আমার প্রিয় নবী

মক্কা বিজয়

হিজরতের অষ্টম বছর। হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্রের একটি ধারা ছিল এই: “উভয় পক্ষের বাইরে থাকা আরব গোত্রগুলো যে পক্ষের আশ্রয়ে ইচ্ছা যেতে পারবে; তারা মুসলমান কিংবা মুশরিক – যে কারও সঙ্গে মিলিত হতে স্বাধীন থাকবে।” সে অনুযায়ী মহানবীর মিত্র খুজাআ গোত্র মুসলমানদের পক্ষে এবং বনু বকর গোত্র মুশরিকদের পক্ষে অবস্থান নিল। খুজাআ গোত্র ও বনু বকর পুরোনো শত্রু ছিল; সুযোগ পেলেই একে অপরের ওপর হামলা চালাত। হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী তারাও কিছুকালের জন্য হামলা বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু বনু বকর মাত্র দুই বছর তা মেনে চলতে পারল। বনু বকরের এক লোক আমাদের প্রিয় নবীকে অবমাননা করে একটি কবিতা আবৃত্তি করল। তা শুনে খুজাআ গোত্রের এক যুবক সইতে না পেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিল। বনু বকর এটিকে অজুহাত বানিয়ে খুজাআ গোত্রের ওপর হামলা চালাল, অথচ চুক্তি অনুযায়ী খুজাআ গোত্র বিপদ থেকে নিরাপদ ছিল। এ হামলায় কুরাইশ মুশরিকরা অস্ত্র দিয়ে এবং গোপনে লোক পাঠিয়ে সাহায্য করল। তারা হারাম শরীফে খুজাআ গোত্রের বিশজনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করল। সংঘর্ষের সময় খুজাআ গোত্রের কিছু মুসলমান মহানবীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। খুজাআ গোত্রের ওপর রাতের বেলা চালানো এই অতর্কিত হামলায় বনু বকরের মধ্যে কুরাইশ মুশরিকরাও যে ছিল, তা অনেকে দেখেছিল।

সেই রাতে আমাদের প্রিয় নবী মদিনায় আমাদের মা হযরত মাইমুনার ঘরে ছিলেন। তিনি নামাজ আদায়ের জন্য উঠে অজু করছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলার অনুমতিতে মুজিযা হিসেবে তিনি শুনতে পেলেন যে, মক্কার মুসলমানরা তাঁর কাছে সাহায্য চাইছেন। তাঁদের জবাবে তিনি বললেন, “লাব্বাইক! তোমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছি!” আমাদের মা হযরত মাইমুনা দেখলেন, মহানবীর কাছে কেউ নেই, অথচ তিনি এভাবে কথা বলছেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কাছে কি কেউ আছে?”

আমাদের প্রিয় নবী তাঁকে মক্কায় সংঘটিত ঘটনা এবং এতে কুরাইশদের শরিক থাকার কথা জানালেন।

কুরাইশ মুশরিকরা বনু বকরকে সাহায্য করে খুজাআ গোত্রের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে এবং তাদের হত্যা করে হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্রের ধারাগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। এভাবে তারা সন্ধিপত্র ভঙ্গ করল।

আমাদের প্রিয় নবী এ খবর সেই মুহূর্তেই জেনে গিয়েছিলেন। তা ছাড়া ঘটনার তিন দিন পর খুজাআ গোত্রের আমর ইবনে সালিম চল্লিশজন অশ্বারোহী নিয়ে এসে রাসূলে আকরামকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সব খুলে বললেন। কিন্তু সে সময় বাণিজ্যের জন্য দামেস্কে যাওয়া কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান এ ঘটনার কিছুই জানত না। হাবিবুল্লাহ বললেন, “আমি যদি বনু খুজাআকে সাহায্য না করি, তাহলে আমাকেও যেন সাহায্য করা না হয়!” তারপর তিনি একটি চিঠি লেখালেন। কুরাইশ মুশরিকদের কাছে পাঠানো এ চিঠিতে আমাদের প্রিয় নবী লিখেছিলেন, “…হয় তোমরা বনু বকরের সঙ্গে তোমাদের মৈত্রী ত্যাগ করে সরে দাঁড়াবে, নয়তো বনু খুজাআর নিহত ব্যক্তিদের রক্তপণ (দিয়াত) পরিশোধ করবে! আমার এ কথাগুলোর কোনোটিই যদি পালন না করো, তাহলে জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব!…” কুরাইশরা এই দয়াটুকুও বুঝতে পারল না। তারা জবাব পাঠাল, “আমরা মৈত্রীও ছিন্ন করব না, রক্তপণও দেব না! আমরা কেবল যুদ্ধ করতে পারি।” কিন্তু এমন করার জন্য পরে তারা হাজারবার অনুতপ্ত হলো এবং ভয়ে চুক্তি নবায়নের জন্য আবু সুফিয়ানের অপেক্ষায় থাকতে লাগল।

“(হে মক্কার মুসলমানগণ!) লাব্বাইক! তোমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছি!” হাদীস শরীফ

আবু সুফিয়ান দামেস্ক থেকে ফিরলে তারা তাকে ঘটনাটি জানাল এবং বলল, “এ বিষয়টি অবশ্যই মিটিয়ে ফেলতে হবে। না মেটালে মুহাম্মদ আমাদের মক্কা থেকে তাড়িয়ে দেবে!” আবু সুফিয়ান বলল, “এ ঘটনার কথা আমি না জানলেও সন্ধি নবায়ন ও এর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।” এই বলে সে তখনই মদিনার পথে রওনা হলো।1 আবু সুফিয়ান মদিনায় পৌঁছানোর আগেই আমাদের প্রিয় নবী তার আগমনের কথা সাহাবায়ে কেরামকে জানিয়ে দিলেন এবং বললেন, “আমার মনে হয়, আবু সুফিয়ান সন্ধি নবায়ন করতে ও সন্ধির মেয়াদ বাড়াতে আসছে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হবে না, যেভাবে এসেছে সেভাবেই ফিরে যাবে!…”

তখনও মুসলমান না হওয়া আবু সুফিয়ান মদিনা মুনাওয়ারায় এল। সে তার মেয়ে, মহানবীর বরকতময় স্ত্রী ও মুমিনদের মা উম্মে হাবিবার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ঘরে গেল। সে আমাদের প্রিয় নবীর বিছানায় বসতে চাইল। আমাদের মা হযরত উম্মে হাবিবা সে বসার আগেই তাড়াতাড়ি বিছানাটি গুটিয়ে নিলেন। এতে তাঁর বাবা খুব মনঃক্ষুণ্ন হলো এবং বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, “হে আমার মেয়ে! এ বিছানাটি কি আমার কাছ থেকে আগলে রাখছ?” মুমিনদের মা হযরত উম্মে হাবিবা রাসূলুল্লাহর ভালোবাসাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিতেন; তিনি তাঁর বাবাকে উত্তর দিলেন, “এ বিছানা আল্লাহ তাআলার রাসূলের বিছানা। এতে মুশরিকরা বসতে পারে না! আপনি মুশরিক ও নাপাক (নাজিস)! এ বিছানায় বসা আপনার কিছুতেই শোভা পায় না!”

বাবা বলল, “হে আমার মেয়ে! আমার ঘর ছেড়ে আসার পর থেকে তোমার কিছু একটা হয়েছে!” তখন তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলাম নসিব করেছেন। আর যে পাথরের মূর্তি শোনেও না, দেখেও না, আপনি এখনও তার পূজা করছেন! আব্বা! আপনার মতো কুরাইশের একজন বড় ও প্রবীণ মানুষ কীভাবে ইসলাম থেকে দূরে থাকতে পারেন?…” বাবা ভীষণ রেগে গেল এবং বলল, “তুমি আমার সঙ্গে এত অসম্মানজনক আচরণ করছ, আমাকে মূর্খতার দোষ দিচ্ছ! তাহলে কি বাপ-দাদারা বছরের পর বছর যাদের পূজা করে এসেছে, সেগুলো ছেড়ে আমি মুহাম্মদের ধর্মে ঢুকব?!” এই বলে সে সেখান থেকে চলে গেল।2

আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে এসে কুরাইশ নেতা বলল, “আমি হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্র নবায়ন করতে ও এর মেয়াদ বাড়াতে এসেছি। এসো, আমাদের মধ্যকার এ চুক্তি লিখিতভাবে নবায়ন করি!” হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর দিলেন, “আমরা হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্রের বিরুদ্ধে কোনো আচরণ করি না এবং তা পরিবর্তনও করব না!” কুরাইশ নেতা বারবার “সন্ধিপত্র বদলাই! নবায়ন করি!…” বললেও আমাদের প্রিয় নবী তাকে কোনো উত্তর দিলেন না। নিজের সমস্ত চেষ্টা কোনো কাজে আসেনি দেখে কুরাইশ নেতা মক্কায় ফিরে গেল এবং মুশরিকদের অবস্থা জানাল। মুশরিকরা “তাহলে কিছুই করতে না পেরে ফিরে এলে, তাই না?!…” বলে তাকে তিরস্কার করল। এখন অপেক্ষা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না।

যে মসজিদুল হারামে আশ্রয় নেয়

আবু সুফিয়ান মদিনা থেকে চলে যাওয়ার পর আমাদের প্রিয় নবী মক্কা বিজয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ কুরাইশরা তাদের অঙ্গীকারে অটল থাকেনি এবং চুক্তি ভঙ্গ করেছিল। কিন্তু তিনি এ রহস্য অত্যন্ত গোপন রাখলেন। মুশরিকদের প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে এবং হারাম শরীফে রক্তপাত না ঘটিয়ে তিনি মক্কা অধিকার করতে চাইছিলেন। এটি ছিল একটি যুদ্ধকৌশল। কেননা মক্কা বিজয় হলে কে জানে, আরও কত মানুষ মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করবে! তিনি বিষয়টি কেবল হযরত আবু বকর এবং সাহাবীগণের বিশিষ্টদের কয়েকজনকে জানালেন। সাহাবীগণকে সফরের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দিলেন, কিন্তু কোথায় যাওয়া হবে তা জানালেন না। সাহাবায়ে কেরাম জিহাদের প্রস্তুতি শুরু করলেন। তা ছাড়া মহানবী আশপাশের মুসলমান গোত্রগুলো – আসলাম, আশজা, জুহাইনা, হুসাইন, গিফার, মুজাইনা, সুলাইম, দামরা এবং বনু খুজাআর কাছে খবর পাঠালেন। খবরে বলা হয়েছিল, “যারা আল্লাহ তাআলা ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, তারা যেন পবিত্র রমজান মাসের শুরুতে মদিনায় উপস্থিত থাকে।” এভাবে তাদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলো।

হাবিবুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্কতা হিসেবে মক্কাগামী পথগুলো আটকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব হযরত উমরকে দিলেন। হযরত উমর সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি পথ, গিরিপথ ও অন্যান্য রাস্তার মুখে পাহারাদার বসালেন এবং আদেশ দিলেন, “মক্কায় যেতে ইচ্ছুক প্রত্যেককে ফিরিয়ে দেবে!”

এ কাজ যেন গোপনে সম্পন্ন হয়, সেজন্য আমাদের প্রিয় নবী আল্লাহ তাআলার কাছে এই বলে দোয়া করছিলেন, “হে আমার রব! আমরা অতর্কিতে তাদের দেশে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত কুরাইশদের গুপ্তচর ও সংবাদবাহকদের আটকে রাখো, তাদের অন্ধ ও বধির করে দাও। তারা যেন আমাদের হঠাৎ করেই দেখে ও শোনে!”

উত্তরের মুশরিকদের কিংবা বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে – এমন ধারণা দেওয়ার জন্য মহানবী হযরত আবু কাতাদাকে একটি সেনাদলসহ উত্তর দিকে, ইজাম উপত্যকার দিকে পাঠালেন। এর মধ্যে মদিনার প্রস্তুতির খবর জানিয়ে মক্কার মুশরিকদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল; আমাদের প্রিয় নবী মুজিযা হিসেবে সে কথা জানিয়ে দিলেন। তিনি হযরত আলিকে পাঠিয়ে চিঠিটি ধরিয়ে আনলেন।

রমজান মাসের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত আশপাশের গোত্রগুলো থেকে সাহায্য এসে পৌঁছাল এবং সবাই আবু ইনাবা কূপের পাশের সেনাশিবিরে সমবেত হলেন। সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা বারো হাজারে পৌঁছাল। তাঁদের চার হাজার ছিলেন আনসার, সাতশো মুহাজির এবং বাকিরা আশপাশের মুসলমান গোত্রগুলোর লোক।3

আমাদের প্রিয় নবী মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে রেখে গেলেন।4 হযরত জুবাইর ইবনে আওয়ামকে দুইশোজনের একটি অশ্বারোহী দলের প্রধান করে অগ্রবর্তী দল হিসেবে আগে পাঠালেন। হিজরতের অষ্টম বছরে, পবিত্র রমজান মাসের দশ তারিখে, বুধবার জগৎসমূহের সরদার আল্লাহ তাআলার নাম নিয়ে বারো হাজারজনের বিশাল বাহিনীর নেতৃত্বে মদিনা থেকে রওনা হলেন; এ বাহিনীর সদস্যদের হৃদয় ছিল আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আট বছর আগে নির্যাতন ও জুলুম করে যেখান থেকে তাঁদের হিজরত করতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁরা সেই জন্মভূমি মক্কার দিকে যাচ্ছিলেন। মূর্তিঘরে পরিণত হওয়া মহান কাবাকে মূর্তি থেকে পবিত্র করতে যাচ্ছিলেন…

জেদ থেকে কিছুতেই সরে আসতে না চাওয়া মুশরিকদের প্রতি হক, ন্যায় ও দয়া দেখাতে যাচ্ছিলেন… আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রচার করতে, সেখানকার মানুষের জাহান্নামের চিরস্থায়ী আজাব থেকে মুক্তির উপায় হতে যাচ্ছিলেন। হে আমার রব! এ কত বড় দয়া ছিল!… ইসলামি বাহিনী জুলহুলাইফায় পৌঁছালে মক্কা থেকে পরিবারসহ হিজরত করে আসা মহানবীর চাচা হযরত আব্বাসের সঙ্গে দেখা হলো। আমাদের প্রিয় নবী চাচার আগমনে খুব খুশি হলেন এবং তাঁর মন খুশি করে বললেন, “হে আব্বাস! আমি যেমন নবীদের মধ্যে সর্বশেষ, তুমিও তেমনি মুহাজিরদের মধ্যে সর্বশেষ।” হযরত আব্বাসের মালপত্র মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আব্বাস মহানবীর সঙ্গে থেকে গেলেন এবং মক্কা বিজয়ে অংশ নিলেন।5 রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার কাছাকাছি কুদাইদে পৌঁছে তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণকে যুদ্ধের বিন্যাসে সাজালেন। প্রত্যেক গোত্রকে আলাদা আলাদা পতাকা দিলেন এবং সেগুলো প্রত্যেক গোত্রের পতাকাবাহীর হাতে তুলে দিলেন। মুহাজিরদের পতাকা বহন করছিলেন হযরত আলি, জুবাইর ইবনে আওয়াম ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। আনসারদের ছিলেন বারোজন পতাকাবাহী; আশজা ও সুলাইম গোত্রের একজন করে, মুজাইনা গোত্রের তিনজন, আসলাম গোত্রের দুজন, বনু খুজাআর তিনজন এবং জুহাইনা গোত্রের চারজন পতাকাবাহী ছিলেন।6 মদিনা থেকে বের হওয়ার দশ দিন হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যার দিকে তাঁরা মক্কার একেবারে কাছে এসে পড়লেন এবং এশার সময় মাররুজ জাহরানে পৌঁছালেন। মহানবী সাহাবীগণকে এখানে থামার আদেশ দিলেন। তা ছাড়া হযরত উমরকে দায়িত্ব দিয়ে প্রত্যেক মুজাহিদকে আগুন জ্বালানোর আদেশ দিলেন।7 হঠাৎ দশ হাজারেরও বেশি আগুন জ্বলে উঠলে মক্কা আলোয় ভেসে গেল। মক্কার মুশরিকরা কোনো কিছুরই খবর রাখত না; তারা হতভম্ব হয়ে পড়ল। কী ঘটেছে জানার জন্য তারা আবু সুফিয়ানকে পাঠাল। সে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ইসলামি বাহিনীর দিকে এগোল। এ সময় আমাদের প্রিয় নবী কয়েকজন সাহাবীকে বললেন, “আবু সুফিয়ানের দিকে নজর রাখো। নিশ্চয়ই তোমরা তাকে পেয়ে যাবে!” কুরাইশরা যতই এগোচ্ছিল, ততই তাদের বিস্ময় বাড়ছিল, ভয়ানক আতঙ্ক তাদের মন গ্রাস করছিল। মক্কার চারপাশে কত সৈন্য জড়ো হয়েছে, আর তারা কত আগুন জ্বালিয়েছে!… এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে তারা আরাক নামের জায়গায় এসে পৌঁছাল।

“হে আমার রব! আমরা অতর্কিতে তাদের দেশে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত কুরাইশদের গুপ্তচর ও সংবাদবাহকদের আটকে রাখো, তাদের অন্ধ ও বধির করে দাও। তারা যেন আমাদের হঠাৎ করেই দেখে ও শোনে!” হাদীস শরীফ

ঠিক তখনই মহানবী বললেন, “আবু সুফিয়ান এখন আরাকে আছে।” তখন হযরত আব্বাস মনে মনে বললেন, “সেখানে অবশ্যই কাউকে খুঁজে নিয়ে মক্কায় পাঠাব, যাতে সে তাদের জানায় যে, ইসলামি বাহিনী তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মক্কাবাসীরাও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাসূল আলাইহিস সালামের কাছে এসে নিরাপত্তা (আমান) চেয়ে নিক।” এই বলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে আরাকের দিকে রওনা হলেন। সেখানে এ উদ্দেশ্যে কাউকে খুঁজতে গিয়ে তিনি কণ্ঠস্বর শুনে আবু সুফিয়ানকে চিনে ফেললেন এবং ডাক দিলেন, “হে আবু হানজালা!” আবু সুফিয়ানও তাঁকে চিনে বলল, “হে আবুল ফজল! এ তো তুমি! আমার মা-বাবা তোমার জন্য কুরবান হোক!” তারপর তাঁরা একসঙ্গে ইসলামি শিবিরের দিকে পথ চলতে লাগলেন…

পথে আবু সুফিয়ান হযরত আব্বাসকে জিজ্ঞেস করল, “খবর কী?” তিনি বললেন, “হে আবু সুফিয়ান! তোমার জন্য আফসোস! রাসূল আলাইহিস সালাম এমন এক বাহিনী নিয়ে তোমাদের দিকে আসছেন, যার মোকাবিলা তোমরা করতে পারবে না। কসম করে বলছি, কুরাইশদের অবস্থা হবে ভয়াবহ। হায়, তাদের ভাগ্যে কী যে আছে!” আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা গভীর আশা নিয়ে মুজাহিদদের মাঝখান দিয়ে আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরবারে এল। বিশ্বজগতের সুলতান তাদের সুন্দরভাবে অভ্যর্থনা জানালেন। মক্কাবাসীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিলেন। অনেক রাত পর্যন্ত কথা বলার পর তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। হাকিম ইবনে হিজাম ও বুদাইল তখনই কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হলেন (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)। কিন্তু আবু সুফিয়ানের দ্বিধা তখনও কাটছিল না। সকাল হলে দয়ার সাগর আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “হে আবু সুফিয়ান! তোমার জন্য আফসোস! আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই – এ কথা জানার সময় কি এখনও আসেনি?” সে বলল, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! কোমলতায়, মর্যাদায় ও আত্মীয়তার হক রক্ষায় আপনার চেয়ে উত্তম কেউ নেই। আপনার প্রতি আমরা এত জুলুম করার পরও আপনি এখনও আমাদের হিদায়াতের (সঠিক পথের) দিকে আহ্বান করছেন। আপনি কত মহান দানশীল! আমি বিশ্বাস করলাম যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই… যদি থাকত, তবে আমার কোনো উপকারে আসত। আর আপনি আল্লাহর রাসূল।” এ কথা বলে তিনি সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন, রাদিয়াল্লাহু আনহু।8

হযরত আব্বাস বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবু সুফিয়ানকে কি এমন কিছু দান করবেন না, যা মক্কাবাসীদের কাছে তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দেবে?” মহানবী তা গ্রহণ করে বললেন, “যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করে আশ্রয় নেবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো, সে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।” হযরত আবু সুফিয়ান অনুরোধ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আরেকটু বিস্তৃত করবেন কি?” তখন আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “যে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে আশ্রয় নেবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো! যে দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে বসে থাকবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো।” রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাইলেন, আবু সুফিয়ান ইসলামি বাহিনীর প্রতাপ ও সংখ্যাধিক্য দেখুন এবং মক্কার মুশরিকদের তা জানান। তাই তিনি হযরত আব্বাসকে বললেন, “তাঁকে সেই গিরিপথে নিয়ে যাও, যেখানে উপত্যকা সরু হয়ে গেছে এবং ঘোড়াগুলো গাদাগাদি করে পার হয়। মুসলমানদের – আল্লাহ তাআলার বাহিনীর জাঁকজমক তিনি দেখুন।”

আবু সুফিয়ানের এটি দেখা দরকার ছিল – যাতে তিনি যে দৃশ্যের সাক্ষী হবেন, তা মুশরিকদের জানান এবং কেউ বাধা দিতে না আসে… এভাবে যেন হারাম শরীফে রক্তপাত না হয়… হযরত আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গিরিপথের দিকে যাওয়ার সময় মুজাহিদরা যুদ্ধের বিন্যাসে দাঁড়িয়ে গেলেন। গোত্রের পর গোত্র পতাকা উড়িয়ে গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করতে লাগলেন। প্রত্যেকের গায়ে বর্ম, হাতে অস্ত্র। প্রতিটি দল অতিক্রম করার সময় তাকবির দিচ্ছিলেন। হযরত আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করছিলেন, “এঁরা কারা?” আর হযরত আব্বাস উত্তর দিচ্ছিলেন, “এঁরা বনু সুলাইম! এঁদের সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ!” “এঁরা বনু গিফার!” “এঁরা বনু কাব!…” “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” ধ্বনিতে আকাশ-পৃথিবী ভরে যাচ্ছিল; মুজাহিদদের সংখ্যাধিক্য ও অস্ত্রের ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। হযরত আবু সুফিয়ানের সবচেয়ে বেশি কৌতূহল ছিল বিশ্বজগতের গৌরব মহানবীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে। তাঁর চারপাশের সৈন্যদের অতিক্রমের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন; তাঁর ধারণা ছিল, তাঁরা অন্যদের থেকে আলাদা হবেন। তাই তিনি বারবার জিজ্ঞেস না করে পারছিলেন না, “এটা কি রাসূলুল্লাহর দল?”… অবশেষে নবীদের সুলতান, জগৎসমূহের সরদার সূর্যের মতো নূর ছড়িয়ে উটনী কাসওয়ার পিঠে দেখা দিলেন। তাঁর চারপাশে ছিলেন মুহাজির ও আনসারগণ। তাঁদের প্রত্যেকে আপাদমস্তক দাউদি বর্মে আবৃত, কোমরে ভারতীয় তরবারি ঝোলানো, উন্নত জাতের ঘোড়া ও উটে আরোহী ছিলেন।

তাঁদের দেখে হযরত আবু সুফিয়ান কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আব্বাস! এঁরা কারা?” তিনি বললেন, “মাঝখানে যিনি, তিনি রাসূল আলাইহিস সালাম। আর তাঁর চারপাশে যাঁরা, তাঁরা শহিদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জ্বলতে থাকা আনসার ও মুহাজিরগণ!…” তাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত আবু সুফিয়ানকে বললেন, “আজ সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা কাবার মর্যাদা সমুন্নত করবেন। আজ বাইতুল্লাহকে গিলাফ পরানোর দিন! আজ দয়ার দিন… আজ সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের (ইসলামের মাধ্যমে) সম্মানিত করবেন।”

হযরত আবু সুফিয়ান যা দেখার দেখে নিয়েছিলেন, যা শোনার শুনে নিয়েছিলেন। তিনি বললেন, “আমি বাইজান্টাইন সম্রাট (কায়সার) ও পারস্য-সম্রাটের (কিসরার) রাজত্ব দেখেছি। কিন্তু এমন জাঁকজমক কখনো দেখিনি। আজকের মতো এমন বাহিনী ও জনসমাবেশের মুখোমুখি আমি কখনো হইনি। এমন বাহিনীর মোকাবিলা কেউ করতে পারবে না। তাদের ওপর কারও শক্তি চলবে না।” এই বলে তিনি মক্কার পথ ধরলেন…

“যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করে আশ্রয় নেবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো, সে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে… যে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে আশ্রয় নেবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো! যে দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে বসে থাকবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো” হাদীস শরীফ

মুশরিকরা অধীর হয়ে আবু সুফিয়ানের অপেক্ষায় ছিল। তিনি মক্কায় ফিরে এসে তাদের সামনে নিজের মুসলমান হওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। তারপর বললেন, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম এমন বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমাদের একেবারে পাশে এসে পড়েছেন, যার মোকাবিলা তোমরা করতে পারবে না। অযথা নিজেদের প্রতারিত কোরো না। মুসলমান হয়ে যাও, যাতে রক্ষা পাও। তোমরা যা দেখোনি, আমি তা দেখেছি। অগণিত বীর, ঘোড়া ও অস্ত্র দেখেছি। তাদের ওপর কারও শক্তি চলবে না। যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, সে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। যে বাইতুল্লাহয় আশ্রয় নেবে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। যে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করবে, তাকেও নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।”9

এরপর মুশরিকদের সবচেয়ে উগ্র কয়েকজন হযরত আবু সুফিয়ানের বিরোধিতা করে তাঁকে অপমান করল। এমনকি ইসলামি বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য তারা তাড়াহুড়া করে প্রস্তুতি নিতে লাগল। কিন্তু তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। বাকিরা তাদের কথায় কান না দিয়ে নিজ নিজ ঘরে ছুটে গেল। আর কেউ কেউ মসজিদুল হারামে আশ্রয় নিল।

সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও গৌরবময় সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) জি-তুওয়া উপত্যকায় এসে সমবেত হলেন। জগৎসমূহের সরদার মুবারক চোখে সাহাবায়ে কেরামের দিকে একবার তাকালেন; তখন তাঁর মনে পড়ল আট বছর আগে মক্কা ছেড়ে যাওয়ার কথা, হিজরতের কথা। তাঁর মনে পড়ল, সে সময় মুশরিকরা তাঁর সাদাতখানা ঘিরে রেখেছিল, তিনি সূরা ইয়াসিনের পবিত্র আয়াত পড়তে পড়তে বেরিয়ে এসেছিলেন, হযরত আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে কারও চোখে না পড়ে সাওর গুহায় প্রবেশ করেছিলেন, আর মক্কার সীমানা ছাড়ার আগে শেষবারের মতো মক্কার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন:

“(হে মক্কা!) আল্লাহর কসম, আমি জানি, আল্লাহ তাআলা যত স্থান সৃষ্টি করেছেন, তুমি সেগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম। আমার রবের কাছেও, আমার কাছেও তুমি সবচেয়ে প্রিয়। আমাকে যদি জোর করে তোমার থেকে বের করে দেওয়া না হতো, তাহলে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” তাঁর এই বেদনাভরা অবস্থায় জিবরাইল আলাইহিস সালাম সূরা কাসাসের ৮৫তম পবিত্র আয়াত পাঠ করে তাঁর মুবারক মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং মক্কা মুকাররমায় ফিরে আসার সুসংবাদ দিয়েছিলেন – এ কথাও তাঁর মনে পড়ল। আরও মনে পড়ল, মুষ্টিমেয় সাহাবী নিয়ে বদর, উহুদ, খন্দক, খায়বার ও মুতায় তিনি কীভাবে শত্রুদের ওপর বিজয়ী হয়েছিলেন। এখন তাঁর বারো হাজার সাহাবী প্রদীপের চারপাশের পতঙ্গের মতো তাঁকে ঘিরে আছেন এবং মক্কায় প্রবেশের জন্য তাঁর একটিমাত্র আদেশের অপেক্ষা করছেন। এসব যিনি দান করেছেন, সরওয়ারে আলম সেই আল্লাহ তাআলার প্রতি গভীরতম কৃতজ্ঞতা ও শোকরে পূর্ণ হয়ে তাঁর প্রশংসা (হামদ) করলেন। বিনয়ের সঙ্গে মুবারক মাথা নত করলেন। ফখরে কায়েনাত (বিশ্বজগতের গৌরব) তাঁর বীর সাহাবীগণকে চারটি দলে ভাগ করলেন। ডান বাহুর সেনাপতি নিযুক্ত করলেন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে, বাম বাহুর সেনাপতি হযরত জুবাইর ইবনে আওয়ামকে, পদাতিক বাহিনীর প্রধান হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহকে এবং অপর দলের প্রধান হযরত সাদ ইবনে উবাদাকে। হযরত খালিদ দক্ষিণ দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করবেন, মুশরিকদের মধ্যে যে বাধা দেবে তাকে শাস্তি দেবেন এবং সাফা পাহাড়ে ফখরে কায়েনাতের সঙ্গে মিলিত হবেন। হযরত জুবাইর উত্তর দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করবেন, হাজুন নামক স্থানে পতাকা গেঁথে সরওয়ারে আলমের অপেক্ষা করবেন। পশ্চিম দিক থেকে অগ্রসর হবেন হযরত সাদ ইবনে উবাদা।10

“আজ সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা কাবার মর্যাদা সমুন্নত করবেন। আজ বাইতুল্লাহকে গিলাফ পরানোর দিন! আজ দয়ার দিন… আজ সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের (ইসলামের মাধ্যমে) সম্মানিত করবেন” হাদীস শরীফ

রাসূলে আকরাম সেনাপতিদের বললেন, “তোমাদের ওপর আক্রমণ না করা হলে কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না। কাউকে হত্যা করবে না।” তবে যাদের নাম নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছিল, তাদের যে-ই ধরা পড়ুক, এমনকি কাবার গিলাফের নিচে লুকালেও, তার শিরশ্ছেদ করা হবে।11

হক এল, বাতিল বিলুপ্ত হলো

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের আগমনের খবর পেয়ে ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ও সুহাইল ইবনে আমর বনু বকর ও বনু হারিসের কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে পথের মুখ আটকে অপেক্ষা করতে লাগল। মুজাহিদদের মধ্যে সবার আগে অগ্রসর হলেন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। মক্কার দক্ষিণে খান্দামা পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে তিনি দেখলেন, উগ্র কুরাইশ মুশরিকরা তাঁদের দিকে তির বর্ষণ করছে। দুজন মুজাহিদ শহিদ হলেন – একজন কুরজ ইবনে জাবির, অন্যজন হাবাশ ইবনে আশআর। হযরত খালিদ যুদ্ধের বিন্যাসে দাঁড়ানো সৈন্যদের আদেশ দিলেন, “কেবল যারা পরাজিত হয়ে পালাচ্ছে, তাদের হত্যা করা হবে না।” এরপর তাঁরা সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুহূর্তের মধ্যে মুশরিকদের পিছু হটিয়ে মসজিদুল হারাম পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন। সংঘর্ষে সত্তরজন মুশরিক নিহত হলো।12 মুশরিকদের একাংশ পাহাড়ের চূড়ায়, একাংশ নিজেদের ঘরে পালিয়ে গেল।

মক্কা মুকাররমা বিজয়

অন্যান্য দিক থেকে পবিত্র মক্কায় প্রবেশকারী গৌরবময় সাহাবীগণ কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হলেন না। যাদের হত্যার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তাদের পাঁচজন ধরা পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের শাস্তি কার্যকর করা হলো। বাকিরা মক্কা থেকে পালিয়ে গেল। রমজান মাসের বিশ তারিখ, বৃহস্পতিবার মুজাহিদরা প্রবল উদ্দীপনায় ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” তাকবির ধ্বনির মধ্যে মক্কায় প্রবেশ করছিলেন। সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটনী কাসওয়ার পিঠে, পেছনে উসামা ইবনে জায়েদকে বসিয়ে, গভীর বিনয়ের সঙ্গে নিজের জন্মভূমি পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করছিলেন। এ দিনগুলো যিনি তাঁকে দেখালেন, সেই আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের সুসংবাদদাতা সূরা ফাতহ তিলাওয়াত করছিলেন।

ফখরে কায়েনাত গভীর আনন্দে বিজয়ী সাহাবীগণের মাঝে কাবা মুআজ্জমার দিকে এগিয়ে গেলেন। ডানে হযরত আবু বকর, বামে হযরত উসাইদ ইবনে হুদাইরকে নিয়ে তিনি কাবা মুআজ্জমার কাছে পৌঁছালেন। হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) জিয়ারতের পর তালবিয়া ও তাকবির পাঠ করলেন। সাহাবীগণ তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলালেন, আর “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” ধ্বনিতে মক্কা মুকাররমার আকাশ গমগম করে উঠল। এই মহিমাময় দৃশ্যের সামনে মুসলমানরা আনন্দাশ্রু ফেলছিলেন, আর হারাম শরীফে আশ্রয় নেওয়া কিংবা ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকা মুশরিকরা ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছিল।

তারপর জগৎসমূহের সরদার ও তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণ তাওয়াফ শুরু করলেন। সপ্তম চক্কর শেষ করার পর আমাদের প্রিয় নবী উটনী থেকে নামলেন এবং মাকামে ইবরাহিমে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। তারপর হযরত আব্বাস কূপ থেকে যে জমজমের পানি তুললেন, তা পান করলেন। জমজমের পানি দিয়ে অজু করতে চাইলেন। ফখরে কায়েনাত যখন অজু করছিলেন, সাহাবায়ে কেরাম আমাদের প্রিয় নবীর দেহ মুবারক স্পর্শ করা অজুর পানি মাটিতে পড়তে না দিয়ে শূন্যেই কাড়াকাড়ি করে ধরতে লাগলেন। এ দেখে মুশরিকরা বিস্মিত হয়ে বলল, “আমরা জীবনে এমন বাদশাহ কখনো দেখিনি, শুনিওনি।” সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাবার চারপাশে পাথর ও কাঠের তৈরি সমস্ত মূর্তি ভেঙে ফেলার ইচ্ছা করলেন। তিনি সেই পবিত্র আয়াত পাঠ করলেন, যার মর্মার্থ: “হক এলে বাতিল দূর হয়ে যায়; বাতিল তো সবসময় দূর হওয়ারই”13 এবং মুবারক হাতের লাঠিটি মূর্তিগুলোর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। লাঠি যে মূর্তিই স্পর্শ করল, সেটিই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তিনশো ষাটটি মূর্তি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো।14 জোহরের সময় হলে রাসূলে আকরাম হযরত বিলালকে কাবায় মুহাম্মদি আজান দেওয়ার আদেশ দিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এ পবিত্র দায়িত্ব পালন করলেন। আজান দেওয়ার সময় মুমিনদের অন্তরে সীমাহীন আনন্দ জাগছিল, আর মুশরিকরা তীব্র যন্ত্রণা ও দুঃখে দগ্ধ হচ্ছিল।15

আমাদের প্রিয় নবী কাবার চাবি চাইলেন। চাবি আনা হলো। ভেতরের ছবিগুলো এবং ভাঙা সমস্ত মূর্তি বের করে ফেলার পর তিনি কাবায় প্রবেশ করলেন।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন হযরত উসামা ইবনে জায়েদ, হযরত বিলাল ও হযরত উসমান ইবনে তালহা। ভেতরে মহানবী দরজাকে পেছনে রেখে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। প্রতিটি কোণে তাকবির দিয়ে দোয়া করলেন। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং লোকজনের ভিড় ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন।

“হক এলে বাতিল দূর হয়ে যায়; বাতিল তো সবসময় দূর হওয়ারই” বনি ইসরাইল: ৮১

বিশ্বজগতের সুলতান তাঁর দুই মুবারক হাতে কাবার দরজার দুই পাল্লা ধরে ছিলেন। সমস্ত কুরাইশ মসজিদুল হারামে ভিড় করে ভয় মেশানো আশা নিয়ে আমাদের প্রিয় নবীর দিকে তাকিয়ে ছিল। কারণ তারা মহানবীকে অপমান করেছিল, তাঁকে মারতে উদ্যত হয়েছিল, তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল!… তাঁর সাহাবীগণের ওপর সব রকমের নির্যাতন চালিয়েছিল। গলায় দড়ি বেঁধে তাঁদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল। আগুনে ফেলে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। উত্তপ্ত পাথর বুকে চাপা দিয়ে অজ্ঞান হওয়া পর্যন্ত নির্যাতন করেছিল। আগুনে লাল করা শিক শরীরে বিঁধিয়ে দিয়েছিল। তিন বছর অনাহারে-তৃষ্ণায় একটি মহল্লায় অবরুদ্ধ রেখে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছিল। পা উটের সঙ্গে বেঁধে উটগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন দিকে হাঁকিয়ে তাঁদের ছিন্নভিন্ন করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের জন্মভূমি থেকে বের করে দিয়েছিল। এতেও যেন যথেষ্ট হয়নি, তাঁদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার জন্য কতবার যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তারা আশাবাদী ছিল। কারণ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত দয়ার সাগর। কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! এখন তোমাদের ব্যাপারে আমি কী করব বলে তোমরা মনে করো?” তারা বলল, “আমরা আপনার কাছে কল্যাণ আশা করি, কল্যাণেরই প্রত্যাশা রাখি। কেননা আপনি মহানুভব ভাই। আপনি আমাদের মহানুভব ও দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। আপনি আমাদের ওপর বিজয়ী হয়েছেন। আপনার কাছে আমরা সদাচরণ প্রত্যাশা করি।” রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “আমার ও তোমাদের অবস্থা হবে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ভাইদের যা বলেছিলেন, তেমনই। তাঁর মতো আমিও বলছি, ’আজ আমি তোমাদের কৃতকর্মের জন্য আর কোনো হিসাব চাইব না (তোমাদের ভুলগুলো তোমাদের মুখের ওপর ছুড়ে মারব না)। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ক্ষমা করুন।’16 যাও, তোমরা মুক্ত, তোমরা স্বাধীন।”

এই মহান দয়া কঠিন হৃদয়গুলোকে নরম করে দিল, ঘৃণাকে ভালোবাসায় পরিণত করল। জগৎসমূহের সরদার তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা মুসলমান হওয়ার জন্য সমবেত হলো।

আমাদের প্রিয় নবী কুরাইশদের কাছে তাঁর নবুয়ত ঘোষণা করে প্রথম যেখানে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন, সেই সাফা পাহাড়ে উঠলেন। সেখানে আবার ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকল মক্কাবাসীর বাইআত (শপথ) গ্রহণ করলেন। এভাবে কুরাইশরা মুসলমান হয়ে সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন। পুরুষদের সঙ্গে অঙ্গীকারের পর নারীদের কাছ থেকেও কিছু বিষয়ে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হলো।17 আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শরিক না করা, মহানবীর অবাধ্য না হওয়া, চুরি না করা, সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষা করা, অপবাদ (বুহতান) না দেওয়া, কন্যাসন্তানদের হত্যা না করা – এগুলো ছিল তার অন্তর্ভুক্ত। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরবারে উপস্থিত নারীরা এসবই মেনে নিলেন এবং কেবল মুখের কথায় অঙ্গীকার করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের জন্য কল্যাণের দোয়া করলেন এবং তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী ও মুআবিয়ার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) মা হিন্দও (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁদের মধ্যে ছিলেন, এমনকি তিনি ছিলেন তাঁদের নেত্রী। এই নারীদের বাইআতে নারীদের পক্ষ থেকে তিনিই কথা বলেছিলেন। (এই অঙ্গীকার এবং এই ইস্তিগফারের দোয়া লাভের কারণে তিনি সফল হয়েছেন বলে বিরাট আশা করা যায়। মুসলমান নারীদের যে কেউ এ শর্তগুলো মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী চললে তিনি এই অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবেন এবং এই দোয়ার বরকত লাভ করবেন।) মুসলমান হওয়া প্রত্যেকে নিজেদের ঘরের সমস্ত মূর্তি ভেঙে ফেললেন। আশপাশের গোত্রগুলোর কাছে সেনাদল পাঠানো হলো এবং সেখানকার মূর্তিগুলোও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো। এভাবে হকের আগমনে বাতিলের মূলোৎপাটন হলো।

দণ্ডপ্রাপ্তরা

ইসলামের প্রথম দিনগুলো থেকে হিজরতের অষ্টম বছর পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধের কারণে যাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছিল, এমন কিছু লোক ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের (পুরুষদের মধ্যে এগারোজন ও নারীদের মধ্যে ছয়জনের) নাম উল্লেখ করে আদেশ দিলেন, “এদের যেখানেই দেখবে, সেখানেই হত্যা করবে।” দণ্ডপ্রাপ্ত পুরুষরা ছিল: ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, ওয়াহশি ইবনে হারব হাবশি, আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহ, হাব্বার ইবনে আসওয়াদ, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, কাব ইবনে জুহাইর, আবদুল্লাহ ইবনে জাবারি, আবদুল উজ্জা ইবনে খাতাল, হুওয়াইরিস ইবনে মুআজ, মাকিস ইবনে সাবাবা ও হারিস ইবনে তুলা। আর নারীরা ছিল: হিন্দ বিনতে উতবা, কারিতা, কারিতে, ইবনে হানজালার আরেকজন দাসী, বনু আবদুল মুত্তালিবের দাসী সারা এবং উম্মে সাদ।

যাঁরা দয়া লাভ করলেন

হিন্দ বিনতে উতবা: মুসলমান হওয়া নারীদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ, যাঁর নাম হত্যার তালিকায় ছিল। কিন্তু জগৎসমূহের জন্য রহমত আমাদের প্রিয় নবী তাঁকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। হিন্দ মুসলমানদের সবসময় কষ্ট ও যন্ত্রণা দিত। হযরত হামজা ও উহুদের অন্যান্য শহিদের প্রতি যে নিষ্ঠুরতা করা হয়েছিল, তা তারই প্ররোচনায় করা হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের দিন বিশ্বজগতের গৌরব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাফা পাহাড়ে উঠে বসলেন। হযরত উমর ফারুক তাঁর নিচের দিকে বসলেন। প্রথমে পুরুষরা, তারপর নারীরা এসে একে একে মুসলমান হলেন। নারীদের মধ্যে ছিলেন হযরত আলির বোন উম্মে হানি এবং হযরত মুআবিয়ার মা হিন্দ। হিন্দ রাসূলুল্লাহর কাছে বাইআত করলেন। নারীদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার সম্পন্ন করলেন। বরকতময় দোয়া লাভে ধন্য হলেন।

ইকরিমা ইবনে আবি জাহল: সে আবু জাহলের পুত্র। দয়া লাভকারী পুরুষদের মধ্যে সে-ও ছিল। মক্কা বিজয়ের দিন সে একজন সাহাবীকে শহিদ করে ইয়েমেনে পালিয়ে গেল। এ খবর রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছালে তিনি মুচকি হাসলেন। সাহাবীগণ এর কারণ জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ বললেন, “ইকরিমা ও তার হাতে যিনি শহিদ হয়েছেন, দুজনে হাতে হাত ধরে জান্নাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।” ইকরিমার স্ত্রী উম্মে হাকিম বিনতে হারিস ইবনে হিশাম নারীদের বাইআতে মুসলমান হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর কাছে ইকরিমার জন্য নিরাপত্তা (আমান) চেয়ে নিয়েছিলেন। ইকরিমা উম্মে হাকিমের সঙ্গে মক্কায় ফিরে এলেন এবং রাসূলুল্লাহর দরবারে গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। রাসূলুল্লাহও দুই হাত তুলে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ইকরিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ঈমান আনার পর বিপুল চেষ্টা ও উদ্যম দেখালেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামের বীরদের অন্যতম হলেন। ওমানে ও ইয়েমেনে জিহাদ করলেন এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহিদ হলেন।

ওয়াহশি ইবনে হারব হাবশি: সে উহুদের যুদ্ধে হযরত হামজাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শহিদ করেছিল। মুসলমানরা তাকে হত্যা করতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। উহুদে রাসূলুল্লাহ কয়েকজন কাফিরের প্রতি বদদোয়া করেছিলেন। লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়াহশির প্রতি কেন লানত করছেন না?” তখন তিনি বললেন, “মিরাজের রাতে আমি হামজা ও ওয়াহশিকে বাহুতে বাহু জড়িয়ে একসঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেখেছি।” মক্কা বিজয়ের দিন ওয়াহশি পালিয়ে গেল। পরে অনুতপ্ত হয়ে তিনি তায়েফবাসীদের সঙ্গে মদিনায় মসজিদে এসে সালাম দিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর সালামের জবাব দিলেন। ওয়াহশি ঈমান আনলেন এবং ক্ষমা লাভ করলেন। তবে তাঁকে ইয়ামামার দিকে চলে যেতে আদেশ করা হলো। রাসূলুল্লাহর সামনে তিনি অত্যন্ত লজ্জিত ছিলেন এবং মাথা নিচু করে জীবন কাটালেন। আর কখনো মদিনায় আসেননি। ঈমান আনার পর তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে গেলেন। সকল আউলিয়ার চেয়েও উচ্চ মর্যাদা লাভ করলেন।

“আমার ও তোমাদের অবস্থা হবে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ভাইদের যা বলেছিলেন, তেমনই। তাঁর মতো আমিও বলছি, ‘আজ আমি তোমাদের কৃতকর্মের জন্য আর কোনো হিসাব চাইব না (তোমাদের ভুলগুলো তোমাদের মুখের ওপর ছুড়ে মারব না)। আল্লাহ তাআলা তোমাদের ক্ষমা করুন’ (সূরা ইউসুফ: ৯২)। যাও, তোমরা মুক্ত, তোমরা স্বাধীন” হাদীস শরীফ

হিজরতের একাদশ বছরে ইয়ামামায় মুরতাদদের সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধ হলো। মুসাইলামার বাহিনীর বিশ হাজারজন প্রাণ হারাল, আর খালিদ ইবনে ওয়ালিদের বাহিনীর দুই হাজারজন শহিদ হলেন। প্রথমে মুসলমানরা পিছু হটতে শুরু করলেন। তখন হযরত ওয়াহশি বীরের মতো আক্রমণ চালালেন এবং যে বর্শা দিয়ে হযরত হামজাকে শহিদ করেছিলেন, সেই বর্শা দিয়েই মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে হত্যা করলেন।18 এ দেখে মুসলমানরা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং বিজয় অর্জিত হলো। রাসূলুল্লাহ যে একসময় ওয়াহশিকে ইয়ামামার দিকে পাঠিয়েছিলেন, তা যে এক বিরাট মুজিযা ছিল, এভাবেই তা প্রকাশ পেল। হিজরি দ্বাদশ বছরে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি অংশ নিলেন এবং বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব দেখালেন। তিনি হিমসে বসবাস করতে লাগলেন এবং হযরত উসমানের খিলাফতকালে সেখানেই ইন্তেকাল করলেন।

দোষীদের ওজর মেনে নিতেন ক্ষমা ও করুণায়,
মহান চরিত্রের, দয়ালু, স্নেহময় সেই দানশীলতার খনি।
ধন ভালোবাসেননি, দারিদ্র্য ভালোবেসে গর্ব করতেন,
মিসকিনদের আপন ভাই করে নিতেন সেই দানশীলতার খনি।
পোশাকে তালি লাগাতেন, পায়ে পরতেন কাঠের খড়ম,
প্রত্যেক রোগীর কাছে গিয়ে দাওয়াই দিতেন সেই দানশীলতার খনি।
পরিবারের সেবা নিজ হাতে আনন্দে করতেন,
সকল কঠিন কাজ সহজ করে দিতেন সেই দানশীলতার খনি।
যবের রুটি আর মসুরের ডালের জন্যও যদি
দাওয়াত পেতেন, অতিথি হতেন সেই দানশীলতার খনি।
কখনো উটে, কখনো ঘোড়ায়, কখনো খচ্চরে, কখনো গাধায় চড়তেন,
কখনো খালি পায়ে হাঁটতেন সেই সুলতান, সেই দানশীলতার খনি।