আমার প্রিয় নবী

প্রকৃত মুসলমান হওয়ার শর্তাবলি

আরবি “ইসলাম” শব্দের অর্থ “নিজেকে সমর্পণ করা, আনুগত্যে মাথা নত করা, নিরাপত্তা লাভ করা”; এর আরেক অর্থ “শান্তি”। ইমামে আজম (রাহিমাহুল্লাহু তাআলা) ইসলামের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: “আল্লাহ তাআলার আদেশসমূহের কাছে আত্মসমর্পণ করা ও মাথা নত করা।”

এ থেকে একজন ভালো মুসলমান কেমন হবে, তা আপনা-আপনিই স্পষ্ট হয়ে যায়। আমাদের আলেমগণ একজন মুসলমানের মধ্যে যেসব গুণ থাকা উচিত, সেগুলো এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: ভালো মুসলমান সবকিছুর আগে দৈহিক ও আত্মিকভাবে পবিত্র।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ইরশাদ করেন, “আমি পবিত্রদের ভালোবাসি!” মুসলমানরা মসজিদে ও ঘরে জুতা পায়ে প্রবেশ করে না। তাদের কার্পেট ও মেঝে ধুলাবালিমুক্ত, পরিচ্ছন্ন থাকে। প্রত্যেক মুসলমানের ঘরে গোসলখানা আছে। তারা নিজেরা, তাদের কাপড়চোপড় ও খাবার সবই সর্বদা পরিচ্ছন্ন থাকে। তাই তাদের মধ্যে জীবাণু ও রোগব্যাধি থাকে না।

প্রকৃত মুসলমান নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে জানে। সে হারাম ও বিষতুল্য মাদক পানীয় ব্যবহার করে না। বহু বিপদের কারণ এবং হারাম ঘোষণার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা শূকরের গোশত খায় না।

আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চিকিৎসাবিদ্যার নানাভাবে প্রশংসা করেছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেন, “ইলম দুই প্রকার: দেহের ইলম ও দ্বীনের ইলম।” অর্থাৎ ইলমসমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হলো রুহ রক্ষাকারী দ্বীনি ইলম এবং দেহ রক্ষাকারী স্বাস্থ্যবিদ্যা। এ কথা বলে তিনি সবকিছুর আগে রুহ ও দেহের সুস্থতার জন্য চেষ্টা করা আবশ্যক বলে আদেশ করেছেন। ইসলাম দেহের ইলমকে দ্বীনের ইলমের আগে শিখতে আদেশ করে। কারণ সকল ভালো কাজ দেহ সুস্থ থাকলেই করা যায়। মহানবী বাইজান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে চিঠি লিখে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। হিরাক্লিয়াস চিঠির উত্তর দিয়েছিল এবং অনেক উপহার পাঠিয়েছিল। সেগুলোর একটি ছিল একজন চিকিৎসক। চিকিৎসক এসে বলল, “জনাব! সম্রাট আমাকে আপনাদের সেবার জন্য পাঠিয়েছেন। আমি বিনামূল্যে আপনাদের রোগীদের চিকিৎসা করব!” মহানবী তা গ্রহণ করলেন। তাঁর আদেশে চিকিৎসককে একটি ঘর দেওয়া হলো। প্রতিদিন তার কাছে উৎকৃষ্ট খাবার ও পানীয় পৌঁছে দেওয়া হতে লাগল। দিন গেল, মাস গেল। একজন মুসলমানও চিকিৎসকের কাছে এল না। চিকিৎসক লজ্জিত হয়ে মহানবীর দরবারে এসে বলল, “জনাব! আমি এখানে সেবা করার জন্য এসেছি। আজ পর্যন্ত একজন রোগীও আসেনি। বসে বসে সময় কাটালাম। খেলাম, পান করলাম, আরামে থাকলাম। এবার আমি চলে যেতে চাই।” এভাবে সে বিদায়ের অনুমতি চাইলে আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “সেটা তোমার ইচ্ছা। যদি আরও থাকো, তবে মেহমানের সেবা করা, তাকে আপ্যায়ন করা মুসলমানদের কর্তব্য। আর যদি চলে যাও, তবে তোমার যাত্রা শুভ হোক। তবে এটুকু জেনে রাখো, তুমি এখানে বছরের পর বছর থাকলেও তোমার কাছে কেউ আসবে না। কারণ আমার সাহাবীগণ অসুস্থ হন না! ইসলাম ধর্ম অসুস্থ না হওয়ার পথ দেখিয়েছে। আমার সাহাবীগণ পরিচ্ছন্নতার প্রতি খুব মনোযোগ দেন। ক্ষুধা না লাগা পর্যন্ত কিছু খান না এবং পেট ভরার আগেই দস্তরখান থেকে উঠে পড়েন।”

এর অর্থ এই নয় যে, মুসলমান কখনো অসুস্থই হয় না। তবে যে মুসলমান নিজের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নবান, সে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে। সে সহজে অসুস্থ হয় না। মৃত্যু সত্য। কেউই মৃত্যু থেকে রেহাই পাবে না, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো রোগের ফলে মারা যাবে। কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত তার স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারা কেবল ইসলামে আদিষ্ট বিষয়গুলো এবং পরিচ্ছন্নতা মেনে চলার ফলেই সম্ভব হয়। ভালো মুসলমান যেমন দেহের পবিত্রতার প্রতি মনোযোগী, তেমনি রুহের পবিত্রতার প্রতিও খুব মনোযোগী। আমাদের নবী ইরশাদ করেন, “আমাকে উত্তম স্বভাবসমূহ পূর্ণতা দিতে এবং উত্তম চরিত্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পাঠানো হয়েছে।” এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে ঈমানে সবচেয়ে পূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” এমনকি ঈমানও চরিত্র দিয়ে পরিমাপ করা হয়।

একজন মুসলমানের জন্য রুহের পবিত্রতাই মূল কথা। যে মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, মানুষকে ধোঁকা দেয়, জুলুম করে, অন্যায় করে, নিজের ধর্মের ভাইদের সাহায্য করে না, অহংকার দেখায়, কেবল নিজের স্বার্থের কথা ভাবে – সে যত ইবাদতই করুক, প্রকৃত মুসলমান বলে গণ্য হয় না। সূরা মাউনের প্রথম তিন আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “হে আমার রাসূল! যে কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করে, ইয়াতিমকে কষ্ট দেয় ও তার হক ছিনিয়ে নেয়, দরিদ্রকে আহার দেয় না এবং অন্যদেরও দরিদ্রের প্রতি সদাচরণে উৎসাহিত করে না, তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ?” এ ধরনের লোকদের ইবাদত কবুল হয় না। ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকা আদেশ পালনের চেয়েও অগ্রগণ্য। প্রকৃত মুসলমান সবকিছুর আগে একজন পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ মানুষ। সে হাসিমুখ, মিষ্টভাষী ও সত্যবাদী। রাগ কী, তা সে জানে না।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “যাকে কোমলতা দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করা হয়েছে।”

মুসলমান অত্যন্ত বিনয়ী। তার কাছে যে-ই আসে, সে তার কথা শোনে এবং সুযোগ পেলেই সাহায্য করে। মুসলমান গাম্ভীর্যপূর্ণ ও ভদ্র। সে তার পরিবার ও দেশকে ভালোবাসে। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।”

আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দারা কেমন হওয়া উচিত, তা পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন। সূরা ফুরকানের ৬৩–৬৯ আয়াতের মহান মর্মার্থ: “রহমানের (অর্থাৎ বান্দাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু আল্লাহ তাআলার মর্যাদাবান) বান্দারা পৃথিবীতে বিনয় ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে চলাফেরা করে। অজ্ঞ লোকেরা তাদের উত্ত্যক্ত করলে তারা (তোমাদের প্রতি শান্তি ও নিরাপত্তা) – এ ধরনের সুন্দর কথা বলে সততা ও কোমলতার সঙ্গে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। তারা তাদের রবের উদ্দেশে সিজদা ও কিয়াম করে (নামাজ পড়ে) রাত কাটায় (তাঁর প্রশংসা করে)। তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের আজাব দূর করে দাও! নিশ্চয়ই তার আজাব স্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক। নিঃসন্দেহে তা কত নিকৃষ্ট আবাস, কত নিকৃষ্ট ঠিকানা!’ তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না, বরং দুয়ের মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করে এবং কারও হক কম দেয় না। তারা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শরিক করে না। আল্লাহ তাআলা যে প্রাণ বধ করা হারাম করেছেন, এমন কাউকে তারা হত্যা করে না। (কেবল অপরাধীদের শাস্তি দেয়।) তারা জিনা করে না।” আর ৭২–৭৪ আয়াতে: “তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। অনর্থক ও ক্ষতিকর কাজ থেকে দূরে থাকে। এমন কোনো অনর্থক, ক্ষতিকর কিংবা জোর করে করানো কাজে ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়লে মুখ ফিরিয়ে গাম্ভীর্যের সঙ্গে সরে যায়। তাদের যখন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা অন্ধ ও বধিরের মতো না দেখার, না শোনার ভান করে না। তারা এই বলে মিনতি করে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্য থেকে আমাদের চোখ জুড়ানো নেককার (আমাদের উত্তরাধিকারী, সর্বোত্তম উত্তরসূরি হবে এমন) মানুষ দান করো! আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা লোকদের নেতা বানাও!’”

এ ছাড়া সূরা সফের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতের মহান মর্মার্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? যা করোনি তা ‘করেছি’ বলা আল্লাহর কাছে মহা অসন্তোষের কারণ।” এটি দেখায় যে, কেউ যদি এমন কিছু মানত করে যা সে করতে পারবে না, কিংবা এমন কিছুর প্রতিশ্রুতি দেয় যা সে পালন করতে পারবে না, তবে তা তাকে আল্লাহর কাছে মন্দ মানুষে পরিণত করবে।

“আল্লাহ তাআলার কসম! কেউ নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা তার দ্বীনি ভাইয়ের জন্য পছন্দ না করা পর্যন্ত তার ঈমান পূর্ণ হয় না” হাদীস শরীফ

প্রকৃত মুসলমান নিজের দ্বীন, মা-বাবা, শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ, দেশের মুরুব্বি ও আইনকানুনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। সে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে না। কেবল উপকারী বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সে জুয়া খেলে না। সময় নষ্ট করে না।

প্রকৃত মুসলমান তার ইবাদত আদায় করে। আল্লাহ তাআলার প্রতি তার কৃতজ্ঞতার ঋণ পরিশোধ করে। ইবাদত নামকাওয়াস্তে কিংবা কেবল নিষেধ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য করা হয় না। ইবাদত আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্যই করা উচিত। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা মানে তাঁকে অনেক ভালোবাসা। মানুষ যেমন তার অতি প্রিয় কাউকে কষ্ট দিতে চায় না এবং তাকে কষ্ট দিয়ে ফেলার ভয় করে, তেমনি আল্লাহ তাআলার ইবাদতও এমনভাবে করা উচিত, যা তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের যে নিয়ামত দান করেছেন, তা এত বড় যে, কেবল তাঁকে অনেক ভালোবেসে এবং আন্তরিকভাবে তাঁর ইবাদত করেই আমরা তার ঋণ শোধ করতে পারি।

এই ইবাদত নানা প্রকার। এর একাংশ আল্লাহ তাআলা ও বান্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা হয়তো তাঁর ইবাদতে ত্রুটিকারীদের ক্ষমা করবেন। অন্যের হক রক্ষা করাও ইবাদত। যারা অন্যদের ক্ষতি করে এবং যাদের ওপর অন্যের হক রয়েছে, হকদাররা ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাদের কখনোই ক্ষমা করেন না। হাদীস শরীফসমূহে ইরশাদ হয়েছে:

“যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তাআলাও তার প্রতি দয়া করেন না।”

“জুলুম প্রতিরোধ করে জালিম ও মজলুম উভয়কে সাহায্য করো।”

“কেনা একটি জামার জন্য দেওয়া টাকার দশ ভাগের নয় ভাগ হালাল আর এক ভাগ হারাম হলে আল্লাহ তাআলা সেই জামা পরে আদায় করা নামাজ কবুল করেন না।”

“মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করে না। তার সাহায্যে ছুটে যায়। তাকে ছোট ও নিজের চেয়ে নিচু মনে করে না। তার রক্ত, সম্পদ, ইজ্জত ও সম্ভ্রমের ক্ষতি করা হারাম।”

“আল্লাহ তাআলার কসম! কেউ নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা তার দ্বীনি ভাইয়ের জন্য পছন্দ না করা পর্যন্ত তার ঈমান পূর্ণ হয় না।”

“আল্লাহর কসম! যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, তার ঈমান নেই (অর্থাৎ সে প্রকৃত মুমিন নয়)।”

দুনিয়ায় সৌভাগ্য, কল্যাণ ও শান্তি লাভ এবং আখিরাতে আজাব থেকে মুক্তির জন্য দুটি কাজ করা আবশ্যক।

প্রথমটি আল্লাহ তাআলার আদেশসমূহ পালন করা। দ্বিতীয়টি তিনি যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকা। দ্বিতীয়টি প্রথমটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে হলে মুবাহ, অর্থাৎ অনুমোদিত বিষয়গুলোও মাত্রাতিরিক্ত না করা, প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে না যাওয়া আবশ্যক। কারণ মুবাহ কাজে সীমালঙ্ঘন মানুষকে হারামের দিকে টেনে নেয়। ইসলামি আলেমগণ বলেছেন, “গুনাহগারদের অনুতাপে মাথা নত করা আদেশ পালনকারীদের গর্বের চেয়ে বেশি প্রিয়।”

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাও দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি আল্লাহ তাআলার হক সংশ্লিষ্ট নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা। দ্বিতীয়টি বান্দাদের হক জড়িত নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা। দ্বিতীয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি অতিশয় দয়ালু। আর মানুষ অত্যন্ত মুখাপেক্ষী ও কৃপণ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন:

“যার ওপর বান্দার হক আছে, যে সৃষ্টির সম্পদ ও ইজ্জতে হাত দিয়েছে, সে যেন মৃত্যুর আগেই হকদারের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেয়, ঋণ পরিশোধ করে! যেদিন টাকা-পয়সা ও সম্পদ কোনো কাজে আসবে না, সেই আখিরাত দিবসে সে যেন বান্দার হক কাঁধে নিয়ে না যায়! সেদিন দুনিয়ায় করা তার ইবাদতসমূহ হকদারকে দিয়ে দেওয়া হবে। তার ইবাদত না থাকলে বা শেষ হয়ে গেলে হকদারের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।” একবার তিনি তাঁর পাশে থাকা লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কে?” তাঁরা বললেন, “যার টাকা-পয়সা ও পুঁজি শেষ হয়ে গেছে।” তখন তিনি ইরশাদ করলেন, “ভালো করে জেনে রাখো, নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ায় নামাজ পড়লেও, রোজা রাখলেও, যাকাত দিলেও মানুষকে গালি দিয়েছে, গিবত করেছে, অন্যের সম্পদ খেয়েছে, প্রাণ হত্যা করেছে, প্রহার করেছে, আহত করেছে। আখিরাতে তার নেকিগুলো হকদারদের দিয়ে দেওয়া হবে; নেকি শেষ হয়ে গেলে হকদারদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”

হযরত মুহাম্মদ মাসুম ফারুকি সিরহিন্দি “মাকতুবাত” গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১১০তম চিঠিতে বলেন, “গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা উচিত। গোপন গুনাহের তওবা গোপনে, আর প্রকাশ্যে করা গুনাহের তওবা প্রকাশ্যে করতে হয়। তওবায় দেরি করা উচিত নয়। কিরামান কাতিবিন ফেরেশতাগণ গুনাহ সঙ্গে সঙ্গে লেখেন না। তওবা করা হলে তা আদৌ লেখা হয় না। তওবা করা না হলে তাঁরা লেখেন। জাফর ইবনে সিনান (কুদ্দিসা সিররুহু) বলেন, ‘যে গুনাহ থেকে তওবা করেনি, তার উচিত মৃত্যুর আগে তওবা করা।’ ওয়ারা ও তাকওয়া হাতছাড়া করা উচিত নয়। তাকওয়া হলো স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বিষয়গুলো না করা; আর ওয়ারা হলো সন্দেহজনক বিষয়গুলোও না করা। নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকা আদিষ্ট বিষয় পালনের চেয়ে বেশি উপকারী। আমাদের বুজুর্গগণ বলেছেন, ‘ভালো-মন্দ সবাই ভালো কাজ করে। কিন্তু কেবল সিদ্দিকগণ ও নেককাররাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন…’ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন যারা আল্লাহ তাআলার দরবারে পৌঁছাবে, তারা হলো ওয়ারা ও জুহদের অধিকারী।’ আরেক হাদীস শরীফে আছে, ‘ওয়ারার অধিকারীর নামাজ কবুল হয়।’ আর অন্য এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ‘ওয়ারার অধিকারীর সঙ্গে থাকা ইবাদত। তার সঙ্গে কথা বলায় সদকা দেওয়ার সমান সওয়াব।’ যে কাজে সন্দেহ জাগে, তাতে নিজের অন্তরের কাছে পরামর্শ চাও! যে কাজে তোমার অন্তর কেঁপে ওঠে, তা কোরো না! নফসের অনুসরণ কোরো না!”

“হিকমত দশ ভাগ। এর নয় ভাগ নির্জনতায় (উজলতে), আর এক ভাগ কম কথা বলায়” হাদীস শরীফ

হাদীস শরীফসমূহে ইরশাদ হয়েছে, “যে কাজ নফসকে প্রশান্তি ও অন্তরকে স্বস্তি দেয়, তা ভালো কাজ। যে কাজ নফসকে উসকে দেয়, অন্তরে অস্থিরতা জাগায়, তা গুনাহ।” “হালাল বিষয়গুলো সুস্পষ্ট, হারামগুলোও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। যা নিঃসন্দেহে জানো, তা-ই করো!” এই হাদীস শরীফগুলো দেখায় যে, যে বিষয়ে সন্দেহ জাগে এবং যা অন্তরকে সংকুচিত করে, তা করা উচিত নয়। আর যাতে সন্দেহ নেই, তা করা জায়েজ। এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে যা হালাল করেছেন, তা হালাল। পবিত্র কুরআনে তিনি যা জানাননি, তা তিনি ক্ষমা করেন।” সন্দেহজনক কিছুর সম্মুখীন হলে হাত বুকের ওপর রাখা উচিত। হৃৎস্পন্দন না বাড়লে কাজটি করা যায়। আর যদি হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, তবে তা করা উচিত নয়। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমার হাত বুকের ওপর রাখো! হালাল বিষয়ে অন্তর শান্ত থাকে। হারাম বিষয়ে অন্তর ধড়ফড় করে। সন্দেহ জাগলে কোরো না। দ্বীনের লোকেরা ফতোয়া দিলেও কোরো না!”

যার ঈমান আছে, সে কবিরা গুনাহে পতিত না হওয়ার জন্য সগিরা গুনাহ থেকেও দূরে থাকে। নিজের সকল ইবাদত ও ভালো কাজকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করা উচিত। আল্লাহ তাআলার আদেশসমূহ পুরোপুরি পালন করতে পারেনি বলে ভাবা উচিত। আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে মানাজিল (কুদ্দিসা সিররুহু) বলেন, “আল্লাহ তাআলা নানা ইবাদত জানিয়েছেন। তিনি সবর, সত্যনিষ্ঠা, নামাজ, রোজা এবং সাহরির সময় ইস্তিগফার করার আদেশ দিয়েছেন। ইস্তিগফারের কথা সবার শেষে বলেছেন। এভাবে বান্দার জন্য আবশ্যক হলো নিজের ইবাদত ও ভালো কাজগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করে সবকিছুর জন্য ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করা।”

জাফর ইবনে সিনান বলেন, “ইবাদত ও ভালো কাজকারীদের নিজেদেরকে গুনাহগারদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা ওই গুনাহগারদের গুনাহের চেয়েও নিকৃষ্ট।”

হযরত আলি মুরতাইশ রমজান শরীফের বিশ তারিখের পর ইতিকাফ ছেড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, “কেন বেরিয়ে এলেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “হাফেজদের সুর করে গানের ঢঙে কুরআন পড়তে এবং তা নিয়ে গর্ব করতে দেখে আমি ভেতরে থাকতে পারলাম না।”

নিজের ও পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ হালাল উপায়ে উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করা উচিত। এর জন্য ব্যবসা ও শিল্পকর্মে নিয়োজিত হওয়া আবশ্যক। সালাফে সালেহিন (রহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাইন) সর্বদা এভাবেই পরিশ্রম করে উপার্জন করতেন। হালাল উপার্জনের সওয়াব বর্ণনাকারী বহু হাদীস শরীফ রয়েছে। হযরত মুহাম্মদ ইবনে সালিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আমরা কি পরিশ্রম করে উপার্জন করব, নাকি কেবল ইবাদত করে তাওয়াক্কুল করব?” তিনি বললেন, “তাওয়াক্কুল করা রাসূলুল্লাহর হাল (অবস্থা)। আর পরিশ্রম করে উপার্জন করা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নত। তোমরা পরিশ্রমও করো, তাওয়াক্কুলও করো।”

আবু মুহাম্মদ ইবনে মানাজিল বলেন, “পরিশ্রম করার পাশাপাশি তাওয়াক্কুল করা এক কোণে সরে গিয়ে ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।” খাওয়া-দাওয়ায় মধ্যপন্থা রক্ষা করা উচিত। দুর্বলতা আনে এত বেশি খাওয়া উচিত নয়। আবার ইবাদত করতে না পারার মতো উপবাসও করা উচিত নয়। আউলিয়ায়ে কেরামের অন্যতম শাহ নকশবন্দ (কুদ্দিসা সিররুহু) বলেন, “ভালো খাও, ভালো কাজ করো!” মোট কথা, ইবাদত ও ভালো কাজে সহায়ক প্রতিটি জিনিসই ভালো ও বরকতময়। প্রতিটি ভালো কাজে নিয়তের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। ভালো নিয়ত না থাকলে সে কাজ করা উচিত নয়।

যারা ইসলামের অনুসরণ করে না এবং যারা বিদআত ও গুনাহে লিপ্ত, তাদের থেকে দূরে থাকা উচিত এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করা উচিত নয়। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “হিকমত দশ ভাগ। এর নয় ভাগ নির্জনতায় (উজলতে), আর এক ভাগ কম কথা বলায়।”

এমন লোকদের সঙ্গে কেবল প্রয়োজন পরিমাণ মেলামেশা করা উচিত। আমোদ-ফুর্তির সময় মৃত্যুর পরে। নেককার, পবিত্র মুসলমানদের (রহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাইন) সঙ্গে মেলামেশা করা, তাঁদের উপকারে আসা এবং তাঁদের থেকে উপকৃত হওয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয়, অনর্থক কথায় সময় নষ্ট করা উচিত নয়।

ভালো-মন্দ সবার সঙ্গে হাসিমুখে আচরণ করা উচিত। ফিতনা সৃষ্টি করা, শত্রু তৈরি করা উচিত নয়। হাফেজ শিরাজির এই কথা মেনে চলা উচিত: “বন্ধুদের সত্য কথা বলবে, আর শত্রুদের সঙ্গে হাসিমুখে ও মিষ্টি কথায় আচরণ করবে।” যারা ক্ষমা চায়, তাদের ক্ষমা করা উচিত। সবার সঙ্গে সদাচরণ করা উচিত। কারও কথার বিরোধিতা করা, তর্ক করা উচিত নয়। সবার সঙ্গে নরম সুরে কথা বলা উচিত, কর্কশভাবে নয়।

শাইখ আবদুল্লাহ বায়াল (কুদ্দিসা সিররুহু) বলেন, “তাসাউফ নামাজ, রোজা ও রাত জেগে ইবাদত করা নয়। এগুলো করা প্রত্যেক মানুষের বন্দেগির দায়িত্ব। তাসাউফ হলো মানুষকে কষ্ট না দেওয়া। যে এটি অর্জন করেছে, সে লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে (ওয়াসিল হয়েছে)।”

হযরত মুহাম্মদ ইবনে সালিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, আউলিয়াকে অন্য মানুষ থেকে কীভাবে আলাদা করে চেনা যায়। তিনি বললেন, “তাঁদের কথার কোমলতা, স্বভাবের সৌন্দর্য, মুখের হাসি, অনুগ্রহের প্রাচুর্য, কথা বলার সময় আপত্তি না করা, ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করা এবং সবার প্রতি দয়ালু হওয়া থেকে তা বোঝা যায়।”

আবু আহমদ মাক্কারিও বলেন, “ফুতুওয়াত (মহানুভবতা) মানে যার প্রতি তুমি অসন্তুষ্ট তার উপকার করা, যাকে তুমি ভালোবাসো না তার প্রতি অনুগ্রহ করা এবং যে তোমাকে বিরক্ত করে তার প্রতি হাসিমুখ থাকা।”

কম কথা বলা, কম ঘুমানো ও কম হাসা উচিত। অট্টহাসি অন্তরকে অন্ধকার করে দেয়। পরিশ্রম করা উচিত, কিন্তু তার প্রতিদান আল্লাহ তাআলার কাছেই আশা করা উচিত। তাঁর আদেশ পালনে আনন্দ অনুভব করা উচিত। কেবল তাঁর ওপর ভরসা করলে তিনি প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে দেন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যে কেবল আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেন এবং সকল মানুষকে তার সাহায্যকারী বানিয়ে দেন।”

ইয়াহইয়া ইবনে মুআজ রাজি বলেন, “তুমি আল্লাহ তাআলাকে যতটা ভালোবাসবে, সবাই তোমাকে ততটাই ভালোবাসবে। তুমি আল্লাহ তাআলাকে যতটা ভয় করবে, সবাই তোমাকে ততটাই ভয় করবে। তুমি আল্লাহ তাআলার যতটা বন্দেগি করবে, সবাই তোমাকে ততটাই সাহায্য করবে। নিজের স্বার্থের পেছনে ছুটো না।”

আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ রাশি (রহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি) বলেন, “আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মাঝে সবচেয়ে বড় পর্দা হলো মানুষের নিজের নফসের কথা ভাবা এবং নিজের মতোই অক্ষম এক বান্দার ওপর ভরসা করা। মানুষের নয়, আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা লাভের কথাই ভাবা উচিত।” পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে মিষ্টভাষী ও হাসিমুখ হওয়া উচিত। তাদের হক আদায় করার মতো সময় তাদের মাঝে থাকা উচিত। তবে তাদের প্রতি আসক্তি যেন আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে না পৌঁছায়।

দ্বীনি বিষয়ে অজ্ঞ ও ফাসিক ধর্মীয় লোকদের কাছে পরামর্শ চাওয়া উচিত নয়। দুনিয়াসক্ত লোকদের সঙ্গে থাকা উচিত নয়। প্রতিটি কাজে সুন্নতের অনুসরণ করা এবং বিদআত থেকে বেঁচে থাকা উচিত। আনন্দের সময় ইসলামের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং কষ্টের মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি কষ্টের সঙ্গে যে স্বস্তি আছে, তা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আনন্দে ও দুঃখে অবস্থা বদলানো উচিত নয়; প্রাচুর্যে ও অভাবে একই অবস্থায় থাকা উচিত। এমনকি অভাবে স্বস্তি এবং প্রাচুর্যে অস্বস্তি অনুভব করা উচিত। ঘটনার পরিবর্তন যেন মানুষকে পরিবর্তন না করে।

“যার পরিবার বড়, রিজিক কম, অথচ সে নামাজ ভালোভাবে আদায় করে এবং গিবত করে না, সে কিয়ামতের দিন আমার পাশে থাকবে” হাদীস শরীফ

কারও দোষের দিকে তাকানো উচিত নয়, বরং নিজের দোষ দেখা উচিত। নিজেকে কোনো একজন মুসলমানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ মনে করা উচিত নয়। প্রত্যেক মুসলমানকে নিজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা উচিত। প্রত্যেক মুসলমানের দোয়ার বরকতে সৌভাগ্য লাভ হতে পারে বলে বিশ্বাস করা উচিত। যাদের হক নিজের ওপর আছে, তাদের কাছে গোলামের মতো থাকা উচিত। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তিনটি কাজ যে মুসলমান করে, তার ঈমান পূর্ণ: নিজের পরিবারের সেবা করা, দরিদ্রদের মাঝে বসা (ভিক্ষুকদের মাঝে নয়) এবং নিজের খাদেমের সঙ্গে একত্রে খাওয়া।” এই তিনটি যে মুমিনদের আলামত, তা পবিত্র কুরআনে জানানো হয়েছে। সালাফে সালেহিনের অবস্থা জানা এবং তাঁদের মতো হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কারও গিবত করা উচিত নয়, গিবতকারীকে বাধা দেওয়া উচিত। (কারও অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে – কথাটি সত্য হলে গিবত। মিথ্যা হলে অপবাদ। দুটিই কবিরা গুনাহ।) আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকারকে অভ্যাসে পরিণত করা উচিত।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যার পরিবার বড়, রিজিক কম, অথচ সে নামাজ ভালোভাবে আদায় করে এবং গিবত করে না, সে কিয়ামতের দিন আমার পাশে থাকবে।” মুসলমান তার মুসলমান ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে, তাকে আনন্দিত করে। মহানবী ইরশাদ করেন, “মুসলমান মুসলমানের ভাই। তারা একে অপরকে কষ্ট দেয় না, দুঃখ দেয় না। যে তার দ্বীনি ভাইয়ের কোনো কাজে সাহায্য করে, আল্লাহ তাআলাও তার কাজ সহজ করে দেন। কেউ কোনো মুসলমানের কষ্ট দূর করে তাকে আনন্দিত করলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে তাকে কষ্ট থেকে মুক্তি দেবেন। কেউ কোনো মুসলমানের দোষত্রুটি গোপন রাখলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।” “যে তার দ্বীনি ভাইয়ের সাহায্যকারী হয়, আল্লাহ তাআলাও তার সাহায্যকারী হন।”

“আল্লাহ তাআলা তাঁর কিছু বান্দাকে অন্য বান্দাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য, তাদের সাহায্যকারী হওয়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন। যাদের প্রয়োজন আছে, তারা এঁদের কাছে আসে। এঁদের জন্য আখিরাতে আজাবের কোনো ভয় থাকবে না।”

“যে তার দ্বীনি ভাইয়ের কোনো কাজ করে দিতে যায়, তার প্রতিটি পদক্ষেপে বহু গুনাহ ক্ষমা করা হয় এবং সত্তরটি সওয়াব দেওয়া হয়। কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে। কাজটি সম্পন্ন হলে তার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এই কাজ করতে গিয়ে সে মারা গেলে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে।”

“যে তার দ্বীনি ভাইয়ের স্বস্তি লাভ কিংবা কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য সরকারি লোকদের কাছে গিয়ে চেষ্টা করে, কিয়ামতের দিন পুলসিরাতের ওপর যখন সবার পা পিছলে যাবে, তখন সে যেন দ্রুত পার হতে পারে, সে জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করবেন।”

“দ্বীনি ভাইয়ের প্রতি হাসিমুখ হওয়া, তাকে ভালো বিষয় শেখানো, তাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, অপরিচিত লোককে তার খোঁজা জায়গা দেখিয়ে দেওয়া, রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড় এবং এ ধরনের ক্ষতিকর, কুৎসিত ও নোংরা জিনিস সরিয়ে ফেলা, অন্যকে পানি পান করানো – এসবই সদকা” হাদীস শরীফ

“আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো পোশাক দিয়ে, আহার করিয়ে কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজন পূরণ করে একজন মুমিনকে আনন্দিত করা।”

“কেউ কোনো মুমিনের উপকার করলে আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন। এই ফেরেশতা সর্বদা ইবাদত করতে থাকেন। তাঁর ইবাদতের সওয়াব সেই ব্যক্তিকে দেওয়া হয়। সেই ব্যক্তি মারা গিয়ে কবরে শায়িত হলে এই ফেরেশতা নূরানি ও মনোরম রূপে তার কবরে আসেন। ফেরেশতাকে দেখে সে স্বস্তি পায়, আনন্দিত হয়। সে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কে?’ ফেরেশতা বলেন, ‘আমি সেই উপকার, যা তুমি অমুক ব্যক্তির প্রতি করেছিলে, এবং সেই আনন্দ, যা তুমি তার অন্তরে দিয়েছিলে। আল্লাহ তাআলা আমাকে আজ তোমাকে আনন্দ দিতে, তোমার জন্য শাফায়াত করতে এবং জান্নাতে তোমার স্থান তোমাকে দেখাতে পাঠিয়েছেন।’”

“মানুষ তার উত্তম চরিত্রের কারণে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। (নফল) ইবাদত মানুষকে এই মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে না। মন্দ চরিত্র মানুষকে জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের গহ্বরে টেনে নেয়।” “সালাম দেওয়ার সময় যে হাসিমুখ থাকে, তাকে সদকাদাতাদের প্রাপ্ত সওয়াব দেওয়া হয়।”

“দ্বীনি ভাইয়ের প্রতি হাসিমুখ হওয়া, তাকে ভালো বিষয় শেখানো, তাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, অপরিচিত লোককে তার খোঁজা জায়গা দেখিয়ে দেওয়া, রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড় এবং এ ধরনের ক্ষতিকর, কুৎসিত ও নোংরা জিনিস সরিয়ে ফেলা, অন্যকে পানি পান করানো – এসবই সদকা।”

“জান্নাতে এমন প্রাসাদ আছে, যার ভেতরে যে থাকে, সে যেখানে ইচ্ছা দেখতে পায় এবং যেখানে ইচ্ছা নিজেকে দেখাতে পারে।” আবু মালিক আশআরি জিজ্ঞেস করলেন, “এমন প্রাসাদ কাদের দেওয়া হবে?” মহানবী ইরশাদ করলেন, “যারা মিষ্টভাষী, দানশীল এবং সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও মহত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করে ও তাঁর কাছে মিনতি জানায়, তাদের দেওয়া হবে।”

প্রকৃত মুসলমান কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। জাদু, কুলক্ষণ, গণনা, মন্ত্র, পবিত্র কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লেখা তাবিজ, নীল পুঁতি, গণকবিদ্যা এবং এ ধরনের বিষয়কে, সেগুলো অবশ্যই কাজ করবে – এমন ধারণাকে, কবরে মোমবাতি জ্বালানো এবং ধাতুর তার ও সুতা বাঁধাকে সে কোনো গুরুত্ব দেয় না; আর নিজেকে কারামতের অধিকারী বলে দাবিকারী প্রতারকদের ধোঁকায় পড়ে না। এসব বাতিল ও বিকৃত বিষয়ের বেশির ভাগই মূলত অন্য ধর্ম থেকে আমাদের মাঝে এসেছে। কিছু দ্বীনদার লোকের কাছে যারা “কারামত” আশা করে, তাদের উদ্দেশে মহান ইসলামি আলেম ইমাম রব্বানি (রাহিমাহুল্লাহু তাআলা) বলেন, “মানুষ দ্বীনদার লোকদের কাছে কারামত আশা করে। তাঁদের কারও কারও কারামত নেই, অথচ তাঁরা অন্যদের চেয়ে আল্লাহ তাআলার বেশি নিকটবর্তী। সবচেয়ে বড় কারামত হলো ইসলাম শেখা এবং তদনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারা।”

অন্য ধর্মের হলেও মানুষের সঙ্গে সর্বদা মিষ্টি ভাষায় ও সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলার আদেশ পবিত্র কুরআনে দেওয়া হয়েছে। অমুসলিমের মুখের ওপর “কাফির”, “ধর্মহীন” বলে তার মনে কষ্ট দেওয়া যে গুনাহ এবং এমন কথা যে বলে তাকে শাস্তি দেওয়া আবশ্যক, তা ফিকহের কিতাবসমূহে লেখা আছে। উদ্দেশ্য হলো সবার কাছে ইসলাম ধর্মের মহত্ত্ব তুলে ধরা। এই জিহাদও কেবল মিষ্টি ভাষা, সবর, ইলম ও ঈমানের মাধ্যমেই হয়। কাউকে কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করাতে চাইলে প্রথমে নিজে তাতে বিশ্বাসী হওয়া শর্ত। আর মুমিন কখনো সবর হারায় না এবং নিজের বিশ্বাস বুঝিয়ে বলতে কষ্ট বোধ করে না। ইসলাম ধর্মের মতো এত স্পষ্ট ও যুক্তিসংগত আর কোনো ধর্ম নেই। এই ধর্মই যে একমাত্র সত্য ধর্ম, তা সহজেই প্রমাণ করা যায়। সংক্ষেপে, প্রকৃত মুসলমান সকল উত্তম স্বভাবের অধিকারী, গাম্ভীর্যপূর্ণ, সচ্চরিত্র, দৈহিক ও আত্মিকভাবে পবিত্র এবং সব দিক থেকে আস্থার যোগ্য একজন পরিপূর্ণ মানুষ। সকল মানুষ যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত, তবে দুনিয়ায় না মন্দ থাকত, না প্রতারণা, না যুদ্ধ, না সহিংসতা, না জুলুম। তাই পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হওয়ার চেষ্টা করা এবং ইসলামের মূলনীতি ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে সারা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দেওয়া সকল মুসলমানের কাঁধে অর্পিত দায়িত্ব।