আমার প্রিয় নবী

খন্দকের যুদ্ধ

একে আহজাবের যুদ্ধও বলা হয়। আহজাব হলো “হিজব” শব্দের বহুবচন। হিজব অর্থ দল, গোষ্ঠী, অংশ। এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কয়েকটি দল একজোট হয়েছিল বলে একে আহজাবের যুদ্ধ বলা হয়েছে। তখন হিজরতের পঞ্চম বছর। মদিনা মুনাওয়ারা থেকে বিতাড়িত, ফিতনা-ফাসাদের উৎস ইহুদি বনু নাজির কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে একাংশ শামে (সিরিয়ায়), আরেক অংশ খায়বারে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ইসলাম ও মহানবীর প্রতি বিদ্বেষ আর প্রতিশোধের আগুন তাদের অন্তর ছেয়ে ফেলেছিল। তাদের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাব নিজ গোত্রের নেতৃস্থানীয়দের মধ্য থেকে বিশজনকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় গেল। তারা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের প্রিয় নবীর মুবারক সত্তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে চুক্তি করতে বসল। তারা বলল, “এ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এক মুহূর্তের জন্যও তোমাদের পাশ ছাড়ব না!” আবু সুফিয়ান বলল, “যারা আমাদের শত্রুর শত্রু, তারা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আমরা যেন তোমাদের বিশ্বাস করতে পারি, সেজন্য তোমাদের আমাদের মূর্তিগুলোর পূজা করতে হবে। কেবল তারপরই আমরা তোমাদের আন্তরিকতা মেনে নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারব।” উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিজেদের দ্বীন পর্যন্ত বিকিয়ে দিতে প্রস্তুত বিশ্বাসঘাতক ইহুদিরা মূর্তিগুলোর সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল… কিতাবধারী কাফির থেকে তারা কিতাবহীন কাফিরে পরিণত হলো। আমাদের প্রিয় নবীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার এবং দ্বীন ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য তারা শপথ করল।

মুশরিকরা সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করল। প্রতিবেশী মুশরিক গোত্রগুলোর কাছেও লোক পাঠাল। ইহুদিরাও বিভিন্ন গোত্রকে রাজি করানোর জন্য তৎপর হলো। কিছু গোত্রকে অর্থ ও খেজুরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা অস্ত্রসজ্জিত করল। মুশরিকরা মক্কার আশপাশ থেকে চার হাজারজনের এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুলল। আবু সুফিয়ান দারুন নাদওয়ায় পতাকা বেঁধে তা উসমান ইবনে তালহার হাতে দিল। বাহিনীতে ছিল তিনশো ঘোড়া, প্রচুর অস্ত্র ও এক হাজার পাঁচশো উট।

চার হাজারজনের মুশরিক বাহিনী মাররুজ জাহরানে পৌঁছালে বনু সুলাইম, বনু ফাজারা, গাতাফান গোত্র, বনু মুররা, বনু আসাদ প্রভৃতি বহু গোত্র ছয় হাজার লোক নিয়ে এসে যোগ দিল এবং মুশরিক বাহিনীর সংখ্যা দশ হাজারে পৌঁছে দিল। সেই যুগের হিসাবে এটি ছিল অত্যন্ত বিশাল এক শক্তি।

খুজাআ গোত্র অনেক আগে থেকেই রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখে চলত। তারা সঙ্গে সঙ্গে মদিনায় খবর পাঠাল: দশ দিনের পথ চার দিনে পাড়ি দিয়ে এক অশ্বারোহী মহানবীকে মুশরিকদের অবস্থার বিস্তারিত খবর জানাল।

সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করা ছিল আমাদের প্রিয় নবীর রীতি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সাহাবীদের একত্র করে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। যুদ্ধ কোথায় ও কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে প্রত্যেক সাহাবী নিজ নিজ প্রস্তাব জানালেন। এই মজলিসে উপস্থিত হযরত সালমান ফারসি কথা বলার অনুমতি নিয়ে বললেন:

“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের দেশে যুদ্ধের একটি পদ্ধতি আছে। শত্রুর অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা হলে আমরা চারপাশে পরিখা (খন্দক) খনন করে আত্মরক্ষা করতাম।” এই পদ্ধতি মহানবী ও সাহাবায়ে কেরাম উভয়েরই পছন্দ হলো এবং এভাবেই শত্রুর মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।1

মহানবী সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে পরিখা কোথায় খনন করা দরকার, তা সরেজমিনে দেখে নিলেন। মদিনার দক্ষিণ দিক ছিল বাগানে ভরা, ঘন গাছপালায় ঢাকা। এদিক দিয়ে মুশরিকদের সম্মিলিত আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল কম।

“হে আয়েশা! তোমার জন্য সুসংবাদ! হক তাআলা তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। তিনি তোমার পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়েছেন” হাদীস শরীফ

তা ছাড়া অল্পসংখ্যক সৈন্য দিয়েই এ দিকটা রক্ষা করা সম্ভব ছিল। আর পূর্ব দিকে বাস করত বনু কুরাইজা নামের ইহুদি গোত্র, যাদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল। এ কারণে মুশরিকরা কেবল পশ্চিম ও উত্তর দিকের খোলা প্রান্তর দিয়েই আক্রমণ করতে পারত। পরিখা খননের জায়গাগুলো এই দিকগুলোতেই নির্ধারণ করা হলো। সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকের ভাগে পড়ল প্রায় তিন মিটার জায়গা। প্রত্যেকে নিজের ভাগের জায়গা দুই মানুষ সমান (প্রায় ৩.৫ মিটার) গভীর করে খুঁড়বেন, আর পরিখা এতটা চওড়া হবে যে, দ্রুতগামী ঘোড়াও তা লাফিয়ে পার হতে পারবে না (৭–৮ মিটার)। সময় ছিল খুব কম। শত্রু মক্কা থেকে বের হয়ে মদিনার দিকে এগিয়ে আসছিল। যত দ্রুত সম্ভব পরিখা খনন শেষ করা দরকার ছিল।

আমাদের প্রিয় নবী স্বয়ং বীর সাহাবীদের সঙ্গে সবার সামনে থেকে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে প্রথম কোদালের আঘাত হানলেন। সবাই প্রাণপণ চেষ্টায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিখা খুঁড়তে লাগলেন। এমনকি শিশুরাও এ কাজে অংশ নিল। রাসূলুল্লাহর জন্য জুবাব টিলার ওপর একটি তুর্কি তাঁবু খাটানো হলো।2 পরিখা থেকে তোলা মাটি ঝুড়িতে করে এই টিলার চারপাশে ফেলা হচ্ছিল, আর ফেরার পথে শত্রুর দিকে ছোড়ার জন্য সালা পাহাড় থেকে পাথর বয়ে আনা হচ্ছিল। যাঁরা ঝুড়ি পাননি, তাঁরা কাপড়ের আঁচলে করে মাটি বইছিলেন। আমাদের প্রিয় নবীও ক্লান্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত কাজ করে যেতেন। এ দেখে সাহাবায়ে কেরামের উৎসাহ আরও বেড়ে যেত। তাঁরা বলতেন, “আমাদের প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের পরিশ্রমই যথেষ্ট। আপনি কাজ করবেন না, বিশ্রাম নিন।” তবুও তিনি উত্তর দিতেন, “আমিও পরিশ্রম করে তোমাদের অর্জিত সওয়াবে শরিক হতে চাই।”

সে দিনগুলোতে আবহাওয়া ছিল খুব ঠান্ডা। তার ওপর সে বছর খরার কারণে দুর্ভিক্ষ চলছিল। খাবার জোগাড় করাও ছিল খুব কঠিন। জগৎসমূহের সরদারসহ সাহাবায়ে কেরামের সবাই ভীষণ ক্ষুধায় কাতর ছিলেন। ক্ষুধার মধ্যেও শরীরে শক্তি অনুভব করার জন্য তাঁরা পেটে পাথর বাঁধতেন, পাকস্থলী চেপে ধরে খাবারের প্রয়োজন দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত আমাদের প্রিয় নবী নিজের ক্ষুধার কথা ভাবতেন না। এই ঠান্ডায় সাহাবীদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাজ করা আর তাঁদের কষ্ট দেখে তিনি খুব ব্যথিত হতেন, তাঁদের প্রতি দয়ার্দ্র হতেন এবং এভাবে দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবন ছাড়া (কাম্য) আর কোনো জীবন নেই। হে আমার রব! আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করে দাও!” আর সাহাবীগণ তাঁদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় সেই হাবিবে আকরামকে উত্তর দিতেন, “জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পথে দ্বীন ইসলাম প্রচারের জন্য আমরা রাসূলুল্লাহর অনুসরণের অঙ্গীকার করেছি।” এই পারস্পরিক ভালোবাসা ক্ষুধা, তৃষ্ণার মতো কত কষ্টকে সমূলে উপড়ে ফেলত।

বিদ্যুৎ চমকে উঠল

প্রতিদিন ভোর থেকে পরিখা খোঁড়া শুরু হতো এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত। একদিন খননের সময় হযরত আলি ইবনে হাকাম পায়ে আঘাত পেলেন। তাঁকে ঘোড়ায় চড়িয়ে মহানবীর দরবারে আনা হলো। জগৎসমূহের সরদার “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। মহানবীর একটি মুজিযা হিসেবে মুহূর্তেই তাঁর পায়ের রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেল এবং ব্যথা থেমে গেল। পরিখা খনন চলতে থাকল। এক সময় সাহাবীগণ খুব শক্ত এক জায়গার মুখোমুখি হলেন। সেখানে খোঁড়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাঁরা রাসূলে আকরামের কাছে এসে বিষয়টি জানালেন। তিনি তাশরিফ এনে পরিখায় নামলেন। এক পাত্র পানি চাইলেন। তা থেকে এক চুমুক মুখে নিয়ে আবার পাত্রে ফেলে দিলেন। তারপর সেই পানি শক্ত জায়গাটিতে ছিটিয়ে দিলেন। এরপর হাতুড়ি নিয়ে এক আঘাতেই সে জায়গাকে বালুর মতো চূর্ণ করে দিলেন। এখন সেখানে সহজেই খোঁড়া যাচ্ছিল। এই আঘাতের সময় আমাদের প্রিয় নবীর পেট মুবারক থেকে কাপড় সরে গেলে উপস্থিত সবাই দেখলেন, ক্ষুধার কারণে তিনি পাকস্থলী মুবারকের ওপর পাথর বেঁধে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহর এই অবস্থা দেখে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর কাছে গিয়ে অনুমতি চাইলেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিলে একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।” অনুমতি পাওয়ার পরের ঘটনা হযরত জাবির এভাবে বর্ণনা করেছেন:

“অনুমতি পেয়ে আমি বাড়ি এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাসূল আলাইহিস সালামের মধ্যে এমন ক্ষুধার অবস্থা দেখেছি যে, তা সহ্য করার মতো নয়। ঘরে খাওয়ার মতো কিছু আছে কি?’ সে বলল, ‘এই ছাগলছানাটি আর কয়েক মুঠো যব ছাড়া আর কিছু নেই।’ আমি তখনই ছাগলছানাটি জবাই করলাম, আর আমার স্ত্রী যব হাতের জাঁতায় পিষে আটা বানাল। তারপর তা দিয়ে খামির তৈরি করল। গোশত হাঁড়িতে চড়িয়ে তন্দুরে রান্না করতে লাগল। আমি যখন রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে যাচ্ছিলাম, তখন খাবার কম হওয়ার কারণে আমরা যেন লজ্জায় না পড়ি, সেজন্য আমার স্ত্রী আমাকে কড়াভাবে সতর্ক করে দিল। এরপর আমি রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে খুব সামান্য খাবার আছে। সঙ্গে এক-দুজনকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে খেতে আসুন!’

রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, ‘তোমার স্ত্রীকে বলো, আমি না আসা পর্যন্ত তিনি যেন তন্দুর থেকে গোশতের হাঁড়িও না নামান, রুটিও বের না করেন।’ তারপর তিনি মুজাহিদদের দিকে ফিরে বললেন, ‘হে খন্দকবাসী! জাবির আমাদের জন্য ভোজের আয়োজন করেছেন, আমাদের খাবারের দাওয়াত দিচ্ছেন। তাঁর খাবার যেমন প্রচুর, তেমনি সুস্বাদু। ওঠো! আমরা জাবিরের ভোজে যাব!’ এই আদেশ শুনে সাহাবায়ে কেরাম সমবেত হয়ে আমাদের নবীর পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে সব ঘটনা জানিয়ে বললাম, ‘এখন আমরা কী করব?’ সে বলল, ‘রাসূল আলাইহিস সালাম কি খাবার কতটুকু তা জিজ্ঞেস করেননি?’ আমি বললাম, ‘জিজ্ঞেস করেছেন, আর আমি বলেছি।’ আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘সাহাবায়ে কেরামকে কি তুমি দাওয়াত দিয়েছ, নাকি রাসূলুল্লাহ?’ ‘রাসূলুল্লাহ দাওয়াত দিয়েছেন’ – এ কথা শুনে সে বলল, ‘রাসূল আলাইহিস সালাম ভালো জানেন।’ এভাবে সে আমাকে সান্ত্বনা দিল।

কিছুক্ষণ পরই আমাদের দরজায় মহানবীর নূরানি চেহারা মুবারক দেখা গেল। তিনি বিপুলসংখ্যক সাহাবীকে বললেন, ‘একে অপরকে ঠেলাঠেলি না করে ভেতরে প্রবেশ করো।’ আমার সাহাবী ভাইয়েরা দশজন দশজন করে দলে দলে বসলেন। সম্মানিত নবী রুটি ও গোশতে বরকতের জন্য দোয়া করলেন। তারপর হাঁড়ি তন্দুর থেকে না নামিয়েই হাতা দিয়ে গোশত তুলে হাতে নেওয়া রুটির ওপর রাখলেন এবং এভাবে সাহাবীদের আপ্যায়ন করলেন। সকল সাহাবী তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই চালিয়ে গেলেন। আমি কসম করে বলছি, যাঁরা খেয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন এক হাজারেরও বেশি; তবু রুটি ও গোশত যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেল। আমরা নিজেরাও খাওয়ার পর বাকিটা প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়ে দিলাম।”3

হযরত সালমান ফারসি খুব দক্ষতার সঙ্গে পরিখা খুঁড়তেন। তিনি একাই দশজনের কাজ করতেন। তিনি সঙ্গীদের নিয়ে নিজেদের জন্য নির্ধারিত জায়গা খুঁড়ছিলেন, এমন সময় তাঁরা খুব শক্ত ও বড় একটি সাদা পাথরের মুখোমুখি হলেন। সেটি ভাঙার জন্য তাঁরা অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাঁদের সব পরিশ্রম বৃথা গেল। উপরন্তু তাঁদের হাতুড়ি, কোদাল ও বেলচাও ভেঙে গিয়েছিল। হযরত সালমান আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে এসে অবস্থা জানালেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পরিখা খোঁড়ার সময় আমরা একটি শক্ত পাথরের সামনে পড়েছি। লোহার তৈরি আমাদের সব যন্ত্রপাতি ভেঙে গেলেও আমরা সেটিকে জায়গা থেকে একটুও নড়াতে পারিনি।” হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে তাশরিফ এনে একটি হাতুড়ি চাইলেন। সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম কৌতূহল নিয়ে ফলাফলের অপেক্ষা করছিলেন। নবীদের সুলতান পরিখায় নামলেন। তিনি হাতুড়ি তুলে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে পাথরে এমন জোরে আঘাত করলেন যে, সেই আঘাতে মদিনাকে আলোকিত করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল এবং পাথর থেকে একটি টুকরো খসে পড়ল।

রাসূলে আকরাম “আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিলেন। তা শুনে সাহাবীগণও তাকবির দিলেন। তারপর তিনি দ্বিতীয়বার পাথরে হাতুড়ির আঘাত হানলেন। আবারও চারদিক আলোকিত করা এক বিদ্যুৎ!

“আমিও পরিশ্রম করে তোমাদের অর্জিত সওয়াবে শরিক হতে চাই” হাদীস শরীফ

আর পাথর থেকে খসে পড়া টুকরোগুলো… আমাদের প্রিয় নবী আবারও “আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিলেন। তাঁর অনুসরণে সাহাবায়ে কেরামও তাকবির দিলেন। তৃতীয়বার হাতুড়ি পড়তেই চারদিক আলোকিত করে আরও একটি বিদ্যুৎ চমকে উঠল এবং পাথরটি টুকরো টুকরো হয়ে গেল। জগৎসমূহের সরদার আবারও “আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিলেন। তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণও তাঁর অনুসরণে আবার তাকবির দিলেন।

হযরত সালমান হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমাদের প্রিয় নবী পরিখা থেকে উঠে এলেন। সালমান ফারসি বললেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জীবনে কখনো যা দেখিনি, এখন তা দেখলাম। এর রহস্য কী?” তখন মহানবী সাহাবীদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “সালমান যা দেখেছেন, তোমরাও কি তা দেখেছ?” তাঁরা বললেন, “জি, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যখন পাথরে হাতুড়ি মারছিলেন, তখন আমরা প্রচণ্ড বিদ্যুৎ চমকাতে দেখেছি। আপনি তাকবির দিলে আমরাও তাকবির দিয়েছি।” মহানবী ইরশাদ করলেন, “প্রথম আঘাতের আলোয় আমার সামনে পারস্য-সম্রাটের (কিসরার) (মাদায়েনের) প্রাসাদগুলো দেখা গেল। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) এসে আমাকে খবর দিলেন, ‘আপনার উম্মত সেসব অঞ্চলের অধিকারী হবে।’ দ্বিতীয় আঘাতে রোম রাজ্যের (শামের) লাল প্রাসাদগুলো দেখা গেল। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) এসে বললেন, ‘আপনার উম্মত সে দেশেরও অধিকারী হবে।’ তৃতীয় আঘাতে সানার (ইয়েমেনের) প্রাসাদগুলো দেখা গেল। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে খবর দিলেন, ‘সেই ভূমিরও মালিক হবে আপনার উম্মত।’”

এরপর বিশ্বজগতের সুলতান যখন মাদায়েনে অবস্থিত পারস্য-সম্রাটের (কিসরার) প্রাসাদের বর্ণনা দিলেন, তখন সে অঞ্চলেরই লোক হযরত সালমান বললেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন ও কিতাব দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, সেই প্রাসাদগুলো ঠিক আপনার বর্ণনার মতোই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল।” মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে সালমান! শাম অবশ্যই বিজিত হবে। হিরাক্লিয়াস তার রাজ্যের সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্তে পালিয়ে যাবে। তোমরা শামের সব দিকের অধিকারী হবে। কেউই তোমাদের মোকাবিলা করতে পারবে না। ইয়েমেন অবশ্যই বিজিত হবে। এই ‘দিয়ারে মাশরিক’ (প্রাচ্যদেশ) অঞ্চলও অবশ্যই বিজিত হবে এবং পারস্য-সম্রাট (কিসরা) নিহত হবে। আমার পরে আল্লাহ তাআলা এসব বিজয় তোমাদের নসিব করবেন।”4

হযরত সালমান ফারসি বর্ণনা করেছেন, “রাসূলুল্লাহর এসব সুসংবাদের প্রতিটি বাস্তবায়িত হতে আমি দেখেছি।”

শত্রু তখন প্রায় এসে পড়েছে। পরিখা পূর্ণ গতিতে খোঁড়া হচ্ছিল, যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার চেষ্টা চলছিল। মুজাহিদরা কেবল প্রয়োজন দেখা দিলে মহানবীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কাজ ছাড়তেন, প্রয়োজন সেরে আবার ছুটে এসে কাজে লেগে যেতেন।

মুনাফিকরা কিন্তু খুবই ঢিলেঢালা আচরণ করছিল। তারা যখন খুশি কাজে আসত, যখন খুশি অনুমতি না নিয়েই কাজ ফেলে চলে যেত। তার ওপর তারা সাহাবীদের এভাবে কাজ করা নিয়ে ঠাট্টা করত, এমনকি মহানবীর দেওয়া সুসংবাদ নিয়েও বলত, “আমরা শত্রুর ভয়ে পরিখায় আশ্রয় নিচ্ছি। আর তিনি আমাদের ইয়েমেন, রোম ও পারস্যের প্রাসাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তোমাদের এই অবস্থা দেখে আমরা অবাক হচ্ছি!…”

এরপর মুজাহিদদের সম্পর্কে নাজিল হওয়া পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “প্রকৃত মুমিন কেবল তারাই, যারা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং (সবার সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক) কোনো সমষ্টিগত কাজে যখন তাঁর (রাসূলুল্লাহর) সঙ্গে থাকে, তখন তাঁর অনুমতি না নিয়ে চলে যায় না। সুতরাং (হে আমার হাবিব!) যারা তোমার কাছে অনুমতি চায়, তারাই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে। এই মুমিনরা যখন তাদের কোনো কাজের জন্য তোমার কাছে অনুমতি চায়, তখন তুমিও তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুমতি দাও এবং তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা গাফুরুর রাহিম, অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”5

মুনাফিকদের সম্পর্কে নাজিল হওয়া পবিত্র আয়াতগুলোতেও মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলার রাসূলের আহ্বানকে তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরকে ডাকার মতো গণ্য কোরো না! তোমাদের মধ্যে যারা একে অপরের আড়াল নিয়ে চুপিসারে (সটকে) পালিয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের জানেন। যারা তাঁর আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন দুনিয়াতে ফিতনায় এবং আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিতে পতিত হওয়া থেকে সাবধান থাকে! জেনে রাখো! আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহ তাআলার। তোমরা কোন অবস্থায় আছ, তাও তিনি জানেন (তোমাদের সকল বৈশিষ্ট্য, নিয়ত, তোমরা মুমিন না মুনাফিক)। যেদিন তোমাদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, সেই কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তোমাদের সব কৃতকর্ম তোমাদের জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ তাআলা সবকিছু জানেন।”6

পরিখা খোঁড়ার কাজ শুরু হওয়ার পর ছয় দিন কেটে গিয়েছিল। প্রত্যেকে নিজ নিজ কাজ যথাযথভাবে শেষ করেছিলেন। কিন্তু একটি জায়গা সময়ের অভাবে চওড়া ও গভীর করে খোঁড়া সম্ভব হয়নি। মহানবী এ জায়গাটি নিয়ে নিজের দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে ইরশাদ করলেন, “মুশরিকরা এখান ছাড়া অন্য কোনো জায়গা দিয়ে পার হতে পারবে না।” তিনি সেখানে প্রহরী নিযুক্ত করলেন।

আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক

মুশরিক বাহিনী যখন মদিনার খুব কাছে এসে পড়েছিল, তখন ইহুদি বনু নাজিরের নেতা হুয়াই কুরাইশ বাহিনীর সেনাপতিকে জানাল যে, মদিনার কুরাইজা ইহুদিরা মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ, তবে সে তাদের নেতা কাব ইবনে আসাদকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের দলে টেনে আনতে পারবে। সেনাপতি বলল, “হে হুয়াই! এখনই কাব ইবনে আসাদের কাছে যাও। তারা যেন মুসলমানদের সঙ্গে করা চুক্তি ভেঙে আমাদের সাহায্য করে।” সেই চুক্তির একটি ধারা ছিল এই: “মদিনায় কোনো শত্রুবাহিনী আক্রমণ করলে মুসলমানদের সঙ্গে একজোট হয়ে শত্রুর মোকাবিলা করা।”

ইহুদি হুয়াই মুশরিক বাহিনী থেকে আলাদা হয়ে রাতে বনু কুরাইজার নেতা কাবের বাড়িতে এল। দরজায় কড়া নেড়ে সে নিজের পরিচয় দিল এবং বলল, “হে কাব! আমি কুরাইশের সমগ্র বাহিনী এবং কিনানা ও গাতাফানের মতো বহু গোত্রকে নিয়ে এসেছি; আমরা দশ হাজারজনের এক বাহিনী। মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা আর রক্ষা পাবে না। তাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত কুরাইশদের সঙ্গে এখান থেকে না সরার শপথ করেছি আমরা!…” কাব তার দুশ্চিন্তার কথা জানাল, “মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করা না গেলে আর কুরাইশ ও গাতাফানরা নিজেদের দেশে ফিরে গেলে আমরা এখানে একা পড়ে থাকব। শেষে তারা আমাদের সবাইকে হত্যা করবে বলে আমার ভয় হয়!…” হুয়াই বলল, “এই ভয় দূর করার জন্য তুমি কুরাইশ ও গাতাফানদের কাছ থেকে সত্তরজনকে জিম্মি হিসেবে চাইবে। এই জিম্মিরা যতদিন তোমার কাছে থাকবে, ততদিন তারা এখান থেকে যেতে পারবে না। আর যদি তারা পরাজিত হয়ে চলে যায়, তবু আমি তোমাদের ছেড়ে যাব না। তোমাদের ওপর যে বিপদ আসবে, তা আমার ওপরও আসবে।” এভাবে সে প্রথমে কাবকে, তারপর অন্য ইহুদিদেরও ধোঁকা দিল। মুসলমানদের সঙ্গে করা চুক্তিনামা সে তাদের দিয়েই ছিঁড়িয়ে ফেলল। এভাবে চুক্তি ভেঙে গেল।

হুয়াই মুশরিক বাহিনীর কাছে ফিরে গিয়ে পরিস্থিতি জানাল। বনু কুরাইজা যে মুসলমানদের পেছন থেকে আঘাত হানবে, সে খবর দিল।

“হে খন্দকবাসী! জাবির আমাদের জন্য ভোজের আয়োজন করেছেন, আমাদের খাবারের দাওয়াত দিচ্ছেন। তাঁর খাবার যেমন প্রচুর, তেমনি সুস্বাদু। ওঠো! আমরা জাবিরের ভোজে যাব!” হাদীস শরীফ

সপ্তম দিনে মুশরিকরা দশ হাজারজনের বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে এসে শিবির স্থাপন করল। এই শিবির ছিল পরিখা খনন করা জায়গার উল্টো দিকে। মুশরিকদের পরিকল্পনা ছিল এই বিশাল বাহিনী দিয়ে মদিনাকে আগাগোড়া জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করা, মহানবী ও তাঁর সাহাবীদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা। বাহ্যত এটি ছিল এমন এক বিশাল বাহিনী, যার মোকাবিলা করা কঠিন। যা তারা কল্পনাও করেনি, পরিখার সেই বাধা দেখে মুশরিকরা হতভম্ব হয়ে গেল, তাদের মনোবল ভেঙে পড়ল। কারণ পরিখা এত চওড়া ছিল যে, ভালো ঘোড়াও দ্রুত ছুটে এসে তা লাফিয়ে পার হতে পারত না। এতে কেউ পড়ে গেলে সহজে উঠে আসতে পারত না। বিশেষ করে বর্ম পরা কারও পক্ষে বেয়ে ওপরে ওঠা ছিল খুবই কঠিন। মুশরিকদের আগমনের খবর পেয়ে আমাদের প্রিয় নবী ছয় দিন ধরে বিরামহীন পরিশ্রমে ক্লান্ত সাহাবীদের তখনই একত্র করলেন এবং পরিখার এ পাশে সালা পাহাড়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করলেন। তাঁদের পেছনে সালা পাহাড় ও মদিনা, সামনে পরিখা, আর তার ওপারে শত্রু… এবারও ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদিনায় মহানবীর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রেখে যাওয়া হলো। নারী ও শিশুদের দুর্গগুলোতে রাখা হলো। তিন হাজারজনের ইসলামি বাহিনীতে ছত্রিশজন অশ্বারোহী ছিলেন। পতাকা বহন করছিলেন হযরত জায়েদ ইবনে হারিসা ও হযরত সাদ ইবনে উবাদা।7 রাসূলুল্লাহর চামড়ার তৈরি তাঁবু সালা পাহাড়ের পাদদেশে খাটানো হলো। সামনে যাঁরা আরও কত বীরত্ব দেখাবেন, সেই সাহাবায়ে কেরাম গভীর মনোযোগে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ করতে লাগলেন। এ সময় দেখা গেল, হযরত উমর আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে আসছেন। তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! শুনলাম, কুরাইজা ইহুদিরা নাকি আমাদের মধ্যকার চুক্তি ভেঙে ফেলেছে এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে!” এই অপ্রত্যাশিত খবরের উত্তরে জগৎসমূহের সরদার বললেন, “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল (আল্লাহ তাআলাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!)” তিনি খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন। এখন ইসলামি বাহিনী দুই দিক থেকে বিপদের মুখে পড়ল। উত্তর ও পশ্চিমে মুশরিক বাহিনী, আর দক্ষিণ-পূর্বে ইহুদিরা। রাসূলুল্লাহ হযরত জুবাইর ইবনে আওয়ামকে বনু কুরাইজার দুর্গে পাঠালেন। হযরত জুবাইর গিয়ে অবস্থা জেনে এলেন। ফিরে এসে তিনি যা দেখেছিলেন, তা জানালেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি দেখলাম, তারা দুর্গ মেরামত করছে, যুদ্ধের মহড়া ও কসরত করছে। তা ছাড়া তারা নিজেদের পশুগুলোকেও একত্র করে গুছিয়ে রাখছে।” এরপর হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাদ ইবনে মুআজ, সাদ ইবনে উবাদা, খাওয়াত ইবনে জুবাইর, আমর ইবনে আওফ ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে বনু কুরাইজাকে উপদেশ দিতে এবং চুক্তি নবায়ন করাতে পাঠালেন।8 দায়িত্বপ্রাপ্ত এই পাঁচ সাহাবী কুরাইজা ইহুদিদের দুর্গে গিয়ে তাদের উপদেশ দিলেন। কিন্তু উপদেশে কোনো কাজ হলো না। উপরন্তু তারা অপমান করতেও শুরু করল। শেষ কথা হিসেবে তারা বলল, “আমাদের ভাই বনু নাজিরকে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে তোমরা আমাদের হাত-পা ভেঙে দিয়েছ। মুহাম্মদ আবার কে! তাঁর সঙ্গে আমাদের কোনো কথা নেই, কোনো চুক্তিও নেই। আমরা সবাই একযোগে তোমাদের নবীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে হত্যা করার শপথ নিয়েছি। আমরা অবশ্যই আমাদের ভাইদের পাশে দাঁড়াব, তাদের সাহায্য করব!…” হযরত সাদ ইবনে মুআজ ও তাঁর সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহর দরবারে এসে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় অবস্থা জানালেন, যেন সবাই বুঝতে না পারে। মহানবী ইরশাদ করলেন, “তোমাদের খবর গোপন রাখো। কেবল যে জানে, তার কাছেই প্রকাশ করো। কারণ যুদ্ধ হলো কৌশল ও ধোঁকারই নাম।”9

সাহাবায়ে কেরাম পরিখার এ পাশে মহানবীর অপেক্ষায় ছিলেন এবং কীভাবে পদক্ষেপ নেবেন, তা জানার জন্য উৎসুক ছিলেন। কিছুক্ষণ পর বিশ্বজগতের সুলতান তাঁর বীর সাহাবীদের কাছে তাশরিফ আনলেন এবং “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিলেন। তা শুনে গৌরবময় সাহাবীগণ সমস্বরে তাকবির দিয়ে মহান আল্লাহর পবিত্র নামের মহিমা ঘোষণা করলেন এবং পরিখার ওপারে বালুকণার মতো গিজগিজ করা কাফিরদের অন্তরে ভয় ধরিয়ে দিলেন। তাকবির শুনে মুশরিকরা বলল, “মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের কাছে নিশ্চয়ই কোনো খুশির খবর এসেছে।”

মহানবী সাহাবীদের উদ্দেশে ইরশাদ করলেন, “হে মুসলমানদের জামাআত! আল্লাহ তাআলার বিজয় ও সাহায্যের সুসংবাদে আনন্দিত হও!” এভাবে তিনি তাঁদের বিজয়ী হওয়ার সুসংবাদ দিলেন। গৌরবময় সাহাবীগণ এর আগে বহু সারিয়্যায় (ছোট সেনাদলে) অংশ নিয়েছিলেন, বদর ও উহুদের যুদ্ধে শরিক হয়েছিলেন। সংখ্যায় ও শক্তিতে অনেক বেশি মুশরিকদের তাঁরা আল্লাহ তাআলার অনুমতি এবং রাসূলে আকরামের দোয়ার বরকতে প্রতিবারই পরাজিত করেছিলেন। সমগ্র সৃষ্টির “মাথার মুকুট” যখন তাঁদের নেতৃত্বে, তখন তাঁদের অসাধ্য কোনো কাজ, অসহনীয় কোনো কষ্ট থাকতে পারে না। আবহাওয়া ঠান্ডা, দুর্ভিক্ষ তীব্র, ক্ষুধা প্রচণ্ড… মহানবীসহ অনেকেই নিজেদের মুবারক পেটে পাথর বেঁধেছিলেন। সামনে শত্রু বালুকণার মতো গিজগিজ করছিল! কিন্তু গৌরবময় সাহাবীদের কাছে শত্রুর সংখ্যাধিক্য কিংবা যে কষ্ট তাঁরা সইছিলেন, তার কোনো গুরুত্ব ছিল না। আল্লাহ তাআলাই ছিলেন সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক… তাঁরা তাঁর সঙ্গেই নিজেদের বেঁধে নিয়েছিলেন, তাঁর ওপরই ভরসা করেছিলেন, তাঁরই আশ্রয় নিয়েছিলেন। কুরাইশের শীর্ষস্থানীয় সেনাপতিরা এবং কুরাইশের সঙ্গে আসা অন্যান্য গোত্রের নেতারা সর্বাত্মক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিখার চারপাশে পার হওয়ার মতো জায়গা খুঁজতে লাগল। তারা পরিখার এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত ঘুরে দেখল। অবশেষে তাড়াহুড়োর কারণে অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া সরু জায়গাটিতে থেমে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, এখান দিয়েই আক্রমণ করা সুবিধাজনক হবে। মুশরিক সৈন্যরাও সেনাপতিদের পিছু পিছু চলছিল আর একবার পরিখার দিকে, একবার গৌরবময় সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে হতবাক হচ্ছিল। তারা বলছিল, “আমরা কসম করে বলছি, এটি আরবদের কোনো কৌশল নয়। নিশ্চয়ই সেই পারসিক লোকটি এ পরামর্শ দিয়েছে!” কুরাইশ সেনাপতিরা সৈন্যদের পরিখার সরু জায়গাটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে এখান দিয়ে লাফিয়ে ওপারে যেতে পারবে?” তখন তাদের মধ্য থেকে পাঁচজন অশ্বারোহী বেরিয়ে এল। তারা পরিখার ওপারে গিয়ে সেখানে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লড়বে। সাহাবায়ে কেরাম ও মুশরিক সৈন্যরা কৌতূহল নিয়ে এই পাঁচ অশ্বারোহীর গতিবিধি দেখতে লাগলেন। অশ্বারোহীরা গতি পাওয়ার জন্য পিছিয়ে গেল। তারপর ঘোড়ার মুখ পরিখার সবচেয়ে সরু জায়গার দিকে ফিরিয়ে ছুটিয়ে দিল। তীব্র বেগে ছুটে আসা পাঁচটি জাতের ঘোড়া এক লাফে পরিখার ওপারে পৌঁছে গেল। আরও বহু অশ্বারোহী তাদের অনুসরণ করতে চাইল, কিন্তু সফল না হয়ে পরিখার ওপাশেই রয়ে গেল। যারা পার হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিল আমর ইবনে আবদে উদ নামের এক মহাশক্তিধর পালোয়ান, যাকে কেউ কখনো ধরাশায়ী করতে পারেনি; সবাই তাকে ভয় পেত, কেউ তার সামনে দাঁড়াতে সাহস করত না। একাই সে ছিল এক বাহিনীর সমান। দশ হাজারজনের বাহিনী থেকে তার এখানে বেরিয়ে আসাও তা-ই প্রমাণ করছিল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সে বর্মে ঢাকা ছিল। ঘোড়ার পিঠে তাকে খুবই ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। দেখতেই যে অন্তরে ভয় ধরিয়ে দিত, সেই লোকটি মুজাহিদদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, “আমার সঙ্গে লড়তে পারে এমন কেউ থাকলে ময়দানে আসুক!…” অহংকারের এই প্রতিমূর্তিকে দেখে হযরত আলি আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে এসে অনুমতি চাইলেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার সঙ্গে আমি লড়ব।” তাঁর গায়ে তখন বর্মও ছিল না।

“হে সালমান! শাম অবশ্যই বিজিত হবে। হিরাক্লিয়াস তার রাজ্যের সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্তে পালিয়ে যাবে। তোমরা শামের সব দিকের অধিকারী হবে। কেউই তোমাদের মোকাবিলা করতে পারবে না। ইয়েমেন অবশ্যই বিজিত হবে। এই ‘দিয়ারে মাশরিক’ (প্রাচ্যদেশ) অঞ্চলও অবশ্যই বিজিত হবে এবং পারস্য-সম্রাট (কিসরা) নিহত হবে। আমার পরে আল্লাহ তাআলা এসব বিজয় তোমাদের নসিব করবেন” হাদীস শরীফ

সাহাবায়ে কেরাম তাঁর দিকে সপ্রশংস ঈর্ষায় (গিবতায়) তাকিয়ে ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী নিজের মুবারক বর্ম খুলে হযরত আলিকে পরিয়ে দিলেন। নিজের তরবারি তাঁর কোমরে বেঁধে দিলেন। মুবারক মাথা থেকে পাগড়ি খুলে নিজের মুবারক হাতে তাঁর মাথায় জড়িয়ে দিলেন। তারপর মিনতি করে এভাবে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! বদরের যুদ্ধে আমার চাচাতো ভাই উবাইদা, উহুদের যুদ্ধে আমার চাচা হামজা শহিদ হয়েছেন। আমার কাছে রয়ে গেছে আমার ভাই ও চাচাতো ভাই আলি। তুমি তাঁকে রক্ষা করো। তাঁকে তোমার সাহায্য দান করো। আমাকে একা ফেলে রেখো না!” সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “আমিন!” দোয়া ও তাকবিরের ধ্বনির মধ্যে আল্লাহ তাআলার সিংহ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেন এবং ঘোড়ার পিঠে দৈত্যের মতো বসে থাকা আমর ইবনে আবদে উদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। চোখ ছাড়া সর্বাঙ্গ বর্মে ঢাকা আমর এই বীরকে চিনতে পারল না এবং তিনি কে, তা জিজ্ঞেস করল। তিনি “আমি আলি ইবনে আবি তালিব” বলে নিজের পরিচয় দিলে আমর যেন তাঁর প্রতি দয়া দেখিয়ে বলল, “হে ভাতিজা! তোমার বাবা আমার বন্ধু। তাই আমি তোমার রক্ত ঝরাতে চাই না। আমার মোকাবিলা করার মতো তোমার চাচাদের কেউ কি নেই?” আর হযরত আলি তাকে উসকে দিয়ে বললেন, “হে আমর! আল্লাহর কসম, আমি তোমার রক্ত ঝরাতে চাই। তবে আমাদের দুজনেরই কি সমান অবস্থায় থাকা উচিত নয়? বীরত্বের মর্যাদার সঙ্গেও কি সেটাই মানানসই নয়? অথচ আমি পায়ে হেঁটে, আর তুমি ঘোড়ায় চড়ে!…”

এ কথা শুনে আমরের পৌরুষে ঘা লাগল; সে সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থেকে নামল, তরবারি দিয়ে নিজের ঘোড়ার পা কেটে ফেলল এবং ক্রোধে হযরত আলির সামনে এসে দাঁড়াল। সে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে আল্লাহ তাআলার সিংহ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমর! শুনেছি, তুমি নাকি শপথ করেছ যে, কুরাইশের কারও মুখোমুখি হলে তার দুটি ইচ্ছার একটি পূরণ করবে। এ কথা কি সত্য?” সে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, সত্য।” তখন তিনি তাকে ঈমানের দাওয়াত দিয়ে বললেন, “তাহলে আমার প্রথম ইচ্ছা হলো, তুমি আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনে মুসলমান হও!” এ কথা শুনে আমর রেগে গিয়ে বলল, “এ কথা বাদ দাও! এটা আমার দরকার নেই!” হযরত আলি বললেন, “আমার দ্বিতীয় ইচ্ছা হলো, তুমি লড়াই ছেড়ে মক্কায় ফিরে যাও। কারণ রাসূল আলাইহিস সালাম শত্রুর ওপর বিজয়ী হলে তোমার এই কাজের মাধ্যমে তুমি তাঁকে সাহায্যই করে থাকবে!…” আমর বলল, “এটাও বাদ দাও! প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত সুগন্ধি না মাখার শপথ করেছি আমি। অন্য কোনো ইচ্ছা থাকলে সেটা বলো!” তখন হযরত আলি বললেন, “হে আল্লাহ তাআলার শত্রু! এখন তোমার সঙ্গে লড়াই ছাড়া আর কিছুই বাকি রইল না!”

আমর এ কথায় হেসে বলল, “আশ্চর্য তো! আরব দেশে আমার মোকাবিলা করতে পারে এমন কোনো বীর আছে, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি! হে ভাতিজা! কসম করে বলছি, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না। কারণ তোমার বাবা আমার বন্ধু ছিল। আমি নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে কুরাইশের অভিজাতদের মধ্য থেকে আবু বকরের মতো, উমরের মতো কাউকে চাইতাম।” হযরত আলি বললেন, “তা হলেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্যই এখানে এসেছি।” এ কথা শুনে আমরের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। তরবারি তোলা আর নামানো তার একসঙ্গেই হলো। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) এমন কিছুরই অপেক্ষায় ছিলেন; আল্লাহ তাআলার এই সিংহ বিদ্যুতের মতো পাশে সরে গিয়ে ঢাল দিয়ে আঘাত ঠেকালেন। কিন্তু আমর এ রকম বহু ঢাল চূর্ণ করেছিল। তার আঘাত সবচেয়ে মজবুত ঢালও সইতে পারত না। এবারও তা-ই হলো। হযরত আলির ঢাল ভেঙে গেল, উপরন্তু তরবারি তাঁর মাথা ছুঁয়ে গিয়ে আহত করল। এবার আক্রমণের পালা হযরত আলির।

আল্লাহ তাআলার আশ্রয় নিয়ে তিনি “ইয়া আল্লাহ!…” বলে জুলফিকার আমরের ঘাড়ে নামিয়ে আনলেন। সেই আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামি বাহিনীতে “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলল, আর কাফির বাহিনীতে উঠল আর্তনাদ… হ্যাঁ, নবীদের সুলতান, সমগ্র সৃষ্টির মাথার মুকুটের দোয়া কবুল হয়েছিল। দানবাকৃতির আমর মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, তার দেহ থেকে নালার মতো রক্ত ঝরছিল, আর তার মাথা শিরস্ত্রাণসহ উড়ে গিয়েছিল। যার ওপর তারা সবচেয়ে বেশি ভরসা করত, সেই আমরকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে তার সঙ্গীরা সঙ্গে সঙ্গে হযরত আলির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ দেখে সাহাবায়ে কেরাম সেখানে ছুটে এলেন। জুবাইর ইবনে আওয়াম নওফল ইবনে আবদুল্লাহকে আহত করে ঘোড়াসহ তাকে পরিখায় ফেলে দিলেন।

হযরত আলি পরিখায় নেমে নওফলকে দুই টুকরো করে ফেললেন। বাকিরা কোনোমতে পরিখা পার হয়ে পিছু হটে পালাল। আর মুশরিক বাহিনীর প্রধান সেনাপতি যুদ্ধের শুরুতেই গভীর হতাশায় ডুবে গেল।

এবার যুদ্ধের ধরন স্পষ্ট হয়ে গেল। পরিখা মুখোমুখি হাতাহাতি লড়াইয়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুই পক্ষ তির ছুড়ে একে অপরের ক্ষয়ক্ষতি করার চেষ্টা করল। এতে যুদ্ধ কেবল দীর্ঘায়িতই হচ্ছিল, আর কোনো লাভ হচ্ছিল না। এভাবে জয়ী হতে পারবে না বুঝে মুশরিকরা সিদ্ধান্ত নিল যে, পরিখার সব দিক থেকে আক্রমণ করাই সবচেয়ে উপযুক্ত পথ; তারা আক্রমণ শুরু করল। দশ হাজারজনের বিশাল শত্রুবাহিনী পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, আর তিন হাজারজনের গৌরবময় ইসলামি বাহিনী তির ও পাথর ছুড়ে তাদের পার হতে না দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। ভয়াবহ এক সংগ্রাম শুরু হলো। এই সংগ্রাম সন্ধ্যা পর্যন্ত চলল।

রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে পরিখার বিভিন্ন স্থানে প্রহরী নিযুক্ত করলেন। নিজে সরু জায়গাটিতে পাহারা দিতে লাগলেন। মদিনায় পাঁচশোজনের একটি টহলদল পাঠিয়ে তিনি রাস্তায় রাস্তায় উচ্চস্বরে তাকবির দেওয়ার আদেশ দিলেন। এভাবে ইহুদিদের কিংবা কুরাইশ মুশরিকদের দিক থেকে আসতে পারে এমন বিপদ সময়মতো প্রতিহত হবে, নারী ও শিশুরা সুরক্ষিত থাকবে।

কুরাইজা ইহুদিরা হুয়াই ইবনে আখতাবকে মুশরিকদের কাছে পাঠিয়ে রাতের অতর্কিত আক্রমণের জন্য দুই হাজারজনের একটি বাহিনী চাইল। তারা রাতে অরক্ষিত নারী ও শিশুদের ওপর হামলা চালানোর মতলব করছিল। কিন্তু ভোর পর্যন্ত মুজাহিদদের টহল এবং “আল্লাহু আকবার!” ধ্বনিতে তাকবির দেওয়া তাদের অন্তরে প্রচণ্ড ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। তারা নিজেদের দুর্গে সরে গিয়ে সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। মাঝে মাঝে ছোট ছোট দলে তারা মদিনায় ঢোকার চেষ্টা করল।

এক রাতে বনু কুরাইজার নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম গাজ্জাল দশজনের একটি দল নিয়ে মহানবীর ফুফু আমাদের মা সাফিয়া যে দুর্গ-বাড়িতে ছিলেন, সেখান পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ভেতরে ছিল নারী ও শিশুরা। আত্মরক্ষার জন্য তাঁদের কাছে একটি অস্ত্রও ছিল না। ইহুদিরা প্রথমে বাড়িটির দিকে তির ছুড়তে লাগল, তারপর ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। তাদের একজন ভেতরের আঙিনায় ঢুকে পড়তে সক্ষম হলো এবং কীভাবে ঘরে ঢোকা যায়, সেজন্য চারপাশ পরখ করতে লাগল। এ সময় আমাদের প্রিয় নবীর বীর ফুফু সঙ্গীদের একটুও শব্দ না করতে বলে নিচে নেমে দরজার পাশে এলেন। একটি ওড়না দিয়ে মাথা শক্ত করে পেঁচিয়ে পুরুষের বেশ ধারণ করে তিনি হাতে একটি লাঠি নিলেন এবং কোমরে একটি ছুরি গুঁজে নিলেন। ধীরে ধীরে দরজা খুলে তিনি সেই ইহুদির পেছনে গেলেন এবং হাতের লাঠি দিয়ে সজোরে তার মাথায় আঘাত করলেন। একটুও সময় নষ্ট না করে মাটিতে পড়ে যাওয়া ইহুদিকে তিনি হত্যা করলেন। তারপর নিহত ইহুদির মাথা বাইরে তির ছোড়ায় ব্যস্ত ইহুদিদের দিকে ছুড়ে মারলেন। সঙ্গীর কাটা মাথা নিজেদের পায়ের কাছে দেখে ইহুদিরা ভীষণ ভয় পেয়ে পালাতে লাগল।

সেই সঙ্গে তারা বিড়বিড় করে বলছিল, “আমাদের তো খবর দেওয়া হয়েছিল যে, মুসলমানরা ঘরে একজন পুরুষও না রেখে সবাইকে যুদ্ধে পাঠিয়েছে!…”10 সকালে যুদ্ধ আবার একই তীব্রতায় শুরু হলো। তিরগুলো বাতাসে শোঁ শোঁ শব্দে উড়ছিল। জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর গৌরবময় সাহাবীদের উদ্দেশে ইরশাদ করলেন, “যাঁর কুদরতের হাতে আমার অস্তিত্ব, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আমরা যে কষ্টের মুখোমুখি হয়েছি, তা অবশ্যই তোমাদের ওপর থেকে তুলে নেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রশস্ততায় (স্বস্তিতে) বের করে আনা হবে।” এভাবে তিনি তাঁদের সবরের উপদেশ দিলেন এবং বিজয় যে ঈমানদারদেরই হবে, সেই সুসংবাদ দিলেন। এই সুসংবাদ পেয়ে বীর সাহাবীগণ ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষের মতো কষ্টগুলো ভুলে গেলেন।

“হে মুসলমানদের জামাআত! আল্লাহ তাআলার বিজয় ও সাহায্যের সুসংবাদে আনন্দিত হও!” হাদীস শরীফ

তাঁরা প্রাণপণে লড়লেন এবং পরিখা দিয়ে একজন মুশরিককেও পার হতে দিলেন না।

সাহাবায়ে কেরামের নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম হযরত সাদ ইবনে মুআজ অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়ে লড়ছিলেন। যুদ্ধের সময় হিব্বান ইবনে কাইস ইবনে আরাকা নামের এক মুশরিকের ছোড়া তির তাঁর বাহুতে বিঁধে তাঁকে আহত করল। তিরটি ধমনিতে লাগায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হলো। আহত হযরত সাদ চারপাশের লোকদের রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করতে দেখে বুঝলেন যে, তাঁর অবস্থা গুরুতর। তিনি এভাবে দোয়া করলেন, “হে আমার রব! কুরাইশ যদি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে আমাকে হায়াত দান করো। কারণ তোমার রাসূলকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছে, সেই মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমি যতটা ভালোবাসি, অন্য কিছুই ততটা ভালোবাসি না। আর যদি আমাদের মধ্যকার যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়, তাহলে আমাকে শাহাদাতের মর্যাদায় উন্নীত করো। কিন্তু বনু কুরাইজার পরিণতি না দেখা পর্যন্ত আমার রুহ কবজ কোরো না।” তাঁর দোয়া কবুল হলো, রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেল। অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মতো মুনাফিকরা সাহাবায়ে কেরামের মাঝে থেকে লড়াই করার ভান করছিল, কিন্তু খুবই গড়িমসি করছিল, সামনের সারির কাছেও যাচ্ছিল না। তার ওপর মুজাহিদদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য তারা সাধ্যমতো সবকিছু করছিল। ফিতনা সৃষ্টির চেষ্টায় তারা বলত, “মুহাম্মদ তোমাদের বাইজান্টাইন সম্রাট (কায়সার) ও পারস্য-সম্রাটের (কিসরার) ধনভান্ডারের প্রতিশ্রুতি দিয়েই চলেছেন। অথচ এখন আমরা পরিখার ভেতরে বন্দি হয়ে আছি। ভয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতেও যেতে পারছি না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের ধোঁকা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করছেন না, দুনিয়ার কোনো কিছুরই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না!…” চাপে পড়লে তারা শত্রু তাদের বাড়িঘরে হামলা করতে পারে – এই অজুহাতে নিজেদের দায়িত্বের জায়গা ছেড়ে চলে যেত। মুনাফিকদের এসব আচরণ ছিল আলাদা এক যন্ত্রণা, আলাদা এক কষ্ট। মুশরিক বাহিনী যত দ্রুত সম্ভব ফলাফলে পৌঁছানোর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছিল, কিন্তু সম্মানিত সাহাবীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের সামনে কিছুই করতে পারছিল না। তারা সবচেয়ে বেশি আক্রমণ চালাত সরু পথটিতে। আমাদের প্রিয় নবী সেখান থেকে সরতেন না, সাহাবীদের যুদ্ধে উৎসাহিত করতেন। মহানবীর পাশে থেকে যুদ্ধ করার মর্যাদা লাভে আগ্রহী সাহাবায়ে কেরাম যুদ্ধের ময়দানে নজিরবিহীন বীরত্ব দেখাচ্ছিলেন। এক সময় দেখা গেল, মুশরিকরা প্রচণ্ড তিরবৃষ্টি শুরু করেছে। তাদের সব লক্ষ্য ছিল বিশ্বজগতের সুলতান যে তাঁবুতে ছিলেন, সেই তাঁবু।

আমাদের প্রিয় নবীর দেহ মুবারক একটি বর্মে ঢাকা ছিল। মুবারক মাথায় ছিল শিরস্ত্রাণ। তিনি তাঁবুর সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের গতি অনুযায়ী সাহাবীদের আদেশ দিচ্ছিলেন। মুশরিকরা কখনো কখনো সবচেয়ে দুর্বল মনে হওয়া জায়গায় হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ত, আর বরকতময় সাহাবীগণ সেখানে ছুটে গিয়ে দ্বীনের শত্রুদের হটিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত প্রেমের আবেগ নিয়ে লড়াই করতেন।

“আলির একটি তরবারির আঘাত সকল মানুষ ও জিনের ইবাদতের চেয়েও বেশি মূল্যবান” হাদীস শরীফ

খন্দকের যুদ্ধ

এই নজিরবিহীন সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত তীব্র; লড়াইয়ের চাপে বীর সাহাবীরা পাশে তাকানোরও সময় পাচ্ছিলেন না। সেদিন সকালে শুরু হওয়া সংগ্রাম অনেক রাত পর্যন্ত চলল। একেকটি নামাজের ওয়াক্ত আসছিল, আর গৌরবময় সাহাবীগণ বলছিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা নামাজ আদায় করতে পারিনি।” আর জগৎসমূহের সরদার, বিশ্বজগতের সুলতান গভীর দুঃখের সঙ্গে উত্তর দিচ্ছিলেন, “আল্লাহর কসম, আমিও আদায় করতে পারিনি।” এশার সময়ের দিকে তাঁরা অত্যন্ত প্রচণ্ড এক আক্রমণ চালালেন এবং ইবাদত করতে বাধা দেওয়া মুশরিকদের পালকে পিছু হটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। এই বিশৃঙ্খলা থেকে নিজেদের সামলাতে না পেরে কুরাইশ ও গাতাফানরা রাত কাটানোর জন্য নিজেদের শিবিরে সরে গেল। মুজাহিদরাও আমাদের প্রিয় নবীর তাঁবুর দিকে রওনা হলেন। তখন জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত বিশ্বজগতের গৌরব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – বদদোয়া করা যদিও তাঁর মুবারক অভ্যাস ছিল না – নামাজের কারণে আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করে ইরশাদ করলেন, “তারা যেভাবে সূর্য ডোবা পর্যন্ত আমাদের ব্যস্ত রেখে নামাজ থেকে বিরত রেখেছে, আল্লাহ তাআলাও তেমনি তাদের ঘর, পেট ও কবর আগুনে ভরে দিন!” কাজা হয়ে যাওয়া জোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর তিনি এশার নামাজে ইমামতি করলেন।

হে আমার রব, কাফিরদের পরাজিত করো

ইসলামকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে চালানো এসব লড়াইয়ের পর মুশরিকরা বুঝল যে, দিনের বেলায় মুসলমানদের পরাজিত করা যাবে না। তাদের মতে একমাত্র উপায় ছিল একই তীব্রতায় রাতের অতর্কিত আক্রমণ চালানো। কেবল এভাবেই মুসলমানদের হারানো সম্ভব। এই সিদ্ধান্ত তারা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করতে শুরু করল এবং ইহুদি বনু কুরাইজার সঙ্গে মিলে রাতের হামলা চালাতে লাগল। সৈন্যদের কয়েকটি দলে ভাগ করে মুশরিকরা পালাক্রমে আক্রমণ করছিল। এ অবস্থা দিনের পর দিন চলল। আমাদের প্রিয় নবী এবং বীর সাহাবায়ে কেরাম ক্ষুধার্ত, নির্ঘুম ও ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধ চালিয়ে গেলেন। শত্রুর একজন সৈন্যকেও তাঁরা পরিখা পার হয়ে এ পাশে আসতে দিলেন না। প্রাণপণে চালানো এই প্রতিরোধ আগের সব যুদ্ধের চেয়ে বেশি ভয়ের, বেশি তীব্র, বেশি কষ্টের ও বেশি শ্রমসাধ্য ছিল।

দিনের পর দিন লড়াই করতে থাকা মুশরিকদের মধ্যে খাদ্যসংকট দেখা দিল। মাটিতে এক মুঠো শুকনো ঘাসও না পেয়ে তাদের ঘোড়া ও উটগুলোও মরতে শুরু করল। এ কারণে মুশরিকদের সেনাপতি দিরার ইবনে খাত্তাবের নেতৃত্বে একটি দলকে রসদ সংগ্রহের জন্য কুরাইজা ইহুদিদের কাছে পাঠাল। কাফিরদের জন্য নিজেদের সবকিছু উৎসর্গকারী ইহুদিরা সঙ্গে সঙ্গে বিশটি উটে গম, যব, খেজুর ও পশুর জন্য খড় বোঝাই করে তাদের হাতে তুলে দিল। দিরার তার সৈন্যদের নিয়ে আনন্দে ফিরছিল, এমন সময় কুবার কাছে একদল সাহাবীর মুখোমুখি হলো। বীর সাহাবীগণ সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করলেন। এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তাঁরা মুশরিকদের পালাতে বাধ্য করলেন, বোঝাই উটগুলো মহানবীর কাছে সোপর্দ করলেন এবং তাঁর অনেক দোয়া লাভে ধন্য হলেন।11 প্রায় এক মাস ধরে চলা এই তীব্র সংগ্রামে বীর সাহাবীগণ খুব কঠিন অবস্থায় পড়েছিলেন। বিশ্বজগতের সুলতান (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের প্রতি দয়ার্দ্র ছিলেন, তাঁদের প্রতি বাবার চেয়েও বহুগুণ বেশি স্নেহ দেখাতেন। গৌরবময় সাহাবীদের এই অতিমানবীয় প্রচেষ্টা দেখে তিনি নিজের মুবারক ললাট মাটিতে রাখলেন এবং তাঁদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে এভাবে মিনতি জানালেন:

“হে বিপদগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসা সত্তা! হে অভাবী ও অসহায়দের দোয়া কবুলকারী আল্লাহ! আমার ও আমার সাহাবীদের অবস্থা তুমি অবশ্যই দেখছ ও জানছ। হে আমার রব! তুমি কাফিরদের পরাজিত করো, তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করো এবং তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো, বিজয় দান করো!…”

শেষ দিনগুলোতে আমাদের প্রিয় নবী এই দোয়া বারবার করছিলেন। দুর্ভিক্ষের যন্ত্রণার কারণে মুশরিকরা যত দ্রুত সম্ভব মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছিল। এভাবে লড়াই চলার এক সন্ধ্যায় মুশরিক বাহিনী থেকে এমন এক ব্যক্তি মহানবীর দরবারে এলেন, যাঁর অন্তরে ইসলামের ভালোবাসা জন্মেছিল। তিনি ছিলেন গাতাফান গোত্রের নুআইম ইবনে মাসউদ। তিনি আমাদের প্রিয় নবীকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এসেছি আল্লাহ তাআলা এক এবং আপনি সত্য নবী – এ কথার সত্যায়ন করতে। আলহামদুলিল্লাহ, মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছি। এতদিন আমি আপনাদের বিরুদ্ধে লড়েছি। এখন থেকে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়ব। আপনি যা আদেশ করবেন, তা করতে আমি প্রস্তুত! ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মুসলমান হওয়ার কথা আমার গোত্রও জানে না।” রাসূলে আকরাম জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এই কাফিরদের মধ্যে ঢুকে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে পারবে?” তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার সাহায্যে আমি তাদের একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারব। তবে যা ইচ্ছা তা বলার অনুমতি আছে কি?” মহানবী ইরশাদ করলেন, “যুদ্ধ হলো কৌশল, তুমি যা চাও বলতে পারো।”

হযরত নুআইম ইবনে মাসউদ প্রথমে কুরাইজা ইহুদিদের কাছে গিয়ে বললেন, “তোমাদের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা তোমরা জানো। তবে আমরা এখন যা আলোচনা করব, তা যেন আমাদের মধ্যেই থাকে, কেউ যেন না জানে!” ইহুদিরা কসম করে বলল, “কেউ জানবে না।” তখন হযরত নুআইম বললেন, “এই লোকটির (মহানবীর) ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে এক মহাবিপদ। বনু নাজির ও বনু কাইনুকার সঙ্গে তিনি কী করেছেন, তা তোমরা জানো। তাদের দেশ ও ঘরবাড়ি থেকে তিনি যে তাদের বিতাড়িত করেছেন, তা তোমরা সবাই দেখেছ। এখন কুরাইশ ও গাতাফানরা এসে মুসলমানদের সঙ্গে লড়ছে, আর তোমরা তাদের সাহায্য করছ। দিনের পর দিন লড়াই করেও আমরা এখনো কোনো ফলাফলে পৌঁছাতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে মনে হচ্ছে অবরোধ দীর্ঘ হবে। কুরাইশ ও গাতাফানদের ধনসম্পদ, জমিজমা, ঘরবাড়ি, সন্তানসন্ততি তোমাদের মতো এখানে নেই। এই যুদ্ধে সুযোগ পেয়ে জয়ী হলে তারা গনিমত কুড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। আর পরাজিত হলে তারা চলে যাবে এবং তোমাদের মুসলমানদের মুখোমুখি একা ফেলে যাবে। অথচ মুসলমানদের সঙ্গে পেরে ওঠার মতো শক্তি বা সামর্থ্য কোনোটাই তোমাদের নেই। আর যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা দেখাচ্ছে যে, মুসলমানরাই বিজয়ী হবে। আমার ধারণা সত্যি হলে মুসলমানরা তোমাদের তরবারির নিচে না ফেলে ছাড়বে না। তাই আমাদের দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে!…”12 ইহুদিরা গভীর উত্তেজনা ও ভয় নিয়ে এ কথাগুলো শুনল। হযরত নুআইম তাদের কথা এতটা ভাবছেন দেখে তারা খুবই সন্তুষ্ট হলো এবং বলল, “তুমি আমাদের প্রতি তোমার বন্ধুত্ব যথাযথভাবে দেখিয়েছ। কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তাও আমাদের বলো।” নুআইম ইবনে মাসউদ ঠিক এরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বললেন, “সঠিক পথ হলো এই: কুরাইশ ও গাতাফানের অভিজাতদের কয়েকজনকে জিম্মি হিসেবে না নিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে কখনো যুদ্ধে জড়াবে না! জিম্মিরা যতদিন তোমাদের কাছে থাকবে, ততদিন তারা যুদ্ধ ফেলে পালিয়ে যেতে পারবে না!” এটিকেও খুব ভালো ব্যবস্থা মেনে নিয়ে ইহুদিরা তাঁকে ধন্যবাদ জানাল এবং সম্মানের সঙ্গে আপ্যায়ন করল। হযরত নুআইম ইহুদিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা কুরাইশের শিবিরে গেলেন। তিনি তাদের সেনাপতিদের বললেন, “মুহাম্মদের প্রতি আমার শত্রুতা আর তোমাদের আমি কত ভালোবাসি, তা তোমরা জানো। আমি একটি বিষয় জানতে পেরেছি; আমাদের বন্ধুত্বের দাবি অনুযায়ী তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে আমি বড় কর্তব্য মনে করেছি। তবে আমি যা বলব, তা কাউকে শোনাবে না – এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তোমাদের কসম করতে হবে!” তারা কসম করল এবং কৌতূহলী হয়ে বলল, “বলো, আমরা তোমার কথা শুনছি।” তিনি বললেন, “জেনে রাখো, কুরাইজা ইহুদিরা তোমাদের সঙ্গে জোট বাঁধার জন্য অনুতপ্ত হয়েছে এবং মুহাম্মদের কাছে খবর পাঠিয়েছে: ‘কুরাইশ ও গাতাফানের নেতৃস্থানীয়দের মধ্য থেকে জিম্মি নিয়ে আমরা তোমার হাতে তুলে দেব, যাতে তুমি তাদের গর্দান কাটতে পারো। তারপর তোমার সঙ্গে একজোট হয়ে মুশরিকদের মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত লড়ব! তবে আমাদের ভাই বনু নাজিরকে তুমি ক্ষমা করে তাদের দেশ ফিরিয়ে দেবে!’ মুহাম্মদও ইহুদিদের এই দাবি মেনে নিয়েছেন! ইহুদিরা যদি তোমাদের কাছে জিম্মি চায়, খবরদার রাজি হবে না, ওরা সবাইকে হত্যা করবে! সাবধান, আমার এ কথাগুলো কেউ যেন না শোনে!…” এই গুরুত্বপূর্ণ খবরের জন্য কুরাইশরা হযরত নুআইমকে অনেক ধন্যবাদ জানাল এবং তাঁর প্রতি বিশেষ সমাদর দেখাল।

“যাঁর কুদরতের হাতে আমার অস্তিত্ব, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আমরা যে কষ্টের মুখোমুখি হয়েছি, তা অবশ্যই তোমাদের ওপর থেকে তুলে নেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রশস্ততায় (স্বস্তিতে) বের করে আনা হবে” হাদীস শরীফ

নুআইম ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেখান থেকে বের হয়ে গাতাফানদের কাছে এলেন। কুরাইশদের যা বলেছিলেন, তাদেরও তা-ই বললেন।

একদিন পর কুরাইশের সেনাপতি বনু কুরাইজার কাছে খবর পাঠাল, “এখানে থাকা আমাদের জন্য এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ আবহাওয়া ঠান্ডা, আমাদের পশুগুলো ক্ষুধায় মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ রাতে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আগামীকাল সবাই মিলে প্রচণ্ড আক্রমণ চালাই।” ইহুদিরা বলল, “প্রথমত, আমরা শনিবার যুদ্ধ করি না। দ্বিতীয়ত, তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিতে হলে তোমাদের নেতৃস্থানীয়দের মধ্য থেকে অনেককে আমাদের কাছে জিম্মি হিসেবে দিতে হবে। যদি অবরোধ দীর্ঘ হয় আর তোমরা অক্ষম হয়ে নিজেদের দেশে ফিরে যাও, তাহলে তো তোমরা আমাদের মুহাম্মদের হাতে তুলে দিয়ে যাবে। আর জিম্মি দিলে তোমরা আমাদের ফেলে চলে যাবে না!…” এই খবর কুরাইশ সেনাপতির কাছে পৌঁছালে সে বলল, “তাহলে নুআইম ইবনে মাসউদের কথাই সত্য!” কুরাইশরা ইহুদিদের কাছে আবার খবর পাঠাল, “আমরা আমাদের একজন লোককেও তোমাদের কাছে জিম্মি হিসেবে দেব না। যদি কাল এসে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, তাহলে খুব ভালো, নইলে আমরা দেশে ফিরে যাব। আর তোমরা মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের মুখোমুখি একা পড়ে থাকবে!…”

এ কথা শুনে কুরাইজা ইহুদিরা ভাবল, নুআইমের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তারা উত্তর দিল, “তাহলে আমরাও তোমাদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না…” এভাবে উভয় পক্ষের অন্তরেই ভয় ঢুকে গেল।13 জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবীর কাছে এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আল্লাহ তাআলা ঝড়ের মাধ্যমে মুশরিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেবেন। তখন জগৎসমূহের সরদার মুবারক হাঁটু গেড়ে বসে মুবারক হাত দুটি প্রসারিত করে বললেন, “হে আল্লাহ! আমার ও আমার সাহাবীদের প্রতি দয়া করার জন্য তোমার শোকর আদায় করছি।” এভাবে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে কৃতজ্ঞতা নিবেদন করলেন। তারপর বীর সাহাবীদের এই সুসংবাদ জানালেন। সেই রাতটি ছিল শনিবারের রাত। চারদিক ভয়াবহ অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিল, চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তারপর নেমে এল কনকনে ঠান্ডা, তার পেছনে বইতে শুরু করল প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া।

এই রাতের কথা হযরত হুজাইফা ইবনে ইয়ামান এভাবে বর্ণনা করেছেন, “আমরা এমন এক রাতে ছিলাম, যার চেয়ে অন্ধকার রাত এর আগে কখনো দেখিনি। এই গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে মেঘের গর্জনের মতো শব্দ তুলে ভয়ংকর এক ঝড়ও বইতে শুরু করেছিল। এ সময় মহানবী আমাদের জানালেন যে, মুশরিক বাহিনী অস্থিরতা ও আতঙ্কে পড়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা, ক্ষুধা আর রাতের বিভীষিকায় আমরা উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না; যে যেখানে ছিলাম, গায়ে কিছু একটা জড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ নামাজে দাঁড়ালেন এবং রাতের একটি অংশ নামাজ পড়ে কাটালেন।

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মুশরিক বাহিনীর কাছে গিয়ে তাদের অবস্থা খুঁটিয়ে দেখে আমাকে খবর এনে দেবে? এই খবর যে আনবে, জান্নাতে সে যেন আমার সঙ্গী হয় – আল্লাহ তাআলার কাছে আমি এই দোয়া করব।’ সেখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা প্রচণ্ড ক্ষুধা ও ঠান্ডায় উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। তখন রাসূলুল্লাহ আমার কাছে এলেন। আমি ঠান্ডা আর ক্ষুধায় দুই হাঁটু মুড়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিলাম। রাসূলুল্লাহ আমাকে স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে?’ আমি বললাম, ‘আমি হুজাইফা, ইয়া রাসূলাল্লাহ।’ রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘যাও, ওই লোকেরা কী করছে দেখে এসো! আমার কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের দিকে তির বা পাথর ছুড়বে না, বর্শা বা তরবারির আঘাতও হানবে না। আমার কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি ঠান্ডা বা গরম কোনোটাতেই কষ্ট পাবে না, বন্দিও হবে না, নির্যাতনের শিকারও হবে না।’

আমি আমার তরবারি ও ধনুক নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। রাসূলুল্লাহ আমার জন্য দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে সব দিক থেকে রক্ষা করো।’

আমি মুশরিকদের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। মনে হচ্ছিল যেন হাম্মামখানার (উষ্ণ গোসলখানার) ভেতর দিয়ে হাঁটছি। আল্লাহর কসম, আমার ভেতরে না ছিল কোনো ভয়, না শীত, না কোনো কাঁপুনি। অবশেষে মুশরিকদের শিবিরে পৌঁছালাম। তাদের সেনাপতি ও নেতৃস্থানীয়রা একটি আড়ালে আগুন জ্বেলে গা গরম করছিল। আবু সুফিয়ান বলছিল, ‘এখান থেকে চলে যেতে হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো, তাকে সেখানেই হত্যা করি। তূণ থেকে একটি তির বের করে ধনুকে জুড়লাম। আগুনের আলোর সুযোগ নিয়ে তাকে বিদ্ধ করতে চাইলাম। ঠিক তির ছোড়ার মুহূর্তে রাসূলুল্লাহর কথা মনে পড়ল, ‘আমার কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত কোনো ঘটনা ঘটাবে না।’ তাই হত্যা করা থেকে বিরত থাকলাম। এরপর নিজের ভেতরে প্রবল সাহস অনুভব করলাম। মুশরিকদের মাঝে ঢুকে আগুনের পাশে বসে পড়লাম। নজিরবিহীন প্রচণ্ড ঝড় আর আল্লাহ তাআলার অদৃশ্য বাহিনী (ফেরেশতাগণ) তাদের সঙ্গে যা করার তা-ই করছিলেন। বাতাসে তাদের হাঁড়ি-পাতিল উল্টে যাচ্ছিল, আগুন ও বাতি নিভে যাচ্ছিল, তাঁবু মাথার ওপর ভেঙে পড়ছিল। এক সময় মুশরিক বাহিনীর সেনাপতি আবু সুফিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমাদের মধ্যে চর ও গুপ্তচর থাকতে পারে, সাবধান! প্রত্যেকে দেখো, তার পাশের লোকটি কে! প্রত্যেকে পাশে বসা লোকের হাত ধরো!’ আবু সুফিয়ান যেন টের পেয়েছিল যে, তাদের মধ্যে কোনো অপরিচিত লোক ঢুকে পড়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে ডানে ও বাঁয়ে বসা দুজনের হাত ধরে ফেললাম এবং তারা জিজ্ঞেস করার আগেই তাদের নাম জিজ্ঞেস করলাম। এভাবে নিজের পরিচয় গোপন রাখলাম। অবশেষে আবু সুফিয়ান তার বাহিনীকে উদ্দেশ করে বলল, ’হে কুরাইশরা! তোমরা যেখানে আছ, তা থাকার মতো জায়গা নয়। ঘোড়া, উট মরতে শুরু করেছে। দুর্ভিক্ষ চারদিক ঘিরে ফেলেছে।

বাতাসে আমাদের কী দশা হচ্ছে, তা তো দেখছ। এখনই রওনা হয়ে চলে যাও! এই যে আমি চললাম!’ এ কথা বলে সে তার উটে চড়ে বসল। মুশরিক বাহিনী বিধ্বস্ত অবস্থায় জড়ো হয়ে মক্কার দিকে রওনা হলো। তাদের ওপর বালু ও নুড়িপাথর বর্ষিত হচ্ছিল।14 মুশরিক বাহিনী চলে গেলে আমিও রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে চললাম। পথের অর্ধেক আসতেই সাদা পাগড়ি পরা প্রায় বিশজন অশ্বারোহী (ফেরেশতা) আমার সামনে এলেন। তাঁরা আমাকে বললেন, ‘রাসূলুল্লাহকে খবর দাও: আল্লাহ তাআলা শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছেন…’ আমি যখন রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরলাম, তিনি তখন একটি চাদরের ওপর নামাজ পড়ছিলেন। কিন্তু ফিরে আসামাত্রই যাওয়ার আগের সেই শীত ও কাঁপুনি আবার শুরু হলো। নামাজের পর রাসূলুল্লাহ জানতে চাইলেন, কী খবর এনেছি। আমি তাঁকে মুশরিকদের বিধ্বস্ত অবস্থা আর তাদের চলে যাওয়ার খবর দিলাম। রাসূলুল্লাহ এ খবরে খুব খুশি হলেন এবং মুচকি হাসলেন। আমরা দিনের পর দিন ঘুমাইনি। আমাদের নবী আমাকেও কাছে টেনে নিলেন এবং নিজের গায়ের চাদরের এক প্রান্ত আমার গায়ে জড়িয়ে দিলেন। সে রাত আমরা এভাবেই ভোর করলাম। সাহরির সময় রাসূলুল্লাহ আমাকে জাগালেন। সকাল হলে দেখা গেল, মুশরিক বাহিনীর কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।” মক্কার কাছাকাছি পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের পেছন থেকে প্রচণ্ড ঝড় বইতে থাকল, আর তারা পেছনে অবিরাম তাকবিরের আওয়াজ শুনতে পেল।

কুরাইশ মুশরিকরা শিবির ফেলে পালালে তাদের অনুসরণে আসা অন্য মুশরিক গোত্রগুলোও মদিনা ছেড়ে চলে গেল। যে বিরাট পরাজয় তারা কোনো দিন ভুলতে পারবে না, তার দুঃখ ও বেদনায় তারা ডুবে গেল। তারা যখন এই পরাজয়ের শিকার হচ্ছিল, তখন বিশ্বজগতের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে শোকরের সিজদায় লুটিয়ে পড়ছিলেন, তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করছিলেন।

“হে আল্লাহ! আমার ও আমার সাহাবীদের প্রতি দয়া করার জন্য তোমার শোকর আদায় করছি” হাদীস শরীফ

মুজাহিদরা “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনির মাঝে নূরানি মদিনার পথ ধরলেন। মুহূর্তের মধ্যে মদিনার রাস্তাঘাট শিশুদের ভিড়ে ভরে গেল; তারা বিশ্বজগতের সুলতানকে এবং নিজেদের বরকতময় বাবা, চাচা, মামা ও বড় ভাইদের স্বাগত জানাতে বেরিয়ে এসেছিল। মহানবীও মুচকি হেসে তাদের সাড়া দিচ্ছিলেন… খন্দকের যুদ্ধে ছয়জন মুসলমান শহিদ হয়েছিলেন… এই যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা (খন্দকের যুদ্ধের) সেই কাফিরদের তাদের ক্রোধসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোনো কল্যাণ বা বিজয় লাভ করতে পারল না। এভাবে আল্লাহ তাআলা (ফেরেশতা ও ঝড়ের মাধ্যমে) যুদ্ধে (সফল হওয়ার জন্য) মুমিনদের জন্য যথেষ্ট হলেন। আল্লাহ তাআলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি আজিজ, সবকিছুর ওপর পরাক্রমশালী।”15

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ স্মরণ করো। যখন তোমাদের ওপর (খন্দকের যুদ্ধে) বাহিনীগুলো আক্রমণ করেছিল, তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম এক ঝড় এবং তোমাদের অদেখা (ফেরেশতাদের) বাহিনী…”16

এই যুদ্ধের পর আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “এখন পালা তোমাদের। এরপর কুরাইশ আর তোমাদের বিরুদ্ধে আসতে পারবে না।”

বনু কুরাইজা অভিযান