আমার প্রিয় নবী

মহানবীর মুবারক নামসমূহ

আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম হলো “মুহাম্মদ”। এর অর্থ “অত্যন্ত প্রশংসিত, অতিশয় পছন্দনীয়”। এই নাম পবিত্র কুরআনে চারবার এসেছে: সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪; সূরা আহজাব, ৩৩:৪০; সূরা ফাতহ, ৪৮:২৯ ও সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২। সূরা সফের ৬ষ্ঠ আয়াতে যেমন জানানো হয়েছে, ঈসা আলাইহিস সালামও নিজ উম্মতকে এই সুসংবাদ দিয়েছিলেন, যার মর্মার্থ: “হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর নবী। আমি তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আগমনকারী এক নবীর সুসংবাদদাতা হিসেবে এসেছি, সেই নবীর নাম আহমদ।” আহমদ অর্থ “সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত, সবচেয়ে প্রিয়”।

পবিত্র কুরআনে “মুহাম্মদ” ও “আহমদ” নাম ছাড়াও আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাহমুদ, রাসূল, নবী, শাহিদ, বাশির, নাজির, মুবাশশির, মুনজির, দায়ি ইলাল্লাহ, সিরাজুম মুনির, রউফ, রহিম, মুসাদ্দিক, মুজাক্কির, মুদ্দাসসির, আবদুল্লাহ, কারিম, হক, মুনির, নূর, খাতামুন নাবিয়্যিন, রহমত, নিয়ামত, হাদি, তোয়াহা, ইয়াসিন… নামে উল্লিখিত হয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর মুবারক নামসমূহের কিছু পবিত্র কুরআনে, কিছু হাদীস শরীফে এবং কিছু পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি প্রেরিত পবিত্র কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো হাদীস শরীফে আমাদের নবীর নাম হিসেবে মাহি, আকিব, মুকাফফি, নাবিয়্যুর রহমা, নাবিয়্যুত তাওবা, নাবিয়্যুল মালাহিম, কাত্তাল, মুতাওয়াক্কিল, ফাতিহ, খাতাম, মুস্তফা, উম্মি, কুসাম (যিনি সকল কল্যাণ নিজের মধ্যে একত্র করেছেন) নামগুলো এসেছে। এক হাদীস শরীফে আমাদের নবী ইরশাদ করেন, “আমার বিশেষ পাঁচটি নাম রয়েছে: আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ, আমি মাহি – আল্লাহ তাআলা আমার মাধ্যমে কুফরকে বিলুপ্ত করেন। আমি হাশির – কিয়ামতের দিন মানুষকে আমার পেছনে পেছনে সমবেত করা হবে। আমি আকিব – আমার পরে আর কোনো নবী নেই।”1

হযরত খাদিজার গর্ভে জন্ম নিয়ে অল্প বয়সে ইন্তেকাল করা পুত্র কাসিমের নামে আমাদের প্রিয় নবীকে “আবুল কাসিম” কুনিয়াত দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নবুয়তের আগেই তাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারি ও নির্ভরযোগ্যতার মতো অগণিত শ্রেষ্ঠ গুণের কারণে কুরাইশ গোত্রে তাঁকে “আল-আমিন” নামে ডাকা হতো। পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামসমূহের একটি হলো পবিত্র কুরআনের হৃদয় সূরা ইয়াসিনের “ইয়াসিন” শব্দটি। গভীর জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত আলেমগণের (উলামায়ে রাসিখিনের) অন্যতম হযরত সাইয়্যিদ আবদুল হাকিম আরওয়াসি বলেছেন, “ইয়াসিন অর্থ – ‘হে আমার ইয়াকিনের সমুদ্রের সাঁতারু আমার হাবিব!’ অর্থাৎ ‘হে আমার মহব্বতের সমুদ্রের ডুবুরি আমার হাবিব!’” এই সমুদ্রের নাম যাঁরা শুনেছেন, দূর থেকে যাঁরা দেখেছেন, যাঁরা এর কাছে এসেছেন এবং এতে প্রবেশ করে নিজ নিজ নসিব অনুযায়ী গভীরে নেমেছেন, তাঁরা সকলেই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে রাসূলুল্লাহর প্রেমে জ্বলেপুড়ে কাটিয়েছেন। দগ্ধ হৃদয়ের আর্তনাদ, অন্তরের অশ্রু ও দহনভরা কবিতার চরণে তাঁরা নিজেদের এই প্রেম প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মহান ও প্রসিদ্ধ একজন, যিনি এই মহব্বতের সমুদ্র থেকে বিরাট অংশ লাভ করেছেন, তিনি হলেন হযরত মাওলানা খালিদ বাগদাদি। রাসূলুল্লাহর প্রতি নিজের মহব্বত ও প্রেম প্রকাশ করে লেখা তাঁর এক কাসিদায় তিনি লিখেছেন:

“হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর নবী। আমি তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আগমনকারী এক নবীর সুসংবাদদাতা হিসেবে এসেছি, সেই নবীর নাম আহমদ” সফ: ৬

হে সরওয়ারে আলম, তোমার প্রেমে পড়ে আমি জ্বলি!
যেখানেই থাকি, তোমার সুন্দর রূপ খুঁজে চলি।
কাবা কাওসাইনের সিংহাসনের সুলতান তুমি, আমি তুচ্ছ অতি,
“তোমার মেহমান” বলাকেও আমি বেয়াদবি গণ্য করি।
জগতে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে তোমারই মর্যাদার খাতিরে,
তোমার রহমত আমার ওপরও ঝরলে সেই ক্ষণই আমার বসন্ত।
সবাই কাবা তাওয়াফ করতে আসে হিজাজের পথে,
আর আমি তোমার মিলনের আকুলতায় পাহাড় পেরিয়ে যাই।
স্বপ্নে আমার মাথায় পরানো হলো সৌভাগ্যের তাজ,
মনে হয়, তোমার পায়ের ধুলো ছিটানো হলো আমার মুখে।
বন্ধুর প্রশংসাকারী প্রেমিকদের বুলবুল, হে জামি!
তোমার দিওয়ানের এই চরণগুলোই আমার মনের কথা বলে:
“জিভ ঝুলে পড়া, তৃষ্ণার্ত, খুজলি-ধরা কুকুরের মতো
তোমার দানের সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা আমি কামনা করি।”

মহানবীর প্রশংসায় বিচ্ছিন্নভাবে লেখা কবিতা ও প্রশস্তিগুলোর কথা বাদ দিলেও তাঁকে নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এগুলোর রচয়িতাদের মধ্যে যাঁদের খ্যাতি ও শিল্পনৈপুণ্য সারা দুনিয়া ও শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে ছড়িয়ে আছে, তাঁরাও রাসূলুল্লাহর প্রশংসা করতে নিজেদের অক্ষমতার কথা ব্যক্ত করেছেন। যাঁরা তাঁকে দেখে তাঁর সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছেন, তাঁরা ভাষায় যতটা কুলিয়েছে ততটা বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন এবং বলেছেন, সেই সৌন্দর্য প্রকাশ করার সামর্থ্য মানুষের নেই।

ইসলামের আলেমগণের গ্রন্থসমূহে সেই প্রেমিকদের দেওয়া শত শত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। যাঁরা এগুলো পড়েন, তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারেন যে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে কল্পনাতীত এক সুবিন্যাসে এবং দেখে দেখেও তৃপ্তি না মেটার মতো সৌন্দর্যে সৃষ্টি করেছেন। না দেখেও তাঁরা তাঁর প্রতি হৃদয় সমর্পণ করেন। হাবিবুল্লাহর প্রেমিকেরা প্রতিটি নিঃশ্বাসে ফুসফুসে প্রবেশ করা বাতাসের শীতলতায় তাঁর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করেন। যতবার তাঁরা চাঁদের দিকে তাকান, তাঁর মুবারক চোখ থেকে আসা আলোকরশ্মির প্রতিফলন খুঁজে আনন্দ পান। তাঁর সৌন্দর্যের সমুদ্র থেকে যাঁরা এক ফোঁটা লাভ করেছেন, তাঁদের প্রতিটি কণা বলে ওঠে:

তোমার সুন্দর কপোল যে চিনেছে, সে গোলাপের দিকে তাকায় না,
তোমার ভালোবাসায় যে গলে যায়, সে আর ওষুধ খোঁজে না!

আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা ও সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।”2 একদিন হযরত উমর মহানবীকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার কসম, আমার প্রাণ ছাড়া সবকিছুর চেয়ে আপনি আমার কাছে বেশি প্রিয়।” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “তোমাদের কেউ কখনো ততক্ষণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় হই।” এরপর হযরত উমর বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! যে আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন, তাঁর কসম, আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়।” তখন মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে উমর, এখন (তোমার ঈমান) পূর্ণ হলো।”

মহাকাশ যুগ, কম্পিউটার,
কত না আধুনিক উপকরণ –
সবকিছুরই উৎস কুরআনে,
তুমি রহমত, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
গুরুত্ব দিলে অভিজ্ঞতাকে,
জ্ঞান ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে,
সামনে চলার পথ দেখালে,
তুমি আলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
যে তোমায় ভালোবাসে, সে আমাদের বন্ধু,
তুমি ছাড়া দুনিয়া আমাদের কাছে সংকীর্ণ,
সবকিছু তোমারই জন্য আছে,
তুমি নিয়ামত, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
তোমার কাছ থেকে নিল চিন্তাধারা,
জ্ঞান, বিজ্ঞান আর শিল্পকলা,
উপকৃত হলো পূর্ব ও পশ্চিম,
তুমি পথপ্রদর্শক, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
যা বলেছ, সবই সত্য হলো
পনেরো শতাব্দী আগে থেকে,
তুমিই মুহাম্মাদুল আমিন,
তুমি ন্যায়পরায়ণ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।
কল্যাণে, ন্যায়বিচারে,
দানশীলতায়, আভিজাত্যে,
দয়ায় ও মহত্ত্বে
তুমিই আদর্শ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।

“তোমাদের কেউ কখনো ততক্ষণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় হই” হাদীস শরীফ

মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদ শরীফের ওপরের “কুব্বায়ে খাদরা / সবুজ গম্বুজ” নামে পরিচিত গম্বুজের বাইরের দৃশ্য