সাহাবায়ে কেরামের তরবিয়ত
মসজিদে নববি
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় তাশরিফ আনার পর সর্বপ্রথম কাজ হিসেবে এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করতে চাইলেন, যেখানে সাহাবীদের গড়ে তোলা হবে এবং জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা হবে। এ সময় জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনি যেন তাঁর জন্য পাথর ও কাঁচা ইট দিয়ে একটি ঘর (মসজিদ) নির্মাণ করেন।” হাবিবে আকরাম মহানবী মদিনায় আগমনের সময় তাঁর কাসওয়া উটনী যেখানে বসে পড়েছিল, সে জায়গাটি তৎক্ষণাৎ মালিকদের কাছ থেকে কিনে নিতে চাইলেন। মালিকরা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা এর বিনিময় কেবল মহান আল্লাহর কাছেই আশা করি। জায়গাটি আমরা আপনাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাদিয়া দিচ্ছি।” তাঁরা তা দান করতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তবুও মহানবী তা গ্রহণ করলেন না, বরং এর মূল্য বাড়তিসহ পরিশোধ করলেন।1
একদিকে জমি সমান করে ঠিকঠাক করা হচ্ছিল, অন্যদিকে কাঁচা ইট বানানো হচ্ছিল এবং পাথর বয়ে আনা হচ্ছিল। অবশেষে সব প্রস্তুতি শেষ হলে ভিত্তি স্থাপনের জন্য সবাই সমবেত হলেন। ভিত্তির প্রথম পাথরটি মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের মুবারক হাতে স্থাপন করলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে ইরশাদ করলেন, “আবু বকর তার পাথর আমার পাথরের পাশে রাখুক! উমর তার পাথর আবু বকরের পাথরের পাশে রাখুক! উসমান তার পাথর উমরের পাথরের পাশে রাখুক! আলি তার পাথর উসমানের পাথরের পাশে রাখুক!” তাঁর আদেশ পালিত হওয়ার পর তিনি সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, “তোমরাও তোমাদের পাথর রাখো।” তাঁরাও রাখতে শুরু করলেন।
মসজিদ নির্মাণে আমাদের প্রিয় নবী থেকে শুরু করে সকল সাহাবায়ে কেরাম বিরামহীনভাবে, বিশ্রাম ছাড়াই কাজ করলেন। তাঁরা মুবারক পিঠে করে পাথর ও কাঁচা ইট বহন করলেন। পাথর দিয়ে ভিত্তি দেড় মিটার উঁচু করলেন, আর তার ওপরে কাঁচা ইট গেঁথে দেয়াল তুললেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাঁচা ইট বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এক সাহাবী তাঁর কাছে এসে অত্যন্ত আদবের সঙ্গে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইটটি আমাকে বহন করার অনুমতি দেবেন কি?” খাতামুন নাবিয়্যিন মহানবী আরও বেশি কোমলতার সঙ্গে তাঁকে জানালেন যে, সওয়াব অর্জনের প্রয়োজন তাঁর নিজেরই বেশি; তাই ইটটি দিলেন না। বরং তাঁকেও গিয়ে পাথর নিয়ে আসার পরামর্শ দিলেন।
মসজিদে নববি নির্মাণে যাঁরা সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন রাসূলুল্লাহ নিজেই। তিনি সবচেয়ে ভারী পাথরগুলো কাঁধে তুলে নিতেন; তাঁর মুবারক বুক হাঁপিয়ে উঠত, তবু তিনি সেগুলো রাজমিস্ত্রিদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এসব পাথর ও ইট বহনের সময় তিনি এই কাজের মর্যাদার কথা বলে এবং যে নিয়ামত লাভ হবে তার সুসংবাদ দিয়ে সাহাবীদের উৎসাহিত করতেন।
মহানবীর এই পরিশ্রম দেখে মুসলমানরা গভীর প্রেম নিয়ে কাজ করছিলেন। এমনকি সবাই যখন একটি করে ইট বহন করতেন, আম্মার ইবনে ইয়াসির তখন দুটি করে ইট বহন করতেন – একটি মহানবীর পক্ষ থেকে, আরেকটি নিজের জন্য। রাসূলুল্লাহ এ দৃশ্য দেখে তাঁর কাছে গেলেন। হযরত আম্মারের পিঠে মুবারক হাত বুলিয়ে ইরশাদ করলেন, “হে সুমাইয়ার পুত্র! তোমার জন্য দুটি সওয়াব, আর অন্যদের জন্য একটি!”
মসজিদের দেয়াল অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল এবং ছাদ দেওয়া হলো। আরবের রীতি অনুযায়ী কক্ষগুলো খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি ছিল, আর ওপরে ছিল পশমের চাটাইয়ের আচ্ছাদন। দরজায় কেবল পর্দা ঝোলানো থাকত। কক্ষগুলো ছিল মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর দিকে। বেশির ভাগ কক্ষের দরজা মসজিদের দিকে খুলত। ছাদের উচ্চতা ছিল মাঝারি গড়নের মানুষের উচ্চতার চেয়ে এক বিঘত বেশি। হযরত ফাতিমা ও হযরত আয়েশার কক্ষের মাঝে একটি দরজা ছিল। এ ছাড়া মসজিদের সঙ্গে লাগিয়ে রাসূলুল্লাহর জন্য কাঁচা ইটের দুটি কক্ষ তৈরি করা হলো। এগুলোর ছাদও খেজুরগাছের কাণ্ড ও ডাল দিয়ে ঢাকা হলো। সময়ের সঙ্গে এই কক্ষের সংখ্যা বাড়িয়ে নয়টি পর্যন্ত করা হয়। মসজিদের নির্মাণ শেষ হলে মহানবী হযরত খালিদ ইবনে জায়েদের ঘর থেকে নিজের জন্য তৈরি করা ঘরে চলে এলেন।2
“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই” হুজুরাত: ১০
ইয়া রাসূলাল্লাহ!
প্রেমিকদের সর্বদা বিরহে দিশেহারা করে রাখে
– তোমার চেহারা মুবারক, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
সকাল-সন্ধ্যা ব্যথায় তাদের দিয়ে আহাজারি করায়
– তোমার প্রতি আকুল বিরহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
দিনরাত বিলাপই করেছে আমার কাজ,
বিরহের আগুনে পুড়িয়েছে আমার হৃদয়,
অবিরাম কাঁদিয়েছে আমার দুচোখ
– তোমার বিচ্ছেদ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আসফিয়া যে আল্লাহর অনুগ্রহ দেখেছেন,3
আউলিয়া যে স্বাদ ও প্রশান্তি পেয়েছেন,4
নবীগণ যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, হে বাদশাহ,
– তা তোমারই সৌভাগ্য ও মহিমা, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
দয়া করো আমার প্রতি – এই প্রবাসী, এই পথহারার প্রতি,
আমি অপরাধী, করুণা করো এই কালিমালিপ্ত মুখের প্রতি,
অসহায়, নিরুপায়ের প্রতি মমতা দেখানো
– তোমারই অভ্যাস, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
হে পাপীদের শাফায়াতকারী, এক আল্লাহর নূর,
নাসুহি তোমারই গোলাম, তাকে তাড়িয়ে দিয়ো না।
দয়া করো, তোমার অনুগ্রহের দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়ো না,
সে তো তোমারই উম্মত, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
Nasûhî Üsküdârî
খেজুরগাছের কাণ্ডের কান্না
মসজিদে নববিতে খেজুরগাছের একটি কাণ্ড পোঁতা ছিল। মহানবী জুমার দিনে মসজিদের হান্নানা নামের এই খুঁটিতে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন।
পরে তিনি তিন ধাপের একটি মিম্বর তৈরি করালেন। এক জুমার দিনে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে নববিতে সমবেত হয়েছিলেন। মহানবী খুতবা দেওয়ার জন্য নতুন মিম্বরে উঠলে, আগে তিনি যে শুকনো খেজুর-কাণ্ডে হেলান দিতেন, সেটি সবাই শুনতে পায় এমন জোরে, গর্ভবতী উটনীর কান্নার মতো আওয়াজে কাঁদতে ও গোঙাতে লাগল। সকল সাহাবায়ে কেরাম বিস্মিত হয়ে সেই আওয়াজ শুনলেন। কিন্তু আওয়াজ কিছুতেই থামছিল না। তখন জগৎসমূহের সরদার মিম্বর থেকে নেমে এলেন এবং কাণ্ডটিতে মুবারক হাত বুলিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে কান্না ও গোঙানি থেমে গেল। আমাদের নবীর প্রতি শুকনো খেজুর-কাণ্ডের এই ভালোবাসা ও প্রেম দেখে সাহাবীরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।
এ ঘটনা সম্পর্কে হযরত আনাস ইবনে মালিক বলেছেন, “তার আওয়াজে মসজিদ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল।” আর ইবনে আবি ওয়াদাআ বলেছেন, “খেজুর-কাণ্ডটি ফেটে নিজের জায়গা থেকে নড়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ এসে তার ওপর মুবারক হাত রাখার পরই কেবল তা চুপ হলো।”
মহানবী ইরশাদ করলেন, “যাঁর কুদরতের হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আমি যদি একে হাত বুলিয়ে না দিতাম, তাহলে আমার প্রতি বিরহ ও শোকে এটি কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই কাঁদতে থাকত।” অন্য এক বর্ণনায় জানানো হয়েছে: রাসূল আলাইহিস সালাম শুকনো খেজুর-কাণ্ডটির দিকে ফিরে ইরশাদ করলেন, “তুমি চাইলে তোমাকে তোমার আগের বাগানে ফিরিয়ে দেব। আবার ডালপালা মেলে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। আর চাইলে তোমাকে জান্নাতে রোপণ করব, আর আল্লাহ তাআলার বন্ধুরা তোমার ফল খাবেন।” রাসূলুল্লাহ তার দিকে কান পেতে শুনলেন, সে বলছে, “আমাকে জান্নাতে রোপণ করুন, আল্লাহ তাআলার বন্ধুরা আমার ফল খাবেন, আর আমি এমন জায়গায় থাকব, যেখানে কখনো পুরনো হব না, পচেও যাব না।” গাছের এই কথা মহানবীর কাছে উপস্থিত লোকেরাও শুনলেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে উত্তর দিলেন, “তুমি যা চাও, তা-ই করব।” তারপর সাহাবীদের দিকে ফিরে ইরশাদ করলেন, “সে দারুল বাকাকে দারুল ফানার (এই দুনিয়ার) ওপর প্রাধান্য দিয়েছে।”5 এরপর রাসূলুল্লাহর আদেশে খেজুর-কাণ্ডটিকে মাটিতে দাফন করা হলো।
পরিবারের সদস্যদের মদিনায় আগমন
সরওয়ারে আলম মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও হযরত আবু বকর হিজরতের সময় নিজেদের সন্তানদের মক্কায় রেখে এসেছিলেন। ইমাম বুখারি বর্ণিত এক হাদীস শরীফে হযরত আয়েশা বলেন, রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, “হে আয়েশা! স্বপ্নে আমাকে দুবার তোমাকে দেখানো হয়েছিল। মনে হয়, আমি সবুজ রেশমি কাপড়ের এক টুকরায় তোমার ছবি দেখেছিলাম, আর আমাকে বলা হয়েছিল, ‘এই ছবি যার, সে তোমার ভাবী স্ত্রী।’” এই স্বপ্নের পর (আমাদের মা হযরত খাদিজার ইন্তেকালের এক বছর পর) মক্কায় থাকতেই মহানবী ও আমাদের মা হযরত আয়েশার বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান তখনও হয়নি। আমাদের মা হযরত আয়েশা এ বিষয়ে বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ মদিনায় হিজরত করার সময় আমাদের এবং নিজের কন্যাদের মক্কায় রেখে গিয়েছিলেন। মদিনাকে ধন্য করার পর তিনি তাঁর আজাদকৃত গোলাম জায়েদ ইবনে হারিসা ও আবু রাফিকে দুটি উট এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য ৫০০ দিরহাম পথখরচসহ আমাদের কাছে পাঠালেন।
আমার বাবাও আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে দুই-তিনটি উটসহ তাঁদের সঙ্গে জুড়ে দিলেন এবং আমার ভাই আবদুল্লাহকে চিঠি লিখে আদেশ দিলেন, তিনি যেন আমার মাকে, আমাকে ও আমার বোন আসমাকে উটে চড়িয়ে পাঠিয়ে দেন। আমি, আমার মা উম্মে রুমান, রাসূলুল্লাহর কন্যাদের মধ্যে হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা ও উম্মে কুলসুম, তাঁর স্ত্রী সাওদা, আর উম্মে আইমান ও উসামা – সবাই একসঙ্গে রওনা হলাম। কুদাইদ নামের জায়গায় পৌঁছে জায়েদ ৫০০ দিরহাম দিয়ে আরও তিনটি উট কিনলেন। কাফেলায় তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহও যোগ দিলেন। মিনা থেকে বাইদ নামের জায়গায় পৌঁছালে আমার উটটি পালিয়ে ছুটতে লাগল। আমি তখন হাওদার ভেতরে ছিলাম। আমার মাও আমার পাশে ছিলেন। আমার মা ‘হায় আমার মেয়ে, হায় আমার নববধূ!’ বলে ছটফট করছিলেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের উটটিকে শান্ত করলেন এবং আমাদের রক্ষা করলেন। অবশেষে আমরা মদিনায় এসে পৌঁছালাম। আমি আমার বাবার পরিবারের সঙ্গে নামলাম। আর রাসূলুল্লাহর পরিবারের লোকেরা তাঁর কক্ষগুলোর সামনে নামলেন।”
“আমি যদি একে (হান্নানাকে) জড়িয়ে না ধরতাম, তাহলে আমার বিচ্ছেদে এটি কিয়ামত পর্যন্ত কাঁদত” হাদীস শরীফ
আমাদের মা হযরত আয়েশা কিছুকাল তাঁর বাবা হযরত আবু বকরের ঘরে অবস্থান করলেন। তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল বদরের যুদ্ধের পর।
কতই না সৌভাগ্যবান সেই মানুষ,
কুরআনই যার পাঠ!
আজান-ইকামত শুনলে
যার হৃদয় ভরে ওঠে ঈমানে!
আজানে মুহাম্মদি
মসজিদে নববি নির্মিত হওয়ার পর নামাজের ওয়াক্ত হলে ওয়াক্ত শুরু হওয়ার কথা জানানোর এবং মুসলমানদের মসজিদে ডাকার কোনো নিয়ম ছিল না। কেবল বলা হতো, “আসসালাতু জামিআহ (চলো, নামাজের দিকে)।”
একদিন রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে চাইলেন, নামাজের ওয়াক্তে মুমিনদের কীভাবে মসজিদে ডাকা উচিত। কেউ কেউ বললেন, নামাজের ওয়াক্ত জানানোর জন্য নাসারাদের মতো নাকুস, অর্থাৎ ঘণ্টা বাজানো হোক; কেউ কেউ বললেন, ইহুদিদের মতো শিঙা ফোঁকা হোক। আবার কেউ কেউ নিজেদের মত জানিয়ে বললেন, “নামাজের ওয়াক্তে আগুন জ্বালিয়ে উঁচু জায়গায় তুলে ধরা হোক।” রাসূলুল্লাহ এর কোনোটিই গ্রহণ করলেন না।6
আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ ইবনে সালাবা ও হযরত উমর স্বপ্নে দেখলেন যে, আজান দেওয়া হচ্ছে। হযরত আবদুল্লাহ আমাদের প্রিয় নবীর কাছে এসে নিজের স্বপ্নের কথা এভাবে বর্ণনা করলেন: “আমি দেখলাম, গায়ে সবুজ চাদর জড়ানো, কোমরে লুঙ্গির মতো কাপড় বাঁধা এক ব্যক্তি হাতে একটি ঘণ্টা নিয়ে আছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার হাতের ঘণ্টাটি কি বিক্রি করবেন?’ তিনি আমাকে বললেন, ‘এটা দিয়ে কী করবে?’ আমি বললাম, ‘নামাজের ওয়াক্ত জানানোর জন্য বাজাব।’ তখন সেই ব্যক্তি বললেন, ‘আমি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি।’ এ কথা বলে তিনি কিবলার দিকে ফিরে উচ্চস্বরে পড়তে লাগলেন, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…’ শেষ করার পর ‘নামাজে দাঁড়ানোর সময়ও এভাবে বলবে’ বলে আজানের বাক্যগুলো আবার বললেন এবং শেষের দিকে ‘কাদ কামাতিস সালাহ’ বাক্যটি যোগ করলেন।”
তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “স্বপ্নটি সত্য। ওই বাক্যগুলো বিলালকে শিখিয়ে দাও, সে আজান দিক!” একেই আজান নাম দেওয়া হলো।7
হযরত বিলাল তখন মসজিদ শরীফের কাছের একটি উঁচু ছাদে উঠে শিখিয়ে দেওয়া বাক্যগুলো দিয়ে প্রথম আজান দিলেন।
হযরত উমর আজানের আওয়াজ শুনে দৌড়ে রাসূলুল্লাহর দরবারে এলেন। তিনি নিবেদন করলেন যে, হযরত বিলাল যে বাক্যগুলো উচ্চারণ করেছেন, হুবহু সেগুলোই তিনি স্বপ্নে দেখেছেন। সে রাতে সাহাবায়ে কেরামের কয়েকজনও একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। ঠিক সেই সময় সূরা জুমুআর ৯ম পবিত্র আয়াত নাজিল হলো এবং এভাবে ওহীর মাধ্যমেও তা জানিয়ে দেওয়া হলো।
একদিন ফজরের নামাজের সময় বিলাল হাবশি আমাদের প্রিয় নবীর দরজার সামনে দুবার উচ্চস্বরে বললেন, “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।”8 মহানবীর এটি পছন্দ হলো। তিনি ইরশাদ করলেন, “হে বিলাল, এ কতই না সুন্দর কথা! ফজরের আজান দেওয়ার সময় এটিও বলবে।” এভাবে ফজরের আজানে এই বাক্যটিও বলা শুরু হলো।
আমাদের নবীর ইন্তেকাল পর্যন্ত মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালনকারী বিলাল হাবশির কণ্ঠ ছিল উদাত্ত, অত্যন্ত সুন্দর ও গভীর প্রভাবময়। তিনি আজান দিতে শুরু করলে সবাই গভীর প্রেম ও ভাবাবেশে শুনতে শুনতে আত্মহারা হয়ে যেতেন। আজান দেওয়ার সময় তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে ফেলতেন।
নামাজের ওয়াক্তে সাহাবায়ে কেরামের আজানে মুহাম্মদির মাধ্যমে একে অপরকে মসজিদে ডাকা মদিনার মুশরিক ও ইহুদিদের কাছে খুবই অদ্ভুত ঠেকল। আজান দেওয়ার সময় তারা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। তাদের এই ভাঁড়ামির জবাবে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মর্মার্থে ইরশাদ করলেন, “তোমরা যখন আজানের মাধ্যমে নামাজের দিকে ডাকো, তখন তারা একে খেলা ও তামাশার বস্তু বানায়। এর কারণ, তারা এমন এক সম্প্রদায়, যাদের বুদ্ধি নেই।”9
মুয়াজ্জিন আজান দিলেন, দাঁড়িয়ে ইকামত দিলেন,
কাবার দিকে মুখ ফেরালেন, নিয়তও করলেন।
শুনে ঈমানদারেরা সসম্মানে কান পাতলেন,
তারপর নামাজে দাঁড়িয়ে রবের বন্দেগি করলেন।
আসহাবে সুফফা
মহানবী মসজিদে নববির উত্তর দেয়ালের পাশে খেজুরের ডাল দিয়ে একটি ছাউনি তৈরি করালেন। মক্কা থেকে হিজরত করে আসা, ধনসম্পদ ও ঘরবাড়িহীন অবিবাহিত সাহাবীদের তিনি সেখানে থাকার আদেশ দিলেন।10 এই অবিবাহিত সাহাবীরা এবং আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে যাঁরা দরিদ্র, তাঁরা মসজিদে নববির পাশে সুফফা নামের বড় চালাঘরের নিচে বসবাস করতেন এবং ইলম শেখা ও শেখানোয় নিয়োজিত থাকতেন। তাঁদের সংখ্যা দশ থেকে চারশো পর্যন্ত ওঠানামা করত। বেশির ভাগ সময় তাঁরা হতেন সত্তরজন। এই সাহাবীরা রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে কখনো সরে যেতেন না এবং তাঁর কোনো সোহবত থেকে বঞ্চিত হতেন না। দিনরাত তাঁরা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন, ইলম অর্জন করতেন, হাদীস শরীফ মুখস্থ করতেন। দিনের বেশির ভাগ সময় রোজা রেখে কাটাতেন; ইবাদত ও আনুগত্য থেকে এক মুহূর্তও বিচ্ছিন্ন হতেন না। এখানে যাঁরা গড়ে উঠতেন, তাঁদের নতুন মুসলমান হওয়া গোত্রগুলোর কাছে পাঠানো হতো; তাঁরা তাদের পবিত্র কুরআন ও সুন্নত শরীফ, অর্থাৎ দ্বীন ইসলাম শিক্ষা দিতেন। অসংখ্য ফজিলতের অধিকারী এই বরকতময় সাহাবীরা ছিলেন মারিফাতের এক বিশাল বাহিনী। মহানবী তাঁদের খুব ভালোবাসতেন, তাঁদের সঙ্গে বসে আলাপ করতেন এবং একসঙ্গে খাবার খেতেন। সেখানে যাঁরা থাকতেন, তাঁদের বলা হতো আসহাবে সুফফা। একদিন রাসূলুল্লাহ আসহাবে সুফফার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, তাঁরা কতটা দরিদ্র। এমন অবস্থায় থেকেও তাঁরা প্রশান্ত ও উজ্জ্বল হৃদয়ে ইবাদত করে যাচ্ছিলেন। মহানবী তাঁদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ইরশাদ করলেন, “হে সুফফাবাসী! তোমাদের জন্য সুসংবাদ! আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ থেকে যায়, যে তোমাদের মতো এই কঠিন অবস্থাতেও সন্তুষ্ট, তাহলে সে নিশ্চয়ই আমার বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত।”
“তোমরা যখন আজানের মাধ্যমে নামাজের দিকে ডাকো, তখন তারা একে খেলা ও তামাশার বস্তু বানায়। এর কারণ, তারা এমন এক সম্প্রদায়, যাদের বুদ্ধি নেই” মায়িদা: ৫৮
হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবকিছুর আগে তাঁর এই মনোনীত সাহাবীদের প্রয়োজন মেটাতেন, তারপর নিজের আহলে বাইতের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করতেন। আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন, “যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আমি কখনো ক্ষুধার জ্বালায় পেট মাটিতে চেপে শুয়ে থাকতাম, কখনো মাটি থেকে একটি পাথর তুলে পেটে বেঁধে রাখতাম। একদিন আবারও আমি এমন অবস্থায় ছিলাম। সেদিন রাসূলুল্লাহ যে পথ দিয়ে মসজিদে যেতেন, আমি সেই পথের ধারে বসে ছিলাম। তখন জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত, দুই জাহানের শোভা নূর ছড়াতে ছড়াতে আমার কাছে এলেন। তিনি আমার অবস্থা বুঝতে পেরে মুচকি হাসলেন এবং ডাকলেন, ‘হে আবু হুরায়রা!’ আমি বললাম, ‘আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!’ তখন তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে এসো।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পিছু পিছু চললাম। তিনি তাঁর বরকতময় ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরে এক পেয়ালা দুধ ছিল। তিনি বললেন, ‘যাও, সুফফাবাসীদের কাছে যাও। তাদের আমার কাছে ডেকে আনো।’ তাঁদের ডাকতে যাওয়ার সময় আমি মনে মনে ভাবছিলাম, ‘এক পেয়ালা দুধ সুফফাবাসীদের সবার জন্য কী করে যথেষ্ট হবে? আমার ভাগে এক ঢোকও পড়বে কি?…’ আমি তাঁদের ডাকলাম, আমরা বরকতময় ঘরে এলাম, অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। যথাস্থানে বসার পর রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘হে আবু হুরায়রা! এই দুধের পেয়ালা নাও এবং তাদের দাও!’ আমি পেয়ালাটি নিয়ে পর্যায়ক্রমে সঙ্গীদের দিতে লাগলাম। প্রত্যেকে পেয়ালা নিচ্ছিলেন, তৃপ্ত হয়ে পান করছিলেন এবং আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় আমি দেখছিলাম, পেয়ালা একটুও কমেনি, আগের মতোই দুধে ভরা। এভাবে আগত সকল সঙ্গীকে আমি পরিবেশন করলাম। তাঁরা সবাই পান করে তৃপ্ত হলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পেয়ালাটি নিলেন এবং আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হে আবু হুরায়রা! দুধ পান করতে বাকি আছি কেবল আমি আর তুমি। এসো, তুমিও বসো, পান করো!’ আমি বসে পান করলাম। তিনি বললেন, ‘আবার পান করো!’ আমি পান করলাম। মহানবী কয়েকবার বললেন, ‘পান করো!’ আমিও প্রতিবার পান করলাম। শেষে আমি বললাম, ‘আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আর পান করতে পারব না। যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আমি পুরোপুরি তৃপ্ত হয়ে গেছি।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে পেয়ালাটি আমাকে দাও।’ আমি দিলাম। তিনি আল্লাহ তাআলার হামদ ও প্রশংসা করলেন, তারপর বিসমিল্লাহ বলে দুধ পান করলেন।”
মসজিদে রাসূলুল্লাহর একটি সোহবতও না ছেড়ে ইলম অর্জনকারী এই বিশিষ্ট সাহাবীদের প্রতি মদিনার সাহাবীরা নজিরবিহীন ভালোবাসা পোষণ করতেন। এক সন্ধ্যায় সুফফার এক সাহাবী ক্ষুধায় একেবারে শক্তিহীন হয়ে রাসূলুল্লাহর দরবারে এসে নিজের অবস্থার কথা জানালেন। মহানবী নিজের বরকতময় ঘরে জিজ্ঞেস করে পাঠালেন, খাওয়ার মতো কিছু আছে কি না। “এখন ঘরে পানি ছাড়া খাওয়ার মতো আর কিছুই নেই” – এই উত্তর পেয়ে তিনি সেখানে উপস্থিত সাহাবীদের বললেন, “কে এই ক্ষুধার্তকে মেহমান হিসেবে নেবে?” মদিনার সাহাবায়ে কেরামের একজন সবার আগে এগিয়ে এসে বললেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাঁকে মেহমানদারি করব।” তিনি মেহমানকে নিয়ে বাড়ি গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, “রাসূলুল্লাহর মেহমানকে আপ্যায়ন করার মতো কিছু প্রস্তুত করো।” স্ত্রী উত্তর দিলেন, “এখন আমাদের ঘরে বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই।” সাহাবী বললেন, “আগে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াও। তারপর সেই খাবারটুকু নিয়ে এসো।” এরপর তিনি কেবল একজনের মতো খাবারটুকু নিয়ে মেহমানের কামরায় প্রবেশ করলেন। দস্তরখান বিছিয়ে মেহমানকে খেতে আমন্ত্রণ জানালেন। একসঙ্গে খাওয়া শুরু করার পর তিনি উঠে বাতি ঠিক করার ভান করে সেটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর অন্ধকারে আবার দস্তরখানের পাশে বসলেন। খাওয়ার ভান করে তিনি মেহমানের তৃপ্ত হওয়ার অপেক্ষা করলেন। মেহমান তৃপ্ত হলে দস্তরখান তুলে নিলেন। সে রাতে তাঁরা সন্তানদের নিয়ে অভুক্ত অবস্থায় রাত কাটালেন। সকালে মহানবীর দরবারে গেলে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “তোমাদের গত রাতের কাজে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়েছেন।” এরপর আল্লাহ তাআলা সূরা হাশরের ৯ম পবিত্র আয়াত নাজিল করে মর্মার্থে ইরশাদ করলেন, “তারা (আনসাররা) নিজেরা অভাব ও প্রয়োজনে থাকলেও (মুহাজিরদের) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।”
চরণ:
যা-ই হোক না কেন, বন্ধুর কথা বলাই সবচেয়ে মধুর!
হৃদয়সমূহের সুলতানের সোহবত
ফখরে কায়েনাত মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে গড়ে তোলা ও পূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য মসজিদে নববিতে অতুলনীয় সোহবত করতেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে যে ফয়েজ ও বরকত দান করেছিলেন, তা তাঁদের হৃদয়ে প্রবাহিত করতেন। মহানবীর সোহবতে অংশগ্রহণের মর্যাদা যাঁরা লাভ করতেন, তাঁরা প্রথম সোহবতেই নিজেদের হৃদয়ে বিরাট পরিবর্তন অনুভব করতেন এবং অতি উচ্চ ঐশী মারিফাতে পৌঁছে যেতেন। এই সোহবতগুলোর বরকতে সাহাবায়ে কেরাম সবার আগে আমাদের প্রিয় নবীকে, তারপর সকল সাহাবী ভাইকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে শুরু করতেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র আয়াতসমূহে তাঁদের প্রশংসা করেছেন। রাসূলুল্লাহর দরবারে তাঁরা এমন আদব ও মনোযোগের সঙ্গে বসতেন, যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে আছে, একটু নড়লেই উড়ে যাবে। এভাবে সাহাবায়ে কেরাম নবীগণ ও মহান ফেরেশতাদের পর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেন। রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের আমাদের দ্বীনের আদেশ ও নিষেধগুলো সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করে শেখাতেন: ঈমান ও ইসলামের শর্তসমূহ; নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত সংক্রান্ত সকল বিধান; পবিত্র আয়াতসমূহের তাফসির; হারাম ও হালাল খাদ্য ও পোশাক; কসম, মানত11 ও কাফফারা; কেনাবেচার জ্ঞান; পানাহার, পোশাক পরিধান, দেখাসাক্ষাৎ ও কথাবার্তা এবং সালাম বিনিময়ের আদব; প্রতিবেশী, আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক; বিবাহ, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার ও মিরাসের বিধান; মামলা-মোকদ্দমা, শাস্তি, চুক্তি ও অংশীদারি; স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জ্ঞান; শত্রুর সঙ্গে লড়াই, যুদ্ধের বিধান… মোটকথা, দ্বীন ইসলাম সংক্রান্ত আখিরাত ও দুনিয়ার সকল জ্ঞান আদ্যোপান্ত সবার বোধগম্য করে বুঝিয়ে দিতেন, আর যে বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন, তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন।12 নারীদের সংক্রান্ত জ্ঞান তিনি নিজের মুবারক স্ত্রীদের মাধ্যমে শেখাতেন।
জিবরাইলের হাদীস শরীফ
মুসলমানদের বীর ইমাম, সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, সর্বদা সত্যভাষী হিসেবে প্রসিদ্ধ আমাদের প্রিয় মুরব্বি উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
– সেদিনটি ছিল এমন এক দিন: সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে আমরা কয়েকজন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরবারে ও খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। সেই দিন, সেই মুহূর্ত ছিল এমনই মর্যাদাপূর্ণ, এমনই মূল্যবান, যা আর কখনো হাতে আসে না। সেদিন আমাদের ভাগ্যে জুটেছিল রাসূলুল্লাহর সোহবতে, তাঁর সান্নিধ্যে থাকার মর্যাদা এবং আত্মার খোরাক, প্রাণে স্বাদ ও প্রশান্তি দানকারী তাঁর সুন্দর চেহারা মুবারক দেখার সৌভাগ্য। (এই দিনের মর্যাদা ও মূল্য বোঝানোর জন্য তিনি বলেছেন, “সেদিনটি ছিল এমন এক দিন…”। জিবরাইল আলাইহিস সালামকে মানুষের আকৃতিতে দেখা, তাঁর কণ্ঠ শোনা এবং বান্দাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অতি সুন্দর ও স্পষ্টভাবে রাসূলুল্লাহর মুবারক মুখ থেকে শোনার সৌভাগ্য যেদিন হয়েছিল, সেদিনের মতো মর্যাদাপূর্ণ ও মূল্যবান সময় আর হতে পারে কি?)
“হে সুফফাবাসী! তোমাদের জন্য সুসংবাদ! আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ থেকে যায়, যে তোমাদের মতো এই কঠিন অবস্থাতেও সন্তুষ্ট, তাহলে সে নিশ্চয়ই আমার বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত” হাদীস শরীফ
তখন চাঁদের উদয়ের মতো এক ব্যক্তি আমাদের কাছে এলেন। তাঁর পোশাক ছিল ধবধবে সাদা, চুল ছিল কুচকুচে কালো। তাঁর গায়ে ধুলোবালি, ঘাম – এমন কোনো সফরের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না। রাসূলুল্লাহর সাহাবী আমাদের কেউই তাঁকে চিনতাম না। অর্থাৎ তিনি আমাদের দেখা-চেনা মানুষদের কেউ ছিলেন না। তিনি রাসূলুল্লাহর সামনে বসলেন। নিজের হাঁটু তাঁর মুবারক হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। (আগন্তুক ছিলেন জিবরাইল। তিনি মানুষের আকৃতি ধারণ করেছিলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালামের এভাবে বসা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানানোর জন্য। অর্থাৎ এটি দেখিয়ে দেয় যে, দ্বীনের জ্ঞান শেখার জন্য লজ্জা করা ঠিক নয় এবং উস্তাদের অহংকার ও দাম্ভিকতা শোভা পায় না। প্রত্যেকের উচিত দ্বীনের যা কিছু জানতে চায়, তা শিক্ষকদের কাছে নিঃসংকোচে ও দ্বিধাহীনভাবে জিজ্ঞেস করা – জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর এই অবস্থার মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামকে তা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। কারণ দ্বীন শেখায় লজ্জা করা এবং আল্লাহ তাআলার হক আদায়ে, শেখানো ও শেখায় সংকোচ করা ঠিক নয়।)
সেই সম্মানিত ব্যক্তি রাসূলে আকরামের মুবারক হাঁটুর ওপর নিজের হাত রাখলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে, মুসলমান হওয়া সম্পর্কে বলুন।”
রাসূলে আকরাম ইরশাদ করলেন, “ইসলামের শর্তগুলোর প্রথমটি হলো কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করা। (কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করার অর্থ হলো ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’ বলা। অর্থাৎ বুদ্ধিসম্পন্ন, বালিগ এবং কথা বলতে সক্ষম ব্যক্তির এ কথা বলা: ’জমিনে ও আসমানে তিনি ছাড়া ইবাদত ও উপাসনার যোগ্য কোনো বস্তু নেই, কোনো সত্তাও নেই।
প্রকৃত মাবুদ কেবল আল্লাহ তাআলা। তিনি ওয়াজিবুল উজুদ (যাঁর অস্তিত্ব অপরিহার্য)। সকল শ্রেষ্ঠত্ব তাঁরই। তাঁর মধ্যে কোনো ত্রুটি নেই। তাঁর নাম আল্লাহ’ – এবং অন্তর দিয়ে দৃঢ়ভাবে এতে বিশ্বাস করা। আরও বলা: ‘গোলাপ রঙের, লালিমা-মেশানো শুভ্র, উজ্জ্বল, মায়াবী চেহারার অধিকারী, কালো ভ্রু ও কালো চোখের, প্রশস্ত মুবারক ললাটের, উত্তম চরিত্রের, যাঁর ছায়া মাটিতে পড়ত না, মধুরভাষী, আরব দেশে মক্কায় জন্মগ্রহণ করার কারণে যাঁকে আরব বলা হয়, হাশিম বংশের আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ নামের সেই মহান সত্তা আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল, অর্থাৎ নবী।’)
তারপর – ওয়াক্ত হলে নামাজ আদায় করা। সম্পদের যাকাত দেওয়া। রমজান শরীফে প্রতিদিন রোজা রাখা। যার সামর্থ্য আছে, তার জীবনে একবার হজ করা।”
সেই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে এই উত্তরগুলো শুনে বললেন, “আপনি সত্য বলেছেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” আমরা শ্রোতারা তাঁর এ কথায় অবাক হয়ে বললাম, “নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার নিজেই সত্যায়ন করছেন!”
এই ব্যক্তি আবার বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঈমান কী, তাও আমাকে জানিয়ে দিন।” (এই হাদীস শরীফে ঈমানের আভিধানিক অর্থ ভাবা উচিত নয়। কারণ আভিধানিক অর্থ হলো সত্যায়ন ও বিশ্বাস করা; আরবের অজ্ঞদের মধ্যেও এ অর্থ জানে না এমন কেউ ছিল না। তাহলে সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাইন) তা জানবেন না – এ কী করে হয়? জিবরাইল আলাইহিস সালাম সাহাবায়ে কেরামকে ঈমানের অর্থ শিক্ষা দিতে চাইছিলেন। এখানে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ইসলামে কিসের নাম ঈমান।) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়ে দিলেন যে, ঈমান হলো নির্দিষ্ট ছয়টি বিষয়ে বিশ্বাস করা: “সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, আখিরাত দিবসের প্রতি, তাকদিরের প্রতি এবং ভালো ও মন্দ যে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে – এর প্রতি বিশ্বাস করা।” সেই ব্যক্তি আবারও “আপনি সত্য বলেছেন” বলে সত্যায়ন করলেন।
তারপর তিনি আবার বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহসান কী, তাও আমাকে জানিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “তা হলো আল্লাহ তাআলার ইবাদত এমনভাবে করা, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। কারণ তুমি তাঁকে না দেখলেও তিনি তোমাকে অবশ্যই দেখেন।” সেই ব্যক্তি আবার বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জানিয়ে দিন!” রাসূল আলাইহিস সালাম ইরশাদ করলেন, “এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।” সেই ব্যক্তি আবার বললেন, “তাহলে এর আলামতগুলো জানিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “যখন দেখবে, দাসীরা তাদের মনিবদের জন্ম দিচ্ছে, আর খালি পা, বস্ত্রহীন, দরিদ্র রাখালরা (ধনী হয়ে) উঁচু উঁচু অট্টালিকা নির্মাণে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।” এরপর তিনি ফিরে চলে গেলেন। রাসূলুল্লাহ আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উমর! প্রশ্নকারী কে ছিলেন, জানো কি?” আমি বললাম, “আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “তিনি ছিলেন জিবরিল (জিবরাইল)। তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।”13 মহানবী সাহাবীদের দ্বীনি মর্যাদা অনুযায়ী তাঁদের বোধগম্য করে বুঝিয়ে দিতেন।
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারীদের অন্যতম হযরত উমর একদিন মসজিদে যাওয়ার সময় দেখলেন, রাসূলুল্লাহ আবু বকর সিদ্দিককে কিছু একটা বলছেন। তিনি তাঁদের কাছে গিয়ে শুনলেন। অন্যরাও এটি দেখলেন, কিন্তু কাছে গিয়ে শুনতে সংকোচ বোধ করলেন। পরদিন হযরত উমরকে দেখে তাঁরা বললেন, “হে উমর! রাসূলুল্লাহ গতকাল আপনাদের কিছু বলছিলেন। আমাদেরও বলুন, যাতে আমরাও জানতে পারি।” কারণ রাসূলুল্লাহ সবসময় ইরশাদ করতেন, “আমার কাছ থেকে যা শোনো, তা তোমাদের দ্বীনি ভাইদেরও বলো! একে অপরকে শুনিয়ে দাও!” হযরত উমর বললেন, “গতকাল হযরত আবু বকর পবিত্র কুরআনের এমন একটি পবিত্র আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করেছিলেন, যা তিনি বুঝতে পারেননি; রাসূলুল্লাহ তাঁকে তা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি এক ঘণ্টা শুনলাম, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না।” কারণ তিনি হযরত আবু বকরের উচ্চ মর্যাদা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করছিলেন। হযরত উমর এত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, “আমি নবীগণের সর্বশেষ। আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না। আমার পরে যদি কোনো নবী আসতেন, তাহলে উমরই নবী হতেন।” এত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়েও এবং মাতৃভাষা আরবি খুব ভালো জানা সত্ত্বেও তিনি হযরত আবু বকরকে বুঝিয়ে দেওয়া পবিত্র কুরআনের তাফসির বুঝতে পারলেন না। আবু বকরের মর্যাদা তাঁর চেয়ে অনেক বেশি উঁচু ছিল। হযরত আবু বকর, এমনকি জিবরাইল আলাইহিস সালামও পবিত্র কুরআনের অর্থ ও রহস্য রাসূলুল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করতেন। রাসূলুল্লাহ সমগ্র পবিত্র কুরআনের তাফসির তাঁর সাহাবীদের জানিয়ে দিয়েছেন।
আমাদের প্রিয় নবী সাহাবীদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি মামলা-মোকদ্দমাও দেখতেন, সাক্ষীদের কথা শুনে সবচেয়ে কঠিন বিরোধেরও মীমাংসা করে দিতেন। ইসলামের পরিচয় তুলে ধরা ও প্রচার করার জন্য, আরও একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি বিরাট পরিশ্রম করতেন, নিজের আচার-আচরণে মানুষের জন্য আদর্শ হতেন এবং মুমিনদের মুশরিকদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতেন।
“হে উমর! প্রশ্নকারী কে ছিলেন, জানো কি? তিনি ছিলেন জিবরিল (জিবরাইল)। তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন” হাদীস শরীফ
হে সেই সৌন্দর্য, যা আউলিয়ার চোখের জ্যোতি,
সাহায্য করো, হে আল্লাহর নূরের খনি!
তোমার পায়ের ধুলো আসফিয়ার চোখের সুরমা,
সাহায্য করো, হে আল্লাহর নূরের খনি!
তোমাকে ছাড়া কেউ হকের কাছে পৌঁছাতে পারে না,
তোমার অনুগ্রহের ফয়েজেই মানুষ কবুল হয়,
তুমিই “জগৎসমূহের রহমত”, হে রাসূল,
সাহায্য করো, হে আল্লাহর নূরের খনি!
আমি সীমাহীন ভুল করেছি, পাপ করেছি,
প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গী হয়েছি,
আমার গুনাহ মাফের জন্য শাফায়াত করো, হে মহানুভব,
সাহায্য করো, হে আল্লাহর নূরের খনি!
হে দানশীলতার খনি, মহান আল্লাহর রাসূল,
ভুলে ভরা এই সেলিমি তোমার সবচেয়ে নগণ্য গোলাম,
তোমার দরবারে আশ্রয় চায়, তোমার দান প্রার্থনা করে,
সাহায্য করো, হে আল্লাহর নূরের খনি!
Yavuz Sultan Selim (Selîmî)
