আমার প্রিয় নবী

মক্কা – তায়েফ সফর

আগামী বছরের জিলহজ মাসে আবার আসার নিয়ত করে তাঁরা দেশে ফেরার জন্য মহানবীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বিদায় নিলেন। সদ্য মুসলমান হওয়া এই ছয়জন হলেন: উকবা ইবনে আমির, আসআদ ইবনে জুরারা, আওফ ইবনে হারিস, রাফি ইবনে মালিক, কুতবা ইবনে আমির ও জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।1

মুসলমান হওয়া ছয়জন মদিনায় নিজেদের জাতির কাছে ফিরে গিয়েই ইসলাম ও আমাদের নবী সম্পর্কে বলতে এবং মানুষকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। এ কাজ তাঁরা এমন উদ্যমের সঙ্গে করলেন যে, মদিনায় এমন একটি ঘরও বাকি রইল না, যেখানে আমাদের নবী ও ইসলাম নিয়ে আলোচনা হয়নি। এভাবে খাজরাজ গোত্রে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল, আউস গোত্রেরও কিছু মানুষ মুসলমান হলেন।

তায়েফবাসীকে ঈমানের দাওয়াত

মুশরিকরা আমাদের প্রিয় নবীর অসংখ্য মুজিযা দেখলেও জেদের কারণে ঈমান আনছিল না; উপরন্তু তাদের যেসব সন্তান, ভাই, আত্মীয় ও বন্ধু মুসলমান হয়েছিলেন, তাঁদের ওপর নির্যাতন ও জুলুম চালাতে বিন্দুমাত্র পিছপা হচ্ছিল না। তাদের দিন দিন বেড়ে চলা এই জুলুম ও নির্যাতনে আমাদের প্রিয় নবী গভীরভাবে ব্যথিত হলেন। তিনি মক্কার কাছের তায়েফে গিয়ে সেখানকার মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার কথা ভাবলেন। তাই জায়েদ ইবনে হারিসাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তায়েফে গেলেন।

সেখানে তিনি তায়েফের নেতৃস্থানীয় আমরের তিন পুত্র – আবদে ইয়ালিল, হাবিব ও মাসউদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তাদের কাছে ইসলাম তুলে ধরে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানালেন। তারা ঈমান তো আনলই না, বরং তাঁকে অপমান করল; উপরন্তু বলল, “আল্লাহ তাআলা নবী পাঠানোর জন্য কি তুমি ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাননি? আল্লাহ তাআলা কি তুমি ছাড়া অন্য কাউকে নবী করে পাঠাতে অক্ষম? আমাদের দেশ থেকে বেরিয়ে যাও, যেখানে খুশি চলে যাও!… তোমার জাতি তোমার কথা মেনে নেয়নি বলেই তো তুমি এখানে এসেছ, তাই না? কসম করে বলছি, আমরাও তোমার কাছ থেকে দূরে থাকব। তোমার কোনো চাওয়াই আমরা মেনে নেব না।”

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যথিত হৃদয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। দশ দিন অথবা এক মাস তিনি সাকিফ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, কিন্তু তাদের কেউই ঈমান আনল না; উপরন্তু তারা তাঁকে উপহাস করল, নির্যাতন করল এবং পেছন থেকে দুয়োধ্বনি দিল। তিনি যে পথ দিয়ে যাবেন, তার দুই ধারে শিশু ও তরুণদের সারি করে দাঁড় করিয়ে তারা তাঁর দিকে পাথর ছোড়াল এবং তাঁর ওপর আক্রমণ চালাতে লেলিয়ে দিল। তায়েফের তরুণদের ছোড়া পাথরের সামনে হযরত জায়েদ নিজের দেহকে ঢাল বানিয়ে মহানবীর যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সে চেষ্টা করছিলেন। হযরত জায়েদ আমাদের প্রিয় নবীর চারপাশে ঘুরে ঘুরে পাথর যেন তাঁর গায়ে না লাগে, সেজন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন। মহানবীর মুবারক দেহে যেন কোনো আঘাত না লাগে, সেজন্য নিজের গায়ে লাগা পাথরের তিনি পরোয়া করছিলেন না। এমন দিনে প্রাণ উৎসর্গ করার সুযোগই কি তিনি খুঁজছিলেন না? আর এখন ওরা জগৎসমূহের সরদারকে পাথর মারছে, নির্যাতন ও জুলুম করে তাঁকে তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

রাসূলুল্লাহকে রক্ষা করার জন্য হযরত জায়েদ যতবার ডানে-বাঁয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন, ততবার পাথরগুলো একের পর এক তাঁর মাথায়, দেহে, পায়ে আঘাত হানছিল। ফলে হযরত জায়েদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত রক্তে ভেসে গেল। প্রিয় নবীকে রক্ষা করার জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছিলেন এবং পাথর নিক্ষেপকারী জালিমদের উদ্দেশে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিলেন, “থামো!… মেরো না! তিনি জগৎসমূহের সরদার! তিনি রাসূলুল্লাহ! আমার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলো, কিন্তু আমাদের নবীর যেন কোনো ক্ষতি না হয়!” যেসব পাথর জায়েদ ইবনে হারিসাকে এড়িয়ে রাসূলুল্লাহর গায়ে লাগছিল, সেগুলো তাঁর মুবারক পা দুটি রক্তাক্ত করে দিয়েছিল।

আমাদের প্রিয় নবী ব্যথিত, ক্লান্ত ও আহত অবস্থায় উতবা ও শাইবা নামের দুই ভাইয়ের আঙুরবাগানের কাছে এলেন। সকল মুমিন যাঁর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত, সেই রাসূলুল্লাহ সেখানে তাঁর মুবারক পা থেকে ঝরা রক্ত মুছে নিলেন।

অজু করে তিনি একটি গাছের নিচে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। তারপর মুবারক হাত তুলে কাতর মিনতিতে তাঁর রবের কাছে দোয়া করতে লাগলেন।

বাগানের মালিকরা এসব লক্ষ করছিল। রাসূলুল্লাহর ওপর যা ঘটেছে, তা তারা দেখেছিল, তাঁর অসহায় একাকিত্বের সাক্ষী হয়েছিল। তাদের হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক হলো। তারা আদ্দাস নামের তাদের এক গোলামের হাতে তাঁর জন্য আঙুর পাঠাল। আমাদের প্রিয় নবী আঙুর খেতে শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম) বললেন। যিনি আঙুর নিয়ে এসেছিলেন, সেই গোলাম ছিলেন খ্রিস্টান। বিসমিল্লাহ শুনে তিনি বিস্মিত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “আমি বহু বছর ধরে এখানে আছি, কারও মুখে এমন কথা শুনিনি। এ কেমন কথা?”

রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কোথাকার লোক?” আদ্দাস বললেন, “আমি নিনেভার লোক।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “তাহলে তুমি ইউনুসের (আলাইহিস সালাম) দেশের মানুষ।” আদ্দাস বললেন, “আপনি ইউনুসকে চিনলেন কী করে? এখানে তো তাঁকে কেউ চেনে না।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “তিনি আমার ভাই। তিনিও আমার মতো নবী ছিলেন।”

আদ্দাস বললেন, “এই সুন্দর মুখ, এই মধুর কথার অধিকারী মিথ্যাবাদী হতে পারেন না। আমি বিশ্বাস করলাম, আপনি আল্লাহর রাসূল।” তিনি মুসলমান হলেন এবং বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! বছরের পর বছর আমি এই জালিমদের, এই মিথ্যাবাদীদের গোলামি করেছি। তারা সবার হক মেরে খায়। সবাইকে ধোঁকা দেয়। তাদের কোনো ভালো দিকই নেই। দুনিয়ার সম্পদ জমানো আর প্রবৃত্তির কামনা মেটানোর জন্য তারা যেকোনো নীচতায় নামতে রাজি। আমি তাদের ঘৃণা করি। আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই, আপনার খেদমতের মর্যাদা লাভ করতে চাই, মূর্খ ও আহাম্মকেরা আপনার প্রতি যে অসম্মান দেখাবে, তার লক্ষ্যবস্তু হতে চাই, আপনার মুবারক দেহ রক্ষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে চাই।”2

রাসূলুল্লাহ মুচকি হেসে বললেন, “এখন তোমার মনিবদের কাছেই থাকো! অল্প কিছুদিন পর তুমি সব জায়গায় আমার নাম শুনতে পাবে। তখন আমার কাছে চলে এসো।”

“থামো!… মেরো না! তিনি জগৎসমূহের সরদার! তিনি রাসূলুল্লাহ! আমার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলো, কিন্তু আমাদের নবীর যেন কোনো ক্ষতি না হয়!” জায়েদ ইবনে হারিসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর তাঁরা মক্কার পথ ধরলেন। মক্কা পৌঁছাতে যখন আর দুই মনজিল পথ বাকি, তখন তিনি দেখলেন, একখণ্ড মেঘ তাঁদের ছায়া দিচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, এ হলেন জিবরাইল আলাইহিস সালাম। পরে আমাদের প্রিয় নবী এ ঘটনা আমাদের মা হযরত আয়েশা সিদ্দিকাকে বলেছিলেন।

“সহিহ বুখারি” গ্রন্থে এবং আহমদ ইবনে হাম্বলের “মুসনাদ” গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে: একদিন আমাদের মা হযরত আয়েশা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহুদের দিনের চেয়েও কষ্টের কোনো দিন কি আপনার জীবনে এসেছে?” রাসূলুল্লাহ এভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “আল্লাহর কসম, তোমার জাতির কাছ থেকে আমি এমন কষ্ট পেয়েছি, যা উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত কাফিরদের কাছ থেকেও পাইনি। আমি যখন ইবনে আবদে ইয়ালিল ইবনে আবদে কুলালের কাছে নিজেকে পেশ করলাম (অর্থাৎ আমার নবুয়তের কথা জানিয়ে তাকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করলাম), সে তা গ্রহণ করল না। আমি তাদের কাছ থেকে এমন গভীর যন্ত্রণা নিয়ে ফিরলাম যে, কারনুস সাআলিব নামক জায়গায় পৌঁছানো পর্যন্ত আমার হুঁশ ফেরেনি। সেখানে আমি মাথা তুললাম। দেখলাম, একখণ্ড মেঘ আমার ওপর ছায়া ফেলেছে। তাকিয়ে দেখি, মেঘের ভেতরে জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! হক তাআলা আপনার সম্পর্কে আপনার জাতির কথা শুনেছেন। তারা যে আপনাকে রক্ষা করতে চায়নি, তা-ও তিনি জেনেছেন। তিনি আপনার কাছে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন; আপনি যা চান, তাঁকে আদেশ করবেন।’ সেই ফেরেশতাও আমাকে ডেকে সালাম দেওয়ার পর বললেন, ’হে মুহাম্মদ! জিবরাইল যেমন বললেন, হক তাআলা পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা হিসেবে আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন; আপনি যা চান, আমাকে আদেশ করুন। আমি আপনার আদেশের অপেক্ষায় আছি। আপনি যদি চান যে, এই দুই খাড়া পাহাড় (কুআইকিআন পাহাড় ও আবু কুবাইস পাহাড়) মক্কাবাসীর ওপর চেপে বসার মতো একটি অন্যটির সঙ্গে মিলে যাক (এবং মুশরিকদের পুরোপুরি পিষে ফেলুক), তবে আদেশ করুন, আমি মিলিয়ে দেব।’ আমি রাজি হলাম না এবং বললাম, ’(না! আমাকে জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠানো হয়েছে।) আমি দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা যেন এই মুশরিকদের বংশ থেকে এমন এক প্রজন্ম বের করে আনেন, যারা কেবল মহান আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।’”

তায়েফ থেকে মক্কায় ফেরার পথে মহানবী নাখলা নামক স্থানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। এক সময় তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। নুসাইবিনের জিনদের একটি দল তখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিল; আমাদের প্রিয় নবী পবিত্র কুরআনের যে আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন, তা শুনে তারা থেমে গেল এবং মন দিয়ে শুনল। তারপর মহানবীর সঙ্গে কথা বলে তারা মুসলমান হলো। মহানবী তাদের বললেন, “তোমাদের জাতির কাছে গিয়ে ঈমানের প্রতি আমার দাওয়াত তাদের কাছেও পৌঁছে দাও। তাদেরও ঈমানের দিকে আহ্বান করো।”

সেই জিনেরা নিজেদের জাতির কাছে গিয়ে এ কথা জানালে যেসব জিন তা শুনল, তারা সবাই ঈমান আনল।3 এ বিষয়টি পবিত্র কুরআনের সূরা জিনে এবং “বুখারি” ও “মুসলিম” নামের প্রসিদ্ধ হাদীস শরীফের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

তিনি মক্কার কাছাকাছি পৌঁছালে মুমিনগণ রাসূলুল্লাহর কাছে খবর পাঠালেন, “তায়েফের নীচ লোকেরা আপনার সঙ্গে যে জঘন্য আচরণ করেছে, কুরাইশরা তা জেনে গেছে। এখন আপনি এলে তারা জুলুম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।” মহানবী হেরায় পৌঁছে একজনকে সুহাইল ইবনে আমরের কাছে পাঠালেন এবং অনুরোধ জানালেন, সে যেন তাঁকে নিজের আশ্রয়ে নেয়। সেই হতভাগা রাজি না হলে তিনি মুতইম ইবনে আদির কাছে খবর পাঠালেন। সে এই অনুরোধ মেনে নিল। হাবিবে আকরাম ও নবীয়ে মুহতারাম মহানবী মুতইম ইবনে আদির আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন। মুতইমও কুরাইশদের এ কথা জানিয়ে দিল। রাসূলুল্লাহ বাইতুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করলেন এবং হাজরে আসওয়াদে (কালো পাথরে) চুমু খেলেন। কয়েক দিন পর তিনি মুতইমকে বললেন, “আমি আর তোমার আশ্রয়ে থাকব না।” মুতইমও তা মেনে নিল। মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে নিজের হেফাজতে রক্ষা করলেন।

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে মুক্তি লাভ করো

রাসূল আলাইহিস সালাম মানুষকে সত্য পথে আহ্বান করে যেতে লাগলেন। এর জবাবে মুশরিকরা আবার উদ্ধত হয়ে আগের চেয়েও বেশি নির্যাতন ও জুলুম শুরু করল। তখন মহান আল্লাহ মহানবীকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন কাবা জিয়ারতের মৌসুমে জিয়ারতে আসা আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। এই আদেশের পর আমাদের প্রিয় নবী মক্কার আশপাশে বসা জুলমাজাজ, উকাজ ও মাজান্না মেলায় যেতে শুরু করলেন।

সেখানে তিনি প্রায়ই গিয়ে গোত্রগুলোকে আল্লাহ তাআলার একত্ব ও তাঁর ইবাদতের দিকে আহ্বান করতেন, নিজেকে নবী হিসেবে মেনে নেওয়ার কথা বলতেন। মেনে নিলে মহান আল্লাহ যে তাদের জান্নাত দান করবেন, তা জানাতেন। দুঃখের বিষয়, মহানবীর প্রায় অনুনয়ভরা এই দাওয়াতে তাদের কেউই কান দিত না; কেউ কেউ রূঢ় আচরণ করে তাঁকে অপমান করত, আবার কেউ কেউ মুখ বাঁকিয়ে কটু কথা বলত। কুরাইশ মুশরিকরাও তাঁর পিছু পিছু গিয়ে তিনি যেসব গোত্রের কাছে যেতেন, তাদের মন বিগড়ে দিত।

ইমাম আহমদ, বায়হাকি, তাবারানি ও ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী রাবিআ ইবনে আব্বাদ বলেছেন, “আমি তখন তরুণ। বাবার সঙ্গে মিনায় গিয়েছিলাম। রাসূল আলাইহিস সালাম আরব গোত্রগুলোর তাঁবুতে যেতেন এবং বলতেন, ‘হে অমুকের বংশধরেরা! আমি আল্লাহ তাআলার রাসূল; তিনি তোমাদের আদেশ করছেন, তোমরা যেন তোমাদের পূজিত এই মূর্তিগুলো ছুড়ে ফেলে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক না করে তাঁর ইবাদত করো, আমার প্রতি ঈমান এনে আমাকে সত্য বলে মেনে নাও এবং হক তাআলা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে পালন না করা পর্যন্ত আমাকে রক্ষা করো!…’

তাঁর পেছনে পেছনে ট্যারা চোখের, বেণি করা চুলের এক লোক ঘুরত এবং বলত, ‘হে অমুকের বংশধরেরা! এ লোক তোমাদের আমাদের মূর্তি লাত ও উজ্জার পূজা থেকে বিরত রাখতে চায় এবং নিজের বানানো এক ধর্মের দিকে ডাকছে!… সাবধান! তার কথা শুনো না, তার আনুগত্য কোরো না!…’ আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই মহান ব্যক্তির পিছু পিছু যে ঘুরছে, সে কে?’ তিনি বললেন, ‘তাঁর চাচা আবু লাহাব।’”

তাবারানি তারিক ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: “আমি রাসূল আলাইহিস সালামকে জুলমাজাজ মেলায় দেখেছিলাম। মানুষ যেন শুনতে পায়, সেজন্য তিনি উচ্চস্বরে ডেকে বলছিলেন, ’হে মানুষ! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) বলো, মুক্তি পাবে!’ এক লোক তাঁর পিছু নিয়েছিল; হাতের কাছে যে পাথর পেত, তা-ই সে তাঁর পায়ে ছুড়ে মারত এবং বলত, ‘হে লোকসকল! বিশ্বাস কোরো না!… এর থেকে সাবধান! কারণ সে মিথ্যাবাদী!…’ পাথরের আঘাতে তাঁর মুবারক পা রক্তাক্ত হয়ে গেলেও তিনি তখনো দমে না গিয়ে, ক্লান্ত না হয়ে দাওয়াত চালিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, ‘এই যুবক কে?’ একজন উত্তর দিল, ‘বনু আবদুল মুত্তালিবের এক যুবক।’ ‘আর পাথর ছুড়ছে কে?’ – এ প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, ‘তাঁর চাচা আবু লাহাব।’”

ইমাম বুখারি “তারিখুল কাবির” গ্রন্থে এবং তাবারানি “মুজামুল কাবির” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: মুদরিক ইবনে মুনিব তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন; দাদা বলেছেন, “বাবার সঙ্গে আমরা মিনায় এসে তাঁবু ফেলেছিলাম। একদল লোকের দেখা পেলাম। একজন তাদের বলছিলেন, ‘হে মানুষ! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো, মুক্তি পাবে!’ তাঁর চারপাশের লোকদের কেউ কেউ তাঁর সেই সুন্দর মুখে থুতু দিচ্ছিল, কেউ মাথায় মাটি ছিটাচ্ছিল, কেউ গালিগালাজ করে নানাভাবে অপমান করছিল। দুপুর পর্যন্ত এ অবস্থা চলল। এ সময় হাতে পানির পাত্র নিয়ে এক বালিকা সেখানে এলেন। সেই মহান ব্যক্তিকে ওই অবস্থায় দেখে বালিকা কাঁদতে লাগলেন। সেই ব্যক্তি পানি পান করার পর বালিকার দিকে ফিরে বললেন, ‘মা আমার! তোমার বাবাকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হবে, লাঞ্ছিত করা হবে – এই ভয় কোরো না!’ তারপর আমরা সেখানে উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইনি কে, আর বালিকাটি কে?’ তারা বলল, ‘ইনি বনু আবদুল মুত্তালিবের মুহাম্মদ, আর পাশের জন তাঁর কন্যা জয়নব।’”

“তিনি (ইউনুস আলাইহিস সালাম) আমার ভাই। তিনিও আমার মতো নবী ছিলেন” হাদীস শরীফ

সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ উমাভি “মাগাজি” গ্রন্থে তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি আবু নাইম ও আবদুর রহমান আমিরি থেকে, আর আবদুর রহমান আমিরি বহু লোক থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন: একদিন আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উকাজ মেলায় গেলেন। তিনি বনু আমির গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “হে বনু আমির! তোমাদের কাছে আশ্রয় নেওয়া লোকদের তোমরা কীভাবে রক্ষা করো?” তারা বলল, “কেউ আমাদের দিকে কটু কথা ছুড়তে পারে না, আমাদের অনুমতি ছাড়া আমাদের আগুনে কেউ গা গরম করতে পারে না!…” মহানবী বললেন, “আমি আল্লাহ তাআলার রাসূল। আমি তোমাদের কাছে এলে আমার রব আমাকে যে নবুয়তের দায়িত্ব দিয়েছেন, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত তোমরা কি আমাকে রক্ষা করবে?” তারা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কুরাইশের কোন শাখার লোক?” মহানবী বললেন, “বনু আবদুল মুত্তালিবের।” তখন তারা বলল, “তুমি যখন বনু আবদুল মুত্তালিবেরই লোক, তখন তারা তোমাকে রক্ষা করে না কেন?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমাকে মিথ্যাবাদী বলায় তারাই সবার আগে ছিল।” বনু আমিরের লোকেরা বলল, “হে মুহাম্মদ! আমরা তোমাকে প্রত্যাখ্যানও করছি না, তোমার আনা বিষয়ে ঈমানও আনছি না। তবে তুমি নবুয়তের দায়িত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত আমরা তোমাকে রক্ষা করব।”

এরপর মহানবী তাদের কাছে বসলেন। সে সময় বনু আমিরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বাইহারা ইবনে ফারিস মেলায় কেনাবেচা শেষ করে তাদের কাছে এল এবং মহানবীকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ কে?” তারা বলল, “ইনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ।” বাইহারা বলল, “তার সঙ্গে তোমাদের কী কাজ যে, তাকে তোমাদের কাছে বসিয়েছ?” তারা বলল, “সে আমাদের আশ্রয় চেয়েছে; সে বলছে, সে আল্লাহর রাসূল, আর নবুয়তের দায়িত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত আমরা যেন তাকে রক্ষা করি – এটাই তার অনুরোধ।” তখন বাইহারা মহানবীর দিকে ফিরে বলল, “তোমাকে রক্ষা করতে যাওয়া মানে সমস্ত আরবের তিরের সামনে আমাদের বুক পেতে দেওয়া।” আর নিজের জাতিকে বলল, “তোমাদের মতো এমন মন্দ কিছু নিয়ে কোনো গোত্র কখনো দেশে ফেরেনি। তাহলে তোমরা সমস্ত আরবের সঙ্গে যুদ্ধ করবে, তাদের তিরের সামনে নিজেদের দেহ পেতে দেবে, তাই না!… তার জাতি যদি তার মধ্যে কোনো কল্যাণ দেখত, তবে তারাই আগে তাকে রক্ষা করত। যাকে তার জাতি মিথ্যাবাদী বলে নিজেদের মধ্য থেকে দূর করে দিয়েছে, তোমরা তাকে আশ্রয় দিতে, তাকে সাহায্য করতে যাচ্ছ!… তোমরা মারাত্মক ভুল ভাবছ!…”

তারপর এই হতভাগা আমাদের প্রিয় নবীর দিকে ফিরে বলল, “এখনই আমাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে তোমার জাতির কাছে ফিরে যাও!… কসম করে বলছি, তুমি যদি আমার জাতির মধ্যে না থাকতে, এখনই তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম!…” এ কথার পর জগৎসমূহের সরদার গভীর দুঃখ নিয়ে তাঁর উটে চড়লেন। সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বাইহারা রাসূলুল্লাহকে উটের পিঠ থেকে ফেলে দিল। এ ঘটনা দেখে সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম দুবাআ বিনতে আমির নামের এক নারী আর্তনাদ করে উঠলেন এবং আত্মীয়দের ডেকে বললেন, “আল্লাহ তাআলার হাবিবের সঙ্গে এমন আচরণ তোমরা কীভাবে মেনে নিচ্ছ? আমার খাতিরে রাসূলুল্লাহকে এদের হাত থেকে রক্ষা করার মতো কেউ কি নেই?” তাঁর চাচাতো ভাইদের মধ্য থেকে তিনজন সঙ্গে সঙ্গে হতভাগা বাইহারার দিকে ছুটে গেলেন। বাইহারার জাতির দুজন লোক তাকে সাহায্য করতে চাইলেও ওই তিনজন বাইহারা ও তার সাহায্যকারীদের বেদম প্রহার করলেন। এ দৃশ্য দেখে আমাদের প্রিয় নবী তাঁর জন্য লড়াই করা সেই তিনজনের জন্য দোয়া করলেন, “হে আমার রব! এই লোকদের তোমার বরকত দান করো!” আর বাইহারা ও তার সাহায্যকারীদের জন্য দোয়া করলেন, “হে আমার রব! এদের তোমার রহমত থেকে দূরে রাখো!”

যাঁদের জন্য তিনি কল্যাণের দোয়া করেছিলেন, তাঁরা মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করলেন, আর অন্যরা কাফির অবস্থায় মারা গেল। বনু আমির গোত্রের লোকেরা দেশে ফিরে নিজেদের গোত্রের আসমানি কিতাব পড়া এক বৃদ্ধের কাছে মক্কায় ঘটে যাওয়া ঘটনা খুলে বলল। বৃদ্ধ মহানবীর নাম শুনেই তাদের তিরস্কার করে বলল, “হে বনু আমির! তোমরা এ কী করলে? ইসমাইলের বংশধরদের কেউ আজ পর্যন্ত মিথ্যা নবুয়তের দাবি করেনি। নিশ্চয়ই তিনি যা বলেছেন, তা সত্য ও হক ছিল। এই হাতছাড়া সুযোগ আর ফিরে পাওয়া খুবই কঠিন!…”

জিবরাইলের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন তিনি,
রফরফ এল তাঁর সামনে, জানাল সালাম।
সেই মুহূর্তে জগতের বাদশাহকে তুলে নিল,
সিদরার পানে তখনই নিয়ে চলল সে।

“হে মানুষ! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো, মুক্তি পাবে!” হাদীস শরীফ

ইসরা ও মিরাজ