আমার প্রিয় নবী

তাঁর বিসত1 ও দাওয়াত

জগৎসমূহের সরদারের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স যখন সাঁইত্রিশ, তখন তিনি শুনতে পেতেন, অদৃশ্য থেকে কেউ “হে মুহাম্মদ!” বলে তাঁকে ডাকছে। আটত্রিশ বছরে পা দিলে তিনি কিছু নূর দেখতে শুরু করলেন। নিজের এসব অবস্থার কথা তিনি কেবল আমাদের মা হযরত খাদিজাকে বলতেন। মুহাম্মদ আলাইহিস সালামকে নবুয়ত জানানোর সময় ঘনিয়ে এলে (প্রায় দশ বছর আগে) সে যুগের বিখ্যাত সাহিত্যিকদের অন্যতম কুস ইবনে সাইদা উকাজ মেলায় উটের পিঠে বসে বিশাল জনসমাগমের সামনে যে খুতবা দিয়েছিলেন, তাতে তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবীও এই খুতবার শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন। কুস ইবনে সাইদা তাঁর এই বিখ্যাত খুতবার একাংশে বলেছিলেন:

“হে মানুষ! এসো, শোনো, অপেক্ষা করো, শিক্ষা গ্রহণ করো! যে বেঁচে আছে, সে মরবে; যে মরে, সে বিলীন হয়; যা হওয়ার, তা হবেই!… কান পাতো, ভালো করে শোনো! আকাশে আছে সংবাদ, পৃথিবীতে আছে শিক্ষা নেওয়ার মতো বহু নিদর্শন!… আল্লাহর কাছে একটি দ্বীন আছে!… আর আল্লাহর একজন নবী আছেন, যিনি আসবেন। তাঁর আগমন খুবই নিকটে। তাঁর ছায়া তোমাদের মাথার ওপর এসে পড়েছে। যারা তাঁর কথা শুনবে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, তারা কতই না বরকতময়! ধিক সেই হতভাগাকে, যে তাঁর অবাধ্য হবে ও বিরোধিতা করবে! আফসোস সেই উম্মতদের জন্য, যাদের জীবন গাফিলতিতে কেটে যায়!…”

সে সময় আরবে মানুষ ঐশী মানদণ্ড থেকে দূরে সরে গিয়েছিল; ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, প্রভু-গোলাম – এভাবে নানা শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। প্রথম শ্রেণির লোকেরা পরের শ্রেণির লোকদের নিজেদের আধিপত্যের নিচে পিষ্ট করত, তাদের মানুষ বলেই গণ্য করত না। দুর্বলদের সম্পদ জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া হতো, তা প্রতিরোধ করার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান যে লজ্জা ও ভয় জাগায়, তা থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা মর্যাদাপূর্ণ গুণাবলি থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছিল। সব ধরনের অনৈতিকতা, মানসম্মান ও ইজ্জত পদদলিত করার মতো হীন কাজ অবাধে চলত; জুয়া, মদ ও আমোদ-ফুর্তির আসরকে কেউ মন্দ মনে করত না। একটানা হত্যা, ব্যভিচার ও আক্রমণের ঘটনায় চারদিক ছারখার হয়ে যাচ্ছিল; নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ ও করুণ চিৎকার আরশ পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলছিল। নৈতিক দিক থেকে চরম অধঃপতন বিরাজ করছিল, মানুষ অজ্ঞতার সাগরে ডুবে যাচ্ছিল। নারীকে সাধারণ পণ্যের মতো কেনাবেচা করা হতো; কন্যাশিশুদের নির্দয়ভাবে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো। সবচেয়ে খারাপ বিষয় ছিল, কঠিনহৃদয়, একগুঁয়ে ও দয়ামায়াহীন এসব মানুষ নিজেদের হাতে বানানো, কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে অক্ষম মূর্তির পূজা করাকে বিরাট সম্মানের কাজ মনে করত।

আদম আলাইহিস সালামের পর থেকে দুনিয়ায় এমন বর্বরতা, পথভ্রষ্টতা, অনৈতিকতা, অবিশ্বাস ও উচ্ছৃঙ্খলতা আর দেখা যায়নি। মানুষ যেন একেকটি হিংস্র পশুর রূপ ধারণ করেছিল। প্রত্যেকে একে অপরের শত্রু; সমাজ যেন যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত। মানুষের শান্তি লাভের জন্য এই অন্ধকারে এক সৌভাগ্যের সূর্য উদিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। সেই সূর্য উদিত হলে অবিশ্বাসের জায়গা নেবে ঈমান, জুলুমের জায়গা নেবে ন্যায়বিচার, অজ্ঞতার জায়গা নেবে জ্ঞান, আর মানুষ লাভ করবে অনন্ত সৌভাগ্য।

অবশেষে আমাদের প্রিয় নবীকে প্রথমে সত্য স্বপ্ন দেখানো শুরু হলো। হাদীস শরীফে জানানো হয়েছে, ওহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন, হুবহু তা-ই ঘটত। এ অবস্থা ছয় মাস চলল। ওহী আসার সময় ঘনিয়ে এলে “হে মুহাম্মদ!” বলে ডাকা আওয়াজ বেড়ে গেল। এরপর তিনি নির্জনতাকে ভালোবেসে মানুষ থেকে দূরে সরে হেরা পাহাড়ের একটি গুহায় গভীর চিন্তায় মগ্ন হতে লাগলেন। কখনো কখনো তিনি মক্কায় এসে কাবা তাওয়াফ করতেন এবং তাঁর সৌভাগ্যময় গৃহে যেতেন। সেখানে কিছুকাল থেকে সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে আবার হেরা পাহাড়ের গুহায় ফিরে যেতেন এবং চিন্তা ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। কখনো কখনো সেখানে দিনের পর দিন থাকতেন। তখন হযরত খাদিজা খাবার পাঠাতেন অথবা নিজেই নিয়ে যেতেন।2

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম হাজরে আসওয়াদ তাঁর বরকতময় চাদরের ওপর রেখে বললেন, “প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে এর এক এক প্রান্ত ধরুক” আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদুল আমিন (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

প্রথম ওহী

চল্লিশ বছর বয়সে মহানবী আবারও এক রমজান মাসে হেরা পাহাড়ের গুহায় নির্জনবাসে গিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। রমজানের ১৭ তারিখ সোমবার রাতে, মধ্যরাতের পর তিনি তাঁর নাম ধরে ডাকা একটি আওয়াজ শুনলেন। মাথা তুলে চারদিকে তাকালে দ্বিতীয়বার একই আওয়াজ শুনলেন এবং দেখলেন, হঠাৎ এক নূর চারদিক ছেয়ে ফেলেছে। এরপর জিবরাইল3 আলাইহিস সালাম তাঁর সামনে এলেন এবং বললেন, “পড়ুন!” মহানবী তাঁকে উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে জানি না!” তখন ফেরেশতা তাঁকে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, তাঁর শক্তি নিঃশেষ হয়ে এল; তারপর বললেন, “পড়ুন!” তিনি আবারও উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে জানি না!” ফেরেশতা আরেকবার চাপ দিয়ে বললেন, “পড়ুন!” তিনি “আমি পড়তে জানি না!” বললে ফেরেশতা তৃতীয়বার চাপ দিলেন। তারপর তাঁকে ছেড়ে দিলেন এবং সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত নিয়ে এলেন, যার মর্মার্থ: “(হে মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম!) পড়ো তোমার রব আল্লাহর নামে, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন! তিনি মানুষকে জমাট রক্ত (আলাক) থেকে সৃষ্টি করেছেন! পড়ো, আর আল্লাহ মহান দানশীল! তিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দেন, মানুষকে শিক্ষা দেন যা সে জানত না।”4 মুহাম্মদ আলাইহিস সালামও তাঁর সঙ্গে পড়লেন। এভাবেই প্রথম ওহী এল, আর সমগ্র জগৎ আলোকিত করা ইসলামের সূর্য এভাবেই উদিত হলো।5

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গভীর শিহরন ও উত্তেজনা নিয়ে হেরা পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে নিচে নামতে শুরু করলেন। পাহাড়ের মাঝামাঝি পৌঁছালে তিনি একটি আওয়াজ শুনলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল, আর আমি জিবরাইল।” এ কথা বলে তিনি গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। আঘাতের স্থান থেকে পানি বের হলো, আর তিনি অজু করতে শুরু করলেন। মহানবী মনোযোগ দিয়ে তা দেখছিলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম অজু শেষ করে মহানবীকে বললেন, তিনি যেমন দেখেছেন, ঠিক তেমনভাবে যেন অজু করেন। আমাদের প্রিয় নবী অজু শেষ করলে জিবরাইল আলাইহিস সালাম ইমাম6 হলেন এবং তাঁরা দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন।

এরপর জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “হে মুহাম্মদ! আপনার রব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন!” তারপর জানালেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তুমি জিন ও মানুষের প্রতি আমার রাসূল। অতএব তাদের তাওহিদের দিকে আহ্বান করো।” তারপর তিনি বিদায় নিয়ে আসমানে উঠে গেলেন। এভাবে আমাদের প্রিয় নবী জিবরাইল আলাইহিস সালামকে দেখলেনও, তাঁর সঙ্গে কথাও বললেন।

পাথর ও গাছের সালাম

মহানবী তাঁর সৌভাগ্যময় গৃহে পৌঁছানো পর্যন্ত পাশ দিয়ে যাওয়া প্রতিটি পাথর ও প্রতিটি গাছকে বলতে শুনলেন, “আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ!” ঘরে এসে তিনি বললেন, “আমাকে ঢেকে দাও! আমাকে ঢেকে দাও!” এবং কম্পন থেমে যাওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নিলেন। তারপর যা দেখেছিলেন, তা আমাদের মা হযরত খাদিজাকে জানালেন এবং বললেন, “জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমার চোখের আড়ালে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর প্রতাপ, প্রচণ্ডতা ও ভীতি আমার ওপর থেকে যায়নি। আমার ভয় হলো, লোকেরা আমাকে পাগল বলবে, কটূক্তি করে আমার নিন্দা করবে।” হযরত খাদিজা এই অবস্থা ও এই দিনগুলোরই অপেক্ষায় ছিলেন এবং এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বললেন, “আল্লাহ তাআলা রক্ষা করুন। হক তাআলা আপনাকে কল্যাণই দান করবেন, আপনার জন্য কল্যাণ ছাড়া আর কিছু চাইবেন না। আল্লাহ তাআলার কসম, আমি বিশ্বাস করি, আপনি এই উম্মতের নবী হবেন। কারণ আপনি অতিথিকে ভালোবাসেন। আপনি সত্য বলেন, আপনি বিশ্বস্ত। আপনি অসহায়দের সাহায্য করেন, ইয়াতিমদের রক্ষা করেন, পরদেশিদের সহায়তা করেন। আপনি সচ্চরিত্র; এমন গুণের অধিকারীর কোনো ভয় নেই।”7

তারপর তাঁরা এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে গেলেন। রাসূলুল্লাহর বর্ণনা শুনে ওয়ারাকা বললেন, “সুসংবাদ, হে মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম! আল্লাহ তাআলার কসম, আপনিই সেই শেষ নবী, যাঁর সংবাদ হযরত ঈসা দিয়েছিলেন। আপনার সামনে যে ফেরেশতা আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি সেই জিবরাইল আলাইহিস সালাম, যিনি আপনার আগে মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসেছিলেন। আহ! হায়, আমি যদি যুবক হতাম! যখন তারা আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দেবে, সেই সময় পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকতাম আর আপনার সাহায্যে ছুটে যেতে পারতাম! খুব শিগগিরই আপনাকে দ্বীন প্রচার ও জিহাদের আদেশ দেওয়া হবে।” তারপর তিনি মহানবীর বরকতময় হাতে চুমু খেলেন। এর কিছুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।8

প্রচারের আদেশ আসা

আমাদের প্রিয় নবীর কাছে তাঁর নবুয়ত জানিয়ে দেওয়া প্রথম ওহী এভাবেই এসেছিল। তারপর ওহী বন্ধ হয়ে গেল এবং তিন বছর এল না। এর মধ্যে ইসরাফিল আলাইহিস সালাম নামের ফেরেশতা এসে তাঁকে কিছু বিষয় শিখিয়েছিলেন। এগুলো ওহী ছিল না। এ সময়ের মধ্যে রাসূলুল্লাহ মাঝে মাঝে অত্যন্ত ব্যথিত হতেন। তিনি যখনই দুঃখিত হতেন, জিবরাইল আলাইহিস সালাম আবির্ভূত হয়ে বলতেন, “হে হাবিবুল্লাহ! আপনি আল্লাহ তাআলার নবী” – আর এভাবে তাঁর দুঃখ প্রশমিত করতেন। মহানবী ইরশাদ করেন, “তখন ওহী বন্ধ ছিল। হেরা পাহাড় থেকে নিচে নামছিলাম, হঠাৎ আকাশের দিক থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম। ওপরে তাকালাম এবং জিবরাইলকে (আলাইহিস সালাম) দেখলাম। তিনি আসমান ও জমিনের মাঝখানে একটি কুরসির ওপর বসে ছিলেন। আমার ভয় হলো। ঘরে ফিরে বললাম, ‘আমাকে কিছু একটা দিয়ে ঢেকে দাও।’ তখন হক তাআলা সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম আয়াতগুলো9 নাজিল করলেন, যার মর্মার্থ: ’হে চাদরাবৃত মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম! ওঠো এবং (কাফিরদের আল্লাহ তাআলার আজাবের) ভয় দেখাও! তোমার রবের বড়ত্ব ঘোষণা করো, তাঁর মহিমা প্রকাশ করো! তোমার পোশাক পবিত্র রাখো!’ এরপর থেকে ওহী আর বন্ধ হয়নি।”

ফখরে কায়েনাত (আলাইহি আফজালুস সালাওয়াত) মহানবী মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে এবং আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ প্রচার করতে শুরু করলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম ওহী নিয়ে আসার সময় কখনো মানুষের রূপ ধারণ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম দিহয়া কালবির আকৃতিতে আসতেন। কখনো তিনি ওহী মহানবীর অন্তরে ঢেলে দিতেন; তখন রাসূলুল্লাহ তাঁকে দেখতে পেতেন না। কখনো ওহী আসত স্বপ্নের মাধ্যমে, আবার কখনো ভীতিকর এক গুঞ্জনধ্বনির সঙ্গে।

মহানবীর জন্য ওহীর সবচেয়ে ভারী ও কঠিন রূপ ছিল এটিই। এমন অবস্থায় সবচেয়ে ঠান্ডা দিনেও রাসূলুল্লাহর বরকতময় ললাট থেকে ঘাম ঝরত; তিনি উটের পিঠে থাকলে ওহীর ভারে উট মাটিতে বসে পড়ত। তাঁর কাছে থাকা সাহাবীগণও ওহীর ভার অনুভব করতেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম কয়েকবার নিজের আসল আকৃতিতেও এসেছিলেন।

“হে চাদরাবৃত মুহাম্মদ! ওঠো এবং (কাফিরদের আল্লাহ তাআলার আজাবের) ভয় দেখাও! তোমার রবের বড়ত্ব ঘোষণা করো, তাঁর মহিমা প্রকাশ করো!” মুদ্দাসসির: ১–৩

আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা ও পর্দা ছাড়া, অর্থাৎ কোনো মাধ্যম ছাড়াও মহানবীর কাছে ওহী পাঠিয়েছেন। এটি ঘটেছিল মিরাজের রাতে। প্রথম ওহী আসার মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুয়তের দায়িত্ব শুরু করেন; তাঁর ইসলাম প্রচার তেইশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এর তেরো বছর কেটেছে মক্কায়, আর দশ বছর মদিনায়। পবিত্র কুরআন ২২ বছর ২ মাস ২২ দিনের মতো সময়ে নাজিল হয়ে পূর্ণতা লাভ করে।

মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম ছিলেন উম্মি, অর্থাৎ তিনি কোনো বই পড়েননি, কিছু লেখেননি এবং কারও কাছে পাঠ গ্রহণ করেননি। তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করে বড় হয়েছিলেন, পরিচিত কিছু মানুষের মধ্যে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। এ সত্ত্বেও তিনি তাওরাত, ইঞ্জিল এবং গ্রিক ও রোমান যুগে লেখা গ্রন্থসমূহে থাকা তথ্য ও ঘটনাবলির সংবাদ দিয়েছেন। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য তিনি হিজরতের ষষ্ঠ বছরের শেষে ও সপ্তম বছরের শুরুতে বাইজান্টাইন, ইরান ও হাবশার শাসকদের এবং অন্যান্য আরব বাদশাহর কাছে চিঠি পাঠান। তাঁর দরবারে ষাটজনেরও বেশি বিদেশি দূত এসেছিল। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে মর্মার্থে জানানো হয়েছে, “এই পবিত্র কুরআন আসার আগে তুমি কোনো কিতাব পড়োনি। নিজ হাতে কিছু লেখোনি। তুমি যদি পড়তে-লিখতে জানতে, তবে তারা বলতে পারত, তুমি অন্যদের কাছ থেকে শিখেছ।”10

হাদীস শরীফেও ইরশাদ হয়েছে, “আমি উম্মি নবী মুহাম্মদ… আমার পরে আর কোনো নবী নেই।”11 পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, “তিনি (মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম) নিজে থেকে কিছু বলেন না। তাঁর কথাগুলো তাঁকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়, শেখানো হয়।”12

প্রথম মুসলমানগণ (সাবিকুনে ইসলাম)

মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে প্রথম ওহী আসার পর সর্বপ্রথম ঈমান আনেন আমাদের মা হযরত খাদিজা।13 তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তখনই ইসলাম গ্রহণ করে প্রথম মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

জিবরাইল আলাইহিস সালাম যেভাবে শিখিয়েছিলেন, মহানবী সেভাবে আমাদের মা হযরত খাদিজাকে অজু করা শেখালেন। তারপর মহানবী ইমাম হলেন এবং তাঁরা একসঙ্গে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। আমাদের মা হযরত খাদিজা আমাদের প্রিয় নবীর প্রতিটি কথা ও প্রতিটি আদেশ সবচেয়ে পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতেন। এভাবে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে অতি উচ্চ মর্যাদা লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ দুঃখিত হলে, অস্বীকারকারীদের উপহাসে কষ্ট পেলে তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন, তাঁর দুঃখ দূর করতেন। তিনি বলতেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! একটুও দুঃখ করবেন না, চিন্তিত হবেন না। শেষ পর্যন্ত আমাদের দ্বীন শক্তিশালী হবে, মুশরিকরা ধ্বংস হবে। আপনার সম্প্রদায় আপনার আনুগত্য করবে…” আমাদের মা হযরত খাদিজার এসব সহযোগিতার কারণে একদিন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! খাদিজাকে আল্লাহ তাআলার সালাম পৌঁছে দিন।” মহানবী বললেন, “হে খাদিজা! এই যে জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) তোমাকে আল্লাহ তাআলার সালাম পৌঁছে দিচ্ছেন।”14

মহানবী আরেকবার ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন, আমি যেন খাদিজাকে জান্নাতে মুক্তার তৈরি একটি ঘরের সুসংবাদ দিই। সেখানে কোনো রোগ, দুঃখ ও মাথাব্যথা নেই।”

হযরত খাদিজার পর বড়দের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলমান হন রাসূলুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অন্যতম হযরত আবু বকর। হযরত আবু বকর এর বিশ বছর আগে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন: “আকাশ থেকে পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসে কাবা মুআজ্জমায় এল, টুকরো টুকরো হয়ে গেল, প্রতিটি টুকরো মক্কার একেকটি ঘরের ওপর পড়ল; তারপর টুকরোগুলো একত্র হয়ে আকাশে উঠে গেল। কিন্তু আবু বকরের ঘরে পড়া টুকরোটি আকাশে উঠল না। এ দৃশ্য দেখে হযরত আবু বকর তৎক্ষণাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন, যেন চাঁদের এই টুকরো চলে যেতে না পারে।”

আবু বকর উত্তেজিত অবস্থায় স্বপ্ন থেকে জেগে উঠলেন এবং সকাল হতেই ছুটে গিয়ে এক ইহুদি পণ্ডিতকে স্বপ্নের কথা বললেন। সেই পণ্ডিত উত্তরে বলল, “এটি এলোমেলো স্বপ্নগুলোর একটি, তাই এর ব্যাখ্যা হয় না।” কিন্তু এই স্বপ্ন আবু বকরের মনকে অস্থির করেই চলল; ইহুদির উত্তরও তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারল না। একবার বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় তাঁর পথ পড়ল পাদরি বাহিরার এলাকায়। তিনি বাহিরার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে বাহিরা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোথাকার লোক?” হযরত আবু বকর “কুরাইশের” বলে উত্তর দিলে বাহিরা বলল, “সেখানে একজন নবী আবির্ভূত হবেন, আর হিদায়াতের নূর মক্কার প্রতিটি কোণে পৌঁছে যাবে। তুমি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর উজির হবে, আর তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর খলিফা হবে।” এই উত্তরে হযরত আবু বকর অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। এই স্বপ্ন ও এর ব্যাখ্যার কথা তিনি মহানবী নবুয়ত ঘোষণা করা পর্যন্ত কাউকে বলেননি। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম নবুয়ত ঘোষণা করলে হযরত আবু বকর সঙ্গে সঙ্গে মহানবীর কাছে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “নবীদের নবুয়তের পক্ষে প্রমাণ থাকে; আপনার প্রমাণ কী?” মহানবী উত্তরে বললেন, “আমার নবুয়তের প্রমাণ সেই স্বপ্ন, যার ব্যাখ্যা তুমি এক ইহুদি পণ্ডিতের কাছে জানতে চেয়েছিলে। সেই পণ্ডিত বলেছিল, ‘এটি এলোমেলো স্বপ্ন, এর ব্যাখ্যা হয় না।’ পরে পাদরি বাহিরা এর সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছিল।” তারপর হযরত আবু বকরকে সম্বোধন করে বললেন, “হে আবু বকর! আমি তোমাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করছি।”

তখন হযরত আবু বকর বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল; আপনার নবুয়ত সত্য এবং তা জগৎ আলোকিত করা এক নূর।” – এ কথা বলে তিনি মুসলমান হলেন।

অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবীর কাছে নবুয়ত আসার আগেই হযরত আবু বকর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। এই সফরে ইয়েমেনে আজদ গোত্রের বহু কিতাব পড়া এক বৃদ্ধের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। বৃদ্ধ হযরত আবু বকরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ধারণা, তুমি মক্কার লোক।” হযরত আবু বকর বললেন, “হ্যাঁ, তা-ই।” তারপর তাঁদের মধ্যে এই কথোপকথন হলো:

– তুমি কি কুরাইশের?

– হ্যাঁ!

– বনু তামিমের?

– হ্যাঁ!

– আরও একটি নিদর্শন বাকি আছে। – সেটি কী?

– তোমার পেট খোলো, দেখি।

– বলো, এতে তোমার উদ্দেশ্য কী?

– আমি কিতাবসমূহে পড়েছি, মক্কায় একজন নবী আসবেন। দুজন ব্যক্তি তাঁর সাহায্যকারী হবেন। একজন যুবক, অন্যজন বৃদ্ধ। যুবকটি বহু কঠিন বিষয়কে সহজ করে দেবেন, বহু বিপদ দূর করবেন। আর সেই বৃদ্ধের চেহারা ফরসা, কোমর সরু, আর পেটের ওপর একটি কালো তিল আছে। আমার ধারণা, সেই ব্যক্তি তুমিই। তোমার পেট খোলো, দেখি।

“তিনি (মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম) নিজে থেকে কিছু বলেন না। তাঁর কথাগুলো তাঁকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়, শেখানো হয়” নাজম: ৩–৪

তখন হযরত আবু বকর তাঁর পেট খুললেন; নাভির ওপর কালো তিলটি দেখে বৃদ্ধ বলল, “আল্লাহর কসম, সেই ব্যক্তি তুমিই।” তারপর সে আবু বকরকে অনেক উপদেশ দিল। হযরত আবু বকর কাজ শেষ করে বিদায় নেওয়ার জন্য বৃদ্ধের কাছে এলেন এবং মহানবী সম্পর্কে কয়েকটি বয়েত শোনানোর অনুরোধ করলেন। তখন বৃদ্ধ বারোটি বয়েত আবৃত্তি করল, আর হযরত আবু বকর সেগুলো মুখস্থ করে নিলেন।

হযরত আবু বকর সফর থেকে মক্কা মুকাররমায় ফিরলে উকবা ইবনে আবি মুআইত, শাইবা, আবু জাহল, আবুল বাখতারির মতো কুরাইশের নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁকে দেখতে তাঁর বাড়িতে এল। হযরত আবু বকর তাদের বললেন, “তোমাদের মধ্যে কোনো ঘটনা ঘটেছে কি?” তারা উত্তরে বলল, “এর চেয়ে আজব ঘটনা আর কী হতে পারে! আবু তালিবের ইয়াতিম নবুয়তের দাবি করছে এবং বলছে, তোমরা, তোমাদের বাপ-দাদারা সবাই বাতিল ধর্মের ওপর আছ। তোমার খাতির না থাকলে আমরা তাকে এতদিন বাঁচিয়ে রাখতাম না। তুমি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু; এ ব্যাপারটা তুমিই মিটিয়ে দাও।”

হযরত আবু বকর তাদের বিদায় করে জানতে পারলেন, মহানবী হযরত খাদিজার ঘরে আছেন। তিনি গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। মহানবী তাঁকে স্বাগত জানালে আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুহাম্মদ! আপনার সম্পর্কে এসব কী বলা হচ্ছে?” মহানবী বললেন, “আমি হক তাআলার নবী। আমাকে তোমার কাছে এবং সমস্ত আদম সন্তানের কাছে পাঠানো হয়েছে। ঈমান আনো, যাতে হক তাআলার সন্তুষ্টি লাভ করো এবং নিজের প্রাণকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো।”

হযরত আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, “এর প্রমাণ কী?” রাসূলে আকরাম বললেন, “প্রমাণ হলো ইয়েমেনে তুমি যে বৃদ্ধকে দেখেছিলে, তার ঘটনা।” হযরত আবু বকর বললেন, “ইয়েমেনে আমি তো বহু বৃদ্ধ ও যুবক দেখেছি।” মহানবী উত্তরে বললেন, “সেই বৃদ্ধ, যে তোমার কাছে বারোটি বয়েত আমানত রেখে আমার কাছে পাঠিয়েছিল।” এ কথা বলে তিনি সেই বয়েতগুলোর সবই পড়ে শোনালেন। হযরত আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, “এ কথা আপনাকে কে জানাল?” মহানবী উত্তর দিলেন, “আমার আগের নবীদের কাছে যে ফেরেশতা আসতেন, তিনিই জানিয়েছেন।” এ কথা বলামাত্র হযরত আবু বকর “আপনার হাতটি আমাকে দিন” বলে তাঁর বরকতময় হাত ধরলেন এবং “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু” বলে মুসলমান হলেন।15 জীবনে প্রথমবারের মতো এমন গভীর আনন্দ অনুভব করে হযরত আবু বকর মুসলমান হয়ে ঘরে ফিরলেন। হাদীস শরীফেও ইরশাদ হয়েছে, “আমি যাকেই ঈমানের দাওয়াত দিয়েছি, সে-ই মুখ কুঁচকেছে, দ্বিধাভরে তাকিয়েছে। কেবল আবু বকর সিদ্দিকই ঈমান গ্রহণে একটুও দ্বিধা করেননি, একটুও থেমে থাকেননি।”

একদিন মহানবী আমাদের মা হযরত খাদিজার সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলেন, এমন সময় হযরত আলি তাঁদের দেখলেন। তখন তাঁর বয়স দশ বা বারো বছর। নামাজের পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী?” রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “এটি আল্লাহ তাআলার দ্বীন। আমি তোমাকে এই দ্বীনের দিকে আহ্বান করছি। আল্লাহ তাআলা এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি তোমাকে আহ্বান করছি সেই এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে, যাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, কোনো শরিকও নেই…” হযরত আলি বললেন, “আগে আমি বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে নেব।” রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন, “যদি ইসলাম গ্রহণ না করো, তবে এই গোপন কথা কাউকে বলবে না!” পরদিন সকালে হযরত আলি রাসূলুল্লাহর দরবারে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে ইসলাম শিখিয়ে দিন” – এবং মুসলমান হলেন।16

হযরত আলি ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তৃতীয়। রাসূলে আকরামের পথে তিনি যে আত্মত্যাগ দেখিয়েছেন এবং তাঁকে নিজের ওপর যে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তা সব ধরনের প্রশংসার ঊর্ধ্বে।

জায়েদ ইবনে হারিসা ছিলেন প্রথম ঈমান আনয়নকারীদের একজন। তিনি হযরত খাদিজা, হযরত আবু বকর ও হযরত আলির পর চতুর্থ, আর আজাদকৃত গোলামদের মধ্যে প্রথম মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী উম্মে আইমানও মুসলমান হয়েছিলেন।17

হযরত আবু বকর মুসলমান হয়েই তাঁর প্রিয় বন্ধুদের কাছে ছুটে গেলেন। তাঁদেরও মুসলমান হতে রাজি করালেন। সাহাবায়ে কেরামের নেতৃস্থানীয়দের মধ্য থেকে উসমান ইবনে আফফান, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, জুবাইর ইবনে আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মতো নিজ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ও মহান ব্যক্তিরা তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।18 আমাদের মা হযরত খাদিজার পরে মুসলমান হওয়া এই আটজনকে সাবিকুনে ইসলাম, অর্থাৎ প্রথম মুসলমানগণ বলা হয়। হযরত উসমান তাঁর মুসলমান হওয়ার ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন, “আমার এক খালা ছিল গণক। একদিন আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে আমাকে বলল, ‘তোমার ভাগ্যে একজন স্ত্রী আছে। তবে তার আগে তুমি কোনো নারীকে দেখোনি, সেও তোমার আগে কোনো পুরুষকে দেখেনি। সে হবে সুন্দর চেহারার, দুনিয়াবিমুখ এক নারী এবং এক মহান নবীর কন্যা।’

খালার এ কথায় আমি অবাক হলাম। সে আমাকে আরও বলল, ‘একজন নবী এসেছেন। তাঁর ওপর আসমান থেকে ওহী নাজিল হয়েছে।’ আমি বললাম, ‘খালা! এমন কোনো গোপন কথা তো শহরে একটুও শোনা যায়নি। তাহলে কথাটা খুলে বলো।’ তখন খালা বলল, ‘মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর কাছে নবুয়ত এসেছে। তিনি মানুষকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর দ্বীনে জগৎ আলোকিত হবে, আর যারা বিরোধিতা করবে, তাদের মাথা কাটা পড়বে।’

খালার এই কথাগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। হযরত আবু বকরের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব ছিল; আমরা একে অপরকে ছেড়ে কখনো থাকতাম না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য দুদিন পর আমি হযরত আবু বকরের কাছে গেলাম। খালার কথাগুলো জানালে তিনি আমাকে বললেন, ‘হে উসমান! তুমি বুদ্ধিমান মানুষ। যে কয়েকটি পাথর দেখে না, শোনে না, কোনো কিছুর উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না, সেগুলো কীভাবে উপাস্য হওয়ার যোগ্য হতে পারে?’ আমি বললাম, ‘আপনি ঠিক বলেছেন; আমার খালার কথাই সত্য।’”

হযরত উসমানকে ইসলাম সম্পর্কে বুঝিয়ে বলার পর হযরত আবু বকর তাঁকে রাসূলুস সাকালাইন, অর্থাৎ মানুষ ও জিনের নবী আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে নিয়ে গেলেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত উসমানকে বললেন, “হে উসমান! হক তাআলা তোমাকে জান্নাতের মেহমান হওয়ার দাওয়াত দিচ্ছেন। তুমিও এই দাওয়াত কবুল করো। আমাকে সমস্ত মানুষের জন্য হিদায়াতের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠানো হয়েছে।” রাসূলুল্লাহর মহান অবস্থা এবং হাসিমুখে বলা কথায় আত্মহারা হয়ে হযরত উসমান গভীর আকুলতা ও আত্মসমর্পণের সঙ্গে “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু” বলে মুসলমান হলেন।

নবুয়তের প্রথম তিন বছর রাসূলুল্লাহ মানুষকে গোপনে ইসলামের দিকে আহ্বান করেছিলেন। মানুষ ধীরে ধীরে, এক-দুজন করে মুসলমান হচ্ছিল। এ সময়ের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ত্রিশে পৌঁছেছিল। তাঁরা নিজেদের ঘরে ইবাদত করতেন এবং পবিত্র কুরআনের নাজিল হওয়া আয়াতগুলো গোপনে পড়তেন ও মুখস্থ করতেন।

“সাবিকুনে ইসলাম, অর্থাৎ প্রথম মুসলমানগণ: আবু বকর সিদ্দিক, আলি ইবনে আবি তালিব, জায়েদ ইবনে হারিসা, উসমান ইবনে আফফান, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, জুবাইর ইবনে আওয়াম ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ” (রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)

নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত

সূরা মুদ্দাসসির নাজিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ মানুষকে ইসলাম ধর্মের দিকে আহ্বান করতে শুরু করেছিলেন। এই দাওয়াত তিনি গোপনে দিচ্ছিলেন। কিছুকাল পর এই পবিত্র আয়াত নাজিল হলো, যার মর্মার্থ: “তোমার নিকটাত্মীয়দের আল্লাহ তাআলার আজাবের ভয় দেখিয়ে সত্য দ্বীনের দিকে আহ্বান করো।”19 এরপর আমাদের নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম আত্মীয়স্বজনকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য হযরত আলিকে পাঠালেন এবং তাদের সবাইকে আবু তালিবের ঘরে ডাকলেন। তিনি তাদের সামনে একজনের জন্য যথেষ্ট এক থালা খাবার ও এক পেয়ালা দুধ রাখলেন। প্রথমে নিজে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলেন, তারপর আগত আত্মীয়দের বললেন, “আসুন, শুরু করুন।” আগতদের সংখ্যা ছিল চল্লিশজন। কিন্তু রাখা খাবার তাদের সবাইকে তৃপ্ত করল এবং একটুও কমল না। আগতরা এই মুজিযা দেখে হতবাক হয়ে গেল। খাওয়ার পর মহানবী আত্মীয়দের ইসলামের দিকে আহ্বান করার জন্য কথা শুরু করতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর চাচা আবু লাহাব শত্রুতাবশত বলল, “আজকের মতো জাদু আমরা কখনো দেখিনি। তোমাদের আত্মীয় তোমাদের জাদু দিয়ে বশ করেছে। হে ভাতিজা! তুমি যে অনিষ্ট ও মন্দ নিয়ে এসেছ, এমন অনিষ্ট আনা আর কাউকে আমি দেখিনি।” – এভাবে সে অপমানজনক কথা বলেই চলল।

আমাদের নবী আবু লাহাবকে বললেন, “কুরাইশ ও সমস্ত আরব গোত্র যে অনিষ্ট করতে পারত না, তুমি আমার সেই অনিষ্ট করলে!” তাদের কেউই মুসলমান না হয়ে চলে গেল। এ ঘটনার কিছুদিন পর তিনি আবার আত্মীয়দের দাওয়াত দিলেন। হযরত আলি আবারও তাদের সবাইকে ডেকে আনলেন।

আগের মতোই তাদের সামনে খাবার রাখা হলো। খাওয়ার পর মহানবী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য। আমি কেবল তাঁরই কাছে সাহায্য চাই। তাঁর প্রতি বিশ্বাস রাখি, তাঁরই ওপর ভরসা করি। আমি নিঃসন্দেহে জানি এবং ঘোষণা করি: আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক। তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, কোনো শরিক নেই।” তারপর তিনি কথা চালিয়ে গেলেন, “আমি তোমাদের কাছে কখনো মিথ্যা বলি না, আমি তোমাদের সত্যই জানাচ্ছি… আমি তোমাদের সেই আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনতে আহ্বান করছি, যিনি এক এবং যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমাদের প্রতি এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি তাঁর প্রেরিত নবী। আল্লাহর কসম, তোমরা যেমন ঘুমিয়ে পড়ো, তেমনি মৃত্যুবরণ করবে; যেমন ঘুম থেকে জেগে ওঠো, তেমনি তোমাদের পুনর্জীবিত করা হবে এবং তোমাদের সব কাজের হিসাব নেওয়া হবে; ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর মন্দ কাজের জন্য শাস্তি পাবে। আর তা হলো হয় জান্নাতে চিরকাল থাকা, নয়তো জাহান্নামে চিরকাল থাকা। মানুষের মধ্যে আখিরাতের আজাবের ভয় আমি সবার আগে তোমাদেরই দেখাচ্ছি।”

এ কথাগুলো শুনে আবু তালিব বললেন, “হে আমার সম্মানিত ভাতিজা! তোমাকে সাহায্য করার চেয়ে মূল্যবান কিছু আমি জানি না। তোমার উপদেশগুলো আমরা আপন করে গ্রহণ করেছি, তোমার কথাগুলোও অন্তর থেকে সত্য বলে মেনেছি। এই মুহূর্তে এখানে যারা সমবেত হয়েছে, তারা তোমার দাদা আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। নিঃসন্দেহে আমিও তাদেরই একজন। তুমি যা চাও, তার দিকে আমাদের মধ্যে আমিই সবার আগে ছুটে যাব। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে ঘিরে রেখে তোমাকে রক্ষা করা থেকে এক মুহূর্তও বিরত থাকব না। তোমাকে যার আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা চালিয়ে যাও। কিন্তু পুরোনো ধর্ম ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার নফস এখনো আমার বশে আসেনি।”

আবু লাহাব ছাড়া সেখানকার আত্মীয়স্বজন ও চাচারা নরম সুরে কথা বললেন। কিন্তু আবু লাহাব বলল, “হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানেরা! অন্যরা তার হাত ধরে তাকে থামানোর আগেই তোমরা তাকে থামাও। আজ যদি তার কথা মেনে নাও, তবে লাঞ্ছনা ও অপমানের শিকার হবে। তাকে রক্ষা করতে গেলে তোমরা সবাই নিহত হবে…” – এভাবে সে ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলল এবং হুমকি দিতে লাগল। আবু লাহাবের জবাবে মহানবীর ফুফু বললেন, “হে আমার ভাই! আমার ভাইয়ের ছেলেকে এবং তাঁর দ্বীনকে সাহায্যহীন অবস্থায় ফেলে রাখা কি তোমার শোভা পায়? আল্লাহর কসম, আজকের দিনে জীবিত জ্ঞানীরা জানাচ্ছেন যে, আবদুল মুত্তালিবের বংশ থেকে একজন নবী আসবেন। ইনিই সেই নবী।”

এ কথার পরও আবু লাহাব তার কুৎসিত কথাবার্তা চালিয়ে গেল। আবু তালিব রেগে গিয়ে আবু লাহাবকে বললেন, “হে কাপুরুষ! আল্লাহর কসম, আমরা যতদিন বেঁচে আছি, আমরাই তাঁর সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী।” তারপর তিনি মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের দিকে ফিরে বললেন, “হে ভাতিজা! কখন তুমি মানুষকে তোমার রবের প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিতে চাও, তা আমাদের জানিয়ো; আমরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে তোমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব।” এরপর ফখরে কায়েনাত মহানবী আবার কথা শুরু করে বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানেরা! আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের যে কল্যাণকর বিষয় (অর্থাৎ এই দ্বীন) নিয়ে এসেছি, তার চেয়ে উত্তম ও কল্যাণকর কিছু আরবদের মধ্যে কেউ নিজের সম্প্রদায়ের জন্য নিয়ে আসেনি। আমি তোমাদের এমন দুটি বাক্য উচ্চারণ করতে আহ্বান করছি, যা জিহ্বায় হালকা, কিন্তু মিজানে ভারী। তা হলো, তোমরা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন, যেন আমি তোমাদের এর দিকে আহ্বান করি। অতএব তোমাদের মধ্যে কে আমার এই দাওয়াত গ্রহণ করবে এবং এই পথে আমার সাহায্যকারী হবে?” কেউ একটি শব্দও করল না। সবাই মাথা নিচু করে রইল। মহানবী এই কথাগুলো তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন। প্রতিবারই হযরত আলি উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন। তৃতীয়বার তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! বয়সে আমি এদের সবার ছোট হলেও আমিই আপনার সাহায্যকারী হব।” তখন রাসূলুল্লাহ হযরত আলির হাত ধরলেন।

বাকিরা বিস্মিত হয়ে চলে গেল। আত্মীয়স্বজনের এমন আচরণে আল্লাহ তাআলার হাবিব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত দুঃখ পেলেন।

কিন্তু তিনি দমে না গিয়ে তাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও সৌভাগ্য লাভের জন্য দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন।

বিসতের চতুর্থ বছরে সূরা হিজরের ৯৪তম আয়াত নাজিল হলো। এর মর্মার্থ: “(হে আমার হাবিব!) তোমাকে যার আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা (আদেশ ও নিষেধসমূহ) প্রকাশ্যে ঘোষণা করো। মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও! তাদের কথায় কর্ণপাত কোরো না!” এই ঐশী আদেশ আসার পর আমাদের প্রিয় নবী মক্কাবাসীকে প্রকাশ্যে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে শুরু করলেন। একদিন তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে বললেন, “হে কুরাইশের লোকেরা! এখানে সমবেত হয়ে আমার কথা শোনো!” গোত্রগুলো সমবেত হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি কখনো আমার কাছ থেকে কোনো মিথ্যা কথা শুনেছ?” সবাই একসঙ্গে বলল, “না, শুনিনি।” তিনি বললেন, “আল্লাহ তাআলা আমাকে নবুয়ত দান করেছেন এবং আমাকে তোমাদের কাছে নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন।” তারপর তিনি সূরা আরাফের ১৫৮তম আয়াত পাঠ করলেন, যার মর্মার্থ: “(হে আমার হাবিব!) তাদের বলো: ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার প্রতি প্রেরিত, জমিন ও আসমানের মালিক আল্লাহ তাআলার রাসূল। তিনিই প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যু দেন এবং জীবিত করেন। তিনি ছাড়া (ইবাদতের যোগ্য) কোনো ইলাহ নেই।’” শ্রোতাদের মধ্যে তাঁর চাচা আবু লাহাবও ছিল। সে কুফরে অটল থেকে রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলল, “আমার ভাইয়ের ছেলে পাগল হয়ে গেছে! যে আমাদের মূর্তিগুলোর পূজা করে না, যে আমাদের ধর্ম ছেড়ে গেছে, তার কথা শুনো না!” সেখানে উপস্থিত লোকেরা চলে গেল, একজনও ঈমান আনল না। মহানবী যে সত্যবাদী ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী, তা জেনেও তারা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং তাঁর শত্রু হয়ে গেল।

“তোমার নিকটাত্মীয়দের আল্লাহর আজাবের ভয় দেখিয়ে সত্য দ্বীনের দিকে আহ্বান করো” শুআরা: ২১৪

আরেক দিন আল্লাহ তাআলার আদেশ “তোমাকে যার আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা (আদেশ ও নিষেধসমূহ) প্রকাশ্যে জানিয়ে দাও” – মেনে মহানবী আবার সাফা পাহাড়ে উঠলেন। উঁচু ও জোরালো কণ্ঠে তিনি মানুষকে ডেকে বললেন, “ইয়া সাবাহাহ! এখানে এসো, সমবেত হও, তোমাদের জন্য আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে!”20 এই আহ্বানে গোত্রগুলো দৌড়ে এসে সমবেত হলো। তারা বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। যারা আসতে পারেনি, তারা কেন সবাইকে জড়ো করা হলো তা জানতে নিজেদের লোক পাঠাল। আগতদের একটি দল জিজ্ঞেস করতে লাগল, “হে মুহাম্মদুল আমিন! আমাদের এখানে কেন জড়ো করলে, কী খবর দেবে?” তিনি “হে কুরাইশের গোত্রগুলো!” – এই সম্বোধনে কথা শুরু করলেন। সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তিনি বলে চললেন, “আমার ও তোমাদের অবস্থা সেই ব্যক্তির মতো, যে শত্রু দেখে পরিবারকে খবর দিতে দৌড়ে যায় এবং শত্রু তার আগে পরিবারের কাছে পৌঁছে ক্ষতি করবে – এই ভয়ে চিৎকার করে বলে, ‘ইয়া সাবাহাহ!’ (শত্রু আমাদের ঘিরে ফেলেছে! ভোর হয়ে এসেছে! তাড়াতাড়ি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও!) হে কুরাইশের লোকেরা! আমি যদি তোমাদের বলি, এই পাহাড়ের ওপাশে একটি শত্রু বাহিনী আছে, তোমাদের ওপর হামলা করতে উদ্যত, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?” তারা বলল, “হ্যাঁ, বিশ্বাস করব। কারণ এ পর্যন্ত আমরা তোমার মধ্যে সত্যবাদিতা ছাড়া আর কিছু দেখিনি। তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি!…”

তখন তিনি কুরাইশের সব গোত্রের নাম ধরে বললেন, “হে বনু হাশিম! হে বনু আবদে মানাফ! হে বনু আবদুল মুত্তালিব!” এবং বলে চললেন, “আমি তোমাদের সেই কঠিন আজাব সম্পর্কে সতর্ককারী, যা নিশ্চিতভাবেই আসবে। আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন, যেন আমি আমার নিকটতম আত্মীয়দের আখিরাতের আজাবের ভয় দেখাই। আমি তোমাদের আহ্বান করছি, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু (আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) বলে ঈমান আনো। আর আমি তাঁর বান্দা ও রাসূল। যদি এতে ঈমান আনো, তবে জান্নাতে যাবে। তোমরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ না বলা পর্যন্ত আমি তোমাদের দুনিয়াতেও কোনো উপকার করতে পারব না, আখিরাতেও কোনো অংশ এনে দিতে পারব না।” শ্রোতা গোত্রগুলোর মধ্য থেকে আবু লাহাব “এর জন্যই কি আমাদের জড়ো করেছ?” বলে মাটি থেকে একটি পাথর তুলে আমাদের প্রিয় নবীর দিকে ছুড়ে মারল। অন্যদের পক্ষ থেকে এমন বিরোধিতা আসেনি; তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে চলে গেল।21

সূর্যকে আমার ডান হাতে দিলেও!

এসব দাওয়াতের পর আমাদের প্রিয় নবী যেখানেই কোনো ব্যক্তি বা দলকে দেখতেন, তাদের কাছে ইসলামের কথা তুলে ধরতেন। তিনি জানাতেন, প্রকৃত মুক্তি কেবল নফসের অনুসরণ, জুলুম, অন্যায় ও সব ধরনের মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমেই সম্ভব। যারা নিজেদের নফসের খেয়ালখুশি ও কামনা-বাসনার অনুসরণ করত, দুর্বলদের ওপর নিপীড়ন চালাত এবং ঔদ্ধত্যে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তারা এর তীব্র বিরোধিতা করল। তাদের এসব বিকৃত কাজের অবসান ঘটতে যাচ্ছে দেখে তারা মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের প্রচারিত বাণী অস্বীকার করল। তারা তাঁর এবং ঈমানদারদের শত্রু হয়ে গেল। মুশরিকরা প্রথমে উপহাস করত। তারপর তারা চাপ ও নির্যাতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। তারা মুমিনদের ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখতে এবং ইসলামের দাওয়াত নিভিয়ে দিতে চাইছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিল আবু জাহল, উতবা, শাইবা, আবু লাহাব, উকবা ইবনে আবি মুআইত, আস ইবনে ওয়াইল, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস, ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা…

একদিন উতবা, শাইবা ও আবু জাহল আবু তালিবকে বলল, “তুমি আমাদের মুরব্বি। আমরা সবসময় তোমাকে শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি। কিন্তু এখন তোমার ভাইয়ের ছেলে একটি নতুন ধর্ম চালু করেছে। সে আমাদের মূর্তিগুলোকে গালি দেয় এবং আমাদের কাফির বলে অভিযুক্ত করে। তাকে উপদেশ দাও। এ কাজ থেকে তাকে ফিরিয়ে রাখো। যদি সে ফিরে না আসে, তবে তার কী ব্যবস্থা নিতে হয়, তা আমরা জানি…”

আবু তালিব তাদের শান্ত করে ফিরিয়ে দিলেন; আর আমাদের নবী যেন দুঃখ না পান, সেজন্য বিষয়টি তাঁর কাছে গোপন রাখলেন। কিছুদিন পর মুশরিকরা আবার জোট বেঁধে আবু তালিবের কাছে এল। তারা বলল, “এর আগেও আমরা তোমার কাছে এসে ব্যাপারটি জানিয়েছিলাম। তুমি আমাদের কথায় কান দাওনি। সে এখনো আমাদের মূর্তিগুলোর নিন্দা করেই চলেছে। আমাদের সহ্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে। তোমাদের দুজনের সঙ্গেই আমরা রক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়ব। মক্কায় হয় সে নিশ্চিহ্ন হবে, নয়তো আমরা।” আবু তালিব তাদের শান্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তারা নিজেদের জেদে অটল রইল।22

আবু তালিব যেমন চাইতেন না যে, রাসূলুল্লাহর মনে কষ্ট লাগুক, তেমনি তিনি এটাও চাইতেন না যে, তাঁর ও তাঁর কওমের মধ্যে কোনো শত্রুতা সৃষ্টি হোক। তিনি আমাদের নবীর কাছে এসে বললেন, “হে মুহাম্মদ! গোটা কওম তোমার বিরুদ্ধে শত্রুতায় একজোট হয়েছে এবং আমার কাছে নালিশ নিয়ে এসেছে। আত্মীয়দের মধ্যে শত্রুতা ভালো নয়। তারা চায়, তুমি তাদের কাফির বলবে না এবং তারা ভ্রান্ত পথে আছে – এ কথা বলে তাদের নিন্দা করবে না।” এর জবাবে হাবিবে আকরাম বললেন:

“চাচাজান! জেনে রাখুন, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও তুলে দেয় (যত প্রতিশ্রুতিই দিক না কেন), তবু আমি এই দ্বীন থেকে এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও জানিয়ে দেওয়া থেকে কখনো বিরত হব না। হয় আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে সারা জাহানে ছড়িয়ে দেবেন আর আমার দায়িত্ব পূর্ণ হবে, নয়তো এই পথে আমি আমার প্রাণ উৎসর্গ করব।” এ কথা বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুবারক চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে গিয়েছিল।

রাসূলুল্লাহকে ব্যথিত দেখে আবু তালিব নিজের কথার জন্য অনুতপ্ত হলেন এবং তাঁকে গলায় জড়িয়ে ধরে বললেন, “হে আমার ভাতিজা! তোমার পথে চলতে থাকো, যা চাও তা-ই করো। আমি যত দিন বেঁচে আছি, তোমাকে আগলে রাখব, রক্ষা করব।”23

মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় দশজন যখন বুঝল যে, আবু তালিব হযরত মুহাম্মদকে রক্ষা করছেন, তখন তারা উমারা ইবনে ওয়ালিদকে সঙ্গে নিয়ে আবু তালিবের কাছে গেল। তারা তাঁর কাছে এমন এক প্রস্তাব রাখল, যা মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়: “হে আবু তালিব! তুমি তো জানো, এই উমারা মক্কার যুবকদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে সচ্চরিত্র। তা ছাড়া সে একজন কবিও। তাকে আমরা তোমার হাতে দিচ্ছি, তোমার কাজে লাগাও। উমারার বদলে মুহাম্মদকে আমাদের হাতে দাও, আমরা তাকে হত্যা করব। তোমার জন্য মানুষের বদলে মানুষ! আর কী চাও?” এ কথায় আবু তালিব ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি বললেন, “আগে তোমরা তোমাদের নিজেদের ছেলেদের আমার হাতে দাও। আমি তাদের হত্যা করব। তারপর আমার ভাতিজাকে দেব।” তখন মুশরিকরা ব্যাপারটি কত গুরুতর, তা বুঝতে পেরে বলল, “আমাদের ছেলেরা তো সে যা করছে, তা করে না…” আবু তালিব বললেন, “কসম করে বলছি, আমার ভাতিজা তোমাদের সব সন্তানের চেয়ে উত্তম। তাহলে তোমরা তোমাদের ছেলেকে আমার হাতে দেবে, আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে বড় করব, আর তোমরা আমার কলিজার টুকরাকে নিয়ে হত্যা করবে – তাই না!… মাদি উটও নিজের বাচ্চা ছাড়া অন্য কারও জন্য ব্যাকুল হয় না, অন্য কাউকে আগলে রাখে না। এ কাজ বুদ্ধি-বিবেচনা থেকে বহু দূরে। ব্যাপারটি এখন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যে আমার কলিজার টুকরা মুহাম্মদের (আলাইহিস সালাম) শত্রু, আমিও তার শত্রু। এ কথা ভালো করে জেনে রাখো, আর তোমাদের যা করার আছে, করে দেখো!”24 মুশরিকরা ক্রোধে উঠে চলে গেল। আবু তালিব সঙ্গে সঙ্গে বনু হাশিম ও বনু আবদুল মুত্তালিবকে একত্র করলেন। তাদের কাছে পরিস্থিতি খুলে বলে তিনি তাদের আমাদের প্রিয় নবীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহায্য করতে রাজি করালেন। রাসূলুল্লাহকে হত্যা করতে যে হাত উঠবে, তা ভেঙে দেওয়া হবে – এ বিষয়ে তারা মুশরিকদের বিরুদ্ধে একজোট হলো। শুধু আবু লাহাব যোগ দিল না। আবু তালিব তাদের বললেন, “হে বীরেরা! কাল তোমাদের প্রত্যেকে কোমরে তলোয়ার বেঁধে আমার পেছনে পেছনে আসবে!”

“চাচাজান! জেনে রাখুন, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও তুলে দেয় (যত প্রতিশ্রুতিই দিক না কেন), তবু আমি এই দ্বীন থেকে এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও জানিয়ে দেওয়া থেকে কখনো বিরত হব না। হয় আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে সারা জাহানে ছড়িয়ে দেবেন আর আমার দায়িত্ব পূর্ণ হবে, নয়তো এই পথে আমি আমার প্রাণ উৎসর্গ করব” আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম

পরদিন আবু তালিব মহানবীর ঘরে গেলেন। সবাই মিলে তাঁরা হারাম শরীফের দিকে রওনা হলেন। বনু হাশিমের বীর যুবকেরা তাঁদের পেছনে পেছনে চলল। তাঁরা কাবায় পৌঁছে মুশরিকদের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। আবু তালিব মুশরিকদের বললেন, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! শুনেছি, তোমরা আমার ভাতিজাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ। তোমরা কি জানো, আমার পেছনে দাঁড়ানো এই যুবকদের হাত তলোয়ারের ওপর, তারা অধীর হয়ে আমার একটি ইশারার অপেক্ষায় আছে? কসম করে বলছি, তোমরা যদি মুহাম্মদকে হত্যা করো, তাহলে তোমাদের একজনকেও জীবিত রাখব না!…” এ কথা বলার পর তিনি আমাদের প্রিয় নবীর প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। আবু জাহল থেকে শুরু করে সেখানে উপস্থিত মুশরিকরা সবাই সরে পড়ল।