তাবুক অভিযান
তাবুক মদিনা মুনাওয়ারা ও দামেস্ক শহরের মাঝামাঝি অবস্থিত একটি সুপরিচিত স্থান। কেউ কেউ বলেছেন, এটি একটি ঝরনার নাম। এ সফর মহানবীর শেষ সফর হওয়ায় একে “তাবুক গাজওয়া” বলা হয়েছে। একে “ফাদিহা”ও বলা হয়, কেননা এ যুদ্ধে মুনাফিকরা লাঞ্ছিত হয়েছিল। একে “জাইশুল উসরা”ও বলা হয়। এ সফরে মুসলমানরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছিলেন। তা ছাড়া পথ ছিল দীর্ঘ, আবহাওয়া ছিল প্রচণ্ড গরম। শত্রুসৈন্য ছিল সংখ্যায় অনেক এবং শক্তিশালী। তখন ছিল দুর্ভিক্ষের সময়। দশজন মানুষ পালা করে একটি উটে চড়তেন। বেশির ভাগ সৈন্য এক মাস খেজুর ছাড়া আর কিছুই খাননি। কখনো তাঁরা ভাজা যব খেতেন। কখনো তা-ও পেতেন না। হিজরতের নবম বছরের রজব মাসে এক বৃহস্পতিবার তাঁরা তাবুক সফরে রওনা হন।
আরব উপদ্বীপে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এই নবম বছরে খ্রিস্টান আরবরা বাইজান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে চিঠি লিখল; এই সম্রাট “ইসলামি রাষ্ট্রের” প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিল এবং এর বিস্তার রোধ করতে চাইছিল। তারা লিখেছিল, “নবুয়তের দাবি নিয়ে আবির্ভূত সেই লোকটি মারা গেছে। মুসলমানরা এখন দুর্ভিক্ষ ও অভাবের মধ্যে আছে। তুমি যদি তাদের তোমার ধর্মে ফিরিয়ে আনতে চাও, এখনই উপযুক্ত সময়।” এ চিঠির পর হিরাক্লিয়াস মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য কুবাদের নেতৃত্বে চল্লিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী পাঠাল। এ খবর পেয়ে ফখরে কায়েনাত সাহাবীগণকে একত্র করলেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আদেশ দিলেন। সে বছর খরা হওয়ায় সাহাবীগণ আর্থিক দিক থেকে ভীষণ টানাটানির মধ্যে ছিলেন। কেবল ব্যবসায়ীদের অবস্থা কিছুটা ভালো ছিল। ইসলামি বাহিনী ছিল বিশাল। খাদ্যসামগ্রী ও যুদ্ধসরঞ্জাম ছিল সামান্য। সামনে কষ্ট পোহাতে হবে। মহানবী চাইলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের সাজসরঞ্জামের জন্য সাহাবীগণ আর্থিক সাহায্য করুন। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ইচ্ছা সাহাবীগণকে উদ্দীপ্ত করল। প্রত্যেকে হাতে যা ছিল, তা-ই নিয়ে আসছিলেন; জান ও মাল দিয়ে জিহাদের প্রস্তুতি নিতে চেষ্টা করছিলেন।
মহানবীর গুহার সঙ্গী হযরত আবু বকর তাঁর সমস্ত সম্পদ নিয়ে এলেন। রাসূলে আকরাম জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু বকর! পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?” তিনি উত্তর দিলেন, “আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।” হযরত উমর তাঁর সম্পদের অর্ধেক সাহায্য হিসেবে নিয়ে এলেন। মহানবী তাঁকেও জিজ্ঞেস করলেন, “হে উমর! পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?” তিনি উত্তর দিলেন, “যতটুকু এনেছি, ততটুকুই রেখে এসেছি।” মহানবী বললেন, “তোমাদের দুজনের মধ্যে পার্থক্য তোমাদের কথার মধ্যকার পার্থক্যের মতোই।” এরপর হযরত উমর হযরত আবু বকরের প্রশংসা করে বললেন, “হে আবু বকর! আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! কল্যাণের পথে সব প্রতিযোগিতায় আপনি আমাকে ছাড়িয়ে যান। এখন ভালো করে বুঝলাম, কোনো কিছুতেই আমি আপনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারব না।”1 সাহাবায়ে কেরাম সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মুনাফিকরা “তোমরা লোক দেখানোর জন্য দিচ্ছ” বলে তাঁদের নিয়ে উপহাস করছিল। মহানবী বললেন, “আজ যে একটি সদকা দেবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে তার সেই সদকা তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।” মহানবীর এই বরকতময় কথার পর মুমিনরা আরও বেশি সাহায্য করতে লাগলেন। হযরত উসমান ইবনে আফফান বাহিনীর অর্ধেকের সাজসরঞ্জামের ব্যবস্থা করলেন।2 উসমান জুন্নুরাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এ বাহিনীকে সমস্ত সরঞ্জামসহ নয়শো পঞ্চাশটি উট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া দিলেন, এগুলোর আরোহীদের সাজসরঞ্জামের ব্যয়ও বহন করলেন; এ ছাড়া আরও দশ হাজার দিনার, অথবা সাতশো রুকিয়া স্বর্ণ পাঠালেন।3 এভাবে তিনি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাহায্যকারী হলেন। হযরত উসমান বাহিনীর প্রয়োজন এমনভাবে পূরণ করেছিলেন যে, পানির মশক মেরামতে যে বড় সুই দরকার হয়, তা-ও দিতে ভোলেননি। তাঁর এ সাহায্যের পর রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আজকের পর থেকে উসমানের নামে কোনো গুনাহ লেখা হবে না।”4 আর্থিক অবস্থা খুবই দুর্বল এক সাহাবী জিহাদে সাহায্যের সওয়াব লাভের জন্য সেই রাতে ভোর পর্যন্ত একটি খেজুর বাগানে পানি তুললেন। পারিশ্রমিক হিসেবে যে খেজুর পেলেন, তা মহানবীর কাছে নিয়ে এলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য হাতে যা ছিল, তা নিয়ে এসেছি। কবুল করুন।”
“হে উমর! তোমাদের দুজনের (আবু বকর ও তোমার) মধ্যে পার্থক্য তোমাদের কথার মধ্যকার পার্থক্যের মতোই” হাদীস শরীফ
মুসলমান পুরুষরা সাধ্যমতো সাহায্যের চেষ্টা করছিলেন, আর নারীরাও এ পথে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছিলেন। তাবুক সফরের প্রস্তুতির সময় মুসলমানরা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে ছিলেন। দুর্ভিক্ষ এত তীব্র ছিল যে, যাঁদের হাতে কিছুই ছিল না, এমন অনেক সাহাবী রাসূলুল্লাহর দরবারে এসে বলতেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কোনো বাহন নেই! খাওয়ার মতোও কিছু নেই! এই যুদ্ধে আপনার সঙ্গ না ছেড়ে জিহাদের সওয়াব লাভ করতে চাই।” আমাদের প্রিয় নবী দুঃখের সঙ্গে তাঁদের জানাতেন যে, তাঁদের চড়ানোর মতো কোনো বাহন আর নেই। একবার সালিম ইবনে উমাইর, আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল, আবু লাইলা মাজিনি, উলবা ইবনে জায়েদ, আমর ইবনে হুমাম, হারামি ইবনে আবদুল্লাহ ও ইরবাদ ইবনে সারিয়া একই আবেদন নিয়ে আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে এলেন। মহানবী গভীর দুঃখের সঙ্গে তাঁদের বললেন, “তোমাদের চড়ানোর মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না।” তখন মহানবীর সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হওয়া ও জিহাদে অংশ নিতে না পারার দুঃখে তাঁরা কাঁদতে লাগলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা এই পবিত্র আয়াত নাজিল করলেন, যার মর্মার্থ: “(হে আমার রাসূল!) তারা (জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য) যখন তোমার কাছে এসেছিল, তুমি তাদের বলেছিলে, ‘তোমাদের বাহন দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই।’ এ পথে ব্যয় করার মতো কিছু তাদের না থাকায় (যুদ্ধে অংশ নিতে না পারায়) তারা দুঃখে অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে ফিরে গেল। তাদের ওপর কোনো দায় (গুনাহ) নেই।”5 অবশেষে হযরত আব্বাস ও হযরত উসমান তাঁদেরও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে দিলেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে মহানবী বাহিনীকে সানিয়্যাতুল ওয়াদায় সমবেত করলেন। যুদ্ধে অংশ নেননি এমন কেউ ছিলেন না বললেই চলে। বাহিনী সমবেত করে রওনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রাসূলে আকরাম মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাকে রেখে গেলেন।6 সফর শুরুর সময় মহানবী বললেন, “সঙ্গে অতিরিক্ত জুতাও নাও। যতক্ষণ তোমাদের কাছে অতিরিক্ত জুতা থাকবে, ততক্ষণ কষ্ট পাবে না।”
বাহিনী রওনা হলে মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মুসলমানদের ভয় দেখানোর জন্য আজগুবি কথাবার্তা বলল। এমনকি সে এ কথাও বলল, “কসম করে বলছি, আমি যেন তাঁকে ও তাঁর সাহাবীদের দুজন দুজন করে দড়িতে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি…” কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম এসব কথায় মোটেও কান দিচ্ছিলেন না; জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁদের উদ্দীপনা দিন দিন বেড়েই চলছিল। এ দেখে মুনাফিকরা আক্রোশে জ্বলেপুড়ে মরছিল। রাসূলুল্লাহ সানিয়্যাতুল ওয়াদা থেকে তাবুকের পথে রওনার আগে বাহিনীর পতাকাগুলো (ঝান্ডা ও নিশান) খুলে উড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। বড় পতাকাটি হযরত আবু বকরকে এবং একটি পতাকা হযরত জুবাইর ইবনে আওয়ামকে দিলেন। আওস গোত্রের পতাকা উসাইদ ইবনে হুদাইরকে, খাজরাজ গোত্রের পতাকা আবু দুজানাকে দিলেন।7 মহানবীর নেতৃত্বাধীন সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার, যাঁদের মধ্যে দশ হাজার ছিলেন অশ্বারোহী। ডান বাহুর সেনাপতি নিযুক্ত হলেন হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, বাম বাহুর হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ।8 গৌরবময় সাহাবীগণ প্রচণ্ড গরমের মধ্যে নিজেদের নবীর নেতৃত্বে রওনা হলেন। তাঁদের সামনে যখন আল্লাহ তাআলার হাবিব, তখন খাদ্য-পানীয়ের অভাব তাঁদের পথ থেকে ফেরাতে পারত না; গন্তব্যের দূরত্ব, শত্রুসৈন্যের সংখ্যাধিক্যও তাঁদের মনে ভয় জাগাতে পারত না। এ অবস্থায় যেকোনো জায়গায় যাওয়া যেত। আমাদের প্রিয় নবী ও বীর সাহাবীগণ প্রতিটি মনজিলে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার পথ চলতেন। তাঁদের অষ্টম মনজিল ছিল হিজর, যেখানে সালিহ আলাইহিস সালামের কওম ধ্বংস হয়েছিল। তারা নিজেদের নবীর আদেশ মানেনি বলে আল্লাহ তাআলা এক প্রচণ্ড সাইহা, অর্থাৎ বিকট আওয়াজ দিয়ে তাদের ধ্বংস করেছিলেন। বিশ্বজগতের সুলতান সাহাবীগণকে বললেন, “আজ রাতে উল্টো দিক থেকে প্রবল ঝড় বইবে। সঙ্গী ছাড়া কেউ যেন জায়গা ছেড়ে না ওঠে। প্রত্যেকে নিজের উটের হাঁটু বেঁধে রাখো। এটি আজাব নাজিল হওয়ার জায়গা। কেউ যেন এই পানি পান না করে এবং এ দিয়ে অজু না করে!…” সবাই এ আদেশ মেনে চললেন। রাতে প্রবল ঝড় উঠল এবং চারদিক লন্ডভন্ড করে দিতে লাগল। এ সময় এক ব্যক্তি, যে উট বাঁধতে অবহেলা করেছিল, উট খুঁজতে একা উঠে দাঁড়াল; অমনি ঝড় তাকে উড়িয়ে নিয়ে তায়ি পাহাড়ের পাদদেশে ফেলে দিল। আরেক ব্যক্তি প্রাকৃতিক প্রয়োজনের তীব্র চাপে একা বাইরে গেল; সেখানে সে হুন্নাক (হুপিং কাশি) নামক রোগে আক্রান্ত হলো। মহানবীর দোয়ায় সে আবার সুস্থ হয়ে উঠল।
সেদিন সকালে পানির পাত্রগুলোতে এক ফোঁটা পানিও ছিল না। পিপাসায় সবাই মরণাপন্ন হয়ে পড়েছিলেন। মুনাফিকরা এটিকে সুযোগ মনে করে ফিতনা সৃষ্টির চেষ্টা করল। তারা বলল, “মুহাম্মদ সত্যিই নবী হলে দোয়া করে বৃষ্টি নামাত।”
বিষয়টি জগৎসমূহের সরদারকে জানানো হলে তিনি মুবারক হাত তুললেন এবং বৃষ্টি দান করার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করলেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মেঘহীন আকাশে তখনই বৃষ্টির মেঘ দেখা দিল। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। সবাই পাত্র ভরে নিলেন, অজু করলেন এবং পশুগুলোকে পানি পান করালেন। বৃষ্টি থেমে মেঘ সরে গেলে দেখা গেল, বৃষ্টি কেবল বাহিনীর ওপরই বর্ষিত হয়েছে।
“আজ যে একটি সদকা দেবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে তার সেই সদকা তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে” হাদীস শরীফ
তাবুক অভিযান
আমাদের প্রিয় নবী ও সাহাবীগণ তাকবির দিলেন। আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন। আর মুনাফিকদের বললেন, “এখন তোমাদের আর কোনো অজুহাত রইল না। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো এবং নেককার মুসলমান হয়ে যাও!…” কিন্তু নির্লজ্জ মুনাফিকরা জবাব দিল, “কী এমন হয়েছে?… এক টুকরো মেঘ যেতে যেতে বর্ষণ করে চলে গেছে!…” ক্ষুধাও চরমে পৌঁছেছিল; এমন অবস্থা হয়েছিল যে, দুজন মানুষ একটি খেজুর ভাগ করে খেতেন। প্রচণ্ড গরম, ক্ষুধা ও পিপাসা সত্ত্বেও তাঁরা তাবুকের কাছে এসে পৌঁছালেন। হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল চাশতের সময় তোমরা তাবুকের ঝরনায় পৌঁছাবে। আমি না আসা পর্যন্ত সেই পানিতে হাত দেবে না।” পরদিন তাঁরা সেখানে পৌঁছালেন। ঝরনার পানি ছিল খুবই কম। আমাদের প্রিয় নবী সেই পানি থেকে কিছুটা একটি পাত্রে তুলিয়ে নিলেন, তাতে মুবারক হাত ডুবিয়ে দোয়া করলেন। তারপর পানিটুকু আবার ঝরনায় ঢেলে দেওয়া হলো। মুহূর্তের মধ্যে পানি উপচে উঠে বেড়ে গেল। ত্রিশ হাজার সৈন্যের ইসলামি বাহিনী পান করার পরও পানি একটুও কমল না। পরে ফখরে কায়েনাতের মুজিযাস্বরূপ এই পানি দিয়ে আশপাশের সব জমিতে সেচ দেওয়া হলো। সেই অঞ্চল সবুজে ঢাকা, বরকতে উপচে পড়া এক প্রান্তরে পরিণত হলো। রাসূলে আকরাম গৌরবময় সাহাবীগণকে নিয়ে তাবুকে পৌঁছে দেখলেন, বাইজান্টাইনদের এবং আমিলা, লাখম ও জুজামের মতো খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত আরব গোত্রগুলো নিয়ে গঠিত বাইজান্টাইন বাহিনী সেখানে নেই। মুতায় তিন হাজার মুজাহিদের বিরুদ্ধে এক লাখ সৈন্যের বাইজান্টাইন বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। আর এখন তাদের সামনে ছিলেন ত্রিশ হাজার মুজাহিদ, যাঁদের সেনাপতি ছিলেন বিশ্বজগতের সরদার। আমাদের প্রিয় নবী বীর সাহাবীগণকে নিয়ে আসছেন শুনে বাইজান্টাইনদের প্রত্যেকে পালানোর জায়গা খুঁজতে লাগল।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করে তাবুক থেকে আর সামনে গেলেন না। এ সময় সেই অঞ্চলে বসবাসকারী কিছু গোত্র ও রাষ্ট্র ইসলামি বাহিনীর আগমনের খবর শুনল। ভয়ে তারা মহানবীর কাছে একেকটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে জিজিয়া দেওয়ার শর্তে নিরাপত্তা (আমান) প্রার্থনা করল। মহানবী দয়া করে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন; প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তির ধারা লেখা হলো এবং তাদের জানিয়ে দেওয়া হলো যে, তারা নিরাপদ।
সরওয়ারে কায়েনাত (আলাইহি আফজালুস সালাওয়াত) প্রায় বিশ দিন শত্রুর জন্য অপেক্ষা করলেন। তাবুকে তিনি সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে দীর্ঘ সময় সোহবতে কাটালেন, তাঁদের হৃদয়কে নূরের সাগরে ধুয়ে দিলেন। তাঁর মুবারক অন্তর থেকে উৎসারিত ফয়েজ ও বরকত তাঁদের অন্তরে প্রবাহিত করলেন। তাঁর অতুলনীয় মজলিসগুলোর একটিতে তিনি বললেন, “মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে মর্যাদাবান কে, তা কি তোমাদের জানাব?” সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “হ্যাঁ, জানিয়ে দিন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!”
তখন তিনি বললেন, “মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে ঘোড়া বা উটের পিঠে কিংবা নিজের দুই পায়ে ভর করে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পথে কাজ করে যায়। আর মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট সেই অবাধ্য ব্যক্তি, যে আল্লাহ তাআলার কিতাব পড়ে অথচ তা থেকে কোনো উপকার লাভ করে না।”
এক ব্যক্তি শাহাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “যাঁর কুদরতের হাতে আমার অস্তিত্ব, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, শহিদগণ কিয়ামতের দিন গলায় তরবারি ঝুলিয়ে আসবেন। তাঁরা নূরের মিম্বরের ওপর বসবেন।”9
এ যুদ্ধে মহানবীর অনেক মুজিযা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন, তাবুক থেকে মদিনায় ফেরার প্রস্তুতির সময় ক্ষুধায় কাতর সাহাবীগণ মহানবীকে নিজেদের অবস্থা জানালেন। রাসূলুল্লাহ তাঁদের অবশিষ্ট খাবার একটি চামড়ার দস্তরখানে জড়ো করালেন। সব মিলিয়ে তা দিয়ে একটি ছোট হাঁড়িও কোনোমতে ভরল। সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অজু নবায়ন করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। মুবারক হাত তুলে খাবারে বরকতের জন্য দোয়া করলেন। তারপর সাহাবীগণকে নিজ নিজ পাত্র আনতে বললেন। বিশাল বাহিনীর একটি পাত্রও খালি রইল না, সবগুলো ভরে দেওয়া হলো। তা ছাড়া সব মুজাহিদ পেট ভরে খাওয়ার পরও দেখা গেল, দস্তরখানের খাবার একটুও কমেনি।
“ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল চাশতের সময় তোমরা তাবুকের ঝরনায় পৌঁছাবে। আমি না আসা পর্যন্ত সেই পানিতে হাত দেবে না” হাদীস শরীফ
দুমাতুল জান্দালে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সারিয়্যা
হযরত হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাবুকে থাকার সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দুমাতুল জান্দালে পাঠালেন। সেখানকার শাসক উকাইদির ইবনে আবদুল মালিক ছিল খ্রিস্টান। ইসলামি বাহিনী দুর্গের কাছে এসে ওত পেতে রইল। দুর্গের ফটকে একটি বুনো গরু এসেছে শুনে উকাইদির সেটিকে শিকার করতে ঘোড়ায় চড়ে তার পিছু নিল। উকাইদির, তার ভাই হাসসান ও তাদের লোকজন যখন শিকারে ব্যস্ত, তখন মুজাহিদরা তাদের ঘিরে ফেললেন। হাসসান তরবারির দিকে হাত বাড়াতেই নিহত হলো। উকাইদির বন্দি হলো। বাকিরা পালিয়ে দুর্গে আশ্রয় নিল। হযরত খালিদ উকাইদিরকে বললেন, “আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি এবং তোমাকে রাসূলুল্লাহর দরবারে নিয়ে যাব। তবে শর্ত হলো, তুমি দুর্গে ঢুকে দুই হাজার উট, আটশো ঘোড়া, আটশো ঢাল ও চারশো বর্শা হস্তান্তর করবে। শাসনক্ষমতা তোমার হাতেই থাকবে।” উকাইদির রাজি হলো। মুজাহিদরা দুর্গে ঢুকে গনিমত নিলেন এবং মদিনায় ফিরে এলেন। উকাইদির ও তাঁর ভাই হাসার মহান দরবারে হাজির হয়ে ঈমান আনলেন এবং মুসলমান হলেন।
ফাঁদ
মুজাহিদরা তাবুক ত্যাগ করে মদিনার পথ ধরলেন। মুনাফিকরা আমাদের প্রিয় নবীর জন্য ফাঁদ পেতে তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করল। এক রাতে তারা ইসলামি বাহিনীর চলার পথে একটি সরু গিরিপথে ওত পেতে অপেক্ষা করতে লাগল। মহানবীর উটের লাগাম ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির, আর পেছনে আসছিলেন হযরত হুজাইফা ইবনে ইয়ামান। জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবীকে জানিয়ে দিলেন যে, মুনাফিকরা পরামর্শ করে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। মহানবী গিরিপথের কাছে পৌঁছে বাহিনীকে বললেন, “তোমরা উপত্যকার ভেতর দিয়ে যাও; সে পথ তোমাদের জন্য সহজও, প্রশস্তও।” তিনি নিজে সরু গিরিপথের দিকে এগোলেন, আর বাহিনী উপত্যকার ভেতর দিয়ে পথ চলল। রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গিরিপথের কাছে এলে মুনাফিকদের সেই দলটি মুখ ঢেকে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হযরত হুজাইফা চিৎকার করে উঠলেন, “হে আল্লাহ তাআলার দুশমনরা!” এবং হাতের লাঠি দিয়ে মুনাফিক ও তাদের পশুগুলোকে আঘাত করতে লাগলেন। এই হইচইয়ে ভয় পেয়ে বারোজন মুনাফিক সঙ্গে সঙ্গে সৈন্যদের ভিড়ে মিশে গেল। রাসূলুল্লাহ তাদের নাম হযরত হুজাইফাকে জানালেন এবং অন্য কাউকে না বলতে নির্দেশ দিলেন।
ঘটনা শুনে হযরত উসাইদ ইবনে হুদাইর দরবারে এলেন এবং অনেক অনুনয় করে মহানবীকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক! তাদের নাম আমাকে বলে দিন, আমি তাদের মাথা আপনার কাছে এনে দেব!” কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুমতি দিলেন না।10
মসজিদে জিরার
অবশেষে আমাদের প্রিয় নবী ও তাঁর বীর সাহাবীগণ বাইজান্টাইনদের মনে ভীতি সঞ্চার করে, তাদের প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে নূরানি মদিনার কাছে এসে পৌঁছালেন। বিশ্বজগতের সুলতান মদিনার খুব কাছে জি-আওয়ান নামক স্থানে সাহাবীগণকে যাত্রাবিরতি করে বিশ্রাম নিতে বললেন। সাহাবীগণ বিশ্রাম নেওয়ার সময় কয়েকজন মুনাফিক আমাদের প্রিয় নবীর কাছে এসে তাঁকে মসজিদে জিরারে তাশরিফ আনার অনুরোধ করল। মসজিদে জিরার ছিল কুবায়। রাসূলুল্লাহ মদিনায় হিজরতের সময় কুবায় যে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন, মুনাফিকরা তার মোকাবিলায় এটি নির্মাণ করেছিল। আমাদের প্রিয় নবী সাহাবীগণকে নিয়ে তাবুকে যাওয়ার সময় মুনাফিকরা দরবারে এসে এই বলে দাওয়াত দিয়েছিল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা একটি নতুন মসজিদ বানিয়েছি; তাশরিফ এনে আমাদের নামাজ পড়িয়ে দেবেন কি?” কিন্তু জগৎসমূহের সরদার তখন সফরে বের হচ্ছিলেন; তিনি বলেছিলেন, নসিবে থাকলে তাবুক থেকে ফেরার পথে সেখানে যেতে পারবেন।
মুনাফিকদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের জামাআতকে বিভক্ত করা, তাদের নিজেদের হীন স্বার্থের হাতিয়ার বানানো এবং ফিতনা সৃষ্টি করে মুসলমানদের একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া। এমনকি তারা বাইজান্টাইন বাহিনীকে মদিনায় ডেকে এনে এই মসজিদে মজুদ করা অস্ত্র দিয়ে তাদের সাহায্য করার পরিকল্পনা করছিল। মহানবী সেখানে নামাজ আদায় করলে মসজিদে জিরার একটি পবিত্র স্থান – এমন ধারণা তৈরি হতো। ফলে মুসলমানরা সেখানে নামাজ পড়ার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন এবং মুনাফিকদের ধারণামতে তাদের জালে আটকা পড়তেন!… সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুনাফিকদের এ দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন, যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা সূরা তাওবার ১০৭ ও ১০৮তম পবিত্র আয়াত নাজিল করে বিষয়টির আসল রূপ জানিয়ে দিলেন। এরপর জগৎসমূহের সরদার মালিক ইবনে দুখশুম ও আসিম ইবনে আদিকে বললেন, “যার লোকেরা জালিম, সেই মসজিদে যাও। সেটি ভেঙে ফেলো, পুড়িয়ে দাও!” তাঁরা মাগরিব ও এশার মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। তারপর সেটি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন। মুনাফিকদের মুখ থেকে টুঁ শব্দটিও বের হলো না।11 মহানবী ও তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণ আসছেন শুনে মদিনাবাসীরা সঙ্গে সঙ্গে জড়ো হলেন এবং গভীর আবেগ নিয়ে তাঁদের স্বাগত জানাতে বেরিয়ে এলেন…
আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মৃত্যু
আমাদের প্রিয় নবী তাবুক সফর থেকে ফেরার দুই মাস পর, শাওয়াল মাসে মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মারা গেল। এরপর মুনাফিকদের ঐক্য ভেঙে গেল, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।12 এভাবে আরব দেশে কেবল মুনাফিকদেরই নয়, মুশরিক ও ইহুদিদেরও মাথা চূর্ণ হলো; ইসলামের বিরোধিতা ও এর পথে বাধা সৃষ্টির সব তৎপরতা স্তিমিত হয়ে গেল।
হিজরতের নবম বছরে সংঘটিত অন্যান্য ঘটনা
রাসূলুল্লাহ তাবুকে পৌঁছালে প্রথমে আইলার, তারপর জারবার শাসকেরা এসে খারাজ দিল। রাসূলুল্লাহ একটি চুক্তিপত্র লিখিয়ে তাদের হাতে দিলেন। এ অভিযানে তিনি হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাকে আবার ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তার ভাগ্যে হিদায়াত জুটল না।
“যাঁর কুদরতের হাতে আমার অস্তিত্ব, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, শহিদগণ কিয়ামতের দিন গলায় তরবারি ঝুলিয়ে আসবেন। তাঁরা নূরের মিম্বরের ওপর বসবেন” হাদীস শরীফ
এ বছর রাসূলুল্লাহর কন্যা উম্মে কুলসুম ইন্তেকাল করলেন। রাসূলুল্লাহ নিজে তাঁর জানাজার নামাজ পড়ালেন; তাঁকে দাফন করার সময় কবরের পাশে রাসূলুল্লাহর মুবারক চোখ থেকে অশ্রু ঝরল।
সানাতুল উফুদ (প্রতিনিধিদলের বছর)
তাবুক সফর থেকে ফেরার পর সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিভিন্ন রাষ্ট্রে দূত পাঠিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। ওমান ও বাহরাইনের অধিবাসীরা মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন।
ইসলাম তখন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। আশপাশের গোত্র ও রাষ্ট্রগুলোতে দ্বীনের মৌলিক বিষয় শেখানোর জন্য শিক্ষক এবং তাদের পরিচালনার জন্য শাসনকর্তা পাঠানো হচ্ছিল। হিজরতের নবম বছরে মুসলমান হওয়া প্রতিনিধিদলগুলো দলে দলে মদিনায় আসতে লাগলেন। বিভিন্ন গোত্র থেকে আসা দলগুলো জগৎসমূহের সরদারের আনুগত্য ঘোষণা করলেন এবং সৌভাগ্য লাভ করলেন। আগন্তুকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ বছরকে সানাতুল উফুদ (প্রতিনিধিদলের বছর) বলা হলো। রাসূলুল্লাহর কাছে যখনই কোনো দূত আসতেন, তিনি মূল্যবান পোশাক পরতেন। সাহাবীগণকেও সুন্দর পোশাক পরাতেন। আগন্তুকদের পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর স্থানে আপ্যায়ন করতেন। ভোজের আয়োজন করে অনেক উপহার দিয়ে তাঁদের বিদায় দিতেন। তাঁরাও সন্তুষ্ট হয়ে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফিরে যেতেন। দূত পাঠানো গোত্রগুলোর একটি ছিল বনু মুররা গোত্র। তাঁরা তেরোজনকে দূত হিসেবে পাঠালেন। দূতেরা জানালেন যে, তাঁদের গোত্র মুসলমান হয়েছে। তাঁরা বললেন, তাঁদের দেশে একেবারেই বৃষ্টি হয়নি, ঘাস জন্মায়নি এবং তাঁরা ভীষণ দুর্ভিক্ষে পড়েছেন। এ কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে দোয়া চাইলেন। তিনি দোয়া করলেন, “হে আমার রব! তাদের বৃষ্টি দিয়ে পরিতৃপ্ত করো।” বনু মুররা গোত্রের দূতেরা দেশে ফিরে দেখলেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের কষ্ট সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেছে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেদিন তাঁদের জন্য দোয়া করেছিলেন, সেদিন সেখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। তা ঠিক দোয়া করার সময়ের সঙ্গেই মিলে গিয়েছিল।
বনু আসাদ গোত্রের দশজন লোক এসে মুসলমান হলো এবং এতে যেন অনুগ্রহ করেছে – এমন ভাব দেখাল। তারা বলল, “আমরা দুর্ভিক্ষের বছরে দূরদেশ থেকে এসেছি। আমাদের বিরুদ্ধে সৈন্য আসার আগেই নিজেদের ইচ্ছায় মুসলমান হয়েছি।” তাদের সম্পর্কে সূরা হুজুরাতের সতেরোতম আয়াত নাজিল হলো। বনু বিকারের প্রতিনিধিদলের প্রধান মুআবিয়া ইবনে সাওর ইবনে উবাদা ইবনে বিকারের বয়স ছিল প্রায় একশো বছর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছেলে বুশাইর, মাজমা ইবনে আবদুল্লাহ ও আবদে আমর ইবনে আসাম। তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন তাঁর ছেলের শরীরে মুবারক হাত বুলিয়ে দেন। কারণ হিসেবে বললেন, “সে আমাকে অনেক সম্মান করেছে এবং আমার অনেক উপকার করেছে।” রাসূলুল্লাহ বুশাইরের মুখমণ্ডলে মুবারক হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তাঁদের অনেক ছাগল উপহার দিলেন। তিনি আবদে আমরের নামও বদলে আবদুর রহমান রাখলেন। বনু নাজিবের প্রতিনিধিদল ছিল দশজনের। তাঁরা নিজেদের সম্পদ ও পশুর যাকাতও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁদের আগমনে অত্যন্ত খুশি হলেন। তাঁদের ভালো জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করতে বললেন। নাজিবের দূত ফরজ ও সুন্নত সম্পর্কে এত প্রশ্ন করলেন যে, তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহর ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ তাঁকে আরও সম্মান ও সমাদর করলেন, অন্য দূতদের তুলনায় তাঁর সঙ্গে বিশেষ আচরণ করলেন। দলের মালপত্রের কাছে যে যুবক থেকে গিয়েছিলেন, তাঁকেও ডেকে পাঠালেন; তিনি আল্লাহ তাআলা ছাড়া সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দেখে তাঁর জন্যও কল্যাণের দোয়া করলেন। অন্যদের মতো তাঁকেও উপহার দিলেন। দলের সবাই মনোবাসনা পূর্ণ করে আনন্দের সঙ্গে নিজেদের গোত্রে ফিরে গেলেন। বনু কিনানা থেকে একটি দল এসে মুসলমান হলেন। তাঁদের নেতা ছিলেন ওয়াসিলা ইবনে আসকা। তিনি যখন এলেন, রাসূলুল্লাহ তখন তাবুক সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওয়াসিলা বাইআত করে নিজের গোত্রে ফিরে গেলেন। তাঁর বাবা ঈমান আনল না, কিন্তু বোন ঈমান আনলেন। তারপর তিনি মদিনায় গেলেন এবং তাবুকগামী বাহিনীর পেছনে পেছনে রওনা হলেন এবং রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে পৌঁছালেন। তাঁকে খালিদের সঙ্গে উকাইদিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো হলো। তাঁর ভাগে অনেক উট পড়ল।
বনু সাইদা থেকে দামাম ইবনে সালাবা এলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর দরবারে গিয়ে নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করলেন। প্রশ্ন শেষ হলে বললেন, “আমি ঈমান আনলাম; আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনি যা কিছু এনেছেন, তার সবকিছুতে বিশ্বাস করলাম।” তিনি নিজের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের কাছে ইসলাম পৌঁছে দিলেন। সেই গোত্রের সবাই মুসলমান হয়ে গেলেন।
ইয়া রাসূলাল্লাহ! তোমার দুয়ারের গোলামের
পায়ে লেগে থাকা মাটি যে চুম্বন করেনি,
আর এই সৌভাগ্যের জন্য যে প্রাণ উৎসর্গ করেনি,
তার মনে তোমার প্রেম নেই; মানি না, তার কথা মিথ্যা।
তোমার পায়ের ধুলাকে যদি মাথার মুকুট করি,
চুমু খাই, চোখে মাখি, হৃদয়ের ওষুধ করি,
সরল পথের সন্ধান দেওয়া প্রদীপ করে ধরি,
তোমার পথে লুটিয়ে পড়ি – তোমার প্রেমে বিভোর, বিস্মিত।
তোমার দিক থেকে আসা প্রতিটি বাতাসের ঘ্রাণ নিই,
তোমার সুবাসের চিহ্ন আছে কি না, খুঁজে ফিরি;
তোমার পথে কুরবান হোক আমার পরিবার, সন্তান,
মা, বাবা, আত্মীয়স্বজন আর আরও হাজারো প্রাণ।
তোমার প্রাণপ্রিয় প্রেমিক মাওলানা খালিদ বলে:
হে জগতের সুলতান, হে সারা জাহানের প্রিয়তম!
আমার একটিই প্রাণ, তা-ও তোমারই দান, তোমার থেকে পাওয়া;
তাই বলতে পারি না, “তোমার জন্য কুরবান করতে প্রাণ এনেছি।”
মাওলানা খালিদ বাগদাদি
“হে আমার রব! তাদের (বনু মুররা গোত্রকে) বৃষ্টি দিয়ে পরিতৃপ্ত করো” হাদীস শরীফ
কাবা মুআজ্জমার একটি রাতের দৃশ্য
