আমার প্রিয় নবী

বনু নাজির অভিযান

আমর ইবনে উমাইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মাউনায় বন্দি থাকা অবস্থায় বাঁধন থেকে মুক্ত হলেন এবং মদিনায় ফেরার পথে বনু আমিরের দুজন মুশরিকের দেখা পেলেন। তিনি এই দুই কাফিরকে হত্যা করলেন। তারা রাসূলুল্লাহর নিরাপত্তার আশ্রয়ে ছিল, কিন্তু আমর তা জানতেন না। মদিনায় এসে তিনি রাসূলুল্লাহকে ঘটনাটি জানালেন। মহানবী জানালেন যে, আমর ভুল করেছেন। তারপর তিনি নিহতদের ওয়ারিশদের দিয়াত (রক্তপণ) পরিশোধের আদেশ দিলেন।

বনু আমির ও বনু নাজির গোত্রের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। বনু নাজির প্রতিবেশীর হকও রক্ষা করত। তাই এই দিয়াত পরিশোধে বনু নাজির গোত্রের মধ্যস্থতার প্রয়োজন দেখা দিল।

উহুদের যুদ্ধের পর হিজরতের চতুর্থ বছরের রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে হযরত আবু বকর, উমর, আলি, জুবাইর, তালহা, সাদ ইবনে মুআজ ও উসাইদ ইবনে হুদাইরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সঙ্গে নিয়ে বনু নাজিরের কাছে গেলেন। তাঁরা বিষয়টি তাদের জানালেন। তারা জানাল যে, ওই দুই কাফিরের দিয়াত পরিশোধে সাহায্য করতে তারা প্রস্তুত, এবং বলল, “একটু অপেক্ষা করুন, আমরা খাবার তৈরি করি।” সে সময় তাঁরা যে ঘরের কাছে অবস্থান করছিলেন, রাসূল আলাইহিস সালাম তার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে ছিলেন, আর সাহাবীগণও একত্র হয়ে তাঁর চারপাশে বসে ছিলেন। এ সময় হুয়াই ইবনে আখতাব বলল, “হে ইহুদিরা! মুহাম্মদকে এমন নিঃসঙ্গ অবস্থায় পাওয়ার সুযোগ আর কখনো হাতে আসবে না। তোমাদের কেউ এই ঘরের ছাদে উঠে সেখান থেকে তার মাথায় একটি পাথর ফেলুক, আমরা তার হাত থেকে মুক্তি পাই।” আমর ইবনে জাহহাশ বলল, “আমি এ কাজ করব।” সাল্লাম ইবনে মিশকাম তাদের এ থেকে যতই নিষেধ করল, কোনো লাভ হলো না। সে বলল, “এ কাজ থেকে বিরত থাকো। তাকে এ খবর জানিয়ে দেওয়া হবে। এ কাজ আমাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণ হবে। এ থেকে অত্যন্ত খারাপ কিছু ঘটতে পারে।” বনু নাজিরের ইহুদিরা তার কথা শুনল না। সেই মুহূর্তে জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে রাসূলুল্লাহকে এ খবর জানিয়ে দিলেন। মহানবী সাহাবীদের কিছু না বলে, যেন কোনো কাজে যাচ্ছেন এমনভাবে সেই মজলিস থেকে উঠে মদিনায় চলে গেলেন। এভাবে তাদের গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো।

এরপর জগৎসমূহের সরদার চুক্তি ভঙ্গকারী এই ইহুদি গোত্রের কাছে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাকে পাঠালেন এবং বললেন, “বনু নাজিরের ইহুদিদের কাছে যাও! তাদের বলো, ‘রাসূলুল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে এই আদেশ জানানোর জন্য পাঠিয়েছেন: আমার ভূমি থেকে বেরিয়ে চলে যাও! এখানে আমার সঙ্গে বসবাস কোরো না! তোমরা আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছ। আমি তোমাদের দশ দিন সময় দিচ্ছি। এই সময়ের পর তোমাদের কাউকে এখানে দেখা গেলে তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে।’”

হযরত মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এই আদেশ জানিয়ে দিলে তারা ভয়ে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করল। কিন্তু মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাদের কাছে এই বলে খবর পাঠাল, “খবরদার, দুর্গ থেকে বের হয়ো না। তোমাদের ধনসম্পদ ও ভূমি ছেড়ে চলে যেয়ো না। আমার লোকদের মধ্য থেকে দুই হাজার লোক নিয়ে আমরা তোমাদের সাহায্যে আসছি।”

এ খবর পেয়ে বিশ্বজগতের সুলতান সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে মসজিদে নববি থেকে চার কিলোমিটার দূরে বনু নাজিরের দুর্গের দিকে অগ্রসর হলেন। মদিনায় হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমকে স্থলাভিষিক্ত রেখে যাওয়া হলো। পতাকা বহন করছিলেন হযরত আলি। দুর্গটি ঘিরে ফেলে অবরোধ শুরু করা হলো। আগে যে ইহুদিরা সাহাবায়ে কেরামকে লড়াইয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ করত, তারা দুর্গ থেকে বের হওয়ার সাহস পেল না। মুনাফিকদের সাহায্যও এসে পৌঁছাল না।

সাহাবায়ে কেরাম দুর্গটি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে নিলেন যে, একটি পাখিও উড়তে দিলেন না। বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা অবরোধের শেষে ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করল। সব অস্ত্র ও সোনা-রুপা মুসলমানদের জন্য রেখে তাদের একাংশকে শামে (সিরিয়ায়), একাংশকে খায়বারে নির্বাসিত করা হলো। এভাবে মদিনা অঞ্চলে ইহুদিদের মধ্যে কেবল বনু কুরাইজাই রয়ে গেল।1

“ইহুদিরা আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল! জিবরাইল আমাকে এ খবর দিলে আমি উঠে পড়লাম!” হাদীস শরীফ

হিজরতের চতুর্থ বছরে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

এই বছর মদপান হারাম ঘোষণা করে পবিত্র আয়াত নাজিল হলো।2 রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র স্ত্রীগণের অন্যতম হযরত জয়নব বিনতে খুজাইমা হিজরি চতুর্থ বছরের রবিউস সানি মাসে, রাসূলুল্লাহর সঙ্গে বিবাহের মর্যাদা লাভ করার প্রায় আট মাস পরে, ত্রিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেন।3 এই বছরই হযরত আলি ও হযরত ফাতিমার দ্বিতীয় সন্তান হযরত হুসাইন জন্মগ্রহণ করলেন।4 হযরত উম্মে সালামার স্বামী উহুদের যুদ্ধে আহত হয়ে পরে ইন্তেকাল করেছিলেন; তিনি কয়েকটি সন্তান রেখে গিয়েছিলেন। আমাদের মা উম্মে সালামা বয়স্ক অবস্থায় কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী তাঁর প্রতি গভীর মমতা ও দয়া দেখিয়ে তাঁকে বিবাহ করে মর্যাদায় ভূষিত করলেন।5

ফাতিমা বিনতে আসাদের ইন্তেকাল

হযরত আলির মা ফাতিমা বিনতে আসাদও এই বছর ইন্তেকাল করলেন।6 এতে আমাদের প্রিয় নবী অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে ইরশাদ করলেন, “আজ আমার মা ইন্তেকাল করেছেন!” আমাদের প্রিয় নবী তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের ইন্তেকালের পর তাঁর কাছেই বড় হয়েছিলেন। আর তিনি যখন নবুয়ত ঘোষণা করলেন, ফাতিমা তৎক্ষণাৎ মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। এ কারণে বিশ্বজগতের সুলতান তাঁকে মায়ের স্থানে রাখতেন, তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তাঁর প্রতি মমতাবশত তিনি নিজের গায়ের মুবারক জামা খুলে দিয়ে সেটি দিয়ে তাঁকে কাফন পরানোর আদেশ দিলেন। জানাজার নামাজ পড়ানোর পর তিনি জানালেন যে, সত্তর হাজার ফেরেশতা নামাজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কবর পর্যন্ত গিয়ে তার ভেতরে নামলেন। কবরের জীবন যেন তাঁর জন্য আরামদায়ক ও সুখকর হয়, সে জন্য কবরের কোণগুলোর দিকে প্রশস্ত করার ইশারা করলেন এবং কবরে শুয়ে পড়লেন।

কবর থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর মুবারক চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে গিয়েছিল, আর পবিত্র অশ্রু কবরে ঝরে পড়েছিল। হে আমার রব! এ কেমন মমতা ছিল?… আর কী সৌভাগ্যবতী নারীই না ছিলেন তিনি!… এমনকি হযরত উমরও স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি বললেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কারও জন্য যা করেননি, এই নারীর জন্য তা করলেন!” তখন বিশ্বস্তদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “আবু তালিবের পর এই স্নেহময়ী নারীর মতো আমার প্রতি এত সদাচরণ আর কেউ করেননি। তিনি ছিলেন আমার মা। নিজের সন্তানরা ক্ষুধার্ত থাকতেও তিনি সবার আগে আমার পেট ভরাতেন। নিজের সন্তানদের গায়ে-মাথায় ধুলোবালি লেগে থাকতেও তিনি সবার আগে আমার চুল আঁচড়ে গোলাপের তেল দিয়ে দিতেন। তিনি ছিলেন আমার মা! তাঁকে যেন জান্নাতের পোশাক পরানো হয়, সে জন্য আমার জামা কাফন হিসেবে পরিয়ে দিয়েছি। কবরের জীবন যেন তাঁর জন্য কোমল ও সহজ হয়, সে জন্য কবরে তাঁর পাশে শুয়েছি। জিবরাইল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমাকে এই খবর দিয়েছেন, ‘এই নারী জান্নাতি।’” এরপর তিনি আমাদের মা ফাতিমা বিনতে আসাদের জন্য এভাবে দোয়া করলেন, “আল্লাহ তাআলা আপনাকে মাগফিরাত দান করুন, ক্ষমা করুন, আপনাকে প্রতিদান দিন। হে আমার মা! আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহমত করুন। নিজে ক্ষুধার্ত থেকেও আপনি আমাকে পেট ভরে খাইয়েছেন। নিজে না পরে আমাকে পরাতেন, নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন। জীবন দানকারী ও মৃত্যু দানকারী আল্লাহ তাআলা। তিনি চিরঞ্জীব। তাঁর মৃত্যু নেই। হে আল্লাহ! আমার মা ফাতিমা বিনতে আসাদকে মাফ করো, ক্ষমা করো! তাঁকে তাঁর জবাব শিখিয়ে দাও। তাঁর কবর প্রশস্ত করো। হে দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু আল্লাহ! তোমার নবী, অর্থাৎ আমার এবং পূর্ববর্তী নবীগণের উসিলায় আমার এই দোয়া কবুল করো।”

হিজরতের চতুর্থ বছরে সংঘটিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

হযরত রুকাইয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া হযরত উসমানের ছয় বছর বয়সী ছেলে আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করলেন। জগৎসমূহের সরদার নাতির জানাজার নামাজ পড়ালেন এবং নিজেই তাঁকে কবরে রাখলেন। তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হলেন, তাঁর পবিত্র অশ্রু কবরে ঝরে পড়ল। কবরের ফলকটি তিনি নিজের মুবারক হাতে স্থাপন করলেন এবং ইরশাদ করলেন, “আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যারা দয়ালু ও কোমলহৃদয়, তাদের প্রতি রহমত করেন।”7

তুমি রাসূলদের সুলতান, মহিমান্বিত বাদশাহ, হে আমার সরদার।
অসহায়দের চিরন্তন সৌভাগ্য তুমি, হে আমার সরদার।
ঐশী দরবারে তুমিই সবার অগ্রণী, হে আমার সরদার।
“লাআমরুকা” ফরমানে তুমি সুদৃঢ়, হে আমার সরদার।
তুমিই আহমদ, মাহমুদ ও মুহাম্মদ, হে আমার সরদার,
হকের পক্ষ থেকে আমাদের সুদৃঢ় সুলতান তুমি, হে আমার সরদার।
পবিত্র রুহগুলোকে দীপ্তি দেয় তোমারই মুক্তাসম সত্তা।
ফেরেশতারা যেখানে মুখ ঘষে, তা তোমার দুয়ারের মাটি।
তাজাল্লির দর্শনের আয়না তোমারই দৃষ্টি,
আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি তোমারই বন্ধু।
তুমিই আহমদ, মাহমুদ ও মুহাম্মদ, হে আমার সরদার,
হকের পক্ষ থেকে আমাদের সুদৃঢ় সুলতান তুমি, হে আমার সরদার।
চিরস্থায়ী জগতের মিম্বরে পাঠ হয় তোমার খুতবা।
প্রতিদান দিবসের আদালতে কার্যকর হয় তোমারই রায়।
তোমার আগমনের স্তুতিধ্বনি ওঠে আল্লাহর আরশে।
তোমার সম্মানিত নামগুলো স্মরণ করা হয় পৃথিবী ও আকাশে।
তুমিই আহমদ, মাহমুদ ও মুহাম্মদ, হে আমার সরদার,
হকের পক্ষ থেকে আমাদের সুদৃঢ় সুলতান তুমি, হে আমার সরদার।
Şeyh Galib

“আবু তালিবের পর এই স্নেহময়ী নারীর (ফাতিমা বিনতে আসাদের) মতো আমার প্রতি এত সদাচরণ আর কেউ করেননি। তিনি ছিলেন আমার মা” হাদীস শরীফ

ছোট বদর অভিযান