হিজরত
আওস ও খাজরাজ গোত্রের হঠাৎ মুসলমান হয়ে যাওয়া এবং মক্কার মুসলমান ও মদিনার মুসলমানদের একত্র হওয়ার সম্ভাবনা মুশরিকদের ভীষণভাবে আতঙ্কিত ও উন্মত্ত করে তুলল। আকাবার দ্বিতীয় বাইআতের খবর শুনে মক্কার মুশরিকদের আচরণ অত্যন্ত কঠোর ও ভয়ংকর রূপ নিল। মুসলমানদের জন্য মক্কায় থাকা অসহনীয় হয়ে উঠল। আকাবার শেষ বাইআতের ফলে মদিনা মুসলমানদের জন্য শান্তি ও আশ্রয়ের স্থানে পরিণত হলো। তাঁরা কোনো একটা উপায় বের করে এই শহর থেকে হিজরত করতে চাইছিলেন; এমন ভূমিতে যেতে চাইছিলেন, যেখানে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে পারবেন, অন্তত কিছুটা স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবেন। তাঁরা মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে নিজেদের অবস্থার কথা নিবেদন করে হিজরতের অনুমতি চাইলেন। তিনি সাহাবীদের ধৈর্য ধরার উপদেশ দিলেন। কারণ তখনও মক্কা ত্যাগের অনুমতি আসেনি। অবশেষে হিজরতের জন্য প্রতীক্ষিত ঐশী অনুমতি এল। সেদিন আমাদের প্রিয় নবী আনন্দিত অবস্থায় সাহাবায়ে কেরামের কাছে এসে ইরশাদ করলেন, “তোমরা যেখানে হিজরত করবে, সেই স্থান আমাকে জানানো হয়েছে। তা হলো ইয়াসরিব (মদিনা)। সেখানে হিজরত করো। সেখানে তোমাদের মুসলমান ভাইদের সঙ্গে মিলিত হও। আল্লাহ তাআলা তাদের তোমাদের ভাই বানিয়ে দিয়েছেন। ইয়াসরিবকে (মদিনাকে) তোমাদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির আবাসভূমি বানিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহর অনুমতি ও উপদেশ অনুযায়ী মুসলমানরা একের পর এক দলে দলে মদিনায় হিজরত করতে লাগলেন।1 মহানবী হিজরতকারীদের অত্যন্ত সতর্ক ও সাবধানে চলার কড়া নির্দেশ দিচ্ছিলেন। মুশরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ না করার জন্য মুসলমানরা ছোট ছোট কাফেলায় পথে নামছিলেন এবং যথাসম্ভব গোপনে চলাফেরা করছিলেন। মদিনায় প্রথম হিজরতকারী আবু সালামা মুশরিকদের হাতে অনেক নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। বেশ কিছুকাল পরে মুশরিকরা ব্যাপারটি টের পেল। তখন তারা হিজরতের জন্য পথে নামা মুসলমানদের মধ্যে যাদের দেখতে পেত, তাদের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে, স্ত্রীদের স্বামীদের কাছ থেকে আলাদা করতে, যাদের ওপর ক্ষমতা চলত তাদের কারাগারে আটকাতে এবং নানা রকম নির্যাতনের শিকার বানাতে লাগল। তাঁদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য সব রকম অত্যাচার চালাল। কিন্তু গৃহযুদ্ধ বেধে যাওয়ার ভয়ে হত্যা করার সাহস পেল না। মুসলমানরা এসব সত্ত্বেও প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়ে মদিনার পথে বেরিয়ে পড়ছিলেন। একদিন হযরত উমরও কোমরে তলোয়ার বাঁধলেন। তির ও বর্শা সঙ্গে নিয়ে সবার চোখের সামনে কাবা সাতবার তাওয়াফ করলেন। সেখানে উপস্থিত মুশরিকদের উদ্দেশে উচ্চস্বরে বললেন, “এই যে, আমিও আমার দ্বীন রক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলার পথে হিজরত করছি। যে চায় তার স্ত্রী বিধবা হোক, সন্তানরা ইয়াতিম হোক, মা কাঁদুক, সে ওই উপত্যকার ওপারে আমার সামনে আসুক!…” এভাবে হযরত উমর এবং প্রায় বিশজন মুসলমান দিনদুপুরে নির্ভয়ে মদিনার দিকে রওনা হলেন। তাঁর ভয়ে কেউ এই কাফেলার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস পেল না। এরপর হিজরতের ধারা আর থামেনি; সাহাবায়ে কেরাম দলে দলে মদিনায় পৌঁছাতে লাগলেন।
“তোমরা যেখানে হিজরত করবে, সেই স্থান আমাকে জানানো হয়েছে। তা হলো ইয়াসরিব (মদিনা)। সেখানে হিজরত করো” এবং “সেখানে তোমাদের মুসলমান ভাইদের সঙ্গে মিলিত হও। আল্লাহ তাআলা তাদের তোমাদের ভাই বানিয়ে দিয়েছেন। ইয়াসরিবকে (মদিনাকে) তোমাদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির আবাসভূমি বানিয়েছেন” হাদীস শরীফ
হিজরতের পথ
এর মধ্যে হযরত আবু বকরও হিজরতের অনুমতি চাইলেন। রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করলেন, “ধৈর্য ধরো। আমার আশা, আল্লাহ তাআলা আমাকেও অনুমতি দেবেন। আমরা একসঙ্গে হিজরত করব।” হযরত আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোন! এমন সম্ভাবনা কি আছে?” আমাদের নবী “হ্যাঁ, আছে” বলে তাঁকে আনন্দিত করলেন। হযরত আবু বকর আটশো দিরহাম দিয়ে দুটি উট কিনলেন এবং সেই দিনের অপেক্ষা করতে লাগলেন। মক্কায় তখন কেবল আমাদের প্রিয় নবী, হযরত আবু বকর, হযরত আলি, দরিদ্র, অসুস্থ ও বৃদ্ধরা এবং মুশরিকদের হাতে কারারুদ্ধ মুমিনরা অবশিষ্ট ছিলেন।
অন্যদিকে মদিনাবাসীরা (আনসার) হিজরতকারী মক্কাবাসীদের (মুহাজিরদের) অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বরণ করে নিলেন এবং মেহমান হিসেবে আপ্যায়ন করলেন। তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠল এক মজবুত ঐক্য।
রাসূলুল্লাহও হিজরত করে মুসলমানদের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন – এই সম্ভাবনায় মক্কার মুশরিকরা অস্থির হয়ে পড়ল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য তারা যেখানে একত্র হতো, সেই দারুন নাদওয়ায় তারা জমায়েত হলো এবং কী করবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু করল। শয়তান শাইখে নজদি বেশে, অর্থাৎ নজদের এক বৃদ্ধের রূপ ধরে মুশরিকদের কাছে এল। সে তাদের আলোচনা শুনল। নানা প্রস্তাব উঠল। কিন্তু কোনোটিই তাদের মনঃপূত হলো না। তখন শয়তান আলোচনায় ঢুকে নিজের মত প্রকাশ করে বলল, “তোমরা যা ভাবছ, তার কোনোটিই কাজে আসবে না। কারণ তাঁর হাসিমুখ আর মধুর কথা সব কৌশল ভেস্তে দেবে। অন্য উপায় ভাবো।”
কুরাইশদের নেতা আবু জাহল বলল, “প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী লোক বেছে নিই। তারা হাতে তলোয়ার নিয়ে মুহাম্মদের ওপর হামলা করুক। তলোয়ারের আঘাতে তার রক্ত ঝরাক। কে হত্যা করেছে, তা যেন বোঝা না যায়। তাহলে তারা বাধ্য হয়ে দিয়াতে (রক্তপণে) রাজি হবে। আমরাও তার দিয়াত দিয়ে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাব।” শয়তানেরও এই পরামর্শ পছন্দ হলো; সে খুব উৎসাহের সঙ্গে তা সমর্থন করল এবং এর পক্ষে জোর দিল।2
মুশরিকরা যখন এই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে রাসূলে আকরামকে মুশরিকদের সিদ্ধান্তের খবর দিলেন। সেই সঙ্গে সে রাতে তাঁকে নিজের বিছানায় না শোয়ার কথা বললেন এবং আল্লাহ তাআলার হিজরতের আদেশও পৌঁছে দিলেন। এই ঐশী আদেশ অনুযায়ী আমাদের প্রিয় নবী হযরত আলিকে নিজের বিছানায় শুতে এবং তাঁর কাছে গচ্ছিত আমানতগুলো মালিকদের ফিরিয়ে দিতে বললেন। তিনি ইরশাদ করলেন, “আজ রাতে আমার বিছানায় শুয়ে ঘুমাও, আর আমার এই চাদরটি গায়ে জড়িয়ে নাও! ভয় পেয়ো না, তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।”
হযরত আলি মহানবীর আদেশমতো শুয়ে পড়লেন। তখন তাঁর বয়স তেইশ বছর। হাবিবুল্লাহর জায়গায় তিনি নির্ভয়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন।
হিজরতের রাতে কাফিররা রাসূলুল্লাহর বরকতময় ঘর ঘিরে ফেলেছিল। সে রাতে সূরা ইয়াসিনের প্রথম আয়াতগুলো নাজিল হলো। মহানবী নিজের বরকতময় ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাদের উদ্দেশে সূরা ইয়াসিনের ৯ম পবিত্র আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, যার মর্মার্থ: “আমি তাদের সামনে একটি প্রাচীর ও পেছনে একটি প্রাচীর দাঁড় করিয়েছি এবং তাদের ঢেকে দিয়েছি, ফলে তারা আর দেখতে পায় না।” তারপর মাটি থেকে এক মুঠো ধুলো নিয়ে কাফিরদের মাথায় ছিটিয়ে দিলেন। (বর্ণিত আছে, এই ধুলো যাদের মাথায় পড়েছিল, তারা সবাই বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।) রাসূলুল্লাহ সুস্থ ও নিরাপদে তাদের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে হযরত আবু বকরের ঘরে পৌঁছালেন। মুশরিকদের কেউই তাঁকে দেখতে পেল না।
“হে আবু বকর! ধৈর্য ধরো। আমার আশা, আল্লাহ তাআলা আমাকেও অনুমতি দেবেন। আমরা একসঙ্গে হিজরত করব” হাদীস শরীফ
কিছুক্ষণ পর এক লোক মুশরিকদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কিসের অপেক্ষা করছ?” তারা উত্তর দিল, “মুহাম্মদের ঘর থেকে বের হওয়ার।” লোকটি বলল, “কসম করে বলছি, মুহাম্মদ তো তোমাদের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে চলে গেছে, তোমাদের মাথায় ধুলোও ছিটিয়ে দিয়ে গেছে।” মুশরিকরা মাথায় হাত দিল। সত্যিই তারা মাথায় ধুলো পেল। মুখ ও মাথা থেকে ধুলো মুছে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে তারা দরজায় হামলা চালিয়ে ভেতরে ঢুকল। রাসূল আলাইহিস সালামের বিছানায় হযরত আলিকে দেখে তারা জিজ্ঞেস করল, রাসূলে আকরাম কোথায়।
হযরত আলি বললেন, “জানি না! তোমরা কি আমাকে তাঁর পাহারায় নিযুক্ত করেছিলে?” এ কথা শুনে তারা হযরত আলিকে ধাক্কাধাক্কি করে মারধর করল। কাফিররা রাসূলুল্লাহকে খুঁজে বের করার জন্য বাইরে বেরিয়ে তল্লাশি শুরু করল। হযরত আলিকে কিছুক্ষণ কাবার কাছে আটকে রেখে তারপর ছেড়ে দিল।3
এরপর তারা হযরত আবু বকরের ঘরে গিয়ে তাঁর কন্যা আসমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল। তিনি উত্তর না দেওয়ায় তাঁকে মারধর করল। সব জায়গায় খুঁজেও না পেয়ে তারা উন্মাদ হয়ে উঠল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র আবু জাহল মক্কা ও তার আশপাশে ঘোষক দিয়ে ঘোষণা করাল যে, আমাদের প্রিয় নবী ও হযরত আবু বকরকে যে খুঁজে এনে দেবে কিংবা তাঁদের ঠিকানা জানাবে, তাকে সে ১০০টি উট দেবে। এই প্রতিশ্রুতির কথা শুনে ধনসম্পদের লোভে কিছু লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।
রাসূলুল্লাহ হযরত আবু বকরের ঘরে তাশরিফ এনে ইরশাদ করলেন, “আমাকে হিজরতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” তখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক আবেগে উদ্বেলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বরকতময় পায়ের ধুলোয় আমার মুখ ঘষি, ইয়া রাসূলাল্লাহ!… আমিও কি আপনার সঙ্গে যাব?” মহানবী উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ…” হযরত সিদ্দিক আনন্দে কেঁদে ফেললেন। অশ্রুভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উট প্রস্তুত। যেটি ইচ্ছা, সেটি গ্রহণ করুন।” জগৎসমূহের সুলতান ইরশাদ করলেন, “যে উট আমার নয়, তাতে আমি সওয়ার হই না। (তবে) দাম দিয়ে কিনে নেব।” এই দৃঢ় আদেশের সামনে নিরুপায় হয়ে হযরত সিদ্দিক উটের দাম বললেন। হযরত আবু বকর পথপ্রদর্শক হিসেবে সুপরিচিত আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামের লোকটিকে ডেকে পথ দেখানোর জন্য পারিশ্রমিক দিয়ে ভাড়া করলেন এবং তিন দিন পর উট দুটি সাওর পাহাড়ের গুহায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন।
নবুয়তপ্রাপ্তির ত্রয়োদশ বছরের সফর মাসের ২৭ তারিখ বৃহস্পতিবার মহানবী ও আবু বকর সিদ্দিক সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে পথে বের হলেন।
হযরত আবু বকর রাসূলুল্লাহর চারপাশে কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে, কখনো সামনে, কখনো পেছনে সরে সরে চলছিলেন। আমাদের নবী জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন এমন করছেন। তিনি বললেন, “চারদিক থেকে আসতে পারে এমন বিপদ ঠেকানোর জন্য। কোনো ক্ষতি এলে যেন আগে আমার ওপরই আসে। আমার প্রাণ আপনার মহান সত্তার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ!”
সরওয়ারে আলম মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে আবু বকর! আমার ওপর যে বিপদ আসবে, তা আমার বদলে তোমার ওপর আসুক – এটা কি তুমি চাও?” হযরত সিদ্দিক বললেন, “হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, যে বিপদ আসবে, তা আপনার বদলে আমার ওপর আসুক – এটাই আমি চাই।”4
আমাদের প্রিয় নবীর জুতা আঁটসাঁট হওয়ায় পথে তা ছিঁড়ে গেল, তাঁর মুবারক পা দুটি জখম হলো; হাঁটার শক্তিও আর রইল না। অনেক কষ্টে তাঁরা পাহাড়ে উঠে গুহায় পৌঁছালেন। গুহার মুখে এসে হযরত আবু বকর বললেন, “আল্লাহর ওয়াস্তে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি ভেতরে ঢুকবেন না! আমি ঢুকি। সেখানে ক্ষতিকর কিছু থাকলে তা আমার ওপর আসুক, আপনার বরকতময় সত্তাকে যেন কোনো দুঃখ, কোনো ব্যথা স্পর্শ না করে।” এ কথা বলে তিনি ভেতরে ঢুকলেন। তিনি ভেতরটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করলেন। গুহার ডানে-বাঁয়ে ছোট-বড় অনেক গর্ত ছিল। তিনি নিজের চাদর ছিঁড়ে গর্তগুলো বন্ধ করলেন, কিন্তু একটি গর্ত খোলা রয়ে গেল। সেটিও পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেপে বন্ধ করে তিনি রাসূলুল্লাহকে ভেতরে আসার আহ্বান জানালেন। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং আবু বকরের কোলে মাথা মুবারক রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঠিক তখনই হযরত সিদ্দিকের পায়ে সাপ দংশন করল। রাসূলুল্লাহর ঘুম যেন না ভাঙে, সেজন্য তিনি সহ্য করে রইলেন, একটুও নড়লেন না। কিন্তু তাঁর চোখের পানি রাসূলুল্লাহর চেহারা মুবারকে গড়িয়ে পড়লে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে, হে আবু বকর?” হযরত আবু বকর বললেন, “পা দিয়ে যে গর্তটি বন্ধ করেছিলাম, সেখান থেকে একটি সাপ আমার পায়ে দংশন করেছে।” আরোগ্যের জন্য রাসূলুল্লাহ আবু বকরের ক্ষতস্থানে নিজের বরকতময় মুখের লালা লাগিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যথা থেমে গেল এবং তিনি আরোগ্য লাভ করলেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবু বকর সিদ্দিক যখন ভেতরে, তখন মুশরিকরা পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে গুহার মুখে এসে পৌঁছাল। তারা দেখল, গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনেছে আর দুটি কবুতর বাসা বেঁধেছে। পদচিহ্ন অনুসরণকারী কুরজ ইবনে আলকামা বলল, “এই তো, এখানে এসে পদচিহ্ন শেষ হয়ে গেছে।” কাফিররা বলল, “তারা যদি এখানে ঢুকত, তাহলে গুহার মুখের মাকড়সার জাল ছিঁড়ে যেত।”
কেউ কেউ বলল, “এত দূর যখন এসেছি, তোমাদের কেউ গুহায় ঢুকে দেখুক!…” তখন কাফির উমাইয়া ইবনে খালাফ বলল, “তোমাদের কি একটুও বুদ্ধি নেই? যার ওপর স্তরে স্তরে মাকড়সার জাল বোনা, সেই গুহায় তোমাদের কী কাজ? কসম করে বলছি, এই মাকড়সা মুহাম্মদের জন্মেরও আগে এই জাল বুনেছে।”
মুশরিকরা যখন গুহার মুখে তর্কাতর্কি করছিল, তখন ভেতরে হযরত আবু বকর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমি নিজের জন্য চিন্তা করছি না। কিন্তু আপনার মহান সত্তার কিছু হয়ে যায় কি না, সেই ভয় পাচ্ছি। আমাকে হত্যা করলে কী আর হবে, আমি তো একজন মানুষ মাত্র। কিন্তু আপনার কোনো ক্ষতি হলে গোটা উম্মত ধ্বংস হয়ে যাবে, দ্বীন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।” বিশ্বজগতের সুলতান মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে আবু বকর! দুঃখ কোরো না!… নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা আমাদের সঙ্গে আছেন।”
আবু বকর সিদ্দিক বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক! তাদের কেউ যদি মাথা নিচু করে তাকায়, তাহলেই আমাদের দেখে ফেলবে!” তখন মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে আবু বকর! আমরা এমন দুজন, যাঁদের তৃতীয়জন আল্লাহ তাআলা। দুঃখ কোরো না!… নিঃসন্দেহে হক তাআলা আমাদের সঙ্গে আছেন।” মুশরিকরা ভেতরে না তাকিয়েই ফিরে চলে গেল।5
আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার কথা পবিত্র কুরআনে মর্মার্থে এভাবে ইরশাদ করেন: “যদি তোমরা তাঁকে (আমার হাবিবকে) সাহায্য না করো, (তাহলে স্মরণ করো সেই সময়ের কথা,) কাফিররা যখন তাঁকে (মক্কা থেকে) দুজনের দ্বিতীয়জন হিসেবে (হযরত আবু বকরের সঙ্গে) বের করে দিয়েছিল, যখন তাঁরা (সাওর পাহাড়ের চূড়ার) গুহায় ছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য করেছিলেন। তখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে (আবু বকর সিদ্দিককে) বলছিলেন, ‘দুঃখ কোরো না, আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও নুসরত নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গে আছে।’ আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর অন্তরে প্রশান্তি দানকারী তাঁর সাকিনা নাজিল করেছিলেন, তাঁকে (তাঁর হাবিবকে) এমন (আত্মিক) বাহিনী দিয়ে শক্তিশালী করেছিলেন, যা তোমরা দেখোনি (ফেরেশতাদের দিয়ে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন), এবং কাফিরদের কথা একেবারে হেয় করে দিয়েছিলেন। আর আল্লাহ তাআলার (তাওহিদের) বাণীই সমুচ্চ (তিনি আল্লাহ নামকে সমগ্র জগতে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং বিজয়ী করেছেন)। আল্লাহ তাআলা নিরঙ্কুশ বিজয়ী। একমাত্র তিনিই হুকুম ও হিকমতের অধিকারী।”6
“আল্লাহর ওয়াস্তে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি ভেতরে ঢুকবেন না! আমি ঢুকি। সেখানে ক্ষতিকর কিছু থাকলে তা আমার ওপর আসুক, আপনার বরকতময় সত্তাকে যেন কোনো দুঃখ, কোনো ব্যথা স্পর্শ না করে” আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)
আমাদের প্রিয় নবী ও হযরত আবু বকর এই গুহায় তিন দিন তিন রাত অবস্থান করলেন। হযরত আবু বকরের পুত্র আবদুল্লাহ মক্কায় যা শুনতেন, রাতে গুহায় এসে তা জানিয়ে যেতেন। আর তাঁর আজাদকৃত গোলাম ও পশুপালের রাখাল আমির ইবনে ফুহাইরা রাতে দুধ নিয়ে আসতেন এবং পদচিহ্ন মুছে দিতেন।
চতুর্থ দিন সোমবার রাতে সাহরির সময় আমাদের প্রিয় নবী সাওর গুহা থেকে বেরিয়ে কাসওয়া নামের উটনীতে সওয়ার হলেন। এক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি হযরত আবু বকরকে নিজের পেছনে বসালেন। অন্য উটে সওয়ার হলেন হযরত আমির ইবনে ফুহাইরা এবং পথঘাট ভালো চেনা আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত।
আল্লাহ তাআলা যার প্রশংসা করেছেন, জনপদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সেই মক্কা মুকাররমা থেকে, নিজের জন্মভূমি থেকে জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় নিচ্ছিলেন। তিনি উটনীর মুখ হারাম শরীফের দিকে ফিরিয়ে বিষণ্ন হৃদয়ে ইরশাদ করলেন, “আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি করা ভূমিগুলোর মধ্যে তুমিই সবচেয়ে কল্যাণময়, আমার রবের কাছে সবচেয়ে প্রিয়! তোমার থেকে বের করে দেওয়া না হলে আমি বের হতাম না। তোমার চেয়ে সুন্দর, তোমার চেয়ে প্রিয় কোনো জন্মভূমি আমার নেই। আমার কওম যদি আমাকে তোমার থেকে বের করে না দিত, তাহলে আমি বের হতাম না, তোমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও ঘর বাঁধতাম না, বসতি গড়তাম না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নেমে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি জন্মভূমির জন্য ব্যাকুল, তার কথা কি মনে পড়ছে?” মহানবী উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আমি ব্যাকুল!” জিবরাইল আলাইহিস সালাম সূরা কাসাসের ৮৫তম পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করলেন, যাতে শেষ পর্যন্ত তাঁর মক্কায় ফিরে আসার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এভাবে তিনি রাসূলুল্লাহর মুবারক হৃদয়কে সান্ত্বনা দিলেন।
যাত্রা শান্তভাবেই চলছিল। মুশরিকরা সব জায়গায় খুঁজেও তাঁদের পাচ্ছিল না; মহান আল্লাহ নিজের হাবিবকে তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ কুদাইদ নামের স্থানে পৌঁছে উম্মে মাবাদ নামের এক মহিলার তাঁবুর সামনে থামলেন। তিনি ছিলেন দানশীলতার জন্য প্রসিদ্ধ, বুদ্ধিমতী ও সচ্চরিত্রা এক নারী। তাঁরা দাম দিয়ে খাবার, খেজুর ও গোশত কিনতে চাইলেন। উম্মে মাবাদ বললেন, “থাকলে টাকার বিনিময়ে নয়, দাওয়াত করে আপ্যায়ন করতাম। দুর্ভিক্ষ আর অভাব-অনটনের কারণে আমাদের হাতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।” “দুধ আছে কি?” – জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দিলেন, “নেই। পশুগুলো বন্ধ্যা, দুধ দেয় না।” বিশ্বজগতের সুলতান (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দুর্বল ভেড়ির দিকে ইশারা করে বললেন, “হে উম্মে মাবাদ! এই ভেড়িটি এখানে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে কেন?” তিনি বললেন, “এটি খুব অসুস্থ ও দুর্বল হওয়ায় পাল থেকে পিছিয়ে পড়েছে। শক্তি না থাকায় যেতে পারেনি।” আমাদের নবী জিজ্ঞেস করলেন, “এর কি একটুও দুধ আছে? এই ভেড়িটি দোহন করার অনুমতি দেবেন কি?” তিনি বললেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোন, এর দুধ নেই; তবে আপনার দোহন করতে কোনো বাধা নেই।”
রাসূলুল্লাহ ভেড়িটির কাছে এসে আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণ করলেন। বরকতের জন্য দোয়া করার পর তিনি ভেড়িটির ওলানে বরকতময় হাত বুলিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে ওলান দুধে ভরে গেল এবং দুধ ঝরতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে একটি পাত্র এনে তা ভরে নেওয়া হলো। তিনি প্রথমে তা উম্মে মাবাদকে দিলেন। উম্মে মাবাদ পান করার পর হযরত আবু বকর ও অন্যদের দিলেন, তাঁরা তৃপ্ত হয়ে পান করলেন। সবশেষে তিনি নিজে পান করলেন। তারপর আবার ভেড়িটির ওলানে বরকতময় হাত লাগিয়ে দোহন করলেন এবং তাঁবুর সবচেয়ে বড় পাত্রটি চাইলেন। সেটিও ভরে উম্মে মাবাদের হাতে তুলে দিলেন। বর্ণিত আছে, সেই ভেড়ি আরও আঠারো বছর বেঁচে ছিল, আর বিশ্বজগতের গৌরব মহানবীর বরকতে সকাল-সন্ধ্যা তার দুধেই তাঁদের সংসার চলত। তাঁরা সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর উম্মে মাবাদের স্বামী এলেন এবং দুধ দেখতে পেলেন। আনন্দিত হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এই দুধ কোথা থেকে এল?” উম্মে মাবাদ বললেন, “এক বরকতময় ব্যক্তি এসে আমাদের ঘরকে সম্মানিত করেছেন। তুমি যা দেখছ, তা তাঁরই হিম্মত ও বরকত।” স্বামী জিজ্ঞেস করলেন, “তাঁর বর্ণনা দিতে পারবে? তাঁর গুণাবলি ও রূপ-সৌন্দর্য কেমন?”
উম্মে মাবাদ বললেন, “আমি যে বরকতময় সত্তাকে দেখেছি, তিনি অত্যন্ত সুগঠিত দেহের অধিকারী ও হাসিমুখ ছিলেন। তাঁর চোখে কিছুটা লালচে আভা, কণ্ঠে কোমলতা ছিল। তাঁর মুবারক চোখের পাপড়ি দীর্ঘ ছিল। চোখের সাদা অংশ ছিল ধবধবে সাদা, কালো অংশ ছিল ঘন কালো; চোখ দুটি ছিল যেন জন্মগতভাবেই সুরমা-মাখা। চুল ছিল কালো, দাড়ি ছিল ঘন। যখন চুপ থাকতেন, তখন তাঁর মধ্যে এক গাম্ভীর্য ও ধীরস্থির ভাব প্রকাশ পেত। কথা বলার সময় মুচকি হাসতেন, তাঁর কথাগুলো যেন গাঁথা মুক্তার মতো মুখ থেকে মধুর হয়ে ঝরে পড়ত। দূর থেকে তাঁকে অত্যন্ত প্রতাপশালী দেখাত, কাছে এলে খুবই মধুর ও আকর্ষণীয় মনে হতো। যাঁরা তাঁর কাছে ছিলেন, তাঁরা তাঁর আদেশ পালনের জন্য প্রাণপণে ছুটে যেতেন।” এভাবে তিনি তাঁর আরও অনেক সুন্দর গুণের কথা বলে গেলেন। বিস্ময়ের সঙ্গে এসব শুনে তাঁর স্বামী বললেন, “কসম করে বলছি, ইনিই সেই ব্যক্তি, কুরাইশরা যাঁকে খুঁজছে। আমি যদি তাঁর দেখা পেতাম, তাহলে তাঁর খেদমতের মর্যাদা লাভ করতাম, তাঁর কাছ থেকে আর সরে যেতাম না।” উম্মে মাবাদের স্বামী রাসূলুল্লাহর পিছু পিছু গিয়ে রিম উপত্যকায় তাঁর নাগাল পেলেন এবং মুসলমান হলেন। তিনি সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন। পরে উম্মে মাবাদও মুসলমান হলেন।7
সুরাকা ইবনে মালিক
মুশরিকরা মদিনার দিকে রওনা হওয়া মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম ও হযরত আবু বকরকে অবিরাম খুঁজছিল। তাদের ভয় ছিল, তাঁদের খুঁজে না পেলে নিজেদের জন্য খুব বড় বিপদ দেখা দেবে। কারণ তারা ভাবছিল, মুসলমানরা একটি “ইসলামি রাষ্ট্র” গড়ে তুলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। এ কারণে মুশরিকরা নিজেদের সর্বস্ব বাজি রাখল। মহানবী ও হযরত আবু বকরকে যে হত্যা করবে কিংবা বন্দি করবে, তাকে তারা একশো উটের পাশাপাশি অগণিত ধনসম্পদ ও অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। এই খবর সুরাকা ইবনে মালিক যে গোত্রের লোক, সেই বনু মুদলিজের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল।
সুরাকা ইবনে মালিক পদচিহ্ন অনুসরণে খুব দক্ষ ছিল। তাই সে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর খোঁজখবর খুব কাছ থেকে রাখছিল।
এক মঙ্গলবার বনু মুদলিজ সুরাকা ইবনে মালিকের বসতি-এলাকা কুদাইদে জমায়েত হয়েছিল। সমাবেশে সুরাকা ইবনে মালিকও উপস্থিত ছিল। এমন সময় কুরাইশের এক লোক এসে সুরাকাকে বলল, “হে সুরাকা! আল্লাহর কসম, আমি একটু আগে সমুদ্রতীরের দিকে যাওয়া তিন-চারজনের একটি কাফেলা দেখেছি। ওরা নিশ্চয়ই মুহাম্মদ আর তার সঙ্গীরা।” সুরাকা ব্যাপারটি বুঝে ফেলল। কিন্তু অনেক বড় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল বলে সে একাই তা হাসিল করতে চাইছিল। তাই সে চাইছিল না যে, অন্য কেউ এ বিষয়ে জানুক। যেন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নয়, এমন ভাব করে সে বলল, “না, তুমি যাদের দেখেছ, তারা অমুক অমুক লোক। একটু আগেই তারা চলে গেছে। আমরাও তাদের দেখেছি।”
সুরাকা ইবনে মালিক আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে নিজের ঘরে ফিরে এল। চাকরকে বলল, ঘোড়া ও অস্ত্র নিয়ে উপত্যকার ওপারে গিয়ে যেন তার জন্য অপেক্ষা করে। নিজে বর্শা হাতে নিল; তার ঝলক যেন কারও চোখে না পড়ে, সেজন্য ফলাটি নিচের দিকে ঘুরিয়ে রাখল। সে ঘোড়া ছোটাতে শুরু করল। পথ চলতে চলতে অবশেষে তাঁদের পদচিহ্ন খুঁজে পেল। সে এত কাছে চলে এল যে, মহানবী যে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন, তাও শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবারও পেছনে ফিরে তাকালেন না। হযরত আবু বকর পেছনে তাকিয়ে সুরাকাকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। মহানবী গুহার মতো এখানেও তাঁকে বললেন, “দুঃখ কোরো না, আল্লাহ তাআলা আমাদের সঙ্গে আছেন।”
“(হে মক্কা মুকাররমা!) তোমার চেয়ে সুন্দর, তোমার চেয়ে প্রিয় কোনো জন্মভূমি আমার নেই। আমার কওম যদি আমাকে তোমার থেকে বের করে না দিত, তাহলে আমি বের হতাম না, তোমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও ঘর বাঁধতাম না, বসতি গড়তাম না” হাদীস শরীফ
ইমাম বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, এ সময় হযরত আবু বকর রাসূলে আকরামকে জানালেন যে, একজন ঘোড়সওয়ার তাঁদের কাছে এসে পড়েছে। তখন মহানবী দোয়া করলেন, “হে আমার রব! ওকে ফেলে দাও!” অন্য এক বর্ণনায় আছে, সুরাকা তাঁদের একেবারে কাছে চলে এলে হযরত আবু বকর কাঁদতে শুরু করলেন। রাসূলে আকরাম জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন কাঁদছেন। তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি নিজের জন্য কাঁদছি না। আপনার কোনো ক্ষতি হবে – এই ভয়ে কাঁদছি।” সুরাকা মহানবীর ওপর হামলা করার মতো কাছে চলে এল। সে বলল, “হে মুহাম্মদ! আজ আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?” সরওয়ারে আলম মহানবী উত্তর দিলেন, “আমাকে রক্ষা করবেন জাব্বার ও কাহহার আল্লাহ তাআলা।” সেই মুহূর্তে সুরাকার ঘোড়ার সামনের দুই পা হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে দেবে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে আবার হামলার চেষ্টা করতেই ঘোড়ার পা আবারও মাটিতে গেঁথে গেল। সুরাকা ঘোড়ার ওপর যতই জোর খাটাল, কিছুতেই সেটিকে ছাড়াতে পারল না। তার আর কিছুই করার রইল না। নিরুপায় হয়ে সে দয়া ও করুণার অধিকারী রাসূলুল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। সকল পূর্ণতা ও উত্তম চরিত্র যাঁর মধ্যে সমবেত, যিনি সর্বোত্তম চরিত্র ও স্বভাব নিয়ে সৃষ্ট, আমাদের সেই নবী তার এই মিনতি কবুল করলেন। সুরাকা বলছিল, “হে মুহাম্মদ! বুঝতে পেরেছি, তুমি সুরক্ষিত। দোয়া করো, যেন আমি মুক্তি পাই। এরপর আর কখনো তোমার ক্ষতি করব না। তোমার পেছনে যারা আসছে, তাদের কাছেও তোমার কথা মোটেই বলব না।” বিশ্বজগতের সরদার দোয়া করলেন, “হে আমার রব! সে যদি তার কথায় সত্যবাদী ও আন্তরিক হয়, তাহলে তার ঘোড়াকে মুক্ত করে দাও।” আল্লাহ তাআলা এই দোয়া কবুল করলেন। কেবল এই দোয়ার পরেই সুরাকা ইবনে মালিকের ঘোড়া গর্ত থেকে বের হতে পারল। তখন ঘোড়ার পা যেখানে দেবে গিয়েছিল, সেখান থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু একটা আকাশের দিকে উঠছিল। সুরাকা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল; এসব ঘটনা থেকে সে বুঝতে পারল যে, মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম সর্বদা সুরক্ষিত। সে অনেক কিছুর সাক্ষী হয়েছিল। শেষে সে বলল, “হে মুহাম্মদ! আমি সুরাকা ইবনে মালিক! আমার ব্যাপারে তোমাদের মনে যেন কোনো সন্দেহ না থাকে। তোমাদের কথা দিচ্ছি, এরপর তোমাদের অপছন্দের কোনো কাজ আমি করব না। তোমার কওম ঘোষণা করেছে, তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদের যে ধরে দেবে, তাকে বিরাট পুরস্কার দেবে।” তারপর কুরাইশের মুশরিকরা কী করতে চায়, তা সে এক এক করে বলে দিল। এমনকি সে তাঁদের পথের খাবার ও সওয়ারির জন্য উট দিতে চাইল, কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী তা গ্রহণ করলেন না। তিনি তাকে বললেন, “হে সুরাকা! যতক্ষণ তুমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করছ, ততক্ষণ তোমার উট বা গরু আমি চাই না, নিতে চাই না। তুমি যে আমাদের দেখেছ, তা গোপন রাখো – এটুকুই যথেষ্ট।” ইবনে সাদ বর্ণনা করেন: সুরাকা মহানবীকে বলল, “আমাকে যা চাও আদেশ করো।” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “নিজের জায়গায় থাকো। কাউকে আমাদের নাগাল পাওয়ার সুযোগ দিয়ো না।” আল্লাহ তাআলা চাইলে সবকিছুই ঘটে যেত। একনিষ্ঠভাবে তাঁর ওপর ভরসা করে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চললে বুদ্ধির অগম্য ঘটনা ঘটত। রাসূলুল্লাহকে হত্যা করে বড় বড় পুরস্কার হাসিল করার লোভে গর্জনরত সিংহের মতো যে সুরাকা পথে নেমেছিল, সে এখন হয়ে গেল এক কোমল, বাধ্য শিশুর মতো। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা, সুরাকা যেন তাঁর হাবিবের কোনো ক্ষতি না করে, সেজন্য তার অন্তরকে কল্যাণের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবিবকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একা ছেড়ে দেবেন না। কারণ তিনি হলেন সেই প্রিয় নবী, যাঁকে আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি রহমতস্বরূপ এবং তারা যেন দুনিয়া ও আখিরাতে চিরস্থায়ী সৌভাগ্য লাভ করে, সেজন্য পাঠিয়েছেন। এরপর সুরাকা নিজের পথ ধরে ফিরে গেল। যাদের সঙ্গে তার দেখা হলো, তাদের কাছেও নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলল না।8
বিশ্বজগতের সুলতান আসছেন!
মহানবী, হযরত আবু বকর, আমির ইবনে ফুহাইরা এবং তাঁদের পথপ্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত এক সপ্তাহ পথ চলার পর “কুবা” গ্রামে পৌঁছালেন। দিনটি ছিল নবুয়তপ্রাপ্তির ত্রয়োদশ বছর (৬২২ খ্রিস্টাব্দ), হিজরতের প্রথম বছরের রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখ, সোমবার (খ্রিস্টীয় সেপ্টেম্বর মাসের বিশ তারিখ); তখন চাশতের সময়। তাঁরা কুলসুম ইবনে হিদম নামের এক মুসলমানের ঘরে মেহমান হলেন। রাসূলে আকরাম মদিনায় আসার আগেই প্রথম মুহাজিররা কুবায় বনু আমর ইবনে আওফের মালিকানাধীন খেজুর শুকানোর একটি জায়গাকে নামাজের স্থানে পরিণত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুবায় পৌঁছে এই নামাজের স্থানটি প্রশস্ত করে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করলেন। তাঁরা কুবা মসজিদে নামাজ আদায় করলেন। সূরা তাওবার ১০৮তম পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে “…যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার ওপর স্থাপিত” বলে কুবা মসজিদের প্রশংসা করা হয়েছে।9
দিন ও রাত সমান হওয়ার দিন, সেপ্টেম্বরের তেইশ তারিখও তাঁরা কুবা গ্রামে কাটালেন। তারপর রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ জুমার দিনে মদিনার পথে রওনা হলেন। জোহরের নামাজের সময় তাঁরা মদিনা ও কুবার মাঝখানে রানুনা উপত্যকায় থামলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম জুমার নামাজ এখানেই আদায় করলেন এবং প্রথম খুতবাও এখানেই দিলেন।10 সেদিনই তাঁরা মদিনায় পৌঁছালেন। (পরে প্রথম জুমার নামাজের স্মৃতিতে এখানে “মসজিদে জুমা” নামে একটি মসজিদ নির্মিত হয়।) এদিকে হযরত আলি মক্কায় থেকে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ কাবা শরীফে সবসময় যে জায়গায় বসতেন, তিনি সেখানে বসলেন। তিনি ঘোষণা করালেন, “রাসূলে আকরামের কাছে যার যা আছে, সে এসে নিয়ে যাক।” সবাই এসে নিজের জিনিসের চিহ্ন বলে আমানত বুঝে নিল। এভাবে আমানতগুলো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। আল্লাহর সিংহ হযরত আলি, কুরাইশের কাফিররা যেখানে জড়ো হতো, সেখানে গিয়ে বললেন, “ইনশাআল্লাহু তাআলা, আগামীকাল আমি মদিনা মুনাওয়ারায় যাচ্ছি। তোমাদের কিছু বলার আছে কি? আমি এখানে থাকতে থাকতেই বলো।” তারা সবাই মাথা নিচু করে রইল, কিছুই বলল না। সকাল হলে হযরত আলি রাসূলে আকরামের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে পথে বের হলেন। কুরাইশের ৪–৫ জন লোক তাঁর পথ আটকাল, কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হলেন। তারপর পথে তাঁর সামনে পড়ল মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ। এক আঘাতে তাকেও মাটিতে ফেলে তিনি ঈমানের দাওয়াত দিলেন। তিনিও মুসলমান হলেন। আবার পথ ধরে ফোলা পা থেকে রক্ত ঝরা অবস্থায় তিনি কুবায় রাসূলুল্লাহর কাছে এসে পৌঁছালেন। দিনে লুকিয়ে থেকে রাতে পায়ে হেঁটে চলা এই সফরের শেষে তিনি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে, আমাদের নবীর দরবারে যেতে পারছিলেন না। রাসূলে আকরাম এ খবর পেয়ে নিজেই তাঁর কাছে তাশরিফ আনলেন। হযরত আলির অবস্থা দেখে রাসূলে আকরামের মন কেঁদে উঠল। তিনি নিজের প্রিয়, আত্মত্যাগী চাচাতো ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, সত্যের পথে হাজারো কষ্ট সহ্য করা তাঁর কোমল, নাজুক পা দুটিতে নিজের মুবারক হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করলেন। এমনও বর্ণিত আছে যে, হযরত আলির এই আত্মত্যাগের প্রেক্ষিতে এই মহান আয়াতটি নাজিল হয়েছিল, যার মর্মার্থ: “মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণ (নিজেকে) উৎসর্গ করে।”11,12
“হে সুরাকা! এই মুহূর্তে আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, তুমি পারস্য-সম্রাটের (কিসরার) কঙ্কণ পরেছ, তার কোমরবন্ধ বেঁধেছ এবং তার মুকুট মাথায় দিয়েছ!” হাদীস শরীফ
আগেই মদিনায় হিজরত করে আসা সাহাবায়ে কেরাম এবং মদিনার মুসলমানরা যখন শুনলেন যে, বিশ্বজগতের সুলতান হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে রওনা হয়েছেন, তখন থেকেই তাঁরা গভীর আগ্রহ ও ব্যাকুলতা নিয়ে তাঁর শুভাগমনের অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাই তাঁরা মদিনা মুনাওয়ারার উপকণ্ঠে পাহারাদার বসালেন এবং মহানবী যে মুহূর্তে তাঁদের শহরকে ধন্য করবেন, সেই মুহূর্তে তাঁকে বরণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে রইলেন। তাঁর ভালোবাসায় যাঁরা জ্বলছিলেন, তপ্ত মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন পানির জন্য ব্যাকুল থাকে, তেমনি তাঁরা দিগন্তে চোখ মেলে দিনের পর দিন অপেক্ষা করলেন।
অবশেষে হঠাৎ একটি আওয়াজ শোনা গেল: “আসছেন! আসছেন!…” যাঁরা আওয়াজটি শুনলেন, তাঁরা তপ্ত মরুভূমির মাঝখানের দিকে চোখ বুলাতে লাগলেন। হ্যাঁ!… হ্যাঁ!… তাঁরাও দেখলেন, উত্তপ্ত মরুভূমিতে সূর্যের ঝলসানো তাপ উপেক্ষা করে প্রতীক্ষিত মেহমানরা গভীর প্রতাপের সঙ্গে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছেন। আনন্দে তাঁরা একে অপরকে ডেকে বলতে লাগলেন, “সুসংবাদ!… সুসংবাদ!… রাসূলুল্লাহ আসছেন!… আমাদের নবী আসছেন!… আনন্দ করো, হে মদিনাবাসী! ঈদ উদযাপন করো! হাবিবুল্লাহ আসছেন!… আমাদের মাথার মুকুট আসছেন!…” এই খবর মুহূর্তের মধ্যে মদিনা মুনাওয়ারার অলিগলি ভরে দিল। সাত থেকে সত্তর, বৃদ্ধ থেকে অসুস্থ – সবাই এই অভূতপূর্ব আনন্দের সংবাদের অপেক্ষায় ছিলেন।
মদিনার সবাই নিজেদের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে জগৎসমূহের সরদারকে বরণ করার জন্য ছুটে চললেন। তাকবিরের ধ্বনি আকাশ মুখরিত করছিল, আনন্দে চোখের পানি বন্যার মতো বয়ে যাচ্ছিল। বেদনা ও সুখে ভরা এক হাওয়া বইছিল, আর মদিনা তার ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দিনটি অতিবাহিত করছিল। একদিকে ছিল তারা, যারা সবার কাছে “আমিন” উপাধিতে পরিচিত আল্লাহ তাআলার হাবিবকে হত্যা করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল; আর অন্যদিকে ছিলেন তাঁরা, যাঁরা তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের রক্ষা করতে, বুকে টেনে নিতে এবং এই পথে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করতে চাইছিলেন।
মদিনাবাসীরা যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের প্রিয় নবীর নূরানি চেহারা দেখতে চাইছিলেন। মদিনা যেদিন থেকে মদিনা হয়েছে, এমন আনন্দময়, এমন বরকতময় মুহূর্ত আর দেখেনি। এ ছিল এমন এক ঈদ, যা সেদিন পর্যন্ত কেউ দেখেনি। যার তুলনা আগে দেখা যায়নি, আর পরেও দেখা যাবে না, সেই ঈদের দিনে শিশু, তরুণ, বয়স্ক – সৌভাগ্যবান সকল মানুষ প্রথমবারের মতো একই সময়ে সমস্বরে এই কবিতাটি গাইছিলেন:13
তালাআল বাদরু আলাইনা,
আমাদের ওপর উদিত হলো পূর্ণিমার চাঁদ
মিন সানিয়্যাতিল ওয়াদা,
বিদায়ের টিলাগুলোর দিক থেকে।
ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা,
আমাদের ওপর শোকর ওয়াজিব হলো,
মা দাআ লিল্লাহি দা।
যতবার আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী আহ্বান করে।
আইয়ুহাল মাবউসু ফিনা,
হে আমাদের মাঝে প্রেরিত মহান সত্তা,
জিতা বিল আমরিল মুতা,
তুমি এনেছ আল্লাহর আদেশ (আমরুল্লাহ)।
জিতা শাররাফতাল মাদিনা,
তুমি মদিনাকে মর্যাদায় ধন্য করলে,
মারহাবান ইয়া খাইরা দা।
স্বাগতম, হে আহ্বানকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম!
আনতা শামসুন, আনতা বাদরুন,
তুমি সূর্য, তুমি পূর্ণিমার চাঁদ,
আনতা নূরুন আলা নূর,
তুমি নূরের ওপর নূর,
আনতা মিসবাহুস সুরাইয়া,
তুমি সুরাইয়া (কৃত্তিকা) তারকার দীপ্তি,
ইয়া হাবিবি, ইয়া রাসূল!
হে আমার প্রিয়তম, হে রাসূল!
কাদ লাবিসনা সাওবা ইজ্জিন,
আমরা ইজ্জত ও সম্মানে পূর্ণ হলাম,
বাদা আসওয়াবির রিকা,
জীর্ণ পুরনো থেকে মুক্তি পেলাম,
ওয়া রাদানা সাদইয়া মাজদিন,
মহিমায় পৌঁছালাম, তৃপ্ত হলাম,
বাদা আইয়ামিদ দিয়া।
ক্ষতিতে ছিলাম – লাভ পেলাম।
কালাত আহমারুদ দায়াজি,
অন্ধকার দূর করা চাঁদ বলে:
কুল লি আরবাবিল ইসলাম,
“ইসলামের অনুসারীদের বলে দাও:
কুল্লু মান ইয়াতবা মুহাম্মদ,
মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের অনুসারীর ওপর
ইয়ানবাগি আল লা ইউদাম।
কখনো জুলুম কোরো না।”
ওয়া তাআহাদনা জামিআন,
আমরা সবাই মিলে কথা দিলাম
ইয়াওমা আকসামনাল ইয়ামিন,
শপথ করার সেই দিনে:
লান নাখুনাল আহদা ইয়াওমান,
সত্যবাদিতাই আমাদের পথ,
ওয়াত্তাখাজনাস সিদকা দিন।
দ্বীনে খেয়ানতের স্থান নেই।
লাসতু ওয়াল্লাহি নাসিয়ান,
আল্লাহর কসম, আমি ভুলব না,
মা ইউকাসিহিল ইবাদ,
বেদনাহীন একটি দিনও ছিল না,
মাশহাদান ইয়া নাজমা আমনিন,
তুমি সাক্ষী, হে নিরাপত্তার তারকা:
জু ওয়াফাইন ওয়া উইদাদ।
তোমার বিশ্বস্ততা ও ভালোবাসা অপরিসীম।
“স্বাগতম, ইয়া রাসূলাল্লাহ”, “আমাদের ঘরে আসুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ” – এমন অনুরোধে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠছিল। মদিনার নেতৃস্থানীয় কয়েকজন কাসওয়ার লাগাম ধরে মিনতি করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের ঘরে আসুন…” তখন মহানবী তাঁদের বললেন, “আমার উটনীর লাগাম ছেড়ে দাও, সে আদেশপ্রাপ্ত। যার ঘরের সামনে সে বসে পড়বে, সেখানেই আমি মেহমান হব!”
“মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে” বাকারা: ২০৭
সবার মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ও কৌতূহল দেখা দিল। কাসওয়া কোথায় বসবে? কাসওয়া মদিনার ভেতরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল; প্রতিটি দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঘরের মালিকরা মিনতি করছিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের ঘরে তাশরিফ আনুন, আমাদের ঘরে তাশরিফ আনুন!” মহানবী তাঁদের দিকে মুচকি হেসে বলছিলেন, “উটনীর পথ ছেড়ে দাও! কোথায় বসবে, সে বিষয়ে তাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে।”
অবশেষে কাসওয়া সেই স্থানে বসে পড়ল, যেখানে আজ মহানবীর বরকতময় মসজিদের দরজা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটনী থেকে নামলেন না। প্রাণীটি আবার উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। তারপর আগের জায়গায় এসে বসে পড়ল এবং আর উঠল না। তখন মহানবী কাসওয়ার পিঠ থেকে নেমে ইরশাদ করলেন, “ইনশাআল্লাহ, আমাদের মনজিল এখানেই।” তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “এ জায়গাটি কার?” তাঁরা উত্তর দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আমরের দুই পুত্র সুহাইল ও সাহলের।” এই দুই শিশু ছিল ইয়াতিম। আমাদের নবী জিজ্ঞেস করলেন, “আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে কার ঘর এ জায়গার সবচেয়ে কাছে?” কারণ রাসূলুল্লাহর দাদা আবদুল মুত্তালিবের মা ছিলেন বনু নাজ্জারের মেয়ে। হযরত খালিদ ইবনে জায়েদ আবু আইয়ুব আনসারি আনন্দে আবেগভরে নিজের ঘর দেখিয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ঘরই সবচেয়ে কাছে। এই যে আমার ঘর, আর এই তার দরজা।” তিনি কাসওয়ার পিঠ থেকে মালপত্র নামালেন এবং রাসূলুল্লাহকে নিজের ঘরে আমন্ত্রণ জানালেন।14
মদিনার মুসলমান ও মুহাজিররা মহানবীর হিজরতে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। এই বছরটিকে “সানাতুল ইজন” (অনুমতির বছর) বলা হয়।
হিজরতের সময় হৃদয়ের ওষুধ, মানবজাতির মাথার মুকুট, আল্লাহ তাআলার হাবিব মহানবীর বয়স ছিল তিপ্পান্ন বছর।
কী দশা হলো আমার?
কী দশা হলো আমার, ইয়া রাসূলাল্লাহ?
জ্বলছে আমার প্রাণ ও দেহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
কাঁপতে থাকা শিখা আর ধূপদানির মতো
তোমার প্রেমে ধোঁয়া হয়ে উড়ছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার বিরহের ব্যথায় কত কাল ধরে
গলে গলে নিঃশেষ হচ্ছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তুমি সেই বাদশাহ, যাঁর জন্য জগৎ সৃষ্টি; তোমার মহান দরজায়
ঘাড় নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার পা রাখা মাটিতে ফুটেছে গোলাপ,
আর আমি সেখানে এক কাঁটা, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
আবু আইয়ুব আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু
