মুতার যুদ্ধ
হিজরতের অষ্টম বছরে জগৎসমূহের জন্য রহমত সরওয়ারে কায়েনাত (আলাইহি আফজালুস সালাওয়াত) ইসলাম প্রচারের জন্য আবারও বিভিন্ন গোত্র ও রাষ্ট্রের কাছে দূত পাঠালেন। এগুলোর কোনো কোনোটি থেকে ইতিবাচক ফল এল, কিন্তু বুসরার শাসনকর্তার কাছে পাঠানো হযরত হারিস ইবনে উমাইরকে শামের বালকা অঞ্চলের মুতা গ্রামে খ্রিস্টান সৈন্যরা বন্দি করল। শামের শাসনকর্তা শুরাহবিল ইবনে আমরের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে হযরত হারিসকে, দূত হওয়া সত্ত্বেও, কাপুরুষের মতো হত্যা করা হলো – তিনি শহিদ হলেন।1
এ খবরে আমাদের প্রিয় নবী অত্যন্ত ব্যথিত হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বীর সাহাবীগণকে সমবেত হওয়ার আদেশ দিলেন। এ আদেশ পেয়ে সাহাবীগণ সন্তানদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত জুরফ শিবিরে সমবেত হলেন। হাবিবে আকরাম জোহরের নামাজ পড়ানোর পর ইরশাদ করলেন, “জিহাদে যাত্রাকারী এই লোকদের জন্য আমি জায়েদ ইবনে হারিসাকে সেনাপতি নিযুক্ত করলাম! জায়েদ ইবনে হারিসা শহিদ হলে তাঁর স্থানে জাফর ইবনে আবি তালিব দায়িত্ব নেবেন। জাফর ইবনে আবি তালিব শহিদ হলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা দায়িত্ব নেবেন। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাও শহিদ হলে মুসলমানরা নিজেদের মধ্য থেকে উপযুক্ত কাউকে বেছে নেবে এবং তাকে নিজেদের সেনাপতি বানাবে!”
এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম বুঝতে পারলেন, যাঁদের নাম বলা হলো, সেই বীরেরা শহিদ হবেন; তাঁরা কাঁদতে লাগলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁরা যদি বেঁচে থাকতেন আর আমরা তাঁদের দ্বারা উপকৃত হতে পারতাম!…” মহানবী তাঁদের কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলেন।2 সেখানে উপস্থিত হযরত জায়েদ, জাফর ও আবদুল্লাহও এ কথা শুনলেন এবং গভীর আনন্দে ভরে উঠলেন। কারণ তাঁদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রচার করতে গিয়ে শহিদ হওয়া। সুসংবাদ দেওয়া হয়ে গেছে, আর তাঁরা নিজের কানে তা শুনেছেন। মুজাহিদরা প্রস্তুতি শেষ করে সেনাপতিদের অপেক্ষা করছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী ইসলামের সাদা পতাকা হযরত জায়েদ ইবনে হারিসার হাতে সোপর্দ করলেন। তাঁকে আদেশ দিলেন, হারিস ইবনে উমাইর যেখানে শহিদ হয়েছেন, সেখান পর্যন্ত যেতে এবং সেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে। তারা গ্রহণ না করলে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে বললেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তাঁর পাশের সেনাপতি সঙ্গীদের সঙ্গে বিদায় নেওয়ার সময় কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “হে রাওয়াহার পুত্র! কেন কাঁদছ?” কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বললেন:
আমার কান্নার কারণ
দুনিয়ার ভালোবাসা নয়,
আল্লাহর কসম,
তোমাদের বিরহও নয়।
আসল কারণ এই:
পবিত্র কুরআনে
আমাদের রব এক আয়াতে
এভাবে ইরশাদ করেছেন:
“নিশ্চিত জেনে রাখো,
তোমাদের মধ্যে
এমন কেউ নেই, যে
জাহান্নামের ওপর দিয়ে পার হবে না…”
এই আয়াত শুনেছি আমি
রাসূলুল্লাহ যখন তিলাওয়াত করছিলেন।
জাহান্নামের ওপর দিয়ে যেতে হলে
কীভাবে আমি ধৈর্য ধরব!
সঙ্গীরা তাঁর জন্য দোয়া করলেন: “আল্লাহ তাআলা তোমাকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের দলভুক্ত করুন, তুমি নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হও!” তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বললেন, “কিন্তু আমি আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চাই। আর চাই, রক্তকে ফিনকি দিয়ে ফেনিয়ে তোলা এক তলোয়ারের আঘাতে, অথবা কলিজা ও নাড়িভুঁড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া এক বর্শার আঘাতে শহিদ হতে!…” বাহিনী রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা মহানবীর কাছে গিয়ে বিদায় নিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এমন কোনো উপদেশ দেবেন কি, যা আমি মুখস্থ করে রাখব এবং কখনো ভুলব না?” মহানবী তাঁকে বললেন, “তুমি আগামীকাল এমন এক দেশে যাবে, যেখানে আল্লাহ তাআলাকে খুব কমই সিজদা করা হয়। সেখানে সিজদা ও নামাজ বেশি করে আদায় করবে।” আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে আরও উপদেশ দেবেন কি?” আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “আল্লাহ তাআলাকে সবসময় জিকির করবে। কেননা আল্লাহ তাআলার জিকির (স্মরণ) তোমার আশা পূরণে তোমার সহায় হবে।”
তিন হাজারজনের ইসলামি বাহিনী “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” ধ্বনির মধ্যে যাত্রা শুরু করল। আমাদের প্রিয় নবী ও মদিনায় থেকে যাওয়া সাহাবীগণ গাজি মুজাহিদদের সানিয়াতুল বিদা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। এখানে জগৎসমূহের সরদার বরকতময় ইসলামি বাহিনীকে এভাবে সম্বোধন করলেন: “আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করবে, তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকবে, তোমাদের সঙ্গী মুসলমানদের প্রতি কল্যাণকামী হবে এবং তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। আল্লাহ তাআলার পথে তাঁর নাম নিয়ে যুদ্ধ করবে। গনিমতের মালে খেয়ানত করবে না। অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে না। শিশুদের হত্যা করবে না! সেখানে খ্রিস্টানদের গির্জায় এমন কিছু লোক পাবে, যারা মানুষ থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের ইবাদতে নিয়োজিত করেছে। তাদের স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকবে! এ ছাড়া এমন কিছু লোকেরও দেখা পাবে, যাদের মাথায় শয়তান বাসা বেঁধেছে; তাদের মাথা তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলবে। নারীদের এবং বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধদের হত্যা করবে না। গাছ পোড়াবে না, কাটবে না। ঘরবাড়িও ধ্বংস করবে না!”
প্রধান সেনাপতি জায়েদ ইবনে হারিসাকেও ইরশাদ করলেন, “মুশরিকদের মধ্য থেকে তোমার শত্রুর সঙ্গে যখন মুখোমুখি হবে, তাদের তিনটি বিষয়ের একটির দিকে দাওয়াত দেবে!… (যদি তারা মুসলমান হয়,) তাদের মুহাজিরদের আবাসভূমি মদিনায় হিজরত করার দাওয়াত দেবে! তোমার দাওয়াত গ্রহণ করলে তাদের জানিয়ে দেবে, মুহাজিররা যে অধিকার ভোগ করে, তারাও তা ভোগ করবে এবং মুহাজিরদের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত, তাদের ওপরও তা অর্পিত হবে।
যদি তারা মুসলমান হয়ে নিজেদের দেশে থাকাকেই বেশি পছন্দ করে, তাহলে তাদের জানিয়ে দেবে, তারা মুসলমানদের মধ্যে যাযাবর আরবদের মতো হবে, যাযাবর আরবদের ক্ষেত্রে যে ঐশী বিধান প্রযোজ্য, তাদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে, যুদ্ধলব্ধ গনিমত থেকে তাদের জন্য কোনো অংশ রাখা হবে না এবং গনিমত থেকে কেবল তারাই উপকৃত হবে, যারা মুসলমানদের পাশে থেকে যুদ্ধ করে!
যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের জিজিয়া দেওয়ার দাওয়াত দেবে! তারা তা মেনে নিলে তাদের স্পর্শ করবে না! জিজিয়া দিতেও রাজি না হলে আল্লাহ তাআলার সাহায্যের আশ্রয় নিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে!…”
এই উপদেশের পর তিনি মুজাহিদদের বিদায় জানালেন। ইসলামি বাহিনী তাকবিরের ধ্বনিতে যাত্রা করল। যাঁরা পেছনে থেকে গেলেন, তাঁরা যাত্রীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে দোয়া করছিলেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের সব রকম বিপদ থেকে রক্ষা করুন, আবার নিরাপদে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনুন…” দিগন্তে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা অশ্রুসিক্ত চোখে গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁদের পেছনে তাকিয়ে রইলেন…
“জায়েদ ইবনে হারিসাকে সেনাপতি নিযুক্ত করলাম! তিনি শহিদ হলে তাঁর স্থানে জাফর ইবনে আবি তালিব দায়িত্ব নেবেন। তিনি শহিদ হলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা দায়িত্ব নেবেন। তিনিও শহিদ হলে তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেবে” হাদীস শরীফ
পবিত্র পতাকা জায়েদ ইবনে হারিসার হাতে পতপত করে উড়ছিল; মুজাহিদরা আল্লাহ তাআলার দ্বীনের খেদমতের জন্য এক অজানা দীর্ঘ পথে চলছিলেন। ইসলামি বাহিনী দ্রুত সিরিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। যাত্রা নির্বিঘ্নে ও আনন্দে কাটছিল। মুজাহিদরা যত দ্রুত সম্ভব শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠেছিলেন। শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাকুলদের একজন ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। জায়েদ ইবনে আরকাম এ কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন: “আমি ছিলাম আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা এক ইয়াতিম। তিনি মুতার সফরে বের হওয়ার সময় আমাকেও তাঁর উটের পেছনে বসিয়ে নিয়েছিলেন। রাতে কিছুদূর যাওয়ার পর তাঁর ঠোঁট থেকে এই চরণগুলো ঝরে পড়তে লাগল:
হে আমার উট! বালুকাময় প্রান্তরের কূপে যদি আমায় নিয়ে যাও,
সেখান থেকে আরও চার মনজিল সামনে যদি পৌঁছাও,
আর কোনো সফরে তোমায় নিয়ে বের হব না আমি,
জেনে রাখো, অচিরেই মালিকহারা হবে তুমি।
আমি হয়তো আর ফিরব না আমার ঘরে,
আশা করি, শহিদ হব আমি এই সমরে।
শেষ মনজিলে মুমিনরা দ্রুত আমায় ছাড়িয়ে গেলেন,
হে রাওয়াহার পুত্র, তোমার সবচেয়ে আপনজনেরাও
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করে চলে গেলেন,
তোমাকে হক তাআলার হাতে সঁপে দিয়ে গেলেন।
এখন আর ভাবি না, পেছনে কী সম্পদ রইল,
গাছপালা আর খেজুরবাগানের কোনো চিন্তা নেই আমার মনে!
এ কথা শুনে আমি কেঁদে ফেললাম। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা চাবুক দিয়ে আমাকে আলতো ছুঁয়ে বললেন, ‘ওহে দুষ্টু! তোমার কী হলো? আমি এমন বললে তোমার কী ক্ষতি? আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে শাহাদাত নসিব করেন, তুমি বাহনের পিঠে চড়ে ফিরে গিয়ে নিজের জায়গায় পৌঁছে যাবে। আর আমি দুনিয়ার সব দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করব।’ তিনি নেমে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। শেষে দীর্ঘ দোয়া করার পর আমাকে ডাকলেন, ‘হে বৎস!’ আমি বললাম, ‘বলুন।’ তিনি বললেন, ‘এই সফরে ইনশাআল্লাহ শাহাদাত নসিব হবে!’”
বীর সাহাবীগণ সিরিয়ার কাছাকাছি পৌঁছানোর অনেক আগেই শামের শাসনকর্তা শুরাহবিল ইবনে আমর ইসলামি বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়ে গিয়েছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে বাইজান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে বিষয়টি জানিয়ে তার কাছ থেকে বিরাট সাহায্য পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিল। কারণ তার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী মুসলমানরা ছিল মাত্র তিন-পাঁচ হাজার। অথচ তার নিজের বাহিনী এক লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, আর অস্ত্রশস্ত্রের তো কোনো হিসাবই ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম (আলাইহিমুর রিদওয়ান) শামের ভূখণ্ড থেকে মাআনে পৌঁছে জানতে পারলেন, রোমানরা এক লাখ সৈন্যের বাহিনী নিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁরা সেখানে যাত্রাবিরতি করে দুই রাত অবস্থান করলেন। সেনাপতি হযরত জায়েদ ইবনে হারিসা সঙ্গীদের একত্র করে পরিস্থিতি জানালেন। রোমান বাহিনীর মোকাবিলায় কী করা উচিত, সে বিষয়ে তাঁদের মতামত চাইলেন। সাহাবীগণের কেউ কেউ বললেন, “রোমান বাহিনীর মুখোমুখি না হয়ে আমরা তাদের দেশে অতর্কিত হামলা চালাই। তাদের লোকদের বন্দি করে মদিনায় ফিরে যাই।” আবার কেউ কেউ বললেন, “রাসূল আলাইহিস সালামের কাছে চিঠি লিখে শত্রুর সংখ্যা জানাই। আমাদের জন্য দ্রুত সৈন্য পাঠাতে অনুরোধ করি, অথবা আমাদের কী করা উচিত, তা জিজ্ঞেস করি।” দ্বিতীয় মতটি বেশি উপযুক্ত বলে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা কথা বলে উঠলেন:
“আল্লাহ তাআলাকে সবসময় জিকির করবে। কেননা আল্লাহ তাআলার জিকির (স্মরণ) তোমার আশা পূরণে তোমার সহায় হবে” হাদীস শরীফ
হে আমার কওম, কিসের তরে এই দ্বিধা তোমাদের?
শহিদ হওয়ার নিয়তেই কি আসিনি আমরা এই রণে?
অস্ত্র আর অশ্বারোহী বেশি ছিল বলে
কাফিরদের সঙ্গে লড়িনি আমরা কখনো কোনো ক্ষণে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের যা দান করেছেন,
সেই দ্বীনের শক্তিতেই লড়েছি সিংহের মতো।
এগিয়ে যাও, লড়ে যাও, নিশ্চয়ই কল্যাণ আছে,
এ কাজের পরিণাম – হয় শাহাদাত, নয় বিজয়।
আল্লাহর কসম, বদরের দিনে ছিল দুটি ঘোড়া আমাদের,
উহুদে ছিল একটি ঘোড়া, অস্ত্রও ছিল খুব কম।
এই যুদ্ধে বিজয় যদি থাকে তাকদিরে,
আল্লাহ ও নবী তো এমন প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন।
হক তাআলা কখনো ফেরেন না তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে,
তাহলে হে মুমিনগণ, এগিয়ে চলো সামনে!
শাহাদাত যদি লেখা থাকে আমাদের তাকদিরে,
জান্নাতে মিলিত হব আমরা শহিদ ভাইদের সঙ্গে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার এই কথাগুলো মুজাহিদদের সাহস বাড়িয়ে দিল। তাঁরা বললেন, “আল্লাহর কসম, রাওয়াহার পুত্র ঠিকই বলছেন।” এবার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল: শহিদ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। গৌরবময় সাহাবীগণ মুতা গ্রামে পৌঁছে এক লাখ সৈন্যের রোমান বাহিনীর মুখোমুখি হলেন।
মুতার যুদ্ধ
পাহাড়-পাথর শত্রুসৈন্যে ভরে গিয়েছিল। এক দিকে আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রচারের জন্য সুদূর মদিনা থেকে রওনা হয়ে শাম পর্যন্ত আসা তিন হাজারজনের ইসলামি বাহিনী, অন্য দিকে ইসলামকে গলা টিপে মারার জন্য জড়ো হওয়া এক লাখ কাফিরের পাল… বাহ্যত শক্তির ভারসাম্য ছিল তুলনার অতীত। এ হিসাবে একজন মুসলমানকে ত্রিশজনেরও বেশি রোমানের সঙ্গে লড়তে হবে। দুই পক্ষই যুদ্ধের সারিতে দাঁড়াল। এ সময় মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদেশ অনুযায়ী ইসলামি বাহিনী থেকে একটি প্রতিনিধিদল রোমান শিবিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁরা রোমান বাহিনীকে ইসলাম গ্রহণের, নয়তো জিজিয়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু তারা এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল। আর নষ্ট করার মতো সময় ছিল না। সেনাপতি হযরত জায়েদ ইবনে হারিসা হাতে ইসলামের পবিত্র পতাকা নিয়ে বাহিনীকে আক্রমণের আদেশ দিলেন। মুজাহিদরা এ মুহূর্তেরই অপেক্ষায় ছিলেন; তাঁরা “আল্লাহু আকবার!” ধ্বনি তুলে তিরের মতো সামনে ছুটে গেলেন। বিদ্যুতের মতো তলোয়ার কোষমুক্ত করে ঝড়ের মতো শত্রুর মাঝখানে ঢুকে পড়লেন… ঘোড়ার হ্রেষা, তলোয়ারের ঝনঝনানি, তাকবিরের ধ্বনি আর আহতদের আর্তনাদ আকাশে পৌঁছে যাচ্ছিল; যুদ্ধের শুরুতেই ময়দান রক্তের হ্রদে পরিণত হলো। গৌরবময় সাহাবীগণ যতবার তলোয়ার চালাতেন, হয় একটি মাথা, নয়তো একটি হাত খসে পড়ত।
রাসূলুল্লাহর সাদা পতাকা হাতে হযরত জায়েদ শত্রুর একেবারে মাঝখানে “আল্লাহ, আল্লাহ” বলে লড়াই করছিলেন। তাঁর তলোয়ারের আঘাতে মুহূর্তে চারপাশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল; শত্রুরা তাঁর সামনে আসার জন্য অনুতপ্ত হচ্ছিল। সেনাপতির বীরত্বপূর্ণ লড়াই দেখে গৌরবময় সাহাবীগণও পিছিয়ে ছিলেন না; প্রত্যেকে একাই ত্রিশজন শত্রুর ওপর তলোয়ার চালিয়ে তাদের ধরাশায়ী করার চেষ্টা করছিলেন। এক পর্যায়ে সেনাপতি হযরত জায়েদের বরকতময় বুকে একসঙ্গে কয়েকটি বর্শা বিঁধল। এরপর আরও বর্শা এল। গৌরবময় সাহাবীর দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল। অবশেষে জায়েদ ইবনে হারিসা উত্তপ্ত মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের শরবত পান করলেন।
জায়েদ ইবনে হারিসার পর হযরত জাফর সঙ্গে সঙ্গে পতাকাটি তুলে নিলেন। ইসলামের পতাকা উড়তে দেখে মুজাহিদরা নতুন উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। হযরত জাফরও জায়েদ ইবনে হারিসার মতো বীরত্বের সঙ্গে লড়ছিলেন। এক দিকে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন, অন্য দিকে সঙ্গীদের সাহস ও উদ্দীপনা জোগাচ্ছিলেন। বীরের মতো লড়াই করা এই নতুন সেনাপতি আরও দ্রুত, আরও ক্ষিপ্র গতিতে তলোয়ার চালাচ্ছিলেন, শত্রুকে চোখ খোলার সুযোগ দিচ্ছিলেন না। আত্মহারা হয়ে লড়তে লড়তে হযরত জাফর সঙ্গীদের থেকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রোমানদের মাঝখানে একা লড়ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের ওপর আলাদা আলাদা তলোয়ারের আঘাত হানছিলেন। কিন্তু এ পথ থেকে যে আর ফেরা নেই, তা বুঝতে তাঁর দেরি হলো না। বীর সেনাপতি বলছিলেন, “আমার কর্তব্য হলো প্রত্যেক কাফিরকে আমার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করা!” – আর “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” এই বরকতময় বাণী থেকে নতুন আত্মিক শক্তি পাচ্ছিলেন। প্রতিটি আঘাতে তিনি একজন শত্রুকে খতম করছিলেন, কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিলেন না। আল্লাহ তাআলার বরকতময় নাম মুখে নিয়ে অফুরন্ত শক্তিতে লড়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে এক শত্রুসৈন্য হযরত জাফরের ডান হাতে তলোয়ারের আঘাত হানল। ডান হাত কাটা যাওয়ার পর হযরত জাফর ইসলামের পবিত্র পতাকা মাটিতে পড়ার আগেই বাঁ হাতে ধরে ফেললেন। তা উঁচু করে আবার ওড়াতে লাগলেন। এমন সময় আরেকটি তলোয়ারের আঘাত… তাঁর বাঁ হাতও কেটে গেল। এবার তিনি কাটা বাহু দুটির মাঝে পতাকাটি বুকে চেপে ধরে ওড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু একের পর এক প্রচণ্ড বেগে নেমে আসা শত্রুর তলোয়ারের আঘাতে তিনি বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন। তাঁর বরকতময় রুহ জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে উড়ে গেল… তাঁর দেহে নব্বইটিরও বেশি তলোয়ার ও বর্শার আঘাত গোনা হয়েছিল।3 সেনাপতিকে শহিদ হতে দেখে বীর মুজাহিদরা মাটিতে পড়া ইসলামের পতাকা তুলে নিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার হাতে তুলে দিলেন।
“হে আমার কওম, কিসের তরে এই দ্বিধা তোমাদের? শহিদ হওয়ার নিয়তেই কি আসিনি আমরা এই রণে?” আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)
তিনি ঘোড়ার পিঠে পতাকা উড়িয়ে প্রচণ্ড বেগে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এক দিকে সামনে আসা শত্রুকে ধরাশায়ী করছিলেন, অন্য দিকে বলছিলেন:
হে আমার নফস, আমার কাছে তোমাকে মাথা নোয়াতেই হবে,
আজ আমি শহিদ হব – এই রণে করেছি শপথ।
হয় তুমি নিজেই খুশিমনে এতে রাজি হবে,
নয়তো আমি জোর করে তোমায় মানিয়ে নেব এ পথ।
এ যুদ্ধে যদি নিহত না হও, হে নফস, আমায় বলো,
তুমি কি তবে কখনো মরবে না, চিরকাল রবে?
জাফর ইবনে আবি তালিব আর জায়েদ ইবনে হারিসা
যা করেছেন, তুমিও যদি করো, জেনো – ভালোই করবে।
তাঁরা শহিদ হয়েছেন, হে নফস, থেমো না পেছনে,
নইলে হতভাগা হবে, চলো, ঝাঁপিয়ে পড়ো সামনে!
হযরত আবদুল্লাহও “আল্লাহু আকবার!” ধ্বনির মধ্যে শত্রুর সঙ্গে নির্মম লড়াইয়ে লিপ্ত হলেন। এক পর্যায়ে একটি তলোয়ারের আঘাত তাঁর আঙুলে লাগল, আর কাটা আঙুলটি হাতে ঝুলে দুলতে লাগল। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রেমে জ্বলতে থাকা এই বরকতময় সেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থেকে মাটিতে লাফিয়ে নামলেন। লড়াইয়ে বাধা হয়ে থাকা আহত আঙুলটি পায়ের নিচে চেপে ধরে বললেন, “তুমি তো কেবল একটি আহত আঙুল, তাই না? এই বিপদেও তো তুমি আল্লাহ তাআলার পথেই পড়েছ!” – এই বলে টেনে ছিঁড়ে ফেললেন। বিদ্যুতের মতো লাফিয়ে ঘোড়ায় উঠে সর্বশক্তি দিয়ে আবার লড়াই শুরু করলেন। কিন্তু এত লড়াই করেও শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করতে না পারায় তিনি নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলেন… বারবার শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অবশেষে একটি বর্শার আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের পথে লড়াই করে তিনি শহিদ হলেন, আর তাঁর বরকতময় রুহ জান্নাতে উড়ে গেল… সেই মুহূর্তে হযরত আবদুল্লাহর পাশে লড়াইরত আবুল ইউসর কাব ইবনে উমাইর পতাকাটি উড়িয়ে রাখার চেষ্টা করলেন। সাহাবীগণের মধ্যে চোখ বুলিয়ে নিজের চেয়ে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ কাউকে খুঁজলেন। সাবিত ইবনে আকরামকে দেখে পতাকাটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন। হযরত সাবিত পতাকাটি মুজাহিদদের সামনে গেড়ে বললেন, “হে আমার ভাইয়েরা! তাড়াতাড়ি নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে সেনাপতি নির্বাচন করো এবং তাঁর অনুসরণ করো!” তাঁরা বললেন, “আমরা আপনাকেই নির্বাচন করলাম।” কিন্তু হযরত সাবিত তা গ্রহণ করলেন না। তাঁর দৃষ্টি পড়ল হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদের ওপর। তিনি তাঁকে বললেন, “হে আবু সুলাইমান! পতাকাটি তুমিই নাও!” মুসলমানদের মধ্যে নতুন যোগ দেওয়া হযরত খালিদ আদবের কারণে পবিত্র পতাকা নিতে চাইলেন না, আর তাঁর বরকতময় ঠোঁট থেকে এ কথাগুলো বেরিয়ে এল: “আমি এই পতাকা আপনার কাছ থেকে নিতে পারি না! আপনি আমার চেয়ে এর বেশি যোগ্য। কেননা আপনি বয়সে বড় এবং বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর পাশে থেকে লড়াই করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন!…” কিন্তু সময় ছিল মূল্যবান। তাঁদের চারপাশে সাহাবায়ে কেরাম শত্রুর সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করছিলেন, এক লাখ শত্রুকে পিছু হটানোর চেষ্টা করছিলেন। হযরত সাবিত আবার বললেন: “হে খালিদ! রাসূলুল্লাহর পবিত্র পতাকা তাড়াতাড়ি নাও! আল্লাহর কসম, আমি তো এটি তোমাকে দেওয়ার জন্যই নিয়েছিলাম। তুমি যুদ্ধের কৌশল আমার চেয়ে ভালো জানো!” তারপর তিনি চারপাশের মুজাহিদদের জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার ভাইয়েরা! খালিদের সেনাপতি হওয়ার ব্যাপারে তোমাদের মত কী?” তাঁরা সমস্বরে বললেন, “আমরা তাঁকে আমাদের সেনাপতি বানালাম।” তখন জগৎসমূহের সরদার নিজের বরকতময় হাতে যে পতাকা সোপর্দ করেছিলেন, হযরত খালিদ তা গভীর শ্রদ্ধা ও আদবের সঙ্গে নিয়ে চুমু খেলেন। ঘোড়ায় লাফিয়ে উঠে পূর্ণ প্রতাপ ও শক্তি নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।4
বীর সাহাবীগণ নতুন সেনাপতির পেছনে আবার আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হযরত খালিদ অভূতপূর্ব সাহস ও দক্ষতায় লড়ছিলেন, সামনে যে আসছিল, তাকেই ধরাশায়ী করছিলেন। এক পর্যায়ে হযরত কুতবা ইবনে কাতাদা শত্রুপক্ষের সেনাপতিদের অন্যতম মালিক ইবনে জাফিলার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। রোমানদের মনোবল ভেঙে পড়ল। কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছিল; সন্ধ্যা নেমেছিল, অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল। অন্ধকারে লড়াই করা খুবই বিপজ্জনক ছিল। কেননা ভুল করে নিজেদের সঙ্গীদেরই আঘাত করে ফেলার আশঙ্কা ছিল…
তাই দুই পক্ষই নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেল। আহতদের চিকিৎসা করা হলো। হযরত খালিদ ছিলেন রণকৌশলে এক প্রতিভা। তিনি সকালে নতুন কৌশল নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে তাদের হতবুদ্ধি করে দিতে চাইছিলেন। সেই রাতে তিনি সৈন্যদের অবস্থান বদলে দিলেন: ডান দিকের সৈন্যদের বাঁ দিকে, বাঁ দিকের সৈন্যদের ডান দিকে, সামনের সৈন্যদের পেছনে আর পেছনের সৈন্যদের সামনে নিয়ে এলেন।
সকালে বীর মুজাহিদরা “আল্লাহু আকবার” ধ্বনির মধ্যে আবার আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শত্রুসৈন্যরা যাঁদের আক্রমণের মুখে পড়ল, তাঁদের তারা এই প্রথম দেখছিল। গতকাল তারা যাঁদের সঙ্গে লড়েছিল, এঁরা তাঁরা নন।
নিশ্চয়ই মুসলমানদের সাহায্যে নতুন বাহিনী এসেছে!… নতুন শক্তি এসেছে ভেবে রোমান সৈন্যরা ভয় পেয়ে গেল, তাদের মনোবল ভেঙে পড়ল। আতঙ্কিত হয়ে তারা পালাতে শুরু করল। একে সুযোগ মনে করে ইসলামি বাহিনী তাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালাল।
শত্রুকে পরাস্ত করার পর তাঁরা মুতা দুর্গে এলেন। দুর্গটিও জয় করলেন এবং এর অভিজাতদের অনেককে হত্যা করলেন। হযরত খালিদ ও বীর সাহাবীগণ সেদিন আরও চমৎকারভাবে লড়াই করে শত্রুর ওপর তলোয়ার চালালেন এবং তাদের হাজার হাজার সৈন্যের প্রাণ জাহান্নামে পাঠালেন। সেদিন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদের হাতে নয়টি তলোয়ার ভেঙেছিল।5 আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ এবং রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দোয়ার বরকতে তিন হাজার গাজি মুজাহিদ এক লাখ শত্রুসৈন্যকে পরাজিত করলেন। এই বিরাট সম্মুখযুদ্ধে পনেরোজন শহিদ হলেন। এভাবে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে তার সীমা বুঝিয়ে দেওয়া হলো, দক্ষিণ দিকে তার নতুন অভিযান চালানোর পথ রুদ্ধ হলো… রাসূলে আকরাম, সম্মানিত নবী, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনো খবর আসার আগেই মুতায় যা ঘটেছে তা জানানোর জন্য সাহাবীগণকে মসজিদে সমবেত করলেন। আমাদের প্রিয় নবীর বরকতময় চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি অত্যন্ত দুঃখিত; তাঁকে আরও দুঃখ দেওয়ার ভয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছিলেন না। অবশেষে সাহাবায়ে কেরামের একজন বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনার মধ্যে এই দুঃখ দেখার পর থেকে আমাদের অন্তর রক্তের অশ্রু ঝরাচ্ছে; আমাদের দুঃখ কত গভীর, তা কেবল মহান আল্লাহই জানেন!” আমাদের প্রিয় নবীর বরকতময় চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল, আর তিনি ইরশাদ করলেন, “আমার মধ্যে তোমরা যে দুঃখ দেখছ, যা আমাকে শোকাতুর করে রেখেছিল, তা ছিল আমার সাহাবীদের শহিদ হওয়া। এ অবস্থা চলছিল, যতক্ষণ না আমি তাঁদের জান্নাতে মুখোমুখি রাখা সিংহাসনে বসা ভাই হিসেবে দেখলাম। জায়েদ ইবনে হারিসা পতাকা হাতে নিলেন। অবশেষে তিনি শহিদ হলেন। তিনি এখন জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। সেখানে তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন। এরপর পতাকা নিলেন জাফর ইবনে আবি তালিব। তিনি শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, লড়াই করলেন এবং অবশেষে তিনিও শহিদ হলেন। তিনি শহিদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করেছেন এবং ইয়াকুতের দুটি ডানা নিয়ে যেখানে ইচ্ছা উড়ে বেড়াচ্ছেন। জাফরের পর পতাকা নিলেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। পতাকা হাতে তিনি শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করলেন, শহিদ হলেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করলেন। জান্নাতে সোনার সিংহাসনের ওপর আমাকে তাঁদের দেখানো হয়েছে। হে আল্লাহ! জায়েদকে ক্ষমা করো!… হে আল্লাহ! জাফরকে ক্ষমা করো! হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে ক্ষমা করো!”
“হে খালিদ! রাসূলুল্লাহর পবিত্র পতাকা তাড়াতাড়ি নাও! আল্লাহর কসম, আমি তো এটি তোমাকে দেওয়ার জন্যই নিয়েছিলাম। তুমি যুদ্ধের কৌশল আমার চেয়ে ভালো জানো!” সাবিত ইবনে আকরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)
জগৎসমূহের সরদারের মুবারক চোখ থেকে তখনও অশ্রু ঝরছিল। অশ্রুসিক্ত অবস্থায় তিনি বলে চললেন, “আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার পর পতাকা হাতে নিয়েছেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। এই তো এখন যুদ্ধ তীব্র হয়ে উঠেছে। হে আল্লাহ! তিনি (খালিদ ইবনে ওয়ালিদ) তোমার তরবারিগুলোর একটি তরবারি। তুমি তাঁকে সাহায্য করো!…”6 আল্লাহ তাআলার অনুমতিতে আমাদের প্রিয় নবী হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরের রণক্ষেত্রের অবস্থা মুজিযা হিসেবে দেখেছিলেন এবং সাহাবীগণকে তা জানিয়েছিলেন। হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব যেদিন শহিদ হলেন, সেদিন এ ঘটনা বর্ণনা করার পর আমাদের প্রিয় নবী উঠে হযরত জাফরের ঘরে গেলেন। জাফরের স্ত্রী আসমা ঘরের কাজ শেষ করে সন্তানদের গোসল করিয়ে চুল আঁচড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “হে আসমা! জাফরের ছেলেরা কোথায়? ওদের আমার কাছে নিয়ে এসো!” আসমা খাতুন ছেলেদের নিয়ে এলে রাসূলুল্লাহ তাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, প্রাণ ভরে চুমু খেলেন ও তাদের ঘ্রাণ নিলেন। তাঁর মুবারক হৃদয় আর সইতে পারল না; মুবারক চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। এ দেখে হযরত জাফরের স্ত্রী অনুনয় করে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা, এমনকি আমার প্রাণও আপনার জন্য কুরবান হোক! ইয়াতিমদের প্রতি যে মমতা দেখানো হয়, আমার ছেলেদের প্রতি আপনি কেন সেই মমতা দেখাচ্ছেন? তবে কি জাফর ও তাঁর সঙ্গীদের সম্পর্কে কোনো দুঃসংবাদ পেয়েছেন?!” জগৎসমূহের সরদার গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ!… তাঁরা আজ শহিদ হয়েছেন!…” আমাদের মা হযরত আসমাও তাঁর ইয়াতিম সন্তানদের বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমাদের প্রিয় নবী এ দৃশ্য বেশিক্ষণ সইতে পারলেন না এবং সেখান থেকে চলে গেলেন।7
সাদাতখানায় ফিরে হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে বললেন, “জাফরের পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করতে অবহেলা কোরো না!” তিন দিন ধরে শহিদ পরিবারগুলোর কাছে খাবার পাঠানো হলো। কয়েক দিন পর হযরত ইয়ালা ইবনে উমাইয়া মদিনায় সুসংবাদ পৌঁছে দিলেন। তিনি ঘটনাগুলো বলার আগেই রাসূলে আকরাম তাঁকে বললেন, “চাইলে যা ঘটেছে তুমি বলো, চাইলে আমি তোমাকে বলি।” এরপর তিনি রণক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, সব খুঁটিনাটিসহ বর্ণনা করলেন। তখন হযরত ইয়ালা ইবনে উমাইয়া বললেন, “যে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য দ্বীন ও কিতাব দিয়ে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম, মুজাহিদদের ওপর দিয়ে যা কিছু ঘটেছে, তার একটি ঘটনাও আপনি বাদ দেননি।” মহানবী উত্তর দিলেন, “আল্লাহ তাআলা আমার জন্য মাঝখানের দূরত্ব তুলে দিয়েছিলেন, আর আমি রণক্ষেত্র নিজের চোখে দেখেছি।”
কয়েক দিন পর সংবাদবাহকেরা জানাল যে, ইসলামি বাহিনী মদিনার কাছে এসে পড়েছে। মহানবী সাহাবীগণকে নিয়ে উঠলেন এবং বাহিনীকে স্বাগত জানাতে মদিনার বাইরে বেরিয়ে এলেন। দূরে ধুলার মেঘ উড়ছিল, ইসলামের পবিত্র পতাকা পতপত করে উড়ছিল। তলোয়ার ও ঢালের ঝলকানি চারপাশ আয়নার মতো উজ্জ্বল করে তুলছিল… সবার মধ্যে গভীর আবেগ চোখে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পর হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুজাহিদ গাজিরা মদিনায় প্রবেশ করলেন, রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন…
“হে আল্লাহ! জায়েদকে ক্ষমা করো!… হে আল্লাহ! জাফরকে ক্ষমা করো! হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে ক্ষমা করো!” হাদীস শরীফ
হুরেরা এল দলে দলে,
নূরের কাপড়ে জড়াল তাঁকে,
মুহাম্মদের গায়ে মুখ রাখল,
মুহাম্মদের জন্মের রাতে।
আকাশের দুয়ার খুলে গেল,
জগতে রহমত ছড়িয়ে পড়ল,
জান্নাতি পোশাক কাটা হলো,
মুহাম্মদের জন্মের রাতে।
ইউনুস বলে, “হে ভাইয়েরা,
চোখ থেকে ঝরে রক্তাশ্রু,
সিজদা করল পাহাড়-পাথর,
মুহাম্মদের জন্মের রাতে।”
কাবা মুআজ্জমার একটি পুরোনো দৃশ্য /
মক্কা মুকাররমা [১৮৯০]
