আমার প্রিয় নবী

তাঁর শৈশব

দুধমায়ের কাছে অর্পণ

মা আমিনা তাঁর নূরানি সন্তানকে কোলে নিলে স্বামী হযরত আবদুল্লাহর ইন্তেকালের বেদনা যেন ভুলে গেলেন। মা নয় দিন মহানবীকে দুধ পান করানোর পর আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা খাতুন কয়েক দিন তাঁর দুধমায়ের দায়িত্ব পালন করেন। সুওয়াইবা খাতুন এর আগে হযরত হামজাকে এবং পরে আবু সালামাকেও দুধ পান করিয়েছিলেন। হাফিজ ইবনে জাজারি বলেন, “আবু লাহাবকে স্বপ্নে দেখে তার অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, ‘আমি কবরের আজাব ভোগ করছি। তবে প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখের রাতগুলোতে আমার আজাব হালকা হয়। তখন আমার দুই আঙুলের ফাঁক দিয়ে বের হওয়া ঠান্ডা পানি চুষে আমি আরাম পাই। কারণ যে রাতে রাসূলুল্লাহ দুনিয়ায় আসেন, সে রাতে সুওয়াইবা নামে আমার দাসী আমাকে এই সুসংবাদ দিয়েছিল। আমিও আনন্দে তাকে আজাদ করে দিয়েছিলাম এবং তাকে রাসূলুল্লাহর দুধমা হওয়ার আদেশ দিয়েছিলাম। এ কারণেই এই রাতগুলোতে আমার আজাব হালকা হয়।’” সে যুগে মক্কাবাসীর রীতি ছিল সন্তানদের দুধমায়ের কাছে দেওয়া। আবহাওয়া ভালো ও পানি মিষ্টি – আশপাশের এমন পার্বত্য চারণভূমিতে পাঠানো শিশুরা কিছুকাল তাদের দুধমায়ের কাছে থাকত। এর কারণ ছিল মক্কার উষ্ণ আবহাওয়া। প্রতি বছর এ উদ্দেশ্যে বহু নারী মক্কায় আসত। তারা প্রত্যেকে দুধ পান করানোর জন্য একটি করে শিশু নিয়ে যেত। শিশুদের বড় করে ফিরিয়ে দিলে তারা অনেক পারিশ্রমিক ও উপহার পেত। মহানবী যে বছর জন্মগ্রহণ করেন, সে বছরও পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বনু সাদ গোত্রের বহু নারী দুধমা হওয়ার নিয়তে মক্কায় এল। তাদের প্রত্যেকেই দুধ পান করানোর জন্য একটি করে শিশু নিয়েছিল। মক্কার আশপাশের গোত্রগুলোর মধ্যে বনু সাদ গোত্র মর্যাদা, দানশীলতা, সাহসিকতা, বিনয় এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলার জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত ছিল। কুরাইশ গোত্রের নেতৃস্থানীয়রা চাইত, তাদের সন্তানদের বেশির ভাগ যেন এই গোত্রের কাছেই দেওয়া হয়। সে বছর বনু সাদ গোত্রের এলাকায় তীব্র খরা ও দুর্ভিক্ষ চলছিল। এই গোত্রের হালিমা খাতুন সে অবস্থার কথা এভাবে বর্ণনা করেন, “সে বছর আমি মাঠে মাঠে ঘুরে ঘাস কুড়াতাম, আর তা পাওয়ার জন্যও আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করতাম। কখনো কখনো তিন দিন পেরিয়ে গেলেও মুখে কিছু দিতে পারতাম না। এ অবস্থায় আমার একটি সন্তান হলো। একদিকে ক্ষুধা, অন্যদিকে প্রসবের কষ্ট। এমন মুহূর্তও আসত, যখন ক্ষুধায় জমিন ও আসমান, রাত ও দিনের পার্থক্য করতে পারতাম না। এক রাতে আমি মরুভূমিতে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি আমাকে দুধের চেয়েও সাদা এক পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘এই পানি পান করো।’ আমি তৃপ্ত হওয়া পর্যন্ত পান করলাম। তারপর তিনি আবার পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করলেন। আমি পান করেই চললাম; তা ছিল মধুর চেয়েও মিষ্টি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে হালিমা! তোমার দুধ প্রচুর হোক! আমাকে কি চিনতে পেরেছ?’ আমি চিনতে পারিনি বলায় তিনি বললেন, ‘কষ্টের দিনে তুমি যে হামদ ও শোকর আদায় করেছিলে, আমি সেই হামদ ও শোকর। হে হালিমা! মক্কায় যাও। সেখানে এক “নূর” তোমার সঙ্গী হবে, তুমি বরকতে পরিপূর্ণ হবে। এই স্বপ্নের কথা কাউকে বোলো না!’ জেগে উঠে দেখলাম, আমার বুক দুধে ভরে গেছে, কষ্ট ও ক্ষুধাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।” সে বছর দুর্ভিক্ষের কারণে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শিশুদের দুধ পান করিয়ে কষ্ট দূর করার আশায় অন্যান্য বছরের তুলনায় আরও বেশি দুধমা মক্কায় এসেছিল।

“আমরা খেলাধুলার জন্য সৃষ্ট হইনি” হাদীস শরীফ

বনু সাদের মরুভূমি

তারা সবাই ধনী পরিবারের শিশুদের নেওয়ার জন্য ব্যস্ত ছিল। তাড়াহুড়া করে আসা এই নারীরা প্রত্যেকে একটি করে শিশু নিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু মহানবী ইয়াতিম হওয়ায় বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে না ভেবে তারা তাঁকে নিতে আগ্রহ দেখায়নি। এই নারীদের মধ্যে সতীত্ব, পবিত্রতা, হিলম অর্থাৎ কোমলতা, লজ্জাশীলতা ও উত্তম চরিত্রের জন্য পরিচিত হালিমা খাতুনও ছিলেন। হালিমা খাতুন ও তাঁর স্বামীর বাহন পশুটি দুর্বল হওয়ায় তাঁরা মক্কায় পৌঁছাতে দেরি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এই দেরির কারণেই তাঁরা যা খুঁজছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু লাভ করেছিলেন। মক্কায় ঘুরে তাঁরা দেখলেন, ধনী পরিবারের শিশুদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু খালি হাতে ফিরে যেতেও তাঁরা চাইছিলেন না। একটি শিশু নিয়ে ফেরাই তখন তাঁদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠেছিল।

অবশেষে শ্রদ্ধা জাগানো, অত্যন্ত মায়াবী চেহারার এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের দেখা হলো। তিনি ছিলেন মক্কার নেতা আবদুল মুত্তালিব। তাঁদের ইচ্ছার কথা জেনে তিনি তাঁর নাতিকে নিয়ে যেতে বললেন এবং জানালেন, এর ফলে তাঁরা বিরাট সৌভাগ্য ও সুখ লাভ করবেন। আবদুল মুত্তালিবের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা তাঁদের আকৃষ্ট করল। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। তারপর বৃদ্ধ দাদা হালিমা খাতুনকে হযরত আমিনার ঘরে নিয়ে গেলেন।

হালিমা খাতুন বর্ণনা করেন, “শিশুটির শিয়রে পৌঁছে দেখলাম, তিনি কাঁথায় জড়ানো অবস্থায় সবুজ রেশমি এক চাদরের ওপর অঘোরে ঘুমাচ্ছেন, আর চারদিকে মেশকের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম; মুহূর্তেই তাঁর প্রতি এত মায়া জন্মাল যে, তাঁকে জাগাতে মন চাইল না। তাঁর বুকে হাত রাখতেই তিনি জেগে উঠলেন, আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। আর আমি সেই হাসিতে মুগ্ধ হয়ে আত্মহারা হয়ে গেলাম। তারপর এমন সুন্দর ও বরকতময় শিশুকে তাঁর মা হয়তো আমাকে দেবেন না – এই ভেবে তাঁর মুখ ঢেকে তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিলাম। আমার ডান স্তন দিলাম, তিনি পান করতে লাগলেন। বাম স্তন দিলাম, পান করলেন না। আবদুল মুত্তালিব আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমার জন্য সুসংবাদ! নারীদের মধ্যে তোমার মতো নিয়ামত আর কেউ লাভ করেনি!’1

প্রিয় সন্তানকে আমার হাতে তুলে দিয়ে মা আমিনা বললেন, ‘হে হালিমা! তিন দিন আগে আমি একটি আওয়াজ শুনেছি: যে নারী আমার পুত্রকে দুধ পান করাবে, সে বনু সাদ গোত্রের আবু জুয়াইবের বংশের।’ তখন আমি উত্তর দিলাম, ‘আমি বনু সাদ গোত্রেরই মেয়ে, আর আমার পিতার কুনিয়াত আবু জুয়াইব।’”

হালিমা খাতুন আরও বর্ণনা করেন, “মা আমিনা আমাকে আরও বহু ঘটনার কথা বললেন এবং কিছু ওসিয়ত করলেন। আমিও মক্কায় আসার আগে দেখা আমার স্বপ্নের কথা তাঁকে জানালাম; আর আসার পথে ডান দিক ও বাম দিক থেকে যে আওয়াজ শুনেছিলাম, তা-ও জানালাম: ‘তোমার জন্য সুসংবাদ, হে হালিমা! চোখ ধাঁধানো ও জগৎসমূহ আলোকিত করা সেই নূরকে দুধ পান করানোর সৌভাগ্য তোমার হবে।’”

হালিমা খাতুন বলেন, “মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে নিয়ে আমি হযরত আমিনার ঘর থেকে বের হলাম। স্বামীর কাছে এলাম। তিনিও আমার কোলের শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে আত্মহারা হয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘হে হালিমা! আজ পর্যন্ত এমন সুন্দর মুখ আমি দেখিনি!’ আর তাঁকে নেওয়ামাত্র আমরা যে বরকত লাভ করলাম, তা দেখে বললেন, ‘হে হালিমা! জেনে রাখো, তুমি অত্যন্ত বরকতময় ও উঁচু মর্যাদার এক শিশুকে নিয়েছ।’ আমিও উত্তর দিলাম, ‘আল্লাহর কসম, আমি তো এটাই চেয়েছিলাম; আমার চাওয়া পূরণ হয়েছে।’”

হালিমা খাতুন ও তাঁর স্বামী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে নিয়ে মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করার মুহূর্ত থেকেই তাঁর বরকত লাভ করতে লাগলেন। আগে যে দুর্বল গাধাটি জোরে চলতে পারত না, সেটি এখন তেজি আরবি ঘোড়ার মতো ছুটতে লাগল। সঙ্গে আসা কাফেলা তাঁদের আগে রওনা হয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও তাঁরা কাফেলাকে ধরে ফেললেন এবং পেছনে ফেলে গেলেন। বনু সাদের এলাকায় পৌঁছানোর পর তাঁরা অভূতপূর্ব প্রাচুর্য ও বরকত লাভ করলেন। আগে যে পশুগুলো অল্প দুধ দিত, সেগুলোর ওলান দুধে ভরে উপচে পড়তে লাগল। এ দেখে প্রতিবেশীরা অবাক হলো এবং স্পষ্ট বুঝতে পারল, দুধ পান করানোর জন্য নেওয়া শিশুটির কারণেই এমন হয়েছে। মহানবী দুধমা হালিমা খাতুনের কেবল ডান স্তনই পান করতেন।

“আমার পূর্বপুরুষদের কেউই কখনো জিনা করেননি। আল্লাহ তাআলা আমাকে পবিত্র, উত্তম পিতা এবং পবিত্র মাতাদের থেকে দুনিয়ায় এনেছেন” হাদীস শরীফ

বাম স্তনটি তিনি দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। দুই মাস বয়সে তিনি হামাগুড়ি দিতে শুরু করলেন। তিন মাস বয়সে দাঁড়াতে পারতেন, চার মাস বয়সে দেয়াল ধরে হাঁটতেন। পাঁচ মাস বয়সে হাঁটতে শিখলেন, ছয় মাস বয়সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন। সাত মাস বয়সে সব দিকে চলাফেরা করতে লাগলেন। আট মাস বয়সে বোঝা যায় এমনভাবে, আর নয় মাস বয়সে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কথা বলতে শুরু করলেন। দশ মাস বয়সে তির ছুড়তে শুরু করলেন।

হালিমা খাতুন বর্ণনা করেছেন, “তিনি যখন প্রথম কথা বলতে শুরু করলেন, তাঁর প্রথম কথা ছিল: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। ওয়াল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।’ সেদিনের পর থেকে তিনি আল্লাহ তাআলার নাম না নিয়ে কোনো কিছুর দিকে হাত বাড়াননি। বাম হাতে কিছু খেতেন না। হাঁটতে শুরু করার পর শিশুরা যেখানে খেলত, সেখান থেকে দূরে থাকতেন এবং তাদের বলতেন, ‘আমরা এর জন্য সৃষ্ট হইনি।’ প্রতিদিন সূর্যের আলোর মতো এক নূর তাঁকে ঢেকে ফেলত, তারপর আবার সরে যেত। তিনি চাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন; চাঁদের দিকে ইশারা করলেই চাঁদ নড়ে উঠত।”

খরার কারণে তাঁরা ভীষণ কষ্টে পড়লেন এবং একবার বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বের হলেন। মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দোয়া করলেন এবং তাঁর খাতিরে প্রচুর বৃষ্টি ও বরকত লাভ করলেন। হালিমা খাতুন বর্ণনা করেন, “মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম দুই বছরে পা দিলে আমি তাঁকে দুধ ছাড়ালাম। তারপর তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য স্বামীর সঙ্গে মক্কায় গেলাম। কিন্তু তাঁর কারণে আমরা এমন বরকত লাভ করেছিলাম যে, তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, তাঁর চেহারা মুবারক না দেখা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন মনে হচ্ছিল। আমি তাঁর অবস্থার কথা তাঁর মাকে জানালাম। মা আমিনা বললেন, ‘আমার পুত্রের বিরাট শান রয়েছে।’ আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম, এর চেয়ে বরকতময় কাউকে আমি দেখিনি।’ তারপর নানা অজুহাত দেখিয়ে মা আমিনার কাছে অনুরোধ করলাম, শিশুটি যেন আরও কিছুদিন আমাদের কাছে থাকে। মা আমিনা আমাদের মন ভাঙলেন না এবং শিশুটিকে আমাদের কাছে রাখার অনুমতি দিলেন। তাঁকে নিয়ে আমরা আবার আমাদের গোত্রে ফিরে এলাম। এর বদৌলতে আমাদের ঘর বরকতে ভরে গেল, আমাদের ধনসম্পদ, সম্পত্তি ও সুনাম বেড়ে গেল। আমরা অগণিত নিয়ামত লাভ করলাম।”2

মাথা মুবারকের ওপর এক খণ্ড মেঘ

হালিমা খাতুন বর্ণনা করেন, “একদিন সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘দিনের বেলা আমার ভাইবোনদের দেখা যায় না। এর কারণ কী?’ আমি বললাম, ‘তারা ভেড়া চরাতে যায়। রাত হলে তবেই ঘরে ফেরে।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমাকেও তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিন। আমিও ভেড়া চরাব।’ আমি নানা অজুহাত দেখালাম। শেষে তাঁর মন রক্ষার জন্য বললাম, ‘ঠিক আছে।’

পরদিন আমি তাঁর চুল মুবারক আঁচড়ে দিলাম, কাপড় পরিয়ে দুধভাইবোনদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম।

কয়েক দিন তিনি তাদের সঙ্গে আসা-যাওয়া করলেন। একদিন দুধবোন শায়মা মাঠ থেকে ফিরলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার নয়নের মণি, আমার পুত্র মুহাম্মদ কোথায়?’ সে বলল, ‘মরুভূমিতে।’ আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার কলিজার টুকরা এই গরম কীভাবে সহ্য করছে?’, শায়মা উত্তর দিল, ‘মা গো! তাঁর কখনো কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ তাঁর মাথা মুবারকের ওপর এক খণ্ড মেঘ সবসময় তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলে; এভাবে তিনি সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পান।’ আমি বললাম, ‘এসব কী বলছ? তুমি যা বলছ, তা কি সত্যিই ঠিক?’ তখন সে কসম খেল। তবেই আমি নিশ্চিন্ত হলাম।

বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ হওয়া (শাক্কে সদর)

আরেক দিন দুপুরবেলা তাঁর দুধভাই দামরা আমার কাছে এসে বলল, ‘মা গো! তাড়াতাড়ি দৌড়ে আসুন!… আমি আমার কুরাইশি ভাইয়ের সঙ্গে ভেড়া চরাচ্ছিলাম। হঠাৎ সবুজ পোশাক পরা তিনজন লোক এল। তারা আমার ভাইকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চলে গেল। তাঁকে চিত করে শুইয়ে ছুরি দিয়ে তাঁর পেট চিরে ফেলল। আমি যখন আপনাদের খবর দিতে এলাম, তখনো তারা সেখানে ছিল। আমার ভাই বেঁচে আছেন কি না, জানি না।’ হালিমা খাতুন ঘটনার বাকি অংশ এভাবে বর্ণনা করেছেন: সেই মুহূর্তে আমার মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল। আমরা দ্রুত সেখানে পৌঁছালাম এবং তাঁকে দেখতে পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চেহারা মুবারকে ও মাথা মুবারকে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আমার নয়নের মণি! হে জগৎসমূহের রহমত আমার পুত্র! এ কেমন অবস্থা? তোমার কী হয়েছে? কে তোমাকে কষ্ট দিয়েছে?’

তিনি বললেন, ’ঘর থেকে বের হওয়ার পর আমি সবুজ পোশাক পরা দুজন ব্যক্তিকে দেখলাম। একজনের হাতে ছিল রুপার একটি বদনা, অন্যজনের হাতে সবুজ পান্নার একটি গামলা। গামলাটি বরফের চেয়েও সাদা কিছু একটা দিয়ে ভরা ছিল। তাঁরা আমাকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেলেন। একজন আমাকে চিত করে শোয়ালেন। আমার চোখের সামনেই তিনি আমার বুক থেকে নাভি পর্যন্ত চিরে ফেললেন। আমি কোনো ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করিনি। তাঁরা হাত ঢুকিয়ে ভেতরে যা ছিল, সব বের করলেন। সেগুলো ওই সাদা জিনিস দিয়ে ধুয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। তারপর একজন অন্যজনকে বললেন, “ওঠো, এবার আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে দাও।” এ কথা বলে তিনি হাত ঢুকিয়ে আমার হৃৎপিণ্ড বের করলেন। সেটিকে দুই ভাগ করলেন এবং ভেতর থেকে একটি কালো জিনিস বের করে ফেলে দিলেন। আর বললেন, “আপনার দেহে শয়তানের অংশ ছিল এটুকুই। আমরা তা বের করে ফেলে দিয়েছি। হে আল্লাহ তাআলার প্রিয়তম! আমরা আপনাকে ওয়াসওয়াসা3 ও শয়তানের চক্রান্ত থেকে নিরাপদ করে দিলাম।” তারপর তাঁরা তাঁদের কাছে থাকা কোমল ও মোলায়েম কিছু একটা দিয়ে আমার হৃৎপিণ্ড ভরে দিলেন। নূরের একটি মোহর দিয়ে তাতে মোহর এঁটে দিলেন। সেই মোহরের শীতলতা এখনো আমি আমার সমস্ত অঙ্গে অনুভব করছি। তাঁদের একজন বিদীর্ণ স্থানে হাত রাখতেই আমার ক্ষত সেরে গেল। তারপর তাঁরা আমার উম্মতের দশজনের সঙ্গে আমাকে ওজন করলেন; আমি ভারী হলাম। এক হাজারজনের সঙ্গে ওজন করলেন; এবারও আমি ভারী হলাম। তখন তাঁদের একজন অন্যজনকে বললেন, “এবার তাঁকে ওজন করা বন্ধ করো। আল্লাহর কসম, তুমি যদি তাঁকে তাঁর সমগ্র উম্মতের সঙ্গেও ওজন করো, তবুও তিনিই ভারী হবেন।” তারপর তাঁরা প্রত্যেকে আমার হাতে ও মুখে চুমু খেলেন এবং আমাকে এখানে রেখে চলে গেলেন।’ বিদীর্ণ হওয়ার চিহ্ন তাঁর বক্ষ মুবারকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।”4

আমাদের প্রিয় নবীর জীবনে ঘটে যাওয়া এবং পবিত্র কুরআনের সূরা ইনশিরাহের প্রথম আয়াতে উল্লিখিত এই ঘটনাকে “শাক্কে সদর”, অর্থাৎ বক্ষ বিদীর্ণ হওয়া বলা হয়।

মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে নবুয়তের কথা জানানোর পর সাহাবায়ে কেরামের কয়েকজন বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কাছে আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?” তখন তিনি ইরশাদ করলেন, “আমি আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহিমের দোয়া। আমি আমার ভাই ঈসার সুসংবাদ!

আর আমার মায়ের কাছে আমি তাঁর স্বপ্ন। আমাকে গর্ভে ধারণের সময় তিনি দেখেছিলেন, তাঁর থেকে এক নূর বের হয়ে শামের প্রাসাদগুলো আলোকিত করেছে… আমি বনু সাদ ইবনে বকরের কাছে দুধ পান করে লালিত-পালিত হয়েছি।”

চার বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর হালিমা খাতুন তাঁকে মক্কায় নিয়ে এসে তাঁর মায়ের কাছে অর্পণ করলেন। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব হালিমা খাতুনকে অনেক মূল্যবান উপহার দিয়ে অনুগ্রহ করলেন। তাঁকে মক্কায় রেখে যাওয়ার সময় হালিমা খাতুন বিচ্ছেদের বেদনা এই কথাগুলোর মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন, “আমার প্রাণ ও হৃদয়ও যেন তাঁর সঙ্গেই রয়ে গেল।”

“মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যতদিন দুধ পান করিয়েছি, তাঁর প্রতি আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলাম। তিনি কখনো কোনো কিছু নোংরা করতেন না। দিনে একবার ও রাতে একবার প্রস্রাব করতেন, তারপর আবার সেই সময় না আসা পর্যন্ত আর প্রস্রাব করতেন না” হালিমা খাতুন

সম্মানিত মায়ের ইন্তেকাল

আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছয় বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের কাছে বড় হলেন। ছয় বছর বয়সে তিনি তাঁর মা এবং উম্মে আইমান নামের এক দাসীর সঙ্গে আত্মীয়স্বজনকে দেখতে ও পিতা আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করতে মদিনায় গেলেন।

সেখানে তাঁরা এক মাস থাকলেন। মহানবী মদিনায় বনু নাজ্জারের একটি পুকুরে সাঁতার শিখলেন। এ সময় এক ইহুদি পণ্ডিত তাঁর মধ্যে নবুয়তের নিদর্শন দেখতে পেল। সে কাছে এসে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করল। তিনি “আহমদ” বললে সেই পণ্ডিত চিৎকার করে বলল, “এই শিশু আখেরি জামানার নবী হবেন!” তা ছাড়া সেখানকার আরও কয়েকজন ইহুদি পণ্ডিত তাঁর মধ্যে নবুয়তের নিদর্শন দেখতে পেয়ে তিনি যে নবী হবেন, সে কথা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল।

তাদের এসব কথা শুনে উম্মে আইমান বিষয়টি আমাদের মা হযরত আমিনাকে জানালেন। তখন তাঁর বরকতময় মা কোনো ক্ষতির আশঙ্কায় তাঁকে নিয়ে মক্কায় ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছালে আমাদের মা হযরত আমিনা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থতা বেড়ে গেল; তিনি প্রায়ই অচেতন হয়ে পড়ছিলেন।

শিয়রে দাঁড়ানো প্রিয় পুত্র মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “হে সেই ব্যক্তির পুত্র, যিনি আল্লাহ তাআলার দয়া ও সাহায্যে একশো উটের বিনিময়ে ভয়ংকর মৃত্যুর তির থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন! আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকতময় করুন। আমি স্বপ্নে যা দেখেছি, তা যদি সত্য হয়, তবে মহিমা ও অশেষ দানের অধিকারী আল্লাহ তাআলা তোমাকে আদম সন্তানদের কাছে হালাল ও হারাম জানিয়ে দেওয়ার জন্য পাঠাবেন। মহান আল্লাহ তোমাকে সেই মূর্তি ও মূর্তিপূজা থেকে হেফাজত করবেন, যা জাতিগুলোর সঙ্গে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।” তারপর তিনি এই কবিতাগুলো আবৃত্তি করলেন:

নতুন যা কিছু পুরোনো হয়, জীবিত যে মরে,
যা প্রচুর তা ফুরিয়ে যায়, চিরতরুণ কে থাকে?
আমিও মরব, তফাত শুধু এইটুকু আমার:
তোমাকে জন্ম দিয়েছি আমি – এটাই গৌরব আমার।
রেখে গেলাম পেছনে এক কল্যাণময় সন্তান,
চোখ বুজলাম আমি, প্রশান্ত আমার প্রাণ।
আমার নাম চিরকাল রয়ে যাবে মুখে মুখে,
তোমার ভালোবাসা বেঁচে থাকবে সবার বুকে।

তারপর তিনি ইন্তেকাল করলেন। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হলো। ইন্তেকালের সময় মা আমিনার বয়স ছিল বিশ বছর। উম্মে আইমান জগৎসমূহের সরদারকে সঙ্গে নিয়ে কয়েক দিনের সফর শেষে মক্কায় পৌঁছালেন এবং তাঁকে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের হাতে অর্পণ করলেন।5

তাঁর মা ও বাবা মুমিন ছিলেন

হাবিবে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিতা ও মাতা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দ্বীনের ওপর ছিলেন।6 অর্থাৎ তাঁরা মুমিন ছিলেন। ইসলামের আলেমগণ জানিয়েছেন যে, তাঁরা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দ্বীনের ওপর ছিলেন; আর মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে নবুয়তের কথা জানানোর পর তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য তাঁদের পুনর্জীবিত করা হয়েছিল, তাঁরা কালিমায়ে শাহাদাত শুনেছিলেন ও উচ্চারণ করেছিলেন এবং এভাবে এই উম্মতেরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।7

বরকতময় দাদার কাছে

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম আট বছর বয়স পর্যন্ত দাদার কাছে বড় হলেন। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মক্কায় সবার প্রিয় এবং নানা বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক এক ব্যক্তিত্ব; তিনি ছিলেন প্রতাপশালী, ধৈর্যশীল, সচ্চরিত্র, সত্যবাদী, সাহসী ও দানশীল। তিনি দরিদ্রদের খাওয়াতেন, এমনকি ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত পশুদেরও খাবার দিতেন।

তিনি আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতে বিশ্বাস করতেন। মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকতেন, জাহিলিয়াত যুগের সব ধরনের কুৎসিত প্রথা থেকে দূরে থাকতেন। মক্কায় জুলুম ও অন্যায় প্রতিরোধ করতেন এবং আগত অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন। রমজান মাসে হেরা পাহাড়ে নির্জনবাসে থাকা তাঁর অভ্যাস ছিল। শিশুদের ভালোবাসতেন ও স্নেহশীল ছিলেন বলে আবদুল মুত্তালিব তাঁর প্রিয় নাতিকে বুকে জড়িয়ে রাখতেন, দিনরাত তাঁকে কাছছাড়া করতেন না। নাতিকে তিনি গভীর ভালোবাসা ও স্নেহ দেখাতেন। কাবার ছায়ায় নিজের জন্য নির্দিষ্ট গদিতে তিনি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বসতেন; যারা বাধা দিতে চাইত, তাদের বলতেন, “আমার পুত্রকে ছেড়ে দাও, তাঁর শান অনেক উঁচু।”8 তিনি মহানবীর দাইমা উম্মে আইমানকে তাঁর ভালোভাবে দেখাশোনা করার জন্য বারবার তাগিদ দিতেন এবং বলতেন, “আমার পুত্রের ভালো করে যত্ন নিয়ো। আহলে কিতাবরা আমার পুত্র সম্পর্কে বলে, তিনি এই উম্মতের নবী হবেন।” উম্মে আইমান বলেছেন, “শৈশবে আমি তাঁকে কখনো ক্ষুধা বা পিপাসার অভিযোগ করতে দেখিনি। সকালে তিনি এক ঢোক জমজমের পানি পান করতেন। আমরা তাঁকে খাওয়াতে চাইলে তিনি বলতেন, ‘চাই না, আমার পেট ভরা।’”

আবদুল মুত্তালিব যখন ঘুমাতেন কিংবা কক্ষে একা থাকতেন, তখন নাতিকে ছাড়া আর কাউকে কাছে আসতে দিতেন না। তিনি তাঁকে স্নেহভরে বুকে জড়িয়ে ধরতেন, আদর করতেন, তাঁর কথা ও আচরণে অত্যন্ত খুশি হতেন। দস্তরখানে তাঁকে পাশে বসাতেন, কোলে তুলে নিতেন, খাবারের সবচেয়ে ভালো ও সুস্বাদু অংশটি তাঁকে খাওয়াতেন এবং নাতি না আসা পর্যন্ত দস্তরখানে বসতেন না। নাতির সম্পর্কে তিনি বহু স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বহু ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন।

একবার মক্কায় খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্ন দেখে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের হাত ধরে আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠলেন এবং দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! এই শিশুর খাতিরে বরকতময় বৃষ্টি দিয়ে আমাদের আনন্দিত করো।” তাঁর দোয়া কবুল হলো, প্রচুর বৃষ্টি হলো। সে যুগের কবিরা কবিতা লিখে এই ঘটনার কথা বর্ণনা করেছিল।

নাজরানের পাদরি

একদিন আবদুল মুত্তালিব কাবার পাশে বসে ছিলেন, এমন সময় নাজরান থেকে এক পাদরি এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। এক পর্যায়ে সে বলল, “আমরা কিতাবসমূহে পড়েছি, বনু ইসমাইল থেকে সবশেষে যে নবী আসবেন, তাঁর গুণাবলি সেখানে লেখা আছে। এই স্থান, অর্থাৎ মক্কাই তাঁর জন্মস্থান। তাঁর গুণাবলি এই এই!” – এভাবে সে একে একে সেগুলো গুনে বলতে লাগল। এ সময় আমাদের প্রিয় নবী তাঁদের কাছে এলেন। নাজরানের পাদরি মনোযোগ দিয়ে তাঁকে লক্ষ করতে লাগল; তারপর কাছে এসে তাঁর চোখ, পিঠ ও পা দেখল এবং উত্তেজিত হয়ে বলল:

“মহান আল্লাহ তোমাকে সেই মূর্তি ও মূর্তিপূজা থেকে হেফাজত করবেন, যা জাতিগুলোর সঙ্গে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে” মা আমিনা

“ইনিই তিনি। এই শিশু কি তোমার বংশের?” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “ইনি আমার পুত্র!” তখন নাজরানের পাদরি বলল, “কিতাবসমূহে আমরা যা পড়েছি, সে অনুযায়ী তাঁর পিতা জীবিত থাকার কথা নয়!” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “তিনি আমার পুত্রের পুত্র। তাঁর জন্মের আগেই, তাঁর মা যখন গর্ভবতী ছিলেন, তখনই তাঁর পিতা মারা গিয়েছিলেন।” পাদরি বলল, “এবার তুমি সত্য বললে।” এরপর আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্রদের বললেন, “তোমাদের ভাইয়ের ছেলে সম্পর্কে যা বলা হলো, তা শুনে রাখো; তাঁকে দেখেশুনে রেখো এবং ভালোভাবে রক্ষা করো।”

বরকতময় দাদার ইন্তেকাল

ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্রদের একত্র করে বললেন, “দুনিয়া থেকে আখিরাতে যাত্রার সময় আমার এসে গেছে। আমার একমাত্র চিন্তা এই ইয়াতিমকে নিয়ে। হায়, আমার আয়ু যদি দীর্ঘ হতো, তাহলে ভালোবেসে এই সেবা চালিয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু কী করার আছে? আয়ু আর সময় দেবে না। এখন আমার হৃদয় ও জিহ্বা এই বিরহের আগুনে পুড়ছে। এই অমূল্য মুক্তাকে তোমাদের কোনো একজনের কাছে আমানত হিসেবে রেখে যেতে চাই। তোমাদের মধ্যে কে যথাযথভাবে তাঁর হকগুলো রক্ষা করবে এবং তাঁর সেবায় কোনো ত্রুটি করবে না?” আবু লাহাব হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “হে আরবের সরদার! এই আমানত অর্পণের জন্য আপনার মনে যদি কেউ থেকে থাকে, তবে তো ভালো; নইলে এই দায়িত্ব আমিই পালন করব।” আবদুল মুত্তালিব তাকে বললেন, “তোমার ধনসম্পদ অনেক। কিন্তু তুমি কঠিনহৃদয়, তোমার দয়ামায়া কম। আর ইয়াতিমের হৃদয় হয় আহত ও কোমল; তা অল্পতেই ভেঙে যায়।” অন্য পুত্রদের কয়েকজনও একই অনুরোধ করলেন। আবদুল মুত্তালিব প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে কারও অনুরোধই গ্রহণ করলেন না। আবু তালিবের পালা এলে তিনি বললেন, “আমি সবার চেয়ে বেশি এটা চাই। কিন্তু বড়রা থাকতে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা সমীচীন মনে করিনি। আমার সম্পদ কম, কিন্তু আমার বিশ্বস্ততা ভাইদের চেয়ে বেশি।” আবদুল মুত্তালিব বললেন, “তুমি ঠিক বলেছ। এই সেবার যোগ্য তুমিই। তবে আমি প্রতিটি কাজে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করি এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করি। প্রতিবারই সঠিক ফল লাভ করি। এ বিষয়েও তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে নিচ্ছি। তিনি তোমাদের যাকে বেছে নেবেন, আমিও তাকেই গ্রহণ করব।”

তারপর তিনি আমাদের প্রিয় নবীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার নয়নের মণি! তোমার বিরহ বুকে নিয়েই আমি আখিরাতের পথে চলেছি। তোমার এই চাচাদের মধ্যে কাকে তুমি বেছে নেবে?”

মহানবী তখনই উঠে গিয়ে আবু তালিবের গলা জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁর কোলে বসে পড়লেন। এতে আবদুল মুত্তালিব অত্যন্ত স্বস্তি পেলেন এবং বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। আমিও এটাই চেয়েছিলাম।” তারপর আবু তালিবের দিকে ফিরে বললেন, “হে আবু তালিব! এই অমূল্য মুক্তা মা-বাবার স্নেহ পাননি। তাই তাঁকে দেখে রেখো, তাঁর জন্য সদা উদ্বিগ্ন থেকো। আমি তোমাকে আমার অন্য সন্তানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করি। এই মহান ও অতি মূল্যবান আমানত তোমার হাতে অর্পণ করলাম। কারণ তুমি আর তাঁর পিতা একই মায়ের সন্তান। তাঁকে নিজের প্রাণের মতো রক্ষা কোরো। আমার এই ওসিয়ত কি তুমি গ্রহণ করলে?”

আবু তালিব “হ্যাঁ, গ্রহণ করলাম” বললে আবদুল মুত্তালিব আমাদের প্রিয় নবীকে জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর মাথা মুবারকে ও চেহারা মুবারকে চুমু খেলেন এবং তাঁর ঘ্রাণ নিলেন। তারপর বললেন, “তোমরা সবাই সাক্ষী থাকো, এর চেয়ে সুন্দর সুবাস আমি কখনো পাইনি, এর চেয়ে সুন্দর চেহারাও কখনো দেখিনি।”9

আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে

দাদার ইন্তেকালের পর বিশ্বজগতের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আট বছর বয়স থেকে চাচা আবু তালিবের কাছে থাকতে শুরু করলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে বড় হলেন। আবু তালিবও তখন তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিবের মতো মক্কায় কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একজন ছিলেন – সবার প্রিয়, সম্মানিত এবং যাঁর কথা সবাই মান্য করত। তিনিও মহানবীকে গভীর ভালোবাসা ও স্নেহ দেখালেন। তিনি তাঁকে নিজের সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন, তাঁকে কাছে না নিয়ে ঘুমাতেন না, কোথাও যেতেন না এবং বলতেন, “তুমি অত্যন্ত কল্যাণময়, অত্যন্ত বরকতময়!” মহানবী হাত না বাড়ানো পর্যন্ত আবু তালিব খাওয়া শুরু করতেন না; তিনি চাইতেন, আগে মহানবীই শুরু করুন। কখনো কখনো তাঁর জন্য আলাদা দস্তরখানও বিছিয়ে দিতেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সবাই দেখত, তাঁর চেহারা চাঁদের মতো ঝলমল করছে, চুল আঁচড়ানো। আবু তালিবের সম্পদ বেশি ছিল না, অথচ পরিবার ছিল বড়। রাসূলে আকরামকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তত্ত্বাবধানে নেওয়ার পর তিনি প্রাচুর্য ও বরকত লাভ করলেন। মক্কায় খরার কারণে মানুষ যখন কষ্টে পড়ল, তখন আবু তালিব তাঁকে কাবার কাছে নিয়ে গিয়ে দোয়া করলেন। তাঁর বরকতে প্রচুর বৃষ্টি হলো। মানুষ খরা ও দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি পেল।10

গালিবের বংশ থেকে আসবেন এক নবী,
জমজম ও হাজরের মাঝে দাঁড়াবেন তিনি।
শহরের সব মানুষকে নিয়ে তাঁকে সাহায্য করো,
হে বনু আমির! সৌভাগ্য তাঁকে সাহায্য করাতেই।

“দুনিয়া থেকে আখিরাতে যাত্রার সময় আমার এসে গেছে। আমার একমাত্র চিন্তা এই ইয়াতিমকে নিয়ে। হায়, আমার আয়ু যদি দীর্ঘ হতো, তাহলে ভালোবেসে এই সেবা চালিয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু কী করার আছে? আয়ু আর সময় দেবে না। এখন আমার হৃদয় ও জিহ্বা এই বিরহের আগুনে পুড়ছে” আবদুল মুত্তালিব

মক্কা – বুসরা সফর

পাদরি বাহিরা

আমাদের প্রিয় নবীর বয়স যখন বারো বছরের মতো, তখন একদিন তিনি দেখলেন, আবু তালিব বাণিজ্যের সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চাচা তাঁকে সঙ্গে নিতে চান না বুঝতে পেরে তিনি দুঃখিত হয়ে আবু তালিবকে বললেন, “এই শহরে আমাকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন? আমার না আছে বাবা, না আছে দরদি কেউ!…” এ কথা আবু তালিবের মনে গভীর রেখাপাত করল। তিনি তাঁকেও সঙ্গে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর বাণিজ্য-কাফেলা বুসরায় খ্রিস্টানদের একটি আশ্রমের কাছে যাত্রাবিরতি করল।11

এই আশ্রমে বাহিরা নামে এক পাদরি থাকত। আগে সে ছিল ইহুদি পণ্ডিতদের একজন, পরে খ্রিস্টান হয়েছিল। জ্ঞানী এই পাদরির কাছে হাতে হাতে চলে আসা, যত্নে লুকিয়ে রাখা একটি কিতাব ছিল; কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে তা থেকেই উত্তর দিত। আগের বছরগুলোতে কুরাইশের কাফেলা বহুবার এ পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করলেও সে কখনো তাদের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। প্রতিদিন সকালে সে আশ্রমের ছাদে উঠে কাফেলা আসার দিকে তাকিয়ে থাকত, যেন কৌতূহলভরে কোনো কিছুর অপেক্ষা করছে। এবার পাদরি বাহিরার কী যেন হলো; উত্তেজনায় চমকে উঠে সে লাফিয়ে উঠল। কারণ দূর থেকে কুরাইশের কাফেলা দেখা দিতেই সে লক্ষ করেছিল, কাফেলার ওপর দিয়ে একখণ্ড মেঘও তাদের সঙ্গে ভেসে আসছে। এই মেঘ মহানবীকে ছায়া দিচ্ছিল। কাফেলা যাত্রাবিরতি করলে বাহিরা দেখল, হাবিবে আকরাম যে গাছের নিচে বসেছেন, তার ডালপালা তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়েছে। এতে সে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সে দস্তরখান বিছানোর ব্যবস্থা করল। তারপর লোক পাঠিয়ে কুরাইশ কাফেলার সবাইকে খাবারের দাওয়াত দিল। কাফেলার লোকেরা আমাদের প্রিয় নবীকে মালপত্রের কাছে রেখে পাদরির কাছে গেল। বাহিরা আগতদের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “হে কুরাইশের লোকেরা! তোমাদের মধ্যে খাবারে আসেনি এমন কেউ আছে কি?” তারা বলল, “হ্যাঁ, একজন আছে।” বাহিরা এ কথা জিজ্ঞেস করেছিল, কারণ কুরাইশরা চলে এলেও মেঘটি তখনো সেখানেই ছিল। তা দেখেই সে বুঝেছিল, কাফেলায় কেউ একজন রয়ে গেছে। পাদরি বাহিরা পীড়াপীড়ি করে তাঁকেও নিয়ে আসতে বলল। তিনি আসামাত্র বাহিরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সে আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করল, “এই শিশু কি তোমার বংশের?” আবু তালিব বললেন, “আমার পুত্র।” বাহিরা বলল, “কিতাবসমূহে লেখা আছে, এই শিশুর পিতা জীবিত থাকবেন না; তিনি তোমার পুত্র নন।” এবার আবু তালিব উত্তর দিলেন, “ইনি আমার ভাইয়ের ছেলে।” বাহিরা জিজ্ঞেস করল, “তাঁর পিতার কী হয়েছে?” তিনি বললেন, “তাঁর জন্মের কিছুদিন আগে তাঁর পিতা মারা গেছেন।” বাহিরা বলল, “ঠিক বলেছ। আর তাঁর মায়ের কী হয়েছে?” আবু তালিব উত্তর দিলেন, “তিনিও মারা গেছেন।” এসব শুনে “ঠিক বলেছ” বলে বাহিরা মহানবীর দিকে ফিরল এবং মূর্তিগুলোর নামে তাঁকে কসম করতে বলল। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী বাহিরাকে বললেন, “মূর্তিগুলোর নামে আমাকে কসম করিয়ো না। দুনিয়ায় ওগুলোর চেয়ে বড় শত্রু আমার আর কেউ নেই। আমি ওগুলোকে ঘৃণা করি।”

তখন বাহিরা আল্লাহ তাআলার নামে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ঘুমাও?” তিনি বললেন, “আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমায় না।”

বাহিরা আরও বহু প্রশ্ন করে সেগুলোর উত্তর পেল। প্রাপ্ত উত্তরগুলো তার আগে পড়া কিতাবসমূহের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছিল। তারপর সে আমাদের প্রিয় নবীর চোখ মুবারকের দিকে তাকিয়ে আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করল:

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি আল্লাহ তাআলার রাসূল!… এই তো জগৎসমূহের সরদার… এই তো জগৎসমূহের রবের রাসূল… এই তো সেই মহান নবী, যাঁকে আল্লাহ তাআলা জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন!” পাদরি বাহিরা

– “এই লালিমা কি তাঁর চোখ মুবারকে সবসময় থাকে?”

– আবু তালিব বললেন, “হ্যাঁ, আমরা কখনো তা মিলিয়ে যেতে দেখিনি।”

এই নিদর্শনটিও মিলে যেতে দেখে বাহিরা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নবুয়তের মোহর দেখতে চাইল। কিন্তু মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদবের কারণে পিঠ মুবারক খুলতে চাইলেন না।

তখন তাঁর চাচা বললেন, “হে আমার নয়নের মণি! তার এই ইচ্ছাটিও পূরণ করো!” এরপর মহানবী পিঠ মুবারক খুললেন, আর বাহিরা নবুয়তের মোহরের পূর্ণ সৌন্দর্য প্রাণভরে দীর্ঘক্ষণ দেখল। আবেগে সে মোহরটিতে চুমু খেল, তার চোখ থেকে বন্যার মতো অশ্রু ঝরতে লাগল। তারপর সে বলল:

– “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি আল্লাহ তাআলার রাসূল!” তারপর কণ্ঠ আরও উঁচু করে বলল, “এই তো জগৎসমূহের সরদার… এই তো জগৎসমূহের রবের রাসূল… এই তো সেই মহান নবী, যাঁকে আল্লাহ তাআলা জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন…”

সেখানে উপস্থিত কুরাইশরা বিস্মিত হয়ে বলল, “এই পাদরির কাছে মুহাম্মদের কদর তো দেখছি অনেক বেশি!”

এরপর বাহিরা আবু তালিবের দিকে ফিরে বলল:

– “ইনি নবীগণের মধ্যে সর্বশেষ ও সবচেয়ে মর্যাদাবান। তাঁর দ্বীন সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং পূর্ববর্তী ধর্মগুলোকে রহিত করবে। এই শিশুকে শামে নিয়ে যেয়ো না। কারণ বনি ইসরাইল তাঁর শত্রু। আমার ভয় হয়, তারা তাঁর মুবারক দেহের কোনো ক্ষতি করতে পারে। তাঁর সম্পর্কে বহু অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছে।”

আবু তালিব জিজ্ঞেস করলেন:

– “এই অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি কী?” বাহিরা উত্তর দিল:

– “আল্লাহ তাআলা সকল নবীর কাছ থেকে, আর সবশেষে ঈসা আলাইহিস সালামের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তাঁরা যেন নিজ নিজ উম্মতকে আখেরি জামানার নবীর আগমনের কথা জানিয়ে দেন।”

বাহিরার এসব কথা শুনে আবু তালিব শামে যাওয়ার সংকল্প ত্যাগ করলেন। মালপত্র বুসরাতেই বিক্রি করে তিনি মক্কায় ফিরে এলেন।12 বাহিরার কাছে যা শুনেছিলেন, তা সারা জীবন আবু তালিবের কানে বাজতে থাকল। তিনি মহানবীকে আরও বেশি ভালোবাসতে লাগলেন। আমৃত্যু তাঁকে রক্ষা করলেন এবং তাঁর প্রতিটি কাজে সহায় হলেন।

চাচা জুবাইরের সঙ্গে ইয়েমেন সফর

সব অবস্থায় শ্রেষ্ঠ গুণাবলি ও সৌন্দর্যের অধিকারী অনন্য মানুষ আমাদের প্রিয় নবী বড় হয়ে সতেরো বছরে পা দিলেন। এ সময় তাঁর চাচা জুবাইর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ইয়েমেনে যাচ্ছিলেন; ব্যবসায় বরকতের আশায় তিনি তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। এই সফরেও তাঁর বহু অলৌকিক অবস্থা দেখা গেল। মক্কায় ফেরার পর তাঁর এসব অবস্থার কথা বর্ণনা করা হলো, আর কুরাইশ গোত্রের মধ্যে বলাবলি শুরু হলো, “এঁর শান অনেক উঁচু হবে।”13