আমার প্রিয় নবী

বিশ্বজগতের সুলতান মহানবী

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার হাবিব (প্রিয়তম); তিনি সৃষ্ট সকল মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে সব দিক থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে মর্যাদাবান। তিনি সেই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, আল্লাহ তাআলা যাঁর প্রশংসা করেছেন এবং যাঁকে সকল মানুষ ও জিনের জন্য নবী হিসেবে মনোনীত করে পাঠিয়েছেন।

তাঁকে জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠানো হয়েছে; সবকিছু তাঁরই সম্মানে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর নাম মুবারক মুহাম্মদ, যার অর্থ “বারবার প্রশংসিত, অত্যধিক প্রশংসিত”। আহমদ, মাহমুদ, মুস্তফা প্রভৃতি তাঁর আরও অনেক বরকতময় নাম রয়েছে। তাঁর পিতার নাম ছিল আবদুল্লাহ। আমাদের নবী হিজরতের ৫৩ (সৌরবর্ষের হিসাবে ৫১) বছর আগে, রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ সোমবার রাতে, ভোর হওয়ার কিছু আগে মক্কা মুকাররমায় জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এই দিনটি ছিল ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল।

তাঁর জন্মের কয়েক মাস আগে পিতা আবদুল্লাহ এবং ছয় বছর বয়সে মাতা আমিনা ইন্তেকাল করেন। এ কারণে মহানবীকে “দুররে ইয়াতিম” (বিশ্বজগতের ঝিনুকে লুকিয়ে থাকা অনন্য, বড় ও সবচেয়ে মূল্যবান মুক্তা) উপাধিও দেওয়া হয়েছে। আট বছর বয়স পর্যন্ত তিনি দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে, তাঁর ইন্তেকালের পর চাচা আবু তালিবের কাছে ছিলেন। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি আমাদের মা হযরত খাদিজাতুল কুবরাকে বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া তাঁর প্রথম পুত্রের নাম ছিল কাসিম। আরবদের মধ্যে প্রথম পুত্রের পিতা হিসেবে উপনামে (কুনিয়াতে) ডাকার প্রথা ছিল। এ কারণে আমাদের নবীকে “আবুল কাসিম”, অর্থাৎ “কাসিমের পিতা” বলা হতো।

চল্লিশ বছর বয়সে আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানিয়ে দেন যে, তিনি সকল মানুষ ও জিনের নবী। তিন বছর পর তিনি সবাইকে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুরু করেন। বায়ান্ন বছর বয়সে মিরাজ সংঘটিত হয়।1 ৬২২ খ্রিস্টাব্দে, ৫৩ (সৌরবর্ষের হিসাবে ৫১) বছর বয়সে তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। তিনি সাতাশবার যুদ্ধ করেছেন: এর নয়টিতে সাধারণ যোদ্ধা হিসেবে আক্রমণে অংশ নিয়েছেন, বাকিগুলোতে ছিলেন প্রধান সেনাপতি। হিজরি ১১ সনে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দে) রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ সোমবার দুপুরের আগে ৬৩ (সৌরবর্ষের হিসাবে ৬১) বছর বয়সে মদিনা মুনাওয়ারায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল নবীকে নাম ধরে সম্বোধন করলেও তাঁকে “আমার হাবিব” (আমার প্রিয়তম) বলে সম্মানিত করেছেন। মহান আল্লাহ এক পবিত্র আয়াতে ইরশাদ করেন, যার মর্মার্থ2: “আমি তোমাকে জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।”3 আর এক হাদীসে কুদসিতে ইরশাদ করেন, “তুমি না হলে, তুমি না হলে আমি সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করতাম না!”4 হযরত সাইয়্যিদ আবদুল হাকিম আরওয়াসি যেমন বলেছেন, “প্রত্যেক নবী নিজ যুগে, নিজ স্থানে, নিজ জাতির সকলের চেয়ে সব দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। আর আমাদের নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত সব যুগে, সব দেশে যত সৃষ্টি এসেছে ও আসবে, তাদের সকলের চেয়ে সব দিক থেকে সবচেয়ে মর্যাদাবান, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। কেউই কোনো দিক থেকে তাঁর ঊর্ধ্বে নয়। মহান আল্লাহ তাঁকে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন।”

তাঁর নূর মুবারকের সৃষ্টি

আল্লাহ তাআলা সবকিছুর আগে, অর্থাৎ কোনো কিছু সৃষ্টি করার আগে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর মুবারক সৃষ্টি করেন। আমাদের তাফসির ও হাদীস বিশারদ আলেমগণের অধিকাংশ জানিয়েছেন, “মহান আল্লাহ নিজ নূর থেকে একটি সূক্ষ্ম ও মহান মৌল উপাদান (জাওহার) সৃষ্টি করেন। এই জাওহার থেকে তিনি ক্রমান্বয়ে সমগ্র বিশ্বজগৎ অস্তিত্বে আনেন। এই জাওহারকে ‘নূরে মুহাম্মদি’ বলা হয়। সকল আত্মা ও দেহের সূচনা ও উৎস এই জাওহার।”

“তুমি না হলে, তুমি না হলে আমি সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করতাম না!” হাদীসে কুদসি

একদিন সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম জাবির ইবনে আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা সবকিছুর আগে কী সৃষ্টি করেছেন?” রাসূলুল্লাহ উত্তরে ইরশাদ করলেন, “সবকিছুর আগে তিনি নিজ নূর থেকে তোমার নবীর নূর, অর্থাৎ আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। তখন লাওহ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, সামাওয়াত (আকাশমণ্ডলী), আরদ (পৃথিবী), সূর্য, চাঁদ, মানুষ ও জিন – কিছুই ছিল না।”

আদম আলাইহিস সালামের হৃদয় ও দেহ সৃষ্টি হলে নূরে মুহাম্মদি তাঁর দুই ভ্রুর মাঝখানে রাখা হয়। তাঁর মধ্যে রুহ ফুঁকে দেওয়ার পর আদম আলাইহিস সালাম অনুভব করলেন, তাঁর ললাটে শুকতারার মতো ঝলমলে একটি নূর রয়েছে।

আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্টি হওয়ার পর ইলহামের মাধ্যমে বুঝতে পারলেন যে, মহান আল্লাহ তাঁকে আবু মুহাম্মদ, অর্থাৎ মুহাম্মদের পিতা বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার রব! তুমি আমাকে আবু মুহাম্মদ কুনিয়াত কেন দিলে?” আল্লাহ তাআলা বললেন, “হে আদম! মাথা তোলো!” আদম আলাইহিস সালাম মাথা তুলে তাকাতেই আরশে আলায়5 নূর দিয়ে লেখা আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাম মুবারক – আহমদ নামটি দেখতে পেলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার রব! ইনি কে?” আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করলেন, “ইনি তোমার বংশধরদের মধ্যে একজন নবী। আকাশে তাঁর নাম আহমদ, আর পৃথিবীতে মুহাম্মদ। তিনি না হলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীও সৃষ্টি করতাম না।”6

তাঁর নূর পবিত্র ললাট থেকে পবিত্র ললাটে

আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্টি হলে তাঁর ললাটে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর মুবারক রাখা হয়। সেই নূর তাঁর ললাটে ঝলমল করতে লাগল। “তাফসিরে মাজহারি” গ্রন্থে যেমন জানানো হয়েছে, এই নূর আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে পবিত্র পিতা ও পবিত্র মাতাদের মধ্য দিয়ে মহানবী পর্যন্ত এসে পৌঁছায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র আয়াতে7 মর্মার্থে এ কথা এভাবে জানিয়েছেন:

“তুমি, অর্থাৎ তোমার নূর, সর্বদা সিজদাকারীদের থেকে সিজদাকারীদের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে তোমার কাছে এসে পৌঁছেছে।”8

এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করলেন। আমাকে মানুষের সর্বোত্তম অংশ থেকে অস্তিত্বে আনলেন। তারপর এই অংশগুলোর মধ্যে সর্বোত্তমটিকে (আরব দেশে) বেছে নিলেন। আমাকে তাদের মধ্য থেকে অস্তিত্বে আনলেন। তারপর ঘর ও পরিবারগুলোর মধ্যে সর্বোত্তমটি বেছে নিয়ে আমাকে তাদের মধ্য থেকে দুনিয়ায় আনলেন। অতএব আমার রুহ ও আমার দেহ সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম। আমার বংশধারা, আমার পূর্বপুরুষগণ মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম।”

আরেক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা সবকিছু শূন্য থেকে অস্তিত্বে আনলেন। সবকিছুর মধ্য থেকে মানুষকে ভালোবাসলেন, মর্যাদা দিলেন; মানুষের মধ্য থেকে যাদের বেছে নিলেন, তাদের আরব দেশে বসতি দিলেন। আরব দেশের নির্বাচিতদের মধ্য থেকে আমাকে বেছে নিলেন। আমাকে প্রতিটি যুগের নির্বাচিত ও সর্বোত্তম মানুষদের মধ্যে রাখলেন। অতএব আরব দেশে যারা আমার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাদের যারা ভালোবাসে, তারা আমার জন্যই ভালোবাসে। আর যারা তাদের সঙ্গে শত্রুতা করে, তারা আমার সঙ্গেই শত্রুতা করে।”

হক তাআলা যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন,
আদমকে দিয়ে এই জগৎকে সাজালেন।
ফেরেশতাদের দিয়ে আদমকে সিজদা করালেন,
দয়াময় রব তাঁকে অপার অনুগ্রহ দিলেন।
তাঁর ললাটে রাখলেন মুস্তফার নূর,
বললেন, “জেনে রাখো, এ আমার হাবিবের নূর।”
সেই নূর তাঁর ললাটে স্থির হয়ে রইল,
বহু কাল তাঁর সঙ্গেই রয়ে গেল।
তারপর, জেনো, এল হাওয়ার ললাটে,
সেখানেও কাটল বহু মাস, বহু বছর।
শিস জন্মালেন – নূর তাঁর কাছে এল,
তাঁর ললাটে সেই নূর ঝলমল করল।
ইবরাহিম ও ইসমাইলের কাছেও পৌঁছাল,
বাকিটা বলতে গেলে কথা দীর্ঘ হবে।
এভাবে শিকলের কড়ার মতো জুড়ে জুড়ে
চলল মুস্তফার কাছে পৌঁছানো অবধি।
জগৎসমূহের রহমত তিনি যখন এলেন,
নূর গিয়ে তাঁর কাছেই স্থির হয়ে রইল।
যদি চাও আগুন থেকে মুক্তি পেতে,
প্রেম আর ব্যথা নিয়ে পড়ো দরুদ শরীফ!

“তুমি, অর্থাৎ তোমার নূর, সর্বদা সিজদাকারীদের থেকে সিজদাকারীদের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে তোমার কাছে এসে পৌঁছেছে” শুআরা: ২১৯

প্রথম সৃষ্ট মানুষ আদম আলাইহিস সালাম মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মূল সত্তার কণা (জাররা) বহন করতেন বলে তাঁর ললাটে নবীর নূর ঝলমল করত। এই কণা হযরত হাওয়ার কাছে, তাঁর কাছ থেকে শিস আলাইহিস সালামের কাছে স্থানান্তরিত হয় এবং এভাবে পবিত্র পুরুষদের থেকে পবিত্র নারীদের কাছে, পবিত্র নারীদের থেকে পবিত্র পুরুষদের কাছে চলতে থাকে। মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূরও এই কণার সঙ্গে পবিত্র ললাট থেকে পবিত্র ললাটে স্থানান্তরিত হয়। ফেরেশতারা যখনই আদম আলাইহিস সালামের চেহারার দিকে তাকাতেন, তাঁর ললাটে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর দেখতেন এবং তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করতেন।

আদম আলাইহিস সালাম ইন্তেকালের আগে তাঁর পুত্র শিস আলাইহিস সালামকে বললেন, “হে বৎস! তোমার ললাটে ঝলমল করা এই নূর শেষ নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর। এটি মুমিন, সচ্চরিত্রা, পবিত্র নারীদের কাছে সোপর্দ করবে এবং তোমার পুত্রকেও এমনই ওসিয়ত করবে!”

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকল পিতা তাঁদের পুত্রদের এমনই ওসিয়ত করে গেছেন। তাঁদের প্রত্যেকে এই ওসিয়ত পালন করেছেন এবং সবচেয়ে অভিজাত, সবচেয়ে ভদ্র মেয়েদের বিয়ে করেছেন। নূর নারী-পুরুষের পবিত্র ললাট পেরিয়ে তার প্রকৃত অধিকারীর কাছে পৌঁছেছে। রাসূলুল্লাহর পূর্বপুরুষদের কারও দুই পুত্র থাকলে, কিংবা কোনো গোত্র দুই শাখায় ভাগ হলে, আমাদের নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর সবসময় সবচেয়ে মর্যাদাবান ও কল্যাণময় শাখায় থাকত। প্রতিটি যুগে তাঁর পূর্বপুরুষ যিনি ছিলেন, চেহারার নূর দেখেই তাঁকে চেনা যেত। তাঁর নূর বহনকারী একটি নির্বাচিত বংশধারা ছিল; প্রতিটি যুগে এই বংশের যিনি থাকতেন, তাঁর চেহারা হতো অত্যন্ত সুন্দর ও উজ্জ্বল নূরানি। এই নূরের কারণে তিনি ভাইদের মধ্যে আলাদাভাবে চোখে পড়তেন, আর তিনি যে গোত্রে থাকতেন, সেই গোত্র অন্যান্য গোত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও অধিক মর্যাদাবান হতো।9

মহানবী এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “আমার পূর্বপুরুষদের কেউই কখনো জিনা করেননি। আল্লাহ তাআলা আমাকে পবিত্র, উত্তম পিতা এবং পবিত্র মাতাদের থেকে দুনিয়ায় এনেছেন। আমার পূর্বপুরুষদের কারও দুই পুত্র থাকলে আমি তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কল্যাণময়, সবচেয়ে উত্তমজনের মধ্যেই থাকতাম।” আদম আলাইহিস সালাম থেকে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই নূর তারুহ পর্যন্ত আসে, তারপর তাঁর পুত্র ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কাছে, এরপর তাঁর পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামের কাছে স্থানান্তরিত হয়। তাঁর ললাটেও সূর্যের মতো ঝলমল করা সেই নূর তাঁর বংশধর আদনান, তাঁর থেকে মাআদ এবং তাঁর থেকে নিজার পর্যন্ত পৌঁছায়। নিজার জন্মগ্রহণ করলে পিতা মাআদ পুত্রের ললাটে নূর দেখে আনন্দিত হলেন। তিনি বড় এক ভোজের আয়োজন করে বললেন, “এমন পুত্রের জন্য এই ভোজ তো সামান্য জিনিস।” এ কারণে তাঁর পুত্রের নাম হয়ে গেল নিজার, অর্থাৎ “সামান্য জিনিস”। এরপর এই নূর কড়ার পর কড়া পেরিয়ে তার প্রকৃত অধিকারী – খাতামুন নাবিয়্যিন (শেষ নবী) আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের কাছে এসে পৌঁছায়।

মহানবী এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “আমি আবদুল্লাহ, আবদুল মুত্তালিব, হাশিম (আমর), আবদে মানাফ (মুগিরা), কুসাই (জায়েদ), কিলাব, মুররা, কাব, লুয়াই, গালিব, ফিহর, মালিক, নাজর, কিনানা, খুজাইমা, মুদরিকা (আমির), ইলিয়াস, মুদার, নিজার, মাআদ, আদনানের বংশধর মুহাম্মদ। আমি যে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তা যখনই দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা আমাকে অবশ্যই তাদের সবচেয়ে কল্যাণময় অংশে রেখেছেন…”10

আরেক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা ইবরাহিমের বংশধরদের মধ্য থেকে ইসমাইলকে বেছে নিয়েছেন। বনু ইসমাইলের মধ্য থেকে বনু কিনানাকে বেছে নিয়েছেন। বনু কিনানার মধ্য থেকে কুরাইশকে বেছে নিয়েছেন। কুরাইশের মধ্য থেকে বনু হাশিমকে বেছে নিয়েছেন। বনু হাশিমের মধ্য থেকে বনু আবদুল মুত্তালিবকে বেছে নিয়েছেন। আর বনু আবদুল মুত্তালিবের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছেন আমাকে।”11

আদনান পর্যন্ত মহানবীর মর্যাদাপূর্ণ বংশধারা নিম্নরূপ:

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম আবদুল্লাহ আবদুল মুত্তালিব (শাইবা) হাশিম (আমর) আবদে মানাফ (মুগিরা) কুসাই (জায়েদ) কিলাব মুররা কাব লুয়াই গালিব ফিহর মালিক নাজর কিনানা খুজাইমা মুদরিকা (আমির) ইলিয়াস মুদার নিজার মাআদ আদনান

দাদা হযরত আবদুল মুত্তালিব

মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরাইশ গোত্রের বনু হাশিম শাখার সন্তান। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহর পিতা ছিলেন শাইবা। আমাদের নবীর দাদা শাইবা মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হাশিম যখন ইন্তেকাল করেন, শাইবা তখনো শিশু। একদিন তিনি মদিনায় মামাদের বাড়ির সামনে বন্ধুদের সঙ্গে তির ছোড়ার অনুশীলন করছিলেন। যে মুরব্বিরা তাঁদের দেখছিল, তারা শাইবার ললাটে ঝলমলে নূর দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল; তারা অনুমান করল, তিনি কোনো সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান।

তির ছোড়ার পালা শাইবার কাছে এলে তিনি ধনুক টেনে লক্ষ্যের দিকে তির ছুড়লেন। তির ঠিক লক্ষ্যভেদ করতেই তিনি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বললেন, “আমি হাশিমের পুত্র। আমার তির তো লক্ষ্যভেদ করবেই!” তাঁর এ কথা থেকে লোকেরা বুঝতে পারল যে, তিনি মক্কার হাশিমের পুত্র। হাশিম তখন আর জীবিত ছিলেন না।

বনু আবদে মানাফের একজন মক্কায় ফিরে এসে হাশিমের ভাই মুত্তালিবকে বলল, “মদিনায় থাকা তোমার ভাতিজা শাইবা খুবই বুদ্ধিমান ছেলে। তার ললাটে এমন এক নূর ঝলমল করে, যা সবাইকে মুগ্ধ করে। এমন মূল্যবান শিশুকে তোমাদের কাছ থেকে দূরে রাখা কি ঠিক?” এ কথা শুনে মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ মদিনায় গেলেন এবং ভাতিজা শাইবাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। মক্কার পথে-ঘাটে কেউ “এ শিশুটি কে?” বলে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিতেন, “আমার গোলাম।” এরপর থেকে শাইবার নাম হয়ে যায় আবদুল মুত্তালিব, যার অর্থ “মুত্তালিবের গোলাম”।12

“হে বৎস! তোমার ললাটে ঝলমল করা এই নূর শেষ নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর। এটি মুমিন, সচ্চরিত্রা, পবিত্র নারীদের কাছে সোপর্দ করবে এবং তোমার পুত্রকেও এমনই ওসিয়ত করবে!” আদম আলাইহিস সালাম

আবদুল মুত্তালিব তাঁর চাচা মুত্তালিবের ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিলেন। আবদুল মুত্তালিবের বরকতময় দেহ থেকে মেশকের সুবাস ছড়াত। তাঁর ললাটে আল্লাহ তাআলার হাবিব মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর ঝলমল করত এবং চারদিকে কল্যাণ ও বরকত ছড়াত। মক্কা নগরীতে যখনই বৃষ্টি না হয়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, মক্কাবাসীরা আবদুল মুত্তালিবের হাত ধরে তাঁকে সাবির পাহাড়ে নিয়ে যেত এবং দোয়া করার জন্য তাঁর কাছে মিনতি করত। তিনিও কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না; বৃষ্টি দান করার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতেন। মহান আল্লাহও আবদুল মুত্তালিবের ললাটে ঝলমলে আমাদের প্রিয় নবীর নূরের বরকতে তাঁর দোয়া কবুল করতেন এবং অঝোর ধারায় বৃষ্টি পাঠাতেন। এভাবে দিন দিন আবদুল মুত্তালিবের মর্যাদা ও সম্মান বাড়তে থাকে। মক্কাবাসীরা তাঁকে তাদের নেতা নির্বাচিত করল। কেউ তাঁর বিরোধিতা করত না; যারা তাঁর অধীনে আসত, তারা শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করত। সে যুগের বাদশাহরাও আবদুল মুত্তালিবের মর্যাদা ও মহত্ত্ব স্বীকার করত। কেবল পারস্য-সম্রাট (কিসরা) তাঁকে সহ্য করতে পারত না, প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণ করত। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন হানিফ, অর্থাৎ মুসলমান।13 তিনি তাওহিদের পথে ছিলেন, আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বে বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ ছাড়া তাঁর অন্য কোনো চিন্তা ছিল না, এবং তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ হানিফ ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দ্বীনের ওপর ছিলেন। এ কারণে তিনি কখনো মূর্তিপূজা করেননি, এমনকি মূর্তির কাছেও যাননি।

তিনি কাবার চারপাশে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতেন এবং তাঁর ইবাদত করতেন।

জমজম

একদিন স্বপ্নে এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিব! ওঠো, তাইয়িবা খনন করো!” – এ কথা বলেই তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পরদিন তিনি বললেন, “ওঠো, বাররা খনন করো!” তৃতীয় দিন সেই ব্যক্তিই আদেশ দিলেন, “ওঠো, মাদনুনা খনন করো!” স্বপ্ন থামছিল না। চতুর্থ দিন সেই ব্যক্তি আবার বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিব! ওঠো, জমজম কূপ খনন করো!” তখন আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞেস করলেন, “জমজম কী? কূপটি কোথায়?” সেই ব্যক্তি বললেন, “জমজম এমন এক পানি, যা কখনো কমে না এবং যার তলদেশে পৌঁছানো যায় না। পৃথিবীর চার কোণ থেকে আসা সকল হাজির জন্য তা যথেষ্ট হয়। জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর ডানা দিয়ে যেখানে আঘাত করেছিলেন, সেখান থেকে তা বেরিয়েছে। এটি সেই পানি, যা আল্লাহ তাআলা ইসমাইল আলাইহিস সালামের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এটি তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা মেটায়। ক্ষুধার্তকে তৃপ্ত করে, রোগীর জন্য হয় আরোগ্য। আমি তোমাকে এর জায়গাটি বলে দিচ্ছি। লোকেরা কুরবানি করার সময় উচ্ছিষ্ট এক জায়গায় ফেলে। তুমি সেখানে থাকতেই লাল ঠোঁটওয়ালা একটি কাক আসবে।

কাকটি ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁড়বে। কাক যেখানে খুঁড়বে, সেখানে তুমি একটি পিঁপড়ার বাসাও দেখতে পাবে। ঠিক সেখানেই জমজমের স্থান।”14

সকালে আবদুল মুত্তালিব পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়ে কাবায় গেলেন এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর স্বপ্নে যেমন বলা হয়েছিল, লাল ঠোঁটওয়ালা একটি কাক এসে সেখানকার একটি গর্তে বসল এবং ঠোঁট দিয়ে মাটিতে ঠোকর দিতে লাগল। এর নিচ থেকে একটি পিঁপড়ার বাসা বেরিয়ে এল। আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হারিস তৎক্ষণাৎ সেখানে খনন শুরু করলেন। কিছুক্ষণ খোঁড়ার পর কূপের মুখ দেখা গেল। তা দেখে আবদুল মুত্তালিব “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিতে লাগলেন।

শুরু থেকেই কূপ খননের কাজ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছিল কুরাইশরা। তারা তাঁর দিকে ফিরে বলল, “হে আবদুল মুত্তালিব! এটি আমাদের পিতৃপুরুষ ইসমাইলের কূপ। এতে আমাদেরও অধিকার আছে। এ কাজে আমাদেরও তোমার শরিক করতে হবে!” আবদুল মুত্তালিব সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করে উত্তর দিলেন, “না! এ দায়িত্ব কেবল আমাকেই দেওয়া হয়েছে।” তখন কুরাইশরা বলল, “তুমি একা। একমাত্র পুত্র ছাড়া তোমার আর কেউ নেই। এভাবে তুমি আমাদের মোকাবিলা করতে পারবে না!”

জমজম কূপ

জমজম কূপ

মসজিদুল হারামের ভেতরে, হাজরে আসওয়াদ কোণের বিপরীতে ছিল। এর একটি পাথরের বেষ্টনী ছিল। মেঝে মার্বেলে বাঁধানো এবং দেয়ালের দিকে ঢালু ছিল। প্রথম আবদুল হামিদ খান কূপটি পানি চুইয়ে না পড়ার মতো করে বানিয়েছিলেন। ইতিহাসের মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন এই সুন্দর শিল্পকর্মটি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ভেঙে ফেলা হয়। কূপের মুখ এবং চারপাশের কয়েক মিটার জায়গা ভূমি থেকে কয়েক মিটার নিচে নামানো হয়। পরে এর ওপর সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়ে মার্বেল বিছানো হয়। এখন এই কূপ আর দেখা যায় না।

তখন তাঁর মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল, কারণ তারা তাঁর একাকিত্ব নিয়ে খোঁটা দিচ্ছিল। তিনি আকাশের দিকে দুই হাত তুলে কাতর কণ্ঠে দোয়া করলেন, “হে আমার রব! আমাকে দশটি পুত্র দান করো। যদি তুমি আমার এই দোয়া কবুল করো, তাহলে তাদের একজনকে কাবার কাছে কুরবানি করব।”15

আবদুল মুত্তালিব ভাবলেন, খননের কাজ বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে, শেষ পর্যন্ত তীব্র সংঘর্ষ বেধে যেতে পারে। তাই তিনি খনন বন্ধ রেখে আপসের পথ বেছে নিলেন।

তিনি চাইলেন, একজন সালিশ বিষয়টির মীমাংসা করুক। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, দামেস্কে বসবাসকারী এক গণক এর সমাধান দিতে পারবে। কুরাইশের নেতৃস্থানীয় একদল লোককে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো। পথে পিপাসা ও প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ কাফেলা আর চলতে পারছিল না। এক ফোঁটা পানির জন্য তারা প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। এটাই তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলেও জ্বলন্ত মরুভূমির মাঝখানে পানি পাওয়া ছিল অসম্ভব।

সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছে, ঠিক তখন আবদুল মুত্তালিব তাদের ডেকে বললেন, “এসো, এসো! সবাই জড়ো হও! তোমাদের ও তোমাদের পশুদের জন্য যথেষ্ট পানি পেয়েছি!” মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর মুবারক ললাটে বহনকারী আবদুল মুত্তালিব পানি খুঁজছিলেন; এমন সময় তাঁর উটের পা একটি বড় পাথরে আটকে গেল, আর পাথরটি সরে যেতেই এর নিচ থেকে পানি বেরিয়ে এল। সবাই দৌড়ে এল।

তারা তৃপ্তি ভরে পানি পান করে যেন নতুন জীবন ফিরে পেল।

আবদুল মুত্তালিবের এই মহত্ত্বের সামনে লজ্জিত কুরাইশরা বলল, “হে আবদুল মুত্তালিব! তোমাকে বলার মতো আর কোনো কথা আমাদের নেই। জমজম কূপ খননের সবচেয়ে যোগ্য তুমিই। এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে আর কখনো বিতর্ক করব না। সালিশের কাছে যাওয়ারও আর প্রয়োজন নেই, আমরা ফিরে যাচ্ছি।” এরপর তারা মক্কার পথ ধরল। ললাটে ঝলমলে নূরের বরকতে আবদুল মুত্তালিব জমজম কূপ খনন করে তার পানি বের করার মর্যাদা লাভ করলেন।16

“জমজম তৃপ্তিদায়ক এবং রোগীর জন্য আরোগ্যদায়ক” হাদীস শরীফ

কুরবানির পুত্র

জমজম কূপ খননের পর আবদুল মুত্তালিবের খ্যাতি ও সুনাম আরও বেড়ে গেল। বছরের পর বছর কেটে গেল। মহান আল্লাহ তাঁর অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত দোয়া কবুল করে আবদুল মুত্তালিবকে হারিস ছাড়াও দশটি পুত্র ও ছয়টি কন্যা দান করলেন। তাঁর পুত্রদের নাম ছিল কুসাম, আবু লাহাব, আবদুল কাবা, হাজল, জুবাইর, আবু তালিব, আবদুল্লাহ, গাইদাক, দিরার ও মুকাওয়িম (হামজা ও আব্বাস তখনো জন্মগ্রহণ করেননি)। আর কন্যারা ছিলেন সাফিয়া, আতিকা, উম্মে হাকিম বাইজা, বাররা, উমাইমা ও আরওয়া। আবদুল মুত্তালিব সন্তানদের মধ্যে আবদুল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, কারণ তাঁর নিজের ললাটের নূর আবদুল্লাহর ললাটে ঝলমল করতে শুরু করেছিল।

একদিন স্বপ্নে আবদুল মুত্তালিবকে বলা হলো, “হে আবদুল মুত্তালিব! তোমার মানত পূরণ করো!”

সকালে আবদুল মুত্তালিব একটি দুম্বা কুরবানি করলেন। রাতে স্বপ্নে তাঁকে আদেশ দেওয়া হলো, “এর চেয়ে বড় কিছু কুরবানি করো!” সকালে তিনি একটি গরু কুরবানি করলেন। স্বপ্নে আবার তাঁকে এর চেয়েও বড় কিছু কুরবানি করার আদেশ দেওয়া হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এর চেয়ে বড় কী?” তখন তাঁকে বলা হলো, “তুমি মানত করেছিলে যে, তোমাকে দশটি পুত্র দান করা হলে তাদের একজনকে কুরবানি করবে। তোমার মানত পূরণ করো!”

পরদিন আবদুল মুত্তালিব সন্তানদের একত্র করে বহু বছর আগে করা তাঁর দোয়ার কথা জানালেন। তারপর পুত্রদের জানালেন যে, তাঁদের একজনকে তাঁর কুরবানি করতে হবে। পুত্রদের কাছ থেকে তিনি কোনো বিরোধিতাই পেলেন না। বরং তাঁরা সম্মতি জানিয়ে বললেন, “আব্বাজান! আপনার মানত পূরণ করুন! আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন!” কোন পুত্র কুরবানি হবে, তা নির্ধারণের জন্য আবদুল মুত্তালিব লটারি করলেন। লটারিতে নাম উঠল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের – ললাটে আল্লাহ তাআলার হাবিব মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর বহনকারী আবদুল্লাহর। আবদুল মুত্তালিব এক মুহূর্তের জন্য টলে উঠলেন, তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। আল্লাহ তাআলাকে দেওয়া কথা তাঁকে রাখতেই হবে। এক হাতে ছুরি আর অন্য হাতে কলিজার টুকরা আবদুল্লাহকে নিয়ে তিনি রবকে দেওয়া কথা পূরণ করতে কাবায় এলেন। অশ্রুসিক্ত পিতা আবদুল্লাহকে কুরবানি করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। তখন কুরাইশের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বিস্মিত দৃষ্টিতে ঘটনাটি দেখছিল।

তাদের মধ্য থেকে আবদুল্লাহর মামা বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিব! থামো! তোমার এই পুত্রকে জবাই করায় আমরা কিছুতেই রাজি নই। তুমি যদি এমন কাজ করো, তাহলে কুরাইশদের মধ্যে এটা প্রথা হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই পুত্রকে কুরবানির মানত করে জবাই করতে শুরু করবে। এমন কাজের পথ দেখিয়ো না! তোমার রবকে অন্য কোনো উপায়ে সন্তুষ্ট করো!” তারপর তিনি প্রস্তাব দিলেন, “কোনো গণককে জিজ্ঞেস করো, সে তোমাকে পথ দেখাক।”

এ কথার পর আবদুল মুত্তালিব খায়বারে থাকা কুতবা (অথবা সাজাক) নামের এক গণকের কাছে গিয়ে ঘটনা খুলে বললেন। গণক জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের এখানে একজন মানুষের রক্তপণ (দিয়াত) কত?” “দশটি উট” – এই উত্তর পেয়ে সে বলল, “দশটি উট ও তোমাদের পুত্রের মধ্যে লটারি করো। লটারিতে পুত্রের নাম উঠলে আরও দশটি উট যোগ করো এবং লটারিতে উটের নাম না ওঠা পর্যন্ত এভাবে বাড়িয়ে বাড়িয়ে লটারি চালিয়ে যাও।”

আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ মক্কায় ফিরে এলেন এবং গণকের কথামতো কাজ করলেন। প্রতিবার উটের সংখ্যা দশটি করে বাড়িয়ে তিনি বহুবার লটারি করলেন। প্রতিবারই আবদুল্লাহর নাম উঠল। কিন্তু উটের সংখ্যা একশোতে পৌঁছালে লটারিতে উটের নাম উঠল। আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি আরও দুবার লটারি করলেন। দুবারই উটের নাম উঠল। আবদুল মুত্তালিব “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিতে দিতে উটগুলো কুরবানি করলেন। এগুলোর গোশত তিনি নিজে বা তাঁর কোনো পুত্র গ্রহণ করেননি। সব গোশত তিনি দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন।17

আদম আলাইহিস সালামের পর থেকে আরেকটি ঘটনা সুপরিচিত – ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কুরবানি করার ঘটনা। মহানবীর বংশধারা ইসমাইল আলাইহিস সালাম পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে তিনি ইরশাদ করেছেন, “আমি দুই কুরবানির সন্তান।”18

পিতা হযরত আবদুল্লাহ

দুই জাহানের সরদার আমাদের নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের নূর ললাটে বহনকারী আবদুল্লাহ যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন আহলে কিতাব একে অপরকে খবর দিল, “আখেরি জামানার নবীর পিতা মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছেন।” বনি ইসরাইলের কাছে পশমে বোনা একটি জুব্বা ছিল। জুব্বাটি ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের; শহিদ হওয়ার সময় সেটি তাঁর গায়ে ছিল, আর তাঁর মুবারক রক্ত এতে লেগে ছিল। তাদের কিতাবে লেখা ছিল, “যখন এই রক্ত আবার তাজা হয়ে ফোঁটা ফোঁটা ঝরতে শুরু করবে, তখন আখেরি জামানার নবীর পিতা দুনিয়ায় আসবেন।” আহলে কিতাব এই নিদর্শন দেখে বুঝতে পারল যে, আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেছেন। তারা ঈর্ষাবশত বহুবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করলেও আল্লাহ তাআলা আবদুল্লাহকে তাঁর ললাটের নূরের বরকতে রক্ষা করলেন।

আবদুল্লাহ বালিগ হওয়ার পর উত্তম চরিত্র ও অপূর্ব সৌন্দর্যের কারণে মানুষের মধ্যে অনন্য হয়ে উঠলেন। বিশেষ করে আঠারো বছরে পা রাখার পর তাঁর সৌন্দর্যের কথা লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। তাঁর ললাটের নূর সূর্যের মতো ঝলমল করত; যে মেয়েরা তাঁকে দেখত, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, তাদের মন তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ত। তাঁর সৌন্দর্য ও খ্যাতি মিসর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

দূর-দূরান্ত ও কাছের সবাই তাঁর সঙ্গে নিজেদের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ল। বহু বাদশাহ আবদুল মুত্তালিবের কাছে এসে তাঁর পুত্রের সঙ্গে নিজেদের কন্যার বিয়ের প্রস্তাব দিল। এর জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত বলেও তারা জানাল। একইভাবে প্রায় দুইশো মেয়েও মক্কা পর্যন্ত এসে আবদুল্লাহকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব উপযুক্ত ভাষায় তাদের প্রত্যেককে ফিরিয়ে দিতেন।

কেননা আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্রের জন্য এমন একজন সবচেয়ে ভদ্র, সবচেয়ে অভিজাত ও সবচেয়ে সুন্দরী হানিফ, অর্থাৎ মুসলমান মেয়ে খুঁজছিলেন, যিনি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সময় থেকে তাঁদের অনুসৃত পূর্বপুরুষদের দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠাবান।

নিজেদের কিতাবে বর্ণিত আখেরি জামানার নবী তাদের নিজেদের জাতি থেকে আসবেন না – এ কথা বুঝতে পেরে বনি ইসরাইল হিংসার বশে আবদুল্লাহকে হত্যা করার শপথ নিল। এ কাজের জন্য তারা সত্তরজন সশস্ত্র লোককে মক্কায় পাঠাল। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকল। অবশেষে একদিন আবদুল্লাহ মাঠে বের হলে, কেউ দেখছে না ভেবে এক মুহূর্তে তারা তলোয়ার বের করে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেদিন ঐশী হিকমতের19 বিধানে আবদুল্লাহর আত্মীয় ওয়াহাব ইবনে আবদে মানাফও কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে শিকারে বের হয়েছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁরা দেখলেন, বনি ইসরাইলের লোকেরা আবদুল্লাহর ওপর হামলে পড়েছে। আত্মীয়তার টানে তাঁরা আবদুল্লাহকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের লোকসংখ্যা ছিল অনেক বেশি। এই সংঘর্ষে তাঁদের পরাজয় ছিল সুনিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত তাঁরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিবৃত্ত করার পথ বেছে নেওয়াই উপযুক্ত মনে করলেন। তাঁরা যখন তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন দেখলেন, এই জগতের কারও সঙ্গে মিল নেই এমন কালো ঘোড়ায় সওয়ার, হাতে তলোয়ার নিয়ে অসংখ্য অশ্বারোহী অদৃশ্য জগৎ থেকে বিদ্যুতের মতো ছুটে এলেন। তাঁরা তাকবির-ধ্বনি দিয়ে বনি ইসরাইলের ওপর আক্রমণ করলেন এবং তাদের সবাইকে তলোয়ারে শেষ করে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এ অবস্থা দেখে ওয়াহাব বিস্মিত হলেন এবং বুঝতে পারলেন, আবদুল্লাহকে কীভাবে রক্ষা করা হলো আর আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর মর্যাদা কত বেশি।

বাড়ি ফিরে তিনি ঘটনাটি স্ত্রীকে বললেন। দুজনেই একমত হলেন যে, তাঁদের কন্যার উপযুক্ত পাত্র আবদুল্লাহই; তাই তাঁরা আমিনাকে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

“আমি দুই কুরবানির সন্তান” হাদীস শরীফ

আবদুল মুত্তালিবও বনু জুহরা গোত্রের প্রধান ওয়াহাবের কন্যা আমিনার রূপ-সৌন্দর্য, সতীত্ব, লজ্জাশীলতা ও দ্বীনদারির কথা শুনেছিলেন। বংশের দিক থেকেও তাঁরা আত্মীয় ছিলেন; কয়েক পুরুষ ওপরে গিয়ে তাঁদের বংশ মিলিত হয়েছিল। তিনি পুত্র আবদুল্লাহর জন্য এই মেয়ের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াহাবের বাড়িতে গেলেন। আবদুল মুত্তালিব প্রস্তাবটি দিলে ওয়াহাব বললেন, “হে চাচাতো ভাই! আপনার আসার আগেই আমরা এই প্রস্তাব পেয়ে গেছি।” এরপর তিনি আগে নিজের চোখে দেখা ঘটনাটি খুলে বললেন এবং যোগ করলেন, “আমিনার মা একটি স্বপ্ন দেখেছে। তার বর্ণনামতে, আমাদের ঘরে একটি নূর প্রবেশ করেছে, আর তার আলো পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলী ভরে দিয়েছে। আমিও আজ রাতে স্বপ্নে আমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দেখেছি। তিনি আমাকে বললেন, ‘আবদুল মুত্তালিবের পুত্র আবদুল্লাহর সঙ্গে তোমার কন্যা আমিনার বিয়ে আমি পড়িয়ে দিয়েছি। তুমিও তা কবুল করো!’ আজ সকাল থেকে আমি এই স্বপ্নের ঘোরে আছি। ভাবছিলাম, তাঁরা কখন আসবেন।” এ কথা শুনে আবদুল মুত্তালিবের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!”

অবশেষে তিনি আঠারো বছর বয়সী পুত্র আবদুল্লাহকে ওয়াহাবের চৌদ্দ বছর বয়সী কন্যা আমিনার সঙ্গে বিয়ে দিলেন। আমিনা ও আবদুল্লাহর বিয়ে সম্পর্কে আরও বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।20

তাঁর নূর মুবারক মায়ের কাছে স্থানান্তরিত হয়

সরওয়ারে আলম মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নূর মুবারক যখন তাঁর মায়ের কাছে স্থানান্তরিত হলো, তখন নেকড়ে ও পাখিরা একে অপরকে এই বলে সুসংবাদ দিল:

“বিশ্বজগতের সরদারের দুনিয়ায় শুভাগমনের সময় ঘনিয়ে এসেছে; তিনি পৃথিবীর আমিন21, যুগের সূর্য।” সেই রাতে কাবার সব মূর্তি উপুড় হয়ে পড়ে গেল। শয়তানরা অক্ষম হয়ে তাদের কাজ করতে পারল না। ফেরেশতারা ইবলিসের সিংহাসন ভেঙে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ছুড়ে ফেললেন এবং চল্লিশ দিন ধরে ইবলিসকে শাস্তি ও যন্ত্রণা দিলেন। এরপর সে পালিয়ে আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রচণ্ড আর্তনাদ করল। ইবলিসের এই আর্তনাদ শুনে তার সব বাহিনী তার চারপাশে জড়ো হলো। সে তাদের বলল, “হায় তোমাদের দুর্ভাগ্য! মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জন্ম নিকটবর্তী হয়েছে। এরপর আর লাত ও উজ্জার পূজা হবে না। তাওহিদের নূর সমগ্র জগতে ছড়িয়ে পড়বে।” সেই রাতে সকল জাদুকর ও গণক তাদের কাজে অক্ষম হয়ে পড়ল। গণকবিদ্যার অবসান হলো। তাদের জাদু প্রভাবহীন হয়ে গেল। সেই রাতে পৃথিবীর অধিবাসীরা আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেল: “আখেরি জামানার নবীর হাজারো কল্যাণ ও অনুগ্রহ নিয়ে আগমনের সময় ঘনিয়ে এসেছে।”

সে সময় মক্কা মুকাররমায় দুর্ভিক্ষ চলছিল। বহু বছর ধরে বৃষ্টি হয়নি। গাছে একটি সবুজ পাতাও ছিল না, ফসলের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছিল না। মানুষ কষ্টে পড়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। আমাদের প্রিয় নবীর নূর মুবারক হযরত আবদুল্লাহ থেকে হযরত আমিনার কাছে স্থানান্তরিত হওয়ার পর এত বৃষ্টি হলো, এত ফসল ফলল যে, মানুষ সেই বছরের নাম দিল “প্রাচুর্যের বছর”। হযরত আমিনা তাঁকে গর্ভে ধারণের পুরো নয় মাস ধরে কোনো ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করেননি।

মা আমিনা যখন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন তাঁর স্বামী আবদুল্লাহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে দামেস্কে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মদিনার কাছে দারুন নাবিগায় তাঁর মামাদের গোত্র বনু নাজ্জারের কাছে আঠারো অথবা পঁচিশ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করলেন।22 এ খবর মক্কায় পৌঁছালে গোটা শহর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ল।23

“মহানবীর পিতা আবদুল্লাহ পুত্রের জন্মের আগেই ইন্তেকাল করলে ফেরেশতারা বললেন, ‘হে আমাদের রব! তোমার রাসূল ইয়াতিম হয়ে গেলেন’” আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)

সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বর্ণনা করেন, “মহানবীর পিতা আবদুল্লাহ পুত্রের জন্মের আগেই ইন্তেকাল করলে ফেরেশতারা বললেন, ‘হে আমাদের রব! তোমার রাসূল ইয়াতিম হয়ে গেলেন।’ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করলেন, ‘তাঁর রক্ষক ও সাহায্যকারী আমিই।’”

মা আমিনা স্বামীর ইন্তেকালে গভীরভাবে শোকাহত হলেন। এক কবিতায় তিনি তাঁর ইন্তেকালের বেদনা এভাবে প্রকাশ করেন:

অপ্রত্যাশিত এক মুহূর্তে মৃত্যু তাঁকে নিয়ে গেল,
অথচ তিনি ছিলেন কত দানশীল, কত দয়ালু!

হাতির ঘটনা

হাতির ঘটনা

রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মের তখন প্রায় দুই মাস বাকি। ঠিক সে সময় হাতির ঘটনা ঘটে। চারদিক থেকে দলে দলে মানুষ এসে কাবা জিয়ারত করত। এতে বাধা দিতে চেয়ে হাবশা (আবিসিনিয়া) রাজ্যের ইয়েমেনের শাসনকর্তা আবরাহা বাইজান্টাইন সম্রাটের সাহায্যে সানায় “কুলাইস” নামে একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করাল। সে চাইল, মানুষ এই গির্জাটি জিয়ারত করুক। কিন্তু আরবরা প্রাচীনকাল থেকেই কাবা জিয়ারত করে আসছিল বলে এই গির্জাকে তারা কোনো গুরুত্বই দিল না। বরং একে অবজ্ঞার চোখে দেখল। এমনকি তাদের একজন গির্জাটি নোংরা করে দিল।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আবরাহা কাবা ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিল। এ উদ্দেশ্যে সে বিশাল এক বাহিনী প্রস্তুত করে মক্কার দিকে অগ্রসর হলো। আবরাহার বাহিনী মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে কুরাইশদের ধনসম্পদ লুট করতে শুরু করল। তারা আবদুল মুত্তালিবের দুইশো উটও কেড়ে নিল। আবদুল মুত্তালিব আবরাহার কাছে গিয়ে তাঁর উটগুলো ফেরত চাইলেন। আবরাহা বলল, “আমি তোমাদের পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে এসেছি। তুমি তা রক্ষা করতে চাইছ না, অথচ নিজের উট ফেরত চাইছ?”

আবদুল মুত্তালিব বললেন, “আমি উটের মালিক। কাবারও অবশ্যই একজন মালিক আছেন। তিনিই তা রক্ষা করবেন।” আবরাহা বলল, “আমার হাত থেকে তা রক্ষা করার কেউ নেই!” এরপর সে আবদুল মুত্তালিবকে তাঁর উটগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বিদায় করল। তারপর বাহিনীকে কাবার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল। আবরাহার বাহিনীতে “মাহমুদা” নামে একটি হাতি ছিল; বাহিনীর আগে আগে তাকে চালানো হতো, কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, এভাবেই বিজয় আসবে। আবরাহার পথপ্রদর্শকদের একজন নুকাইল ইবনে লাবিব বিশাল হাতিটির কানের কাছে ঝুঁকে বলল, “হে মাহমুদা, তুমি যে ঘর ধ্বংস করতে যাচ্ছ, তা আল্লাহ তাআলার ঘর। এখনই বসে পড়ো! খবরদার, সামনে এগিয়ো না! নইলে ধ্বংস হয়ে যাবে!” আবরাহা হাতিটিকে কাবার দিকে ফেরাতেই সেটি মাটিতে বসে পড়ল এবং আর নড়ল না। অথচ ইয়েমেনের দিকে ফেরালে সেটি দৌড়ে চলত।

এভাবে আবরাহার বাহিনী মক্কার কাছে পৌঁছেও আক্রমণ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলল। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর আবাবিল, অর্থাৎ পাহাড়ি তালচড়াই নামে পরিচিত এক ঝাঁক পাখি পাঠালেন। এই পাখিদের প্রত্যেকে ছোলা বা মসুরের দানার সমান তিনটি করে পাথর বহন করছিল: একটি ঠোঁটে, দুটি দুই পায়ে। সেগুলো তারা আবরাহার বাহিনীর ওপর ফেলতে লাগল। পাথরগুলো সৈন্যদের মাথা দিয়ে ঢুকে সোজা শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। যে সৈন্যের গায়ে পাথর লাগত, সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যেত। পবিত্র আয়াতে যেমন জানানো হয়েছে, বাহিনীটি খেয়ে ফেলা শস্যপাতার মতো হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে আবরাহা আতঙ্কিত হয়ে পালাতে চাইল। কিন্তু পালাতে পারল না। পাথরগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল সে-ই, আর তার গায়েও পাথর লেগেছিল। পালাতে পালাতে তার গোশত টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়তে লাগল এবং শেষে সে মারা গেল। এই ঘটনা পবিত্র কুরআনের সূরা ফিলে মর্মার্থে এভাবে জানানো হয়েছে: “(হে আমার রাসূল! কাবা ধ্বংস করতে চাওয়া) হাতিওয়ালাদের (হাতি নিয়ে সজ্জিত আবরাহার বাহিনীর) সঙ্গে তোমার রব কেমন আচরণ করেছেন, তুমি কি দেখোনি? তিনি কি তাদের (কাবা মুআজ্জমা ধ্বংস করার) চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেননি? তিনি তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠালেন। সেই পাখিরা তাদের ওপর কাদা দিয়ে তৈরি ও আগুনে পোড়ানো পাথর নিক্ষেপ করছিল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের পোকায় খাওয়া শস্যপাতার মতো নিশ্চিহ্ন করে দিলেন। (তাদের পোকায় কুরে কুরে খাওয়া শস্যপাতার দশায় পরিণত করলেন।)”24

“আমি উটের মালিক। কাবারও অবশ্যই একজন মালিক আছেন। তিনিই তা রক্ষা করবেন” শাইবাতুল হামদ

আরব দেশ ও তার আশপাশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসমূহ