আমার প্রিয় নবী

ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আল্লাহ তাআলার প্রশংসা এবং তাঁর দান করা নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য অসীম শোকর… তাঁর প্রিয় নবী, সব দিক থেকে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের প্রতি, তাঁর সুন্দর চেহারা মুবারক দেখার ও উপকারী বাণী শোনার সৌভাগ্য লাভ করে যাঁরা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হয়েছেন, তাঁর সেই সকল সাহাবীর প্রতি এবং তাঁদের পথের অনুসারীদের প্রতিও দোয়া ও সালাম বর্ষিত হোক…

মানুষকে যা সুশোভিত করে, সুন্দর করে তোলে, মানুষের কাছে প্রিয় ও সম্মানিত করে, তা হলো তার উত্তম চরিত্র। পদমর্যাদা, পদবি, ধনসম্পদ কিংবা অন্য কোনো কিছুই উত্তম চরিত্রের স্থান নিতে পারে না।

হে সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ! হে সৃষ্টিকর্তার প্রিয়তম! হে নবীগণের সরদার, কল্যাণের উৎস, মানবজাতির সর্বোত্তম এবং সকল শ্রেষ্ঠত্বের আধার আমাদের মর্যাদাবান নবী! আমরা তোমার প্রশংসা করার দুঃসাহস করছি না; বরং তোমার মাধ্যমে আমাদের লেখাকে মূল্যবান করে তুলছি।

ইয়া রাসূলাল্লাহ! তোমার প্রশংসা করার সাধ্য আমার নেই,
তোমারই সম্মানে সৃষ্ট হয়েছি আমরা সবাই।

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার রাসূল, আদম সন্তানের সরদার ও নেতা। কিয়ামতের দিন যাঁদের অনুসরণ করে মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, তাঁদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে দানশীল।

কিয়ামতের দিন সবার আগে তিনিই কবর থেকে উঠবেন। সবার আগে তিনিই শাফায়াত করবেন। সবার আগে তাঁর শাফায়াতই কবুল হবে। জান্নাতের দরজায় সবার আগে তিনিই করাঘাত করবেন। দরজা তাঁর জন্য সঙ্গে সঙ্গে খুলে দেওয়া হবে। “লিওয়াউল হামদ” নামের পতাকা তাঁর হাতে থাকবে। আদম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর যুগ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত প্রত্যেক মুমিন এই পতাকার নিচে থাকবে।

এক হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন আমি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের সরদার। আমি সত্য জানিয়ে দিচ্ছি, গর্ব করছি না।” আরেক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “আমি আল্লাহ তাআলার হাবিব, তাঁর প্রিয়তম। আমি নবীগণের নেতা। গর্ব করার জন্য বলছি না।”

বিভিন্ন মুসলিম ভাষায় রচিত সকল মাওলিদ গ্রন্থেই লেখা আছে যে, আমাদের নবীর মা ও বাবা ছিলেন সম্পূর্ণ পবিত্র। পবিত্র কুরআনের পর সবচেয়ে মূল্যবান ও সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ “বুখারি শরীফ” গ্রন্থের এক হাদীস শরীফে আমাদের নবী ইরশাদ করেন, “প্রতিটি শতাব্দীতে, প্রতিটি যুগে যাঁরা বসবাস করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম ও নির্বাচিত মানুষদের থেকে আমাকে দুনিয়ায় আনা হয়েছে।”

সর্বদা সত্যভাষী সেই মহান সত্তা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আরও ইরশাদ করেন, “আমি নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) মধ্যে সর্বশেষ, এতে গর্ব করছি না। আমি আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ। আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করলেন। আমাকে সৃষ্টি করলেন মানুষের মধ্যে সর্বোত্তমদের মাঝে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন দলে ভাগ করলেন। আমাকে রাখলেন তাদের সর্বোত্তম দলে। তারপর এই সর্বোত্তম দলকে গোত্রে ভাগ করলেন। আমাকে রাখলেন সর্বোত্তম গোত্রে। তারপর এই জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ঘরে ভাগ করলেন। আমাকে সর্বোত্তম ঘর, অর্থাৎ সর্বোত্তম পরিবার থেকে দুনিয়ায় আনলেন। আমি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম। আমি সর্বোত্তম পরিবারের সন্তান। কিয়ামতে যখন সবাই নীরব থাকবে, তখন আমি কথা বলব। কেউ যখন নড়াচড়া করতে পারবে না, তখন আমিই তাদের জন্য শাফায়াতকারী। কারও মনে যখন কোনো আশা থাকবে না, তখন আমিই তাদের সুসংবাদদাতা। সেদিন সকল কল্যাণ, সব ধরনের সাহায্য এবং প্রতিটি দরজার চাবি থাকবে আমার কাছে। লিওয়াউল হামদ আমার হাতে। আমি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম, সবচেয়ে দানশীল, সবচেয়ে উত্তম। সেদিন আমার অধীনে থাকবে হাজার হাজার সেবক। কিয়ামতের দিন নবীগণের ইমাম, তাঁদের খতিব এবং তাঁদের সকলের শাফায়াতকারী আমিই। এসব কথা আমি গর্ব করার জন্য বলছি না। আমি সত্য জানিয়ে দিচ্ছি। সত্য জানিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব। এসব না বললে আমার দায়িত্ব পালন করা হতো না।”

তিনি (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) না হলে আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন না, আর তাঁর রব হওয়া ও উপাস্য (মাবুদ) হওয়ার বিষয়টিও প্রকাশ পেত না। আদম আলাইহিস সালাম যখন পানি ও মাটির মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন, অর্থাৎ যখন তাঁর মাটির খামির তৈরি হচ্ছিল, মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম তখনও নবী ছিলেন।

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার মাহবুব (প্রিয়পাত্র) বলে তাঁর পথের অনুসারীও মাহবুবের মর্যাদায় উন্নীত হয়। কেননা মুহিব, অর্থাৎ প্রেমিক, তার প্রিয়জনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য যার মধ্যেই দেখে, তাকেও ভালোবাসে।

সমগ্র মানবজাতির সরদার ও শ্রেষ্ঠ এমন নবীর প্রতি যে ঈমান আনে এবং তাঁর পথে চলে, সে নিঃসন্দেহে উম্মতসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হয়। তাদের জন্য সুসংবাদ হলো সূরা আলে ইমরানের একশো দশতম আয়াত, যার মর্মার্থ: “তোমরা উম্মতসমূহের মধ্যে, ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সর্বোত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ!” যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে না, তাঁকে বুঝতে পারে না, তাঁকে নিজেদের মতোই মনে করে, তারা মানুষের মধ্যে নিকৃষ্টতম। সূরা তাওবার সাতানব্বইতম আয়াত তাদের পরিচয় তুলে ধরে, যার মর্মার্থ: “বর্বর, কঠিনহৃদয় মূর্খরা তোমার প্রতি ঈমান আনে না। তাদের অধিকাংশই মুনাফিক (কপট)।” পৃথিবীর আজকের এই অবস্থায় যাঁরা তাঁর মহান সুন্নত (সুন্নাতে সানিয়্যা), অর্থাৎ ইসলামের অনুসরণের মর্যাদা লাভ করেছেন, তাঁরা কতই না সৌভাগ্যবান!

মহান আল্লাহ সূরা নিসার আশিতম আয়াতে জানিয়েছেন যে, মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের আনুগত্য করা মানে স্বয়ং আল্লাহরই আনুগত্য করা। মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে: “যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল।” সূরা হাশরের সপ্তম আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে: “আমার রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো!” এই পবিত্র আয়াত প্রমাণ করে যে, ইসলামের অনুসরণ করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা সূরা কলমের চতুর্থ আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ করেন: “নিঃসন্দেহে তুমি খুলুকে আজিমের (মহান চরিত্রের) অধিকারী” (সূরা কলম, ৬৮:৪)। আর সূরা আহজাবে তিনি মর্মার্থে ইরশাদ করেন: “তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে [অনুসরণযোগ্য] উত্তম আদর্শ রয়েছে” (সূরা আহজাব, ৩৩:২১)।

মহান আল্লাহ দয়া করে আমাদের রাসূলুল্লাহর উম্মত বানিয়ে নিয়ামতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিয়ামতে ধন্য করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাসূলের অনুসরণ ও আনুগত্য করা আবশ্যক। এই মহান নিয়ামতের জন্য আমরা আমাদের মহান রবের যত প্রশংসা ও শোকরই করি না কেন, তা অল্পই হবে।

এই গ্রন্থে সমগ্র মানবজাতির প্রকৃত পথপ্রদর্শক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জীবন, তাঁর উত্তম চরিত্র, মুজিযা ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, দ্বীন ও দুনিয়ার সৌভাগ্যের জন্য তাঁর অনুসরণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি।

আমরা যদি নিজেদের, পরিবারের, দেশের ও জাতির জন্য উপকারী মানুষ হতে চাই, তাহলে আসুন, মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের অনুসরণ করি। দুনিয়ায় ও আখিরাতে শান্তি ও সৌভাগ্য লাভের জন্য আসুন, তাঁর অনুসরণ করি।

হক তাআলা আমাদের সকলের হৃদয় আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের আহলে সুন্নতের আলেমগণের দেখানো সঠিক পথে অবিচল রাখুন! আমিন!

Prof. Dr. Ramazan Ayvallı