বনু কুরাইজা অভিযান
রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খন্দকের যুদ্ধ থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে আমাদের মা হযরত আয়েশার ঘরে এলেন। তিনি অস্ত্র ও বর্ম খুলে রাখলেন। দেহ মুবারক ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল। তিনি গোসল করলেন। ঠিক তখনই হযরত দিহয়ার আকৃতিতে, গায়ে বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্রসহ এক অশ্বারোহী এলেন। তিনি ছিলেন জিবরাইল আলাইহিস সালাম। মহানবী তাঁর কাছে গেলে তিনি এই আদেশ পৌঁছে দিলেন, “হে আল্লাহ তাআলার রাসূল! মহান আল্লাহ আপনাকে এখনই বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন!” বিশ্বজগতের সুলতান হযরত বিলালকে ডেকে পাঠালেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য এই আদেশ দিলেন, “হে আমার সাহাবীগণ! ওঠো, ঘোড়ায়, উটে আরোহণ করো! যারা আনুগত্য করে, তারা যেন আসরের নামাজ বনু কুরাইজার এলাকায় আদায় করে!”
হাবিবে আকরাম সঙ্গে সঙ্গে বর্ম পরে তরবারি কোমরে বাঁধলেন। মুবারক মাথায় শিরস্ত্রাণ পরলেন, ঢাল পিঠে ঝোলালেন, বর্শা হাতে নিলেন। তারপর ঘোড়ায় চড়লেন। সাহাবীদের মাঝে এসে তিনি হযরত আলির হাতে ইসলামের পতাকা দিলেন এবং তাঁকে অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে মদিনার ঠিক দক্ষিণ-পূর্বের সমভূমিতে অবস্থিত কুরাইজা ইহুদিদের দুর্গের দিকে পাঠালেন। মদিনায় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে স্থলাভিষিক্ত রেখে গেলেন।1
গৌরবময় সাহাবীগণ আমাদের প্রিয় নবীকে মাঝখানে রেখে “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” তাকবির ধ্বনির মাঝে মদিনা থেকে বের হলেন। পথে বনু গানমের সঙ্গে তাঁদের দেখা হলো। তাঁরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে রাসূলুল্লাহর অপেক্ষা করছিলেন। মহানবী তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের সঙ্গে কারও দেখা হয়েছে কি?” তাঁরা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের সঙ্গে দিহয়া কালবির দেখা হয়েছে। তিনি জিন লাগানো একটি সাদা খচ্চরে চড়ে ছিলেন। খচ্চরটির ওপর ছিল রেশমি সাটিনের একটি মখমলের আবরণ।” আমাদের প্রিয় নবী তাঁদের বললেন:
“তিনি জিবরাইল। তাঁকে বনু কুরাইজার কাছে পাঠানো হয়েছে, যেন তিনি তাদের দুর্গগুলো কাঁপিয়ে দেন এবং তাদের অন্তরে ভয় ঢেলে দেন…” কুরাইজা ইহুদিদের দুর্গে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ইসলামি বাহিনীর সংখ্যা তিন হাজারে দাঁড়াল। হযরত আলি ইসলামের পতাকা কুরাইজা ইহুদিদের দুর্গের সামনে গেড়ে দিলেন। এ দেখে ইহুদিরা মহানবীর বিরুদ্ধে কটু কথা বলতে লাগল। হযরত আলি গিয়ে অবস্থার কথা মহানবীকে জানালেন। রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন হাজার সৈন্য নিয়ে সেখানে তাশরিফ আনার পর দয়াপরবশ হয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। ইহুদিরা এই সুন্দর প্রস্তাব গ্রহণ করল না। আমাদের প্রিয় নবী প্রস্তাব দিলেন, “তাহলে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের আদেশের কাছে মাথা নত করে দুর্গ থেকে নেমে আত্মসমর্পণ করো।” তারা এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করল।
তখন জগৎসমূহের সরদার তিরন্দাজদের ওস্তাদ হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বললেন, “হে সাদ! এগিয়ে যাও এবং তাদের দিকে তির ছোড়ো!” হযরত সাদ ও অন্যান্য তিরন্দাজ তাকবির ধ্বনির মাঝে তূণের তিরগুলো ইহুদিদের দুর্গের দিকে ছুড়তে লাগলেন। তারাও তির ও পাথর ছুড়ে জবাব দিল, এভাবে লড়াই শুরু হলো। মুসলমানদের দুর্বল মুহূর্তে যারা পেছন থেকে আঘাত হেনেছিল এবং হিংসার বশে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নবুয়ত মেনে নেয়নি, ইহুদিদের সেই দলটি দুর্গের দরজা খুলে ময়দানে বের হওয়ার সাহস পেল না।
“হে আমার সাহাবীগণ! ওঠো, ঘোড়ায়, উটে আরোহণ করো! যারা আনুগত্য করে, তারা যেন আসরের নামাজ বনু কুরাইজার এলাকায় আদায় করে!” হাদীস শরীফ
যুদ্ধ অবরোধের রূপ নিয়ে চলতে থাকল। ইসলামি বাহিনীর মধ্যে থাকা মুনাফিকরাও গোপনে দুর্গে খবর পাঠিয়ে বলছিল, “খবরদার, আত্মসমর্পণ করবে না! মদিনা ছেড়ে চলে যেতে বললেও রাজি হবে না! যদি লড়াই চালিয়ে যাও, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তোমাদের সাহায্য করব, কোনো কিছুতেই তোমাদের জন্য কার্পণ্য করব না। আর যদি তোমাদের মদিনা থেকে বের করে দেয়, আমরাও তোমাদের সঙ্গে বেরিয়ে যাব!…” এই খবর পেয়ে ইহুদিরা মুনাফিকদের সাহায্যের আশায় নতুন সংকল্প ও নতুন আশা নিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে গেল। অবরোধ দীর্ঘ হলো; প্রায় এক মাস হয়ে এলেও মুনাফিকদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য এল না। তাদের অন্তরে ভয় ঢুকে গেল এবং তারা সন্ধি করতে চায় বলে জানাল।
সন্ধি করার জন্য নাব্বাশ ইবনে কাইস নামের এক ইহুদি রাসূলুল্লাহর দরবারে এসে বলল, “হে মুহাম্মদ! বনু নাজিরের প্রতি যে দয়া দেখিয়েছ, আমাদের প্রতিও তা দেখাও। আমাদের ধনসম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র তোমার হোক! শুধু আমাদের রক্ত ঝরিয়ো না। সন্তান ও স্ত্রীদের নিয়ে আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি দাও। অস্ত্র ছাড়া প্রতিটি পরিবারকে এক উট-বোঝাই মাল নিয়ে যাওয়ারও অনুমতি দাও!…” জগৎসমূহের সরদার উত্তর দিলেন, “না! এই প্রস্তাব আমি গ্রহণ করতে পারি না!” এবার সে বলল, “মাল নিয়ে যাওয়ার দাবি ছেড়ে দিলাম। আমাদের রক্ত ঝরিয়ো না! নারী ও সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দাও!” আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “না! কোনো শর্ত ছাড়াই আমার ফয়সালার কাছে মাথা নত করা, আনুগত্য করে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপায় নেই!” ইহুদি নাব্বাশ বিপর্যস্ত অবস্থায় দুর্গে ফিরে গিয়ে আলোচনার কথা জানাল। এবার বনু কুরাইজা গভীর হতাশা ও দুঃখে ডুবে গেল।2 তাদের নেতাদের অন্যতম কাব ইবনে আসাদ ন্যায়ের পথে এসে নিজ গোত্রের সামনে এই স্বীকারোক্তি ও প্রস্তাব রাখল, “হে আমার গোত্র! দেখতেই পাচ্ছ, আমাদের মাথার ওপর বড় এক বিপদ এসে পড়েছে। এ অবস্থায় তোমাদের প্রতি আমার তিনটি পরামর্শ আছে। এগুলোর যেকোনোটি বেছে নিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করতে পারো! প্রথমটি: এসো, এই মহান ব্যক্তির অনুসরণ করি এবং তাঁর নবুয়ত মেনে নিই! আল্লাহর কসম, আমরা সবাই জানি, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সেই নবী, যাঁর গুণাবলি আমরা আমাদের কিতাবে দেখেছি। যদি আমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনি, তাহলে আমাদের জান, সন্তান, স্ত্রী ও ধনসম্পদ রক্ষা পাবে। তাঁর অনুসরণ না করার একমাত্র কারণ হলো আরবদের প্রতি আমাদের ঈর্ষা এবং তাঁর বনি ইসরাইল থেকে না হওয়া। অথচ এটি আল্লাহরই ব্যাপার। এসো, তাঁর অনুসরণ করি!…” ইহুদিরা সবাই একযোগে বিরোধিতা করে বলল, “না! আমরা এটা মানব না এবং নিজেদের ছাড়া আর কারও অনুসরণ করব না!”
এবার কাব তার দ্বিতীয় প্রস্তাব দিল, “এসো, আমরা সবাই আমাদের সন্তান ও স্ত্রীদের হত্যা করি; তারপর পেছনে ভাবনার মতো কেউ না থাকায় মুসলমানদের ওপর চড়াও হই, মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই করি!…” ইহুদিরা এটাও প্রত্যাখ্যান করল।
তৃতীয় প্রস্তাবে কাব বলল, “আজ রাত শনিবারের রাত। আমরা যে এ রাতে লড়ব না, মুসলমানরা তা জানে বলে তারা নিশ্চিন্ত ও অসতর্ক থাকতে পারে। এসো, আমরা তরবারি কোষমুক্ত করে সবাই একসঙ্গে দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এমন অতর্কিত আক্রমণে হয়তো আমরা জয়ী হতে পারব!…”
ইহুদিরা “শনিবারে কাজ করার নিষেধাজ্ঞা আমরা ভাঙতে পারি না!” বলে এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করল। কেবল তাদের মধ্য থেকে আসিদ ও সালাবা নামের দুই ভাই এবং তাঁদের চাচাতো ভাই আসাদ প্রথম প্রস্তাব গ্রহণ করে মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন। তাঁরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে সাহাবায়ে কেরামের দলে যোগ দিলেন।3 ইহুদিরা নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ সময় বাদানুবাদ করল। অবশেষে তারা আত্মসমর্পণের পতাকা তুলল এবং মহানবীর কাছে অনুরোধ করল, তাদের ব্যাপারে ফয়সালা দেওয়ার জন্য তিনি যেন একজনকে সালিস নিযুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমার সাহাবীদের মধ্যে যাঁকে চাও, তাঁকে সালিস হিসেবে বেছে নাও।” তারা বলল, “সাদ ইবনে মুআজ যে ফয়সালা দেবেন, আমরা তাতে রাজি।” মহানবী তা গ্রহণ করলেন এবং হযরত সাদ ইবনে মুআজকে নিয়ে আসার আদেশ দিলেন।
সাদ ইবনে মুআজ খন্দকের যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ মসজিদে নববিতে একটি তাঁবুর ভেতর তাঁর চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। সালিস নির্বাচিত হওয়ার পর হযরত সাদকে খাটিয়ায় করে কুরাইজার দুর্গে নিয়ে যাওয়া হলো। পথে হযরত সাদ আপনমনে বলছিলেন, “আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলার পথে আমি কোনো নিন্দুকের নিন্দায় কান দেব না!” রাসূলুল্লাহর সামনে তাঁকে খাটিয়া থেকে নামানো হলো। মহানবী বললেন, “হে সাদ! এরা তোমার ফয়সালা অনুযায়ী আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছে। এখন এদের ব্যাপারে তোমার ফয়সালা আমাকে জানাও।” সাদ ইবনে মুআজ বললেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিঃসন্দেহে ফয়সালা দেওয়ার অধিক যোগ্য আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “এদের ব্যাপারে ফয়সালা দেওয়ার আদেশ আল্লাহ তাআলা তোমাকেই দিয়েছেন।” হযরত সাদ ইহুদিদের কাছ থেকে তাঁর ফয়সালা মেনে নেওয়ার পাকা প্রতিশ্রুতি নিলেন। উভয় পক্ষ উৎকণ্ঠা নিয়ে ফয়সালার অপেক্ষা করতে লাগল। তখন হযরত সাদ নিজের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক, শিরদাঁড়া হিম করা, তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত এই মহান ফয়সালা ঘোষণা করলেন:
“আমার ফয়সালা এই: বুদ্ধিসম্পন্ন ও বালিগ সকল পুরুষের গর্দান কাটা হোক! তাদের নারী ও শিশুদের বন্দি করা হোক, আর তাদের ধনসম্পদ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করা হোক!…”
এই চূড়ান্ত ফয়সালার সামনে ইহুদিরা স্তব্ধ হয়ে গেল। কারণ তাদের নিজেদের কিতাবেও এমন সীমালঙ্ঘনকারীদের শাস্তি ঠিক এ রকমই ছিল। সেখানে লেখা ছিল, “যুদ্ধ করার জন্য কোনো নগরে গেলে তাদের সন্ধির দাওয়াত দাও। তারা তা গ্রহণ করে দরজা খুলে দিলে ভেতরের সবাই তোমাকে কর দেবে এবং তোমার সেবা করবে। আর যদি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের অবরোধ করো। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তাদের ওপর বিজয়ী হলে তাদের সব পুরুষকে তরবারির নিচে ফেলো। তাদের নারী, শিশু ও ধনসম্পদ গনিমত হিসেবে নাও!…”
সাদ ইবনে মুআজের ফয়সালা ঐশী বিধানের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় জগৎসমূহের সরদার আমাদের প্রিয় নবী তাঁকে অভিনন্দন জানালেন এবং প্রশংসা করে বললেন, “তুমি তাদের ব্যাপারে সাত আসমানের ওপরে লাওহে মাহফুজে থাকা আল্লাহ তাআলার ফয়সালার অনুরূপ ফয়সালা দিয়েছ!”
ইহুদিরা নিজেদের কিতাবে বর্ণিত এই বিধানের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি তুলতে পারল না। বুদ্ধিসম্পন্ন ও বালিগ সকল পুরুষের হাত তাদের গলার সঙ্গে বেঁধে মদিনায় নিয়ে যাওয়া হলো। পরদিন রাসূলুল্লাহর আদেশে হযরত আলি ও হযরত জুবাইর ফয়সালা কার্যকর করলেন। শিশু, নারী ও ধনসম্পদ সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বণ্টন করা হলো।4 এই গোষ্ঠী মুসলমানদের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে পেছন থেকে আঘাত হেনেছিল, সব চুক্তি ভঙ্গ করেছিল এবং মহানবীকে তাঁর শৈশব থেকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এসেছিল। এভাবে এই কুটিল, বিশ্বাসঘাতক ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী থেকে মদিনা ও তার আশপাশ মুক্ত হলো। বন্দিদের মধ্যে একজন নারী মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করলেন। রায়হানা নামের এই নারী মহানবীর ভাগে পড়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে স্বাধীনতা দিলেন – চাইলে নিজের ধর্মে থাকবেন, চাইলে মুসলমান হবেন। রায়হানা নিজের ধর্মে থাকতে চান বলে জানালেন। তাঁকে উম্মে মুনজিরের ঘরে পাঠানো হলো। পরে সালাবা ইবনে সাইয়ার পরামর্শ ও প্রচেষ্টায় তাঁর অন্তর ইসলামের প্রতি নরম হলো। তখন আমাদের নবী রায়হানাকে বললেন, “তুমি কি আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের পথ ধরতে চাও? আমি এটাকেই উপযুক্ত মনে করি।” রায়হানা বললেন, “জি।” তাঁর এই পদক্ষেপে অত্যন্ত খুশি হয়ে আমাদের প্রিয় নবী – তিনিও যেন আনন্দিত হন এবং জান্নাতে তাঁর মর্যাদা যেন অনেক উঁচু হয়, সেজন্য – দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে আজাদ করলেন এবং স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন। মোহর দিয়ে তাঁকে বিবাহ করলেন। তাঁদের বিয়েও উম্মে মুনজিরের ঘরেই হলো। এভাবে রায়হানা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সকল মুসলমানের মা হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন।5
“না! কোনো শর্ত ছাড়াই আমার ফয়সালার কাছে মাথা নত করা, আনুগত্য করে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপায় নেই!” হাদীস শরীফ
সাদ ইবনে মুআজের শাহাদাত
বনু কুরাইজার ইহুদিদের ব্যাপারে ফয়সালা দেওয়ার পর সাদ ইবনে মুআজকে আবার তাঁর তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁর ক্ষত আরও গুরুতর হলো, অবস্থার অবনতি ঘটল। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কাছে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! সাদ তোমার সন্তুষ্টির জন্য তোমার পথে জিহাদ করেছেন। তোমার রাসূলকেও সত্য বলে মেনেছেন। তাঁর জন্য সহজ করে দাও…” আমাদের প্রিয় নবীর এই বরকতময় কথা শুনে হযরত সাদ ইবনে মুআজ চোখ খুলে ফিসফিস করে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে সালাম ও শ্রদ্ধা জানাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহ তাআলার নবী।” এরপর সাদ ইবনে মুআজের আত্মীয়স্বজন তাঁকে তাঁবু থেকে বনু আবদুল আশহালের ঘরে নিয়ে গেলেন। সে রাতে তাঁর অবস্থা খুবই গুরুতর হয়ে পড়ল। জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবীর কাছে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ রাতে আপনার উম্মতের মধ্যে কে ইন্তেকাল করেছেন, যাঁর ইন্তেকালের কথা ফেরেশতাদের মাঝে সুসংবাদ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে?” তখন বিশ্বজগতের সুলতান সঙ্গে সঙ্গে সাদ ইবনে মুআজের অবস্থা জানতে চাইলেন। লোকেরা জানাল, তাঁকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মহানবী কয়েকজন সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে সাদ ইবনে মুআজের কাছে রওনা হলেন। পথে খুব দ্রুত চলার কারণে সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি!” মহানবী দ্রুত চলার কারণ ব্যাখ্যা করে ইরশাদ করলেন, “ফেরেশতারা যেমন হানজালার জানাজায় আমাদের আগে উপস্থিত হয়েছিলেন, তেমনি সাদের জানাজায়ও আমাদের আগে উপস্থিত হবেন। আমরা তাঁদের আগে পৌঁছাতে পারব না।”
সাদ ইবনে মুআজের কাছে পৌঁছে মহানবী দেখলেন, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি তাঁর শিয়রে দাঁড়ালেন এবং সাদ ইবনে মুআজকে তাঁর কুনিয়াত ধরে সম্বোধন করে বললেন, “হে আবু আমর! তুমি ছিলে নেতাদের মধ্যে সর্বোত্তম। আল্লাহ তাআলা তোমাকে সৌভাগ্য, বরকত ও সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন! আল্লাহ তাআলাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তুমি পূরণ করেছ। আল্লাহ তাআলাও তোমাকে যা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা দেবেন!” এ সময় সাদ ইবনে মুআজের মা কাঁদতে কাঁদতে এই কবিতাটি আবৃত্তি করলেন:6
হায়, কেমন করে সইবে তার অভাগিনী মা!
সবর তো চাই, তবু কাঁদি – এ বিপদ সয় না!
আসলাম ইবনে হারিস এভাবে বর্ণনা করেছেন, “রাসূলুল্লাহ সাদ ইবনে মুআজের ঘরে এলেন। আমরা দরজার কাছে অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভেতরে প্রবেশ করলেন; তিনি খুব লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছিলেন। আমরাও তাঁর পেছনে পেছনে গেলাম। রাসূলুল্লাহ থামতে ইশারা করলে আমরা থেমে ফিরে এলাম। ভেতরে সাদের মরদেহ ছাড়া আর কেউ ছিল না। রাসূলুল্লাহ কিছুক্ষণ ভেতরে থেকে বাইরে এলেন। আমার কৌতূহল হলো; আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটার রহস্য কী?’ তখন তিনি বললেন, ’এত ভিড়ের মজলিসে আমি আর কখনো উপস্থিত হইনি। (ফেরেশতায় ভরে গিয়েছিল।) এক ফেরেশতা আমাকে তাঁর ডানার ওপর তুলে নিলেন, তবেই আমি বসতে পারলাম।’ তারপর তিনি সাদ ইবনে মুআজকে কুনিয়াত ধরে সম্বোধন করে বললেন, ‘তোমার জন্য কল্যাণ হোক, হে আবু আমর! তোমার জন্য কল্যাণ হোক, হে আবু আমর! তোমার জন্য কল্যাণ হোক, হে আবু আমর!’”
তাঁর ইন্তেকাল রাসূলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কেরামকে গভীর শোকে ফেলে দিল; তাঁরা অশ্রু ঝরিয়ে কাঁদলেন। তাঁর জানাজায় সকল সাহাবী সমবেত হলেন। আমাদের প্রিয় নবী জানাজার নামাজে ইমামতি করলেন এবং তাঁর খাটিয়া বহন করলেন। সাদ ইবনে মুআজের খাটিয়া বহনের সময় সাহাবায়ে কেরাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এত সহজে বহন করা যায় এমন জানাজা আমরা আর কখনো দেখিনি!” তখন মহানবী বললেন, “ফেরেশতারা নেমে এসেছেন, তাঁরাই তাঁকে বহন করছেন।” জানাজা যাওয়ার সময় মুনাফিকরাও সাদকে হেয় করার জন্য বলল, “কত হালকা!” তখন আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “সাদের জানাজায় সত্তর হাজার ফেরেশতা নেমে এসেছেন। এর আগে কখনো তাঁরা এত বিপুলসংখ্যায় জমিনে নামেননি।”
আবু সাঈদ খুদরি তাঁর দাদার এই উক্তি বর্ণনা করেছেন, “সাদ ইবনে মুআজের কবর যাঁরা খুঁড়েছিলেন, আমি ছিলাম তাঁদের একজন। তাঁর জন্য কবর খোঁড়া শুরু করতেই কবর থেকে চারদিকে মেশকের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল!” শুরাহবিল ইবনে হাসানা বলেছেন, “সাদ ইবনে মুআজকে দাফন করার সময় এক ব্যক্তি তাঁর কবর থেকে এক মুঠো মাটি তুলে নিয়েছিল। পরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর সেই মাটি মেশক হয়ে গেল। তাঁর মরদেহ কবরে নামানোর সময় আমাদের নবী কবরের পাশে বসে ছিলেন; তাঁর মুবারক চোখ অশ্রুসিক্ত হলো, তিনি মুবারক দাড়ি হাতে ধরে গভীর শোক প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ‘সাদ ইবনে মুআজের ইন্তেকালে আরশ কেঁপে উঠেছে।’” একবার আমাদের নবীকে একটি অত্যন্ত মূল্যবান পোশাক উপহার দেওয়া হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম যখন বললেন, এটি কত সুন্দর, তখন তিনি বললেন, “জান্নাতে সাদ ইবনে মুআজের রুমালগুলো এর চেয়েও সুন্দর।”
আবু সুফিয়ানের প্রতিশোধের চেষ্টা
খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পর একদিন আবু সুফিয়ান নিজ গোত্রের মাঝে বসে তাদের বলল, “মুহাম্মদের কাছ থেকে আমাদের প্রতিশোধ নিতে পারে, এমন কেউ কি নেই!” এক বেদুইন এ কথা শুনে আবু সুফিয়ানের কাছে এল। সে বলল, “তুমি যদি আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দাও, তাহলে আমি এ কাজ করব। আমি পথও ভালো চিনি, আমার ধারালো খঞ্জরও আছে। আমি কাউকেই ভয় পাই না।” আবু সুফিয়ান তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিল, তার চাওয়া পূরণ করল। একটি উট কিনে তার হাতে দিল এবং বিষয়টি গোপন রাখতে বলল। বেদুইন রাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে অল্প সময়েই মদিনায় পৌঁছাল। সে জানতে পারল, নবী আলাইহিস সালাম বনু আবদুল আশহাল গোত্রে আছেন। উটটি এক জায়গায় বেঁধে সে পায়ে হেঁটে সেখানে গেল। নবী আলাইহিস সালাম তখন ওই গোত্রের মসজিদে নসিহত করছিলেন। দূর থেকে বেদুইনকে দেখে তিনি ইরশাদ করলেন, “এই যে লোকটি আসছে, তার মনে খারাপ মতলব আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও দয়া আমার ও তার মাঝে পর্দা হয়ে থাকবে।”
বেদুইন রাসূলুল্লাহর দিকে এগোল। এ সময় উসাইদ ইবনে হুদাইর তাকে ধরে পেছনে টেনে নিলেন। “রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাক, হে অভিশপ্ত!” বলে তিনি তার কোমরবন্ধে হাত দিলেন এবং কোমরে গোঁজা খঞ্জরটি দেখতে পেলেন। তিনি বুঝলেন, তার মতলব খারাপ। বেদুইন উসাইদের পায়ে পড়ে চিৎকার করে বলল, “আমার রক্ত ঝরিয়ো না!” উসাইদ তাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে এলেন। নবী আলাইহিস সালাম বললেন, “হে বেদুইন, সত্য কথা বলো, তুমি কে? সত্য কথা ছাড়া আর কিছুই তোমার উপকারে আসবে না। যদি মিথ্যা বলো, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলা তোমার মতলব আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন।” বেদুইন নিরাপত্তা (আমান) চেয়ে সব খুলে বলল। রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামের আদেশে তাকে আটকে রাখা হলো।
পরদিন তাকে ডেকে এনে তিনি বললেন, “আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিলাম, যেখানে ইচ্ছা চলে যাও। তবে তোমাকে এর চেয়েও উত্তম একটি জিনিসের প্রস্তাব দিচ্ছি।” বেদুইন জিজ্ঞেস করল, “সেটি কী?” নবী আলাইহিস সালাম বললেন, “আমি চাই, তুমি আল্লাহর একত্ব ও আমার রিসালাতের সাক্ষ্য দাও।” বেদুইন সঙ্গে সঙ্গে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কখনো কাউকে ভয় পেতাম না। আপনাকে দেখে আমার বুদ্ধি লোপ পেল। আমার মনে যা ছিল, আপনি তা জেনে গেলেন। এ কথা আমি আর আবু সুফিয়ান ছাড়া কেউ জানত না। আমি বুঝলাম, আপনি আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর হেফাজতে আছেন; আবু সুফিয়ানের মতলব হলো শয়তানি মতলব।”
“হে আল্লাহ! সাদ তোমার সন্তুষ্টির জন্য তোমার পথে জিহাদ করেছেন। তোমার রাসূলকেও সত্য বলে মেনেছেন। তাঁর জন্য সহজ করে দাও” হাদীস শরীফ
আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে এমন দুষ্কর্ম প্রকাশ পেলে বিশ্বজগতের শিক্ষক খাজায়ে কায়েনাত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমর ইবনে উমাইয়া ও দামরা ইবনে আসলামকে আদেশ দিলেন, তাঁরা যেন মক্কায় গিয়ে সুযোগ পেলে আবু সুফিয়ানকে হত্যা করেন। এই দুই সাহাবী হারাম শরীফে পৌঁছে তাওয়াফ করার সময় এক দাসী তাঁদের চিনে ফেলল। সে চিৎকার করে বলল, “হে মক্কাবাসী, অসতর্ক থেকো না! এরা আমর ইবনে উমাইয়া ও দামরা ইবনে আসলাম!” লোকেরা তাঁদের চিনে ফেললে দুই সাহাবী দুই দিকে আলাদা হয়ে গেলেন। আমর মক্কার পাহাড়গুলোর একটির গুহায় ঢুকে আত্মগোপন করলেন। আর ইবনে আসলাম মদিনায় চলে গেলেন। কয়েক দিন পর আমর গুহা থেকে বের হলেন। আবু সুফিয়ানের দুই গুপ্তচর তাঁর সামনে পড়ল। তাদের একজনকে তিনি তির মেরে হত্যা করলেন, অন্যজন পালিয়ে গেল। তারপর আমর নিরাপদে মদিনায় পৌঁছালেন। আবু সুফিয়ান এসব জানতে পেরে খুব ভয় পেয়ে গেল।
হিজরতের পঞ্চম বছরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
রাসূলে আকরাম জিলকদ মাসে জয়নব বিনতে জাহশকে বিবাহ করলেন।7 এ বছর হিজাবের পবিত্র আয়াতগুলো নাজিল হলো এবং মুসলমান নারীদের পর্দা করার আদেশ দেওয়া হলো।8 মদিনা মুনাওয়ারার কাছে বসবাসকারী মুজাইনা গোত্র প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে মুসলমান হলো এবং তাদের মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হলো।9 এ বছরই ভূমিকম্প ও চন্দ্রগ্রহণ হলো। তা ছাড়া এ বছরই হজ ফরজ করা হলো। খন্দকের যুদ্ধের পর আশপাশের গোত্রগুলোর একাংশ ইসলামি রাষ্ট্রের শক্তি স্বীকার করে নিল। তারা ভাবতে শুরু করল যে, মুসলমানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে চলা, এমনকি মুসলমান হয়ে যাওয়াই সবচেয়ে সঠিক পথ। তাদের কেউ কেউ মহানবীর দরবারে এসে মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন।
জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বীন ইসলাম প্রচারের জন্য সাহাবীদের নিয়ে বিভিন্ন দল গঠন করে আশপাশের গোত্রগুলোকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পাঠালেন। কিছু গোত্রের কাছে তিনি নিজেই গেলেন। দুমাতুল জান্দালের অধিবাসীদের মতো কিছু গোত্র নসিহত গ্রহণ করে মুসলমান হলো। আর গাতাফান, বনু লিহইয়ানের মতো গোত্রগুলো ইসলামি বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে পালিয়ে গেল। এভাবে আশপাশের গোত্রগুলোকে সতর্ক করে দেওয়া হলো।
বনু লিহইয়ান অভিযান
রাজির ঘটনায় মুশরিকরা আসিম ইবনে সাবিত, খুবাইব ইবনে আদি ও তাঁদের সঙ্গীদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন) শহিদ করেছিল। মহানবী এতে অত্যন্ত ব্যথিত ও শোকাহত হয়েছিলেন। বনু লিহইয়ানের কাছ থেকে তাদের এই কাজের হিসাব নেওয়ার জন্য তিনি উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন, কারণ তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। পরিস্থিতি অনুকূল হলে মুসলমানরা দুইশোজনের একটি বাহিনী নিয়ে বনু লিহইয়ানের বিরুদ্ধে রওনা হলেন। মহানবী মদিনায় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে নিজের স্থলাভিষিক্ত রেখে গেলেন। শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাঁরা শামের দিকে যাওয়ার ভান করলেন এবং সেই মুমিনগণ যেখানে শহিদ হয়েছিলেন, সেই রাজির জলাশয়ের কাছে এলেন। সেখানে তাঁরা আসিম ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করলেন। ইসলামি বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে বনু লিহইয়ানের লোকেরা পাহাড়ে পালিয়ে গেল।
মহানবী ও তাঁর সাহাবীগণ সেখানে এক দিন অবস্থান করলেন। চারদিকে সৈন্য পাঠানো হলো, কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শত্রুকে পাওয়া গেল না। তবে এই ভয়ই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। তারপর সাহাবায়ে কেরাম উসফানে পৌঁছালেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত আবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “দশজনের একটি দল নিয়ে গানিম পর্যন্ত চারপাশ খুঁজে দেখে ফিরে এসো।” কাফিররা ইসলামি বাহিনীর সাড়াশব্দ শুনতে পেল, তাদের অন্তরে ভয় ঢুকে গেল। তারা পাহাড়ে উধাও হয়ে গেল। মুসলমানরা কারও দেখা পেলেন না। কিন্তু এই অভিযান আশপাশের মুশরিকদের কাছে মুসলমানদের আধিপত্যের এক দলিলের মতো হয়ে রইল। তারপর তাঁরা মদিনায় ফিরে এলেন। এই অভিযান চৌদ্দ দিন স্থায়ী হয়েছিল।
গাবা অভিযান
একে জু কারাদ অভিযানও বলা হয়। রাসূলুল্লাহর বাচ্চাসহ বিশটি উটনী ছিল। আবু জারের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছেলে মাঠে সেগুলো চরাতেন। ফাজারা গোত্রের উয়াইনা ইবনে হিসন নামের এক ব্যক্তি বুধবারের রাতে চল্লিশজন অশ্বারোহী নিয়ে এল, আর তারা ইবনে আবি জারকে শহিদ করল। উটগুলোও তারা হাঁকিয়ে নিয়ে গেল।
এই খবর রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছালে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদিনায় স্থলাভিষিক্ত রেখে নিজে পাঁচশো অশ্বারোহী নিয়ে রওনা হলেন। তিনি মিকদাদ ইবনে আসওয়াদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাতে পতাকা দিয়ে তাঁকে সাহাবীদের একাংশের সঙ্গে অগ্রবর্তী দল হিসেবে আগে পাঠালেন। সালামা ইবনে আকওয়াকেও (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাফিরদের পেছনে পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জু কারাদ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন।
অগ্রবর্তী দল শত্রুর পেছনের অংশকে ধরে ফেললেন। হযরত আবু কাতাদা কাফির মাসআদা ফাজারিকে হত্যা করলেন। হযরত উক্কাশা ইব্বান ইবনে আমর নামের এক কাফিরকে হত্যা করলেন। মুসলমানদের মধ্যে একজন শহিদ হলেন। হযরত সালামা ইবনে আকওয়া কাফিরদের পিছু ধাওয়া করলেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষ তিরন্দাজ ছিলেন। অভিশপ্তদের অনেককে তিনি হত্যা করলেন, অনেককে আহত করলেন। তাদের অনেক জিনিসপত্র ফেলে যেতে বাধ্য করলেন। কাফিরদের হাত থেকে দশটি উট ছিনিয়ে নিলেন। হযরত আবু কাতাদা শিবিরে এলে রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্য দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আবু কাতাদাকে সুস্থতা দাও এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁকে সুস্থ-সবল রেখে বাঁচিয়ে রাখো!” রাসূলুল্লাহ মাসআদা ফাজারির ঘোড়া ও অস্ত্র হযরত আবু কাতাদাকে দিলেন। আবু কাতাদার পর হযরত সালামা ইবনে আকওয়াও এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল মুশরিকদের ফেলে যাওয়া দুটি ঘোড়া। আমাদের নবী তাঁকেও সাদরে গ্রহণ করে অভিনন্দন জানানোর পর ইরশাদ করলেন, “আজ আমাদের অশ্বারোহীদের মধ্যে সর্বোত্তম আবু কাতাদা, আর পদাতিকদের মধ্যে সর্বোত্তম সালামা ইবনে আকওয়া।”
যে মুশরিকরা চরম ঔদ্ধত্যে নবীর সম্পদে হাত বাড়িয়েছিল, তাদের জন্য এবং অন্যান্য গোত্রের জন্যও এই অভিযান এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা হয়ে রইল। তাঁরা জু কারাদে এক রাত ও এক দিন অবস্থান করলেন। তারপর মদিনায় ফিরে এলেন। এই অভিযান পাঁচ দিন স্থায়ী হয়েছিল।
“জান্নাতে সাদ ইবনে মুআজের রুমালগুলো এর চেয়েও সুন্দর” হাদীস শরীফ
তোমার আগমন রহমত, আনন্দ আর প্রশান্তি, ইয়া রাসূলাল্লাহ,
তোমার প্রকাশ আশিকদের বেদনার ওষুধ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
আদম যখন পানি ও মাটির মাঝে, তখনও তুমি ছিলে নবী,
তাই নবীগণের ইমাম হওয়া তোমারই শোভা, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
পূর্ণতাপ্রাপ্তরা পূর্ণতা পেয়েছেন তোমারই নূরে,
তোমার অস্তিত্ব খোদার কুদরতের পূর্ণ প্রকাশ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার মাধ্যমেই তাঁরা পৌঁছেছেন সেই সত্তায়, নানা আত্মিক স্বাদে,
অভাবীদের দান করাই তোমার কাজ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
হুদায়ির জন্য শাফায়াত করো – প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে,
তোমার দুয়ারে আশ্রয় নেওয়া এক ভিখারি সে, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
Aziz Mahmûd Hüdâyî
