ছোট বদর অভিযান
এই অভিযানকে বদরুল মাওইদ ও বদরুস সুগরাও বলা হয়। উহুদ থেকে ফেরার সময় আবু সুফিয়ান যখন বলেছিল, “আগামী বছর বদরে আবার যুদ্ধ করব”, তখন হাবিবে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইশারায় হযরত ফারুকে আজম উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উত্তর দিয়েছিলেন, “তা-ই হোক।” আবু সুফিয়ান সৈন্য জোগাড় করে কুরাইশদের যুদ্ধে উৎসাহিত করত। কিন্তু মনে মনে সে তা চাইত না। তবু লোকে যেন না বলে যে, সে কথা রাখেনি, সেজন্য সে সবার আগে আগে থাকত। সেই সময় নুআইম ইবনে মাসউদ আশজায়ি মক্কায় এসেছিল। সে জানাল যে, ইসলামি বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, এবং তাদের শক্তি ও প্রতাপের বর্ণনা দিল। আবু সুফিয়ান তাকে বলল, “যদি তুমি মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের যুদ্ধে বের হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারো, তাহলে তোমাকে তিন বছর বয়সী বিশটি উট দেব। সুহাইল ইবনে আমর আমার এই প্রতিশ্রুতির জামিন থাকুক।” নুআইম রাজি হলো। মদিনায় এসে সে কাফির বাহিনীর সংখ্যাধিক্যের খবর ছড়াল। সাহাবীদের একাংশ দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কিন্তু আবু বকর ও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) রাসূলুল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে মদিনা থেকে বের হওয়ার প্রস্তাব দিলেন। রাসূলুল্লাহ এতে অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, “যাঁর কুদরতের হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই যুদ্ধে বের হব।” তিনি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত রেখে গেলেন এবং পতাকা দিলেন হযরত আলির হাতে।
সেই সময় মক্কার মুশরিকরা ইসলামের বিস্তার রোধ করার জন্য আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে দুই হাজার সৈন্য নিয়ে বদরের দিকে রওনা হলো। জগৎসমূহের সরদার এক হাজার পাঁচশো বীর সাহাবীকে নিয়ে তাদের আগেই বদরে পৌঁছে গেলেন। মুজাহিদরা তাদের আগেই বদরে পৌঁছে গেছেন জেনে মুশরিকদের অন্তরে ভয় ঢুকে গেল। তারা কেবল মাররুজ জাহরান পর্যন্ত এগোতে পারল। বীর ইসলামি বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সাহস তাদের হলো না। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে তারা সে বছরের দুর্ভিক্ষকে অজুহাত বানিয়ে মক্কায় ফিরে গেল। মক্কাবাসীরা তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল।
মুসলমানদের সঙ্গে মাত্র দুটি ঘোড়া ছিল। কিন্তু ব্যবসার পণ্য ছিল প্রচুর। বদরে তাঁরা সেগুলো অনেক দামে বিক্রি করলেন। তখন জিলকদ মাসের মাঝামাঝি। তাঁরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেন। রাসূলে আকরাম তাঁর গৌরবময় সাহাবীদের নিয়ে আট দিন বদরে মুশরিকদের অপেক্ষায় রইলেন। তারপর আনন্দ ও মর্যাদার সঙ্গে মদিনার পথে রওনা হলেন।
জাতুর রিকা অভিযান
এই অভিযান মুহাররম মাসে সংঘটিত হয়। মদিনায় ভেড়া বিক্রি করতে আসা এক ব্যক্তি মুসলমানদের জানাল যে, বনু আনমার ও বনু সালামা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সৈন্য জড়ো করছে। এ খবর নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে পৌঁছাল। হযরত উসমানকে মদিনায় স্থলাভিষিক্ত রেখে মুসলমানরা চারশো, অন্য এক বর্ণনায় সাতশোজনের একটি বাহিনী নিয়ে সেই মাসের দশ তারিখে রবিবারের রাতে মদিনা থেকে বের হলেন। তাঁরা মুশরিকদের অবস্থানস্থলে গিয়ে পৌঁছালেন। কিন্তু সেখানে নারীদের ছাড়া আর কাউকে পেলেন না। মুশরিকদের পুরুষেরা পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। মুশরিকরা যেন ওত পেতে আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য সেখানকার সম্পদ গনিমত হিসেবে নেওয়া হলো এবং আশপাশের মুশরিক গোত্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে দেওয়া হলো।1 পনেরো দিন সফরে কাটিয়ে তাঁরা মদিনায় ফিরে এলেন।
“যাঁর কুদরতের হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই যুদ্ধে বের হব” হাদীস শরীফ
মুরাইসির যুদ্ধ
দুমাতুল জান্দাল অভিযান
দুমাতুল জান্দালে বসবাসকারী যে গোত্রগুলো দামেস্কে যাতায়াতকারী পথিকদের উত্ত্যক্ত করত এবং মদিনা মুনাওয়ারাকে হুমকি দিচ্ছিল, রাসূলুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে এক হাজারজনের একটি বাহিনী নিয়ে অভিযানে বের হলেন। তখন রবিউল আউয়াল মাসের শেষ দিক, দিনটি ছিল সোমবার। তিনি সিবা ইবনে উরতুফাকে মদিনায় স্থলাভিষিক্ত রেখে গেলেন। ইসলামি বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে শত্রু গোত্রগুলো পালিয়ে গেল। সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করার পর মুসলমানরা রবিউস সানি মাসের বিশ তারিখের দিকে মদিনায় ফিরে এলেন।2
মুরাইসির যুদ্ধ
এই যুদ্ধকে বনু মুস্তালিকের যুদ্ধও বলা হয়। মুরাইসি হলো কুদাইদে খুজাআ গোত্রের পানির কূপগুলোর এবং সেই কূপ পাহারা দেওয়ার জন্য নির্মিত দুর্গের নাম। এ জায়গাটি একই সঙ্গে বনু খুজাআ গোত্রের অগ্রবর্তী চৌকিও ছিল।
হিজরতের পঞ্চম বছরে বনু মুস্তালিকের সরদার হারিস ইবনে আবি দিরার মহানবীর সঙ্গে লড়াই করার জন্য বহু লোক জড়ো করেছিল। তাদের অস্ত্রসজ্জিত করে সে মদিনার ওপর চড়াও হওয়ার পরিকল্পনা করছিল। এ খবর আমাদের প্রিয় নবীর কাছে পৌঁছালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সাতশোজনের একটি বাহিনী নিয়ে বনু মুস্তালিকের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হলেন। মুরাইসি কূপের কাছে শিবির স্থাপন করা হলো। প্রথমে বনু মুস্তালিককে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হলো। তারা তা গ্রহণ না করে তির ছুড়ে যুদ্ধ শুরু করল। রাসূলুল্লাহ আদেশ দিলেন, “সবাই একসঙ্গে অতর্কিতে আক্রমণ করো!” এই আদেশ পালন করে সাহাবায়ে কেরাম বনু মুস্তালিকের দশজনকে হত্যা করলেন। গোত্রের সরদার পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল, কিন্তু তার কন্যা বাররা এবং তার গোত্রের ৬০০ জন বন্দি হলো। গনিমত বণ্টন করে দেওয়া হলো। বাররা মহানবীর দরবারে এসে বললেন, “যার ভাগে আমি পড়েছি, সেই মালিকের সঙ্গে নয় স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে মুক্তি পাওয়ার চুক্তি করেছি। আমাকে সাহায্য করুন!” মহানবী দয়া করে তাঁর এই ইচ্ছা পূরণ করলেন এবং তাঁকে কিনে নিলেন। তারপর তাঁকে আজাদ করে দিলেন। আমাদের প্রিয় নবীর দাওয়াতে তিনি মুসলমান হলেন। তাঁর মুসলমান হওয়ায় জগৎসমূহের সরদার অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং পুরস্কারস্বরূপ তাঁকে বিবাহ করে সম্মানিত করলেন। এ দেখে সাহাবায়ে কেরামের সবাই বললেন, “রাসূলুল্লাহর পরিবারের সদস্য আমাদের মায়ের আত্মীয়স্বজনকে দাস-দাসী হিসেবে খাটাতে আমরা লজ্জাবোধ করি।” এ কথা বলে তাঁরা নিজ নিজ বন্দিদের আজাদ করে দিলেন। এই বিবাহ শত শত বন্দির মুক্তির কারণ হলো।
আমাদের প্রিয় নবী তাঁর বরকতময় স্ত্রীর নাম বাররা বদলে জুওয়াইরিয়া রাখলেন। আমাদের মা হযরত জুওয়াইরিয়া সম্পর্কে আমাদের মা হযরত আয়েশা বলতেন, “জুওয়াইরিয়ার চেয়ে অধিক কল্যাণময়, অধিক বরকতময় কোনো নারী আমি দেখিনি।”3
ইসলামি বাহিনী বিজয়ীর বেশে নূরানি মদিনার পথ ধরলে আশপাশের মুশরিক গোত্রগুলোর চোখে ভয় ধরে গেল। তারা বুঝে গেল, মুসলমানদের ওপর আক্রমণের দুঃসাহস দেখানো কতটা বিপজ্জনক।
হিজরি পঞ্চম সনে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা
মুস্তালিক অভিযান থেকে ফেরার পথে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বইল। সাহাবীগণ ভাবলেন, শত্রু হয়তো মদিনায় এসে লুটপাট করতে চায়। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “ভয় পেয়ো না। মদিনা নিরাপদ স্থান, এর প্রতিটি কোণে রক্ষী ফেরেশতারা আছেন। তবে আজ এক মুনাফিক মারা গেছে। সে ছিল উবাই সালুলের বন্ধু জায়েদ ইবনে ফুরাআ।”
“জুওয়াইরিয়ার চেয়ে অধিক কল্যাণময়, অধিক বরকতময় কোনো নারী আমি দেখিনি” হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)
এই অভিযানে মুমিনদের মা হযরত আয়েশা ও উম্মে সালামাও গিয়েছিলেন। মুনাফিকরা আমাদের মা হযরত আয়েশার নামে অপবাদ রটাল। কিছু মুসলমানও এই অপবাদে প্রতারিত হয়েছিলেন। পবিত্র আয়াত নাজিল হলো; তাতে মুনাফিকদের অপবাদ ফাঁস করে দেওয়া হলো এবং হযরত আয়েশার প্রশংসা করা হলো।4 রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “হে আয়েশা! তোমার জন্য সুসংবাদ! হক তাআলা তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। তিনি তোমার পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়েছেন।” নবী আলাইহিস সালাম সাহাবীদের মসজিদে সমবেত করলেন। তিনি খুতবা দিলেন এবং নাজিল হওয়া মহান আয়াতগুলো পাঠ করলেন। এই পবিত্র আয়াতগুলোর বরকতে মুমিনদের অন্তরের সন্দেহ দূর হয়ে গেল। যারা এই অপবাদ রটানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তাদের শাস্তিও দেওয়া হলো। এই অভিযান থেকে ফেরার পথে তায়াম্মুমের আয়াত নাজিল হলো।5
আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) গলার হার মদিনার কাছে সালসালা নামক স্থানে আরেকবার হারিয়ে গেল। হার না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা সেখানে অপেক্ষা করলেন। সে জায়গায় পানি ছিল না, সাহাবীদের সঙ্গেও পানি ছিল না। রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তখন আয়েশা সিদ্দিকার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম পানির অভাবের কথা হযরত আবু বকরকে জানালেন। তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে গেলেন, আর রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালাম জেগে উঠলেন। আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের আয়াত নাজিল করলেন। সাহাবীগণ তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। তারপর আয়েশাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহা) উটের পিঠে বসালেন। উট উঠে দাঁড়াতেই হারটি পাওয়া গেল।
আজ তুমি জগতের নূর, তুমিই আল্লাহর প্রিয়জন,
তোমার দুয়ার থেকে আশিকদের দূরে রেখো না এক ক্ষণ।
তোমার পবিত্র নাম মুখে যেন থাকে প্রতিক্ষণ,
ব্যথিত হৃদয়ের ওষুধ সে, তাতে শান্তি পায় প্রাণমন।
আশা করি, তোমার প্রতিটি নাম শাফায়াত করবে আলাদা –
আহমদ ও মাহমুদ, আবুল কাসিম মুহাম্মদ মুস্তফা।
তাঁকেই তো বলা হয়েছে ‘ওয়াশ শামস’, বলা হয়েছে ‘ওয়াদ দুহা’,
তাঁর মুখ, ললাট যদি সূর্য-চাঁদে তুলনা করি, দোষ কোথা?
Kanûnî Sultân Süleymân (Muhibbî)
