আমার প্রিয় নবী

রাজির ঘটনা

উহুদের যুদ্ধের দক্ষতম তিরন্দাজদের অন্যতম হযরত আসিম ইবনে সাবিত এই যুদ্ধে মুশরিকদের মধ্যে মুসাফি ইবনে তালহা ও তার ভাই হারিসকে হত্যা করেছিলেন। তাদের মা সুলাফা বিনতে সাদ ছিল প্রতিহিংসাপরায়ণতার জন্য কুখ্যাত। সে ঘোষণা দিল, তার দুই ছেলের হত্যাকারী আসিম ইবনে সাবিতের মাথা যে এনে দেবে, তাকে সে একশো উট দেবে। সে হযরত আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করার কসম খেল। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহর পাঠানো একটি সারিয়্যায় আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস বনু লিহইয়ানের খালিদ ইবনে সুফিয়ানকে হত্যা করায় বনু লিহইয়ান আদাল ও কারা গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করল। মক্কার আশপাশে বসবাসকারী এই দুই গোত্র একটি পরিকল্পনা করে দূত প্রস্তুত করল। তারা দূতদের বলল, “তোমরা বলবে যে, তোমরা মুসলমান হয়েছ। বলবে, ‘আমরা যাকাত দেব, তা গ্রহণ করার জন্য এবং আমাদের ইসলাম শেখানোর জন্য আমরা শিক্ষক চাই।’ যারা আসবে, তাদের কয়েকজনকে হত্যা করে আমরা প্রতিশোধ নেব। আর কয়েকজনকে মক্কায় নিয়ে গিয়ে কুরাইশদের কাছে বিক্রি করে দেব।”

হিজরতের চতুর্থ বছরের সফর মাসে এই দুই গোত্রের ছয় বা সাতজনের একটি প্রতিনিধিদল মহানবীর কাছে এসে বলল, “আমরা মুসলমান হয়েছি, আমাদের পবিত্র কুরআন ও দ্বীন শেখানোর জন্য শিক্ষক পাঠিয়ে দিন।”

এ সময় আমাদের প্রিয় নবী মক্কার মুশরিকরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য দশজনের একটি সারিয়্যা প্রস্তুত করেছিলেন। আদাল ও কারা গোত্র থেকেও এমন একটি প্রতিনিধিদল এসে শিক্ষক চাওয়ায় তিনি পরিস্থিতি অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও খবর দেওয়ার জন্য দশজনের এই গোয়েন্দা দলটিকে আগতদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন।

এই সারিয়্যায় সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে ছিলেন মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ, খালিদ ইবনে আবি বুকাইর, আসিম ইবনে সাবিত, খুবাইব ইবনে আদি, জায়েদ ইবনে দাসিন্না, আবদুল্লাহ ইবনে তারিক, মুআত্তিব (মুগির) ইবনে উবাইদ এবং আরও তিনজন সাহাবী, যাঁদের নাম জানা যায় না (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।

দিনের বেলা লুকিয়ে থেকে আর রাতে পথ চলে এই গোয়েন্দা দলটি একদিন সাহরির সময় রাজির পানির কাছে এসে পৌঁছাল। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তাঁরা আজওয়া নামক উৎকৃষ্ট জাতের মদিনার খেজুর খেলেন। তারপর সেখান থেকে সরে গিয়ে কাছের একটি পাহাড়ে উঠে লুকিয়ে রইলেন।

হুজাইল গোত্রের এক মেষপালিকা নারীও রাজির পানির কাছে এসেছিল। খেজুরের বিচিগুলো দেখে সে বুঝতে পারল, এখানে মদিনার খেজুর খাওয়া হয়েছে। “এখানে মদিনা থেকে লোক এসেছিল!” বলে চিৎকার করে সে তার গোত্রকে খবর দিল।

সাহাবায়ে কেরামের এই দশজনের সারিয়্যার সঙ্গে আদাল ও কারা গোত্রের যে প্রতিনিধিরা ছিল, তাদের একজন এ সময় কোনো এক অজুহাতে তাঁদের কাছ থেকে সরে পড়ল। সে সঙ্গে সঙ্গে বনু লিহইয়ানের কাছে গিয়ে খবর দিল।

এই খবর পেয়ে বনু লিহইয়ান তৎপর হয়ে উঠল। এই ছোট্ট সারিয়্যার বিরুদ্ধে তারা দুইশোজনের একটি বাহিনী পাঠাল, যাদের একশোজন ছিল তিরন্দাজ। আগত এই মুশরিকদের দল হযরত আসিম ইবনে সাবিত ও তাঁর সাথিদের পাহাড়ের চূড়ায় খুঁজে পেয়ে ঘিরে ফেলল। দশজন সাহাবীর খবর যে লোকটি মুশরিকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, সে-ও এর মধ্যে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। সাহাবায়ে কেরাম তখনই বুঝতে পারলেন যে, তাঁদের প্রতারিত করা হয়েছে। তাঁরা লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে তলোয়ার কোষমুক্ত করলেন। তা বুঝতে পেরে মুশরিকরা তাঁদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “তোমরা যদি আমাদের কাছে নেমে আসো, তবে তোমাদের কাউকেই আমরা হত্যা করব না। পাকা কথা দিচ্ছি। আল্লাহর কসম, আমরা তোমাদের হত্যা করতে চাই না। তবে তোমাদের বদলে মক্কাবাসীদের কাছ থেকে আমরা মুক্তিপণ (ফিদিয়া) আদায় করতে চাই।”

“আহত হওয়ার পরও যারা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছে, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে ও মন্দ থেকে বেঁচে থেকেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা প্রতিদান” আলে ইমরান: ১৭২

রাজির ঘটনা

আসিম ইবনে সাবিত, মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ ও খালিদ ইবনে আবি বুকাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, “মুশরিকদের কথা ও অঙ্গীকার আমরা কখনো গ্রহণ করব না।” এ কথা বলে তাঁরা তাদের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। হযরত আসিম ইবনে সাবিত বললেন, “আমি কসম খেয়েছি যে, কখনো মুশরিকদের আশ্রয় গ্রহণ করব না। আল্লাহর কসম, তাদের আশ্রয় ও কথায় ভুলে আমি নিচে নেমে আত্মসমর্পণ করব না।” তিনি দুই হাত তুলে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তোমার নবীকে আমাদের অবস্থার খবর জানিয়ে দাও।” আল্লাহ তাআলা হযরত আসিমের দোয়া কবুল করলেন এবং রাসূলুল্লাহকে তাঁদের খবর জানিয়ে দিলেন।

হযরত আসিম মুশরিকদের বললেন, “আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই না। কারণ আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন (মৃত্যু হলে শহিদ হয়ে জান্নাতে যাব)।” মুশরিকদের সরদার বলল, “হে আসিম! নিজেকে আর তোমার সাথিদের ধ্বংস কোরো না, আত্মসমর্পণ করো!” এর জবাবে আসিম ইবনে সাবিত তির ছুড়লেন। তির ছোড়ার সময় তিনি এই চরণগুলো আবৃত্তি করছিলেন:

আমি শক্তিমান, কোনো ঘাটতি নেই আমার।
আমার ধনুকের মোটা ছিলা টানটান হয়ে আছে।
মৃত্যু সত্য, জীবন অসার ও ক্ষণস্থায়ী।
তাকদিরে যা লেখা, সবই মাথার ওপর আসবে।
মানুষ আগে হোক বা পরে, আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে।
যদি আমি তোমাদের সঙ্গে লড়াই না করি,
আমার মা (দুঃখে) জ্ঞান হারাবেন।

আসিমের তূণে সাতটি তির ছিল। প্রতিটি তির দিয়ে তিনি একজন করে মুশরিককে হত্যা করলেন। তির ফুরিয়ে গেলে বর্শা দিয়ে অনেককে ক্ষতবিক্ষত করলেন। কিন্তু তাঁর বর্শাটিও ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তলোয়ার কোষমুক্ত করলেন, খাপটি ভেঙে ছুড়ে ফেলে দিলেন। (এর অর্থ ছিল, “মৃত্যু পর্যন্ত লড়ব, আত্মসমর্পণ করব না।”) তারপর তিনি এভাবে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আজ পর্যন্ত আমি তোমার দ্বীনের হেফাজত করেছি। আজকের দিনের শেষে তুমি আমার দেহ রক্ষা করো, হেফাজত করো – তোমার কাছে এই মিনতি করছি।” হযরত আসিম ইবনে সাবিত ও অন্য সাহাবীদের “আল্লাহু আকবার!” ধ্বনিতে পাহাড়গুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। দুইশোজনের বিরুদ্ধে দশজন মুজাহিদ জীবন বাজি রেখে লড়াই করছিলেন, আর যারা তাঁদের কাছে ঘেঁষছিল, তারা নিজেদের কৃতকর্মের সাজা পাচ্ছিল। অবশেষে আসিম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দুই পায়ে আঘাত পেয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। কাফিররা তাঁকে এত ভয় পাচ্ছিল যে, তিনি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁর কাছে যেতে পারল না, দূর থেকে তির ছুড়ে তাঁকে শহিদ করল। সেদিন সেখানে উপস্থিত দশজন সাহাবীর সাতজন শহিদ হলেন, তিনজন বন্দি হলেন।

বনু লিহইয়ান সুলাফা বিনতে সাদের কাছে বিক্রি করার জন্য আসিম ইবনে সাবিতের মুবারক মাথা কেটে নিতে চাইল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হযরত আসিম ইবনে সাবিতের দোয়া কবুল করেছিলেন বলে সেখানে এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন। মৌমাছিগুলো মেঘের মতো আসিম ইবনে সাবিতের ওপর অবস্থান নিল। মুশরিকরা তাঁর কাছে যেতে পারল না। শেষে তারা বলল, “ছেড়ে দাও, সন্ধ্যা হলে মৌমাছিরা চলে যাবে, তখন আমরা মাথা কেটে নিয়ে যাব।”

সন্ধ্যায় আল্লাহ তাআলা মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। উপত্যকাগুলো দিয়ে ঢল নামল এবং তা হযরত আসিম ইবনে সাবিতের মুবারক দেহ ভাসিয়ে নিয়ে অজানা এক স্থানে নিয়ে গেল। মুশরিকরা যত খুঁজল, তা আর পেল না। এ কারণে মুশরিকরা হযরত আসিম ইবনে সাবিতের দেহের কোনো অংশই কেটে নিতে সক্ষম হলো না।

“হে আল্লাহ! আজ পর্যন্ত আমি তোমার দ্বীনের হেফাজত করেছি। আজকের দিনের শেষে তুমি আমার দেহ রক্ষা করো, হেফাজত করো – তোমার কাছে এই মিনতি করছি” আসিম ইবনে সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

মৌমাছিরা যে হযরত আসিমকে রক্ষা করেছিল, সে ঘটনা আলোচিত হলে হযরত উমর বললেন, “আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাঁর মুমিন বান্দাকে হেফাজত করেন। আসিম ইবনে সাবিত জীবদ্দশায় যেভাবে মুশরিকদের থেকে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন, আল্লাহ তাআলাও তেমনি মৃত্যুর পর তাঁর দেহ হেফাজত করেছেন এবং মুশরিকদের তা স্পর্শ করতে দেননি।” এ কারণে আসিম ইবনে সাবিতের কথা উঠলে তাঁকে “মৌমাছিরা যাঁকে রক্ষা করেছিল” বলে স্মরণ করা হতো।1

বন্দি হওয়া তিন সাহাবী ছিলেন খুবাইব ইবনে আদি, জায়েদ ইবনে দাসিন্না ও আবদুল্লাহ ইবনে তারিক (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। বনু লিহইয়ান তিনজনকেই ধনুকের ছিলা দিয়ে বেঁধে ফেলল। তাঁদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে তারিক মক্কার মুশরিকদের কাছে যেতে রাজি হলেন না এবং বাধা দিলেন। “আমার শহিদ সাথিরা জান্নাতের মর্যাদা লাভ করেছেন!” বলে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। তিনি হাতের বাঁধন ছিঁড়ে ফেললেন, কিন্তু বনু লিহইয়ান পাথর ছুড়ে তাঁকেও শহিদ করল। হযরত খুবাইব ইবনে আদি ও জায়েদ ইবনে দাসিন্না “হয়তো রাসূলুল্লাহর দেওয়া গোয়েন্দাগিরির দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ পাব” – এই চিন্তা করে ধৈর্য ধরলেন।

বনু লিহইয়ান দুজনকেই মক্কায় নিয়ে গেল। বদর ও উহুদের যুদ্ধে যাদের আত্মীয়স্বজন নিহত হয়েছিল, সেই মুশরিকরা বিদ্বেষ ও প্রতিশোধের লালসায় জ্বলছিল এবং সুযোগ খুঁজছিল। মুশরিকদের মধ্যে হুজাইর ইবনে আবি ইহাব তামিমি বদরের যুদ্ধে নিহত তার ভাইয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হযরত খুবাইবকে কিনে নিল, আর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বদরের যুদ্ধে নিহত তার পিতা উমাইয়া ইবনে খালাফের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হযরত জায়েদ ইবনে দাসিন্নাকে কিনে নিল। মুশরিকদের উদ্দেশ্য ছিল দুজনকেই হত্যা করা। কিন্তু তখন চলছিল সেই মাসগুলোর একটি, যেগুলোতে যুদ্ধকে তারা নিষিদ্ধ মনে করত। তাই তারা তাঁদের বন্দি করে রেখে সেই সময় পার হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল। তাঁদের আলাদা আলাদা জায়গায় বন্দি করে রাখা হলো। দুই সাহাবীই এই বন্দিদশায় গভীর ধৈর্য, সহনশীলতা ও আভিজাত্যের পরিচয় দিলেন।

হযরত খুবাইব ইবনে আদিকে যে ঘরে বন্দি রাখা হয়েছিল, সেখানে থাকত মাবিয়া নামে এক মুক্ত দাসী (এই নারী পরে মুসলমান হয়েছিলেন)। তিনি বর্ণনা করেছেন:

“খুবাইবকে আমি যে ঘরে থাকতাম, সেখানে একটি ছোট কামরায় বন্দি রাখা হয়েছিল। তাঁর চেয়ে উত্তম কোনো বন্দি আমি দেখিনি। একদিন দেখি, তাঁর হাতে একটি পানির পাত্রের মতো বিশাল আঙুরের থোকা। তিনি তা থেকে খাচ্ছিলেন। প্রতিদিন তাঁর হাতে এমন আঙুরের থোকা দেখা যেত। বছরের সেই মৌসুমে, তার ওপর আবার মক্কায়, আঙুর পাওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না। আল্লাহ তাআলাই তাঁকে রিজিক দিচ্ছিলেন। যে কামরায় তিনি বন্দি ছিলেন, সেখানে তিনি নামাজ পড়তেন, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর তিলাওয়াত শুনে নারীরা কাঁদত এবং তাঁর জন্য মমতা বোধ করত। কখনো আমি জিজ্ঞেস করতাম, ‘তোমার কোনো চাওয়া আছে কি?’ তিনি বলতেন, ‘আমাকে মিঠা পানি দাও, মূর্তির নামে জবাই করা পশুর গোশত এনো না, আর আমাকে যখন হত্যা করবে, তা আগেভাগে জানিয়ে দিয়ো – এর বাইরে আর কিছু চাই না।’ তাঁকে হত্যার দিন নির্ধারিত হলে আমি গিয়ে তাঁকে জানালাম। এ কথা শুনেও তাঁর মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না, বিন্দুমাত্র দুঃখের চিহ্নও তিনি দেখালেন না।

সেই দিনটি ঘনিয়ে এলে তিনি জানালেন যে, মৃত্যুর আগে তিনি শরীর পরিচ্ছন্ন করতে চান; তাই একটি ক্ষুর চাইলেন। আমি আমার শিশুর হাতে ক্ষুরটি দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দিলাম। শিশুটি তাঁর কাছে ঢুকে পড়লে হঠাৎ আমার ভীষণ ভয় হলো। আমি বললাম, ‘হায় সর্বনাশ! এই লোক তো ক্ষুর দিয়ে শিশুটিকে জবাই করে ফেলবে। তাকে তো এমনিতেই মেরে ফেলা হবে।’ দৌড়ে শিশুটিকে দেখতে গেলাম। দেখি, আমার পাঠানো ক্ষুরটি খুবাইব শিশুর হাত থেকে নিয়ে নিয়েছেন আর শিশুটিকে আদর করে হাঁটুর ওপর বসিয়ে রেখেছেন। এ অবস্থা দেখে প্রচণ্ড ভয়ে আমি চিৎকার করতে লাগলাম। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তিনি বললেন, ‘তুমি কি ভাবছ, আমি এই শিশুটিকে হত্যা করব? আমাদের দ্বীনে এমন কিছু নেই। অন্যায়ভাবে কারও প্রাণ নেওয়া আমাদের স্বভাব ও মর্যাদার সঙ্গে খাপ খায় না।’”

খুবাইব ইবনে আদি ও জায়েদ ইবনে দাসিন্নাকে হত্যার জন্য মুশরিকদের নির্ধারিত দিনটি এসে গেল। সেদিন ভোরবেলা তারা বন্দিদের শিকল খুলে মক্কার বাইরে তানইম নামক স্থানে নিয়ে গেল। (তানইম কাবা থেকে ৫–৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানকার পাহাড়টির নামও তানইম পাহাড়।) মক্কার লোকজন ও মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেখার জন্য সমবেত হয়েছিল। চারদিকে বিশাল জনতার ভিড় ছিল।

বন্দিদের যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, সেখানে মুশরিকরা দুটি ফাঁসিকাঠ খাড়া করেছিল। হযরত খুবাইবকে ফাঁসিকাঠে তুলে বাঁধতে চাইলে তিনি বললেন, “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিই।” তারা তাঁকে ছেড়ে দিল এবং বলল, “ওখানে পড়ো।” খুবাইব সঙ্গে সঙ্গে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং গভীর একাগ্রতায় (খুশুর সঙ্গে) দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। সমবেত মুশরিক, নারী ও শিশুরা উত্তেজনা নিয়ে তাঁকে দেখছিল। নামাজ শেষ করে তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা যদি না ভাবতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তাহলে আমি নামাজ আরও দীর্ঘ করতাম এবং আরও বেশি পড়তাম।” এভাবে হযরত খুবাইব ইবনে আদিই সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ডের সময় দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন, আর তাঁর কারণেই এটি একটি রীতি ও সুন্নত হয়ে উঠল। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন শুনলেন যে, মৃত্যুদণ্ডের আগে তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করেছেন, তখন তাঁর এই কাজকে যথাযথ ও সংগত বলে গণ্য করলেন।2

নামাজ শেষ হওয়ার পর হযরত খুবাইবকে ফাঁসিকাঠে তুলে বাঁধা হলো। তাঁর মুখ কিবলা থেকে মদিনার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। তারপর তারা বলল, “চলো, তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো! আমরা তোমাকে মুক্ত করে দেব।” তিনি এই জবাব দিলেন, “আল্লাহর কসম, আমি ফিরব না! সমগ্র দুনিয়াও যদি আমার হয়ে যায়, আমাকে দিয়ে দেওয়া হয়, তবু আমি ইসলাম থেকে ফিরব না!”

এই জবাব পেয়ে মুশরিকরা বলল, “তুমি কি চাও না যে, এখন তোমার জায়গায় মুহাম্মদ থাকুক, তাকে হত্যা করা হোক? ‘হ্যাঁ’ বললে তুমি বেঁচে যাবে, নিজের ঘরে আরামে বসে থাকবে!” খুবাইব বললেন, “মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের পায়ে একটি কাঁটা বিঁধুক – এতেও আমি কখনো রাজি নই!”

মুশরিকরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে হাসাহাসি করতে করতে বলল, “হে খুবাইব! ইসলাম ধর্ম থেকে ফিরে এসো! না ফিরলে আমরা তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব!” খুবাইব তাদের জবাব দিলেন, “আল্লাহ তাআলার পথে যখন আছি, তখন নিহত হওয়ার কোনো গুরুত্বই আমার কাছে নেই।”

এরপর খুবাইব দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! এখানে আমি শত্রুর মুখ ছাড়া আর কোনো মুখ দেখছি না। হে আল্লাহ! আমার পক্ষ থেকে তোমার রাসূলের কাছে সালাম পৌঁছে দাও। আমাদের সঙ্গে যা করা হলো, তা তোমার রাসূলকে জানিয়ে দাও!” তারপর বললেন, “আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।” খুবাইব যখন এই দোয়া করছিলেন, তখন আমাদের প্রিয় নবী সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে বসে ছিলেন। জায়েদ ইবনে হারিসা বর্ণনা করেন, “একদিন রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের সঙ্গে বসে ছিলেন, এমন সময় বললেন, ‘ওয়া আলাইহিস সালাম।’ সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কার সালামের জবাব?’ তিনি ইরশাদ করলেন, ’এটি আমাদের ভাই খুবাইবের সালামের জবাব। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) খুবাইবের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।’”3

খুবাইবের চারপাশে জড়ো হওয়া কুরাইশ মুশরিকরা “এই হলো সেই লোক, যে তোমাদের পিতাদের হত্যা করেছে” বলে তরুণদের বর্শা নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালাতে উসকে দিল, আর তারা তাঁর মুবারক দেহ ক্ষতবিক্ষত করতে লাগল। এ সময় খুবাইবের মুখ কাবার দিকে ঘুরে গেল। মুশরিকরা আবার তা মদিনার দিকে ঘুরিয়ে দিল। হযরত খুবাইব দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আমি যদি তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য বান্দা হয়ে থাকি, তবে আমার মুখ কিবলার দিকে ফিরিয়ে দাও।” তাঁর মুখ আবার কিবলার দিকে ঘুরে গেল। মুশরিকদের কেউই তাঁর মুখ কাবা ছাড়া অন্য কোনো দিকে ফেরাতে পারল না। এর মধ্যে খুবাইব একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন; তাতে তিনি ফাঁসিকাঠের ওপর শত্রুদের মাঝে নিঃসঙ্গ অবস্থায় শহিদ হতে চলার কথা তুলে ধরলেন। মুশরিকরা হাতের বর্শাগুলো তাঁর দেহে বিঁধিয়ে নির্যাতন শুরু করলে তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, মুসলমান হিসেবেই যখন আমি নিহত হচ্ছি, তখন আঘাত খেয়ে যে পাশেই পড়ি না কেন, আমার কোনো দুঃখ নেই! এর সবই আল্লাহ তাআলার পথে।”

“মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের পায়ে একটি কাঁটা বিঁধুক – এতেও আমি কখনো রাজি নই!” খুবাইব ইবনে আদি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

এরপর খুবাইব মুশরিকদের জন্য এই বদদোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! কুরাইশ মুশরিকদের সবাইকে ধ্বংস করো! তাদের দলগুলো ছত্রভঙ্গ করে দাও! একে একে তাদের প্রাণ নাও, তাদের কাউকে জীবিত রেখো না!” এই বদদোয়া শুনে মুশরিকরা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল, তাদের একাংশ সেখান থেকে পালিয়ে দূরে চলে গেল। যারা রয়ে গেল, তাদের কেউ কেউ একের পর এক তাঁর দেহে বর্শা বিঁধাতে লাগল। তাদের একজন তাঁর বুকে বর্শা বিঁধিয়ে দিল, বর্শাটি পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেল। দেহ থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে, ফাঁসিকাঠে ঝুলে থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন – এমন অবস্থায় খুবাইব “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু” বলে শহিদ হলেন।4

খুবাইব ইবনে আদির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মরদেহ চল্লিশ দিন ফাঁসিকাঠে ঝুলে রইল। তাঁর দেহ পচেনি, দুর্গন্ধও ছড়ায়নি। তা থেকে সবসময় তাজা রক্ত ঝরছিল। আমাদের প্রিয় নবী তাঁর মরদেহ নিয়ে আসার জন্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে হযরত জুবাইর ইবনে আওয়াম ও মিকদাদ ইবনে আসওয়াদকে পাঠালেন। তাঁরা রাতের বেলা গোপনে মক্কায় প্রবেশ করলেন। খুবাইবকে যে ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হয়েছিল, তা থেকে নামিয়ে উটের পিঠে তুলে তাঁরা মদিনার পথে রওনা হলেন। ব্যাপারটি জানতে পেরে মুশরিকরা বিশাল দল নিয়ে তাঁদের দিকে ধেয়ে এল। দুই সাহাবীই আত্মরক্ষার জন্য মুবারক দেহ মাটিতে রাখলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁরা দেখলেন, যেখানে তা রেখেছিলেন, সেখানকার মাটি ফেটে গিয়ে দেহ মুবারক ভেতরে টেনে নিয়ে আবার বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর তাঁরা মদিনার পথ ধরলেন।

হযরত জায়েদ ইবনে দাসিন্নাকেও খাড়া করা আরেকটি ফাঁসিকাঠে বাঁধা হলো। তাঁকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে আনতে তারা বলপ্রয়োগ করল। কিন্তু জায়েদের ঈমানকে আরও মজবুত করা ছাড়া মুশরিকরা আর কিছুই অর্জন করতে পারল না। তখন তারা জায়েদের ওপর তির বর্ষণ করল। অবশেষে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার মুক্ত দাস নিসতাস তাঁকে শহিদ করল।