আমার প্রিয় নবী

উমরাতুল কাজার সফর

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর এক বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। ঈদুল আজহার এক মাস বাকি থাকতে, জিলকদ মাসের শুরুতে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে উমরার প্রস্তুতি নেওয়ার আদেশ দিলেন। হুদাইবিয়ায় গিয়ে বাইআতে রিদওয়ানে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, ইন্তেকাল করা ব্যক্তিরা ছাড়া তাঁদের সবাই উমরায় উপস্থিত থাকবেন। এই আদেশের পর দুই হাজার সাহাবী প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। কুরবানির জন্য সত্তরটি উট কেনা হলো। এগুলোকে চরাতে চরাতে মক্কা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো নাজিয়া ইবনে জুনদুব ও তাঁর চার সঙ্গীকে। এ ছাড়া হযরত মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার অধীনে একশো অশ্বারোহী দিয়ে তাঁকে বর্ম, বর্শা, তলোয়ার প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্র বহন করে নেওয়ার জন্য আগে পাঠানো হলো। মুশরিকদের বিশ্বাস করা যেত না। কোনো আক্রমণ হলে এসব অস্ত্র কাজে লাগানো হবে। সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী আমরা তো কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র নিয়ে উমরায় আসব না!” জগৎসমূহের সরদার ইরশাদ করলেন, “আমরা এসব অস্ত্র হারামে, কুরাইশদের কাছে নিয়ে প্রবেশ করব না। তবে কুরাইশদের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর কোনো আক্রমণ হলে, সে জন্য এগুলো আমাদের কাছাকাছি, হাতের নাগালে থাকবে।”

মদিনা মুনাওয়ারায় স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আবু জর গিফারিকে রেখে যাওয়া হলো।1 আবু রুহম গিফারিকে রেখে যাওয়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে। দুই হাজার সাহাবী আমাদের প্রিয় নবীর সঙ্গে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। সাহাবায়ে কেরাম গভীর আবেগে উদ্বেলিত ছিলেন। বহু বছর পর তাঁরা দেখতে পাবেন সেই ঘরবাড়ি, সেই ভিটেমাটি, সেই জন্মভূমি, যা তাঁরা আল্লাহ তাআলার পথে, আমাদের প্রিয় নবীর জন্য ছেড়ে এসেছিলেন… পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যেদিকে মুখ ফেরান, সেই কাবা মুআজ্জমা জিয়ারত করবেন… মুসলমান হয়েও চুক্তির কারণে মদিনায় আসতে না পারা আত্মীয়দের সঙ্গে মিলিত হবেন। বছরের পর বছর যারা তাঁদের চোখ দিয়ে অশ্রুর বদলে রক্ত ঝরিয়েছে, জুলুমের নিচে কাতরাতে বাধ্য করেছে, নিজেদের মূর্তির পূজা করানোর জন্য তাঁদের বহু ভাইকে শহিদ করেছে, সেই কুরাইশ মুশরিকদের তাঁরা ইসলামের মর্যাদা ও গৌরব দেখিয়ে দেবেন। হয়তো এ দৃশ্য দেখে মুশরিকদের অন্তরে ইসলামের ভালোবাসা জাগবে এবং তারা মুসলমান হয়ে যাবে!…

মদিনায় যাঁরা থেকে গেলেন, তাঁরা সানিয়াতুল বিদা পর্যন্ত তাকবির দিয়ে জগৎসমূহের সরদারকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলেন… আমাদের প্রিয় নবী মদিনা থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে জুলহুলাইফায় পৌঁছে ইহরাম বাঁধলেন। গৌরবময় সাহাবীগণও তাঁর অনুসরণ করলেন। সবাই সাদা পোশাকে আবৃত। উমরা করার জন্য মক্কা মুকাররমার পথে যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এখন “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক! ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক!” (আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির! তোমার ডাকে আমার কথা ও সত্তা দিয়ে বারবার সাড়া দিয়েছি, তোমার আদেশে মাথা নত করেছি। তোমার কোনো শরিক নেই, আমার সমগ্র অস্তিত্ব নিয়ে তোমার দিকে ফিরেছি। সমস্ত প্রশংসা ও নিয়ামত কেবল তোমারই। রাজত্বও তোমার। তোমার কোনো অংশীদার নেই) ধ্বনিতে আসমান-জমিন মুখরিত হচ্ছিল।

আল্লাহ তাআলার প্রশংসা, তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি এবং তাঁর বরকতময় নামের জিকিরে যাত্রা অত্যন্ত আনন্দময় হয়ে উঠেছিল।

মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার নেতৃত্বে আগে যাওয়া দলটি মক্কার কাছাকাছি পৌঁছালে কুরাইশ মুশরিকরা তাঁদের দেখে ফেলল। তারা ভয়ে ভয়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “এসব কী?” তাদের ভঙ্গি যেন বলছিল, ‘এক বছর আগে আমরা কি এমন চুক্তি করেছিলাম?’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা তাদের এমন উত্তর দিলেন, যা শুনে তাদের হাড় পর্যন্ত হিম হয়ে গেল: “এরা আল্লাহ তাআলার রাসূলের অশ্বারোহী বাহিনী… আল্লাহ তাআলা অনুমতি দিলে আগামীকাল তিনিও এখানে তাশরিফ আনবেন!…” মুশরিকরা ভয়ে ভয়ে ফিরে গিয়ে মক্কায় খবর পৌঁছে দিল। মক্কার মুশরিকরা বলাবলি করতে লাগল, “আমরা কসম করে বলছি, আমরা চুক্তি মেনে চলেছি। মুহাম্মদ কেন আমাদের সঙ্গে লড়াই করবে?…” তারা সঙ্গে সঙ্গে মহানবীর সঙ্গে কথা বলার জন্য নিজেদের মধ্য থেকে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাল।

“লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক! ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক!” তালবিয়া

এ সময় জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাতনে ইয়াজাজ নামক স্থানে এসে পৌঁছেছিলেন, যেখান থেকে মক্কা দেখা যায়। তাঁরা এখানে কোমরে ঝোলানো তলোয়ার ছাড়া বাকি সব অস্ত্র রেখে দিলেন। অস্ত্রগুলো পাহারা দেওয়ার জন্য দুইশো সাহাবীকে প্রহরী নিযুক্ত করলেন। এই প্রস্তুতি শেষ হলে কুরাইশ প্রতিনিধিদল মহানবীর সঙ্গে কথা বলার এবং তাঁর দরবারে প্রবেশের অনুমতি চাইল। অনুমতি দেওয়া হলে তারা বলল, “হে মুহাম্মদ! হুদাইবিয়ার চুক্তির পর থেকে আমরা তোমাদের সঙ্গে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। তবুও তুমি কি এসব অস্ত্র নিয়ে মক্কায়, নিজের সম্প্রদায়ের কাছে প্রবেশ করবে? অথচ আমাদের চুক্তি অনুযায়ী তোমাদের সঙ্গে কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া আর কিছু থাকার কথা নয়!…” জবাবে জগৎসমূহের সরদার ইরশাদ করলেন, “শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত আমি প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও বিশ্বস্ততার জন্য পরিচিত। আমরা কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র নিয়ে হারামে প্রবেশ করব না। তবে আমি চাই, অস্ত্রগুলো আমার কাছাকাছি কোনো জায়গায় থাকুক।” প্রতিনিধিদল বুঝতে পারল, তাদের কাছে যে খবর পৌঁছেছিল, তা ঠিক ছিল না; তারা স্বস্তি পেল এবং বলল, “হে মুহাম্মদ! সত্যি বলতে কী, তোমার কাছ থেকে আমরা সবসময় বিশ্বস্ততা ও কল্যাণই দেখেছি। তোমাকে তা-ই মানায়।” – এই বলে তারা ফিরে গেল। মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের বিষয়টি জানাল। তারাও স্বস্তি পেল।

কুরাইশদের নেতৃস্থানীয়রা বিদ্বেষ ও হিংসার কারণে মহানবী ও তাঁর সাহাবীগণের এই সৌভাগ্যময় মুহূর্তগুলো না দেখার জন্য মক্কা ছেড়ে পাহাড়ে চলে গেল। আমাদের প্রিয় নবী চিহ্নিত কুরবানির উটগুলো আগেই জি-তুওয়া নামক স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর সাহাবীগণকে নিয়ে প্রস্তুতি শেষ করে পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশের জন্য এগিয়ে চললেন। সাহাবায়ে কেরাম জগৎসমূহের সরদারকে মাঝখানে রেখেছিলেন। বিশ্বজগতের সুলতান তাঁর কাসওয়া উটনীর ওপর হাজারো তারার দীপ্তি ম্লান করে দেওয়া সূর্যের মতো চারদিকে নূর ছড়াচ্ছিলেন। হে আমার রব! কী সৌন্দর্য! কী মহিমাময় দৃশ্য ছিল সেটি!…

মুখে মুখে “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক!…” ধ্বনি, আর অন্তরে অন্তরে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা।

তাঁরা পায়ে পায়ে মহান কাবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। যত কাছে যাচ্ছিলেন, তাঁদের আবেগ ততই বেড়ে যাচ্ছিল, যেন উপচে পড়ছিল। সমস্বরে উচ্চারিত তালবিয়ার ধ্বনি মক্কা ভরে দিচ্ছিল; মুশরিকরা এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যতই দেখছিল, ততই তাদের অন্তর গলে যাচ্ছিল, তারা অনুভব করছিল, তাদের হৃদয়ে যেন ভালোবাসার মিঠে শরবত ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। অনেকের অন্তরে ইসলামের ভালোবাসা ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছিল… শেষ পর্যন্ত বিশ্বজগতের সুলতান, দুই জাহানের সরদার, আমাদের প্রিয় ও মর্যাদাবান নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিজয়ী হয়েছিলেন…

এই তো আমাদের প্রিয় নবী ও তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণ কোমরে তলোয়ার ঝুলিয়ে কাবা মুআজ্জমায় প্রবেশ করছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা মহানবীর কাসওয়া উটনীর লাগাম ধরে সামনে সামনে চলছিলেন। মক্কার কিছু মুশরিক তাদের নারী ও শিশুদের নিয়ে দারুন নাদওয়ায় সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রিয় নবী ও তাঁর বীর সাহাবীগণকে দেখছিল। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগোতে এগোতে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন, আর তাঁর চরণগুলো হাতুড়ির মতো মুশরিকদের মাথায় আঘাত হেনে তাদের অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল:

ওহে কাফিররা, সরে দাঁড়াও নবীর পথ থেকে,
আল্লাহ তাআলা কুরআন নাজিল করেছেন তাঁকে।
সব কল্যাণ, সব মঙ্গল আছে তাঁর দ্বীনে,
এ দ্বীনের তরে মরণই শ্রেষ্ঠ মরণ জীবনে।
তিনিই সত্য রাসূলুল্লাহ, মেনেছি হৃদয় দিয়ে,
তাঁর সব কথা বিশ্বাস করি, আজ আমি মেনে নিয়ে।
ওহে কাফিররা! কুরআন যে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে
নাজিল হয়েছে – তোমরা যখন অস্বীকার করেছিলে একে,
তখন যেমন অতর্কিতে তোমাদের হেনেছি আঘাত,
ধড় থেকে মাথা আলাদা করেছি যেমন অকস্মাৎ,
এর মর্মেও যদি তোমরা বিশ্বাস না করো আর,
তেমনি আঘাত নেমে আসবে তোমাদের মাথায় আবার।
শুরু করি সেই আল্লাহর বরকতময় নামে,
নেই আর কোনো সত্য দ্বীন তাঁর দ্বীন ছাড়া এই ধরাধামে।
আবারও শুরু করি সেই আল্লাহরই নামে,
মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল – এ কথা জানি প্রাণে।

হযরত উমর আর থাকতে না পেরে তাঁকে সতর্ক করতে চাইলেন: “হে ইবনে রাওয়াহা! তুমি রাসূলুল্লাহর সামনে এবং হারাম শরীফে কীভাবে কবিতা আবৃত্তি করতে পারো?” কিন্তু মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে উমর! তাঁকে বাধা দিয়ো না! আল্লাহ তাআলার কসম, তাঁর কথাগুলো এই কুরাইশ মুশরিকদের ওপর তির বর্ষণের চেয়েও দ্রুত ও বেশি কার্যকর। হে ইবনে রাওয়াহা, চালিয়ে যাও!”

কিছুক্ষণ পর মহানবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে ইরশাদ করলেন, “বলো: ‘আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! তিনি এক! তিনিই তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন! তিনিই তাঁর এই বান্দাকে সাহায্য করেছেন! তিনিই তাঁর বাহিনীকে শক্তিশালী করেছেন! সমবেত গোত্রগুলোকে পরাজিত করেছেন একমাত্র তিনিই!’”

তখন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এভাবে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন:

আল্লাহ তাআলা ছাড়া নেই আর কোনো ইলাহ!
নেই তাঁর কোনো শরিক, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!
মুসলমানদের বাহিনীকে তিনিই করেন বলীয়ান!
কাফিরদের ছত্রভঙ্গ করে তিনিই করেন পরাজিত, ম্লান!

মুসলমানরাও এই কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী বাইতুল্লাহয় পৌঁছে নিজের বরকতময় ডান কাঁধ খুলে দিলেন। তাঁর মুবারক দেহের সৌন্দর্য চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল, হৃদয় আকর্ষণ করছিল, সূর্যের মতো নূর ছড়াচ্ছিল। এরপর তিনি ইরশাদ করলেন, “আজ যারা এই মুশরিকদের সামনে নিজেদের শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত দেখাবে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমতে সেই বীরদের ক্ষমা করুন!” এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম ডান কাঁধ খুলে প্রতাপের সঙ্গে দ্রুত পায়ে হেঁটে কাবা তিনবার তাওয়াফ করলেন। তবে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের কোণের মাঝখানে ধীরে ধীরে হাঁটলেন। মহানবী ও তাঁর সাহাবীগণ হাজরে আসওয়াদের কাছে গিয়ে তাতে চুমু খাচ্ছিলেন, অথবা দূর থেকে হাত তুলে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করছিলেন।

“আল্লাহ তাআলার কসম, তাঁর (ইবনে রাওয়াহার) কথাগুলো এই কুরাইশ মুশরিকদের ওপর তির বর্ষণের চেয়েও দ্রুত ও বেশি কার্যকর” হাদীস শরীফ

মুশরিকরা দূর থেকে সাহাবীগণকে লক্ষ করছিল এবং তাঁদের এই প্রতাপশালী ও গর্বিত চলন দেখে অবাক হচ্ছিল। কারণ তাদের বলা হয়েছিল, মদিনায় যাওয়ার পর থেকে মুসলমানরা দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে; এ ধরনের খবরও ছড়ানো হয়েছিল। অথচ এখন তারা এর ঠিক উল্টোটা দেখছিল, আর তাদের বিস্ময় বাড়ছিল।

বাকি চারটি চক্কর ধীরে ধীরে, শান্ত পদক্ষেপে সম্পন্ন করা হলো। তাওয়াফের পর তাঁরা মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। এরপর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার সাঈ করলেন। কুরবানি করার পর মহানবী তাঁর বরকতময় মাথা মুণ্ডন করালেন। তাঁর বরকতময় চুল বাতাসেই লুফে নেওয়া হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামও মাথা মুণ্ডন করলেন। এভাবে রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঠিক এক বছর আগে দেখা স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হলো। উমরার জিয়ারত সম্পন্ন হলো, জোহরের ওয়াক্ত হলো। জগৎসমূহের সরদার হযরত বিলালকে কাবায় আজান দেওয়ার আদেশ দিলে বিলাল হাবশি সঙ্গে সঙ্গে সেই আদেশ পালন করলেন। তিনি যখন কাবায় মুহাম্মদি আজান দিচ্ছিলেন, সমগ্র মক্কা আলোড়িত হয়ে উঠল। সাহাবায়ে কেরাম গভীর বিনয় ও একাগ্রতায় আজান শুনছিলেন, মৃদু স্বরে তার জবাব দিচ্ছিলেন। আজান শেষ হলে হাবিবুল্লাহ ইমাম হলেন। সবাই মিলে আদায় করা জোহরের নামাজ মুশরিকদের অন্তরে এক অন্য রকম প্রভাব ফেলল।

আমাদের প্রিয় নবীর জন্য আবতাহে চামড়ার একটি তাঁবু খাটানো হয়েছিল। সাহাবীগণও এর চারপাশের তাঁবুগুলোতে তিন দিন অবস্থান করলেন। নামাজের সময় তাঁরা বাইতুল্লাহয় সমবেত হয়ে জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। অন্য সময় তাঁরা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতেন; ইসলাম তাঁদের যে উত্তম চরিত্র দান করেছিল, তা দিয়ে আত্মীয়দের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতেন। আর আত্মীয়রা সাহাবীগণের এই সুন্দর আচরণের সামনে যেন গলে যাচ্ছিল, নিজেদের মুগ্ধতা গোপন করতে পারছিল না। এই তিন দিনে মক্কা যেন ভেতর থেকেই বিজিত হয়ে গিয়েছিল।

তিন দিন পূর্ণ হলো… এবার বিদায়ের সময় এসে গেল। সন্ধ্যার দিকে মহানবী ইরশাদ করলেন, “মুসলমানদের (উমরার জন্য আগতদের) কেউ মক্কায় সন্ধ্যা কাটাবে না, সবাই রওনা হয়ে যাবে!” তখন সবাই গোছগাছ করে মদিনার পথে রওনা হলেন… জুহফায় থাকার সময় রাসূলুল্লাহর সঙ্গে হযরত আব্বাসের দেখা হলো। হযরত আব্বাস প্রস্তাব দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাইমুনা বিনতে হারিস বিধবা হয়েছেন। আপনি যদি তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন, তা কি ভালো হয় না?” তখন মহানবী আবু রাফি ও আনসারদের একজনকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে মক্কায় পাঠালেন। হযরত মাইমুনা উটের পিঠে থাকা অবস্থায় রাসূলুল্লাহর প্রস্তাবের খবর পেয়ে বললেন, “উট এবং এর ওপর যে আছে, সবই রাসূলুল্লাহর।” তিনি নিজেকে মহানবীর কাছে সমর্পণ করলেন। এ বিষয়ের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদনের ভার তিনি তাঁর বোন উম্মুল ফজলকে দিলেন, আর উম্মুল ফজল তা তাঁর স্বামী হযরত আব্বাসের ওপর ছেড়ে দিলেন। উমরা থেকে মদিনায় ফেরার পথে সারিফ নামক স্থানে পৌঁছে হযরত আব্বাস আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছ থেকে চারশো দিরহাম দেনমোহর গ্রহণ করে হযরত মাইমুনাকে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে বিবাহ দিলেন। বিবাহ-অনুষ্ঠানও সেখানেই হলো। হযরত মাইমুনা রাসূলুল্লাহর বিবাহের সম্মানে ধন্য হয়ে তাঁর সর্বশেষ স্ত্রী হলেন। আমাদের নবী এরপর আর কোনো বিবাহ করেননি।

“আজ যারা এই মুশরিকদের সামনে নিজেদের শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত দেখাবে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমতে সেই বীরদের ক্ষমা করুন!” হাদীস শরীফ

একটি বাতিদান উপহার দেওয়ার সাহস করেছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আমার বাসনা তোমার মহান দরবারের খেদমত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তোমার পবিত্র রওজার যোগ্য নয় আমার এ তুচ্ছ উপহার,
কবুল করো, দয়া ও অনুগ্রহ করো, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার, যাকে জানাব মনের হাল?
তোমার দরবারেই তো দয়া ও বদান্যতা, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আশ্রয় চাই, আমান, শতবার আমান – তোমার দুয়ারে লুটিয়েছি,
করুণা করো, আমার জন্য শাফায়াত করো, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
দুই জাহানে তোমার ছায়ায় রেখো ন্যায়পরায়ণ খান মাহমুদকে,
শুরুতে ও শেষে রাজত্ব তো তোমারই, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
II. Mahmud Hân

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের মুসলমান হওয়া

জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন উমরা করতে মক্কায় গিয়েছিলেন, তখন সাহাবীগণের অন্যতম হযরত ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদকে বলেছিলেন, “খালিদ কোথায়? তার মতো লোক ইসলামকে চিনবে না, বুঝবে না – এমন হতে পারে না। সে যদি তার সমস্ত প্রচেষ্টা ও বীরত্ব মুসলমানদের পক্ষে, মুশরিকদের বিরুদ্ধে দেখাত, তাহলে কতই না ভালো হতো! আমরা তাকে ভালোবাসতাম, মর্যাদা দিতাম।” ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ এর আগেও মাঝে মাঝে বড় ভাইকে চিঠি লিখে মুসলমান হতে উৎসাহিত করতেন। মহানবীর এই বরকতময় কথাগুলোও পৌঁছে দিলে ইসলামের প্রতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদের আকর্ষণ দিন দিন বাড়তে লাগল। উমরা পালনকারী সাহাবীগণ মদিনায় ফিরে এলেন। দিন কেটে গেল, হিজরতের অষ্টম বছর শুরু হলো। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ আর স্থির থাকতে পারছিলেন না; যত দ্রুত সম্ভব মদিনায় পৌঁছে জগৎসমূহের সরদারের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভের জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজেই এভাবে বর্ণনা করেছেন:

“আল্লাহ তাআলা আমাকে মহানবীর ভালোবাসা দান করলেন। আমার অন্তরে ইসলামের ভালোবাসা বসিয়ে দিলেন। আমাকে ভালো-মন্দ আলাদা করার মতো অবস্থায় পৌঁছে দিলেন। আমি মনে মনে বললাম, ‘মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে সব যুদ্ধে আমি ছিলাম। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে আসার সময় আমি জানতাম, আমি এক ভ্রান্ত ও ভুল অবস্থার ওপর আছি, আর তিনি একদিন অবশ্যই আমাদের ওপর বিজয়ী হবেন; এই অনুভূতি নিয়েই আমি ফিরে আসতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন হুদাইবিয়ায় এসেছিলেন, তখনো আমি শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি ছিলাম। উসফানে আমি তাঁদের কাছাকাছি গিয়ে দেখা দিলাম। রাসূলুল্লাহ আমাদের দিক থেকে নিশ্চিন্ত থেকে সাহাবীগণকে জোহরের নামাজ পড়াচ্ছিলেন। আমরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা করতে চাইলাম, কিন্তু তা সম্ভব হলো না। এমন হওয়াটাই কল্যাণকর হয়েছিল। আমাদের মনে কী চলছে, রাসূলুল্লাহ নিশ্চয়ই তা বুঝতে পেরেছিলেন; কেননা আসরের নামাজ তাঁরা সতর্কতার সঙ্গে আদায় করলেন। এ ঘটনা আমার মনে গভীর রেখাপাত করল। আমি মনে মনে বললাম, এই মহান ব্যক্তিকে নিশ্চয়ই আল্লাহ রক্ষা করছেন। আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। আমি নানা চিন্তার মধ্যে ছিলাম, এমন সময় মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম উমরার জন্য মক্কায় এলেন, কিন্তু আমি তাঁর সামনে গেলাম না। আমার ভাই ওয়ালিদও তাঁদের সঙ্গে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁরা আমাকে খুঁজে পাননি। আমার ভাই এই চিঠিটি রেখে গিয়েছিলেন: ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম! আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা এবং রাসূলুল্লাহর প্রতি দরুদ ও সালামের পর বলছি, সত্যিই তোমার ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ার চেয়ে আশ্চর্য কিছু আমি জানি না। অথচ তুমি যে পথে চলছ, তা যে ভুল, তা বোঝার মতো জ্ঞান তোমার আছে। কেন তুমি বুদ্ধি খাটাও না? ইসলামের মতো একটি দ্বীনকে চিনতে ও বুঝতে না পারা কতই না অদ্ভুত! মহানবী আমার কাছে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন। তিনি চান, তুমি ইসলামকে চিনে নিজের প্রচেষ্টা ও বীরত্ব মুসলমানদের মধ্যে থেকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাও। হে আমার ভাই! অনেক সুযোগ তুমি হাতছাড়া করেছ, আর দেরি কোরো না!’

আমার ভাইয়ের চিঠি আমার কাছে পৌঁছালে মুসলমান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠল। আমি যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছিলাম। রাসূলুল্লাহর কথাগুলো আমাকে খুবই আনন্দিত করেছিল। সেই রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম, আমি এক সংকীর্ণ, দুঃসহ, মরুভূমির মতো পানিশূন্য জায়গা থেকে সবুজে ঢাকা এক বিস্তৃত, প্রশস্ত জায়গায় বেরিয়ে এসেছি। ঠিক করলাম, মদিনায় পৌঁছে এই স্বপ্নের কথা হযরত আবু বকরকে বলে তাঁর কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চাইব। রাসূলুল্লাহর কাছে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ভাবছিলাম, ‘সেখানে যাওয়ার পথে কে আমার সঙ্গী হতে পারে?’ তখন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সঙ্গে দেখা হলো। তাকে বিষয়টি বললাম। সে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। এরপর ইকরিমা ইবনে আবি জাহলের সঙ্গে দেখা হলো। সে-ও প্রত্যাখ্যান করলে আমি বাড়ি ফিরে গেলাম। আমার বাহনে চড়ে উসমান ইবনে তালহার কাছে গেলাম। তাঁকেও বললাম, মুসলমান হওয়ার জন্য আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাব, আর অনুরোধ করলাম তিনি যেন আমার সঙ্গী হন। তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই রাজি হলেন, আর পরদিন সাহরির সময় আমরা একসঙ্গে রওনা হলাম। হিরা নামক জায়গায় পৌঁছে আমর ইবনে আসের সঙ্গে আমাদের দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য বললে তিনিও জানালেন, তিনি হাবশা থেকে আসছেন, নাজাশি আসহামার কাছে মুসলমান হয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহর কাছে বাইআত করার জন্য মদিনায় যাচ্ছেন। আমরা তিনজন মদিনায় পৌঁছালাম। আমাদের আগমনের খবর পেয়ে মহানবী নাকি বলেছিলেন, ‘মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলোকে আমাদের দিকে ছুড়ে দিয়েছে।’ মদিনায় এসে আমি সফরের পোশাক খুলে ফেললাম। আমার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত হলাম। এমন সময় আমার ভাই ওয়ালিদ এসে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি করো। কেননা মহানবীকে তোমাদের আগমনের খবর দেওয়া হয়েছে, তিনি খুবই খুশি হয়েছেন। এখন তিনি তোমাদের অপেক্ষায় আছেন।’ আমি তাড়াতাড়ি সেই মহান নবীর দরবারে গেলাম। তিনি মুচকি হাসছিলেন। আমি সালাম দিয়ে বললাম, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহ তাআলার নবী।’ তিনি ইরশাদ করলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তোমাকে হিদায়াত দান করেছেন, সঠিক পথ দেখিয়েছেন।’ এরপর আমি অনুরোধ করলাম, আমার গুনাহ মাফের জন্য তিনি যেন আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করেন। তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন এবং ইরশাদ করলেন, ‘ইসলাম তার আগে করা গুনাহগুলো মুছে দেয়।’ আমার অন্য দুই সঙ্গীও মুসলমান হলেন।”2 এভাবে মক্কার সবচেয়ে বড় বীরদের অন্যতম এই তিন পালোয়ান হৃদয় উপচে পড়া আন্তরিকতা নিয়ে রাসূলে আকরামের দরবারে সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করলেন। তাঁরা আগুনে ঝাঁপ দিতেও পিছপা হতেন না, নিজেদের লক্ষ্যের জন্য জীবন দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। এখন থেকে তাঁরা সমস্ত শক্তি দিয়ে কুফর নির্মূলের জন্য চেষ্টা করবেন। তাঁদের মুসলমান হওয়ায় সাহাবীগণ অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং “আল্লাহু আকবার!” তাকবির দিয়ে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করলেন।

হযরত মুহাম্মদ – হকের আওয়াজ তিনি,
তিনি দুই জাহানের সরদার।
আরব-অনারব সবাই তাঁর গোলাম।
সেই গোলাপের মতো গোলাপ দেখেনি কাল,
তুমিও সেই সুন্দরের সামনে মাথা নত করো।
ইমাম বুসিরি

“ইসলাম তার আগে করা গুনাহগুলো মুছে দেয়” হাদীস শরীফ