিয়ারত) করা তার ওপর আল্লাহ তাআলার একটি হক, একটি ফরজ” আলে ইমরান: ৯৭

সেদিনের পর কোনো মুশরিক আর কাবায় আসেনি এবং কেউ বিবস্ত্র হয়ে কাবা তাওয়াফ করেনি। এ বিষয়গুলো ঘোষণার পর মুশরিকদের বেশির ভাগ মুসলমান হয়ে গেল। হজের ফরজ আদায়ের পর হযরত আবু বকর ও হযরত আলি সঙ্গের সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।4

ইয়েমেনে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সারিয়্যা

আমাদের প্রিয় নবী হিজরতের দশম বছরে, রবিউল আউয়াল মাসে খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে চারশো মুজাহিদসহ ইয়েমেনের কাছে বসবাসকারী বনু হারিস ইবনে কাবকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পাঠালেন। রাসূলুল্লাহর আদেশ অনুযায়ী হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এ গোত্রকে টানা তিন দিন ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাঁরাও দাওয়াতে সাড়া দিয়ে মুসলমান হলেন।

সূর্যের ঝরনা থেকে সারাক্ষণ ঝরে ফয়েজের নির্মল পানি,
তোমার কবর নতুন করে গড়ার কারিগরের যদি লাগে পানি।
জাহান্নামের ভয় দুঃখের আগুন জ্বেলেছে দগ্ধ হৃদয়ে;
আশা আমার, তোমার দানের মেঘ সেই আগুনে ঢালুক পানি।
তোমার নাতের বরকতে ফুজুলির কথা হয়েছে রত্ন,
যেমন বসন্তের মেঘ থেকে ঝরে রাজকীয় মুক্তা হয় পানি।
হাশরের দিনে যখন সবাই উঠবে গাফলতের ঘুম ভেঙে,
জাগ্রত চোখগুলো বিরহের অশ্রুতে যখন ঝরাবে পানি,
আশা আমার, হাশরের দিন যেন বঞ্চিত না হই আমি,
তোমার দর্শনপিয়াসী আমাকে মিলনের ঝরনা দিক পানি।
Fuzûlî

হিজরতের দশম বছরে সংঘটিত ঘটনাবলি

হিজরতের দশম বছরে ইসলাম গোটা আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়ল। নবম বছরের মতো এ বছরও আরবের সব প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে মদিনায় আসছিলেন; মুসলমান হওয়ার মর্যাদা ও চিরস্থায়ী সৌভাগ্য লাভের জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছিলেন। তখন আরব দেশে মুসলমানদের মোকাবিলা করার মতো আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না; ইসলাম সর্বত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। কেবল কিছু ইহুদি ও খ্রিস্টান গোত্র মুসলমান হয়নি।

সে বছরই রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাজরানের খ্রিস্টানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা চৌদ্দজনকে বাছাই করে রাসূলুল্লাহর অবস্থা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের জন্য মদিনায় পাঠাল। প্রতিনিধিদল কিছুদিন পর একটি সন্ধিচুক্তি করল। তাদের কয়েকজন পরে স্বেচ্ছায় মুসলমান হলেন। সে বছর ইয়েমেনের শাসনকর্তা বাজান ইন্তেকাল করলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর এলে রাসূলুল্লাহ তাঁর রাজ্য ভাগ করে একাংশ তাঁর ছেলে শাহরকে, একাংশ আবু মূসা আশআরিকে, একাংশ ইয়ালা ইবনে উমাইয়াকে এবং একাংশ মুআজ ইবনে জাবালকে দিলেন।

মহানবী এ বছর ইসলাম ছড়িয়ে পড়া সব জনপদে শাসনকর্তা পাঠালেন। হযরত আলিকেও তিনশোজন সাথি নিয়ে ইয়েমেনের মুদলিজ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য পাঠানো হলো। প্রথমে তারা বিরোধিতা করে ইসলামি বাহিনীর দিকে তির ছুড়ল। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেওয়া হলো। বিশজন নিহত হলো। বেশির ভাগ ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেল। হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাহাবীগণকে শত্রুর পিছু ধাওয়া করতে দিলেন না। তাদের নসিহত করে আবার ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা তা গ্রহণ করে ঈমান আনল। হযরত আলি ও সাহাবীগণ সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত মদিনার দিকে রওনা হলেন এবং মক্কায় গিয়ে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে মিলিত হলেন। নবম বছরের মতো এ বছরও দূতদের আগমন অব্যাহত রইল। তাঁদের একজন গামিদের, আরেকজন বনু হানিফার দূত। তাঁরা রাসূলুল্লাহর মজলিসে এসে মুসলমান হলেন।

নাজাশির বোনের ছেলে ফিরোজ এসে মুসলমান হলেন। আবদুল কাইস থেকেও একটি প্রতিনিধিদল এসে মুসলমান হলেন।

সে বছর রাসূলুল্লাহর পুত্র ইবরাহিম দেড় বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেন। এই কলিজার টুকরাকে হারিয়ে রাসূলুল্লাহর মুবারক চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। হযরত ইবরাহিমকে বাকি কবরস্থানে উসমান ইবনে মাজউনের পাশে দাফন করা হলো। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর কবরের ওপর পানি ছিটানো হয়েছিল।5

অসহায় তোমার উম্মত; তাদের পাপের দিকে তাকিয়ো না,
হাত নেড়ে ফিরিয়ে দিয়ে বিরহে জাহান্নামে পুড়িয়ো না।
দয়া করো, আমান! বিচ্ছেদের আগুনে আমাদের পুড়িয়ো না;
মোটকথা, পাপে ভরা গোলাম গালিবকে ছেড়ে দিয়ো না।
তুমি আহমদ, মাহমুদ ও মুহাম্মদ, হে আমার সরদার,
হকের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যপ্রাপ্ত সুলতান তুমি, হে আমার সরদার।
Şeyh Galib

“মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো। মজলুমের দোয়া ও মহান হক তাআলার মাঝে কোনো পর্দা নেই” হাদীস শরীফ

আরব উপদ্বীপে ইসলামের প্রসার